Latest News

বাংলার ডাকাত কালী উপাখ্যান

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

“মাথায় ঝাঁকড়া চুল, কানে গোঁজা জবা ফুল… হা রে রে রে ডাকাত এলো রে তেড়ে”… বঙ্কিমচন্দ্রের সেই কালাদিঘির ডাকাতদের গল্প তো কমবেশি সবাই সবাই পড়েছে ছোটবেলায়। কলকাতা সহ এই বাংলার মাটিতে বাস্তবেও রাজত্ব ছিল এসব দোর্দণ্ডপ্রতাপ ডাকাতদের (Dakat Kali)।

ডাকাতদের কালী পুজো নিয়ে মিথ হয়ে আছে যেসব কল্পকাহিনি, সেখানে দেখা যায় তাঁরা নরবলি, ছাগবলি দিয়ে ছাগ-রক্ত করালবদনী কালীর খাঁড়ায় ছুঁইয়ে সেই রক্তে কপালে রক্ততিলক কেটে রক্তবস্ত্র পরে দলবল নিয়ে হা রে রে রে করে ডাকাতি করতে বেরোত। উগ্রচণ্ডা মুক্তকেশী করালবদনী কালীর সঙ্গে ডাকাতদের দাপট আর নৃশংসতা যেন একাকার হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তব জীবনে বেশিরভাগ ডাকাতেরাই দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করতেন এবং তাঁদের কালীপুজোর রীতিতে উগ্রতার থেকে আধ্যাত্মিকতাই থাকত বেশি। 

শপিং মল, ফ্লাইওভার, ঝাঁ চকচকে কলকাতা শহর-সহ সমগ্র বাংলাতেই আজও নিভৃতে আছে এমনই সব ডাকাতকালী ও সেই ডাকাতদের স্মৃতিবিজড়িত অসংখ্য মন্দির। কালী পুজোর পুণ্য তিথিতে এমনই সব ডাকাত কালীদের মাহাত্ম্য নিয়ে এই উপাখ্যান।

কাশীপুর রঘু ডাকাতের কালী (Dakat Kali)

Image - বাংলার ডাকাত কালী উপাখ্যান

ভাগীরথীর তীরে জঙ্গলঘেরা আলো অন্ধকার এক অঞ্চলে ছিল রঘু ডাকাতের ডেরা। রঘু ডাকাতের হাতেই প্রতিষ্ঠা পান চিত্তেশ্বরী সর্বমঙ্গলা কালী। মন্দির চত্বরে লোকমুখে ইতিহাস শুনে জানা যায় রঘু ডাকাত রক্তবস্ত্র পরে মায়ের পুজো কখনই করতেন না। পট্টবস্ত্র পরিধান করে শাস্ত্রমতে পুজো করতেন। বাস্তবজীবনে তাঁর নাম ছিল রঘু বাবু। ডাকাতির পথ বেছে নেওয়ার পরেই তাঁর নাম হয়ে যায় রঘু ডাকাত। তিনি ছিলেন পরম বৈষ্ণব, কিন্তু কালীর পুজো করতেন শাক্ত মতে।

রঘু ডাকাতের পুজোয় প্রায়ই নরবলি দেওয়া হত, যা ভাবলে বুক কেঁপে ওঠে আজও। পুজো সেরে ডাকাতি করতে বেরোতেন দলবল নিয়ে। আবার গরিব-দুঃস্থদের অর্থ দিয়ে প্রায়ই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন এই রঘু ডাকাত। এই মন্দিরটি ছিল জঙ্গল অধ্যুষিত। ডাকাত সর্দার রঘুবাবুর মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেন রামশরণ সিমলাই নামে এক ব্রাহ্মণ। তিনি স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে কাশীপুর গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টারি রোডে নতুন করে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। কথিত আছে, সাধক রামপ্রসাদ কলকাতা থেকে হালিশহর নৌকাযোগে যেতে যেতে দেবীকে রামপ্রসাদী গান শুনিয়েছিলেন, ‘মা তারিণী শঙ্কর বৈরাগী।’

বর্তমানে কাশীপুরের খগেন চ্যাটার্জি রোডে এই রঘু ডাকাতের কালীর মন্দির আজও খুব জাগ্রত।

কাশীপুর আদি চিত্তেশ্বরী

এই দেবী কিন্তু কালী নন, দুর্গা। কিন্তু ডাকাতেরই দেবী। তাঁকে আরাধনা করা ডাকাতের নাম চিতু বা চিত্তেশ্বর রায়। চিত্তেশ্বর থেকেই মা চিত্তেশ্বরী। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে চিতু ডাকাত ষোড়শোপচারে দেবীর পুজো করতেন। আদি চিত্তেশ্বরী বলার কারণ হিসেবে শোনা যায়, প্রায় পাঁচশো বছর আগে এই দেবীর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। দেবীর নাম অনুসারেই জায়গাটির নাম পরে চিৎপুর হয়ে ওঠে। আবার কেউ বলে চিতু ডাকাতের এলাকা থেকে নাম চিৎপুর। চিত্তেশ্বরী দেবীর গায়ের রং হরিদ্রাভ। গঙ্গায় ভেসে আসা নিম কাঠ দিয়ে দেবী মূর্তি নির্মিত। দেবী সিংহবাহিনী। দেবীর বিগ্রহের সঙ্গে রয়েছে একটি বাঘের মূর্তি যা সুন্দরবনের দক্ষিণ রায়ের প্রতিভূ। 

কলকাতা, কাশীপুর, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা তখন জঙ্গলাকীর্ণ, বাঘের উপদ্রবও ছিল। তাই বাঘকে সন্তুষ্ট করতে ডাকাতরা চিত্তেশ্বরীর সঙ্গে বাঘকেও পুজো করতেন। আর এই মন্দিরেও নিয়মিত নরবলি হত। রেভারেন্ড লঙ সাহেব তাঁর কলকাতা বর্ণনায় লিখেছেন চিতু ডাকাতের চিত্তেশ্বরীর কাছে সর্বাধিক নরবলি দেওয়া হত। আজও দুর্গা পুজোর সময় দেবীর পূজা হয়। কিন্তু একসময় নরবলির কারণে এই দেবী কালী হিসাবেও অনেক ইতিহাসে বিখ্যাত আজও। এই দুর্গার সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশরা থাকেন না। উগ্রচণ্ডা দেবী রূপেই ডাকাতদের পূজিতা ইনি। তবে এখন ইনি সবার মা। আজও ভিড় হয় চিত্তেশ্বরীর আরতি দেখতে।

চিতু ডাকাতের মৃত্যুর পরে তৎকালীন জমিদার মনোহর ঘোষ ও নৃসিংহ ব্রহ্মচারী এই মন্দির পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন৷ হালি শহরের জমিদার সাবর্ণ রায়চৌধুরীর বংশধর কাশীশ্বর রায়চৌধুরী ও ইন্দ্রা রায়চৌধুরী বর্তমানে এই মন্দিরের সেবায়েত৷

আলিপুর চেতলা ডাকাতকালী (Dakat Kali)

Image - বাংলার ডাকাত কালী উপাখ্যান

দুর্গাপুর ব্রিজ পেরিয়ে চেতলা বাজার অঞ্চলের ভিতর চেতলা রোডের প্রতিষ্ঠিত মন্দিরে পূজিতা হন ডাকাতকালী। দেবীর হাত পা এত ভারী যে শিকল দিয়ে বাঁধা থাকে। দেবীর উচ্চতাও অনেক। অসুরমুণ্ডের উপর দেবী শিব-সহ আসীন। বর্তমানে দেবীর মন্দির বাঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে নবরূপে। দরিদ্র ভিখারী শিশুরা খেলে বেড়ায় এই উগ্রচণ্ডা মায়ের নাটমন্দিরে। নীলু ও ভুলু নামে দুই ডাকাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই ডাকাত কালীর ইতিহাস।

মতভেদে শোনা যায়, তারকেশ্বর যাওয়ার পথে মা সারদাকে নীলু ও ভুলু নামের দুই ডাকাত আক্রমণ করেন এবং মাকে ধরে নিয়ে গিয়ে তাঁদের আখড়ায় বেঁধে রাখেন। পরে দেখেন মা সারদার জায়গায় বসে স্বয়ং মা কালী। এরপর তাঁরা মা সারদাকে ছেড়ে দেয়। এই দেবীকে দেখলে গা ছমছম করে উঠবেই।

মনোহর ডাকাতের ছানা কালী

অভিজাত আধুনিক দক্ষিণ কলকাতার পূর্ণদাস রোডে অবস্থিত এই মনোহর ডাকাতের কালী মন্দির। যে রাস্তার আগে নাম ছিল এই ডাকাতের নামে মনোহরপুকুর রোড। মনোহর বাগদি ওরফে মনোহর ডাকাত ছিলেন দক্ষিণ কলকাতার ত্রাস।

তখন সবে সবে পলাশীর যুদ্ধ শেষ হয়েছে। এই কলকাতার অধিকাংশ অঞ্চলই ছিল গভীর জঙ্গল। মাঝ দিয়ে গেছে আদি গঙ্গার নদীপথ। বাঘ,সাপের ভয়ের সঙ্গে ছিল মনোহর ডাকাতের ভয়। কিছু দর্শনার্থী এই পথে কালীঘাট মন্দির যেতেন। রাতে ফিরতি পথে তাঁরা মনোহরের দলবলের কবলে পড়তেন। বিশেষত ধনী লোকেদেরই টাকা পয়সা লুঠ করত মনোহর।

মনোহর ছিলেন অকৃতদার। এক বয়স্ক পিসিসম মহিলার সঙ্গে থাকতেন এখানেই। সঙ্গে থাকত তাঁর দলবল। নরবলির জন্য মনোহর বেছে নিতেন সমাজের সেইসব ধনী লোকেদের, যারা গরিবদের শোষণ করতেন।
তখন এই মন্দির হয়নি। সবটাই জঙ্গল। বাইরে যে ছোট্ট লাল শিব মন্দির এখন, ওই স্থানেই একদা কষ্টি পাথরের মায়ের পুজো করতেন মনোহর। মনোহরের পূজিতা সেই মূর্তিই আজও মন্দিরে অধিষ্ঠাত্রী। মনোহর এই মূর্তি ডাকাতি করতে যাওয়ার সময়ে পাশে পাতকুয়োয় দড়ি বেঁধে ফেলে দিয়ে যেতেন।

এভাবেই একদিন আর মনোহরের তোলা হল না ঐ ছানা কালী মূর্তি। মারা গেলেন মনোহর ডাকাত। এরপর জনৈক কামাখ্যা চরণ মুখোপাধ্যায় স্বপ্নাদেশ পান ছানা কালীর। মা বলেন তিনি পাতকুয়োয় পড়ে আছেন, তাই নিত্য পুজো পান না। তাঁকে যেন প্রতিষ্ঠা করা হয়। কামাক্ষাচরণ পরিত্যক্ত কুয়োয় গিয়ে দেখেন সত্যি মাতৃমূর্তি। এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতাও কামাক্ষাচরণ। কিন্তু যেহেতু ছানা কালীর আসল সাধক ছিলেন মনোহর, তাই ডাকাতের নামেই মন্দিরের নামকরণ হয়।

Image - বাংলার ডাকাত কালী উপাখ্যান

ছানা কালী মানে মা কালী ছানা খেতে ভালবাসেন তা নয়। ছোট্ট কালী তাই তিনি ছানা কালী। ছানা কালী হলেও তাঁর ইতিহাসে জড়িয়ে দোর্দণ্ডপ্রতাপ মনোহর ডাকাতের নাম। আজও আধুনিক কলকাতার মাঝে অজস্র জবা গাছের জঙ্গলে ঘেরা এই ছানা কালী মন্দির। মন্দিরের পরিবেশ এত শান্ত যেন কান পাতলে শোনা যাবে মনোহর ডাকাতের হুঙ্কার।

রসা ডাকাতের রসাকালী

কুঁদঘাটের ম্যুর এভিনিউতে এই রসা কালীর আজও ঘটা করে পুজো হয়। রসা ডাকাতের নামে রসা কালী। রসা ডাকাত সাধক ছিলেন, তাই তাঁকে পাগল ছেলেও বলত অনেকে। রসা ডাকাতের ডেরা ছিল আদি গঙ্গার পারে। এখন এই ক্লাবের নাম রসা শক্তি সেবক সঙ্ঘ। রাস্তার নামও রসা রোড। ভীষণদর্শনা এই কালী দেখলে গায়ে কাঁটা দেয়। টালিগঞ্জের এই পুজো বারোয়ারি পুজো হয়ে গেছে আজকাল। খুব জাঁকজমক করে মন্ত্রী থেকে ফিল্মস্টার এনে পুজো উদ্বোধন হয়। রসা ডাকাতের এই বরাভয় শ্মশানকালী দেখলে মনে ভক্তিভাব আসবেই।

সিঙ্গুর ডাকাত কালী

সিঙ্গুরের পুরুষোত্তমপুরে অবস্থিত এই সাড়ে পাঁচশো বছরের প্রাচীন ডাকাত কালী। সরস্বতী নদীর তীরে মহারাজ সিংহবাহ্লর রাজধানী এই সিংহপুর আজ সিঙ্গুর। রাজনৈতিক কারণে আজকাল সিঙ্গুর বহুল প্রচারিত, কিন্তু বহু আগে থেকেই সিঙ্গুর বিখ্যাত এই ডাকাত কালীর জন্য।

ভীষণদর্শনা কালী অবস্থান করেন মন্দিরের গর্ভগৃহে। দক্ষিণমুখী আটচালা মন্দিরের গর্ভগৃহে ত্রি-খিলান বিশিষ্ট প্রবেশ পথ। গগন সর্দার নামে এক ডাকাত এই কালী প্রতিষ্ঠা করেন। এখানেও প্রতি অমাবস্যায় নরবলি হত। এই ডাকাত কালীর সঙ্গে মা সারদার মাহাত্ম্য জড়িয়ে।

মা সারদা একবার ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের অসুস্থতার খবর পেয়ে দক্ষিণেশ্বর যাচ্ছিলেন। সেই সময় গগন সর্দার মায়ের পথরোধ করেন। তখন মা সারদার পিছনে আবির্ভূতা হন দক্ষিণা কালী। তাই দেখে মা সারদাকে আপ্যায়ন করে রাত্রিবাসের ব্যবস্থা করে দেন গগন সর্দার। রাতে মা সারদার ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য মাকে দেওয়া হয় চালভাজা আর কড়াইভাজা। সেই থেকে আজও এই মা কালীর ভোগে চালভাজা আর কড়াইভাজা দেওয়া বাধ্যতামূলক রীতি।

মগরার ডাকাত কালী

হুগলির মগরার কাছে ভীষণাকৃতি ডাকাত কালীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাবু বিশ্বম্ভর ওরফে বিশে ডাকাতের নাম। অত্যাচারী জমিদারদের শায়েস্তা করতে বিশ্বম্ভর বাবু ডাকাতের দল তৈরী করে নিয়মিত ডাকাতি করতেন। তাঁর নাম বিশু থেকে হয়ে যায় বিশে ডাকাত লোকমুখে। ইনি সুলক্ষণযুক্ত ব্যক্তিকে বলি দিয়ে কালী পুজো করতেন। সুলক্ষণ ব্যক্তি মানে গ্রামের অত্যাচারী জমিদার বা মোক্তারকে নরবলি দিতেন মায়ের পায়ে বিশে ডাকাত। ভাবলেই বোঝা যায় এরা কতটা পাওয়ারম্যান ছিলেন। বিশে ডাকাতের কালী আরাধনায় মদ আর ছাগ মাংস আবশ্যিক ছিল। মায়ের ভোগের মাংস রান্না হত পেঁয়াজ রসুন ব্যতীত গোলমরিচ আর ঘি দিয়ে। গ্রামের সমস্ত মানুষকে পাত পেড়ে পাঠার মাংস খাওয়াতেন বিশ্বম্ভর বাবু ওরফে বিশে ডাকাত। আজও মগরায় এই দেবী প্রসিদ্ধ।

আসানসোলের অধম বাবার কালী

আসানসোলের জামুরিয়ার ৬০ নম্বর সড়কের ধারে অবস্থিত এই ডাকাত কালী। অধম বাবার আশ্রম বলে খ্যাত এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা অধম বাবা। একসময় বর্ধমান,বাঁকুড়া,দুর্গাপুর,বীরভূম,পুরুলিয়ার ১৪ বন্দুকবাজের দল নিয়ে ডাকাতি করতেন অধম বাবা। পঞ্চমুণ্ডি আসনে বসে কালী সাধনা করতেন। হঠাৎ মনের পরিবর্তন হওয়ায় ডাকাতি ছেড়ে কীর্তনে মন দেন। ইনি এখনও জীবিত। কয়েক বছর আগেও এই কালী মন্দিরে পুজো করতেন। কিন্তু এখন তিনি আর সেভাবে কথা বলেন না। সেসব ডাকাতির গল্প কেউ বললে তিনি শুধু হাসেন। দু বছর আগেও দেখা যেত এককালের দোর্দণ্ডপ্রতাপ ডাকাত অধম বাবাকে মন্দির চত্বরে।

কাঁচড়াপাড়ার ডাকাত কালী

কাঁচড়াপাড়ার ডাকাত কালীর সাথে জড়িয়ে মদন ডাকাতের ইতিহাস। ছশো বছরের পুরনো এই মন্দির কাঁচড়াপাড়ার বীজপুর থানা অঞ্চলে। এখানে কালী নিমগাছ রূপী। প্রাচীনকালে নিম গাছকে মা কালীর প্রতিভূ ভেবে পুজো করত ডাকাতরা। গাছটা আর নেই কিন্তু নিম গাছের গোড়াটা আছে, গোড়াকেই মা কালী রূপে আজও পুজো করা হয়। এই নিম মা খুব জাগ্রত।

কালীর সাথে শিব,হনুমান,কৃষ্ণ,রাধাও পূজিত হন। শ্যামা পুজো ছাড়াও রটন্তী কালী ও ফলহারিণী কালী পুজো এখানে বড় করে অনুষ্ঠিত হয়।

শান্তিপুর সাধনা কালী

শান্তিপুরের সবচেয়ে জাগ্রত এই ডাকাত কালী। কালহরা কৃষ্ণবর্ণের বিশাল উচ্চতা এলোকেশী মাতৃমূর্তি। রক্তমুণ্ড হাতে, রক্তমুখী জিহ্বা ও ঠোঁট, ভয়াল কালো মূর্তির পেশীবহুল নগ্ন পায়ে বিছে আঁকা এবং কালো আভূমি চুলে ঢাকা মাতৃমূর্তি। এই কালী এখানে সাধনা কালী নামেই বিখ্যাত যা একসময়ে ডাকাতরা পুজো করত। এত উঁচু প্রতিমা যে ভাড়া বেঁধে রঙ করতে হয়, গয়না পরাতে হয়। বিশাল শোভাযাত্রা সহকারে সাধনা কালীর বিসর্জন দেখার মতো।

শান্তিপুরের বোম্বেটে কালী

Image - বাংলার ডাকাত কালী উপাখ্যান

বোম্বেটে আদতে পর্তুগিজ শব্দ। মূল শব্দটি হল বোম্বারডেরি। মানে বোমবাজ। পরবর্তীকালে বোম্বেটে বলতে জলদস্যুদের বোঝাতো। নদিয়ার শান্তিপুরের একদল স্বাধীনতা সংগ্রামী যুবকদের ডাকা হত বোম্বেটে বলে । তাঁদের প্রতিষ্ঠিত কালীকে লোকে আজও বোম্বাটকালী বা বোম্বেটেকালী নামে ডাকে। শান্তিপুরের এটি প্রথম বারোয়ারি কালীপুজো।

শিমলাগড়ের ডাকাত কালী

হুগলি জেলার বিখ্যাত ডাকাত কালী শিমলাগড়ের জিটি রোডের ধারে৷ এই কালী আনুমানিক ৮০০ বছরের পুরনো৷ গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড নির্মাণের পূর্বে গভীর জঙ্গলে ঢাকা এই কালীকে ডাকাতরাই পুজো করতেন৷ নরবলিও দেওয়া হত এখানে৷ পরবর্তী সময়ে কালীসাধক দুর্গাদাস শিরোমণি এখানে মন্দির প্রতিষ্ঠা করে মায়ের নিত্যপুজো শুরু করেন৷ শ্বেতপাথরের বেদির উপর প্রায় পাঁচ ফুট উঁচু মায়ের বিগ্রহের মাথায় রয়েছে সোনার মুকুট৷ হাতে ও গলায় সোনার গয়না৷ গলায় রক্তজবার মালা৷ এক চূড়াবিশিষ্ট মন্দিরটির চূড়ার রংটি হলুদ হলেও শিমলাগড়ের কালীমন্দিরটি রক্ত জবার মতো লাল৷ কার্তিক মাসের কালীপুজোর দিনই মন্দিরের মূল উৎসব অনুষ্ঠিত হয়৷

ত্রিবেণীর বাসুদেবপুরের ডাকাত কালী- 

যে সাতটি গ্রাম নিয়ে সপ্তগ্রামের সৃষ্টি তার অন্যতম বাসুদেবপুর। ত্রিবেণী ঘাটের এক কিলোমিটারের মধ্যে দুটি প্রধান রাস্তার সংযোগস্থলের পাশে এক জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে রয়েছে এই ডাকাত কালীর মন্দির। বাসুদেবপুরের দুই কুখ্যাত ডাকাত রঘু ডাকাত ও বুধো ডাকাত। এই দুই ডাকাতের আরাধ্যা দক্ষিণা কালী মন্দিরটি গম্বুজাকার, এক চূড়াবিশিষ্ট, এবং সামনে বিশাল চাতাল। মন্দিরের পিছনে রয়েছে পুকুর যেখানে শোনা যায় ডাকাতরা স্নান সেরে শূচী বস্ত্রে কালীর পুজো দিতেন।

Image - বাংলার ডাকাত কালী উপাখ্যান

উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ডাকাতরা অবলুপ্ত হয়ে গেল, ডাকাত কালীরা গুণ্ডাদের কালী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেলেন। সেই সময় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা পাঁঠার ব্যবসায়ী গোপাল পাঁঠা, মধ্য কলকাতার চাকুর ঘায়ে ফুটিফাটা কৃষ্ণপদ ঘোষ ওরফে ফাটাকেষ্ট, রাসবিহারীর নীরদ চ্যাটার্জ্জী ওরফে চিনার কালী পুজো, ক্রিক রোর হাম্বার মোটরবাইক চালক ভানু বোস, বেহালা অজন্তার শঙ্কর পাইকের সাদা কালী পুজোর রমরমা শুরু হল। তাঁদের জমানাও শেষ কিন্তু তাঁদের পুজো গুলো আজও রয়ে গেছে এই কলকাতা সহ বাংলায়।

ভক্ত রামপ্রসাদকে যে রূপে দেখা দিয়েছিলেন স্বয়ং মা কালী

You might also like