Latest News

Child Rights: ১৪০০ নাবালিকা বিয়ে রুখেছেন, নারী পাচার, শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়ছেন ‘ভারত কি বেটি’

চৈতালী চক্রবর্তী

২০১২ সাল। ১৮ বছরের লক্ষ্মী সারগারার নাম তখন দেশের প্রতিটি সংবাদমাধ্যমে জ্বলজ্বল করছে (Child Rights)। দেশ বলে শুধু নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও তাঁকে নিয়ে চর্চা। রাজস্থানের লুনি গ্রামের এই তরুণী (Kriti Bharti) সমাজ-সংস্কার, প্রথাগত ধারণার ওপর দিয়ে

বুলডোজার চালিয়ে দিয়েছেন। তিনিই ভারতের প্রথম মহিলা (Women Empowerment) যিনি বাল্য বিয়ের (Child Marriage) বাধা কাটিয়ে মুক্ত জীবনে ফিরেছেন। রাজস্থানের প্রত্যন্ত গ্রামে এমন সাহস দেখানোর ক্ষমতা সে সময় অবধি অত্যন্ত কেউ করেননি। লক্ষ্মী সারগারা সেখানে বিদেশি খবরের কাগজগুলোতেও নাম তুলে ফেলেছেন।

এই লেখা যাঁকে নিয়ে তিনি লক্ষ্মী সারগারা নন, বরং লক্ষ্মীকে জীবনের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার সাহস যিনি দেখিয়েছিলেন সেই কৃতী ভারতীকে (Kriti Bharti) নিয়ে। লক্ষ্মীর সঙ্গে সেদিন তাঁকে চিনেছিল দেশবাসী। ডক্টর কৃতী ভারতীর নাম উঠেছিল লিমকা বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে। কে এই কৃতী ভারতী? সমাজব্যবস্থা, নিয়মকানুনকে বুড়োআঙুল দেখিয়ে এক যুবতী গর্জে উঠেছেন নাবালিকা বিয়ের (Child Marriage) বিরুদ্ধে। গাঁয়ের মোড়লদের চোখ রাঙানি তাঁকে থামাতে পারেনি। খাপ বসিয়ে, ধর্ষণের হুমকি দিয়েও লাভ হয়নি। একা একজন মহিলা পুরুষশাসিত প্রত্যন্ত গ্রামে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন।

Child Rights-Kriti Bhartiজন্মানোর আগেই বাবা ছেড়ে চলে যান, কিশোরীবেলায় বিষ খাওয়ান আত্মীয়েরা (Child Rights)

ডক্টর কৃতী ভারতীকে (Kriti Bharti) যোদ্ধা বললেও কম বলা হয়। এমন লড়াকু মহিলা হাতে গোনাই হয়। কৃতী যখন তাঁর মায়ের গর্ভে তখন বাবা ছেড়ে চলে যান, মেয়ে হয়ে জন্মেছিলেন বলে বিষ খাইয়ে খুন করার চেষ্টা করেন আত্মীয়েরা। কম বয়সে বিয়ে দেওয়া হয় আধবুড়ো লোকের সঙ্গে। শারীরিক, মানসিক নির্যাতন চরমে ওঠে। সেখান থেকে জীবনের মোড় নিজেই ঘুরিয়ে দেন কৃতী। স্বনির্ভর হন শুধুমাত্র নিজের সাহস আর জেদের জোরে। ভাগ্যের দোহাই দেননি কোনওদিন, বরং নিজের ভাগ্য লিখেছেন নিজের হাতেই।

আরও পড়ুন: সংযুক্তার ‘মর্দানি’, এই মহিলা আইপিএসের নামে থরথর করে কাঁপে জঙ্গিরা

Child Rights-Kriti Bhartiজন্মের সময় থেকই লড়াই শুরু হয় কৃতীর। মা ইন্দু চোপড়া একা মানুষ করেন কৃতীকে। যখন মায়ের গর্ভে, বাবা অন্য সাংসার পাতেন। গর্ভের ভ্রূণ নষ্ট করে দিতে বলেছিলেন, কিন্তু কৃতীর মা শোনেননি। কন্যা সন্তান জন্মানোর পরে শ্বশুরবাড়িতেও ঠাঁই হয়নি ইন্দুর। মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যান অন্য গ্রামে। সেখানেই বেড়ে উঠতে থাকে ছোট্ট কৃতী (Kriti Bharti)। বাবার পদবীই রাখে চোপড়া। অন্য গ্রামে এসেও আত্মীয়দের কুনজর থেকে রেহাই পাননি ইন্দু ও কৃতী দুজনেই। কৃতী তখন ক্লাস ফোরের ছাত্রী। আদর করে বাড়িতে ডেকে খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে খাইয়ে দেন এক আত্মীয়। মারাই যেত বাচ্চা মেয়েটা, তবে গ্রামের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তারবাবু বিষ বের করে সে যাত্রায় বাঁচিয়ে দেন। তবে স্বাভাবিক হতে পারেনি কিশোরী, বিষের জ্বালায় হাঁটাচলার ক্ষমতা হারিয়েছিল। সারা শরীর পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল।

Child Rights-Kriti Bharti

Child Rights-Kriti Bharti
জাতপাত-বর্ণ-বৈষম্য আবার কী? দেশের বেটি পদবীই বদলে ফেলেন

বছর দুয়েক লেগেছিল সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে। হাসপাতালের দরজায় দরজায় মেয়েকে নিয়ে ঘুরেছিলেন ইন্দু। পরে এক জাপানি চিকিৎসকের রেইকি থেরাপিতে সুস্থ হয়ে ওঠে কৃতী। স্কুলের পড়া শেষ করে কলেজ, তারপর সাইকোলজিতে পিএইচডি। রাজস্থানের প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হবে এমন ধারণাই করেননি কেউ। তার ওপর যে মেয়েকে সমাজে একঘরে করা হয়েছে। কৃতী পরে নানা সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, রাজস্থানের প্রতিটি গ্রামে ভয়ঙ্কর বর্ণ বৈষম্যের শিকার হতে হয় তাঁর মতো মেয়েদের। জাতপাতের সীমারেখা তো আছেই। ভিন জাতে সম্পর্ক তৈরি হলে সম্মানরক্ষার্থে নিজের ছেলেমেয়েকেই খুন করে ফেলেন বাবা-মা, আত্মীয়-পরিজনরা। তাই একটা সময় নিজের পদবীই বদলে ফেলেছিলেন কৃতী, চোপড়া নয় ভারতের বেটি কৃতী নিজের পদবী রাখেন ভারতী। শুরু হয় এক অন্য লড়াই।

মহিলাদের স্বনির্ভর করতে প্রচার চালাচ্ছেন ডক্টর কৃতী ভারতী

৯০০ নাবালিকা বিয়ে (Child Marriage) রুখেছেন, ১৪০০ কিশোরী মেয়ের হেনস্থা রুখেছেন ডক্টর কৃতী (Child Rights)

পুতুল খেলার বয়সেই বিয়ে হয়ে যায় বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোর। কখনও কিশোরী মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয় দ্বিগুণ বয়সী লোকের। রাজস্থানের গ্রামে গ্রামে কন্যা ভ্রূণ হত্যা চলে অবাধে। পরিবারে মেয়ে জন্মানো মানেই হয় তাকে খুন করো, না হলে কম বয়সে বিয়ে দিয়ে দাও। আর তা না হলে, নিজের পরিবারেই যৌন হেনস্থার শিকার হতে হয় কিশোরী মেয়েদের। এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললেন কৃতী। তাঁর প্রথম লড়াই লক্ষ্মী সারগারা মামলা।

Child bride: 'I made history by getting my marriage annulled' | Gulfnews – Gulf News
লক্ষ্মী সারগারা নিজের বিয়ে ভেঙে দেশ-বিদেশের খবরে আসেন, নেপথ্যে ছিলেন ডক্টর কৃতী ভারতী

লক্ষ্মীই প্রথম যিনি নিজের বিয়ে ভেঙে নতুন জীবন শুরু করেছিলেন। বয়স যখন এক তখনই লক্ষ্মীর বিয়ে হয়ে যায়, স্বামীর বয়স তিন বছর। ১৮ বছরের লক্ষ্মী শ্বশুরবাড়িতে ফিরে যাননি, পালিয়ে গিয়েছিলেন কৃতীর কাছে। তাঁকে উদ্ধার করে পড়াশোনা শিখিয়েছিলেন কৃতী। পরে বিয়েও দেন লক্ষ্মীর পছন্দের মানুষের সঙ্গে। এই ঘটনা নিয়ে তোলপাড় চলে দেশে। ডক্টর কৃতীকে খুনের হুমকি দেওয়া হয়। ধর্ষণের ভয় দেখায় গ্রামের মাথারা। তবে কোনওকিছুতেই রোখা যায়নি তাঁকে।

Child Rights-Kriti Bhartiধর্ষিতা, যৌন হেনস্থার শিকার মেয়েদের মানসিক চিকিৎসা করে কৃতীর ‘সারথি’

২০১১ সালে ‘সারথি ট্রাস্ট’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তৈরি করেন কৃতী। নারী নির্যাতন, বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে এই সংগঠন। ১৪০০ র বেশি বাচ্চা ছেলেমেয়ের বিয়ে আটকেছেন কৃতী। যৌন হেনস্থা তেকে বাঁচিয়েছেন অসংখ্য মহিলা ও শিশুকে। নিজের রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারও আছে ডক্টর কৃতীর। যৌন নির্যাতনের শিকার এমন শিশু ও মহিলাদের মানসিক চিকিৎসাও করেন তিনি। শিশু শ্রমিক, এইচআইভিতে আক্রান্ত মেয়েরা যাদের সমাজ একঘরে করে দেয়, তাদের ঠাঁই হয় কৃতীর সেন্টারে।

Child Rights-Kriti Bhartiকৃতী একটি ঘটনার কথা বলেছেন যেখানে শান্তা দেবী নামে একটি মেয়ে ছেলেবেলা থেকেই যৌন নির্যাতনের শিকার ছিল। ১১ মাস বয়সে তাকে বিয়ে দেওয়া হয়। শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার আগে অবধি নিজের পরিবারেই চরম যৌন নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছিল তাকে। ১৮ বছর বয়সে স্বামীর ঘর করতে গিয়ে সেখানেও শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সইতে হয়। কৃতী বলছেন, শান্তাকে যখন তিনি উদ্ধার করে রিহ্যাবে নিয়ে আসেন তখন তাঁর মানসিক অবস্থা বিপর্যস্ত। শৈশব থেকে যৌন নির্যাতন সহ্য করতে করতে এক ভয়ঙ্কর ট্রমায় চলে গিয়েছিল মেয়েটা। সেখান থেকে তাঁকে জীবনের মূলস্রোতে ফিরিয়ে স্বনির্ভর করে তোলেন কৃতী। আজ অবধি সাত হাজারের বেশি মেয়েকে উদ্ধার করে স্বনির্ভর করেছে কৃতীর ‘সারথি ট্রাস্ট’।

Child Rights-Kriti Bharti
দেশের সেরা ড্রামাটিক রিয়েল হিরো অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন ডক্টর কৃতী

এমন সাহস, এমন সাফল্যের গল্পই যদি মেয়েদের গল্প হত, কী ভালই না হত। কিন্তু দিনের শেষে হাসি আটকে যায় ঠোঁটের কোনায়। কৃতী বলেছেন এ লড়াই চলছে চলবে। এক মুহূর্তও বসে থাকার সময় নেই তাঁর।

You might also like