Latest News

যশোরের সুখ, সম্বৃদ্ধি ও আশা ভরসার প্রতীক মা যশোরেশ্বরী কালী

মা যশোরেশ্বরী কালীর মন্দির, ৫১ পীঠের অন্যতম ও জাগ্রত এক শক্তিপীঠও।

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ডেস্ক: বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামে বিরাজ করছেন মা যশোরেশ্বরী কালী! একদা বৃহত্তর যশোর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল যশোরেশ্বরী কালী মায়ের মন্দির। যে মন্দিরটি, ৫১ পীঠের অন্যতম ও জাগ্রত এক শক্তিপীঠও। তন্ত্রচূড়ামণি গ্রন্থে এই মন্দির সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘যশোরে পানিপদ্ম দেবতা যশোরেশ্বরী, চণ্ডশ্চ ভৈরব যত্র তত্র সিদ্ধ ন সংশয়।’ অর্থাৎ এখানে সতীর হাতের তালু পতিত হয়েছিল এবং পিঠের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর নাম যশোরেশ্বরী। তাঁর ভৈরবের নাম ‘চণ্ড’।

মা যশোরেশ্বরীর মন্দির

মন্দিরের গর্ভগৃহের বেদীতে বিরাজ করছেন মা যশোরেশ্বরী। মখমলের আবরণে ঢাকা পুরো শরীর। জাগ্রতা দেবীর কেবল মুখমণ্ডল দৃষ্টিগোচর হয়। শরীরের কোনও অংশই দেখা যায় না। সচরাচর দেবী কালিকার যে মূর্তি দেখে আমরা অভ্যস্ত, একেবারেই সেরকম দেখতে নন মা যশোরেশ্বরী। মা এখানে ভীষণদর্শনা। রক্তাভ জিহবাটি আকৃতিতে বেশ বড়। মা যশোরেশ্বরীর নাকে বাম পাটায় পরানো আছে বড় নথ। মায়ের গলায় শোভা পায় রক্তজবার মালা ও সোনার হার। মাথায় মুকূট। মায়ের মাথার ওপর টাঙানো থাকে রক্তলাল চাঁদোয়া।

মা যশোরেশ্বরী

প্রত্যেকদিন হাজার হাজার মানুষ মা যশোরেশ্বরীর দরবারে আসেন মানত করতে। তাঁরা মায়ের পায়ে তাঁদের অর্ঘ্য নিবেদন করেন। অত্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে ও তন্ত্রমতে মা যশোরেশ্বরীর নিত্যপূজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবছর কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে মা যশোরেশ্বরী কালীর মন্দিরে সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয় শ্রী শ্রী শ্যামা মায়ের আরাধনা।

বলিদানের প্রথা আছে এই মন্দিরে। দেবীকে তুষ্ট করার জন্য শ্যামাপূজার সময় ছাগবলি দেওয়া হয়। শ্যামাপূজার সময় মন্দির প্রাঙ্গণে মেলা বসে। তিন দিন ধরে চলা সেই মেলায় দূরদূরান্ত থেকে আসেন প্রায় লক্ষাধিক মানুষ। যাঁরা মা যশোরেশ্বরীর কাছে মানত করেন, তাঁদের মনোকামনা পূরণ হলে, মন্দিরের দালান থেকে তাঁরা নীল আকাশে উড়িয়ে দেন দুটি দুধ সাদা পায়রা।

শোনা যায় মা যশোরেশ্বরীর মন্দিরটি নির্মান করেছিলেন এক ব্রাহ্মণ। তাঁর নাম ছিল আনারি। পদবী জানা যায় না। পরবর্তীকালে মধ্যযুগীয় বাংলার সেন রাজবংশের চতুর্থ রাজা লক্ষ্মণ সেন মন্দিরটির সংস্কার করেছিলেন। মন্দিরটি সংস্কার করেছিলেন যশোরের প্রবলপ্রতাপশালী রাজা প্রতাপাদিত্য। যিনি একজন সামন্ত রাজা থেকে স্বাধীন যশোর রাজ্যের মহারাজা হয়েছিলেন। রাজত্ব করেছিলেন প্রায় ২৫ বছর।

মূলমন্দিরটির সঙ্গে একসময় নাটমন্দির ও নহবতখানা ছিল। মন্দিরটিকে ঘিরে ছিল সুবিশাল প্রাচীর। আজ সেগুলি কালের ছোঁয়ায় ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিলুপ্তির পথে। নাটমন্দিরের স্তম্ভগুলির ধ্বংসাবশেষ জানান দেয় মন্দিরের গৌরবময় ইতিহাস। যে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে মন্দিরের প্রবেশদ্বারের পাশে থাকা শত শত বছর পুরনো এক বটগাছ।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী যাওয়ার আগে এই অবস্থাতেই ছিল মন্দিরটি।

মন্দিরটি তার প্রাচীন গরিমা হারালেও এক কণাও কমেনি মা যশোরেশ্বরীর মহিমা। বরং তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। মা যশোরেশ্বরীর মহিমার কথা পঞ্চমুখে বলেন স্থানীয় মুসলিমেরাও। অতীতে তাঁর মহিমার কথা যশোর থেকে পৌঁছে গিয়েছিল দিল্লির মসনদ পর্যন্ত। দিল্লির মসনদে বসার পর সম্রাট আকবর তাঁর পুত্র জাহাঙ্গীরকে পাঠিয়েছিলেন বঙ্গবিজয়ের উদ্দেশ্যে।

বাংলার মাটিতে মুঘল বাহিনীর সামনে পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বারো ভুঁইয়ার অন্যতম প্রতাপশালী জমিদার ও যশোরের মহারাজা প্রতাপাদিত্য। মা যশোরেশ্বরী কালীর আশীর্বাদ নিয়ে মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামা প্রতাপাদিত্যের সেনার হাতে পরাজিত হয়েছিল মুঘলবাহিনী। দিল্লি ফিরে গিয়েছিলেন হতোদ্যম জাহাঙ্গীর।

সম্রাট আকবরকে জাহাঙ্গীর বলেছিলেন, মা যশোরেশ্বরী কালীর আশীর্বাদেই মহারাজা প্রতাপাদিত্যের এত প্রতাপ। তাই প্রতাপাদিত্যকে হারিয়ে বাংলা জয় করা দুষ্কর হয়ে উঠেছে। মহারাজা প্রতাপাদিত্যকে শায়েস্তা করতে সম্রাট আকবর তখন বাংলায় পাঠিয়েছিলেন তাঁর সেনাপতি রানা মানসিংহকে।

কিন্তু অম্বররাজ মানসিংহও বেশ কয়েকটি যুদ্ধে হেরে গিয়েছিলেন মহারাজা প্রতাপদিত্যের কাছে। অবিশ্বাস্যভাবে যুদ্ধে হারার পর মানসিংহ বুঝলেন, ঠিকই বলেছিলেন জাহাঙ্গীর। মহারাজা প্রতাপাদিত্যের সকল শক্তির কেন্দ্র হলেন যশোরের যশোরেশ্বরী কালী মা। মহারাজা প্রতাপাদিত্যের শক্তিকে খর্ব করার জন্য যশোরেশ্বরী কালী মায়ের এক পুরোহিতকে অর্থ দিয়ে বশ করেছিলেন মানসিংহ। তারপর সেই পুরোহিতের সাহায্যে যশোরের থেকে মা যশোরেশ্বরীর বিগ্রহটি চুরি করে নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছিলেন।

আরাধ্যা দেবী মা যশোরেশ্বরী কালীর বিগ্রহটি চুরি যাওয়ায় শোকে মহারাজা প্রতাপাদিত্য সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছিলেন। মূর্তি চুরির পুরো দায় চাপিয়ে দিয়েছিলেন মন্দিরের প্রধান সেবায়েত রামানন্দগিরির ওপর। যশোরেশ্বরী কালীর প্রধান সেবায়েত রামানন্দগিরিকে অপমান করে মন্দির থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। অথচ নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ ও কালীমায়ের পরম ভক্ত রামানন্দগিরি ছিলেন নিরপরাধ।

অপমানিত রামানন্দগিরি সত্যি সত্যিই উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন। কিছুদিন পর রানা মানসিংহ হীনবল প্রতাপাদিত্যকে হেলায় হারিয়ে দখল করেছিলেন বাংলা। যশোরের মন্দির থেকে চুরি করা মা যশোরেশ্বরী কালীর বিগ্রহটি রাজস্থানের অম্বর দুর্গে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আজও সেই দুর্গেই বিরাজ করছেন মা যশোরেশ্বরী কালীর প্রাচীন বিগ্রহটি।

বঙ্গবিজয়ের কিছুদিনের মধ্যেই অম্বররাজ মানসিংহ স্বপ্নে দেখেছিলেন মা যশোরেশ্বরী কালীকে। রুষ্ট কণ্ঠে মা কালী মানসিংহকে বলেছিলেন, মানসিংহের জন্যই তাঁর পরমভক্ত রামানন্দগিরি বিনা দোষে উন্মাদ হয়ে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মানসিংহ যেন নিজে গিয়ে রামানন্দগিরিকে জঙ্গল থেকে উদ্ধার করেন এবং উদ্ধার করার পর সূক্ষ্মাবতী নদীর তীরে মা কালীর নতুন একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরের মায়ের সেবার পূর্ণ দায়িত্ব যেন রামানন্দগিরিকে দেওয়া হয়। এর অন্যথা হলে সমূহ বিপদে পড়তে হবে রানা মানসিংহকে।

মা যশোরেশ্বরী কালীর সেই ভীষণা রূপ দর্শন করার পর মানসিংহ দেরি না করে চলে এসেছিলেন বাংলায়। যমুনার শাখা সূক্ষ্মাবতী নদীর তীরে থাকা জঙ্গল থেকে উদ্ধার করেছিলেন রামানন্দগিরিকে। মায়ের আদেশ মেনে সূক্ষ্মাবতী নদীর তীরের জঙ্গলের মধ্যেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মা করুণাময়ী কালীর বিগ্রহ। রানা মানসিংহ প্রতিষ্ঠিত সেই মন্দিরের নামই আজ ‘আমডাঙা করুণাময়ী মঠ’। পরবর্তীকালে যশোরের মূলমন্দিরে আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা করা হয়েছিল মা যশোরেশ্বরী কালীর বিগ্রহ। যশোরের বুকে ফিরে এসেছিলেন যশোরের সুখ, সম্বৃদ্ধি ও আশা ভরসার প্রতীক মা যশোরেশ্বরী কালী।

You might also like