Latest News

পুষ্পরেণু আঘ্রাণে যখন, না হয় দাঁড়ালে কিছুক্ষণ

অংশুমান কর

Image - পুষ্পরেণু আঘ্রাণে যখন, না হয় দাঁড়ালে কিছুক্ষণ

শক্তি চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন এত কবি কেন, আবার বিনয় মজুমদার লিখেছিলেন যে, অনেক কষ্টে কবিদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা গেছে। কবিদের সংখ্যা বেশি নাকি কম হলে ভালো— এ নিয়ে তর্ক চলেছে, বোধহয় সেই অনাদিকাল থেকেই। কিন্তু তর্কের বাইরের পৃথিবীটি বলে যে, কবিদের সংখ্যা একটি দেশের জনসংখ্যার তুলনায় চিরকালই নগণ্য, কিন্তু সেই সংখ্যা কোনও সময়েই খুব একটা কমে গেছে বলেও তো মনে হয় না। তাহলে, এই যে এত এত মানুষ কবিতা লেখেন বা কবিতা লেখার চেষ্টা করেন, সেই চেষ্টাকে কীভাবে দেখব? এক সময় আমি নিজে এমনটা ভাবতাম যে, এত মানুষ কবিতা লেখার চেষ্টা না-করলেই বোধহয় ভালো। এখন জানি যে, এ নিয়ে তেমন মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। কেননা, শখে অনেকেই কবিতা লেখেন। কিন্তু তাঁরা বেশিদিন কবিতা লেখার চেষ্টা করে যেতে পারেন না। আর যাঁরা সারাজীবন কবিতা লিখেই যান, কিন্তু পান না তেমন কোনও স্বীকৃতি, তাঁরা যেমনই কবিতা লিখুন না কেন, কবিতার কাছে তাঁদের এই আত্মসমর্পণকে আজ আমি শ্রদ্ধা করি। এঁদের মধ্যে অনেকেই কবিতায় দারুণ ভাঙচুর কিছু করেন না। বাংলা কবিতার ইতিহাসে একটি প্যারাগ্রাফও (কলকাতা-কেন্দ্রিক) সমালোচকেরা এঁদের জন্য বরাদ্দ করবেন কি না জানি না। কিন্তু এইসব প্রশ্ন নিয়ে কণামাত্র ভাবিত না-হয়ে আজীবন নিষ্ঠার সঙ্গে এঁরা কবিতা-লেখার চর্চা করে যান। এঁদের সারস্বত চর্চায় কোনো ফাঁকি থাকে না। সলিল ভট্টাচার্যর “নির্বাচিত কবিতা” বইটি পড়তে পড়তে এইসব কথাই মনে হচ্ছিল। (Book Review)

সলিল ভট্টাচার্য ছিলেন অধ্যাপক। দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন বর্ধমানের বিবেকানন্দ মহাবিদ্যালয়ে। অবশ্য এটি তাঁর বহুবিধ পরিচিতির একটি মাত্র। তাঁর প্রয়াণের কিছুদিন আগে প্রকাশিত ‘নির্বাচিত কবিতা’র পরিচিতি অংশটিতে যেমন লেখা আছে, “ষাটের দশকে বামপন্থী ছাত্র-যুব আন্দোলনের অগ্রণী যোদ্ধা হিসাবে তাঁর আত্মপ্রকাশ”। ১৯৬৫-৬৬ সালে রাজবন্দি হিসাবে প্রেসিডেন্সি জেলে কেটেছিল তাঁর জীবনের মূল্যবান কয়েকটি দিন। ছিলেন অসামান্য বাগ্মী। স্মৃতি ছিল ঈর্ষনীয়। এ-হেন মানুষটি কবিতা চর্চাকে কিন্তু কোনওদিনই হালকাভাবে নেননি। স্বীকৃতির পরোয়া না-করেই নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন কবিতায়। অবশ্য, স্বীকৃতি একেবারেই মেলেনি একথা বলা ঠিক হবে না। ‘গণশক্তি’, ‘নন্দন’, ‘নতুন চিঠি’ ইত্যাদি পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছিল তাঁর বেশ কিছু কবিতা। পত্রিকাগুলির নাম থেকেই বোঝা যায় যে, একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কবিতাচর্চায় নিজেকে নিবেদন করেছিলেন সলিল ভট্টাচার্য। তবে যদি এমনটি মনে করা হয় যে, তিনি কবিতায় কেবলই লাল নিশান উড়িয়ে চলে গিয়েছেন, তাহলে মস্ত বড়ো ভুল হবে। (Book Review)

এগারোটি কাব্যগ্রন্থের জনক ছিলেন সলিল ভট্টাচার্য। ‘নির্বাচিত কবিতা’য় এই কাব্যগ্রন্থগুলি থেকে বাছাই করা কবিতা যেমন আছে, তেমনই আছে কিছু অপ্রকাশিত ও অগ্রন্থিত কবিতাও। তাঁর রাজনৈতিক কবিতার অনেকগুলিই ছড়ার চালে চলে। এবং এই চালটিতে তাঁর সিদ্ধি প্রশ্নাতীত। শাণিত তরবারির মতো এই ধরনের ছড়াগুলির ধার বিদ্রুপের পরিমিত ব্যবহারে। যেমন, ‘মই’ কবিতাটিতে তিনি লিখেছেন, “শুধু একটা মই/ যদি মেলে চলনসই/ তারপরেতে হিসেব নিকেশ সোজা/ আমি হব পথের কাঙাল/ তুমি রাজার রাজা”। ক্ষমতাবান ও ক্ষমতাহীনের চিরকালের বাইনারিতে এই কবিতাকে স্থিত করে কবি নিজেকে রাখছেন ক্ষমতাহীনের দলেই। এই কবিতারই শুরুতে তিনি লিখেছেন, “শুধু একটা মই/ইচ্ছে হলে উঠতে পারো/যেমন খুশি ধরতে পারো/মগডাল বা বিলের তাজা কই”। বিশেষ বিশেষ কিছু মানুষের সঙ্গে সংযোগ যে আমাদের সমাজে কারও কারও দ্রুত উত্থানের কারণ তা এই কবিতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। কিন্তু অবাক হতে হয় যখন তিনি লেখেন যে, মই ব্যবহার করে ধরা যেতে পারে ‘বিলের তাজা কই’। মই তো মগডালে ওঠার জন্য ব্যবহৃত হয়। তাজা কই ধরার কাজে মইয়ের কোনও উপকারিতা আছে কি? বোঝা যায় যে, কেবল মিলের প্রয়োজনেই নয়, হাতে চলে এলে মই যে-কাজে ব্যবহারের কথা নয়, সেই কাজ সম্পন্ন করতেও যে ব্যবহৃত হয়, সেই কথাটিই ইঙ্গিতে বলতে চেয়েছেন কবি।  তিনি নিজে যে এই ‘মই’ ব্যবহারকারীদের মধ্যে পড়েন না, সেই কথাটি অবশ্য বেশ স্পষ্ট করেই এই গ্রন্থেরই অন্য কিছু কবিতায় বলে দিয়েছেন কবি। যেমন, ‘সূর্যসেনা’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, “এ বয়সে আর আসে না তো হরবোলা/ মোহ ভয় ভুলে দরজাটা রেখো খোলা”। এ রাজ্যে ২০১১ সালে পরে ক্ষমতার পরিবর্তন হওয়ার পরে এই কবিতা লেখা। ক্ষমতার তখ্‌ত থেকে অপসারিত হওয়ার পরে পাড়ায় পাড়ায় মোড়ে মোড়ে তথাকথিত বামপন্থী অনেক ‘দাদা’ এবং ‘তাত্ত্বিক’রাই হতভম্ব হয়ে গিয়ে কোন সুরে কথা বলবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না; একবার এঁর ডাক, একবার ওঁর ডাক নকল করছিলেন। মতাদর্শে বিশ্বাসহীনতা থেকেই জন্ম হয়েছিল এই হরবোলাদের। ‘সূর্যসেনা’ কবিতায় সলিল ভট্টাচার্য স্পষ্ট করছেন যে, তিনি এই হরবোলাদের দলে পড়েন না; তিনি পৃথক, আলাদা। তিনি জানেন যে, “মরা কুঞ্জেতে ফুল নেই কোনোখানে/ ঈশাণের মেঘ জমেছে ঝড়ের গানে”; কিন্তু তাও তিনি ভীত নন। কর্তা বা মই— কোনোটারই তাঁর প্রয়োজন নেই। পলায়নী মনোবৃত্তিকেও তিনি ঘৃণা করেন। তাই মানুষের উপমার খোঁজে সাগরে বা অরণ্যে যেতে চান না তিনি। ঈষৎ বেদনা থেকেই বরং লেখেন, “মানুষকে বাদ রেখে সাগর পাহাড় করো তোলপাড়/ হাজার অরণ্য খুঁজে মানুষের উপমা উদ্ধার।” (Book Review)

Image - পুষ্পরেণু আঘ্রাণে যখন, না হয় দাঁড়ালে কিছুক্ষণ

লেখাটির এ পর্যন্ত পড়ে যদি কেউ মনে করেন যে, সলিল ভট্টাচার্য আজীবন একই ধরনের কবিতা লিখে গেছেন; গেয়েছেন জাগরণের গান, থেকেছেন মানুষের মাঝে, প্রকৃতি-বিমুখ, তাহলেও ভুল ভাবা হবে। সমাজের মতোই প্রকৃতি-লগ্ন তাঁর কবিতা। তাঁর কবিতায় বারেবারে ফিরে ফিরে এসেছে সমুদ্রর চিত্রকল্প। যেমন, ‘দীঘার আঁধারে’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, “আমরা ক’জনা যুবক অথবা বৃদ্ধ,/ কালের বিচারে স্থূল বা সূক্ষ্ম রুচি/ ঢেউ ভেঙে ভেঙে সাগর হয়েছে ক্রুদ্ধ/ কুড়োতেই থাকি শুক্তি ঝিনুক-কুচি/ হঠাৎ কেন যে পায়ের চিহ্ন আঁকি,/ বুঝিনি তখন, এখনো কি আমি বুঝি?” প্রকৃতির ছবি আঁকতেই আঁকতেই এভাবেই তিনি একাধিক কবিতায় মানুষের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা-করা বিপন্নতাকে স্পর্শ করে যান। বোঝা যায় যে, তাঁর কবিসত্তা কেবল বাহিরকেই অবলোকন করে না, অন্দরেও দৃষ্টিপাত করে। ‘কাছে এসো’ নামে একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন, “বন্ধু তুমি তো গাছের মতো/চুপ করে আছো বৃষ্টিতে রোদ্দুরে/কথা বলে যাই তুমি কথা বলো না তো”। পড়ে থমকে যেতে হয়। মনে হয়, ঠিকই তো। একজন প্রকৃত বন্ধু তো গাছেরই মতো। সে বলে কম, শোনে বেশি। বন্ধুর আনন্দ-বেদনা গ্রহণ করে শান্ত চিত্তে। দেয় শুশ্রূষাও।

প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত ‘কবিতা ও আমি’ শীর্ষক একটি লেখার সূচনা ঘটিয়েছিলেন এইভাবে, “ইয়েটসের বাবা ইয়েটসকে জানিয়েছিলেন, কবিতা হচ্ছে, ‘The social act of a solitary person’। আমিও তাইই-ই বিশ্বাস করি”। যদিও প্রণবেন্দুর কবিতা ভাবনা ও ভুবনের সঙ্গে সলিল ভট্টাচার্যর কবিতাজগতটির দূরত্ব বিস্তর (প্রণবেন্দু থাকতেন সক্রিয় রাজনীতির থেকে শতহস্ত দূরে), তবুও সলিল ভট্টাচার্যর একটি কবিতা পড়তে পড়তে প্রণবেন্দুর এই লেখাটির কথাই মনে পড়ল। একাকী মানুষ ঘোষিতভাবে সামাজিক কর্মে লীন হয়ে গেলে মাঝে মাঝে যে-সংকট তাঁকে গ্রাস করে, সেই সংকটের কথাই সলিল ভট্টাচার্য লিখেছেন ‘অন্তহীন বাতাসের কাছে’ কবিতাটিতে, “তারপর ফিরে যেতে যেতে/ উদ্দাম বাতাস লেগে অনেক ধুলোবালির সঙ্গে/ কিছু পুষ্পরেণু যখনই আঘ্রাণে নিলে,/ তখন আর একবার/ থমকে দাঁড়াতে ইচ্ছে হলো”। সামাজিক কর্মে নিবেদিত-প্রাণ একাকী মানুষকে প্রকৃতির মাঝে এসেও প্রকৃতিকে ভুলে এক সময় ফিরে যেতে হয় মানুষের মূর্তির পুজো করতে। এই ফিরে যাওয়া অনিবার্য, কিন্তু এই ফিরে যাওয়ার কালে আরও অনিবার্য বোধহয় একাকী মানুষের দু-দণ্ড থমকে দাঁড়ানো। এই থমকে দাঁড়ানো মুহূর্তটিকেই, এই দ্বিধা এবং সংশয়কেই এই কবিতায় ধরে রেখেছেন সলিল ভট্টাচার্য।

কবি হিসেবে সলিল ভট্টাচার্যকে তাহলে কীভাবে দেখব আমরা? বিপুল ভাঙচুর তাঁর কবিতায় নেই। নেই পাঠকের চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার মতো অগুণতি পঙ্‌ক্তিও। বাংলা কবিতার ইতিহাসে তাঁর জায়গা হবে নাকি হবে না, সেই কূট প্রশ্ন নিয়ে কালক্ষয়েরও কারণ দেখি না। সলিল ভট্টাচার্যের মতো কবিদের গুরুত্ব অন্য জায়গায়। ‘কবিতা ও আমি’ প্রবন্ধটিতেই প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত লিখেছিলেন, “কবিতা-লেখক হিসেবে আমি মনে করি যে, আমার কবিতা যদি মুষ্টিমেয় কয়েকজন পাঠকেরও চেতনার উন্মীলন বা উদ্বোধন ঘটাতে সক্ষম হয়, তাহলেই আমার ‘সামাজিক কাজ’ বা সামাজিক দায়িত্ব বহুলাংশে সম্পূর্ণ হল”। প্রণবেন্দু তাঁর মতো করে এ-কাজ করেন। সলিল ভট্টাচার্যর মতো কবিরা একই কাজ (হয়তো বা প্রণবেন্দু-সম নৈপুণ্য ব্যতীতই) করেন তাঁদের মতো করে। কবির সামাজিক ভূমিকাটি অক্ষয় করে রাখাতেই তাঁর মতো কবির গুরুত্ব।

You might also like