Latest News

আজ স্নানের দিন

 অদিতি বসুরায়        

(৪)

 বিশ্বাসের জোর– বড় সহজ ব্যাপার নয়। এরপর অনেকরকম কষ্ট গেছে আমার। মনে মনে শুধু গৌরের কথা ভেবেছি। কিন্তু ওর মতো মনের জোর কোথায় পাব! তবু ভরসা আসে ওরকম মানুষের কথা ভাবলে। মনই তো সব। মনের বাঘেই মানুষকে খায়। বনের বাঘের চেয়ে সে অনেক বেশি হিংস্র। এক মিনিট সে তিষ্ঠোতে দেয় না কাউকে।  আমি আজীবন তার থাবা থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে চেয়েছি। পারিনি। তাই জানি, ওই বাঘের নখে ধারের তীব্রতা কীরকম। ছোটবেলা থেকেই আমার খুব রাগ। সবার বাবা-মা থাকে, আমার ছিল না। ছিল না নিজস্ব ঘর। কিছুই ছিল না, যা সবার থাকে! কিন্তু প্রকাশ ছিল না এতদিন। এখন প্রায়ই হিতাহিত হারিয়ে ফেলি রেগে গেলে। বয়েস হচ্ছে বলে বোধহয় এতকালের সযত্নে রাখা আত্ম-নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমে আসছে! নিজেকে আর আটকে রেখে কী হবে! বাঘটা আমাকে পেড়ে ফেলেছে ইদানীং। (bengali novel)

এই বাড়ির সামনে একটা বড় পুকুর। বাকি বসতবাটি সব একটু দূরেই। ফলে পড়শিদের উঁকিঝুঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই। বাড়ির সামনের দিকে লম্বা বারান্দা। বারান্দার লাল মেঝেটা ভারি ঠান্ডা। এমনিতে লাল রং আমার দুচক্ষের বিষ। কিন্তু এটা একটা মেটে লাল রং। দেখলে আরাম হয় চোখের। সামনে কোমর সমান রেলিং। গ্রিলের। এই বাড়িটার সামনে একসারি কদমগাছ আছে। বর্ষায় ফুলে ফুলে ছেয়ে যায়। শুনেছি কদম গাছ নাকি দূষণ কমাতে সাহায্য করে। হবেও বা!

 রাজের সঙ্গে যখন বাড়ি দেখতে বেরতাম, গাছ খুঁজতাম। আর একটু ঠান্ডা পরিবেশ। এই বাড়িটা কেনার প্রধান কারণই, এই কদমগাছের উপস্থিতি। রাজদের আগের বাড়িটা ভালো ছিল, তবে সে শহর থেকে আরও অনেক ভেতরে। ভাড়ার বাড়িতে কতদিনই বা থাকা চলে? রাজের খুব অসুবিধা হত ও-বাড়ি থেকে কলেজে আসা-যাওয়া করতে। ওর বাবা যে জমিটা কিনেছিলেন, সে নিয়ে তো গোলমাল আর মিটলই না! তবে সে জমি তো আর বসত-বাড়ির জন্যে কেনা হয়নি। আদর্শবাদী মানুষ ছিলেন আমার শ্বশুরমশাই। অনাথ বাচ্চাদের একটা মাথা গোঁজার জায়গা করে দেওয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর। আজও সে স্বপ্ন সাকার করা গেল না। পার্টি-ক্লাব ইত্যাদির চক্করে। এ দেশে মানুষের জন্য কাজ করার জ্বালাও কম নয়। পদে পদে বিপত্তি। সেই জমি এখনও পড়ে আছে। মানুষটা চলে গেছেন।

 এখন সদ্য সকাল হয়েছে। আমি  ছোট থেকেই ভোরে উঠতে ভালবাসি। সূর্য ওঠার পরপরই নলেন গুড়ের মতো এক ধরনের আলো-আঁধারি ছেয়ে থাকে দিনের গায়ে। মন ঠিক থাকলে, খুব ভোরে রণো রেওয়াজে বসে। ডাকতে হয় না। আধ-ঘুমন্ত, চুপচাপ পাড়ায় সুরের আজান বয়ে যায়। আমি রান্নাঘরে গিয়ে গ্যাস জ্বালি। চায়ের পাতা গরম জলে ফেলে প্লেট চাপা দিয়ে বার্নার অফ করে দি। মিনিট তিনেক অপেক্ষা করি। এই চা বানাতে বানাতেই দেখতে পাই, সমস্ত দিনটা কীভাবে নেমে আসছে মণিপুরের মাথায়। আর একটু ভালো করে ভোর দেখব বলে, বারান্দায় দাঁড়াই চায়ের কাপ হাতে। দুধের ক্যান ঝুলিয়ে দুধওয়ালা সাইকেলে করে যায়। ফুল তুলে ফেরার পথ ধরেন পাড়ার মাসিমারা। শ্যামল আসবে। সেলফ মেড ম্যান। ওকে দেখছি বহুদিন। এই কাগজ দিয়ে দিয়েই বোনেদের বিয়ে দিয়েছে। ছেলেকে পড়িয়েছে। এখন ছেলে সরকারি চাকুরে। শ্যামল তবু কাগজ দেওয়া বন্ধ করেনি। বলে, বাড়িতে  থাকলে পাগল হয়ে যাব দিদি। বাইরে বেরিয়ে তবু আপনাদের সঙ্গে দেখা হয়। বসে একটু কথা বলি। বাড়িতে বসে থাকতে পারি না। ছেলেটা বড় হয়ে গেল। দায়িত্ব শেষ। শুনে ভাবি, আমারও ছেলেদুটো বড় হয়ে যাচ্ছে– মনে হয়, এরকম দিন আমারও আসবে। আজকাল আমার নানা কথা নিয়ে ছেলেরা হাসাহাসিও করে। রণো আর শমী ঠাট্টা করে আমি এখনও ব্যালকনি না বলে বারান্দা বলি, বলে। আরও কত কী বলি, শুনে ওরা বলে, “তুমি একটু আধুনিক হও, এবার মা”। এসব হয়, যখন রণো ঠিক থাকে। রণোর মন-মেজাজের ওপর, আমাদের বাড়ির পরিবেশ ওঠানামা করে। আজ চারদিন রণো ভালো নেই। খায়নি। ওঠেনি। ঘরে আটকে রেখেছে নিজেকে। রাজ প্রতিদিন ওর পাশে গিয়ে বসেছে। রণো কথা বলেনি। শমী বারবার ঢুকেছে আর বেড়িয়ে এসেছে। মুখ ফিরিয়ে ছিল। আমি এসব সময়ে দেখতে যেতে পারি না রণোকে। আবার না-দেখেও কি থাকা যায়? বুকের ভেতরটা ফেটে যেতে থাকে। এমন সুন্দর ছেলে আমার! কথা বলেনা। পড়াশোনা শেষ করল না। বেশি বকাবকি করলে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কী যেন খোঁজে আমার মধ্যে। বুঝতে পারিনা। কষ্ট বেড়ে যায় আরও। কিন্তু শক্ত থাকতে হয়। হয়-ই। আমি যে শমীরও মা। সে ছেলে, দাদার শুকনো মুখের পাশে মায়ের করুণ মুখ দেখলে পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। রাজও এবার আর সহ্য করতে পারছে না। গতরাতে খাবার টেবিলে, শমী চুপচাপ চোখ মুছছে দেখে রাজও খেতে পারল না। উঠে গেল। শমী একটা রুটিকে চার টুকরো করে দুধে চুবিয়ে ফেলে দিল। উঠে গেল। আমি বসে রইলাম। ঘরে এলাম টেবিল পরিষ্কার করে। সন্তান না খেলে মায়ের বুকের মধ্যেটা যে কীরকম করে, তা কেবল আমিই জানি।

 রাজ ঘুমোতে যাওয়ার আগে আমাকে ডাকল, “ওকে এবার বোধহয় কোনও রিহ্যাবে পাঠানো দরকার”। বলতে বলতে পাণ্ডুর হয়ে গেল রাজের মুখ। আমিও শিউরে উঠলাম। রিহ্যাব নিয়ে আমার বরাবরের ভয়। রাজ এটা খুব ভালো করে জানে। আমাদের আগের পাড়ার একজনকে রিহ্যাবে পাঠানোর পরে, সে আর ফেরেনি। সেখানেই গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে। সে কতকাল আগের কথা! তবু আমার ভয় আজও কাটল না! রাজ অবশ্য তার দায়িত্ব পালনে কোনওরকম অবহেলা করেনি কখনো। দায়িত্ব কথাটা এক্ষেত্রে একটু রূঢ় শোনায়। রণোকে ও বেশ পছন্দই করে, মানে ভালবাসে আরকি ! – সে আমি জানি। প্রথম থেকেই দেখছি, রণো এবং রাজ পরস্পরের খুব কাছের।

সেই যখন রণোর বয়েস পাঁচ, তখন থেকেই রাজ রণোকে জানে। প্রথম দেখার দিনই পাঁচ বছরের শিশু যেভাবে ঝাঁপিয়ে উঠেছিল রাজের কোলে , সেদিনই বুঝেছিলাম এই  লোক আমাদেরই কেউ। আমাদের মানে – আমার আর রণোর। অন্য কেউ হতেই পারে না। তখন রণো, আমি ছাড়া আর কারো কাছে যেতই না। আমি বাথরুমে গেলেও শাড়ির আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে থাকত দরজার বাইরে। একটু বড় হতে দেখেছি,  রাজকেই ও সব গোপন কথা বলে। সেই অভ্যাস এখনও আছে। রণোর বাবা মারা যাওয়ার পর, ওইটুকু শিশুকে নিয়ে আমি যখন ওকুল পাথারে, তখন থেকেই মনে হয় এই বিষণ্ণতা ওর ভেতরে শেকড় গেড়ে বসেছে।ছোটবেলাতেও সব সময় কেমন আতঙ্কিত হয়ে থাকত। বাথরুম যাওয়ার দরকার হলেও বলত না। রাজের বাড়িতে আসার পরেও বহুদিন মুখ লুকিয়ে ঘুরে বেড়াত। রাজের বাবা-মায়ের আদরে খানিকটা সহজ হয়। শমীর জন্মের পর, ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচি।  রাজ বলত, ওর বন্ধু দরকার। ঠিকই বলত। কিন্তু সেই বন্ধু থেকেই তো আবার গোলমাল হয়ে গেল। তাই তো,  তিথির ব্যাপারটাতে ও আরো আপসেট হয়ে পড়েছে। এটা শুধু আমার ধারণা নয়।  যে ডাক্তার ওকে দেখছেন, তিনিও একই কথা   জানিয়েছেন। রাজও একমত আমার সঙ্গে এই ব্যাপারে।

রাজের সঙ্গে আমি ক্লাশ ওয়ান থেকে পড়েছি। মাঝখানে  প্রায়  আট-দশ  বছর কোনও  যোগাযোগ ছিল না আমাদের।  ভাগ্যের ফেরে কলকাতা চলে যেতে হয়েছিল  আমাকে। পিসির  কাছ থেকে জোর করে অনুমতি আদায় করে কলকাতার কলেজে ভর্তি হই। যে টাকা পিসি পাঠাতো তাতে চালাতে পারতাম না বলে, বাধ্য হই দুটো টিউশনি নিতে। সেই সময় ফারহানের সঙ্গে আলাপ। তারপর তো নিয়তি ঠাকরূন ভেল্কি দেখিয়ে দিলেন একেবারে।

 সেসব কথা হবে পরে! রাজের সঙ্গে আবার দেখা এই মণিপুরেই। তখন খুব গরম। রাড় বাংলার কুখ্যাত গ্রীষ্ম যাকে বলে। কিন্তু তখন আর আমার শীত-গ্রীষ্ম দেখার অবসর ছিল না।  যেদিন রাজের সঙ্গে ফের মোলাকাত হয়, সেদিনটা আমি আজীবন মনে রাখবো। একটানা তাপপ্রবাহ চলছিল কয়েকদিন। সেরকমই একদিন দুপুরে আমি স্থানীয় প্রাইমারি ইস্কুলে গিয়েছিলাম কাজের জন্য। সেদিন গাছের একটা পাতাও নড়ছিল না। প্রবল গরমে পথের কুকুরগুলো পর্যন্ত ছেয়ে খুঁজে নিয়ে উধাও। রাস্তায় পিচ গলছে। প্রায় জনপ্রাণীহীন পথে রাজের সঙ্গে দেখা। যে ইস্কুলে গিয়েছিলাম, আমার এক প্রতিবেশি ওই ইস্কুলের হেড মাস্টারমশাই ছিলেন। তাঁর মেয়েকে আমি গান শেখাতাম। রণোর বাবা মারা যাওয়ার পর, আমাদের অবস্থা দেখে, তিনিই বলেছিলেন দেখা করতে।যদি তাঁর ইস্কুলে একটা চাকরির ব্যবস্থা হয়! তখন একটা কাজের জন্য, আমি সবকিছু করতে প্রস্তুত। ছুটলাম ছেলে কোলে। সেই ঘোর মে মাসের চল্লিশ ডিগ্রি গরমে, বাচ্চা নিয়ে ফেরার পথে রাজের সঙ্গে দেখা, টাউন হলের  সামনে। আমার তখন ক্রমাগত উপোষে মাথা টলছে। তার ওপর আবার সঙ্গে রণো।  তখন যেখানেই যাই, ছেলেকে নিয়ে যেতে হত। কারণ, কার কাছে রেখে যাব ওকে? আমি পিসির কাছে মানুষ। বাবা-মা নেই। পিসি আমাকে অপয়া বলে ডাকত। আমার জন্মের পর থেকেই ওবাড়িতে নানা দুর্ঘটনা ঘটতে থাকে। কিছু হলেই পিসি সারাক্ষণ ইনিয়ে-বিনিয়ে সেই সব কথা বলে যেত! বিয়েতে একটা সিল্কের শাড়ি আর পাতলা সোনার চেন দিয়ে দায়িত্ব সেরেছিল। ফারহানকে একেবারেই স্বীকার করেনি পিসি-পিসে। তাছাড়া তাঁরা কেউই আর বেঁচে নেই তখন।আত্মীয়স্বজন যাঁরা আছেন, সবই শ্বশুরবাড়ির দিকের। রণোর বাবা মারা যেতে, ওর মা একদিন এসেছিলেন। অসম্ভব অভিজাত চেহারাভার কাজের ঢাকাই জামদানি-সোনালী ফ্রেমের চশমা।  নিজেদের গাড়িতে এসেছিলেন, ফারহানের  শেষকৃত্য  সারা হওয়ার পরদিন বিকেলে। এর আগে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল মাত্র একবার। সে কাহিনি পরে হবে। তিনি এলেন। নাতির দিকে একবার তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিলেন। আমাকে আপাদমস্তক দেখে বললেন, “আমার ছেলেকে আমি মানুষ করতে পারিনি বলেই সে তোমার মতো মেয়ের খপ্পড়ে পড়ে শেষ হয়ে গেল। এবার দ্যাখো, তোমার ছেলেকে তুমি কিভাবে মানুষ করবে”। কথা শেষ করে একটা খাম এগিয়ে দিলেন। “এতে পাঁচ হাজার আছে। রেখে দাও। আর কোন কিছুর প্রত্যাশা রাখবে না আমাদের কাছ থেকে”। নীরবে নিতে হল টাকাটা। আমার তখন মান-অপমান বলে কিছু ছিল না। আসলে সবকিছুই বোধহয়  অর্থের ওপর নির্ভর। ভাতের থেকে বড় আর কিছু নেই।  এক মুঠো  ভাত, মুখে না দিতে পারলে সব তেজ ভেসে যায়।

You might also like