Latest News

আজ স্নানের দিন

অদিতি বসুরায়

Image - আজ স্নানের দিন

(১৩)
প্রায় ছয় মাস ভুগেছিল বাবা। সিরোসিস অফ লিভার-এ। কেমন ঝিম ধরে থাকত, চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। অতিরিক্ত মদ্যপানে যা হয়ে থাকে। কোনও নিষেধ গ্রাহ্য করত না। বিকেল থেকে সেদিন বাবা খুব কথা বলছিল— চা খেতেও ওঠেনি। তারপর ঘুমিয়ে পড়ল। আর ওঠেনি। কথাও বলেনি। আমাকে মাটি দিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কবরখানায়। মাও ছিল সঙ্গে। আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। কান্না পাচ্ছিল না, রাগ হচ্ছিল না,— শুধু মায়ের কোলে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল!

বাবার গ্রামের বাড়িতে আমি কোনওদিন যাইনি। বাবা আমাকে জলটুংরির গল্প বলত। বলত, জলটুংরির বাগানে যে সব ফুল ফোটে তাতে রঙিন শিশির লেগে থাকে। সেই ফুল মাজার বা মন্দিরে যায় না। বাচ্চারা খেলা করে তাদের নিয়ে। আর যিনি ঈশ্বর, তিনি রাতে ফুল ফুটিয়ে বেড়ান একা একা। কেউ তাকে দেখেনি কক্ষনো। আমি জিজ্ঞেস করতাম, আমি তাকে দেখতে চাই বাবা। কী করে দেখা যায় তাকে? বাবা বলত, মিথ্যা কথা বলে না যারা, যারা কাউকে দুঃখ দেয় না, তারাই কেবল তাকে দেখতে পায়। বাবা যখন মাকে মারত, আমার খুব বলতে ইচ্ছে হত, তোমাকে ফুল ফোটানো বুড়ো কখনও দেখা দেবে না বাবা। তুমি খারাপ। তুমি সবাইকে কষ্ট দাও। কিন্তু আমার কথা বলতে ভয় করত খুব। বাবা তাতে আরো বেশি রেগে যেত।

সেই সব রাতে খুব লোডশেডিং হত। ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকত। আমাদের দেওয়ালজুড়ে কালো কালো ছায়া ধীরে ধীরে এগিয়ে আসত। মনে হত, আর একটু এগোলেই ওরা আমাকে চেপে ধরবে। মাকে ডাকতে গিয়ে দেখতাম, মা ঘরে নেই। বাবা চিৎকার করে যাচ্ছে। কখনও দেখতাম, মাকে এলোপাথাড়ি মারছে বাবা। কী ভয় পেতাম আমি! কেঁদে ফেলতাম। মা হাতে-পায়ে ধরত বাবার। বলত, ‘রণো জেগে গেছে। তুমি আর এরকম কোরো না প্লিজ। ও ভয় পাচ্ছে, দেখ।’ বাবা চেঁচাত, ‘বেশ হয়েছে। জেগে গেছে, বসে থাক। বসে বসে মা-বাপের থিয়েটার দেখুক। এই তোমাদের জন্যই আজ আমার এই অবস্থা।’ কী অবস্থা? বুঝতে পারতাম না বলে, আরও জোরে কাঁদতে বসতাম। মা এসে আমাকে জড়িয়ে নিত কোলে। বাবা শুয়ে পড়ত। মা কিন্তু কাঁদত না। আমাকে ঘুম পাড়াত।

আমাদের দিন শুরু হত খুব ভোরে। আমাদের মানে, আমার আর মায়ের। আমাকে সবুজসাথী ইস্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল মা। নিয়মিত না হলেও, সপ্তাহে চারদিন তো যেতামই। আমার ইস্কুল আটটা থেকে। মা সকালে উঠে পাউরুটি সেঁকে জ্যাম বা বাটার দিয়ে খাইয়ে দিত আমাকে। নিজে চা খেতে খেতে বাসন মাজত। আমাকে ইস্কুলে দিয়ে এসে, গানের টিউশনিতে বসে যেত। বাবা দেরি করে উঠে, আমাকে ইস্কুল থেকে নিয়ে আসত। বেলা এগারোটা নাগাদ। বাড়ি ফিরে দেখতাম, মা একের পর এক কাজ সেরে চলেছে। রান্না, বাজার, ঘর মোছা, কাপড় কাচা— সব একা হাতে। কী রোগাই না ছিল আমার মা!

আমাদের ওখানে কালেভদ্রে মাছ উঠত বাজারে। যা উঠত তাও প্রায় সবই কাটাপোনা। মা একদম ওই মাছ খেতে পারত না। তাছাড়া গোটা মাছ নিতে হত— ফলে দামও বেশি পড়ত। মাংস হত মাসে দু-একবার। বাবা খুব মুরগির মাংস ভালবাসত। মাও। রোজ ডিম খেতাম আমরা। রোজ মানে সপ্তাহে পাঁচ দিন। বাকি দুদিন সয়াবিন। সয়াবিন খেতে আমার জঘন্য লাগত। এখনও লাগে।

এত বছর হয়ে গেল, তবু বারবার কেন যে ওই সব দিনের কথা মনে পড়ে আমার!
মা ভাবে ওই দিনগুলোর জন্যেই আমার বিষণ্ণতা কাটে না। ঠিকই ভাবে। এখনও বৃষ্টি এলে, ওই এক কামরার ঘরের পাশের জলা থেকে ব্যাঙের ডাক শুনতে পাই আমি। দেখতে পাই, একমাথা ঝাঁকড়া চুলের এক তরুণ সুর করে ডাকছে, গুগাবাবা ও গুগাবাবা! ওই তরুণের থেকে আমার জন্ম। ওই লোকটা আজ আর দুনিয়ায় নেই, কতগুলো অর্থহীন সংস্কারের জন্য। আমার বাবাকে মেরেছে সমাজ। ধর্ম। হিন্দু মেয়ে বিয়ে করার অপরাধে রাজার দুলালকে মাটিতে রাত কাটাতে হয়েছে। অনাহারে, অর্ধাহারে দিন গেছে তার। সন্তানের পথ্য যোগাড় করতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়েছে। আহা! আর একবার যদি ফিরে দেখা করা যেত! বাবাকে দেখতে সাধ হয় খুব।

— রণো, কী করছিস?
— এসো বাবাই। চা খাবে?

বাবাই আমার বন্ধু। প্রথম থেকেই। বাবাইয়ের মধ্যে একরকম স্নিগ্ধতা আছে, যা পুরুষের মধ্যে সহজে দেখা যায় না।
— হলে মন্দ হয় না। দেখ বলে, মাকে।

চায়ের কাপ হাতে পেলে বাবাই-এর খুশি দেখে কে! মাকে চা দিতে বললাম চেঁচিয়ে। আজ সারাদিন বেশ ভাল লাগছে আমার। খিদে পাচ্ছে। ঘুমও। তবে বাড়ি থেকে বেরোতে ইচ্ছে করছে না আর একদম। কেমন ল্যাদ লাগছে। সেদিন ঝড় খেয়ে এসে, ভালই লাগছিল। কিন্তু শমী যা জানালো, তাতে বিরক্ত লাগতে শুরু করল। শমীর জীবন সরল। তাই সে বোঝে না আমার ক্ষোভ। বোঝে না, শাসকের সুতো শক্ত করার জন্যেই ধর্মের মাঞ্জা দরকার। এছাড়া এই বিষয়টির কোনও প্রয়োজন নেই। শমী বোঝে না, এই ধর্মের গেড়োয় পড়ে কীভাবে এক প্রতিভাবান চিত্রকরের অকালপ্রয়াণ হয়েছে। শুধু কি একজন? যুগে যুগে এই ফাঁদে প্রাণ দিয়েছে কোটি কোটি সাধারণ মানুষ। যারা কিনা, এই ধর্মকেই তাদের আশ্রয় জেনে এসেছিল। তাদের মগজে ইনজেক্ট করিয়ে দেওয়া হয়েছিল, আল্লাহ-ভগবান-যিশু তাদের বাঁচিয়ে রাখার মালিক। মেরে ফেলারও। শমী এসব জানে না। ও চিন্তা করে বাইরের জগত নিয়ে। আমাকে বোঝায়। ওর তো ক্রাইসিস নেই সেরকম। ওকে তো ইস্কুলে ভর্তি হতে গিয়ে প্রশ্নের সামনে পড়তে হয়নি, মা ইরাবতী মিত্র আর বাবা ফারহান সিদ্দিকি কেন? ওকে তো মায়ের হাত ধরে ঘুরতে হয়নি আশ্রয়ের খোঁজে। ওর বাবা হেঁটে গেলে, গোবরজল দিয়ে উঠোন ধুয়ে দেয়নি কেউ।  শমী আমার মায়ের সন্তান। আমার বাবার নয়। ফলে এই অন্ধকারগুলো ওকে সেভাবে ছোঁয়নি। ভাগ্যিস। ছোট্ট ভাইটা আমার। ওর জীবনে আনন্দ থাক। এসব কথা বরং বাবাই অনেকটা বোঝে। (BengaliNovel)

— চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে যে! কী ভাবছিস?
— আচ্ছা বাবাই, এই যে একটা লোককে অনেকে মিলে পিটিয়ে মারল কেবল অপছন্দের মাংস ফ্রিজে রাখার জন্য, তোমার রাগ হয় না এইসব দেখে?
— ওহ রণো, সারাক্ষণ এইসব নিয়ে ভাবিস না বাবা!
— কেন ভাববো না বাবাই? কেন? একটা মানুষকে কেটে ফেলা হবে ঠাকুরের নাম নিয়ে শ্লোগান দিতে না পারলে— আর সেই আজব ঘটনায় মুখ খোলা যাবে না? ভাবা যাবে না?
— ভাববি না, কারণ তুই যে ভাবে ভাবছিস, সব সময় ঘটনাটা তেমন ঘটছে না। সবকিছুরই অনেক স্তর থাকে। সব সামাজিক অপরাধের পেছনেই বহুরৈখিক কারণ থাকে রে।
— আর কী কারণ, বাবাই?
— ওরে, আমাদের ভারতবর্ষ এক আজব জায়গা বাবা! এখানে মারাত্মক সব কনফিউশিং বিষয়গুলোকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। কোনও সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না। শুধু ধর্মের ক্ষেত্রেই নয়— অনেক কিছু আছে এরকম। যে মেয়েদের বেশ্যা বলে ব্যবহারিক জীবনের বাইরে ফেলে রাখে মানুষ, তাদেরই দরজার মাটি ছাড়া দুর্গাঠাকুর তৈরি হয় না। এবার দুর্গা কে? না, দুর্গা হলেন মা। হিন্দু ধর্মের সবচেয়ে বড় উৎসব যাঁকে নিয়ে। কী আশ্চর্য কনট্রাস্ট ভাব তো?
— হ্যাঁ বাবাই। মেয়েদের দিক দিয়েও এই ব্যাপারটা ভেবে দেখ। কী আজব লাগে, যারা মেয়েদের শক্তি ধরে পুজো করছে তারাই আবার মেয়েদের ঘরের মধ্যে আটকে জ্বালিয়ে দিয়ে মেরে যাচ্ছে। আর মেজরিটি চুপ করে আছে। যারা মুখ খুলছে দোষ যেন তাদেরই।

বাবাইয়ের মুখে এই ধরনের কথা শুনলে অবাক লাগে।
— তুমি বলতে চাইছ, যে অত্যাচারিত হচ্ছে, অন্যায় তারই?
— দোষের কথা নয়। একজন দোষ দিলে কী আসে যায়? এই সমাজ যে তাকে দোষী ঠাউরে নেয়। সেটাই মুশকিল।
— সমাজের বলাবলিতে কিছু এসে যায় না কি বাবাই?
— যায়, খুবই যায়। কারণ, সমাজ যে প্রেশার ব্যক্তি-মানুষের ওপর দেয়, তাকে বহন করা সোজা নয়। ব্যক্তি মানুষ সেই চাপের সামনে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়।

সে আমি নিজের চোখে দেখেছি। আমার বাবার হাল তো সমাজেরই অবদান। কিন্তু বাবাইকে সে সব বলে আর কষ্ট দিতে ইচ্ছে করছে না এখন! একজন প্রাপ্তবয়স্ক তরুণের ভিন্ন ধর্মের মেয়েকে জীবন-সঙ্গিনী করার অধিকার দেয়নি আমাদের এই সমাজ। তাকে পরিবার থেকে প্রতিবেশী– রেহাই দেয়নি কেউই। বাবাই তো জানে সব। কেই-বা জানে না! সবাই জানে এসব এবং মানেও। আর এই মেনে নেওয়াটাতেই আমার আপত্তি।
 — তাই তো বলি বাবা, তুই পড়াশোনা শেষ কর। কাজে ঢোক। এসব তো রইল-ই ।

— তুমিও ব্রুটাস?

— একটা কথা শোন রণো, তুই ফেসবুকে এখন আর এসব লিখিস না। বসিরহাটের ঘটনা তো জানিস। লোকজন আজকাল আর তলিয়ে ভাবে না, বাবা। কী দরকার বিপদে সাধ করে ঢোকার? আর তুই তো জানিস এইসব কাণ্ডগুলোতে সাফার করে তোর-আমার মতো সাধারণ মানুষ। তার চেয়ে এখন একটা প্ল্যান ছকে ফেল দেখি। কালিম্পং থেকে কোথায় কোথায় যাওয়া যায়, ঠিক করে ফেল। আমি কালিম্পং ছাড়িয়ে একটা গ্রামের সন্ধান পেয়েছি। রামপুর। ওখানে একটা হোমস্টে আছে। আমাদের পঙ্কজদা গত বছর ওখানে গিয়েছিলেন। খুব নাকি ভাল। চল, ঘুরে আসি। জমিয়ে দেশি মুর্গি, মোমো খাওয়া যাবে। প্ল্যান কর তো…

বলতে বলতে, বাবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেমে গেল। আমিও চুপ করে তাকিয়েই ছিলাম। মনে মনে বুঝতেও পারছিলাম, বাবাই ভুল কিছু বলছে না। বাস্তবে যা ঘটে তাকে যদি ‘সত্যি’ বলে ধরে নেওয়া হয় তবে, বাবাই সত্যি কথাই বলছে। চিন্তাও করছে খুব। একটানা তিনটে সিগারেট খেয়ে ফেলল— মানে চিন্তার বিষয় ঘটেছে কিছু। শুধু একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না, বাবাই বা শমীকে কি কেউ কিছু বলেছে আলাদা করে? যদি বলে থাকে, তবে মায়ের কানে গেলে সমস্যা আছে। মা টেনশনে মাথা-খারাপ করে ফেলবে। এদিকে বাবাই বা শমী কেউই ঝেড়ে কাশছে না। কিন্তু আমাকে তো লিখতেই হবে। লিখেই যেতে হবে যতদিন না ফারহান সিদ্দিকি আর ইরাবতী মিত্ররা নিশ্চিন্তে ঘর বসাতে পারে! যতদিন না ‘ধর্মযাজকের উর্দি’ কেড়ে নেয় ‘নিষ্পাপবালক’।

মনে আছে, খুব ছোটবেলায় আমাদের কামারপাড়ার বাড়িতে সিরাজুলের মা বলে এক মহিলা আসত। হাঁসের ডিম আর দেশি মুরগির ডিম বেচতে। বাবাকে সে ‘আব্বা’ বলে ডাকত। যেদিন জানতে পারল, আমার মা হিন্দু, সিরাজুলের মা খুব আশ্চর্য ব্যবহার করে। মায়ের সেদিন মন ভালো ছিল না। আগের রাতে বাবা খুব অশান্তি করেছে। মায়ের মুখ তাই গম্ভীর। সে বুড়ি, মাকে কাছে ডেকে গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, ও আম্মাগো, মনে অভিমান রাখবা না। নাকফুল দাও দিনি একখানা নাকে। সাদা পাথর বসানো। ওরম বেতের লতার মতো নাকখান কি মানায় নাকফুল ছাড়া? আর সিঁদুর পরলে তো আম্মা আমার দুগগা ঠাকুর।

মা এই ঘটনাটার কথা আজও নানা প্রসঙ্গে তোলে। আসলে আমাদের দেশের জনসংখ্যার অধিকাংশই এইভাবে ভাবে। তাদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-কাজিয়ার ফুরসত কোথায়? ভাতের যোগাড়েই তো দিন কেটে যায়। মা বলে, জানিস রণো, আমার খুব ইচ্ছে এদের জন্য একটাই স্কুল করি। নিজের নামটাও যদি সই করতে শেখাতে পারি, তাই অনেক।

মা ওই অভাব, লাঞ্জনার মধ্যেও স্বপ্ন দেখত। আমি মায়ের কোলে বসে প্লাস্টিকের টিয়াপাখি চিবোতাম। কিছু ভাঙা গাড়ি, টিয়া পাখি, ঘাড়-নাড়া বুড়ো এইসব নিয়ে আমার দিন কাটত। মায়ের হারমোনিয়ামে চেপে বসতাম মাঝে মাঝে। বাবার তুলিতে জল দিতাম। ইজেলে ঠেস দিয়ে বসতাম। বাবা-মায়ের কথা বুঝতে পারতাম না। কিন্তু ওরা যখন ঘন হয়ে বসে কথা বলত, ভারি শান্তি-শান্তি লাগত আমার। ঘুম পেয়ে যেত।

এবাড়িতে আসার পরেও, বাবাই আর মাকে একসঙ্গে দেখে বুকটা ঠান্ডা হয়ে যেত। বাবাইদের ফুলডিহির জমিতে মায়ের স্বপ্নের ইশকুলটা হওয়ার কথা ছিল। ঠাকুরদা মানে বাবাইয়ের বাবা প্রথমে চেয়েছিলেন, ওখানে একটা অনাথ আশ্রম করতে। আমার এই ঠাকুরদা স্বপ্ন-দেখা মানুষ ছিলেন। বড় কম এই ধরনের লোকের সংখ্যা। মা ওই সঙ্গে বয়স্ক-শিক্ষার ইস্কুলের প্ল্যান করে। হল না। হবে কি না, জানে না কেউ। সবকিছু আমি জানি না এখনও। কিন্ত ছোটবেলা থেকে ওই ইস্কুলের কথা শুনতে শুনতে আমারও স্বপ্নে ঢুকে গেছে বিষয়টা। মাঝে মাঝে সত্যিকারের স্বপ্নে ওই ইস্কুলবাড়ি হানা দেয়। আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখি সাদা একটা দোতালা বাড়ি। তাতে নীল বর্ডার। মিষ্টি একখানা বাগান সামনে। বাঁশের বেড়ার গায়ে ফুলগাছ। পরিষ্কার সাদা ইউনিফর্ম গায়ে বাচ্চা ছেলে-মেয়েরা খেলে বেড়াচ্ছে। প্রেয়ার করছে। গান শিখছে। পড়ছে।
— রণো, ভাত দিয়েছি। খাবি আয়।
মা ডাকছে। চটক ভেঙে গেল।
— যাই-ই।

খাবার টেবিলে গিয়ে দেখি বাবাই আর শমী বসে গেছে। আমাকে দেখেই বাবাই চেঁচিয়ে উঠল– রণো, কাঁচকলার কোপ্তা দিয়ে শুরু কর। তোর মা আজ জমিয়ে দিয়েছে পুরো।
শমী বলল- উফ! মা! কেন যে তুমি কাঁচকলাকে এত ফুটেজ দিতে গেলে আজ?
মা- মানে? জানিস ঝাড়া দু’ঘণ্টা লেগেছে কোপ্তা রাঁধতে?
— তাই তো বলছি মাম্মি ডারলিং। হাবিজাবি জিনিসে এত এফোর্ট কেন দাও? মাটনের কোপ্তা বানাতে পারতে? এইসব কাঁচকলা, লাউ-ফাউয়ের জন্য এত কষ্ট কর কেন?
মায়ের মুখের রং পাল্টাচ্ছে দেখে বাবাই সামাল দিতে ফিল্ডে নেমে পড়ল।
— কী যে বলিস শমী! তোর মায়ের হাতের কাঁচকলার কোপ্তা খেতে আমার দিল্লির বন্ধুরা অবধি মুখিয়ে থাকে। এ জিনিস বানানো সহজ নয়। চিকেন-মাটন দিয়ে তো কোপ্তা সব্বাই বানাতে পারে।
কিন্তু বাবাইয়ের ইশারা বুঝে চুপ করার পাত্রই নয় শমী।
— সে তুমি যাই বলো! এদিকে না কি মা টাইম পায় না রেওয়াজে বসার। কোপ্তা বানাতে দিন কাটিয়ে ফেললে হবে?
— তুই চুপ কর তো। রণো, আগে কী দিয়ে খাবি?
— আর কী আছে?
— চিকেন আছে। ডাল আছে।
— সবই দাও একটু একটু করে। আগে ডাল দাও।
এবার শমী আমার দিকে ফিরল…
— দাদা, কাল সিনেমা যাবি?
— নাহ!
— কেন রে? চল না! বাড়িতে বসে থেকে কী করবি?
— কী আর করব? দাঁড়া, দাঁড়া এত তাড়া দিচ্ছিস কেন? কাল সকালে জানাবো। এখন কোপ্তা খা।

জানি শমীকে কাটানো সোজা ব্যাপার নয়। তবু চেষ্টা চালিয়ে যেতে ক্ষতি নেই। সিনেমা দেখতে আমি ভালই বাসতাম। সিনেমা দেখতে গিয়েই তো তিথির সঙ্গে আলাপ হয়। তবে সে উৎসবের ছবি ছিল। কিন্তু এখানে সাধারণত যে সব ছবি আসে, দেখতে ইচ্ছে করে না। তার থেকে ঢের ভালো ঘরে বসে ছবি দেখা। ইন্টারনেট বা ডিভিডি-তে। নানারকম কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে খাওয়া শেষ হল। যে যার ঘরে চলে গেল। ‘গুডনাইট’ কথাটা কয়েকবার ঘুরপাক খেয়ে মিলিয়ে গেল শুনশান রাতের বাড়িটায়। শমী এখন পড়াশোনা করবে। জি আর ই-এর জন্যে। ও বাইরে চলে যেতে চায়।
 

You might also like