Latest News

আজ স্নানের দিন

অদিতি বসুরায়

Image - আজ স্নানের দিন

(১১)
 ওরা দাদাকে নিয়ে নিজেদের মধ্যে ডুবে যেত, আর আমি পাশে বসে চুপচাপ শুনতাম। দূরে সরে যেতে ইচ্ছে করত। বাবার মনে পড়ত না আমার কথা। মায়েরও না। বড়জোর, রাতে খেতে বসার আগে কাছেপিঠে না দেখতে পেলে জানতে চাইত, শমীকে দেখছি না। ঘুমিয়ে পড়েছে নাকি! আমি গুটিয়ে যেতাম। দাদাকে খুব হিংসে হত।

একজন অন্যমনস্ক মা, একটি মুখচোরা বিষণ্ণ কিশোরের সঙ্গে বড় হতে হতে আমার খারাপ লাগাগুলো বাড়তে থাকে। ঠাম্মা আন্দাজ করতে পারত খানিকটা। দাদাভাইকে বলত মনে হয়। আমি দাদার নামে, নালিশ করতাম খুব। এসবের  ওপর ছিল, মা। উফ! মা সবসময় কী যেন ভেবে চলেছে। পুরো এপিটোম অফ স্যাডনেস। যেন বিবাহ-জনিত বিষাদ ছাড়া আর কিছু থাকে না মেয়েদের জীবনে। এত ভালো গান গাইত। ছবি আঁকত। সব ছেড়ে দিয়ে আমাদের সেবায় লেগে গেল। খুব ছোট ছিলাম যখন, মা নীল শাড়ি, লাল ব্লাউজ পরে আমার ইস্কুলে চলে আসত। তখন সবাই ম্যাচিং করে শাড়ি-ব্লাউজ পরত। আমার সব বন্ধুর মায়েরা তেমনটাই করত। মা বাদে। একজন মানুষ কীভাবে কেবল অতীতের জন্য বর্তমানকে মেরে ফেলতে পারে, তা মায়ের কাছ থেকে শেখার মতো। শেষটায় মায়ের যেদিন আমার স্কুলে আসার কথা থাকত, আমি মায়ের শাড়ি-ব্লাউজ বের করে রেখে আসতাম মিলিয়ে মিলিয়ে। কিংবা ঠাম্মাকে বলে রাখতাম। (Bengali Novel)

বাড়িতেও নানা গোলমাল হত। প্রায়ই খাওয়ার টেবিলে ভাত খেতে বসে দেখা যেত, মা ভাত রাঁধতে ভুলে গেছে। অন্য সব তরকারি, মাছ ইত্যাদি রান্না করেছে শুধু ভাতটাই করতে ভুলে গেছে। কিংবা ভাতের হাঁড়ি গ্যাসে বসিয়েছে বটে, তবে গ্যাস অন করতে ভুলে গেছে– দেখা গেল। সেসব নিয়ে হাসি-ঠাট্টা হত খুব। আমার ভাল লাগত না। হরির বউ বলত, তোমার মায়ের ওপর জিনপরির নজর আছে। মেয়েমানুষের এত আলাভোলা হলে চলে? তার ওপর সদা-সর্বদা খোলাচুলে ঘুরে বেড়াচ্ছে! ঠাম্মার আড়ালে এসব কথা বললে, আমি যতবার ওকে জিজ্ঞেস করেছি, জিন-পরি কী? সে বলেছে, না বাবা। আমি কিছু বলবনি।

মায়ের এই ভুলোমনের জন্যেই ঠাম্মা, হরির বউকে ধীরে ধীরে রান্নাঘরে এন্ট্রি দেন। রান্না শেখাতে শুরু করেন। এখন তো সে একাই একশো। এগরোল, পকোড়া পর্যন্ত হেব্বি বানায়। কিন্তু মা খুব ভালো গল্প বলত। রোজ রাতে আমাদের দুইভাইকে গল্প শোনাতো মা। বেশির ভাগই সত্যি ঘটনা। গৌরদাস গায়কের গল্প মায়ের মুখে শুনে আমি রাগ করেছিলাম। রাগ হয়েছিল খুব। এই আমাদের দেশ? এখানে এক চিকিৎসকের ভুলে একটা মানুষ গোটা জীবন– হাঁটতে পারল না? প্রথাগত শিক্ষা নিতে পারল না? জীবিকা হল না তার ভিক্ষাবৃত্তি ব্যতীত? আর এত বড় ঘটনার দায় কেউ নিল না। এড়িয়ে গেল। একটা জীবন নষ্ট হল। এ কি সম্ভব কোনও সভ্য দেশে? মানুষটি দরিদ্র– এই তার দোষ। কেউ নেই তার হয়ে কথা বলার। তাই সে শেষ। তাহলে এই রাষ্ট্র নামের প্রহেলিকার দরকার কী? দুর্বলকে সে যদি সুরক্ষা না দিতে পারে। তবে আমি তাকে ছেড়ে চলে যাব। কেন থাকবো? আমাকে কে বাঁচাবে? সেই ছোটতেই আমি ঠিক করি, চলে যাব। চলে যেতে হবে।
 
– কী রে শমী, তোকে কখন থেকে ডাকছি। কানে যাচ্ছে না কথা?
মাতৃদেবী এবার ঘরে ঢুকে পড়লেন।
– যাচ্ছিলাম তো। তুমি এত চেঁচাও কেন বলো তো?
– না চেঁচালে কি তোমরা কথা শোনো? আধ ঘণ্টা ধরে ডাকা হচ্ছে। হরির বউকে দিয়ে মেথির পরোটা ভাজালাম খাবি বলে। সে তো ঠাণ্ডা হয়ে গেল একেবারে। কী করছিস তুই বল তো?
– ওহ মা। প্লিজ একটু থামবে? একেই আমার মাথা ধরেছে।
– মাথা আবার ধরলো কখন? জানাসনি কেন?
– জানালে কী করতে? আমি পেইন কিলার খেয়ে নিয়েছি। চিন্তা করো না। এখন এক কাপ চা আর মুড়ি খাব। পরোটা খাব না।
– আগে বললে তো করাতামই না। কিছুই তো জানাও না আমাকে তুমি। ঠিক আছে। চা পাঠাচ্ছি। শুয়ে থাক।

আমি শুয়ে পড়লাম আলো নিভিয়ে। ঠান্ডা ঝিরঝিরে হাওয়া আসছে জানালা দিয়ে। কখন যে হরির বউ চা দিয়ে গেছে, টেরই পাইনি। ঘুম ভাঙল কাচের বাসন পড়ার শব্দে। এ আমাদের বাড়ির নিত্য ঘটনা। হরির বউ প্রায়ই বাসন ভাঙে। মা চেঁচায়। আমি মাকে অনেকবার বলেছি, কাচের বাসন রোজ ব্যবহার করা বন্ধ করতে। শুনবে না। ফলে যা হওয়ার, তাই হবে। আজ ঘুম ভাঙার পর মেজাজটা গরম হয়ে গেল। বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে টের পেলাম, মাথা যন্ত্রণাটা ছেড়ে গেছে। চায়ের কাপে হাত না দিয়েও বুঝতে পারলাম, ওটা আর খাওয়া যাবে না। দেখি, আর এক কাপ পাওয়া যায় কি না! দাদা এসে ঢুকল,
– মাথা ব্যথা বাঁধিয়ে ফেললি আবার?
দাদা মাথা ব্যথার ব্যাপারে এক্সপার্ট। আমার সাইনাস, আর ওর মাইগ্রেন। এ বলে আমাকে দেখ– ও বলে আমাকে দেখ! মানিকজোড় একেবারে!
– এখন কমে গেছে।
গম্ভীর মুখে জবাব দিলাম।
– শুনলাম তোদের না কি পলাশকে নিয়ে খুব ঝামেলা গেছে আজ।
– হ্যাঁ। তুই কোথায় শুনলি?
– রামদার ঠেকে আড্ডায়। দীপ্তমান আর রাণা এসেছিল। ওরাই বলল। তোদের এই গরমের ছুটির স্পেশাল ক্লাস শেষে ক্রিকেটে এসে ঠেকেছে তাহলে?
– মোটেই না। আজ স্যারেরা ব্যস্ত ছিলেন বলে ক্লাশের দেরি ছিল। আমরা একটু ব্যাট পেটাবো বলে মাঠে গিয়েছিলাম।
– এই রোদে?
– বাইরে বেরোলে খুব একটা গরম লাগে না, জানিস!
– জানলাম। গায়ে ঘামাচি বেরোলে বুঝবি এখন।
– আমার ঘামাচি হয় না। আর যদি ঘামাচি হয়ও তাতেই বা কী? তুই ঘরে যা তো প্লিজ। আমি একটু স্নান করে আসি। গা-কিচকিচ করছে।

দাদা বেড়িয়ে যেতেই আমি বুঝতে পারলাম মাথার যন্ত্রণাটা ফিরে আসার প্ল্যান করছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিতে পারলে, সারারাত ভোগাবে। খানিকটা জল খেয়ে, বাথরুমে ঢুকলাম। বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলছিল দাদা। একটু কি ভুলেছে সে সব? কী জানি। এসব আবার জিজ্ঞাসাও করা যাবে না ওকে। দাদাকে নিয়ে নতুন এক টেনশন ছড়াচ্ছে। ফেসবুকে ও ধর্ম নিয়ে যা লিখছে, তা অনেকেরই পছন্দ হচ্ছে না। আমি ওর পোস্ট নিয়মিত পড়ি। আমার সে রকম কিছু মনে হয়নি। কিন্তু বেশ কদিন ধরে নানা ডিপার্টমেন্টে দাদাকে নিয়ে গুনগুন চলছে। আমি রাণাকে চেপে ধরাতে বলে ফেলল, রণোদা ধর্ম নিয়ে কী সব লিখছে তুই জানিস না? লোকে ওর ওপর রাগ করছে, বুঝতে পারছিস কি? (Bengali Novel)

– রাগ করছে? দাদা তো ধর্ম নিয়ে কিছু লেখে না। ওর সব লেখায় তো থাকে ধর্মে অবিশ্বাসের কথা। তাছাড়া ওর তো ফলোয়ারও আছে অনেকেই।

– ওই হল! একই কেস। ফলোয়ার দিয়ে কিছু এসে যায় না। ফলোয়ার হাতকাটা বিলুরও আছে। ওসব বাদ দে।

– যাহ বাবা! একই? দুটো-ইএক?

ধর্ম ও ধর্মহীনতা এক? কী হবে আর আলোচনা করে? কী বোঝাবো এদের? দাদার কথাগুলো বুঝতেই পারেনি, দেখা যাচ্ছে। ছোটবেলা থেকে মা বলে এসেছে, কথা বলবে। আলোচনা করবে। কথা বললে সমস্যা মেটানো যায়। কমিউনিকেশন খুব জরুরি। আজকাল মনে হয়, মানুষ নামের প্রজাতিটির মধ্যে কমিউনিকেশনের তার ছিঁড়ে গেছে। কেউই কারও কথা বুঝতে পারছে না। দাদাকে না বোঝার মতো তো নয়। ও একটা ধর্মের বেড়াহীন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে। সেটাই লেখে। খুবই শান্তস্বরে লেখে। হিংস্রতার তো কোনও প্রশ্নই নেই, এমনকী ধর্মের প্রতি বিরোধিতাও নেই। কেবল অস্বীকার করার উচ্চারণ আছে। এর জন্যে ঢাকায় তো চপার বসিয়ে দেওয়া হল ব্লগ-লিখিয়ের শরীরে। প্রকাশ্যে। এইভাবে একজন নয়, পরপর মেরে ফেলা হচ্ছে মুক্তমনাদের ওদেশে। হুমকি দেওয়া হচ্ছে লেখক-কবিদের। মুখ খোলা চলবে না। চারিদিকে ফতোয়া। চারিদিকে রাগ। জঙ্গিরা ছেয়ে ফেলছে চতুর্দিক।

দাদার এইসব না জানার কথা নয়। ওকে তো কোনওকালেই কিছু বলতে গেলে, তর্ক করে না। মৃদু হাসে। আবার লেখেও। দমে না। যারা ওর লেখা বন্ধ করাতে চায়, তাদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি। লাভ নেই। বুঝবে না। আমার তাই আর কথা বাড়াতে ইচ্ছে হয়নি। তবে যা জানার জেনে গেছিলাম। পরিস্থিতি ঘোরালো হচ্ছে দিনকে দিন। এর মধ্যে আবার দাদার বাবার ধর্মীয় পরিচয় নিয়েও লোকে আলোচনা আরম্ভ করেছে। দাদার সঙ্গে এ নিয়ে আলাপ করা দরকার। সমস্যা হল, দাদাকে এই বিষয়ে বলতে গেলেই এমন মুষড়ে পড়বে যে আবার তিন-চার দিন ঘর বন্ধ করে বসে থাকবে। আরে, তুই তোর মতো যা খুশি ভাব, লেখার দরকার কী? দেখতে পাচ্ছিস সারা দুনিয়ার স্বাধীন চিন্তাধারার মানুষগুলোকে ধরে ধরে খুন করা হচ্ছে! তারপরও কোনও মানে হয়, আমি ধর্মে বিশ্বাস করি না ইত্যাদি হেনতেন লেখার! মাথা গরম হয়ে যায় এর মধ্যে ঢুকলে। আমি এসব নিয়ে ভাবতে চাইও না।
 
 

You might also like