Latest News

Begum Rokeya: আপসহীন সংগ্রামের পথে আগুন হয়ে জ্বলেছেন বেগম রোকেয়া

গৌতম রায়

উনিশ শতকের জাগরণের যে প্রবাহ বিশ শতকের শুরুতে বাংলার আবহমানকালের পরিমন্ডলকে সমৃদ্ধ করেছে, সেই বৃত্তকে পূর্ণতা দেওয়ার ক্ষেত্রে বেগম রোকেয়ার (Begum Rokeya) (১৮৮০, ৯ ডিসেম্বর-১৯৩২, ৯ ডিসেম্বর) অবদান অবিস্মরণীয়।

উনিশ শতক (19th Century) বলতেই গবেষকদের চোখে ভেসে ওঠে কলকাতা মহানগরী কেন্দ্রিক জাগরণের চালচিত্র। সেই চলচ্চিত্র নির্মাণের কুশীলব হিসেবে যাঁদের অগ্রগণ্য ভূমিকাকে সবথেকে প্রোজ্জ্বল ভাবে সামনে তুলে ধরা হয়, জন্ম পরিচয়ে তাঁরা হিন্দু। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে জাগরণের স্পর্শ হিন্দুদের কাছে প্রথম আসে। তা বলে মুসলমান সমাজ যে একদম ঘুমিয়েছিল, ইতিহাসকারদের এই কথকতার ভিতরেও অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাবে লুকিয়ে আছে পক্ষপাতের এক ধূম্রজাল। তাই নবজাগরণের ইতিহাসকারেরা রামমোহন, বিদ্যাসাগরের সমমর্যাদা কখনওই দিতে চান না নওয়াব আবদুল লতিক, সৈয়দ আমির আলি থেকে শুরু করে নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী বা বেগম রোকেয়াকে (Begum Rokeya)।

উনিশ শতকের নবজাগরণ যে কেবলমাত্র কলকাতা মহানগরীর বুকেই হয়নি, আর কেবলমাত্র কলকাতা কেন্দ্রিক হিন্দু অভিজাতেরাই সেই নবজাগরণ ঘটাননি, সেই কয়লা কালো সত্যকে স্বীকার করে নিতে অনেকের মধ্যেই একটা হীনমন্যতা বোধ কাজ করে। কলকাতায় শহরকেন্দ্রিক জাগরণের অভ্যস্ত ভঙ্গির নিত্যনতুন তথ্য সমাহারের জাবর কাটতে ব্যস্ত থাকা শহুরে পণ্ডিতদের কাছে সেই সময়ের পূর্ববঙ্গের প্রত্যন্ত কুমিল্লায় স্ত্রী শিক্ষা বিস্তারের (Women Empowerment) জন্যে নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর উদ্যোগ, মেয়েদের জন্যে ইস্কুল প্রতিষ্ঠা– এইসব কথা আমাদের উনিশ শতক কেন্দ্রিক আলোচনায় প্রায় অনুল্লিখিতই থেকে যায়।

স্ত্রী শিক্ষা বিস্তারে ব্রাহ্ম সমাজের ভূমিকার কথা সশ্রদ্ধ চিত্তে আলোচিত হলেও ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর কর্মকাণ্ড পণ্ডিতদের বদান্যতায় সর্বসাধারণের প্রায় অগোচরেই থেকে যায়। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অম্লান দত্তের ভগিনী, পরবর্তীকালে ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী প্রতিষ্ঠিত স্কুলে শিক্ষালাভ করলেও বাংলার জাগরণে ফয়জুন্নেছার অবদান সম্পর্কে অম্লান দত্ত একটি শব্দও লিখেছেন কি?

ফয়জুন্নেছার লেখা ‘রূপজালাল’ বাঙালি মেয়েদের লেখা অন্যতম আদিগ্রন্থ। কিন্তু শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে সুকুমার সেন হয়ে অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়- কেউ কি এই ‘রূপজালাল’ সম্পর্কে একটি শব্দও উচ্চারণ করেছেন? ব্যতিক্রম একমাত্র ক্ষেত্র গুপ্ত। সাহিত্যের ইতিহাস রচনায় সম্ভবত তিনিই একমাত্র ব্যতিক্রম যিনি উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান অত্যন্ত সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করেছেন। বাঙালির সামাজিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে অবদানের জন্যে তাই ক্ষেত্র গুপ্তকে রবীন্দ্রনাথ, দীনেশচন্দ্র সেনের একজন সার্থক উত্তরাধিকারী বলতে হয়।

উনিশ শতকের নবজাগরণের ঢেউ যে কেবলমাত্র কলকাতা মহানগরীর বুক থেকেই উঠেছিল, একাংশের ইতিহাসবিদদের এই দাবির আদৌ কোনও সারবত্তা নেই। তার পাশাপাশি এই নবজাগরণের উন্মেষ কেবলমাত্র হিন্দু অভিজাতদের ভিতরে ঘটেছিল, আম-মুসলমান সমাজ আধুনিক শিক্ষার সুযোগ না পেলেও , অভিজাত, উচ্চবর্ণীয় মুসলমান সমাজের ভিতরে যে আধুনিক শিক্ষা এবং ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রভাব বেশ ভালভাবেই পড়েছিল, উনিশ শতকের শেষপ্রান্তে উত্তরবঙ্গের রংপুর জেলার পায়রাবন্দে রোকেয়ার পরিবার বা বিশ শতকের সূচনা পর্বে বরিশাল জেলার শায়েস্তাবাদে, রোকেয়ার (Begum Rokeya) সার্থক উত্তরসূরি সুফিয়া কামালের পরিবারের পুরুষদের ভিতর আধুনিক শিক্ষার প্রচলন এবং সেই শিক্ষার ধারাবাহিকতাতেই রোকেয়া বা তাঁর পরবর্তী সময়ে সুফিয়া কামালদের স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠে, উনিশ শতকীয় নবজাগরণে স্ত্রী শিক্ষা এবং নারীর স্বাধিকার- ক্ষমতায়নের বিষয়টিকে একটা নতুন আলোয় উদ্ভাসিত করে সমাজের বুকে উন্মোচিত করবার ভিতর পরিষ্কার ভাবে ফুটে উঠেছে।

ভুলে গেলে চলবে না যে, প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ না পেলেও, স্বশিক্ষার ভিতর দিয়ে আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে পরিচয় স্থাপনের ক্ষেত্রে দাদারা এবং দিদি করিমুন্নেসার পুত্র, দেলদোয়ারের জমিদার গজনভী ভাইদের অবদান বিশেষ ভাবে পড়েছিল রোকেয়ার উপর। ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতার প্রশ্নে এই গজনভী ভাইদের অবদান ছিল ঐতিহাসিক।

ভিক্ষেপাত্র নয়, বইখাতাই থাক হাতে! মুম্বইয়ের স্টেশনে পড়ান বাঙালি ‘স্কাইওয়াক টিচার’

স্ত্রী-শিক্ষা ঘিরে রোকেয়ার (Begum Rokeya) সারা জীবনের আপসহীন লড়াই মনে রেখেও বাঙালি মেয়ের লেখা প্রথম কল্পবিজ্ঞানের কাহিনির লেখক রোকেয়া এবং তাঁর, ‘সুলতানাজ ড্রিম’ (এই ‘সুলতানা’র স্বপ্ন ঘিরেই সুফিয়া কামাল তাঁর মেয়ের নাম রেখেছিলেন ‘সুলতানা’, আজ যিনি বিশ্ববিশ্রুত মানবাধিকার নেত্রী) ঘিরে নারীর নিজস্ব ভুবন রচনার স্বপ্ন দেখেছিলেন রোকেয়া।

Begum Rokeya - Wikipedia

নারীর নিজস্ব ভুবন রচনার কল্পনাকেও কেউ কেউ রোকেয়ার (Begum Rokeya) অতি নারীবাধ এবং পুরুষ বিদ্বেষ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন। ‘সুলতানাজ ড্রিমে’ যেহেতু কোনও পুরুষ চরিত্র নেই, আর নারীর ক্ষমতায়নের একটা স্বপ্ন-বাস্তব মেদুরতা আছে, তাই রোকেয়া পুরুষ বিদ্বেষী বলে দেখিয়ে আত্মতৃপ্তি পেতে চান কেউ কেউ।

মজার কথা হল, অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর ‘রত্ন ও শ্রীমতী’ উপন্যাসে যখন নারীর আপন ভুবন সৃষ্টির অধিকারের দাবি প্রথম তোলেন বাংলা উপন্যাসে, তখন কিন্তু পুরুষ হয়ে পুরুষ বিদ্বেষী, এই অভিযোগ অন্নদাশঙ্করকে কখনও শুনতে হয়নি, যেটা আধুনিক বিদূষীরা রোকেয়াকে এই ‘সুলতানাজ ড্রিম’-এর জন্যে পুরুষ বিদ্বেষী হিসেবে দেখাতে চাইছেন। যদিও শিক্ষা বিস্তারে রোকেয়ার যে কর্মকাণ্ড, সেখানে ব্যবহারিক জীবনে একটা বিপ্লবাত্মক ঘটনাক্রম সৃষ্টির ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়কে শামিল করেই। কিন্তু নিজের কর্মস্রোতকে প্রথম থেকে পরিচালিত করেছিলেন রোকেয়া। পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে নিজে অতি বিপ্লবী কখনওই সাজার চেষ্টা করেননি তিনি (Begum Rokeya)।

বেগম রোকেয়া (Begum Rokeya) যেন এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ

মেয়েদের ইস্কুল, বিশেষ করে পারিবারিক রক্ষণশীলতা থেকে মুসলমান মেয়েদের বের করে এনে তাঁদের প্রথাগত শিক্ষার পরিমণ্ডলে আনার জন্য রোকেয়ার যে গোটা জীবনব্যাপী প্রয়াস, সেখানে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা কম আসেনি। কিন্তু সেই প্রতিবন্ধকতার মোকাবিলা করতে গিয়ে তিনি কোনও অবস্থাতেই পুরুষের সঙ্গে দ্বন্দ্ব-বিবাদ-ঝগড়া-কলহের মধ্যে দিয়ে নিজের কার্যসিদ্ধি করার পথে হাঁটেননি। সমাজের প্রতিবন্ধকতার জগদ্দল পাথরকে তিনি সরিয়েছেন তাঁর স্বভাবসুলভ বুদ্ধিমত্তা এবং ব্যক্তিত্ব দিয়েই।

চিরজীবন পর্দা প্রথার ঘোরতর বিরোধী ছিলেন রোকেয়া। তাঁর শৈশব, কৈশোরে দেখা পর্থাপ্রথার বিভীষিকা মেয়েদের জীবনকে কীভাবে এবং কতটা বিষময় করে তোলে, তার অসামান্য শ্লেষাত্মক অথচ সমাজদ্রোহী বিবরণ হলো তাঁর লেখা ‘অবরোধবাসিনী’। এই ছোট্ট বইটি পড়লে আমাদের আজও শিউরে উঠতে হয়। হিন্দু সমাজে নারীর এই কৌণিক অবস্থান ঘিরে বিশ শতকের শেষ পর্বে লিখেছিলেন কল্যাণী দত্ত ‘পিঞ্জরে বসিয়া’। তার পরেও অনেকেই এ নিয়ে চর্চা করেছেন। কিন্তু উনিশ শতকের শেষ পর্বে বা বিশ শতকের সূচনাকালে পুরুষ শাসিত সমাজের সৃষ্ট অবরোধের পাশাপাশি নারী যে নিজেই নিজেকে কী ভাবে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল তার হৃদয়স্পর্শী সামাজিক দলিল রেখে গিয়েছেন রোকেয়া (Begum Rokeya) তাঁর ‘অবরোধবাসিনী’তে।

বাঙালি মেয়েদের অন্তঃপুরের যন্ত্রণা সম্পর্কে আমাদের কিছুটা ধারণা আছে। কিন্তু অবাঙালি মেয়েদের, বিশেষ করে মুসলমান সমাজের মেয়েদের অন্তঃপুরে অবরোধকে ঘিরে কী ধরনের মানসিক, সামাজিক এবং শারীরিক নির্যাতনের ভিতর দিয়ে গোটা জীবনটা কাটাতে হয়, সে সম্পর্কে আমাদের বোধ উন্মেষ এবং উন্মীলন প্রথম ঘটিয়েছিলেন রোকেয়া (Begum Rokeya)।

সেই রোকেয়াই কিন্তু তাঁর স্বামী সৈয়দ নেহাল হোসেনের অকাল মৃত্যুর পর, ভাগলপুরে (স্বামীর সেই সময়ের কর্মস্থল) সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ পরিবেশে, সতীন কন্যার চরম বিরুদ্ধতার ভিতরে, নিজের স্ত্রীধনটুকু সম্বল করে যখন প্রথম মেয়েদের জন্যে ইস্কুল করেন, তখন পুরুষের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এই কাজ তাঁকে করতে হবে, এমন কোনও মানসিকতা বা বোধের দ্বারা তিনি নিজেকে পরিচালিত করেননি। স্বামী যেহেতু উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী ছিলেন, তাই অবরোধের সমস্ত সামাজিক প্রেক্ষিতকে মাথায় রেখেই স্বামীর সহকর্মীদের সহযোগিতাকে সম্বল করে নিজের কাজ শুরু করেছিলেন।

সতীন কন্যাদের বিরুদ্ধতার জন্যে ছোট বোন হোমায়েরাকে নিয়ে কার্যত প্রাণ হাতে করেই রোকেয়াকে (Begum Rokeya) ভাগলপুর থেকে কলকাতায় চলে আসতে হয়েছিল। এই পর্বেও কিন্তু তাঁর স্বামীর সহকর্মীরা তাঁকে অনেকটাই সাহায্য করেছিল। কলকাতায় এসে তাঁর শিক্ষা বিস্তারের কর্মকাণ্ডকে অক্ষুন্ন রাখতে রোকেয়া কিন্তু একটি বারের জন্যেও পুরুষ বিদ্বেষী হয়ে, অতি নারীবাদী আচরণের ভিতর দিয়ে নিজের কর্তব্য সাধনে ব্রতী হননি। আবার পুরুষের কাছে আত্মসমর্পণ করেও নিজের সংকল্প সাধন করতে চাননি।

যে রোকেয়া নিজের শৈশব-কৈশোরের অভিজ্ঞতায় পর্দাপ্রথার চরম বিরোধী ছিলেন, ‘অবরোধবাসিনী’র মতো আগুনের গোলা লিখেছিলেন, সেই রোকেয়াই কিন্তু সামাজিকতার জগদ্দল পাথরকে ভাঙতে অতি বিপ্লবী হননি। বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সেই পাথর সরাতে জীবনপাত করেছিলেন। ইস্কুলের কর্মসমিতির সভ্যদের সঙ্গে আলোচনার সময়ে নিজে থাকতেন চিকের আড়ালে। সরাসরি পুরুষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথাও বলতেন না। বলতেন কোনও পরিচারিকাকে মাধ্যম করে।

রোকেয়া (Begum Rokeya) জানতেন, সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে, বিশেষ করে মেয়ের স্বাধিকারের লড়াইকে উন্মুক্ত করতে গেলে, নারী-পুরুষের যুগবদ্ধ লড়াই দরকার। এটা যে কোনও একক লড়াই নয়, রোকেয়া তাঁর সমাজকর্ম, লেখালেখি সব কিছুর ভিতর দিয়েই তা প্রমাণ করে গিয়েছেন।

You might also like