Latest News

আজ আরডি বর্মণের জন্মদিন, কলকাতার ৩৬/১ সাউথ এন্ড পার্কে তাঁদের বাড়িটির কী দশা

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

হিন্দি সিনেমার গানকে বিশ্বায়ন করার পথিকৃত তিনি। মিউজিকে এমন এমন জিনিস ইন্ট্রোডিউস করেছেন, যা তখন কেউ ভাবতেও পারতেন না। তিনি রাহুল দেববর্মণ, সংক্ষেপে আর ডি বর্মণ। গানে যখন প্রথম সিন্থেসাইজার ব্যবহার করেন তখন অনেকেই তাঁর বিরোধী ছিলেন, অনেক সঙ্গীত পরিচালকও। আজকাল তো সিন্থেসাইজার খুব কমন গান রেকর্ডে।

একদিন আশা ভোঁসলেকে নিয়ে শপিংয়ে বেরিয়েছেন। তার পর চলে গেছেন লংড্রাইভে। শপিংয়ের কথা বেমালুম ভুলে গেছেন। আশা সে কথা মনে করানোর পর দুটো কাচের গ্লাস কিনে বাড়ি ফেরা। আর সেই কাচের গ্লাসে চামচ ঠুকেই জিনাত আমনের লিপে বিখ্যাত গান ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে জো দিলকো’-র মিউজিক কম্পোজ করে ফেলেন আর ডি।

এমন অজস্র ট্রেডমার্ক গানের স্রষ্টা রাহুলের বাবা জগদ্বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ সুরকার গায়ক শচীন দেববর্মণ এবং মা মীরা দাশগুপ্ত ছিলেন গীতিকার। ত্রিপুরার চন্দ্রবংশীয় মাণিক্য রাজপরিবারের সন্তান হলেও তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা কলকাতায়। পরবর্তীকালে, কাজের সূত্রে তিনি বসবাস শুরু করেন বম্বে শহরে। কিন্তু, মনেপ্রাণে ছিলেন একেবারেই কলকাত্তাইয়া।

জন্ম ২৭ জুন ১৯৩৯, কলকাতার হিন্দুস্থান পার্কের একটি বাড়িতে, যেখানে শচীন দেববর্মণ তাঁর পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকতেন। পরবর্তীকালে দেববর্মণ পরিবার চলে আসে সাউথ এন্ড পার্কের বাড়িতে। যে বাড়ির খোঁজ আমরা আর রাখি না। শচীন-রাহুলের স্মৃতিধন্য স্পর্শধন্য বাড়ি আজ পোড়োবাড়ি হয়ে পড়ে আছে খোদ কলকাতা শহরে।

ছেলেবেলা থেকেই মাউথ অর্গান বাজাতেন রাহুল দেববর্মণ। সঙ্গে শুরু করেন হারমোনিয়াম বাজানো। তখন কলকাতায় স্কুলে পড়েন, এক অনুষ্ঠানে সভাপতি হয়েছিলেন বাবা শচীন দেববর্মণ। সেই অনুষ্ঠানে রাহুল ওরফে পঞ্চম বাজিয়েছিলেন হারমোনিয়াম। পিতা শচীনকর্তা জানতে চেয়েছিলেন, ‘গানবাজনা করে কী করবে?’’ জবাবে রাহুল নাকি বলেছিলেন, ‘‘তোমার থেকে বড় মিউজিক ডিরেক্টর হব।’’

সেই শুনে শচীন দেববর্মণ ছেলেকে ব্রজেন বিশ্বাসের কাছে তবলা শেখার ব্যবস্থা করে দিলেন। আশিস খাঁর কাছ সরোদ। রবিশঙ্কর-আলি আকবর খাঁর সঙ্গও পেয়েছিলেন, যাতে রাগসঙ্গীতের বেসটাও পঞ্চমের তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

সত্যি একদিন শিখরে উঠেছিলেন পঞ্চম। একসময় আশির দশকে তো পুজোর গান মানেই ছিল আর ডি-আশার গান। ‘কিনে দে রেশমী চুড়ি’, ‘যেতে যেতে পথে হল দেরি’, ‘চোখে চোখে কথা বলো’, ‘যাব কী যাব না’, ‘সন্ধ্যাবেলায় তুমি আমি বসে আছি দুজনে’, ‘মনে পড়ে রুবি রায়’। বলিউড হিন্দি গান তো আছেই। ‘দম মারো দম’ থেকে ‘তেরে বিনা জিন্দেগি’, ‘রিমঝিম রিমঝিম’, ‘কুছ না কাহো’।

কিন্তু এত বড় সুরকারের জীবনের শুরুর পনেরো বছর যে বাড়িতে কেটেছে, সেই দক্ষিণ কলকাতার বাড়িটি একা পড়ে আছে। বম্বে পাড়ি দেবার আগে অবধি এই বাড়িতেই থাকতেন শচীন দেববর্মণ। এরপর বাবা-মা বম্বে চলে গেলে দিদিমার সঙ্গে অনেকটা সময় এই বাড়িতেই কাটান পঞ্চম। শচীন-মীরা বম্বে থেকে মাঝেমাঝে কলকাতায় এলে এই বাড়িতেই থাকতেন।

৩৬/১ সাউথ এন্ড পার্ক, কলকাতা-২৯। এই বাড়ির ঠিকানা। এখানেই কেটেছে পঞ্চমের শৈশব। বাড়ির সামনে দাঁড়ালে গায়ে কাঁটা দেয় আজও। আর বাড়ির সামনের ফলকে শচীন দেববর্মণ নাম দেখলেই বাড়িটির মাহাত্ম্য বোঝা যায়।

২০০৬ সালে এই বাড়িটি ‘Class IIB’-র হেরিটেজ তালিকাভুক্ত হয়। কিন্তু বাড়িটির সংস্কারের কোনও উদ্যোগই নেওয়া হয়নি এ যাবৎ। ফলে, খুব ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলেছে শচীন দেব এবং পঞ্চমের স্মৃতিধন্য বাড়ি। খোদ দক্ষিণ কলকাতায় ঢাকুরিয়ার কাছেই দাঁড়িয়ে আছে এমন স্বর্ণখচিত ইতিহাস। বাড়িটিকে উদ্ধার করে শচীন-পঞ্চম যাদুঘর তো করাই যায়?

যতদূর জানা যাচ্ছে, এককালে দূরদর্শন কেন্দ্রের স্টেশন ডিরেক্টর ছিলেন আর ডি-র মামা অভিজিৎ দাশগুপ্ত। তিনি পঞ্চমের খেলার সাথি ছিলেন এই বাড়িতেই। এ বাড়িতে তখন পারিবারিক ভোজ থেকে দোলে রংখেলা পরিবারের সবাই মিলেন করতেন। ত্রিপুরা আর বঙ্গের কালচার মিশে যেত এ বাড়িতে।

কিন্তু আজ সবটাই সোনালি অতীত। অভিজিৎবাবুই এই বাড়িটি সংস্কারে উদ্যোগী হন। চিঠি করেন ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল হেরিটেজ কমিশন’-এর দফতরে। বাড়িটিও পেয়েছে হেরিটেজ তকমা, সামনে রয়েছে ক্লাব ও রাজনৈতিক মহলের লাগানো ফলক, যাতে ইতিহাস লেখা বাড়িটির। কিন্তু বাড়ির ভিতরের সংস্কারকাজ কিছুই শুরু হয়নি। দোতলা বাড়িটি ইতিহাসের সাক্ষীরূপে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রথমে শচীন-মীরা বম্বে চলে গেলে রাহুল পনেরো বছর বয়স অবধি দিদিমার সঙ্গে এই বাড়িতেই থেকে পড়াশুনো করেন। এরপর চলে যান এরা বম্বে। শচীন দেব ভাড়া দেন এই বাড়ি দুই পরিবারকে। মুখুজ্জ্যে পরিবার দোতলায় আর এক দক্ষিণী পরিবার এক তলায়। বছর কয়েক পর এক অন্য একজন কেনেন বাড়িটি। যার ছেলেমেয়ে আমেরিকা নিবাসী। বাড়িমালিক রেজিস্ট্রেশনের দিনই মারা যান। এরপর তাঁর স্ত্রী আসতেন। তিনিও মারা যান।

স্বভাবতই বাড়িটি হাতবদল হয়েছে। কিন্তু তাঁরাও থাকেন না। মালিকানা এখন কাদের? বাড়িটি বর্তমানে একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীর হস্তগত রয়েছে শোনা যায়।আরও শোনা যায়, শচীন দেবের সাউথ এন্ড পার্কের এই বাড়িটি ত্রিশ বছর আগে বিয়েবাড়ির জন্য ভাড়া দেওয়া হত। এমনকি সিনেমার শ্যুটিংয়ের জন্য ভাড়া দেওয়া হত। তখন সেই কারণে রক্ষণাবেক্ষণ তবু হত। এখন দীর্ঘকাল একেবারেই বন্ধ। আর ডি ভক্তরা অবশ্য চেষ্টা করছেন বাড়িটিকে উদ্ধার করার। তাঁদের মতে, বিশাল চক্র রয়েছে এই বাড়ির পেছনে, যারা বাড়িটি আত্মসাৎ করতে চাইছে।

তবে সরকারের তরফ থেকেও উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই বাড়ির মালিকানা সংক্রান্ত তথ্য বের করতেই লেগে যায় এক বছর। হেরিটেজ কমিশন জানায়, ‘‘আমরা অনুরোধ পেয়েই বিশেষজ্ঞদের পাঠাই বাড়িটি পরিদর্শনে। সেখান থেকে ঘুরে এসে এক্সপার্ট কমিটি জানায়, এই বাড়িটির মালিকানার হাতবদল হয়েছে। সেই মালিক কে তা আমরা জানতে পারিনি গত একবছর যাবৎ। একটি ব্যক্তিসম্পত্তিকে তো যখনতখন নিয়ে নেওয়া যায় না। আমরা মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। যদি এই বাড়ির দুটো ঘরও শচীন ও রাহুল দেববর্মণ মিউজিয়াম করা যায় সে উদ্যোগ আমরা নেব।’’

ঢাকুরিয়া ব্রিজ আর লেকের পাশেই বিশাল বাড়িটির গোল বারান্দাটা দেখলে মনে হয় এখানেই বসে কত গান রচনা করেছেন শচীনকর্তা। উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, গুরু দত্ত, সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো লেজেন্ডরা এসেছেন, আড্ডা দিয়েছেন এই বাড়িতে। এই বারান্দায় কেটেছে পঞ্চমের কত শৈশব থেকে কিশোরবেলা, সঙ্গীতের রেওয়াজ। রাহুল চলে গিয়েছেন ১৯৯৪-এর জানুয়ারিতে। তবু তাঁর গান থেকে যাবে চির অমলিন। কিন্তু তাঁদের স্মৃতিজড়ানো বাড়িটি ধূলিসাৎ হলে শেষ হবে এসডি-আরডি বর্মণের পরিবারের সঙ্গে কলকাতার শেষ সংযোগ!

You might also like