সভা-কাণ্ড

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    ঋতা বসু

    স্কুলে যাবার আগে লেখার টেবলে বসে অভ্যেসমতো কম্পিউটারের চাবি টেপাটেপি করছিল অমলকুমার। তার আসল নাম অজয়। অমল নামের প্রতি তার দুর্বলতা ছোটবেলা থেকেই। ক্লাসের ফার্স্টবয় ছিল অমলকুমার। কী জানি কেন তার মনে হত ফার্স্ট হওয়ার সঙ্গে অমল নামের একটা অদৃশ্য যোগ আছে। চোরা মনোকষ্ট নিয়েই সে বয়ে চলেছিল তার অজয় নামটা। অনেকদিন পর প্রথম লেখাটি একটা নামী পত্রিকায় পাঠাবার সময়ে সে প্রথম সুযোগেই ছদ্মনাম নিল ‘অমলকুমার’। অজয়ের থেকে অমল কোন অংশে উন্নত, এটা অন্য কেউ না বুঝলেও সেই দৈব নামের জোরে নামী পত্রিকায় মনোনীত হয়েছিল তার লেখা। তারপর থেকেই সে অমলকুমার। দিনে দিনে আরও অমল হবার সাধনা তারপর থেকেই।
    পাড়াতুতো দাদা মন্টাদা ঘরে ঢুকেই কোনও গৌরচন্দ্রিকা ছাড়া পিঠে চাপড় মেরে বলল– ‘তোর জন্য জ্যাকপট নিউজ। আমার শালির গ্রাম বেলতোড়ে প্রধানের ছেলের দোকান উদ্বোধন। তুই প্রধান অতিথি। এই শর্মা সাজেস্ট করেছে। প্রধান সিলমোহর দিয়েছে। এইমাত্র খবর এল। তোকে আগে বলিনি। আরও দুটো ক্যান্ডিডেট ছিল। সব ক’টাকে লেঙ্গি মেরে তোকে ঢোকাতে হয়েছে।’ অমল চিঁ-চিঁ করে বলে– ‘প্রধানের ছেলে যখন পুরপিতা-মাতাদের ধরো না।’
    –‘সে তোর আগেই ভাবা হয়ে গেছে। যেগুলোকে অ্যাপ্রোচ করা যেত তার মধ্যে একটা তোতলা আর একটা টাকা চায়। তখনই তোর কথা মাথায় এল– খাতা কাগজ কলমের দোকান যখন, লেখক হলেই ভাল। তোরও ভাল ওদেরও ভাল। হ্যাঁ মনে করে তোর ক’টা বইও নিয়ে যাস। একপাশে রাখতেও পারে। কাল সকাল সকাল খেয়ে নিয়ে তৈরি থাকিস। দূরের পথ।’
    মন্টাদা বিদায় নিলে দু-একটা দরকারি জিনিস গুছিয়ে নিয়ে অমলকুমারও বেরিয়ে পড়ল। শনি রবি যুতসই কারণসহ কোথাও একটা কাটিয়ে সোমবার স্কুল করে যখন ফিরবে প্রধানের ছেলের দোকান উদ্বোধন শেষে জোরকদমে দৌড়চ্ছে।

    লেখকদের বড় প্রিয় পদ প্রধান অতিথি ও তীর্থভূমি সভাস্থলের প্রতি অমলকুমারের বিরাগের কারণ জানতে হলে পেছতে হবে কয়েকটা বছর। সেবারও এইরকম সকালবেলাটাতেই হেঁহেঁ করে দু’জন হাজির ভায়া ভায়া হয়ে। হাওড়া থেকে বিশ-পঁচিশ মাইল ভেতরে নিমপীঠ গ্রামে তাদের স্কুলের একশো বছর পূর্তি উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী উৎসব শেষে মনে পড়েছে, সব হয়েছে কিন্তু একজন লেখক মিসিং।
    –‘শেষবেলায় বুঝতেই তো পারছেন– মেগাস্টাররা সব রবীন্দ্রজয়ন্তী নিয়ে ব্যস্ত। আপনি আমাদের বিমুখ করবেন না জেনেই পাঠাল।’
    আহা কী বিপদ– এরা আবার বিমুখ-টিমুখ ভাবছে নাকি? অমলকুমার তো এখনই মনে মনে বক্তৃতাটা মুসাবিদা করতে শুরু করে দিয়েছে। যথেষ্ট গাম্ভীর্যের সঙ্গে বিনীত ভাব ফুটিয়ে সে জানাল, যদিও ব্যস্ততা তারও কিছু কম নেই তবু দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যাপার যখন, সে অবশ্যই উপস্থিত থাকবে।
    –‘তাহলে স্যার আর একটু কষ্ট করুন– এই আমাদের ঠিকানা। খুঁজে পেতে কোনও কষ্ট হবে না। দশ গাঁয়ের লোক চেনে– অক্ষুণ্ণ আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়। একটা গাড়ি ভাড়া করে চলে যাবেন। আমাদের সামর্থ্য কম, তবে ভাড়াটা আমরা ওখানেই হাতে হাতে মিটিয়ে দোব আর সামান্য সম্মাননা।’
    সম্মাননাটা কী বস্তু প্রথম প্রধান অতিথি হতে যাওয়া অমলকুমার জানত না, তবে সাম্মানিকের থেকে দরে ছোট নয় নিশ্চয়ই।

    নির্দিষ্ট দিনে দুরুদুরু বুকে তখন পর্যন্ত প্রকাশিত সবেধন নীলমনি বইটি ঝোলায় নিয়ে অক্ষুণ্ণ আদর্শের সঙ্গে মিলিয়ে ভাবগম্ভীর বক্তৃতা মুখস্থ করে বউয়ের কাছ থেকে গাড়ির অগ্রিম টাকাটা কেঁদে-কঁকিয়ে আদায় করে অমলকুমার রওনা দিল। নিমপীঠের এক কিলোমিটার দূর থেকেই তোরণ আর লাউডস্পিকারে অনুষ্ঠানের ঘোষণা। প্রধান অতিথি হবার শুরুয়াতটা ভারী চমৎকার। হঠাৎ মাইকে নিজের নাম শুনে অমলকুমার শিহরিত– ‘এখনই আমাদের মধ্যে এসে পৌঁছবেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক অমলকুমার… আপনারা তাঁর অভ্যর্থনার জন্য প্রস্তুত হন।’ খানিকটা বাদে গলা খেলিয়ে আরও একটু নাটকীয় ভাবে– ‘বাংলা সাহিত্য-বৃক্ষের ডাল যাঁর দানে ভগ্নপ্রায়–।’ এবার অমলকুমার একটু নড়েচড়ে বসে। মাইকের ঘড়ঘড় আওয়াজে বাকি কথা অশ্রুত।
    কী একটা যান্ত্রিক গোলযোগে ঘোষণা বন্ধ থাকে খানিকক্ষণ। ইতিমধ্যে গাড়ি বিদ্যালয় চত্বরে পৌঁছে গেছে। প্রচুর লোক। এত সাহিত্যপ্রেমী মানুষ সবাই এসেছে, সভা উজ্জ্বল করে বসে আছে– এটা যদি বউকে একবার দেখানো যেত।

    সবাই প্রচণ্ড ব্যস্ত। মাইকে অত হেঁকে যখন বলছে অফিশিয়াল অভ্যর্থনাটা বোধহয় পরে হবে। আপাতত উদ্যোক্তাদের দু’জন তাকে পেছন দিকে একটা ঘরে বসিয়ে দিয়ে বলল– ‘স্যার একটু রেস্ট নিন। চা-টা খান। এখনই আসছি। পাঁচমিনিট সময় দিন।’
    ঘরের মধ্যে সাজগোজ করা কয়েকটি মেয়ে তাদের মেকআপে শেষটান দিচ্ছে। সেদিকে অমলকুমারের সন্দিগ্ধ দৃষ্টি লক্ষ্য করে বিগলিত উদ্যোক্তা বলল– ‘আপনাকে বসাবার মত এই ঘরটাই খালি আছে। কোনও অসুবিধে হবে না। এই তোরা স্যারকে বিরক্ত করবি না।’
    মেয়েগুলির উদাস দৃষ্টি ঘুরে যায় অমলকুমারের ওপর দিয়ে, যেন সেটা ঘরের বাড়তি একটা ফার্নিচার। অমলকুমারের চোখ বাইরে থাকলেও টের পেল একজন বুকের আঁচল ফেলে পিন লাগিয়ে ঢিলে ব্লাউজ মাপসই করল। কয়েকজন শাড়ির আঁচলের ঝুল মনমতো করল। দলের সকলেই তো আর ল্যাপাপোছা নয়। কারও কারও শরীরে কিশোরীবেলাতেও বেশ উঁচুনীচু টক্কর। তখনও প্রায় যুবক অমলকুমারকে কেউ ধর্তব্যের মধ্যেই ধরছে না। সেদিনের বুকের কুট করে কামড়টা এখনও টাটকা।

    পাঁচমিনিটের চা আধঘণ্টাতেও এল না। মেয়েরা উত্তেজিত আসন্ন নৃত্যনাট্য নিয়ে। তাদের প্রিয়মানুষদের প্রতিক্রিয়া কল্পনায় তারা একটু নার্ভাসও বটে। চোখ সরালেও অমলকুমারের কান তো খোলা।
    প্রধান অতিথি নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই।
    জানালা দিয়ে বাইরের কর্মকাণ্ডের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যান্ত্রিক ত্রুটি সারিয়ে মাইক এবং অমায়িক সঞ্চালক আবার স্বমহিমায়। তার অনর্গল বাক্যস্রোতের থেকে অমলকুমার জানতে পারল, সে ছাড়া আরও তিনজন প্রধান অতিথি, দু’জন উদ্বোধক, একজন আহ্বায়ক, পাঁচজন শুভার্থী মঞ্চে উপস্থিত থাকবেন। তাদের পরিচয়, সমাজে অবদান সব শোনা হয়ে গেল। বলাবাহুল্য, তার মধ্যে সেও আছে এবং একমাত্র বহিরাগত বলে যে বিশেষ সম্মানের অধিকারী, সেটাও নিমপীঠের সমাজ যেন ভুলে না যায় সেটা বিশেষ করে মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
    এতদসত্ত্বেও অমলকুমার অধৈর্য ছুটন্ত একজনকে জিজ্ঞেস করল, ‘শুরু কখন হবে?’
    –‘সভাপতি এলেই।’
    –‘তিনি কখন আসবেন?’
    –‘কাজের মানুষ। ফুরসত পেলেই আসবেন।’
    এই সময়ে সঞ্চালকটিকে এদিকে আসতে দেখে মেয়েদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হল। মেয়েদের প্রতি সযত্নলালিত উদাসীনতা নিয়ে ভঙ্গিতে বেজায় ওজন চড়িয়ে সঞ্চালকটি অমলকুমারের কাছে এসে বলল– ‘আপনার বইগুলো সম্বন্ধে দু’চার কথা বলে দিন। জায়গামতো গুঁজে দেব।’
    অমলকুমার সবে শুরু করেছে, বাইরে ‘এসেছে এসেছে’ ধ্বনি। মালগাড়ির কয়লা কারবারি থেকে এলাকার কয়লা-সম্রাট নুটু দত্তের গাড়ি একেবারে সভাস্থলের কাছে এসে ব্রেক কষল। ধবধবে গাড়ি থেকে ধবধবে সাদা পোশাকের নুটু দত্ত বাতাসের মতো ফুরফুরে রুমাল দিয়ে ঘাড়-গলা মুছতে মুছতে স্টেজে উঠলেন। মঞ্চে চেয়ারের ভিড় দেখে উদ্যোক্তাদের একজনকে কোনওরকমে অমলকুমার বলতে পারল– ‘আমাকে বহুদূর যেতে হবে, যদি আগে ছেড়ে দেন তো–।’
    শেষ করার আগেই উদ্যোক্তা তাকে থামিয়ে দেয়– ‘দাঁড়ান, লাইনমতো হবে সব। গাড়ি আছে তো, চিন্তা কী?’

    ঘণ্টা হিসেবে মিটার চড়ছে। অমলকুমার দুশ্চিন্তা চেপে নিজের বক্তৃতা ঝালাতে থাকে। ততক্ষণে স্টেজে ভয়ানক গোলমাল। আহ্বায়ক প্রদীপ জ্বালানোর জন্য উঠতি দলের নেতাকে আগে ডেকেছে। সেই জন্য পড়তি দলের নেতা মাইক টেনে এই স্কুলে তিনি এবং তার দলের অবদান বর্ণনা শুরু করলেন। ‘এই স্কুলে যখন টিনের চাল মাটির মেঝে– তখন কোথায় ছিল এরা? কারা বানাল এই আলিশান বাড়ি?’ তার উত্তরে উঠতি দল জানাল– হাম কিসিসে কম নেহি। সেই কবে ঘি খাওয়ার চোঁয়া ঢেকুর তুলে কী লাভ? আগামী নির্বাচনের পর তাদের কী কী কর্মসূচি এটা একবার কান খুলে শুনে নেওয়া হোক।
    দু’দলই জ্বালাময়ী ভাষায় জানপ্রাণ কবুল করে তাদের সমর্থকদের তৈরি থাকতে বলছে। বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী। চাপানউতোরে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ। সেই সভাতে পরবর্তীকালের টিভির সান্ধ্য খেউড়ের রকটা মহড়া দেখেছিল অমলকুমার।
    সঞ্চালকটির বিশেষ প্রেম আছে তার নিজস্ব কন্ঠস্বরটির প্রতি। এত গোলমালের মধ্যেও মাইকটি সে হাতছাড়া করেনি। সমাজ তথা নিমপীঠ তথা অক্ষুণ্ণ আদর্শ বিদ্যালয়ে শিক্ষা, সাহিত্য ও কয়লা যে কত জরুরি, তা সোডার মত ভসভসিয়ে উঠে আসছে তার পেট থেকে।
    অমলকুমার বড় আদরের প্রধান অতিথির চেয়ার ত্যাগ করে স্টেজ থেকে নেমে এল। কেউ লক্ষ্যই করল না। স্টেজের নীচেই একটা উদ্বিগ্ন জটলা। অমলকুমার একটা চেনা মুখকে বলল– ‘গাড়িভাড়াটা দিয়ে দিলে রওনা হয়ে যাই।’ সে প্রায় মুখ খিঁচিয়ে উঠল– ‘দেখছেন কীরকম গোলমাল। এখনই হাতাহাতি শুরু হবে। তখন আর এলাকা ছেড়ে বেরোতেই পারবেন না। ভাল চান তো এই বেলা কেটে পড়ুন।’
    ভাগ্য ভাল ড্রাইভারটি গাড়ির কাছেই দাঁড়িয়েছিল। গাড়ি ছাড়ার আগের মুহূর্তে একটা ছেলে দৌড়ে এসে একটা ঠোঙা কোনওরকমে গাড়ির জানালা গলিয়ে সিটের ওপর ফেলে দিল– প্রধান অতিথির অলংকার জীবনের প্রথম উত্তরীয় আর কাচের ঘেরাটোপে সোনালি ফলক।

    গাড়ির বাকি টাকাটার জন্য বউ শুধু গায়ে হাত তোলাটা বাকি রেখেছিল। সে দুঃখের কথা অমলকুমার আর মনে করতে চায় না।
    ঠোঙার ভেতর থেকে দেড় হাত কাপড়ের টুকরোটা বার করে বউ ঠোঁট উলটে বলল– ‘এঃ উত্তরীয়– দু’দিনের বৈরাগী ভাত রে কয় অন্ন। এর থেকে গামছা দিলে পারত। সেটা তবু কাজে লাগত।’
    সাম্মানিক আর সম্মাননার তফাতটা মুহূর্তের মধ্যেই পরিষ্কার।
    পরদিন সকালে আশ্চর্যভাবে পরিস্থিতি বদলে গেল। বউ হাসিমুখে চায়ের কাপ নিয়ে এসে বলল– ‘এত হাবিজাবিতে টেবিল বোঝাই থাকে যে, চায়ের কাপ রাখাই যেত না। একটা মাপসই ট্রে কবে থেকে খুঁজছি। দেখো–।’
    বউয়ের মুখে সোনালি হাসি। হাতে সোনালি ধাতুর গোল ট্রেতে বসানো সোনা রঙের চা। কাচের ঘেরাটোপ থেকে মুক্তি পেয়েছে বলে মাঝখানে লেখাটা জ্বলজ্বল করছে– সম্মাননা অমলকুমার।

    চিত্রকর: মৃণাল শীল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More