নীলুর জন্যে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রাজেশ কুমার

    সূর্য নিভতেই মানিকের মনে পড়েছিল, আজ ছেলেটার জন্মদিন। যেমন-তেমন নয়, ঠিক পাঁচবছর পূর্ণ করল নীলু, তার একমাত্র সন্তান। শেষ ট্রিপের প্যাসেঞ্জার নামিয়ে সে বড় রাস্তায় অটো সাইড করে। তারপর সোজা নেমে আসে পতিরামের হাটে। মাটির তৈরি ছোটছোট চাতাল, চারপাশে চারটে বাঁশের খুঁটি। মাথায় পলিথিনের ছাউনি। তারই মাঝে কেরোসিনের কুপি জ্বালিয়ে পসার সাজিয়ে পরপর বসেছে পসারিরা।

    শীতের রাত। এখন আটটা। পতিরামের হাট এখানকার সবচাইতে বড় হাট। দূরদূরান্তের গ্রাম থেকে মানুষ জড়ো হয়। লোকজনের ভিড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে না ঠান্ডা। অন্য দিন হলে মামুলি আলু পেঁয়াজ সরষের তেল কিনে বাড়ি ফিরত মানিক। কিন্তু আজ আর ইচ্ছা করল না। বাইরে ঠান্ডাটাও পড়েছে জমিয়ে। ইতস্তত ঘোরাঘুরি না করে সে হাঁটা লাগাল সোজা মাংসের দোকানের দিকে। হাটের পশ্চিম প্রান্তে ছাগল কাটার দুটো দোকান। এখন হাট ভাঙার মুখে। সস্তায় ঝড়তি-পড়তি কিছু জুটে গেলেও যেতে পারে। কিন্তু মাংসের দোকান অবধি যেতে হল না মানিককে। হঠাৎ দেখা হয়ে গেল বগার সঙ্গে।
    –আরে ওস্তাদ চললে কোথায়! সাইডে এসো।

    বগা তাকে টানতে টানতে হাটের একধারে নিয়ে গেল। তারপর খানিক ঝুঁকে এসে বলল, বড় মাল আছে। আজই চালান যাবে, পুরো একঝুড়ি। একটা নিয়ে যাও, ওস্তাদ। রাতে বউবাচ্চা নিয়ে ভোজ খাবে। দেখবে কাল সকালেও হেঁটে বেড়াচ্ছে দিব্বি, হাঁটি হাঁটি পা পা। কথা শেষ করে রসিকতার ছলে হাসে সে। বগার কথা শুনে চোখ চকচক করে ওঠে মানিকের। জিভে জল চলে আসে। আহা, কতদিন ভোজ খাওয়া হয়নি। তার মনে পড়ে যায়, আজ ভোরেই একটা একস্ট্রা ট্রিপ মেরেছে সে। কিন্তু ওই ক’টা টাকায় আর কী-ই বা হবে! ছোট কাছিম হলে তবু একটা কথা ছিল। বড় মানে, প্রায় হাজার-দুয়েক পড়বে। মাথার ফুরিয়ে আসা চুলে হাত বোলাতে থাকে সে। বগা বলে, ও সব দাম নিয়ে ভেবো না, ওস্তাদ। যা পারো দিয়ো। তোমার কাছে হাতেখড়ি। গুরুদক্ষিণা বাবদ কিছু তো দেনা থাকে নাকি!

    মানিক কী বলবে ভেবে পায় না। রুটে অটো চালানোর আগে সে লরির ড্রাইভারি করত। বড় বড় ট্রাক ভর্তি ফল, সবজি নিয়ে পাড়ি দিত দেশ-দেশান্তর। হিলি বর্ডার পেরিয়ে বাংলাদেশ, মায়ানমার। রাস্তায় রাস্তায় তার কেটে যেত আট-দশদিন। বগা ছিল তার সেই সময়ের সঙ্গী, খালাসি। শাগরেদও বলা যেতে পারে। মানিকই তাকে নিয়ে এসেছিল এই লাইনে। ছেলেটার মধ্যে বেশ একটা হম্বিতম্বি ছিল। লড়ে যেতে পারত। ভাল লেগে গেছিল মানিকের। গাড়ি থামলে রান্না করা, খাওয়ার জল যোগাড় করা, এমনকি হাত-পা টিপে দেওয়ার কাজও করে দিত বগা। এছাড়া ছোটখাট ফাইফরমাশ তো ছিলই। বিনিময়ে একটু-আধটু সুখদুঃখের গল্প করা, বোতলের ভাগ দেওয়া, স্টিয়ারিং চালানো শেখাত মানিক। আর-পাঁচটা ড্রাইভার যেভাবে তাদের খালাসিকে শেখায় আর কী। কিন্তু সে-সব অনেকদিনের কথা। তার জন্য বগার সামনে হাত পাততে সংকোচ হয় মানিকের। বগা নিজেই এখন লরি ড্রাইভার। সে শোনে না। বস্তায় মুড়ে কায়দা করে আস্ত একটা জ্যান্ত কচ্ছপ ধরিয়ে দেয় মানিকের হাতে। বলে, দরকার হলে পরে দাম মিটিয়ে দিয়ো।

    এরপর আর কথা চলে না। মানিক বস্তা নিয়ে সাবধানে অটোয় গিয়ে ওঠে। বস্তার মধ্যে নড়াচড়া করে কচ্ছপ। টের পায় মানিক। এদিকে পুলিশের তেমন বাড়বাড়ন্ত নেই। তবুও নিজের সাবধানতা নিজের কাছে। যাইহোক, নীচু হয়ে অটোয় স্টার্ট দেয় সে। ফাটা সাইলেন্সার পাইপের ফ্যাটফ্যাট শব্দে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে এগিয়ে চলে তার অটো।

    পতিরামের হাট থেকে মানিকের বাড়ি প্রায় আধা ঘণ্টার রাস্তা। পৌঁছেই হাঁড়ি করে গরমজলে ছেড়ে দিতে হবে মালটাকে। তারপর খোল ছাড়ানো, বঁটিতে কাটা। বউ ঝুম্পির দ্বারা এসব হবে না। সে শহরের মেয়ে। গ্রামের মেয়েদের মত কাজকর্মে পটু নয়। তা ছাড়া ঝুটঝামেলার কাজ সে একটু এড়িয়ে চলতেই পছন্দ করে, লক্ষ্য করে দেখেছে মানিক। তবে এ-সব নিয়ে তার দুঃখ নেই। তার দুঃখ একটাই, ছেলেটা আর-পাঁচটা বাচ্চার মত সুস্থ-স্বাভাবিক হল না। কেমন যেন একগুঁয়ে জন্তু প্রকৃতির। কথা বলে না। মুখ দিয়ে শুধু আওয়াজ করে গোঁ-গোঁ। মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে। সব সময় একটা অস্থিরভাব। স্থির হয়ে বসে না কোনওখানে। ডাক্তার বলেছে, কী-একটা অসুখ। সারবে না। একটু বড় হলেই পালিয়ে যেতে চাইবে ঘর থেকে। তখন চেন-তালা দিয়ে বেঁধে রাখতে হবে। যদিও ঝুম্পি এখনই বেঁধে রাখে মাঝেমধ্যে। জিগ্যেস করলে বলে, অভ্যাস করছি। আমাকেই তো পায়ে বেড় দিতে হবে। ও তো আর এমনিতে থাকবে না। আসলে, নীলুর অস্থিরতার সঙ্গে পেরে ওঠে না বউটা। ছেলেটা বড্ড এদিক-সেদিক দৌড়োদৌড়ি করে। হাঁপিয়ে উঠলে ঝুম্পি মাঝেমাঝে শাপশাপান্ত করে মানিককেও। শালা হারামি, পেটের মধ্যে বাচ্চা দিল দেখো। এর থেকে বাঁজা থাকা ভাল। মানিক ভাবে, ভগবানের মার। সে সামান্য মানুষ। এতে তার কী হাত! কিন্তু পাড়ার বউরা অন্য কথা বলে। বলে, বুড়ো বয়সের ছেলে, এমন হবে না তো কেমন হবে! মানিকের এখন আটচল্লিশ। ঝুম্পির তিরিশ। মানিকের খারাপ লাগে ঝুম্পির কথা ভেবে। কম বয়সে শুধু শুধু একটা কষ্টের মধ্যে জড়িয়ে গেল মেয়েটা। ইস্, আগে যদি টের পেত সে! পরক্ষণেই ভাবে, টের পেলেই বা আর কী করার ছিল তার।

    লরি চালানোর সময় প্রায়ই উপরি কিছু জুটত। লোডিং, আনলোডিংয়ে ধুনচুন করে। সেই জমিয়েই কোনওমতে দাওয়া সমেত একচালা ঘর একখানা দাঁড় করিয়েছে সে। সঙ্গে পায়খানা, বাথরুম। আর সামনে খানিক উঠোন। বিয়ের পর প্রথম কিছুদিন যখন সে ট্রিপ মেরে ফিরত, নতুন বউয়ের জন্য ঝোলাভরে নিয়ে আসত আপেল, বেদানা। সবই ওই উপরির টাকায়। বাদ সাধল নীলু। সে পেটে আসার পরই ঝুম্পি বলেছিল, এত এত রাত একা থাকতে হয়, ভয় করে আমার। বাধ্য হয়েই ও লাইন ছাড়ল মানিক। ব্যাংক লোনের টাকায় নামাল অটো। বন্ধ হল উপরি। বন্ধ হল আপেল, বেদানা, রোজকার যা কিছু এক্সট্রা সব। এসব কথা ভাবলেই বুকের মধ্যেটা কেমন করে ওঠে মানিকের। মনে হয়, একখানা বড় লরি নিয়ে সে ঢুকে পড়েছে অচেনা কোনও কানাগলিতে। কিছুতেই কাটিয়ে বেরিয়ে আসতে পারছে না আর।

    ভয় কাটাতে একটা বিড়ি ধরায় সে। ফুৎকারে উড়িয়ে দেয় সমস্ত চিন্তাভাবনা, তার অটোর ওই সাইলেন্সার পাইপের মতই। বাড়ি ঢোকার আগে চেনা ঠেক থেকে বাংলা মদের একটা পাঁইট নিয়ে নিতে ভোলে না। অনেকদিন পরে আজ সে জমিয়ে বসবে। একেবারে রাজার মত।

    উঠোনের একপাশে অটো দাঁড় করায় মানিক। বস্তার মুখ খুলে কচ্ছপ ছেড়ে দেয় দাওয়ায়। টিলার মতো পিঠ নিয়ে প্রাণীটা নড়াচড়া করে মেঝেয়। মানিক তাকিয়ে থাকে তার দিকে। ভারি আহ্লাদ হয় মানিকের। সে চেঁচিয়ে ডাকে ঝুম্পিকে।
    –বউ, দরজা খোল। দেখ কী এনেছি। ঝুম্পি দরজা খুলে দাওয়ায় আসে। চমকে ওঠে কচ্ছপ দেখে। বলে, ও মা, এটা কী হবে! কচ্ছপ কখনও ঘরে থাকে! ও তো সুযোগ পেলেই পালিয়ে যাবে। মানিক হাসে, পালাবে না রে পাগলা। আজ নীলুর জন্মদিন। আজ তোদের নিজেহাতে রেঁধে কচ্ছপের মাংস খাওয়াব। একবার খেলে দেখবি আর এ জীবনে ভুলবি না। ঝুম্পি আঁতকে ওঠে। একবার প্রাণীটার দিকে তাকায়। আর একবার মানিকের মুখের দিকে। তার চোখমুখ কঠিন হয়ে ওঠে। বলে, তুমি মানুষ, না কি অন্য কিছু! এ-সবের মধ্যে আমি নেই। সংসারে মঙ্গল-অমঙ্গল বলে একটা বিষয় আছে। তা ছাড়া রাত অনেক হয়েছে। আমার রান্না হয়ে গেছে। তোমার খেতে হয়, বাইরে বসে খাও। ওদের কথার মাঝে দরজা ঠেলে বেরিয়ে আসে নীলু। কচ্ছপ দেখে মুখ দিয়ে আওয়াজ করে গোঁ-গোঁ। ধরতে যায় ওটাকে। ঝুম্পি টেনে সরিয়ে নেয় নীলুকে। দরজা বন্ধ করে দেয় ঘরের। ভেতর থেকে নীলুর গোঁ-গোঁ গোঙানির শব্দ ভেসে আসে তখনও।

    যত সব সতীপনা। হঠাৎ-ই রোক চেপে যায় মানিকের। সে একাই রাঁধা-বাড়ার ব্যবস্থা করে। ঝুড়ি থেকে বের করে আনে আলু, পেঁয়াজ। উঠোনের একপাশে মাটির উনুনে আগুন জ্বালায় কাঠের। বড় একটা হাঁড়িতে জল গরম বসায়। ঝুম্পি নিজের মত খাওয়া সেরে খিল এঁটে দেয় ঘরের। তারও অনেক পরে রান্না শেষ হয় মানিকের। দাওয়ায় বসে স্টিলের গ্লাসে বাংলা ঢেলে চুটিয়ে খায় সে। শীতের মৌতাত নেয়। গান ধরে প্রাণের স্ফূর্তিতে। না না না আজ রাতে আর যাত্রা শুনতে যাব না। তারপর বেশ খানিকটা খাবার ফেলে ছড়িয়ে রেখে হঠাৎ ভাবে শুতে যাওয়ার কথা। টলমল পায়ে উঠে দাঁড়ায় মানিক। ঝুম্পি আধোঘুমে দরজা খোলে। ভেতরে মুড়ি দিয়ে শুয়ে নীলু। শান্ত, গভীর ঘুমের দেশে। ঠিক আর-পাঁচটা শিশুর মতই। ঝুম্পির হাত ধরতে যায় মানিক। ঝুম্পি ঝটকা মেরে সরিয়ে দেয় তার সেই হাত।

    বিছানায় ঘুম আসে না মানিকের। এধার-ওধার ছটফট করতে থাকে। শীতের রাত আরও গভীর হলে বিছানা ছেড়ে দাওয়ায় আসে সে। গুটিসুটি মেরে বসে। বাইরে কুয়াশা, ভিজেমাটির সোঁদা গন্ধ। কুয়াশার মধ্যে ঝিরঝিরে চাঁদের আলো। সেই আলোয় মানিক দেখে, কচ্ছপটার সঙ্গে উঠোনে খেলে বেরাচ্ছে নীলু। গোল গোল ঘুরছে প্রাণীটার চারপাশে। প্রাণীটাও টিলার মতো উঁচু কালচে সবুজ পিঠের মধ্যে থেকে বের করে দিচ্ছে তার লম্বা গলা। তাকিয়ে থাকছে নীলুর দিকে। নীলু কথা বলছে ওটার সঙ্গে। হেসে লুটিয়ে পড়ছে মাটিতে। মানিক তাকিয়ে থাকে নির্বাক। মনে মনে ভাবে, সময়-সুযোগ হলে বগার থেকে আর একটা কচ্ছপ নেবে সে। শুধুমাত্র নীলুর জন্যে।

    চিত্রকর: মৃণাল শীল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More