মন্থন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    উজ্জ্বল রায়

    মাঝরাতে ওয়াক তোলার শব্দে ঘুম ভেঙে যায় ক্ষমার। তাকিয়ে দেখে মা পাশে নেই। মশারি তুলে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখে, মা উঠোনে উবু হয়ে বসে নালির ধারে বমি করছে। বাথরুম অবধি যাওয়ার আর ওনার তর সয়নি…। দেখেই মাথায় রাগ চড়ে গেছিল ক্ষমার। ‘তখনই বলেছিলাম মা, দু’পিস মাছ খেয়ো না, খেয়ো না। পাকা মাছ। তখন কে কার কথা শোনে! নোলা উপচে পড়ছিল। কত মোটা আর চওড়া দুটো পেটির মাছ, থকথক করছে চর্বি। আমারই বলে খেতে ভয় করছিল আর তুমি…, ডাক্তারবাবু বারণ করেছে না তোমায় পাকা মাছ খেতে? খাবার সময় সেকথা খেয়াল থাকে না? খাবার দেখলে নিজের রোগের কথা ভুলে যাও। নিজে ভোগে, সঙ্গে আমাকে ভোগাও। আমার বুঝি ঘরে বসে থাকলে চলবে, কাজ নেই আমার?’ গজগজ করতে করতে ক্ষমা মায়ের পিঠে চেপে চেপে মালিশ করে দেয় কিছুক্ষণ। তারপর চৌবাচ্চা থেকে বালতি করে জল এনে উঠোন ধোয়। কলসি থেকে জল গড়িয়ে দেয় গেলাসে। তারপর ঘরে এসে লাইট জ্বেলে ঘড়িতে দেখে, পৌনে তিনটে। সেই থেকে ক্ষমা জেগে।
    চিৎ হয়ে শুয়ে ছাতের দিকে তাকিয়ে ক্ষমা আবোল-তাবোল কত কী ভাবে! কাল নেমন্তন্ন বাড়ি যাওয়ার মোটেই ইচ্ছে ছিল না তার। মাকে বলেওছিল সেকথা, ‘এমন কিছু কাছের আত্মীয় নয় সজলদারা যে, না গেলেই নয়। যাওয়া মানে তো এখন একগাদা খরচ। আজকের দিনে একটা রুচিমতো শাড়ি দিতে গেলেও সাড়ে তিনশো-চারশোর নীচে ছোঁয়া যায় না। আমার হাত এখন খালি মা। বারবার আমার মাসিমার কাছে হাত পাততে ভাল লাগে না।’ মা সেকথা শুনলে তো! বলেছিল, ‘বিপদের দিনে সজলরাই তো একমাত্র আমাদের পাশে ছিল রে ক্ষমা। তোর বাবা যখন ম’ল, তখন কোন আত্মীয়রা এসেছিল আমাদের বাড়িতে বল?’

    সেই কবেকার কথা! বাবা আজ মরেছে? সেইসব কথা মা আজও পুষে রাখে মনে। এখন শুয়ে থাকতে থাকতে ক্ষমার মনে হল, আসলে মায়ের ওইসব কথার আড়ালে ছিল স্রেফ নোলা। নেমন্তন্ন বাড়িতে ভাল-মন্দ খেতে পাবে, তাই। বড্ড অবুঝ মা। ক্ষমা পাশ ফিরে শোয়।
    মায়ের পেটে যে কী হল, কে জানে! থেকে থেকে পেটে ব্যথা। খাওয়ার পরে বেশি বাড়ে। গ্যাসের বড়ি খেয়েও কমে না। ডাক্তার ঘোষালের কাছে নিয়ে গেছিল ক্ষমা। তিনি অনেকক্ষণ ধরে মায়ের পেট-ফেট টিপে গম্ভীর মুখ করে বলেছিলেন, ‘পেটের একটা ফটো করাও মায়ের। আমার খুব একটা ভাল মনে হচ্ছে না। পাথর-টাথর হতে পারে।’
    ক্ষমা কাঁচুমাচু মুখ করে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘ফটো করতে কত খরচ পড়বে ডাক্তারবাবু?’
    ডাক্তার ঘোষাল প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে জানিয়েছিলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে গেলে কোনও পয়সা লাগবে না। তবে ইউএসজি কবে হবে সে আমি বলতে পারবে না। দু’মাসও লাগতে পারে, আবার পাঁচ মাসও। লাইনের ওপর ডিপেন্ড করছে।’
    ‘আর প্রাইভেটে করালে?’ ক্ষমা মিনমিন করে জিজ্ঞেস করেছিল।
    ‘সেও এক এক জায়গায় এক এক রকম। তবে তিনশো-চারশো টাকার নীচে নয় কোথাও।’
    সেদিন ক্ষমা ডাক্তারের চেম্বারে বসেই ভেবে নিয়েছিল, মাসিমাকে গিয়ে বলবে একবার কথাটা। ওঁর কাছে তিন-চারশো টাকা কিছু না। ঠিকমতো চাইলে নিশ্চয়ই দেবেন। অনেক বড় ‘রিদয়’ মাসিমার।
    শেষে মাসিমার টাকাতেই ইউএসজিটা করিয়েছিল ক্ষমা। প্রাইভেটে। ডাক্তারবাবু সেই ছবি দেখে বলেছেন, ‘পাথর নয়, টিউমার। সরকারি কোনও হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ভাল করে মায়ের চেকআপ করাও। ফেলে রেখো না। আমার ভাল ঠেকছে না। বললে আমি ঠাকুরপুকুরে চিঠি লিখে দেব’খন। তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। খরচও কম।’

    ঠাকুরপুকুর কি এখানে? ক্ষমা খোঁজ নিয়ে দেখেছে, সে কোন ধ্যাড়ধেড়ে গোবিন্দপুরে। মেট্রো-ফেট্রো, আরও কী কী সব বাস-মাস, অটো-মটো করে যেতে হয়। মা আমল দেয়নি। ওসব বড় বড় হাসপাতালে যাওয়া মানে তো গুচ্ছের টাকার শ্রাদ্ধ। কাজেই গরিবের শেষভরসা, ডক্টর দাস। হোমিওপ্যাথ। মিশনে বসেন। কিন্তু তাঁর চেম্বারে ঢোকার আগে ক্ষমা কি ছাই জানত যে, হোমিওপ্যাথি গুলিরও এত দাম হয়! এক একটা ফাইল, বলে কিনা তিনশো টাকা! তবু যা হোক, বড় হাসপাতালের চেয়ে তো খরচ কম। মায়ের কপালে যা লেখা আছে, তা-ই হবে! বিশালাক্ষীর থানে মায়ের নামে একটা পুজো দিয়ে দিলেই হবে একসময়।
    খাপরার চালের ফাঁক দিয়ে রাস্তার সোডিয়াম ভেপারের আলো চুঁইয়ে ঘরে ঢুকছিল। দেখে মনে হচ্ছিল যেন সুতোর ঝালর! বর্ষার আগে ছাতে প্লাস্টিক না চড়ালে ঘরে এবার গামলা পাততে হবে। কে জানে এখন একটা ভাল প্লাস্টিকের শিটের দাম কত!
    পায়ের দিকের জানালা খোলা। কাঁঠালগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ফিকে আকাশ দেখতে দেখতে কখন ঘুম চলে এসেছিল ক্ষমার। সেই ঘুম ভাঙল আটটা দশে। ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসে ক্ষমা। মা নেই। চোখ রগড়াতে রগড়াতে উঠোনে নেমে এসে দেখে, মা উনুন ধরিয়ে চায়ের জল চাপিয়েছে। ক্ষমা একটু ঝাঁজিয়ে বলে ওঠে, ‘ডেকে দাওনি কেন আমায় মা? দেখো তো কত দেরি হয়ে গেল আমার। সব তোমার জন্য হল আজ। মাসিমারা লোক ভাল বলে কিছু বলেন না। অন্য লোক হলে কবে তাড়িয়ে দিত।’ শাড়ি ব্লাউজ হাতে নিয়ে ক্ষমা বাথরুমে ঢোকে।

    সিদ্ধেশ্বরীতলায় বাসরাস্তার ওপর মাসিমাদের পেল্লাই বাড়ি। তাঁর বয়স এখন ছিয়াশি ছুঁইছুঁই। সারা অঙ্গ লোলচর্ম হলেও মুখখানা এখনও টানটান। গায়ের রঙ ধবধব করছে ফরসা। ক্ষমা এক একদিন মাসিমার গায়ে তেল মাখাতে মাখাতে ঠাট্টা করে বলে, ‘মাসিমার যত বয়স বাড়ছে তত যেন রূপ খুলছে।’
    মোটা টাকা পেনশন পান মাসিমা। মেশোমশাই রেলের অফিসার ছিলেন। বছর দুই হল ক্ষমা মাসিমার দেখাশোনা করে। মানে গোদা বাংলায় যাকে বলে, আয়া। সকাল আটটা সাড়ে আটটায় সে আসে এবাড়ি। দুপুরে মাসিমাকে খাইয়ে শুইয়ে দিয়ে তবে তার ছুটি। এরই মধ্যে সে মাসিমাকে চা জলখাবার করে দেয়, নিয়ম করে ওষুধ খাওয়ায়, টয়লেটে নিয়ে যায়, স্নান করায়, বাসি জামাকাপড় কেচে শুকোতে দেয়। অনেক কাজ। রোজ ঘর ডাস্টিং করাটাও তার ডিউটির মধ্যে পড়ে। সারাদিন ধরে এইসব টুকটাক কাজের ফাঁকে ফাঁকে চলতে থাকে তার আর মাসিমার মধ্যে রাজ্যের গল্পকথা। কোনও কোনও দিন সন্ধেবেলায়ও আসে। কাজ না থাকলে বসে বসে মাসিমার সঙ্গে গল্প করে। টিভি দেখে।

    ক্ষমার মা, মানে সুরবালার বয়স মেরেকেটে ছেষট্টি হবে কী হবে না, অথচ দেখায় যেন ছিয়ানব্বই বছরের বুড়ি! তোবড়ানো গাল। কণ্ঠার হাড় বেরনো। খসখসে খড়িওঠা চামড়া। রেগে গেলে ক্ষমা তাই মাকে খিস্তি মারে, ‘ভিখিরি কোতাকার!’
    উঠোনের ওপ্রান্তে বাবলু থাকে। ক্ষমার দাদা। রাজমিস্ত্রি। একঘরে থাকে, কিন্তু দেখে মনে হবে যেন দুই ভাড়াটে। মায়ের দিকে ফিরেও তাকায় না ছেলে। এই যে কাল সারারাত মা অত বমি করল, সকালে উঠে একবারও খোঁজ নিয়েছে দাদা? ওর ‘রিদয়’ বলে কিছু নেই! মায়ের এই যে কীসব রোগ হয়েছে, বললে বলে, ‘আমি বলে আমার সংসার নিয়েই হেগেমুতে একশা।’ ইদানীং আবার শুনিয়ে শুনিয়ে বলে, ‘কেরলে চলে যাব। ওখানে লেবারদের পয়সা বেশি।’
    ক্ষমা মনে মনে গজরায়, ‘তো যা না। কে ধরে রেখেছে তোকে? এখানে থেকেই বা কী উপগারটা করছিস আমার?’
    দাদার এই গড়িমসির জন্যই একরকম বিয়ে হয়নি ক্ষমার। নইলে তাকে দেখতে কুৎসিত নাকি? নাইবা পড়াশোনা জানল! টাটা-বিড়লার ঘরে তো আর বিয়ে হচ্ছিল না তার! মেয়েদের কাছে ঠিকমতো সংসার করাটাই হল আসল বিদ্যে। ঘর মোছা, বাসন ধোয়া, ডাল ভাত চচ্চড়ি রাঁধতে জানলেই হল। আর সোয়ামিকে রোজ রাতে একটু সোহাগ করা। এসবই হল গিয়ে মেয়েদের জেবনে ‘বন্ন-পরিচয়’।
    একেবারে স্নান সেরে বাথরুম থেকে বেরল ক্ষমা। বাথরুমে টিনের চাল। মরচে পড়ে দু’চার জায়গায় ফুটো হয়ে গেছে। তা দিয়ে আলোর ছুঁচলো শিক ঢোকে। তা হোক, বর্ষায় বাথরুমে জল পড়লে কিছু আসে-যায় না। তবে উদোম হয়ে চান করার সময় বাথরুমের চালে কোনও কাকপক্ষী বসলে ক্ষমা ঝট করে গায়ে গামছা জড়িয়ে নেয়। ওর তখন মনে হয়, ফুটো দিয়ে পাখিগুলো বুঝি প্যাটপ্যাট করে ওকে দেখছে। ক্ষমার গা শিরশির করে। লজ্জা পায়।
    বেরিয়ে এসে দেখে, মা বিছানার ওপর তার টিফিন গুছিয়ে রেখেছে। গায়ে জড়াতে জড়াতে ক্ষমা মাকে ধমক দেয়, ‘সকাল সকাল উঠে কে তোমাকে এতসব করতে বলেছিল? আবার পড়ার ইচ্ছে আছে নাকি? আমি ওবাড়িতে মুড়িটুড়ি যা হোক কিছু খেয়ে নিতাম। পইপই করে তোমাকে বলে দিচ্ছি মা, সাবধানে থাকো, সাবধানে থাকো। আমার কথা একটু মাথায় রেখো।’ বলতে বলতে টিফিন কৌটোটা কোনও রকমে ব্যাগে সেঁধিয়ে একরকম ছুটে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। পেছন থেকে সুরবালা চেঁচায়, ‘আস্তে যা ক্ষমা, দৌড়ুসনি। একটু দেরি হয়েছে তো কী হয়েছে? হোঁচট খেয়ে পড়বি যে!’ সুরবালার গলায় অপরাধবোধ ভেজা সুতোর মতো জড়িয়ে থাকে।

    সুরবালা বসে বসে হাঁপায়। পেটটা আজকাল কেমন বড় বড় দেখায়। পাশ ফিরে শুতে অসুবিধে হয়। ব্যথা করে। মুখে খাবার রোচে না। বমি বমি ভাব সব সময়। চোখ বুজে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে সর্বদা। কিন্তু তা করলে কি চলবে! নিজের জন্য না হোক, মেয়েটার জন্য তো কিছু রাঁধতেই হয়। ক্ষমাকে নিজের এত অসুবিধের কথা বলতে ভয় হয়। বললেই এক্ষুনি বাড়ি মাথায় করবে। ওকে দোষ দিয়েও লাভ নেই। একা কত দিক সামলাবে মেয়েটা!

    ক্ষমা আগে কলোনির সমবায় সমিতিতে কাজ করত। খানিকটা উদ্বাস্তু সমস্যা মেটাতেই একসময় এরাজ্যের অনেক জায়গায় ছোট ছোট সমবায় সমিতি গড়ে উঠেছিল। সরকারি সাহায্য পেত সমবায়টি। লোকাল কমিটি থেকেও পার্টির লোকেরা এসে দেখাশোনা করত। সমিতিতে তখন দশ-বারোটা তাঁত ছিল। তার মতো জনা তিরিশেক মহিলা কাজ করত সেখানে।
    সেই সব তাঁতে মূলত গামছা, ডাস্টার, কল্কা করা খেস, চাদর ইত্যাদি বোনা হত। প্রতিবছর সেইসব জিনিস ঘাড়ে করে বয়ে নিয়ে নানান মেলায় গিয়ে বেচে আসত ক্ষমারা। সেই সুবাদে ক্ষমা বার দুয়েক কল্যাণী গিয়েছিল সতীমায়ের মেলায়। ভালই সেল হত সেসব জিনিসের। মেলায় বিক্রি করা ছাড়াও এ অঞ্চলে তাদের বোনা গামছা আর ডাস্টারের ভাল ডিমান্ড ছিল। বিক্রির ভাগ ছাড়াও, সরকারি মাসোহারা পেত ক্ষমারা। মোটামুটি আয় ছিল মাসে। ক্ষমার দেখাদেখি ক্ষমার মাও গিয়ে জুটেছিল সমিতিতে।
    শান্তাদি ছিলেন সেই সমিতির হেড। সবাই খুব মান্যি করত তাঁকে। একা হাতে সব সামলাতেন শান্তাদি। সমিতির একটা ঘর নিয়ে একা থাকতেন তিনি। বিয়ে-থা করেননি। শান্তাদি মারা যেতে, কালের নিয়মেই ধীরে ধীরে একদিন বন্ধ হয়ে গেল সমিতি। পরিবর্তনের পর সরকারও হাত গুটিয়ে নিল। ঝপ করে বেকার হয়ে গেল ক্ষমারা। তখন থেকে হন্যে হয়ে একটা কাজ খুঁজছিল ক্ষমা। সেই সময় বিশুর মা একদিন ক্ষমাকে ডেকে মাসিমার ঘরে এই কাজের কথাটা বলেছিল। ক্ষমা প্রথমটায় রাজি হয়নি। নাক কুঁচকেছিল। আয়ার কাজ! খানিকটা অবজ্ঞার সুরে বলেছিল, ‘তুমি আর আমার জন্য কাজ খুঁজে পেলে না দিদি? শেষে রুগির গু-মুত পরিষ্কার করার কাজ যোগাড় করলে! না বাবা, আমার দ্বারা ওসব হবে না। তুমি বরং অন্য কাউকে বলো।’
    বিশুর মা চলে যেতে যেতে বলেছিল, ‘গু-মুত পরিষ্কার করতে হবে কিনা জানি না বাপু। মাসিমা তো এখনও তেমন অথব্য কিছু হননি। সকালে গিয়ে চান-খাওয়া করিয়ে দুপুর নাগাদ চলে আসবে, এই তো কাজ। তা বলে… সব দিন কি আর এক যায় মানুষের? বয়স্ক মানুষ, কোনওদিন একটু বেশি শরীর খারাপ হতেই পারে। যাই হোক, ওরা বলছিল, ভাল লোক পেলে হাজার তিনেক টাকা দেবে। এখন ভেবে দেখো তুমি।’
    সন্ধেবেলা বিছানায় বসে টিভি দেখতে দেখতে ক্ষমা মাকে বলেছিল কথাটা। তিন হাজার টাকাটা একটা বড় ব্যাপার। দাদা তো পালাই পালাই করছে। দায় যেন ক্ষমারই। ক’দিন খুব কিন্তু কিন্তু করে একদিন নিজেই যেচে হাজির হয়েছিল ক্ষমা বিশুদের বাড়ি। বিশুর মায়ের কাছ থেকে ঠিকানাটা চেয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘লোক কেমন গো দিদি এরা? ঘরে কে কে আছে? বুড়ি মানুষরা বড় খিটখিটে হয়, কেমন মানুষ তোমার এই মাসিমা?’
    সিদ্ধেশ্বরীতলার ঠিকানাটা মুখে মুখে বুঝিয়ে দিয়ে বিশুর মা বলেছিল, ‘গিয়ে একবার নিজের চোকে দেখেই এসো না কেন, তারপর পোষায় করো, নইলে… কাজ ছাড়তে কতক্ষণ।’
    সেই যে এবাড়িতে ঢুকেছে ক্ষমা, আজ বছর দুই হল একনাগাড়ে করে যাচ্ছে। মাইনে তিন হাজার থেকে বেড়ে চার হাজার হয়েছে। কাজ ছাড়ার কথা ক্ষমা এখন স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। এত ভালমানুষ এই মাসিমা! দেবতা!

    আজ ক্ষমা এসে দেখে মাসিমা বিছানায় শুয়ে। চোখ বোজা। চোখের কোনা বেয়ে শুকনো জলের ধারা। মুখে ক্লান্তির ছাপ। বিছানার একপাশে বড়দা বসে। মাসিমার বড়ছেলে। মুখ গম্ভীর। চিন্তাক্লিষ্ট। শিয়রে বড়দাদার মেয়ে তিতির দাঁড়িয়ে। তার মুখেও দুশ্চিন্তার ছাপ।
    ক্ষমা কাঁধের ব্যাগটা টেবলে রাখতে রাখতে একবার আড়চোখে দেখে নেয় দেয়ালে টাঙানো ঘড়িটা। ন’টা কুড়ি। অপরাধবোধে তার মাথা নীচু হয়ে আসে। অপরাধীর মতো মুখ করে মিনমিন স্বরে বড়দাকে জিজ্ঞেস করে, ‘কী হল মাসিমার, বড়দা? কাল তো ভালই দেখে গেলাম…।’
    মাসখানেক হল বড়দা রিটায়ার করেছেন। তাঁর নজর বড় তীক্ষ্ম। মাসিমার যত্নের এতটুকু এদিক-ওদিক হলে কেমনভাবে যেন তিনি তাকান। মুখে কিছু না বললেও, ওই দৃষ্টিতে কড়া ধমক থাকে। এবাড়ির সবাই, ছেলেমেয়ে নাতি-নাতনি থেকে শুরু করে বউদি পর্যন্ত মাসিমাকে বড় আদর-যত্নে রেখেছেন। আহা, ক্ষমার মাঝেমাঝে মনে হয়, আমার মায়ের কপালে যদি এমন আদর ভালবাসা জুটত!
    বড়দা মাসিমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘এখন ওষুধ-টষুধ যা আছে, মাকে খাইয়ো না ক্ষমা। ডাক্তারকে খবর দেওয়া হয়েছে, তিনি এসে কী বলেন দেখি…।’
    ক্ষমা তিতিরের দিকে জিজ্ঞাসু নয়নে তাকালে সে যথাসম্ভব চাপা গলায় জানায়, ‘সকাল থেকে ঠাম্মির খুব মাথা ঘুরছে, উঠে বসতে পারছে না। মুখচোখ কিছু ধোয়নি। বাথরুমেও যায়নি। কথাটথা কিছু বলছে না।’
    বড়দা উঠে দাঁড়িয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমার আসতে আজ এত দেরি হল কেন ক্ষমা? রুগির ঘরে এত দেরি করে আসলে চলে?’
    ক্ষমা মনে মনে বড়দার মুখ থেকে এইসব কথাই শুনতে চাইছিল। একটু ধমক ধামক। তবেই যেন তার অপরাধের শাস্তি মেটে। মায়ের ওপর তার গা জ্বলে যাচ্ছিল।
    একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ক্ষমা বলল, ‘আসলে কাল রাত থেকে আমার মায়ের শরীরটা খুব খারাপ যাচ্ছে বড়দা। পেটে ভীষণ ব্যথা বলছিল। বমি, পায়খানা… সারারাত প্রায় জেগে কেটেছে।’
    ‘কী হয়েছে তোমার মায়ের? প্রায়ই শুনি তোমার মায়ের শরীর খারাপ। তো একটা ভাল ডাক্তার দেখাচ্ছ না কেন? তোমার এক দাদা আছে না? সে কী করে? তাকে বলো।’
    ক্ষমা বিছানায় বসে মাসিমার কপালের ওপর থেকে চুল সরিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘আমার দাদা! ও নামেই ছেলে। খোঁজ নেওয়া তো দূরের কথা, ‌একবার ফিরেও তাকায় না মায়ের দিকে। অথচ একই উঠোনের ‌এপার-ওপার থাকি আমরা। আপনাদের মতো ক’টা লোক হয় দাদাবাবু আজকাল! আমি তো তাই রোজ মাকে বলি, কপাল করে মাসিমা ছেলেমেয়ে পেয়েছেন। এমন ভাগ্য সবার হয় না দাদা!’ নাক দিয়ে একটা অসহায় তপ্ত শ্বাস ছিটকে বেরিয়ে আসে ক্ষমার।
    ক্ষমা আজ ভেবে রেখেছিল, মাসিমাকে চান-টান করিয়ে ঝট করে একবার ডক্টর দাসের চেম্বারে গিয়ে মায়ের জন্য ওষুধটা নিয়ে আসবে। কয়েকমাস হল ডক্টর দাসের হোমিওপ্যাথ গুলি খেয়ে ভাল আছে মা। পেটের ব্যথাটা সামান্য হলেও কমেছে। কিন্তু আজ ডাক্তারের কাছে যাবার কথা এবাড়িতে কাউকে বলা যাবে না। মাসিমা সুস্থ থাকলে তবু না হয় হত।
    সারাদিন আজ মাসিমা বিছানায় চোখ বুজে শুয়ে রইলেন। ডাক্তারবাবু এসে বলে গেছেন, প্রেসার খুব হাই। ওষুধ দিয়ে গেছেন। তারই মাঝে ক্ষমা চায়ে বিস্কুট ভিজিয়ে একটু একটু করে মাসিমার মুখে দিয়েছে। ফলের রস খাইয়েছে। গরমজলে গা স্পঞ্জ করিয়ে দিয়েছে। চুল বেঁধে দিয়েছে। মাসিমার মাথায় অল্প চুল হলে কী হবে, খুব সৌখিন। রোজ মাথায় তেল দিয়ে টানটান করে চুল বাঁধা চাই। আর ফাঁকে ফাঁকে নিজের মায়ের কথা ভেবে ব্যথায় মনটা টনটন করে উঠেছে। মা এখন ঘরে একা একা কী করছে কে জানে! পেটের দায় বড় দায়! স্রেফ দুটো পয়সার জন্য নিজের অসুস্থ মাকে ঘরে ফেলে রেখে অন্যের সেবা করতে বের হতে হয়েছে। বউদিটাও যদি একটু দেখত মাকে! হারামজাদি কাকে বলে! ঘরে একটা মোবাইল পর্যন্ত নেই যে, কিছু হলে খবর পাবে! মাসিমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ক্ষমার চোখ দুটো ভিজে ওঠে।

    সাতদিনের মধ্যে মাসিমা পুরোপুরি শয্যা নিলেন। এখন বিছানাতেই তাঁকে সব করিয়ে দিতে হয়। গা স্পঞ্জ করা, বেডপ্যান দেওয়া। আগের মতো আর কথা বলেন না মাসিমা। যা-ও বা দু-চারটে কথা বলেন, তা-ও জড়িয়ে জড়িয়ে। মুখের কাছে কান পেতে শুনতে হয়। সারাদিন কেবল চোখ বুজে পড়ে থাকেন। আর মাঝে মাঝে ক্ষমা ক্ষমা বলে ডাকেন।
    এতটুকু চোখের আড়াল হবার জো নেই ক্ষমার। ইতিমধ্যে দু-দু’বার এসে দেখে গেছেন ডাক্তারবাবু। বড়দাকে আড়ালে ডেকে নাকি বলেছেন, ‘প্রাণশক্তি ফুরিয়ে এসেছে ওনার… এভাবেই যতদিন বেঁচে থাকেন, থাকুন। এত পরিচ্ছন্ন, খোলামেলা ঘর, সুন্দর আলোবাতাস… হাসপাতালে দিয়ে কী হবে! সেখানে নিয়ে গেলেই তো এক্ষুনি আইসিইউ, ভেন্টিলেশন, তারপর নিউমোনিয়া। ব্যাস…।’
    ঘরের সবাই বিমর্ষ হয়ে থাকে সব সময়। মা যা যা খেতে চায়, সবাই তাই নিয়ে আসে। যত্নের কোনও ত্রুটি নেই। আত্মীয়স্বজন, পাড়াপড়শি এসে এসে রোজ দেখে যাচ্ছে মাসিমাকে।

    ক্ষমা শুধু ভেতরে ভেতরে ছটফট করে। রাতে ভাল করে ঘুম হয় না তার। যাতায়াতের পথে মা বিশালাক্ষীর মন্দির পড়ে। পঞ্চবৃক্ষের সমাহার। বিশাল তার গুঁড়ির বেড়। একটা গোটা শাড়ি লেগে যায় জড়াতে। আগে আগে মা বিশালাক্ষীর ওপর খুব ভক্তি ছিল ক্ষমার। ফি-বছর মাঘীপূর্ণিমার দিন উপোস করে, খালি পায়ে ঘড়ায় করে গঙ্গাজল এনে গাছের গোড়া ধুইয়ে দিত। এখন বহু দিন হল ক্ষমা আর মন্দিরতলায় যায় না। ঘরের দৈন্য, মায়ের অসুখ, দাদার স্বার্থপরতা, সব দেখেশুনে মা বিশালাক্ষীর ওপর থেকে ভক্তি উঠে গেছে। মা অন্ধ! একপেশে।
    কিন্তু মাসিমার এই অবস্থা দেখে, ক’দিন হল ক্ষমা আবার বিশালাক্ষীতলায় যাতায়াত শুরু করেছে। সেখানে গিয়ে আর্ত কণ্ঠে সে শুধু ঠাকুরকে বলে, ‘মা বিশালাক্ষী, মাসিমাকে সুস্থ করে দাও ঠাকুর, মাসিমাকে সুস্থ করে দাও। নইলে আমি যে মারা পড়ব…।’
    সেদিন অমনি বাড়ি ফেরার পথে ক্ষমা অনেকক্ষণ বসে থাকে বিশালাক্ষীতলায়। তিরতির করে মৃদু হাওয়া বইছে। মন্দির প্রাঙ্গণে শুকনো গাছের পাতা খসে খসে পড়ছে। ক্ষমা উঠে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। মা বিশালাক্ষীর গোড়ায় মাথা ঠুকতে ঠুকতে অস্ফুটে উচ্চারণ করে, ‘হে মা বিশালাক্ষী, মাসিমাকে রেখে আমার মাকে বরং…।’
    চিরকালীন সংস্কারবশে ক্ষমার ঠোঁটের গোড়ায় ঝুলে থাকে তার মনের অনুচ্চারিত গোপন বাক্যাংশটি। পরক্ষণেই নিজের স্বার্থপরতার কথা ভেবে নিজেই আঁতকে ওঠে। মুখে হাত চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে।
    রাতে ঘুম হয় না ক্ষমার। খাপরার চালের দিকে চেয়ে শুয়ে থাকে। মা আর মাসিমা, এই দুই জননীকে নিয়ে সে বিভ্রান্ত। মাসিমা মারা গেলে, কে তাকে এখন চার হাজার টাকা দিয়ে পুষবে! দাদার কাছে হাত পাতার চেয়ে তার মরে যাওয়া ভাল।
    বাথরুম করতে উঠে সুরবালা দেখে, মেয়ে জেগে। ঘুমজড়ানো গলায় ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কীরে, তুই এখনও জেগে, ঘুম আসছে না? শরীর ঠিক আছে তো মা?’
    ক্ষমা ফুটো চালের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থেকে একটা বড় শ্বাস ফেলে জবাব দেয়, ‘মাসিমা ভাল নেই মা।’
    সুরবালারও সেই এক চিন্তা। মাসিমা মারা গেলে, তাদের সংসার যে অচল হয়ে পড়বে! চার হাজার টাকা কি চাট্টিখানি কথা! সেই কথা ভেবে ভেবে সুরবালার শরীর ক্রমশ ভাঙতে থাকে। পেটের ব্যথাটা বাড়ে। চলাফেরায় আর তেমন বল পায় না। সব সময় বড্ড ঘুম ঘুম পায়। এই হোমিওপ্যাথ ওষুধে আর কোনও কাজ দিচ্ছে না। সেকথা ক্ষমাকে বলার উপায় নেই। বেচারি আর কত দৌড়োদৌড়ি করবে! মনে মনে বলে, আমারও যে বড্ড বাঁচতে ইচ্ছে যায় ঠাকুর। যতই দুঃখকষ্ট থাক সংসারে, এই পৃথিবী ছেড়ে যেতে মন চায় না! মেয়েটাকে দেখবে কে? একটা বিয়ে পর্যন্ত দিতে পারলাম না…।

    একদিন ক্ষমা বেরিয়ে গেলে, কোনওরকমে হাঁপাতে হাঁপাতে নাজিরের কাছে যায় সুরবালা। গিয়ে বলে, ‘নাজিরভাই, আমায় একটু ক্যান্টনমেন্ট মাজারে গিয়ে তোমাদের ওই পিরবাবার জলপড়া এনে দেবে? শুনেছি ওই জলপড়া খেলে নাকি সব রোগ সেরে যায়!’
    নাজির খুশি হয়। বলে, ‘এ আর কী এমন বড়কথা মা। আজ বিকেলেই আমি এনে দেব’খন। পিরবাবার জলপড়া খুব জাগ্রত। ক্যানসারও সেরে যায়!’
    দুপুরবেলা সিদ্ধেশ্বরীতলা থেকে ফেরবার পথে নাজিরের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় ক্ষমার। নাজির ক্ষমাকে জলপড়ার শিশিটা হাতে দিয়ে বলে, ‘তোমার মা এটা আমায় আনতে বলেছিল। পিরবাবার জলপড়া। খুব জাগ্রত। কিছুটা খাইয়ে বাকিটা গায়ে-মাথায় বুলিয়ে দিয়ো। ঠিক হয়ে যাবে তোমার মা। চিন্তা কোরো না।’
    ক্ষমা অবাক হয়, মা এখন এইসব করছে বুঝি! সেরে ওঠার ফন্দি-ফিকির! কিন্তু মুখে কিছু বলে না। শিশিটা মুঠিতে চেপে ধরে। সঞ্জীবনী সুধা! চুপি চুপি ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয়। ক্লান্ত হয়ে ঘরে ঢোকে। শিশিটা যে নাজির দিয়েছে, মাকে জানায় না।
    খেতে বসে মায়ের মুখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে ক্ষমা। সুরবালা খুবি ধীরে ধীরে মুখে ভাতের গ্রাস তুলছে। মনের মধ্যে কী যেন এক দহন চলতে থাকে ক্ষমার। মন্থন। ‘ব্রহ্মারে কহিল পূর্বে দেব গদাধর।/ দেবাসুরগণ নিয়া মথহ সাগর।/ অমৃত উৎপত্তি হইবে সাগর-মন্থনে।/ দেবগণ অমর হইবে সুধাপানে।।’
    গলা দিয়ে ভাত নামতে চায় না ক্ষমার। মার মুখটা কুয়াশার মতো ঝাপসা দেখায়।

    চিত্রকর: মৃণাল শীল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More