ঝাঁপ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    গৌতম সাহা

    এইখানে জীবন অনেক সহজ। অনেক শান্ত। অনেক স্থির। সাদাকালো ছবির মতো। কোনও ধামাকা নেই। নেই কোনও মেগা ব্যাপার। জীবন খুব ঢিমে লয়ে চলে যাচ্ছে। তার শান্ত একটা গতি আছে। সেই গতি টের পাওয়া যায় না। জীবন বলতে যা বোঝায়, ঠিক সেইরকম বলা যায় না।
    এখানে সূর্যের আলো নেই। কিন্তু অন্য আলো আছে। কোথাও কোথাও সাদা আলো। আলো টিউবলাইটের। আর আছে অন্ধকার। খুব অন্ধকার। ঘুটঘুটে।
    ২০০২ সালের ঝিমলি। শান্তা ২০০৮-এর মাঝামাঝি। এই দু’জনে মিট করল সেন্ট্রাল মেট্রো স্টেশনে। ২০০৯-এর অতনু। স্নিগ্ধা— সেও ২০০৯-এর শেষ দিকের। আরও অনেকে আসবে। মিটিং পয়েন্ট সেন্ট্রাল মেট্রো স্টেশন। তারপর সবারই গন্তব্য দক্ষিণের দিকে। কালীঘাট মেট্রো স্টেশন। বেশিরভাগ বড় বড় ঘটনা টের পাওয়া যায় না। সবচেয়ে বড় ইভেন্ট বুঝে ওঠা যায় না। পৃথিবী দু’রকমভাবে ঘুরছে। ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন— এদের চলাচল জানান দিয়ে ঘটে না। কত কিছু দিনরাত ঘটছে। শব্দ না করে।
    অনেক বড় একটা জমায়েত হতে চলেছে। সব দিক থেকেই ওরা আসছে। প্রস্তুতি চলছিল অনেক দিন ধরেই। দেওয়ালে দেওয়ালে পোস্টার পড়ছিল। যাদের দেখার তারা দেখেছে। যাদের দেখার নয় তারা দেখতে পায়নি। সময় সন্ধ্যা ছ’টা। স্থান কালীঘাট মেট্রো আর যতীন দাস স্টেশনের মাঝামাঝি। চার নম্বর পিলারের সামনে। দলে দলে যোগ দেবার আহ্বান।

    অন্ধকার লাইনের পাশে স্টেজ। ওরা বসছে। দাঁড়াচ্ছে। হাত-পা নাড়াচ্ছে। ডিসিপ্লিন মেইনটেইন করছে। অন্ধকার সুড়ঙ্গে এখনও কোনও শব্দ নেই। এখানে আসার সময় হিসেবে ওরা ব্যাচ করে বসেছে। ১৯৮৫-৮৬-৮৭-র ব্যাচ প্রথম দিকে। মাঝে ২০০১-০২ আর ২০০৫-০৬। একদম হালে যারা এসেছে তারা পেছনের দিকে। কী উদ্দেশ্যে আজকের এই সভা সেটা সবারই জানা। অনিমেষ পেছন ফিরে সীমাকে বলল, ‘এটা আসলে প্রতিবাদ সভা।’ ২০০৪-এর ব্যাচের অনিমেষ, সীমা, অঙ্কন, চন্দন, সত্যজিৎ সবাই দাঁতে দাঁত চেপে বসে আছে। ওরা জানে তীব্র একটা প্রতিবাদ দরকার। রুখে দাঁড়াতেই হবে। কিন্তু কোন পথে প্রতিবাদ হবে সেটাই আজ ঠিক হবে।
    সীমা, অনিমেষ, চন্দনদের মতো কত মুখ এখন এই সুড়ঙ্গে, একসঙ্গে। ওরা সবাই দমদম থেকে টালিগঞ্জের মধ্যে এই সুড়ঙ্গেই থাকে। ওদের শরীরের পাশ দিয়ে হুশ হুশ করে ট্রেন চলে যায়। টালিগঞ্জের পর গড়িয়ার দিকে, যেখানে মাটির ওপর দিয়ে লাইন, সেখানে ওদের আনাগোনা নেই। সারাদিন ধরে স্টেশনে যাত্রীদের জমজমাট হুল্লোড় ওদের কানে পৌঁছয়। নানারকমের শব্দ আর স্টেশনের আলো সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে পড়তে চায়। রাত বাড়লে সব যখন বন্ধ হয়ে যায়, সুড়ঙ্গ থেকে একে একে ওরা স্টেশনগুলোতে ভিড় করে। টালিগঞ্জ থেকে দমদম পুরোটাই তখন ওদের দখলে চলে যায়। সবার রাত কাটে প্রেমে, গল্পে, আদরে আর পুরনো স্মৃতিতে। প্রত্যেকের জীবনের আলাদা আলাদা গল্প। কিন্তু গল্পের শেষটা এক। প্রত্যেকের গল্পের শেষেই আছে একটা করে ঝাঁপ। একটা দুর্দান্ত ঝাঁপ। ঠিক ঠিক হিসাব করে, সঠিক সময়ে একটা ঝাঁপ মানে কিছু মানুষের জন্য দিনটা ওলটপালট করে দেওয়া। ট্রেন কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ। কিছু মানুষের অফিস লেট বা বাড়ি ফিরতে দেরি। আটকে পড়ে এর-ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি। বডি বের করে লাইন পরিষ্কার হবার পর আবার সব আগের মতো। ঝকঝকে।

    সভা শুরু। কোনও নেতা নেই, তাই মাইকও নেই। যে যার মতো করে নিজেদের মতামত জানাতে পারে। তবে প্রথম দিকের ব্যাচে যারা, তাদের অগ্রাধিকার রয়েছে। সবার মতামতের ওপর ভিত্তি করে একটা সমাধানে পৌঁছনো হবে। ১৯৮৯-এর ব্যাচের নিখিলেশ ধর শুরুর বক্তৃতা দিতে উঠেছে। এরা সবাই নিখিলেশ ধরকে চেনে। সে-ই প্রথম এখানে এসেছে। সবার সিনিয়র। নিখিলেশ যেদিন ঝাঁপ দেয় সেদিন কলকাতা বৃষ্টিতে নদী। মেট্রো রেলের সীমানা তখন টালিগঞ্জ থেকে এসপ্ল্যানেড। রবীন্দ্র সরোবর স্টেশনে ঝাঁপ দিয়ে নিখিলেশ ১৯৮৯ সাল থেকে এখানে। এখন স্টেজে।
    নিখিলেশ একদমে বলে চলেছে। ‘আমরা প্রত্যেকে এখানে এসেছি নিজের মতো করে। নিজেদের চেষ্টায়। অনেকেই চেষ্টা করেছে কিন্তু আমরা যারা আজ এখানে, তারাই সফল। এখানে এসে আমাদের কখনও মনে হয়নি অন্য কোনও জায়গায় যাবার। আমরা একজনও এখান থেকে চলে যাইনি। আমরা নিজেরা জানি এখানে কতটা ভাল আছি। আমরা এখান থেকে কেউ চলে যেতে চাই না।’
    সব কালো মাথাগুলো একসঙ্গে বলে উঠল, ‘যেতে চাই না, যেতে চাই না।’
    সেই কবেকার কথা। নিখিলেশ যখন কলকাতার একটা বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির বাবু হয়ে যাবার দিকে এগোচ্ছিল ঠিক তখনই নিখিলেশের বউ কেলেবাবুর সঙ্গে পালায়। নিখিলেশ আর সায়ন্তনীর বিয়ের বয়স তখন আট মাস। নিখিলেশদের বাড়ির একতলার ঘরে সায়ন্তনী আবৃত্তি শেখাত। দোতলার ছাদে দাঁড়ালে কেলেবাবুর গুমটিতে উনুনের আঁচ পরিষ্কার দেখা যেত। স্যান্ডো গেঞ্জি পরে জামা-প্যান্ট পাটপাট করে ইস্তিরি করছে কেলেবাবু। কেউ গুনে গুনে জামাকাপড় দিচ্ছে। কেউ নিচ্ছে। কেলেবাবু ইস্তিরি করছে। খদ্দেরদের জামাকাপড় বুঝিয়ে দিচ্ছে। বুঝে নিচ্ছে। পয়সা নিচ্ছে। আর নিজের ফোলানো বাইসেপের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। সায়ন্তনী যে কী করে কেলেবাবুর সঙ্গে চলে গিয়েছিল তা নিখিলেশ কিছুতেই বুঝে উঠতে পারেনি। জীবনে কতকিছুই যে ঘটে। তবে সে যাওয়ার পর নিখিলেশ আর দেরি করেনি। চলে এসেছে এখানে। সবার আগে। এই জন্য প্রথম প্রথম তার একটু গর্বও ছিল।
    নিখিলেশ বলে চলেছে, ‘আমাদের সবাইকে এক হয়ে থাকতে হবে। খুব সাবধান। আমাদের এই জমায়েতের কথা ওপরের ওরা যেন জানতে না পারে। বন্ধুরা দেখবেন, সাংবাদিক আর টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা হয়তো এই সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়বে। আপনারা ওদের সঙ্গে কোনও কথা বলবেন না।’

    নিখিলেশ এরপর সামনে বসে থাকা অম্বরীশকে ডেকে নিল। ১৯৮৯-এর প্রথম ব্যাচের দু’জনের অন্যজন অম্বরীশ লাহা। আটত্রিশ বছরের অম্বরীশ কোনও এক গরমের দুপুরে ময়দানে বাস থেকে নেমে পড়েছিল। নাগেরবাজার থেকে বাসে আসতে আসতে অম্বরীশের মেট্রোর লাইনের কথার মাথায় আসে। তিন মাস ধরে অম্বরীশরা লড়াই করেছে। কারখানা বন্ধ হয়ে যাবার পর সময় লেগেছে বুঝতে। কারখানার বাড়ি, জমি বিক্রি হয়ে গেছে তলায় তলায়। চাকরি আর ফিরে পাবার নয়। কারখানাই আর থাকবে না। অসুস্থ বাবা-মা আর ক্লাস এইটে পড়া ভাইকে নিয়ে সংসার আর চলছিল না। তিন মাস ধরে নানারকমভাবে চেষ্টা করে পুরো হেরে যাবার আগে অম্বরীশ টিকিট কেটেছিল। ঘামতে ঘামতে। প্রথমে ময়দান থেকে টালিগঞ্জ। আবার ফিরতি ট্রেনে ময়দান। টাইমিং গণ্ডগোল হয়ে যায়। আবার হেরে যাচ্ছিল অম্বরীশ। থার্ড লাইনের দৌলতে অম্বরীশ মরে গিয়ে একদম শেষ মুহূর্তে জিতে যায়।
    ‘আমি তিরিশ বছর আগে ওপর থেকে এখানে চলে এসেছি। তখনকার শহর আর এখনকার শহরের হয়তো অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখনকার মেট্রোযাত্রীদের মুখ, মুখের ভাষা, জামাকাপড় এসব দেখে বুঝতে পারি, ওপরটা আগের মতো আর নেই। এখানে আসার পর নিখিলেশদাকে প্রথম পেয়েছি। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখানে সদস্য সংখ্যা বেড়েছে। আমরা একটা পরিবারের মতো এখানে আছি। কখনও ওপরের মানুষদের কোনওভাবে বিরক্ত করিনি। কারও কোনও ক্ষতি করিনি। হয়তো আমাদের অজান্তে কেউ কেউ আমাদের দেখে ফেলেছে। দেখে ভয় পেয়েছে। তারপর ভুলে গেছে। সেইরকম ঘটনাও হাতেগোনা। কয়েক বছর আগে রাতের শেষ মেট্রোর সময় রবীন্দ্র সরোবর স্টেশনে একজন ভদ্রলোক আমাদের সদস্য কমল চক্রবর্তীকে দেখে ভয় পেয়েছিল। অজ্ঞান হয়ে যায়। পুলিশ এসে ভদ্রলোককে তুলে নিয়ে যায়। কমল
    ইচ্ছাকৃতভাবে এই কাজ করেনি। সেটা আমরা প্রত্যেকে জানি। কমল নিজেও এই ঘটনার জন্য অনুতপ্ত।’
    অম্বরীশ একনাগাড়ে বলে যাচ্ছিল। ‘আমরা ওপরের মানুষদের সঙ্গে কোনওরকমভাবেই যোগাযোগ রাখতে চাই না। সেখানে কী ঘটছে সেটা জানার কৌতূহলও আমাদের নেই। এটাই এখানে উপস্থিত সমস্ত সদস্যের মনের কথা। সেটা আমি জানি। কিন্তু আমাদের সামনে এখন বড় বিপদ।’

    দর্শকদের মধ্যে বসে ২০০৩-এর ব্যাচের অসীম পাত্রের খুব মায়া হচ্ছিল। অম্বরীশদার মুখের মধ্যেও একটা মায়া আছে। অম্বরীশদা যে বিপদটার কথা বলতে যাচ্ছে সেটা এখানকার সবাই জানে। তবু অম্বরীশদা একবার মনে করিয়ে দিচ্ছে। সে বলে চলেছে, ‘আমাদের ওপর সরকারের দৃষ্টি পড়েছে। এ দেশের সরকার যা চাইছে আমরা তা চাইছি না। ওপরে আমরা যাব না। আমরা আমাদের এই জায়গা ছাড়ব না। সরকারের তরফে এক প্রতিনিধিদল আমাদের সঙ্গে কথা বলতে এসেছিল। তারা আমাদের মূলস্রোতে ফিরে যেতে বলেছে। বলেছে, আকাশের তলায় মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করতে। ওপরে নাকি অনেক উন্নতি হয়েছে। নতুন নতুন রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, ফ্লাইওভার, শপিংমল, মাল্টিপ্লেক্স— এসব ভোগ করার জন্য ডাকছে আমাদের। যা ছেড়ে এসেছি, আবার সেখানে ফিরে যেতে বলছে। ওপরে নাকি অনেক আরামে থাকতে পারব। সরকার আমাদের ভোল পাল্টে দিতে চায়। সেদিনের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আমাদের যে মিটিং হয়েছে সেখানে আপনারা অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। আমরা সেই দলকে জানিয়ে দিয়েছি, আমরা ওপরে যেতে চাই না। সরকারের এই প্রস্তাবে এখানে একজনেরও সমর্থন নেই। কিন্তু গভর্নমেন্ট নাছোড়বান্দা। তারা জোর করে আমাদের নিয়ে যেতে চায়। কারণটা পরিষ্কার। আমাদের নিয়ে গেলে সরকারি দলের ভোট বাড়বে। যে দল সরকার চালায় সেই দলের ইশতেহারে এটা ওরা প্রকাশ করে দিয়েছে। কিন্তু আমরা আমাদের জায়গা কোনওমতেই ছাড়ব না। লড়াইটা সরকারের বিরুদ্ধে। তবে সে লড়াই কীভাবে হবে আমরা কেউ তা জানি না।’
    অম্বরীশ এবার গলা নামিয়ে, চোয়াল শক্ত করে বলল, ‘এখানে যারা আছেন সবাইকে এক হয়ে ঠিক করতে হবে আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ।’
    এই অন্ধকার সুড়ঙ্গের বাইরের পৃথিবীতে যেখানে মানুষ হইহল্লা করে জীবন কাটায়, সেখানে তখন চলছিল আরও একটা মিটিং। ঠিক মিটিং নয়। সমাবেশ। ঠিক সমাবেশও নয়। উৎসব। আনন্দ উৎসব। যে দল সরকার চালায় তারা উৎসব করছে। প্যান্ডেল বেঁধে। অনেক আলো জ্বালিয়ে। প্রচুর লোক। খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাও আছে। মেনু— লুচি, ছানার ডালনা, কাঁচকলার কোপ্তা আর মৌচাক— মিষ্টি। প্রচুর আওয়াজের মধ্যেই মাইকে ঘোষণা হচ্ছে। সরকারের নতুন পরিকল্পনা। অভাবনীয়। একসময় যারা মানুষ ছিল তাদের সঙ্গে এখন যারা মানুষ আছে তাদের রাখার উদ্যোগ। যারা নিজেদের ইচ্ছেয় মরে গেছে তাদেরই মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনতে চায় সরকার। মাটির তলার সুড়ঙ্গের মধ্যে থেকে তাদের বের করে এনে নতুন জীবন দেবে। ওপরে এসে তারা ফুর্তি করবে, হাসবে, কাঁদবে, ভোট দেবে, নাচবে, এমনকি চাইলে মালও খেতে পারে। সরকারের এই উদ্যোগের জন্য একটা উৎসব হচ্ছে। মাইকের ঘোষণা অনুযায়ী, এই পরিকল্পনার একটা শিলান্যাস হবে একটু পরেই।

    ২০১৬-র ব্যাচের সঞ্জীব রায় মতামত দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছে। সঞ্জীব যেদিন এখানে আসে সেদিন মেট্রোর যাত্রীরা দেড়ঘণ্টা দুর্ভোগে পড়ে ছিল। সঞ্জীব খুব কাঠকাঠ গলায় বলল, ‘আমরা যেটা পারি সেটাই আমাদের করতে হবে। অন্য কিছু ভেবে সময় নষ্ট করে কোনও লাভ নেই। আমরা বেশি কিছু করতে পারি না। তবে কাজটা আমাদের নিখুঁতভাবে করতে হবে। আর সেটা ঠিকঠাক করতে পারলেই আমাদের জায়গা ছেড়ে কোথাও যেতে হবে না।’
    সঞ্জীবের কিছু হওয়ার কথা ছিল। অনেক কিছুই হতে পারত। ক্লাস ওয়ান থেকে সব ক্লাসে ফার্স্ট। মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকে স্টার। আশুতোষ কলেজে স্ট্যাটিসটিক্স। ফার্স্ট ক্লাস। তারপর সময় চলে গেল। কোথাও কিছু ঠিক ঠিকভাবে হল না। শুধু বয়স বেড়ে গেল। তারপর প্রথম পেল একশো দিনের কাজ। ডেঙ্গু হচ্ছিল খুব। সঞ্জীব পেল ব্লিচিং পাউডার ছড়ানোর কাজ। হাত গ্লাভস। সঞ্জীবের হাত-পা তবুও ব্লিচিং পাউডারে সাদা হয়ে যাচ্ছিল। একদিন ব্লিচিং পাউডারের ব্যাগ নামিয়ে রেখে সঞ্জীব টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশনে হাজির হয়। তখনও তার হাত একদম সাদা ছিল।
    সঞ্জীব বলছিল, ‘আমরা যে জীবিত নই এই কথাটা ভুলে গেলে চলবে না। দেশের সরকারের অনেক শক্তি। ওরা সবাই বেঁচে আছে। আমাদের শক্তি একটাই। আমরা কেউ জীবিত নই। মৃত।’
    ওরা সবাই বুঝে গেল, যে পথ ওরা খুঁজছিল সঞ্জীব সেই পথ দেখাচ্ছে। সে বলল, ‘আমাদের আরও বেশি করে মনে রাখতে হবে, আমরা মৃত। আমরা অনেক শক্তিশালী। ভূত মানে কী? অতীত। আমরা আমাদের অতীত ফেলে রেখে এসেছি। আমাদের আরও বেশি করে ভূত হতে হবে।’
    ১৯৯১-এর ডিসেম্বরের এক শীতের সন্ধ্যায় পঙ্কজ চক্রবর্তী গিরিশ পার্ক মেট্রো স্টেশনের সামনে ঝাঁপ দেয়। গড়িয়ার খালপাড়ের ফ্ল্যাটে থাকা পঙ্কজ তিন লাখ টাকা দেনা রেখে টালিগঞ্জ থেকে টিকিট কাটে গিরিশ পার্কের। ভিড়ে ঠাসা মেট্রোটা গিরিশ পার্ক স্টেশনে ঢুকছে। স্পিড কমাচ্ছে। স্টেশনে থামবে। ঠিক সময় পঙ্কজের জাম্প। নিখুঁত ফিনিশ। সঙ্গে সঙ্গে পঙ্কজ আর ওর ব্যাঙ্কের তিন লাখ টাকার ধারও ফিনিশ।
    পঙ্কজ তখন ভাবার চেষ্টা করছে, কী ফেলে এখানে এসেছে। আবছা মনে পড়ল তিন লাখ টাকা দেনার কথা। চেষ্টা করেও আর কিছু মনে করতে পারল না। সঞ্জীবের শেষ কথাটা কানে বাজছিল শুধু। ‘আমাদের আরও বেশি করে ভূত হতে হবে।’

    মানস রায় এসবের কিছুই জানত না। এসব তার জানার কথাও নয়। রোজ সে মেট্রো চেপে অফিসে যায়। রাত্রে মেট্রোতেই ফিরে আসে। মন দিয়ে চাকরি করে। বউ-ছেলে নিয়ে সংসারের দায়দায়িত্ব পালন করে। তার ফ্ল্যাটের লোন আছে, এসির লোন আছে, বাবা-মাকে দেখতে হয়, এল আই সির প্রিমিয়াম দিতে হয়। মাঝেমধ্যে সে শুনতে পায় মেট্রোয় মানুষ আত্মহত্যা করছে। অনেকদিন ধরেই ট্রেনের সামনে মানুষ ঝাঁপ দেয়। লাইন কিছুক্ষণ বন্ধ থাকে। ভিড় বাড়ে। চূড়ান্ত দুর্ভোগ হয়। সেও এরকম অবস্থায় পড়েছিল কয়েকবার। তবে এসব নিয়ে কোনওদিন ভাবেনি। শুধু কখনও কখনও মনে হয়েছে, এরা এত সাহস কোথা থেকে পায়? নিজেকে এইভাবে কেউ কষ্ট দিতে পারে!
    রাতে বাড়ি ফিরে মানস টিভি দেখছিল। খবরের চ্যানেলগুলো ঘোরাচ্ছিল। চোখ আটকে গেল। একটা লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে। প্রথম চোখ পড়ল টিভির স্ক্রিনের তলায় ব্রেকিং নিউজটাতে। ‘জীবিত আর মৃতদের সহাবস্থান, সরকারের অভিনব উদ্যোগ।’ ক্যামেরা একটা ভিড় দেখাচ্ছে। অনেক মাথা। মানুষের মাথা। ভিড়টা এগোচ্ছে। গেল একটা আলো ঝলমলে জায়গায়। ওখানে শামিয়ানা। মনে হচ্ছে মেলার মাঠ। টিভিতে ভয়েসওভার চলছে। ‘পৃথিবীতে প্রথম। মরে যাওয়া মানুষের পুনর্বাসন।’ ক্যামেরার অ্যাঙ্গেলে বোঝা যাচ্ছে আলাদা ব্যারিকেডের মধ্যে ভিভিআইপিরা। মানস বুঝল, তোড়জোড় বেশ চলছে। ভয়েসওভারে তখন সরকারি এই উদ্যোগের শিলান্যাসের কথা বলছে। একটু পরেই হবে।
    মানস আধশোয়া অবস্থায় টিভি দেখছিল আর চমকে চমকে উঠছিল। রাস্তা, ব্রিজ, রেললাইন এসব প্রকল্পের শিলান্যাসের কথা শুনেছে। কিন্তু এ তো একদম অন্যরকম। পুরো ব্যাপারটাই চমক। তার খুব ভাল লাগছিল ভেবে, দেশের সরকার ইচ্ছে করলে কত কিছু করতে পারে।
    টিভিতে দেখে যাচ্ছে, সবাই তৈরি হচ্ছে। শিলান্যাস এক্ষুনি হবে। ক্যামেরাম্যান জুম করে দেখিয়ে দিয়েছে পর্দা ঢাকা একটা বিশাল ফলক। মানস নিজেও ভাবছে, একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত লাইভ দেখতে পারবে। ভেতরে ভেতরে সে ফুটছিল। মরে যাওয়া মানুষরা আমাদের মতো বেঁচে থাকা মানুষদের সঙ্গে থাকবে!

    সব কিছু ঠিকঠাক চলছিল। হঠাৎ করে ক্যামেরা কেঁপে উঠল। ছবি নড়ছে। নিউজ রিডার আমতা আমতা করছে। বড় বড় অনুষ্ঠানে অবশ্য এইরকম হয়েই থাকে। না, তা তো নয়। কিছু মানুষ ছুটছে। যেন ভয় পেয়েছে। পুলিশ লাঠি হাতে পালাচ্ছে। পুলিশের মুখেও ভয়। সব ছবি কাঁপা কাঁপা। কারা যেন সব লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে। যারা দড়ি দিয়ে বেড় ধরে ছিল তারা দড়ি ফেলে পালাচ্ছে। কেউ বুঝতে পারছে না কেন এসব হচ্ছে। স্পটে যে রিপোর্টার, সেই মেয়েটিও কাঁপা গলায় বলছে, ‘দলবেঁধে কিন্তু কিছু মানুষ কিন্তু গণ্ডগোল পাকানোর চেষ্টা করছে কিন্তু।’ ছবিতে বোঝা যাচ্ছে, সবার মুখেই ভয়। কেউ কেউ অসুস্থ। অজ্ঞান হয়ে পড়ছে। টিভির পর্দার নীচে আবার ব্রেকিং নিউজ— ‘সরকারি অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা। বানচাল করার ছক।’ ক্যামেরাম্যান ভয় পেয়ে অনেক দূরে পালিয়ে গেছে। ক্যামেরায় খুব অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে— ছায়া ছায়া কারা যেন পর্দা ছিঁড়ে সরকারি প্রকল্পের পাথরের ওপর কালো কালি লেপে দিচ্ছে। ক্যামেরাম্যান জুম করেছে। কালো কালির ওপর সাদা দিয়ে ওরা কী যেন লিখছে। ক্যামেরাম্যান আপ্রাণ চেষ্টা করছে জুম করে দেখাবার। খুব হালকা। খুব অস্পষ্ট। তবু চোখ ঠিকরে মানস পড়তে পারল সেই লেখা।
    আমরা যেখানে যেমন আছি খুব ভাল আছি।
    আমরা ফিরতে চাই না। ফিরতে চাই না। ফিরতে চাই না।

    চিত্রকর: মৃণাল শীল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More