যন্ত্রমানব

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    বিশ্বদীপ চক্রবর্তী

    রূপালি আজকাল স্বপনের সঙ্গে হেঁটে তাল রাখতে পারে না। কেমন ঝমঝমিয়ে হাঁটে যেন লোকটা। মেল ট্রেনের পারা। নাকি এই দেশে এসে দুটো পাখা গজিয়েছে!
    অথচ আগে কেমন গঙ্গার ধার ধরে আঙুলে আঙুল ঠেকিয়ে হেঁটেছে। এমনও হয়েছে হাঁটতে হাঁটতে পিছিয়ে পড়েছে লোকটা। ওমা, ওখানে দাঁড়িয়ে পড়ে করছে কী লোকটা? রূপালি বকাঝকা করলে আঙুল দেখিয়েছে দূরে।
    ‘দেখলে না ওই বকটা কেমন ঘাই মেরে নীচে নেবে নদীর জল ছুঁয়ে গেল। দেখতে আমোদ লাগে না?’
    কিংবা দাঁড়িয়ে পড়ে কোমরে গামছা বাঁধা ছেলেবুড়োর ঘাটের জলে ঝাঁপাঝাঁপি দেখতে লেগেছে সব ভুলে।
    অমনই চোখ বড় ছিল লোকটা। আর শোনার ধাত। কান পেতে গাছের পাতা নড়ার আওয়াজ শুনবে, বৃষ্টি হলে মাটির ঘ্রাণ নেবে বুকভরে, মগডালে কাকে বাসা বাঁধছে তাই দেখতে দাঁড়িয়ে গেল কখনও বা। বাজারহাটে গেলেও অমনই ধরন। রূপালি কোথায় তাকে ফ্যান্সি স্টোরে ঝোলানো ঝুমকো দেখাচ্ছে, ওনার চোখ যত হাটুরে লোকের চলনে-বলনে। বললে ফিক করে হাসবে, ‘জীবনের হরেক রঙ চারদিকে ছড়িয়ে আছে রে রূপালি, সেসব ঠাহর করে তবে না পা সামনে বাড়াব।
    এই দেখার লোভেই না দেশ ছেড়ে এতদূরে পাড়ি দিয়েছে। না হলে মোদক বাড়ির দুটো মিষ্টির দোকান, জমজমাট ব্যবসা। অবশ্য ব্যবসায় ভাগ নেওয়ার লোকও কিছু কম নয়। ওরা ভাইই তো পাঁচজনা, তারপর আছে দুই বোনের জামাই। ওর মেজদা তপনের কথায়, ‘এক মিষ্টির দোকানে পাঁচ ভাই মিলে গুঁতোগুঁতি করব নাকি? তাই তো নিজের ধান্দা খুঁজে নিতে বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়েছি।’
    অবশ্য তপনের বাড়ি ছাড়ার কারণ ছিল অন্য। বেজাতের মেয়ে বিয়ে করবে, সেই নিয়ে বাড়িতে অনেক হুজ্জুত। কিছুতেই মানবে না কেউ। তপন যে তলে তলে নিজের অন্য ব্যবস্থা করছে সেটা কে জানত? লুকিয়ে রেজিস্ট্রি বিয়ে করেছে, কানাডা যাওয়ার কাগজ বানিয়েছে, তারপর একদিন কাউকে না জানিয়ে বিয়ে করা বউকে নিয়ে হাওয়া। খোঁজ খোঁজ, কে কোথায় পাবে তাদের তখন?

    সে লোক চুঁচুড়া ছেড়েছিল বছর দশেক আগে। কেজো লোক, নানান ধান্দা করে নতুন দেশে বেশ গুছিয়েও বসেছে। তারপর নিজের দাপে বউ বগলে দেশেঘরে ফিরল যখন, তখন বউয়ের কোলে মোদকবাড়ির বাচ্চা ফনফনিয়ে বাড়ছে। পোশাক-আশাকে চেকনাই, মুখ খুললে ইংরেজি শব্দ ছড়াচ্ছে, কথায় কথায় অন্য রঙের টাকা বেরিয়ে আসে। এইসবের পরে বউ জাত না বেজাতের, সেকথা জিজ্ঞেস করতেই লোকে গেল ভুলে। বরং হাঁ করে শুনল সবাই তপনের কথা। ওই দেশের বাতাসে নাকি সুগন্ধি ফুলের বাস, সকালের রোদ গলানো সোনার মতো ফটফটায়।
    ‘ধুলোবালি উড়তে দেখা যায় না সেই আলোয়?’
    এমন উজবুকি প্রশ্নের কী উত্তর দেবে তপন। এর উত্তর শুধু দুই আঙুলের মুদ্রায় উড়িয়ে দিয়ে বরং বলেছে, সেই নীল হ্রদের কথা যার জল সমুদ্রের মত আকাশজমিন এক করা, আর দিনরাত যেখানে জাহাজ চলে ডাক ছেড়ে।
    ‘আমাদের গঙ্গার মতন?’
    ‘ধুস, এমন ঘোলা নাকি সেই জল? নীলের পরে নীল সাজিয়ে ঠিক যেন ময়ূরের গলার মতো বাহারি। আর তোদের গঙ্গায় জাহাজ দেখলি আবার কবে?’
    সবার চোখেমুখে অবাক ফুলঝুরিতে খুশি হয়ে আরও বৃত্তান্ত দিয়েছে তপন। ‘শীতকালে বরফ পড়ে যেন দই, যেদিকে তাকাবে যেন হাঁড়িতে পাতা দইয়ের মতো মোলাম আর তেমনি ধপধপে সাদা।’
    ‘ঠান্ডা লাগে না সে বরফে?’
    তপনের বউ কাজরিই বা চুপ থাকে কেন। ‘ও মাগো! সে কী ঠান্ডা! মায়ের বোনা সোয়েটার মাফলারে ওই শীতের ছুটি করানো যাবে নাকো।’
    ওদের ঘরে হিটারখানা শরীরে কেমন ওম রাখে এরপর সেটাই সবিস্তারে বলেছিল কাজরি।
    ‘আর সে কী চকমিলান শহর! মাটির থেকে উপর পানে তাকালে বাড়ির চূড়া অবধি ঠাহর হয় না।’
    আলোয় ঝলমল করে সেই শহর। রাস্তায় কুটোটি পড়ে থাকার জো নেই।
    এরকম এক শহরে, এরকম এক বাড়ির ওপরতলায় জমিয়ে বসেছে তপন। কাজের ছেলে সন্দেহ নেই। শশী মোদক ছেলের পিঠে চাপড় মেরে বাহবা দিয়েছে।
    শুনতে শুনতে স্বপনের চোখ চকচক। এমন একটা দেশ আছে এই পৃথিবীতেই? দু’চোখভরে দেখতে সাধ যায় এমন দেশটাকে। রূপালিও যেতে রাজি একপায়ে, মেজো বউয়ের মত দুবাই থেকে গয়না কিনবে ও।
    ‘তুই পারবি?’ দশ বছর না দেখা ছোটভাইয়ের দিকে চেয়ে বলেছিল তপন। ‘গায়ে ফুঁ দিয়ে বেড়ালে হবে না কিন্তু। গায়েগতরে খাটতে হবে।’
    ঘাড় কাত করে আটবছরের বড় দাদাকে হ্যাঁ বলেছিল স্বপন।
    মুরুব্বি মানুষ হতে গেলে শুধু নিজের গুছালে হয় না। আর দশটা লোককে জীবনের হাল ধরাতে পারলে তবেই না! স্বপন যখন এই দেশে আসার কথা বলল, তপন বউয়ের সঙ্গে একটু শলাপরামর্শ করল বইকী। ভাই যতদিন নিজের পায়ে না দাঁড়াবে, থাকবে তার ঘাড়েই। তাই কাজরির মতো থাকা চাই। তপন কাজরিকে গুছিয়ে যে কথাটা বলল তার সারমর্ম হল, তপন যে মোদক ইন্টারন্যাশনাল নামে একটা মিষ্টির দোকান দেবার ভাবনা ফেঁদেছে, সেখানে ভাইকে কাজে লাগানো যাবে। বিশ্বস্ত লোক পাওয়ার অভাবেই না দোকানটা নিয়ে এগোনো যাচ্ছে না।
    ‘সে তুমি কবে দোকান দেবে, কবে কাজে হাত লাগাতে হবে তার কোনও ঠিক আছে? ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হয় কক্ষনো?’
    কাজরির এমন যুক্তিপূর্ণ কথায় স্বপন মাথা চুলকে অন্য ফিরিস্তি ধরে। কথাটা এইভাবে সাজাল– ‘বাচ্চা এখনও ছোট, হাতে হাতে কাজ করার লোক পাওয়া যায় না, রূপালিকে দেখে বেশ চটপটে মনে হয়’ ইত্যাদি। এই ইঙ্গিতটা কাজরির বেশ মনে ধরে। যদিও ওদের খাওয়াপরার পয়সাটা কে দেবে এই চিন্তাটা মাথায় বিনবিন করছিল তখনও। তপন নিশ্চিন্ত করল এই বলে যে, গায়ে খাটতে পারলে এখানে কাজের অভাব নেই, সে এতদিন থেকে ঘাঁতঘোত বুঝে নিয়েছে অনেক।
    বেশ গায়েগতরে খাটতে হবে রে স্বপন। পইপই করে সেই কথাটা বলেছে তপন। যে কোনও কাজ পেলেই করতে হবে। মোদকবাড়ির ছেলে, সেই কথাটা মাথায় ঠাঁই পেতে রাখিস না।
    তপন কাউকে যেটা বলেনি এবার সেই কথাটা বুঝিয়েছে ছোটভাইকে। সেটা হল, ওই দেশে পত্তন গেড়ে হেন কাজ নেই সে করেনি। সে ঘরসাফাইয়ের কাজ হোক কিংবা রাস্তা বানাবার মজুরগিরি। পেটে কিল মেরেও থেকেছে কত রাত, সোনার দেশ বলে কিন্তু পথেঘাটে টাকা পড়ে নেই।
    এইভাবে পাখিপড়া করিয়েছে তপন। মাস ছয়েক বাদে কাগজপত্রের ব্যবস্থা হওয়ার পর দাদার টাকায় বউ বগলে স্বপন কানাডার টরোন্টো শহরে হাজির।

    এসে অবধি স্বপন আর রূপালি বাতাসে ফুলের ঘ্রাণ নিয়েছে, রোদে সোনা চলকাতে দেখেছে, ওন্টারিও হ্রদের জলে নীল রঙের বাহার দেখতেও ছাড়েনি। শহরের চকচকে রাস্তা, ঝকঝকে বাড়ি আর হরেক পসরা সাজানো দোকান দেখতে দেখতে রূপালি স্বপনের হাত আরও জোরে আঁকড়ে ধরেছে।
    কিন্তু শুধু দেখায় তো জীবন ভরে না।
    জীবন ভরানোর জন্য তপন পারে বটে খাটতে। ‘সবাইকেই খাটতে হয় রে বাবা, চারদিকে যে হরেক পসরা দেখিস সেসব তো হাতের মোয়া নয়, মিনিমাগনাও দেবে না কেউ।’
    তপন রাস্তা বানাবার কাজ করে, শনি-রবিবার জলের কল সারানোর কাজ নেয়। এতে নাকি অনেক পয়সা। কাজরি যায় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে বেচাকেনা দেখতে। স্বপন দাদার চেনা হোটেল তন্দুরি হাটে ওয়েটারের চাকরি নিয়েছিল প্রথমে। রূপালি রাত্রে বিছানায় গুজগুজ করছিল, স্বপনেরও কেমন লাগছিল এটা। মোদকবাড়ির ছেলে ওয়েটার? ছ্যাঃ! তার ওপরে রূপালির তাগাদা, ‘নিজেদের একটা জায়গা খোঁজো। দাদার বাড়ি আর ক’দিন?’
    ‘কেন, বউদি কিছু বলছে নাকি?’
    ‘বলেনি, বলতে কতক্ষণ! আমাকে রাতদিন বেগার খাটাচ্ছে। মিনিমাগনা একটা কাজের লোক পেয়েছে যে।’ বরের কাঁধে ফোঁসফোঁস করেছে রূপালি।
    সব পেয়েছির দেশে এসে পড়ে টাকার মাহাত্ম্যটা নতুন করে বুঝেছে স্বপন। মুফতে কিছুই হয় না। যতটা চাই ততটা কব্জা করা যায় না কিছুতেই। আর কাল পর্যন্ত যেটা চাইত বলে জানত না, এখন সেটা না হলে জীবন মহানিশা হয়ে পড়েছে।
    তাই এখন সোনা ঝরানো রোদ, সুবাস তোলা বাতাস আর নীল হ্রদের জল পিছনে ফেলে লম্বা লম্বা পায়ে হাঁটে স্বপন। হাঁটার ছন্দটা বদলিয়ে যাচ্ছে। চোখ কান মাথাকে একত্র করে হাঁটে স্বপন।


    আমাজনের গুদাম, মাসি স্কোয়ারে দাদার বাড়ি থেকে প্রায় মাইল দশেক। মাইল দশেক শুনতে এমন, কিন্তু এদেশে দশ বিশ মাইলের দূরত্ব নস্যি। হেঁটে ভিক্টোরিয়া স্টেশন, মাঝখানে ট্রেন বদলে শেষে কিং স্টেশনে। ট্রেনগুলো এমন সময়মতো চলে যে, মাঝখানে ট্রেন বদল করেও এই রাস্তা পেরোয় ঠিক আঠাশ মিনিটে। ট্রেনে উঠেও কাঁটায় কাঁটায় সেকেন্ড মিনিট ধরে পৌঁছে যাওয়াটা স্বপনকে তাজ্জব করত প্রথম প্রথম। এতদিন জীবনটা চলত ঘণ্টার হিসাবে। সেই একেক ঘণ্টায় কাজের সঙ্গে অনেক অকাজ জুড়ে দেওয়া যেত।
    এখন আর করে না। স্বপনের নিজের প্রতিটা পদক্ষেপও এখন সেকেন্ডের কাঁটায় মাপা। ঘর থেকে হেঁটে ট্রেন স্টেশনে আসে পাঁচ মিনিট পঁচিশ সেকেন্ডে, আগে দশ মিনিটের বেশি লাগত। রাস্তার মানুষ, দোকান এসব দেখতে দেখতে হাঁটত স্বপন। এখন চলে রোজ ঘড়ির কাঁটা ধরে।
    এমনকি ঘরে খেতে বসেও তাই। ‘ঠিক ছয় মিনিটে খেতে হবে বুঝলে।’
    ‘সে আবার কী কথা? ওইভাবে সময় ধরে খায় নাকি কেউ?’
    বুঝদারি হাসি হাসে স্বপন। ‘কেন নয়? মনে করো ভাতের মধ্যে ডাল ঢাললাম, কত সেকেন্ড?’
    ‘ওটাও ঘড়ি দেখে করবে?’
    ‘আহা ঘড়ি দেখতেও হয় না। মনে মনে গুনতে থাকি তো। আমাদের শিফটের যে ম্যানেজার জোসেফ, সে তো বলে আমাদের শরীরে একটা ঘড়ি আছে, ওইটাকে প্যাঁচ মারতে হয় ঠিকঠাক। তাহলে শরীরটাও ঘড়ির নিয়মে চলবে।’
    ‘হ্যাঁ গো, তুমি ওদের সব কথা বুঝতে পারো?’ এই দেশে এই এক মহাবিপত্তি রূপালির। তাও তো সে একা বাইরে বেরোয় না। বেরোলেও চারপাশে কত রকমের কচকচি শোনে, মাথায় ঢোকে না কিছুই। স্বপন জোসেফ, মিগুয়েল এদের কথা বুঝে নিচ্ছে ভেবেই বুকটা কেমন আনন্দে ধরাস ধরাস করে রূপালির। এতবড় একটা জায়গায় কাজ করে স্বপন, আমাজন ফিলিং সেন্টার! দশমাথা উঁচু যার ছাদ, তিন মাঠ পেরিয়ে তার বেড়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড়লোক নাকি এর মালিক।
    ‘বুঝতে হয় রে বাবা, না হলে কাজ করব কী করে। তবে কথা বলার এত সময়ই বা কোথায়? গুদামের এই মাথা থেকে ওই মাথা দিনভর তো শুধু দৌড়াচ্ছিই। শুধু দৌড়? কখনও হামাগুড়ি, কখনও আকাশের তারা অবধি উঠে যাওয়া মইতে চেপে তরতর করে উপরে উঠে উঁচুর শেলফ থেকে জিনিস নাবানো’– স্বপনের দিনের হিসেব তো এইসবের সঙ্গেই জোড়া।
    সময়ের হিসেব-নিকেশ, হাত-পা চালানোর সহজতম পদ্ধতি ভাবতে ভাবতে কিং স্টেশন থেকে আবার হাঁটা লাগায়। মিনিট তিনেকের হাঁটা কিন্তু স্বপন সাত মিনিট রেখেছে। না রেখেও উপায় নেই। আটটার একমিনিট আগে গেলেও গুদামে ঢুকতে পাবে না। কম্পিউটারের সব অঙ্কগুলো ওলটপালট হয়ে যাবে নাকি তাহলে। মিগুয়েল, পেগি, ওয়াল্টার, সেলিম এরা সবাই দাঁড়িয়ে থাকে লাইনে। সময় হলে অস্ত্রের মত স্ক্যানার বাগিয়ে সবাই সার দিয়ে ঢোকে।
    তাই এই চার মিনিটের অপচয় স্বপনকে ভাবায় না। বরং গুদামে ঢোকার আগে ওন্টারিও লেকের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে খানিক। ধূসর ডানা, গলায় কালো দাড়ি দাড়ি টানা একগুচ্ছ বক ডানা মেলে উড়ে যায়। লেকের রুপোলি জলে ছায়া পড়ে না। উত্তেজনায় দমবন্ধ হয়ে আসে স্বপনের। চুঁচুড়ার বাড়িতে তার পোষা পায়রা ছিল হাফ ডজন। ছিল নিজের হাতে পোঁতা পেয়ারা গাছ, কাশী থেকে কলম এনেছিল। এখানে গুদাম চত্বরে ঢোকার মুখে সার দিয়ে কয়েকটা বাদাম গাছ। অন্য রকম বাদাম। মিগুয়েল বলেছে, পেকান। গাছগুলো এখনও বাড়ছে, তাই হাত বাড়িয়ে সবুজ পাতা ছোঁয়া যায়। এই গাছের গুঁড়ি ধরেও একমিনিট দাঁড়ায় স্বপন, গাছের গুঁড়িতে হাত বুলিয়ে নিজের পেয়ারা গাছটার ছোঁয়া খোঁজে। ওইটুকুই। তারপরেই দৌড়ে সবার সঙ্গে লাইনে জুড়ে যায় আটটা বাজার আগেই। একমিনিটও দেরি করার নিয়ম নেই।


    ‘আলিবাবার সেই গুহাটার কথা মনে আছে রূপালি?’
    ‘ছবিতে তো? ওই যে চিচিং ফাঁক বলতেই সড়সড় করে গুহার দরজা খুলে গেল আর ভিতরে সারি দিয়ে থাকে থাকে হিরে জহরত।’ স্বপনের পিঠ মালিশ করতে করতে বলে রূপালি। দিন দিন ওর কাঁধ আর পিঠ কেমন শক্ত হয়ে উঠছে। তেমনি শীতল। যেন ইস্পাত।
    ‘আমাজনের গুদামটাও অমনই। যেই দরজা খুলল, আমরা সবাই সারি দিয়ে ঢুকলাম। থরে থরে জিনিস, যেদিকে দু’চোখ যায়। ভিতরে ঢুকলে জায়গাটার ল্যাজামুড়ো খুঁজে পাবে না। যেমন লম্বায়, তেমনই চওড়ায়। আর সে উঁচু কত!’
    সত্যিই কেমন গুহার মতো মনে হয় স্বপনের। একেকটা বে-তে যখন জিনিস নেবার জন্য ঢুকে পড়ে, দু’দিকে সারি সারি জিনিস সেই উঁচু অবধি সাজানো, কোনওদিকে স্বপন ছাড়া আর কোনও মানুষ দেখা যাচ্ছে না, কেমন গা ছমছম করে। শুধু সে আর তার স্ক্যানার। মাঝেমাঝে মনে হয় জিনিসগুলো যদি ঝমাঝম তার মাথায় পড়তে থাকে, কী করবে স্বপন?
    রূপালি আঙুলের খোঁচা দিয়ে স্বপনকে মনের দুনিয়া থেকে বের করে আনে। ‘আর অমনি হিরে জহরতে ভরা?’
    ‘আহা, তা কেন হবে। কিন্তু এইসব জিনিসেরও তো দাম কিছু কম নয়। সারা বিশ্বের লোকের কত কী যে চাই। চাই, চাই শুধু চাই। তাদের কাছ থেকে কাতারে কাতারে অর্ডার আসছে আর আমরা স্ক্যানার হাতে ছুটছি। একবার এই কোনায়, পরের বার হয়তো আর এক কোনায়। কখনও পাতালে, কখনও সেই চূড়ায়। এই হামাগুড়ি দিচ্ছি, তো পরের বার মইতে করে উঠে জিনিস নাবাচ্ছি।’
    রূপালির চোখে আলিবাবা সিনেমার সিন ভেসে ওঠে। স্বপন যেন মুঠো মুঠো করে মণিমাণিক্য তুলছে। কিন্তু অমন এলোপাথারি ছোটাছুটি করে স্বপনদের কাজ থোড়াই হয়। কোনদিকে যাবে, কতটুকু যাবে সব হিসেবমতো। না হলেই সময়ের হিসেবে মেলে না। এমনিতেই জোসেফ খুশি নয় নাকি স্বপনের কাজে। কথায় কথায় বলে, ‘ম্যান, ইউ সাক!’ একেকটা জিনিস জায়গা থেকে উদ্ধার করে প্যাকিং স্লিপ লাগিয়ে ডেলিভারি শাটলে তুলে দেওয়ার কথা আঠেরো মিনিটে। স্বপন নাকি পারছে না।
    ‘তোমার এত সময় লাগে কেন স্যাপান? গতকাল একুশ মিনিট লেগেছে তোমার একেকটা জিনিস নিতে।’ বিরক্তি ছলকে পড়ছিল জোসেফের চোখেমুখে।
    ‘জো, আমার অর্ডারগুলো অমনই ছিল যে। একবার উত্তর দিকের বে-তে যাচ্ছি, তারপর সোজা দক্ষিণে।’
    ‘ডোন্ট ট্রাই টু ফুল মি, স্যাপান। তোমাদের হাতের এই স্ক্যানারগুলো দেখছ? এগুলো আমাদের থেকে অনেক বেশি চালাক। তুমি কোন তাক থেকে কী তুললে, সেটা দেখে পরের অর্ডারটা তোমাকে এমন দেবে যেটা সবচেয়ে কাছাকাছি।’
    স্বপন স্ক্যানারটার দিকে তাকায়। ছোট্ট স্ক্রিনটা চোখ পিটপিট করার মতো জ্বলে-নিভে উঠল। যেন বলল, হ্যাঁ, আমার মাথায় অনেক নিয়ম ভরে দেওয়া আছে, তোমাদের দিয়ে ঠিকঠাক কাজ করানোর জন্য। এইসব ভাবনায় স্বপনের মুখ দিয়ে কোনও কথা বের হয়নি। জোসেফ এবার ঝাঁঝিয়ে উঠল। ‘কী বলছি সেটা মাথায় ঢুকছে কি? তোমরা এইরকম করলে এবার আমাজন কোম্পানি রোবট নাবাবে, রোবট। তোমাদের থেকে অনেক তাড়াতাড়ি কাজ করবে। আর সব লোকের মধ্যে তোমার জায়গাতেই আমি শুরুতে রোবট আনাব। এখনও সময় আছে, ভাল করে কাজ করো।’
    শুনে বুক কেঁপে উঠেছে স্বপনের। একটু একটু করে টাকা জমাচ্ছে, নিজের একটা জায়গা খুঁজে উঠে যেতে হবে। রূপালি আর কাজরির ক্যাচরম্যাচর বেড়েই চলেছে দিনদিন। চাকরি গেলে করবে কী?
    পেগি অবশ্য সেই কথা উড়িয়ে দিল। মেয়ে হলে কী হয়, বেশ পেটাই চেহারার পেগি স্বপনের থেকে আরও ইঞ্চি তিনেক লম্বা। ওজন তুলে-নামিয়ে হাতের পেশিগুলো তার শক্ত, হাসতে হাসতে যখন স্বপনের উরুতে থাবড়া মারে আগের স্বপন হলে নির্ঘাত ওখানেই পটকে যেত।
    ‘তুমি তো নতুন, আমি আছি গত দু’বছর। শুরুর থেকে এই রোবট আসার গল্প শুনছি। দু’বছর আগে এক স্ক্যান থেকে আরেক স্ক্যানের মাঝখানে বাইশ মিনিট সময় দিত। রোবট আসছে, সেই গল্প শুনিয়ে শুনিয়ে সেটাকে আঠেরো মিনিটে নিয়ে এসেছে।’
    ‘জোসেফটা খুব বদমাশ তো।’ স্বপনকে খামোকা ভয় পাইয়ে দিয়েছে। একটা স্বস্তির বাতাস খেলে গেল স্বপনের বুকে।
    মিগুয়েল একটু দরাজ। ‘আরে ও কী করবে, ওর সময়ও তো এমনই হিসাবে চলে।’
    ‘ওর তো চিন্তা নেই, ওর কাজ তো আর রোবটে করবে না।’ জোসেফের ওপরে তখনও রাগ যায়নি স্বপনের। সব সময় এমন খবরদারি করে লোকটা।
    পেগি এবার হাতের স্ক্যানারটা দেখায়। ‘দেখছ, আমাদের হাতের এই যন্ত্রটা? গত দুই বছরে এটা তিনবার পাল্টেছে।’
    ‘কেন, ভালভাবে কাজ করে না?’
    ‘আরও ভালভাবে কাজ করানোর জন্য। জোসেফদের কাজগুলো এই স্ক্যানারে আরও বেশি বেশি ঢুকিয়ে দিচ্ছে ওরা। আগে জোসেফরা আমাদের সারাদিন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত। এখন সেই কাজ করে এই স্ক্যানার।’
    ‘কীভাবে?’
    ‘একেকবার একটা প্যাকেজ স্ক্যান করছ, তারপর থেকে ও তোমার হাঁটার হিসেব রাখছে। কতবার দাঁড়ালে, কত জোরে ছুটলে, সোজা হাঁটছ, না ব্যাঁকা। সমস্ত ‘
    ‘তাহলে জোসেফ কী করবে?’
    ‘জোসেফের ঘরের ওই অত বড় স্ক্রিনটা দেখোনি? আমাদের সবার নাম থাকে সার দিয়ে। নিয়মের বাইরে হাঁটলেই সেই হিসাব চলে যাচ্ছে ওই জোসেফের স্ক্রিনে। আমাদের নামের পাশে ঢ্যাঁড়া পড়ছে। ওইখান থেকে লোকটা আমাদের ওপর নজরদারি করে। একদিন ওই স্ক্রিনের হাত পা মুখ গজাবে, জোসেফ ভ্যানিশ হয়ে যাবে।’
    ‘মিগুয়েল ঠিক বলেছে। আগে জোসেফের কাজ পাঁচজন লোক করত, একেকবার নতুন স্ক্যানার আসে, খবরদারি করার লোক কমে যায়। এরপরের বার যখন স্ক্যানার বদলাবে তখন হয়তো জোসেফের চাকরিটাই যাবে।’ পেগি তার স্ক্যানার হাতে আবার কাজের পথে রওনা দিল। ‘তাই বলে ভেবো না, আমাদের কাজগুলো কোথাও যাচ্ছে। রোবট আসছে না মোটেই। সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠার রোবট বানাতে দেরি আছে এখনও।’
    স্বপন তখনও স্ক্যানারের কথা ভাবছিল। ‘তাহলে তখন আমাদের শিফট কে দেখবে মিগুয়েল? এই স্ক্যানারগুলো?’
    ‘এই স্ক্যানারগুলো যে কী ভীষণ মিচকে, সেটা তো জানো না। তুমি কতবার হাঁটু মুড়ে জিনিস নিচ্ছ, কতবার মইতে চড়ছ, সব হিসেব রাখে। আর কতবার রেস্টরুমে যাও, তারও।’ বলতে বলতে হাতের বাকি স্যান্ডউইচটা কাগজে মুড়ে ওভারলের পকেটে ঢুকিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল মিগুয়েল। বারো ঘণ্টায় পনেরো মিনিটের দুটো বিরতি। একমিনিট দেরি করলে স্ক্যানার ঠিক ধরে নেবে।
    কীরকম ভয়ে শিরশির করছিল স্বপন। এই স্ক্যানারগুলো সব বুঝতে পারে? তার পেচ্ছাপ করার সময়েরও হিসাব রাখছে। ক’দিন বাদে এই হয়ে যাবে তার শিফট ম্যানেজার। কীরকম একটা ভয়ভক্তিও আসছিল স্বপনের মনে। হাতের স্ক্যানারটা নিয়ে গদগদ হতে যাচ্ছিল, এটা বিপ বিপ করে উঠল। তার মানে সে আঠেরো মিনিটের সময় পেরিয়ে গেছে আর জিনিসটা ডেলিভারি শাটলে পৌঁছানো হয়নি। ত্রস্ত পায়ে স্বপন তার পরবর্তী জিনিসটার উদ্দেশে ছুটল। স্বপনের হাঁটার ভঙ্গিটা বেশ বদলে গেছে। আগে তার হাঁটা ছিল নদীর মতো। সে ছিল কেমন বয়ে চলার ছন্দ। এখন পা মাটিতে পড়ে ট্যাপের জলের মতো ছড়াৎ ছড়াৎ। স্বপন তার সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে সেই গতি নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে।


    স্বপন হাঁটা প্র্যাক্টিস করে। কিং স্টেশন থেকে নেমে আর এদিক-ওদিক দেখতে দেখতে হাঁটে না আজকাল। লেকের জলে বক দেখে না। পেকানের ডালপালা আরও ফনফনিয়ে বেড়েছে, তার গুঁড়ি ছুঁয়েও দেখে না। পেয়ারা গাছের কথা আর মনে পড়ে না স্বপনের। পায়রার বকবকম শব্দ চলতে-ফিরতে মাথায় আসে না। স্টেশন থেকে গুদামের রাস্তা একমিনিট পঞ্চাশ সেকেন্ডে পেরিয়ে যায় স্বপন। তারপর হাতে বাকি পাঁচ মিনিট দশ সেকেন্ড চক্কর মারে গুদামের চৌহদ্দি ধরে। হাত আর পায়ের চলনবলনে হিসাব মিলিয়ে। হাঁটু ভাঙে কবজি ভাঁজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। তার হাঁটার ভঙ্গি বদলে যাচ্ছে একদম। তার হাঁটা নিয়ে স্ক্যানার মাঝেমাঝেই বাহবা দেয়, ‘গুড জব স্যাপান!’ বলে। আজকাল আর জোসেফ নেই কোথাও। ওই বড় স্ক্রিনটার হয়ে স্ক্যানারই কথা বলে স্বপনদের সঙ্গে।
    স্ক্যানার হাতে গুদামে ঢোকার মুখে প্যান্টের নিচে ডায়াপেরটাকে টেনেটুনে দেখে। আজকাল আর পেচ্ছাপ করতে বাথরুমে যেতে হয় না স্বপনকে। সিঁড়ি দিয়ে মাথায় মাল নিয়ে নামতে নামতেই ছড়ছড় করে হিসি করে, ডায়াপের শুষে নেয় সব। এতেও সময় বেঁচেছে অনেক। আজকাল আঠেরো মিনিটের কাজ সতেরো মিনিটে হয়ে যাচ্ছে স্বপনের।
    তাদের নতুন ঘরে নতুন বিছানায় রূপালি স্বপনকে আঁকড়ে ধরে চমকে চমকে ওঠে আজকাল। ‘তোমার হাত-পাগুলো কেমন পাথরের মতো চ্যাটালো হয়ে যাচ্ছে যেন!’
    ‘অত ভারী ভারী জিনিস তুলি রোজ।’
    ‘হাত-পাগুলো চালাও যেন সিধা সিধা একদম। দেখে আমার কেমন ভয় লাগে।’
    ‘নিয়ম মেনে হাত-পা চালাই রূপালি, এতে হাঁটায় তেজ আসে বেশি।’
    ‘সে নয় কাজের সময়। আমাকে যখন জড়িয়ে ধরো তখনও কেন এমন?’
    ‘কেমনভাবে ধরি?’ মনে করতে পারে না স্বপন। অন্য পাশ ফিরে রূপালি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। আজকাল আর জড়িয়ে ধরে কোথায়? রসকষ কিছু আর বাকি আছে লোকটার? সময়ের সঙ্গে ছুটতে ছুটতে কেমন ধারা হয়ে গেছে। সেই মানুষটা আর নেই যেন।
    স্বপন আগেকার দিনের মতো রূপালির মুখ নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয় না। বরং মাথায় হাঁটার স্বপ্ন দেখে। না, স্বপ্ন নয়, হাঁটার ছক কষে। কীভাবে আরও তাড়তাড়ি হাঁটা যায়, কত সহজে হামাগুড়ি দিতে দিতে জিনিস নিয়ে উঠে দাঁড়ানো যায়। রূপালিকে বিছানায় রেখে মেঝেতে উঠে দাঁড়ায় স্বপন। পা দুটোকে রাখে সমান্তরালে, কোমর থেকে শরীরটাকে ভাঁজ করায় একদম সোজাসুজি। ঘাড় থেকে হাত ঝুলিয়ে দেয় একদম মেঝে বরাবর, তারপর কনুই ভাঙে পাক্কা নব্বই ডিগ্রিতে। আবার নিজেকে গুটিয়ে নিতে নিতে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। বারবার এরকম চলতেই থাকে। কোনও রোবটও এরকম পারবে না। একেকটা জিনিস আনতে এরপর পনেরো মিনিটের কম লাগবে। কম লাগাতেই হবে।
    পারবে, এই বিশ্বাস নিয়ে স্বপন গটগটিয়ে ঢুকছিল গুদামে। তার মাথা আজকাল পরিষ্কার। সেখানে বকে কোনও ছায়া ফেলে না, পেয়ারা পাতার গন্ধ আসে না নাকে-– চোখ কান মন সব যেন জমা হয়েছে তার হাত-পায়ের সব ক’টা কলকব্জায়, যেগুলো চলে যত্নে তেল দেওয়া যন্ত্রের মতো। হাত-পা চলছিল তেমনি ছন্দে। নীচে থেকে জিনিস তুলতে আর হামাগুড়ি দিতে হচ্ছে না স্বপনকে, শরীরটা ভেঙে যাচ্ছে ঠিক তিনভাগে আর নীচ থেকে উঠিয়ে তুলছে প্যাকেজ। যেমন ভেবেছিল তাই, তার প্যাকেজ তুলে শাটলে পৌঁছে দিতে এখন লাগছে চোদ্দো মিনিট চল্লিশ সেকেন্ড। স্ক্যানারটা পারলে বোধহয় তার পিঠ ঠুকে দিত। স্ক্রিনে বলেনি কিছুই, কিন্তু ওর সঙ্গে কেমন ভিতরকার সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে স্বপনের, ভিতর ভিতর খবর চলতে থাকে।
    অবাক হতে পারে না আজকাল স্বপন কিছুতেই। না হলে হয়তো অবাক হয়ে ভাবত কেন পেগি, মিগুয়েল কেউ আর নেই ধারেকাছে কোথাও। এতবড় গুদামে শুধু স্বপন আর স্ক্যানার। সব কিছু চলছে শুধু এই দুইজনায়, তাতেই হিসাবমতো মাল পৌঁছে যাচ্ছে সবার কাছে, একদম সময়ের কাঁটা ধরে।
    মুশকিলের মধ্যে, চুঁচড়োর স্বপনকেই আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও।

    চিত্রকর: মৃণাল শীল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More