গাছ কথা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

নির্মলকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

নিশীথবাবু শান্তশিষ্ট নিরীহ মানুষ। কথা কম বলেন। কারও সাত-পাঁচে থাকেন না। অবশ্য অন্যভাবে বলা যায়, উনি সাত-পাঁচেই থাকেন। প্রোমোটার বারোতলার এই বিশাল বাড়িটার নাম রেখেছিল ‘চাঁদের হাসি’। এ তল্লাটে এত উঁচু বাড়ি একটাই। সম্ভবত এ বাড়ির ছাদ থেকে চাঁদকে ছোঁয়া যায়, এমন একটা ধারণা থেকেই এই নামকরণ। সেই ‘চাঁদের হাসি’-র সাততলার পাঁচ নম্বর ফ্ল্যাট নিশীথবাবুর। আশপাশের কাউকেই তিনি চেনেন না। কারও খোঁজও রাখেন না। তিন মাস অন্তর ম্যানেজমেন্ট অফিসে গিয়ে নিজের সার্ভিস চার্জটুকু মিটিয়ে আসেন। ঘরে দিনরাত বাতের ব্যথায় কষ্ট পাওয়া স্ত্রী পার্বতী। বেশ কয়েক বছর ধরে দু’জনের বাক্যালাপ বন্ধ। কখনও কখনও ইশারায় দু’একটা কাজের কথা বোঝানোর চেষ্টা ছাড়া। শেষঝগড়াটা কবে, কী নিয়ে হয়েছিল মনে পড়ে না আজ। বাইরে একঘণ্টা বাসের পথ পেরিয়ে তাঁর কর্মস্থল-– সূর্য সেন উচ্চমাধ্যমিক। তিনিই হেডমাস্টার। সম্ভবত তাঁর অন্তর্মুখী চরিত্র আর বিনয়ী স্বভাবের জন্যই কেউ সচরাচর তাঁকে বিরক্ত করে না। ফলে স্কুলই হোক বা বাড়ি, তিনি শান্তিতেই থাকেন।

এহেন নিশীথবাবুর টেবলে বিডিও-র সই করা ছাপানো নিমন্ত্রণপত্র। ব্লক অফিসে বনমহোৎসব এবং গাছ লাগানোর অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি হিসেবে তাঁরই নাম। প্রথমটা চমকে ওঠেন তিনি। পরে বিডিও সাহেবের অনুরোধে ছোটখাট একটা বক্তৃতা প্রায় মুখস্থ করে, লম্বা ছাতাটাকে লাঠি বানিয়ে, ঠুকঠুক করে সভায় হাজির হন।

মাঠের চারদিকে গাছগাছালির ভিড়। তাদের মধ্যে থেকে একটা উঁচু নারকেলগাছকে বেছে নেন তিনি। নিজের নামঘোষণার পর মাইকে দাঁড়িয়ে সোজা নারকেলগাছের মাথায় দু’চোখকে আটকে রেখে গড়গড় করে বলতে শুরু করেন। সতর্কভাবেই নিজের বক্তৃতায় ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’, ‘ডিফরেস্টেশন’, ‘সমাজভিত্তিক বনসৃজন’ জাতীয় দু’চারটে আধুনিক শব্দও ঢুকিয়ে দেন। তিনি জানেন, এতে বক্তৃতার ওজন বাড়ে। এর পর বৃষ্টিপাতের সঙ্গে গাছ পোঁতার সম্পর্ক কী, অথবা গাছ কীভাবে অনবরত অক্সিজেন যুগিয়ে প্রাণীকুলকে বাঁচিয়ে রেখেছে, এ সব কথাও উল্লেখ করেন। এর পরই কথা বেশি হয়ে যাচ্ছে ভেবে আচমকা বক্তৃতা থামিয়ে মাইক ছেড়ে সোজা নিজের চেয়ারে। নিশীথবাবুর ভাষণ যে শেষ হয়েছে, মগ্ন শ্রোতারা সে-কথা বোঝেন সভাপতির পরের বক্তার নামঘোষণায়। ফলে নতুন বক্তার বক্তৃতার মাঝেই নিশীথবাবুর জন্য ওঠে হাততালির ঝড়।

এরই মাঝে শুরু হয় হাল্কা বৃষ্টি। তাতে অবশ্য অনুষ্ঠান চলায় কোনও বাধা আসে না। মঞ্চের অতিথিরা সমবেত স্থানীয় মানুষদের সাথে হাত মিলিয়ে গাছ লাগান মাঠের চারদিকে। লরি ভর্তি করে আনা বিভিন্ন গাছের চারা বিলানো হয় তাদের মধ্যে। নারকেল, আম, পেয়ারা, পাতাবাহার। চরম উৎসাহে মানুষ গাছ হাতে ভিজে মাথায় অপেক্ষা করে অনুষ্ঠানের শেষটুকু দেখার তাগিদে। আর এই শেষলগ্নে আবার বিড়ম্বনায় পড়েন নিশীথবাবু। সভাপতি ঘোষণা করেন-– অনুষ্ঠানের শেষপর্যায়ে জেলার এগ্রিকালচার অফিসার শ্রীঅলকেন্দু হীরা মহাশয় আমের চারা তুলে দেবেন প্রধান অতিথির হাতে।

পোড়ামাটির টবে বসানো সরু লিকলিকে একটা আমের চারা প্রায় জোর করেই নিশীথবাবুর হাতে ধরিয়ে দেন অলকেন্দুবাবু। নিশীথবাবু ফ্যালফেলিয়ে তাকান তাঁর দিকে। চেনা মুখের আদল। সে যাই হোক, কী করবেন তিনি আস্ত একটা আমের চারা নিয়ে? ফ্ল্যাটবাড়িতে গাছ রাখার জায়গা কোথায়? নিশীথবাবু চিন্তায় পড়েন। সে-কথা বুঝে অলকেন্দুবাবুই সমস্যার সুরাহা করতে মাঠে নামেন। নিশীথবাবুকে বুঝিয়ে বলেন, ‘মাস্টারমশাই, এ যে-সে গাছ নয়। এ আমাদের সরকারি ফার্মে অনেক গবেষণার ফসল। একবছরেই ফল নিশ্চিত। গাছ হবে লম্বাটে আর অল্প জায়গা জুড়ে। সত্যি বলতে কী, আগামী দিনের কথা ভেবে ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে রাখার জন্যই এমন গাছ তৈরি হয়েছে। আপনার মত গুণীজনের হাতে এটি তুলে দিতে পেরে আমাদের ডিপার্টমেন্ট আজ সত্যিই গর্বিত।’

হাততালির শব্দের মাঝেই নিশীথবাবু টবসুদ্ধ গাছ হাতে নিঃশব্দে বাড়ির পথ ধরেন। ব্যালকনির এককোণে রেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন গাছটার দিকে। বৃষ্টিভেজা পাতায় উজ্জ্বল সবুজের ঝলকানি। হাল্কা বাতাসেই পাতাগুলো নড়ে ওঠে। আস্তে-আস্তে মনে হয়, বাড়িতে বুঝি তৃতীয় কারও আবির্ভাব হয়েছে। একটু-একটু করে গাছটার প্রেমে পড়েন নিশীথবাবু। সকাল-বিকেল দু’বেলা জল দেওয়া শুরু করেন। টবের মাটি বদলে দেন কিছুদিন অন্তর। দোকান থেকে সার এনে ছিটিয়ে দেন গাছের গোড়ায়। গাছও বাড়তে থাকে ফনফন করে। ছ’মাসের মধ্যেই মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় গাছটা। তার পর শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে একটা সবুজ চাঁদোয়া যেন। নিশীথবাবুর আনন্দ ধরে না। রোজ সকাল-সন্ধেয় গাছের পাতায় হাত বুলান। তাদের সাথে বিড়বিড় করেন। নিশীথবাবু এখন গাছে-পাওয়া এক অন্য মানুষ।

একদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে নিশীথবাবু আবিষ্কার করেন গাছটার ঝাঁকড়া মাথার ঠিক মাঝখান থেকে একটা সরু ডাল বেরিয়ে সোজা উপরপানে উঠছে। ক্রমে ডালটা মোটা হয়। আর তার মাথায় তৈরি হয় আরেকপ্রস্থ শাখাপ্রশাখা সমেত সবুজ পাতার শামিয়ানা। মুশকিল হল গাছটার ওই নতুন অংশটা বাড়তে বাড়তে তার সীমানা ছাড়িয়ে গিয়ে থামে, উপরের তলার ব্যালকনি বরাবর। নিশীথবাবু প্রমাদ গোনেন। অঙ্কের নিয়মে উপরেই আটের পাঁচ। সেখানে কে থাকেন, কেমন লোক, কিছুই জানেন না তিনি। তাঁর পোষ্যের এই অদ্ভুত আচরণ কতটাই বা মেনে নেবেন তাঁরা। যাই হোক, ঠান্ডামাথায় অপেক্ষা করাই উচিত বলে মনে হয় তাঁর। তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন। একসময় নিশ্চিন্ত হন, রসালতরুর ওই খামখেয়ালিপনায় কেউ বিরক্ত হননি। ভাল প্রতিবেশী এখনও আছে বইকী! নিশীথবাবু হাঁফ ছাড়েন।

নিশীথবাবু দোতলা বাসে চড়েছেন। দোতলা ট্রেনও দেখেছেন। তা বলে এমন দোতলা গাছ আগে কখনও দেখেছেন বলে মনে করতে পারেন না। পাহাড়ি অঞ্চলে এমন গাছ হয়তো দেখা যায়, তবে তিনি নিশ্চিত সেগুলো বাহারি গাছ। অন্তত আম জাম বা কাঁঠালগাছ নয়। তাঁর ব্যালকনি থেকে গাছের উপরের তলার নিচের অংশের পাতার ঝোপটাই খালি দেখা যায়। তাতে অবশ্য কিছু যায়-আসে না। নিশীথবাবু গাছের যত্ন করেন তার গোড়াটাকে ঘিরে। আর আদর করেন গাছটার যে মাথাটা তাঁর হাতের নাগালে, তারই ডালপালা বা পাতাকে ছুঁয়ে। তাঁর একঘেয়ে জীবনে গাছটা যেন একপশলা ঠান্ডা বাতাস।

এর পর কেটেছে আরও মাসছয়েক। সে-দিন কোনও কারণে স্কুলে তাড়াতাড়ি ছুটি হয়েছে। ও-দিকে এক্সটেনশন পিরিয়ড শেষ হয়ে সামনেই তাঁর রিটায়ারমেন্ট। নিজের ফ্ল্যাটের সামনাসামনি কম্পাউন্ডের ছোট গেট পেরিয়ে স্কুলফেরতা বাড়ির দিকে পা বাড়ান তিনি। মাথায় ছাতা। চোখ যথারীতি মাটির দিকে। ঠকাস শব্দ করে কী যেন একটা পায়ের কাছে এসে পড়ে। থমকে দাঁড়িয়ে জিনিসটা ভালভাবে দেখতে থাকেন নিশীথবাবু। একটা আমের আঁটি। চেটেচুষে পরিষ্কার করে খাওয়া ছোটখাট আঁটিটার দিকে তাকিয়েই বোঝা যায়, বেশ ভাল জাতের আম। মনে হয়, চুষতে গিয়েই কারও হাত গলে নিচে পড়েছে। ছাতাটাকে মাথার পিছনে ঠেলে চোখ তুলে উপরের দিকে তাকান তিনি। সরষে ফুল নয়, স্পষ্ট দেখেন তাঁরই পালন করা আমগাছটার দোতলা ঝোপটা তাঁর উপরের ব্যালকনিতে নুইয়ে পড়েছে ফলের ভারে। পাতার ভিড়ের মাঝে সেখানে থোকা-থোকা ঝুলছে লাল টুকটুকে অমৃতফল। তারই মাঝখান থেকে একটা মুখ সরে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে। নিশীথবাবু চোখ নামিয়ে অবাক হয়ে দেখেন গাছটার একতলার ঘন সবুজ যে অংশটা তাঁর ব্যালকনিতে শোভা পাচ্ছে, সেখানে শুধুই পাতার জটলা।

গাছেদের এমন অদ্ভুত আচরণ আগে কখনও শোনেননি তিনি। বইতেও পড়েছেন বলে মনে পড়ে না তাঁর। মুহূর্তে মনস্থির করেন। বাড়ির দিকে না এগিয়ে হাঁটা দেন সোজা ম্যানেজমেন্ট অফিসের দিকে। ভালমানুষির দিন শেষ। এখুনি একটা কমপ্লেন করা দরকার। হাজার হোক গাছটার প্রতিটি পাতায়, প্রতিটি ফলে তাঁরই যত্ন, তাঁরই পরিশ্রম। পৃথিবীর যে কোনও নিয়মেই বিচার করা হোক না কেন, গাছটার মালিকানা আদপে তাঁরই।

সার্ভিস চার্জ জমা নেবার জাবদা খাতাটা খুলে পাতা উলটে-উলটে একসময় থামে অফিসে নতুন যোগ দেওয়া ছেলেটি। –‘কত নম্বর বললেন, স্যার? আটের পাঁচ? হ্যাঁ, এই তো। মিস্টার অলকেন্দু হীরা।’

নিশীথবাবুর মাথায় বাজ পড়ে। তার বিদ্যুতের আঁচ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেহে। চেয়ারের পিঠে ঝোলানো ছাতা ভুলে কাঁপতে-কাঁপতে হনহন করে ছোটেন নিজের ফ্ল্যাটের দিকে। কলিং বেলের অস্বাভাবিক একটানা আওয়াজে চমকে উঠে ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে দরজা খোলেন পার্বতী। সোজাসুজি তাকান কর্তার দিকে। ও-দিকে নিশীথবাবুর রাগী চোখ দুটোও স্থির হয় পার্বতীর সদ্য ঘুমভাঙা মুখটার ওপরে। কেমন যেন একটা টলটলে ভাব। একটু হলেও রাগটা বোধহয় কমে আসে তাঁর। সরাসরি ধর্মপত্নীর চোখে চোখ রেখে নরম গলায় শুধিয়ে ওঠেন, ‘পারু, আমাদের কাটারিটা কোথায় বলতে পারো?’

চিত্রকর: মৃণাল শীল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More