দশতলায় সেদিন…

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

ছন্দক বন্দ্যোপাধ্যায়

পথচলতি খেয়ালে

নাকতলা থেকে শহিদ ক্ষুদিরাম মেট্রো স্টেশনের পাশে পনেরোতলা আন্ডার-কন্সট্রাকশান বাড়িটায় পৌঁছতে সুতপার ঠিক আধঘণ্টা সময় লাগল, আগের ট্রেনটা মিস করল-– তা না হলে বড়জোর পনেরো-বিশ মিনিট লাগার কথা।
বাড়িটা আপাতত চোদ্দোতলা অব্দি হয়েছে। আগেরবার যখন মাস-দুয়েক আগে একবার এসেছিল এখানে, তখন তেরোতলা হয়েছিল। এর মধ্যে আরও একটি নবীন তলার জন্ম হয়েছে।

এখন দুপুর দুটো। সবে পয়লা বৈশাখ গেছে দশদিন আগে। বাতাসে আগুনের ছোঁয়া। গোটা শহরটা যেন কুণ্ডলী পাকিয়ে জিভ বের করে হাঁপাচ্ছে-– দম নিচ্ছে।
সুতপা বাড়িটার সামনে এসে একবার চোখ তুলে দেখল। উত্তাপ মেশানো বাতাসের মাঝে ঝিরিঝিরি করে কাঁপছিল জানলাগুলো, জানলার বাইরে লোহার চৌকো খোপকাটা ফ্রেমে বসা লোকজন।
সুতপার পরনে হাল্কা নীল রঙের শাড়ি। কার্বন ফ্রেমের চশমা আঁটা ফরসা মুখটা রোদে থমথম করছে। ওর কাঁধে সস্তার চামড়ার ব্যাগ। তার মধ্যে জলের বোতল, ওষুধের লিস্ট, মাসের বাজারের ফর্দর সাথে জড়াজড়ি করে আজকে সকালে আসা চিঠিটাও আছে। এই চিঠির জন্যই আজ এখানে আসা-– কাউকে না জানিয়ে, আগেও যেমন ও এসেছিল।

সুতপার সারাপিঠে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে। একটু আগে মেখে বেরনো পাউডারের অনেকটাই চেটে খেয়ে নিয়েছে আদরের সূর্যটা, যেইটুকু পারেনি সেটুকু ছোপ ছোপ চুনকামের মত জেগে রয়েছে গলায়-পিঠে।
তাতান আর মউকে স্কুল থেকে আনতে যেতে হবে। তার আগে এই কিছুক্ষণ সময়। এরপর দুই মূর্তিমানকে দুই হাতে ধরে তাদের সারাদিনের বীরত্বর গল্প শুনতে শুনতে বাড়ি ফিরে যাবে।
অলক ফেরে আটটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে। ফিরতে না ফিরতেই শুরু হবে তার ফরমাশ-– কোনওদিন ডালমুট-চা, কোনওদিন ঘুগনি, তো কোনওদিন আবার চাউমিন। আজকে সকালে অফিসে যাওয়ার সময়ই তেনার বায়না শুনিয়ে গেছেন-– ‘এই শোনো, তুমি দইবড়া বানাতে পারো না? সেদিন একটা মাড়োয়ারি বন্ধু খাওয়াল, হলদিরামে। কী দারুণ খেতে। কিন্তু বড্ড দাম, দেখো না, যদি বাড়িতে বানানো যায়।’
অলক স্টেট ইলেক্ট্রিসিটি বোর্ডের অ্যাকাউন্টস ক্লার্ক। সকালে অফিস যায়, সন্ধেবেলায় বাড়ি আসে, বউয়ের হাতের রান্না খেয়ে রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমায়।
মজে আসা ডোবার মত মসৃণ নিস্তরঙ্গ জীবন। অলকের বাবা-মা, নিজের দুটোকে ধরে সুতপার সবসুদ্ধ পাঁচটি সন্তান। ওর মনে হয়, পাখির মত ডানা থাকলে সেটা একদিনও ওর আকাশে ওড়ার কাজে লাগত না, বরং পাঁচজনকে আগলানোর কাজ করতে করতেই দম ফুরিয়ে যেত।

বাড়িটার নাম ‘ডাউন টাউন হাইটস’। আটখানা উঁচু উঁচু টাওয়ার-খচিত লাক্সারি অ্যাপার্টমেন্ট। দু’খানা কমপ্লিট, বাকিরা কেউ মাঝপথে, কেউ সবে শুরু। যখন পুরোপুরি তৈরি হয়ে যাবে, তখন আর এত সহজে সুতপার মত মধ্যবিত্ত গৃহবধূ এখানে ঢুকতে পারবে না। ও শুনেছে, এই সব বড় বড় কমপ্লেক্সে অনেক রকম নিয়মকানুন থাকে, হাজার গণ্ডা বেড়াজাল। সে যখন পারবে না, তখন দেখা যাবে।

সুতপা অভ্যস্ত পায়ে একটা সদ্য শেষ হওয়া ব্লকের সামনে এসে দাঁড়াল। এখন হাঁকডাক একটু কম। লেবারগুলো মনে হয় খেতে গেছে। গোটা পাঁচ-ছয়েক লোক দূরে দাঁড়িয়ে একটা টেবলের ওপরে কাগজে কিছু আঁকিবুকি কাটছে। মাথায় হলুদ হেলমেট। আরেকটা দল, সবে যে দুটো ট্রাক এসে দাঁড়িয়েছে মাল বোঝাই হয়ে-– তাদের হিসেবপত্র বুঝে নিচ্ছে। ও এদিক-ওদিক একটু দেখে নিয়ে চট করে বাড়ির ভিতরে চলে এল।

সিঁড়ির মুখেই কাঠের চেয়ারে বসে অ্যালুমিনিয়মের টিফিন বাক্সে ভাত খাচ্ছিল বসন্ত। ওর দিকে চোখ পড়তেই বলল-– ‘আরে দিদিভাই!! আপনি আবার এসেছেন আজ? আগের বারেই আপনাকে বললাম না, এ রকম করে এখানে ওঠার পারমিশান নেই। দেখছেন না ওদিকে ইঞ্জিনিয়াররা আছে-– এন্ট্রি না করে কাউকে ছাড়ার নিয়ম নেই। সাইটের কাজ চলছে।’

বসন্ত দাস এই টাওয়ারের সিকিউরিটি গার্ড। বাইরে একটু কড়া ধাতের দেখালেও আসলে লোকটা নরমসরম। বেশিক্ষণ জেদ ধরে রাখতে পারে না। যখনই সুতপাকে দেখে এখানে আসতে, একটু তর্জনগর্জন করে, কিন্তু তার বেশি কিছু এগোয় না।
সুতপা মুখটা কাঁচুমাচু করে বলল-– ‘দাদা, মাত্র ঘণ্টাখানেক থাকব। এই যাব আর আসব। আসলে, বলেছিলাম না, ওই দশতলার ঘরটা না আমার খুব পছন্দ। ফাঁকাই তো পড়ে আছে। তাই আর কী!! লোকজন এসে গেলে কি এই বড়লোকের বাড়িতে আমি আসতে পারব, বলো? আর এখানে থাকতে পারব, সেই সাধ্য আমার দশজন্মেও হবে না। তাই বলছিলাম…’
সুতপাকে থামিয়ে দিয়ে বসন্ত মাথা নেড়ে বলল-– ‘না না!! আগেও কয়েকবার একই কথা বলে আপনি অনেক টাইম লাগিয়েছিলেন। আমি তো ভয়ই পেয়ে গেছিলাম-– কী জানি বাবা!! মেয়েছেলেটা ঝাঁপটাপ দিল নাকি গো? কোনও কিচাইন হলে সব দোষ হবে এই বসন্তর। ও সব হবে না-– আপনি ফিরে যান।’
বলে মুখটা নামিয়ে ভাতের মধ্যে একটা কাঁচালঙ্কা ঘষতে লাগল বসন্ত। ডাল, উচ্ছে ভাজা শেষ করে সবে চুনোমাছটায় হাত দিয়েছে– তার মাঝে এই সব বাওয়াল।

সুতপা এইবার ‘মেয়েছেলে’ হওয়ার পূর্ণ সুযোগটা কাজে লাগাল। মানুষ চেনার ক্ষমতা ওর আছে। একটু কাছে ঘেঁষে ঘন গলায় বলল-– ‘দাদা, আমার একটা সাতবছর, একটা চারবছরের ছেলেমেয়ে আছে। খুব মিষ্টি ওরা। আমার বরও খুব ভাল। কোনও কষ্ট নেই আমার জীবনে। শুধুমুধু কেউ মরে আপনি বলুন? ছোটবোনের একটু অনুরোধ দাদা… আচ্ছা আধঘণ্টা থেকেই চলে আসব। এই আপনার দিব্যি খেয়ে বললাম।’

ইচ্ছে করে দিব্যি খাওয়ার ছলে বসন্তর হাতটা ছুঁয়ে দিল সুতপা। স্পর্শ অনেক সময় ম্যাজিকের মত কাজ করে।
বসন্ত আর দৃঢ় হতে পারল না, এইটুকুই ওর ক্ষমতার মধ্যে ছিল। একবার মুখ বাড়িয়ে সতর্কতার দৃষ্টিতে আশপাশে দেখে নিয়ে বলল-– ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে যান– কিন্তু জলদি ফিরবেন। কী করেন এই ন্যাড়া বাড়ির টঙে চড়ে, বুঝি না বাবা!! পাগল আর কাকে বলে…।’
সুতপা একটু হাসিমাখা ধন্যবাদ দিয়ে দিয়ে প্রথমধাপে পা রাখল।
এই বিল্ডিংটায় এখনও লিফট বসেনি। লেবারদের জন্য সার্ভিস লিফট আছে বটে, কিন্তু সেটায় তো আর সুতপা উঠতে পারে না। তাই নিজের দু’চাকাই ভরসা। দশতলা অব্দি উঠতেই বোধহয় আধঘণ্টার বেশি সময় লেগে যাবে। হাতে সময় কম। ও গলায় দু’ঢোক জল চালান করে পাহাড় চড়ায় মন দিল।

শুধু গল্প নয়

আসলে সুতপা একজন গল্পকার। ইংরাজিতে যাকে বলে, স্টোরি-টেলার। না, আকাশছোঁয়া বিদ্যাবুদ্ধি বা এলেমদার জ্ঞানগম্যি কোনওটাই ওর নেই। মফস্বলের মেয়ে, মেজেঘষে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে ফার্স্ট ইয়ারে পড়তে পড়তেই বিয়ে হয়ে যায়। অলক ছেলে ভাল, তায় সরকারি চাকুরে। মোলায়েম শ্বশুর-শাশুড়ি, ভাড়া হলেও কলকাতায় বাড়ি-– সব মিলিয়ে সুতপার সামনে আলিবাবার গুহা খুলে গিয়েছিল। ও নিপাট মনোযোগ দিয়ে সংসারের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল খুব তাড়াতাড়ি। ভেবেছিল গ্র্যাজুয়েশনটা শেষ করবে, কিন্তু প্রকৃতির নিয়মে তাতান-মৌ চলে আসার পর দেবী সরস্বতী তাঁর একটা হাত পাকাপাকিভাবে সুতপার মাথা থেকে তুলে নিলেন। যদিও আরেকটা হাত তিনি প্রথম থেকেই বিছিয়ে রেখেছিলেন ওর মনের গভীর এক গলিপথে।
কোনও এক অজ্ঞাত কারণে সুতপার মধ্যে গল্পেরা জন্ম নেয়-– নিজের নিয়মে, আপন খেয়ালে। পরিচ্ছন্ন মৌলিক কাহিনি। প্রথম গল্প লিখেছিল বারোবছর বয়সে, লিখে পাড়ায় একটা কিছু পুরস্কারও পেয়েছিল, মনে আছে দিব্বি। সেই যে শুরু, আর থামা হয়ে ওঠেনি। রোজ রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, সুতপা চুপিচুপি ঝাঁপ দেয় ওর লেখার খাতায়। লাল রঙের মোটা খাতা-– একই খাতায় সংসারের হিসেবও থাকে। নিশুতি নিস্তব্ধতায় বিভিন্ন চরিত্ররা ভিড় করে আসে ওর মাথায়। ও যেন সিনেমার মত দেখতে পায় তাদের চলাফেরা, হাসিকান্না, দুঃখ-ঝগড়ার গল্পগুলো। সুতপার মাথা থেকে কখন তারা নেমে আসে খাতার পাতায়, কখনও বা হারিয়ে যায় কোথায়-– খুঁজে পাওয়া যায় না আর।

বিয়ের কয়েকমাস পরে এক ভালবাসা-ক্লান্ত দুপুরের শেষে সুতপা চুপিচুপি অলককে বলেছিল, ওর এই ক্ষমতার কথা। অলক প্যান্ট পরতে পরতে ঘুরে তাকিয়েছিল অবাক হয়ে, তার পর জোরে হেসে ফেলেছিল, বলেছিল-– ‘মানে? তুমি নভেল লেখো? নভেল লিখতে গেলে কত পড়াশোনা করতে হয় তুমি জানো? তোমার ওই বারো ক্লাসের বিদ্যায় আজকাল নভেল হচ্ছে বুঝি?’ জামাটা গায়ে চড়িয়ে ঘর থেকে বেরনোর আগে ওর মুখে মুখ মিশিয়ে বলেছিল-– ‘ও সব নাটক-নভেলের ছাইপাঁশ মাথা থেকে বাদ দিয়ে মাছের ডিমের টকটা একটু ভাল করে শিখে নাও মায়ের থেকে। আজকে তুমি খারাপ বানাওনি, কিন্তু মায়ের মতন হয়নি।’

এর পর থেকে এই ব্যাপার নিয়ে আর বিশেষ কোনও কথা কারওর সাথেই বলেনি সুতপা। কিন্তু না লিখেও তো ওর নিস্তার নেই। কলম নিয়ে বসলেই সিনেমা শুরু। রাজা-রানি, ভিনদেশের যোদ্ধা, জলের তলার আজব অজানা শহর থেকে শুরু করে কলকাতার মানুষ, ওর বড় হয়ে ওঠা ছোট মফস্বলের লোকজন, রোজকার যাতায়াতের অটোওয়ালা– কে নেই সেই সিনেমায়? কোনও কিছু পড়লে বা দেখলে সাথে সাথে সেটা ঘিরে গল্পেরা দানা বাঁধতে শুরু করে দেয় ওর মনের মধ্যে-– বিশুদ্ধ প্রাকৃতিকভাবে।

একটানা ছ’তলা অব্দি উঠতে পারে সুতপা। ওদের নাকতলার বাড়ি, মানে, ভাড়া বাড়িটা দোতলা। একতলায় ওরা, ওপরে বাড়িওয়ালারা থাকে। কালেভদ্রে ছাদে ওঠা ছাড়া আজকাল আর সিঁড়িতে ওঠাউঠি তেমন হয়ই না।
সুতপার হাঁফ ধরে গেছে। ব্যাগ খুলে কাঁপা কাঁপা হাতে জলের বোতলটা বের করে কিছুটা ঢালল গলায়, কিছুটা মুখেচোখে। এই নিয়ে চারনম্বর বার এই বাড়ির দশতলায় উঠছে ও। প্রথমবার কেমন একটা ঘোরের মধ্যে উঠে পড়েছিল বলে সিঁড়ি দিয়ে দশতলা ওঠার পরিশ্রমটা সেই রকম মালুম হয়নি। পরের বার, সাততলার পর মনে হচ্ছিল, ওকে কেউ জলের তলায় দম আটকে মেরে ফেলতে চাইছে।
সুতপা ঘড়ি দেখল-– পৌনে তিনটে। সাড়ে চারটে-পাঁচটার মধ্যে ওকে ছেলেমেয়ের স্কুলে পৌঁছতে হবে। নিয়ম হল, সাড়ে তিনটেতে ছুটির সময় যেন সুতপা স্কুলগেটের সামনে থাকে। আজ ছবি আঁকার এক্সট্রা ক্লাস হবে সব বাচ্চাদের নিয়ে-– তাই কিছুক্ষণ বাড়তি সময়। অলকের বাচ্চাদের ব্যাপারে কোনও গাফিলতি একদম পছন্দ নয়।

ব্যাগের মধ্যে একবার উঁকি দিয়ে দেখল সুতপা। জ্বলজ্বল করছে বাদামি রঙের খামটা। সামনের দিকে বড় এক প্রকাশনা সংস্থার সিল লাগানো। ভিতরে কী আছে, সেইটা হয়তো ও জানে-– কিন্তু পড়বে সেই দশতলায় উঠে। তার আগে নয়।
গতবছর পুজোর কিছুদিন পরপরই এই খেয়াল মাথায় চেপেছিল সুতপার। শান্তিপুরে বাবার একটা মাঝারি মাপের হার্ট অ্যাটাক হওয়ার পরে তিনমাস বাপের বাড়িতে গিয়ে থাকতে হয়েছিল। হপ্তায়ান্তে নাকতলায় আসতে পারত। অলক চমৎকার সামলেছিল সেই সময়টায়। ছেলেমেয়েদের স্কুলে পৌঁছনো, ঘরদোর সাফ রাখা থেকে বাবা-মাকে সময়ে ওষুধ খাওয়ানো– সবই একা হাতে করেছিল। অফিসের কাজ এই সময়টায় একটু ঢিলে যাবে সেইটাও আগে থেকে বলে রেখেছিল বড়সাহেবদের। অলকের কাণ্ড দেখে সুতপার মা প্রায় চোখের জল ফেলতে বসেছিলেন-– কপাল করে বর পেয়েছে বটে মেয়েটা। পুরুষমানুষের এত খেয়াল সব দিকে? …জামাই তো নয়, যেন খাঁটি সোনা।
সুতপাও মানে সে কথা।
সেই সময়ে দুপুরের দিকে সুতপার কোনও কাজ নেই। বাড়িতে অখণ্ড অবসর। একদিন কী মনে হল, বসে বসে সব নামী-অনামী বাংলা পত্রিকার প্রকাশনা দপ্তরের ঠিকানা খুঁজে বের করে সেখানে নিজের লেখা ছোটগল্প, বড় বা মাঝারি উপন্যাস পাঠাতে শুরু করল। নিজে বাজারে ঘুরে ঘুরে শৌখিন খাম যোগাড় করে আনল, তার মধ্যে ফুলস্ক্যাপ কাগজ ভরা চরিত্ররা চটপট করে নিজেদের জায়গা করে নিল। বিচিত্র স্বাদের ভিন্ন মেজাজের গল্পেরা ডানা মেলে উড়তে লাগল শহরের আনাচেকানাচে। বহুদিন আগে, বিয়ের পরপর কিছুদিন অলকের অফিসের দু’তিনটে ছেলের সাথে ওর আলাপ হয়েছিল, ওরা শখে একটা ত্রৈমাসিক পত্রিকা চালাত। তাদের উৎসাহে কয়েকটা গল্প লিখে দিয়েছিল। ছেপে বেরনোর পর বরের অফিস মহলে কিঞ্চিৎ সুনামও কুড়িয়েছিল। কিন্তু, অলক বা শ্বশুর-শাশুড়ির কারওরই ব্যাপারটা সে রকম পছন্দ হয়নি বলে চাপা পড়ে গেছিল, এর পর ছাপানো হয়নি কিছুই। তবে নিজের মতন লিখে যায় ও-– অভ্যাসে।
এখন মাঝবয়সে এসে নিজের সোনার সংসার থেকে আচমকা কিছুদিন ছুটি পেয়ে গিয়ে সেই পুরনো ভূত সুতপার মাথায় আবার চেপে বসেছিল। গল্প তো ও এমনিই লিখতে পারে, কিন্তু সেই ক’দিনে শুধু লিখেই থেমে থাকেনি, পাকা লিখিয়েদের মতন যত্ন করে নিজের মস্তিষ্কজাত শব্দস্রোতকে ভাসিয়ে দিয়েছিল সম্ভাবনার সমুদ্রে। তারপর কেটে গেছে বেশ কয়েকদিন-– বাবা সুস্থ হয়ে ওঠাতে সুতপাও ফিরে এসেছে নাকতলার দৈনন্দিনে।
একদিন তাতান–মৌকে স্কুলে পৌঁছে বাড়ি ফেরার পথে লেটারবক্সে নিজের নামে একটা চিঠি পেল ও– দুই বাংলার সবচেয়ে নামী এবং প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনা দপ্তর থেকে এসেছে। সুতপার পাঠানো একটা গল্প তাদের বহুলপ্রচারিত বিখ্যাত ‘স্বদেশ’ পত্রিকার জন্য পছন্দ হয়েছে-– এবং নতুন এই লেখিকাকে আরও লেখা পাঠানোর অনুরোধ জানানো হচ্ছে। এ ছাড়া সম্পাদক আলাদা করে এককলম লিখেছেন যে, সুতপার লেখার প্লট, ভঙ্গিমা ও শব্দচয়ন– সব কিছুই বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে। তিনি ওর পরের লেখার জন্য অপেক্ষা করবেন।

চিঠিটা হাতে নিয়ে কেমন যেন দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল সুতপা-– খানিকটা ঘাবড়েও গেল। এত ঘটনা ঘটে যাবে, সেইটা ও ঠিক বুঝতে পারেনি। নিজের খেয়ালে ক’টা গল্প এদিক-ওদিকে পাঠিয়েছিল, এবং কিছুদিন বাদে সেই সম্পর্কে ভুলেও গেছিল। এই চিঠিটা সব কেমন গোলমাল করে দিল। সুতপা বাড়ি না ঢুকে হাতের মুঠোয় চিঠিটা ধরে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিল। বুকের ভিতরে একটা গোটা জলপ্রপাতের আওয়াজ আছড়ে পড়ছে যেন। কিছুক্ষণ এলোমেলো ঘুরেছিল-– দেখছিল ট্রাম বাস ট্যাক্সিতে মোড়া কলকাতা শহরের দুপুরের চালচিত্র– কিন্তু কিছুই যেন মাথায় ঢুকছে না-– এমন কিছু একটা করতে ইচ্ছে করছে, যা আগে কোনওদিন করেনি। মনে হচ্ছিল, চিৎকার করে সবাইকে বলে-– এই দেখো, আমার সন্তানেরা মূল্যহীন নয়-– তারা প্রকাশিত, প্রতিষ্ঠিত। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎই সামনে দেখেছিল এই বাড়িটাকে– ডাউন টাউন হাইটস। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল, এর সবচেয়ে উঁচু তলাটায় গিয়ে আকাশটাকে ছুঁয়ে ফেলতে। মেঘের মধ্যে হারিয়ে যেতে। যেমন ভাবা, তেমন কাজ– সবার অলক্ষ্যে চড়ে বসেছিল দশতলার ছাদে। সেইটাই প্রথমবার। ঘণ্টাখানেক পরে ঠান্ডামাথায় বাড়ি ফিরে এসেছিল। সাথে নিয়ে এসেছিল নিজের মধ্যে অনেকটা স্থায়ী পরিবর্তন আর কিছু সংকল্প। বাড়িতে কাউকে কিছু জানায়নি। যে রকম আজকেও কেউ জানে না ওর অভিসারের কথা।

দশতলায় উঠে চোখের সামনে মৃত্যু দেখতে পাচ্ছিল সুতপা। চোখ ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে-– খাবি খাওয়া মাছের মতন শ্বাস টানতে লাগল। আজ আর স্কুলে ঠিক সময়ে পৌঁছনো যাবে না। জিরোতে জিরোতেই অনেকক্ষণ লাগবে…।
অনেক উঁচুতে ওঠার একটা তীব্র আনন্দ আছে, সেটা মাঝেমাঝে উপভোগ করতে দিব্বি লাগে ওর। চারিদিকে শনশন করে বাতাস বইছে-– মানুষের চিৎকার, হট্টগোল-বাসের হর্ন-মেট্রো রেলের ঘড়ঘড়ানি কানে বাজছে, তবে তার তেজ কম। যত উপরে ওঠা যায়, তত চারপাশে নিস্তব্ধতা বাড়তে থাকে। এখন বেশি হাওয়ার আওয়াজ।
বৈশাখের দুপুর, পায়ের তলায় একটু একটু করে পুড়ছে শহর কলকাতা। দশতলার এই নির্মীয়মাণ ফ্ল্যাটটি ছোট, টু বি-এইচ-কে, মেরেকেটে আটশো স্কোয়্যার ফুট মতন হবে। সাউথের এই সব বড় বড় ফ্ল্যাটগুলি তৈরি হয়ে বেশিরভাগই পড়ে থাকে। লোকজন তেমন একটা থাকাথাকি করে না। হয় খদ্দের জোটে না, বা জুটলেও তারা জাতে এনআরআই। বিদেশে বসে ডলারের জোরে ফ্ল্যাটটা কিনে ফেলে রেখে দেন আর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেন, ‘ইটস জাস্ট ফর ইনভেস্টমেন্ট পারপাস’। বছরের পর বছর ফাঁকাই পড়ে থাকে। এই ফ্ল্যাটটাও সেই দলেরই, প্রায় তৈরিই হয়ে গেছে। জানলা-দরজা লেগে গেছে, এবার রঙের কাজটা হলেই মালিকের হাতে চাবি। তবে রং এখনি হচ্ছে না, দেরি আছে। মালিক বছরে একবারও আসে কি না সন্দেহ। তাই কোনও তাড়া নেই-– কারওরই।
বাড়িটার দুটো ঘরই পশ্চিমমুখী। দুপুরের কড়া রোদে তেতে আছে। ড্রইংরুমে মাটিতে এককোণে চুন বালি পেরেক পড়ে আছে, মিস্তিরিদের মই, চুনকামের ডিব্বা, রোলার এদিক-ওদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কয়েকদিন আগে কিছু সারাইয়ের কাজ হয়েছিল, মিস্তিরিরা ফেলে গিয়েছিল। এখন আর হয় না কাজ।
সুতপা নেতিয়ে পড়েছিল। দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকল ও। জোরে জোরে শ্বাস পড়ছে। গেটের চাবিটা হাতের মুঠোর মধ্যে ধরা। সুতপার ব্লাউজে দেওয়ালের সদ্যলেপা সিমেন্টের কণাগুলো মহাআনন্দে লাফালাফি করতে লাগল।
কিছুক্ষণ বাদে মেইন গেটে সামান্য আওয়াজ হল– ঘরে এসে ঢুকল মাধব। মাঝারি উচ্চতার গোলগাল মুখ। গালে অযত্নের দাড়ি। গায়ে বিচিত্র রঙের একটা হাতকাটা গেঞ্জি, সাদাটে প্যান্ট হাঁটু অব্দি গোটানো। মাধব এই বাড়িতে রঙের কাজ করছে মাস-ছয়েক ধরে। এর আগে গড়িয়া মোড়ে একটা বাড়িতে কাজ করত, সেটা শেষ হওয়াতে এখানে জুটেছে। মাধবের বাড়ি সেই ক্যানিং লাইনে। রোজ সকালে সূর্যকে পকেটে ভরে যে শয়ে শয়ে লোক ক্যানিং, লক্ষ্মীকান্তপুর নামখানা অঞ্চল থেকে কলকাতায় আসে দুটো পয়সা কামাবার জন্য-– মাধব তাদের একজন। ওর দিন শুরু বা শেষ পৃথিবীর আহ্নিক গতির সাথে হয় না-– বরং লোকাল ট্রেনের চাকার সাথে ঘুরতে ঘুরতে দুম করে ফুরিয়ে যায়। এরা হল সেই প্রজাতির মানুষ, যারা ট্রেনে কাটা পড়ে মরে গেলেও পরিবারের লোকজন বেশি মাথা ঘামায় না–- বরং নেতাদের বাড়িতে ধর্না দেয় ক্ষতিপূরণের টাকাটা জলদি পাওয়ার জন্য। এখন কিছুদিন অবশ্য মাধব এই সাইটেই থাকে, অনেক রাত অব্দি কাজ হয় বলে-– মাসে দু’বার বাড়ি যায়।
মাধবের আরেকটা পরিচয় আছে-– সে ব্রাহ্মণ সন্তান, মাধব চক্রবর্তী। এই নিয়ে ওর নিজের বেশ অহঙ্কার আছে এবং লেবারদের মধ্যেও একটা সমীহ আছে। একসময়ে নাকি ওর ঠাকুরদা সরকারি স্কুলের মাস্টার ছিলেন। তাই জন্য মাধব নিজেও এইট অব্দি পড়েছে-– বাকি লেবারদের মত ‘ক-অক্ষর গোমাংস’ নয় ও। মাসের মাইনের সময় নিজে যখন সুন্দর হাতে লেখায় সই করে টাকা নেয়, তখন বুক ফুলিয়ে বলে-– বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে নেশাভাঙ করে বিপথে চলে গেলাম বলে, তা না করে মন দিয়ে পড়লে না– সুপারভাইসারের কাজ বাঁধা ছিল। এ সব কথা শুনে শুনে লোকের কানে চড়া পড়ে গেছে। পুরোটাই কপালের দোষ, তাই তো রঙের কাজেও খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি ও। সব সময় কাজ থাকেও না-– বছরে বেশ কয়েকমাস ভাঁড়ে মা ভবানী। যখন কাজ পায়, তখনও যে টাকাপয়সা উপচে পড়ে, তাও নয়। অগত্যা আজকাল মাধব সকালের দিকটা রিকশা চালায়। বসে থাকলে তো চলবে না। বামুনের ছেলে হয়ে রিকশা চালায়, এটা ভাবতেও মাথাকাটা যায় ওর-– কিন্তু পয়সার চেয়ে বড় মলম আর কী বা আছে? মাধবের কাটা মাথা আবার জুড়েও যায়, সেই মলমে। যা মাগ্গিগণ্ডার বাজার, রাতে দু’পাত্র বাংলামালের দাম তুলতে জান কয়লা হয়ে যায়, আর লোকে কিনা এই রাজপ্রাসাদের মত বাড়ি বানিয়ে ফেলে রেখে দেয়-– শালা, যত্ত বড়লোক, তত আজিব তাদের খেয়াল!!

তবে যেইদিন এই ম্যাডাম আসেন, সেদিন মাধবের মনটা ভাল হয়ে যায়। সুতপা ম্যাডাম একদম অন্য রকমের। ও বলে– ‘কেউ কেউ আসে (আছে) না, যাদের দেখলেই সব কিছু ভুলে পরানটা কেমন খুশিখুশি হয়ে যায়-– ইনি সেই ধরনের মানুষ। এরে দেখলেই আমার দিন ভাল যায়।’
তা বলে যে সবাই ম্যাডামের আসার খবর জানে, সেটা নয়, কয়েকজন জানে। সিকিউরিটি বসন্ত বোধহয় জানে না, কিন্তু ব্যাটা কিছু একটা ঠাহর করে, এটা মাধবের মনে হয়। বাকিদের মধ্যে গিয়াসভাই আর কাঠের কাজ করে বেঁটে বাচ্চু সিং। এরা মাধবের কাছের বন্ধু-– আর বাইরের কারও এই ব্যাপারটা চোখে পড়েনি। এখনও অব্দি।

ম্যাডামকে ও প্রথম দেখে আজ থেকে বেশ কয়েকমাস আগে। এ বছর শুরুর দিকে। সেদিন ওর অন্য একটা টাওয়ারে কাজ ছিল। ছাদ রং। দুপুরবেলায় ভাত খেয়ে উঠে একটু জিরিয়ে কাজে লাগতে যাবে, এমন সময় মানেজারের ডাক-– এই মাধব, স্যাফায়ার– জি ব্লকের দশতলায় চলে যা তো। টেন-বি। ‘ওনার’ ফোন করেছিল-– কিছু কাজ বলছে বাকি আছে। যা দেখে আয়।
তখনও জানলা-দরজা লাগেনি। বাইরের ঘরে এসে সবে নিজের যন্ত্রপাতির ব্যাগটা রেখে চারদিকে চোখ বোলাচ্ছিল, ঘরের কোথায় কতটা কাজ লাগবে, দেখে নিতে হবে।
হঠাৎ ভিতরের ঘরে দরজা খোলার আওয়াজ– এদিক-ওদিক সন্তর্পণে তাকাতে তাকাতে প্যাসেজ দিয়ে বেরিয়ে ম্যাডাম এক্কেবারে মাধবের মুখোমুখি। মাধব প্রথমে ভেবেছিল ইনিই ‘ওনার’, মুহূর্তেই সেই ভুল ভাঙল। মহিলার চালচলনেই বোঝা যায় গোলমেলে কেস।
থতমত মুখে বলেছিল-– ‘আসলে দাদা, এটা আমার ভাইয়ের ফ্ল্যাট-– ফাঁকা পড়ে আছে, তাই একটু দেখতে এসেছিলাম আর কী!’

মাধবের সন্দেহ হয়েছিল-– পরিষ্কার বুঝতে পারছিল, মহিলা উল্টোপাল্টা বকছে। কিন্তু দেখে ঠিক চোরছ্যাঁচড় বলেও মনে হল না ওর, তাছাড়া ফাঁকা বাড়িতে নেবেই বা কী? যে ঘর থেকে উনি বেরলেন, সেটা দেখার কথা মাথায় এসেছিল। কী করছিলেন ভিতরে? একটু কড়া ভাবে তাকিয়ে বলেছিল-– ‘এখানে দাঁড়ান, কোথাও যাবেন না। আমি আগে দেখি, আপনি কী করছিলেন ঘরে।’

মাধব সাবধানি পা ফেলে ঘরের দরজা খুলল, আগে-পিছনে তাকিয়ে একবার দেখে নিল। ম্যাডাম পালায়নি, ওর দিকে তাকিয়েছিল সোজা। বারান্দার কোনা দিয়ে একটুকরো রোদ এসে পড়েছিল ওনার মুখে। শেষশীতের নরম বাদামি রোদ।

ঘরটা মাঝারি মাপের। ফ্লোরের কাজ শেষ হয়েছে কিছুদিন আগে। দরজা-জানলাও লাগানো হয়ে গেছে। জানলায় গরাদ নেই। শেল্ফ করার জন্য সিমেন্টের র‍্যাকগুলোয় অনেক ক’টা বই রাখা। ব্রাউন পেপারের খামে মোড়া একতাড়া কাগজ। একটা বাঁধানো মোটা খাতাও আছে। ডটপেন তিন চারটে। বাকি ঘরটায় ধুলো ভর্তি হলেও, শেল্ফটা আজ মোছা হয়েছে বোঝা যায়। চুনকাম করা দেওয়ালে চার-পাঁচটা ছবি টাঙানো, মাধব বেশিরভাগই বুঝতে পারল না কার। একটা বাদে-– রবি ঠাকুর, স্কুলের বইতে ছবি ছিল। তাই চিনতে পারল। দেওয়ালে অনেক কিছু লেখাও আছে। কিছু আবার লিখে কেটে দেওয়া। কোথাও কোথাও চিরকুট মতন হলুদ রঙের কী সব আটকানো। মেঝেতে পাঁজা করে কিছু খবরের কাগজ আর পত্রিকা রাখা। সেগুলোর ওপরে ধুলোর আস্তরণ। মাধব ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে– সামনে খোলা জানলা দিয়ে হু-হু করে হাওয়া আসছিল। মাধবের চুল উড়ছিল। মনে তখন পাহাড়প্রমাণ বিস্ময়। এ সবের মানে কী?
যা হচ্ছে, সেটা রীতিমত বেআইনি কারবার। অন্য কারও বাড়িতে একটা ঘর বিনা অনুমতিতে জবরদখল করাটা ঘোরতর অন্যায়।
মাধব ফেসিলিটি ম্যানেজারকে জানালে, ম্যাডাম কেস খেয়ে যেত। সেটা ও করেনি, কারণ ওর মাথার মধ্যে অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। সব ক’টার উত্তর আজও পায়নি, তবে কিছুটা আন্দাজ করা যায়, মোটের ওপর মাধব বেমালুম চেপে গেছিল ঘটনাটা।
ক’দিন পর গা-সওয়া হয়ে গেছিল।
মাঝেমাঝে ম্যাডাম আসেন-– ওই ঘরের মধ্যে ঢুকে নিজের মত দু’তিনঘণ্টা থাকেন। আবার চুপচাপ চলে যান। একদিন তো ফোন নম্বরও নিয়ে গেলেন। বললেন– মাধবকে ফোন দিলে, ও যেন আগে থেকে একটু দেখেটেখে রাখে। মেইন দরজা লাগার পর মাধবই তো চাবি যোগাড় করে দিয়েছিল। আগেরবার মাধবের সাথে কিছুক্ষণ গল্প করলেন ম্যাডাম। আসলে বই-পত্তর লেখালিখিতে মোড়া ঘরটা বেশ লাগে ওর। জিজ্ঞেস করেছিল– দেওয়ালের ছবিগুলো কার? না, নাম শুনে চিনতে পারেনি। এনারা নাকি বড় বড় লেখক।
সুতপা ম্যাডাম এখানে ঠিক কী কারণে আসে, সেটা হয়তো ও বোঝে না, কিন্তু ওর এই লুকোচুরির সাথে অনেক দিন টানা গরমের পর ঝমঝমিয়ে বৃষ্টির মতন একপশলা ভাল লাগা যে মিলেমিশে আছে, সেটা বেশ বুঝতে পারে।

তখন বিকেল

সুতপার চোখ খুলল মাধবের ডাকে। মুখে একটু হাসি এনে তাকাল ও, মাধবের দিকে।
‘ম্যাডাম-– ও ম্যাডাম! কি আপনার শরীর খারাপ লাগছে নাকি? আপনি সকালে বললেন, আসবেন, তাই এলাম দেখা করতি। তা ভাল আসেন তো? আমার অবস্থা তো দেখতেই পাসসেন। টাকাপয়সা সেরম নাই হাতে।’
সুতপা হাতের মুদ্রায় অভয় দিল। এখন খানিকটা ধাতস্থ বোধ করছে। হাতের বোতলের বাকি জলটুকু শেষ করল ঢকঢক করে। মুখটা মুছে মাধবের দিকে তাকিয়ে বলল-– ‘সরি গো মাধবদা, আগের দিন হাতে তেমন কিছু ছিল না, তাই… বুঝতেই তো পারো।’

ব্যাগ খুলে একটা একশো টাকার নোট বের করে মাধবের হাতে গুঁজে দিল সুতপা।
‘–এবার আমি একটু একা থাকি মাধবদা? কিছু দরকার লাগলে তোমায় ডাকব-– কেমন? ও হ্যাঁ, এই বোতলটা একটু ভরে দিয়ে যাবে? যা গরম…!’
মাধব জলের বোতলটা নিয়ে বেরিয়ে গেল। সুতপা পায়ে-পায়ে ‘ওর’ ঘরে এসে ঢুকল। তেরচাভাবে রোদের ধুলোমাখা কণারা নির্দিষ্ট সরলরেখায় নাচানাচি করছে। খোলা জানলা দিয়ে সুতপা একঝলক নিচে অনেক নিচে ওর বাস্তব সত্যিকারের শহরটাকে দেখে নিল। এখন সে তার মেঘের ওপরে তৈরি লেখার ঘরে চলে এসেছে-– এখানে পুরোটাই রূপকথা। নিজের বাড়ির রান্নাঘরের মেঝে, শোয়ার খাট যদি কারখানা হয়, তা হলে এইটা ওর শো-রুম। নিজের নাই বা হল, ধরে নেওয়া যাক না, যতদিন কেউ দেখছে না ততদিন এটা ওরই ঘর। নিজের সাম্রাজ্য। কিছু প্রিয় মানুষ, লেখকের ছবি, নিজের লেখা যেই সব ম্যাগাজিনে বেরোয়, তার কপি ছাড়াও খবরের কাগজ, জরুরি পত্রপত্রিকা সব এনে রেখেছে এখানে। দশতলার মায়াবী ঘরটায় ঢুকলে ওর মাথায় যেন জোয়ার আসে। নিজের সাথে কথা বলে ও, চরিত্রদের দেখতে পায় ঘরের আনাচেকানাচে-– চার দেওয়ালের নিস্তব্ধতার মধ্যে খুঁজে পায় নিজের আরেকটা অংশকে, যে শুধু গল্প বলে।
এখনও পুরো ঘরটা গুছিয়ে উঠতে পারেনি বটে-– তবে ধীরে ধীরে কাজ এগোচ্ছে।
ঘরখানাকে বেশ কিছুক্ষণ তারিফ চোখে দেখল সুতপা। গুনগুন করে গানও গেয়ে নিল মাঝে একবার। এবার ব্যাগ থেকে চিঠিটা বার করে আনল। বাদামি রঙের মোটা খাম। খাম ছিঁড়ে ভিতরে চোখ বোলাতেই মনটা নেচে উঠল। সেই নামী কাগজের দপ্তর থেকে চিঠিতে জানানো হচ্ছে-– শ্রীমতী সুতপা বক্সীর পাঠানো দীর্ঘ উপন্যাসের শুরুর বিন্যাস ও ভাবনা মনোনীত হয়েছে। উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করার বিষয়ে কথা বলার জন্য সম্পাদকীয় কমিটি সুতপাকে তাঁদের কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করছেন।

বাইরের একদমকা উত্তপ্ত বাতাস সুতপাকে একটু অগোছালোভাবে আদর করে চলে গেল। দুপুর গড়াচ্ছে বিকেলের দিকে। সূর্য তেজ কমিয়ে আনছে। ও চিঠিটা জোরে জোরে পড়ল-– পরপর দু’বার পড়ল। কিছু নিশ্চল মুহূর্ত পরেই ব্যাগের অন্য চেনে শব্দ করে ডেকে উঠল মোবাইলটা-– না দেখেই ফোন তুলল ও, চেনা রিংটোন। অন্য হাতে চিঠিটা ধরা।
–‘হ্যাঁ মা, বলুন। না না এখনও পৌঁছাইনি স্কুলে-– রাস্তায় ক’টা কাজ ছিল, সেরে নিলাম। আপনি চিন্তা করবেন না একদম। কী? ওষুধ-– হ্যাঁ হ্যাঁ মনে আছে। আনব সব। …না, দিপুর মাকে বলবেন আটা না মাখতে। আজ রাতে রুটি হবে না। আর শুনুন না মা, একটু দই আনিয়ে রাখবেন পারলে। সকালে ছেলে বলল না দইবড়া খাবে। …আরে আপনিও খাবেন, একদিন খেলে কিছু হবে না… বাবার জন্য অন্য কিছু করে দেব।’
কথা কিছুক্ষণ চলবে এখন। ডাক এসে গেছে-– একটু পরেই সুতপাকে আবার নেমে আসতে হবে ওর নাকতলার নুন-হলুদের সংসারের মধ্যে। দর কষাকষির ভিড়ে ঘড়ির কাঁটায় চোখ রেখে দিনটাকে শেষ করার দিকে এগোতে হবে। কত কাজ পড়ে আছে সুতপার। পিছনের আকাশে তখন সবে বিকেলের রং লাগতে শুরু করেছে।

চিত্রকর: মৃণাল শীল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More