আখর

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রাজা সিংহ

দেওয়ালটার দিকে তাকিয়ে থমকে গেল সারি। পুরনো বাংলোর হলদে দেওয়াল বেয়ে নেমে এসেছে লোহার জলনিকাশি পাইপ। লোহার পাইপ রোদে-জলে জীর্ণ। সেই পাইপ বেয়ে মরচেরঙা জল বেরিয়ে ভিজে আছে দেওয়ালের বেশ কিছুটা। ম্যালের বড় রাস্তা ছেড়ে একটা রাস্তা উঠে গেছে পাহাড় বেয়ে। সেই চড়াই রাস্তার বাঁকের মুখে রাস্তাঘেঁষে বাড়িটা। লনের ভেতরে সার-সার দেওদার গাছ লম্বা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাশাপাশি। পাহাড়ি হাওয়া পাতা ছুঁয়ে শব্দ তুলছে একটানা। পরিত্যক্ত লনে আগাছা বেড়েছে খেয়াল-খুশিমত। ভেঙে পড়া সিমেন্টের টব, একসময় মেটে লাল রং ছিল বোধহয়, রঙের আভাসে বোঝা যায়। টবে একসময় চয়ন করা গাছও ছিল নিশ্চয়ই, এখন জংলা লতা বেড়ে উঠেছে ফনফনিয়ে সেখানেও ফুল ফোটে, গাঢ় হলুদ, বেগুনি, কিংবা নরম গোলাপি। যত্ন লাগে না। এমন পুরনো বাংলো ছোট্ট শৈলশহর ইয়ারকাড জুড়ে রয়েছে ছড়ানো-ছেটানো। সালেম থেকে মাত্র পঁয়তাল্লিশ মিনিট পাহাড়ে উঠলেই, কুয়াশা আর বুনো গোলাপে ঢাকা ছোট্ট মনোহর শহর। মেঘ ছুঁয়ে যায় মাঝে-মাঝে। এখানে আসার পর থেকেই বেরনোর জন্য ছটফট করছিল সারি।

সৌরদীপ এল না, চারঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে এসে একটা জম্পেশ লাঞ্চের পর টানটান শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিয়েছে সৌরদীপ। সারির হাত ধরেও টেনে আনতে চেয়েছিল তার পাশটিতে।

‘পালিয়ে যাচ্ছি না তো, আমিও না, তুমিও না।’ হেসেছিল সারি। হাসলে সারিকে খুব উজ্জ্বল দেখায়। হাসলে সবাইকেই উজ্জ্বল দেখায়, কিন্তু সারির সারা অবয়ব যেন তার হাসিতে যোগ দেয়। সেই উজ্জ্বলতার কাছে অতিবড় মহারথীও হাঁটু গেড়ে অস্ত্র সংবরণ করেন। জানে সারি, তার অস্ত্র সম্পর্কে ওয়াকিবহাল সে।

গুনগুনকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে এল সারি। ঠান্ডা হাওয়া আদর করে গেল গাল ছুঁয়ে থাকা চুলে। হোটেলের রাস্তা পেরুলেই কিছুটা অংশ সমতল, ম্যাল। আর ম্যালের একপাশে ছবির মত সুন্দর একটা চার্চ। ধবধবে সাদা। ছোট ছোট পাকদণ্ডী পাহাড়ের শরীর বেয়ে উঠেছে, নেমেছে শিরা-উপশিরার মত। উপত্যকার দিকে মুখ করে একটা সিমেন্টের বেঞ্চে বসল সারি। দৃষ্টি দিগন্ত ছাড়িয়ে যেতে বাধা পেল না। উপত্যকা পেরিয়ে পাহাড়ের পরত। পাহাড় পেরিয়ে গাঢ় নীল আকাশ কলুষহীন, উন্মুক্ত। মাথার ভেতর হালকা, ফুরফুরে লাগল সারির। এখানে বেশ কয়েকদিন থাকবে ওরা। প্রতিবারের মত শুক্কুরবার এসে রবিবার রওনা দেওয়ার মত তাড়াহুড়ো নেই এবার। সে-কথা মনে পড়তেই ভাল লাগার অনুভূতিটা কেমন যেন মায়ের মত বুকে টেনে নিল। বড় স্বস্তি পেল সারি। প্রতিটি শ্বাসভরে টাটকা গন্ধমাখা অক্সিজেন ভরিয়ে দিল ফুসফুস। চোখে আরাম মাখিয়ে দেওয়া সবুজের দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে সত্যিই বড় স্বস্তি পেল সারি।

কতক্ষণ কেটেছিল জানা নেই। খুব বেশিক্ষণ নয় নিশ্চয়ই। নাগরিক অভ্যাসে স্বস্তির স্থায়িত্ব বড় ক্ষণস্থায়ী। তাই সারির মন যখন কোনও অজানা উদ্বেগের জন্য রসদ খুঁজতে, ভাবতে শুরু করল কী নিয়ে উদ্বেগ এবার? কোনও উদ্বেগ নেই তো তার। তক্ষুনি তার খেয়াল হল গুনগুন নেই।
গুনগুউউউউউন, লাফিয়ে উঠল সারি।

এখানেই তো খেলা করছিল। একদম তার পাশটিতে, একবার কসরত করে বেঞ্চে উঠছিল আর নেমে পড়ছিল গড়গড়িয়ে। নেমে পড়ে প্রতিবার হাততালি দিয়ে উঠছিল নিজের কৃতিত্বে। সাথে-সাথে হাততালি দিয়ে উঠছিল সারি, হাসছিলও। গুনগুনের দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে প্রায়ই মুগ্ধ হয় সারি। এ তার সৃষ্টি, তার শরীরজাত। মনে আছে, একসময় হাতের জল ঝাড়ার মত পরম ঔদাসীন্যে হাত ঝাড়ত সারি। বলত, কোনও অ্যাটাচমেন্টই তার জন্য নয়। ছোটবেলা থেকেই কোনও কিছুকেই সে তেমন প্রাণঢেলে ভালবাসেনি। জিনিস কিংবা সম্পর্ক ভাঙলে কষ্ট হত কয়েকদিনের। কিন্তু তার বেরিয়ে আসতেও অসুবিধা হত না তেমন। ভাঙনে নাকি বুকের ভেতর কাপড় নিঙড়ানো যন্ত্রণা হয়। তেমনই বলে তো সবাই, সারি জানেনি, অনুভব করেনি কোনও দিন। কিন্তু গুনগুনের জন্মকাল থেকে প্রতিদিন এক অদ্ভুত আঁকড়ে থাকার অনুভব বড় হচ্ছে প্রতিদিন গুনগুনের সাথে-সাথে, এখন আর সেভাবে হাত ঝাড়তে পারে না সারি।

পাগলের মত দু’পাশে দৃষ্টি ঘোরাল সে। ম্যালের উপর গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ, সে-ভয় নেই। কিন্তু ম্যালের গা-বেয়ে নেমে গেছে সরু সরু পাকদণ্ডী, অভিজ্ঞ, অভ্যস্ত পা ছাড়া সে পাকদণ্ডী দিয়ে নামা দুষ্কর। ‘গুনগুউউউন…’ চিৎকার করে ডেকে উঠল সারি, বুকের ভেতর দামামা বাজছে। মাথার ভেতর শূন্যতা। কে যেন হাহাকার করে উঠল মাথার ভেতরে। অজানা ভয় ছিটকে এল মাথায়।

সমস্ত শক্তি একজোট করে সে ডেকে উঠল আবার, ‘গুনগউউউউউউউন…’

উদভ্রান্ত দৃষ্টিতে আর একবার চিরুনি তল্লাশি চালাতেই নজর পড়ল, উল-গোলার মত গোল আর চকোলেটরঙা একটা কুকুরছানার পেছনে ছুটতে-ছুটতে গুনগুন উঠে যাচ্ছে মোরাম বিছানো পথ বেয়ে। উঠে গেছে বেশ কিছুটা উপরে। লাল সোয়েটার, লাল টুপি, লাল জুতো আর লালচে আভা গালে নিয়ে গুনগুন একটা বড়সড় লাল উলের গোলার মত ছুটে চলেছে। ছুট লাগাল সারি। একদমে পুরো পথটা প্রায় উড়ে গিয়ে পুরনো বাংলোটায় ঢোকার মুখে সে ধরে ফেলল গুনগুনকে।

‘খুব দুরন্ত মেয়ে হয়েছ তুমি অ্যাঁ? প্রাণ বের করে দিয়েছিলে আর একটু হলে’, গুনগুনকে জাপটে ধরে সারি। চকোলেটরঙা কুকুরছানাটা তখন একটা টবের পেছনে লুকিয়েছে। শশব্যস্ত গুনগুন হাত ছাড়িয়ে ছুট লাগাল সে-দিকে।
এতক্ষণের টানটান স্নায়ু এবার শিথিল হচ্ছে ধীরে-ধীরে। কপালে ঘাম জমেছে। বুকের হাপর স্বাভাবিক হচ্ছে ধীরে-ধীরে। এখনও কাঁপন আছে বুকের ভেতর, কী দুরন্ত মেয়েরে বাবা, ‘এত দুরন্তপনা কীভাবে পেলি তুই?’
গুনগুন দুই পেরল। সৌরদীপের রং পেয়েছে একেবারে, আর সারির চোখ, মুখ।

সব কিছুতেই গুনগুনের উৎসাহ অপার অবাধ। কোনও নতুন কিছু পেলেই তার পেছনে ছুটবে সব সময়, যতক্ষণ না তার সেটা দু’হাতের মুঠোয় আসছে। ততক্ষণ দৌড়-ঝাঁপ, একবার পেয়ে গেলে তার উৎসাহ উপে যেতে মুহূর্তকাল। কুকুরছানাটার পেছনে ছুটতে-ছুটতে বাংলোর লনে এসে পৌঁছেছে গুনগুন আর গুনগুনের পেছনে-পেছনে সারি। বেশ বড়সড় বাংলোটা পড়ে আছে অযত্নে, গাছপালার শেকড় গেঁথেছে পাথর দেওয়ালে, বড়-বড় সাহেবি আমলের জানালার কাচভাঙা পাল্লা, ভেতর থেকে কার্ড বোর্ড সাঁটানো, সে কার্ড বোর্ডও জরাজীর্ণ প্রায়। রেড অক্সাইডের তিনটে সিঁড়ি ভেঙে উঠলেই বারান্দা। টানা বারান্দা পেরিয়ে দরজা। ঘুরে-ঘুরে দেখতে লাগল সারি। কেউ কি থাকে বাংলোটাতে? থাকে নিশ্চয়ই। বাংলোর ভাঙা দেওয়ালে রং-চটা শাড়ি মেলা আছে একটা। সব কিছুতেই বয়সের ছাপ স্পষ্ট। বাংলোর বাইরের একটি দেওয়ালই কেবল উজ্জ্বল অন্যগুলির চেয়ে। হয়তো দেওয়াল লিখনের জন্য রং করেছিল রাজনৈতিক কোনও দল কোনও একসময়, তার পর আর প্রয়োজন পড়েনি।

দেওয়ালটার দিকে চেয়ে থমকে গেল সারি। সেই অপ্রয়োজনের পরিত্যক্ত দেওয়ালে কে যেন কাঠকয়লা দিয়ে বাংলায় লিখেছে, ছাড়া-ছাড়া বড়-বড় হরফ। পুরুষালি হাতের লেখা। তবে তাড়াহুড়োয় নয়, বরং খুব ধরে-ধরে খুব যত্ন করে, ভালবেসে লেখা হরফ কয়টি। যেন চোখে পড়ে। যেন কাউকে মনে করিয়ে দিতে চাইছে। কী অদ্ভুত লেখাটা। তামিলনাড়ুর এই ছোট শৈলশহরে এই বাংলোর গায়ে বাংলায় লেখাটা সত্যিই বড় অদ্ভুত। মনে করিয়ে দিতে চাইছে কোনও স্মৃতি? বাংলোটা ঘিরেই কি স্মৃতি ছিল কিছু? এ বাংলোতে এসে উঠেছিল তারা কোনও এক সুখ-সময়ে? কার উদ্দেশে লিখেছে এমন? সে কি বেঁচে আছে? নাকি…? গা শিরশির করে উঠল সারির। দেওদার গাছের পাতা ছুঁয়ে ছুটে আসা পাহাড়ি হাওয়ার ঝলক ছুঁয়ে, অবিন্যস্ত করে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। গুনগুনকে বুকে জড়িয়ে ধরে পাহাড়ি পথ বেয়ে দ্রুত হাঁটা লাগাল সারি।

জনসন্স বেবি ক্রিমের গন্ধে বড় আরাম পায় সারি, দু’হাতের মাঝে মাখনের দলাটাকে জাপটে ধরে তার সাথে খুনসুটি করতে-করতে হোটেলের ঘরে ফিরতে-ফিরতে পুরনো বাংলোর কথা বিশেষ আর মনে রইল না সারির। মনে রইল না কাঠকয়লায় লেখা আখর ক’টি। সৌরদীপ উঠে পড়েছে ততক্ষণে। আধঘণ্টার ফ্রি-হ্যান্ড সেরে নিয়ে পনেরো মিনিটের ধ্যানে বসেছে। লেসের পর্দাঢাকা জানালা দিয়ে নরম আলো এসে ভরিয়ে দিয়েছে হোটেলের ঘরটা। তারই একফালি এসে পড়েছে সৌরদীপের ধ্যানস্থ মুখে। স্বর্গীয় দেখায় সৌরদীপকে। বুক ভরে যায় সারির। এক অদ্ভুত ঋজু সৌন্দর্য। এমনই তো চেয়েছিল সারি। সৌরদীপের সান্নিধ্য তাকে বড় ভরসা দেয়। আনন্দ অনুভূতিতে মাখামাখি হল সারি। সুপুরুষ, মায়াময় সৌরদীপ, মাখনের দলার মত ফুটফুটে গুনগুন, নিভৃত, নিশ্চিন্ত অপরাহ্ণ সব মিলিয়ে এক অনির্বচনীয় সুখবোধ ছড়িয়ে পড়ল সারির শরীরে মনে। সারি সুখী। খুউউউব সুখী সারি। বাইরে ঘন সবুজ ভর-ভরন্ত সফেদাগাছের ডালে বসে একটা হলুদ পাখি ক্রমাগত ডেকে চলেছে, ‘ট্যুইট টো, ট্যুইট টো, ট্যুইট টো’। সারি পাখি চেনে না। সৌরদীপও না।

গুনগুনকে জাপটে ধরে সারি জিজ্ঞেস করল, ‘এটা কী পাখি বলো তো?’ গুনগুন মায়ের দিকে ফিরেও চাইল না, হাত ঠেলে পা দিয়ে ঠেলে নেমে যেতে চাইল, হোটেলের লনে ছোট-বড় বাচ্চা জুটে গিয়ে হৈহুল্লোড় করছে সব।
সৌরদীপ এসে দাঁড়িয়েছে লনে, পাজামা, পাঞ্জাবি ছেড়ে সাদা টেনিস শর্টস আর বেনেটনের সবুজ টি-শার্ট। সারি কিনেছিল, সারিই কেনে। নামী সফটওয়ার কোম্পানিতে দামি চাকরি করে সারি। ভালবাসার মানুষদের জন্য এটা-সেটা কিনতে তার বড় ভাল লাগে। দিতে খুব পছন্দ করে সে। লনে নেমে এল সারি, নানা রকম ছোট-বড় গাছের কেয়ারি, সার দিয়ে ফুটে আছে কমলারঙা বার্ড অব প্যারাডাইস, দু’পাশে মেলা পাখনা যেন। কলাগাছের মত পাতাওয়ালা গাছ থেকে ঝুলে আছে কাঁকড়ার দাঁড়ার মত টকটকে লাল ফুল, ডগার কাছটা হলুদ। নামটাও সেজন্যই তাল মিলিয়ে লবস্টার ক্লস। সেই ছোটবেলা থেকেই গাছের বড় শখ সারির। পুরনো বোতল, কৌটো, বাক্স কিছুই ফেলে না। সবুজ গাছ-গাছালিতে তার তিন কামরার ফ্ল্যাটবাড়ি ভরে থাকে। সে-দিকে তাকিয়ে আবার সুখী হয় সারি। সৌরদীপ, গুনগুন, তিন কামরার সাজানো ফ্ল্যাট আর তাতে অজস্র গাছ। দাঁতের ফাঁকে মৌরির দানা কাটে, পকেটে ছিল। মৌরির গন্ধে, জনসন্স ক্রিমের গন্ধে, টাটকা জংলা সবুজের গন্ধে কারা যেন কোরাসে বলে, ‘সুখ, বড় সুখ, বড় সুখ বেঁচে নেওয়ায়।’

বাচ্চাগুলো ভিড় করেছে একজায়গায়। ছুট লাগাল সারি, গুনগুনকে বিশ্বাস নেই মোটে, যা কাণ্ডটাই করেছিল আজকে। বাচ্চাদের ভিড়ে মাথা গলাতেই দেখতে পেল সামনে বসে বয়স্ক মানুষ একজন, উলোঝুলো চুলদাড়ি, হাতঢাকা জামা আর পুরনো হাফ জ্যাকেট। একটা প্ল্যাস্টিকের নীল গামলায় ছেড়ে দিয়েছে একটা ছোট টিনের স্টিমার, ভেতরে জ্বেলে দিয়েছে ছোট প্রদীপের মত ল্যাম্প একটা। আর সেই স্টিমার ফটফট, ভটভট শব্দে বারবার পাক খাচ্ছে। দেখে সারি, মনে পড়ে ছোটবেলায় তারও ছিল এমন নীলরঙের স্টিমার, আর ছাদটা টুকটুকে লাল, সামনে আবার একটা টিনের পতাকা। দুর্গাবাড়ির মেলায় সেও গুনগুনের মতই বসে ছিল প্লাস্টিকের গামলার কোনাটা ধরে। কিনে দিয়েছিল বাবা। প্রথম-প্রথম খুব উৎসাহ ছিল। তারপর বদ্ধ বৃত্তে, বৃত্তাকার ঘুরে চলা দেখতে-দেখতে একসময় স্পৃহা চলে গিয়েছিল সারির।

‘জাহাজ ভাল লাগে গুনগুন?’ সৌরদীপ গুনগুনের গালে গাল ঠেকাল, আর তক্ষুনি ওপাশ থেকে কেউ যেন হো-হো করে হেসে উঠে চমকে দিল সারিকে। ধড়ফড় বুক নিয়ে চমকে তাকাল সারি। সুপুরুষ জনা-চার বয়স্ক মানুষ বাঁদিকের লনে টেবল ঘিরে বসেছেন। হেসে উঠছেন সোল্লাসে। বয়স্ক, কিন্তু বৃদ্ধ নন। বৃদ্ধ হলে বদ্ধতা আসে, তার সাথে বয়সের সম্পর্ক নেই বিশেষ। খুব কমবয়সেও নিজেদের বেঁধে ফেলে অনেকে, গণ্ডি-বদ্ধ বেঁচে নেওয়ায় অভ্যস্ত তারা। তারা কিন্তু বয়স্ক নয়, অথচ বৃদ্ধ। আবার চমকে উঠল সারি, এ-কথা মনে এল কেন? হঠাৎ এ-কথা কেন মনে এল সারির। অচানক, মনের অতল থেকে কী করে ভেসে উঠল এ-কথা?

‘আপনি আটচল্লিশ?’ মেদহীন টানটান প্রাণবন্ত মানুষটার দিকে চেয়ে অবাক হয়েছিল সারি। ক্রু-কাট চুল, আর গায়ের রোম সমুদ্রের নোনা জল, আর উন্মুক্ত রোদে বাদামি, সেই নোনা হাওয়া গায়ে মেখেই তামাটে হয়ে যাওয়া শরীরটা ফর্সা ছিল একসময়।
‘বুড়ো বলি আপনাকে?’ সাতাশ ছোঁয়া সারি বলেছিল সকৌতুকে।
‘বুড়ো…বুড়ো…বুড়ো, বাঃ বেশ নামখানা’, বাঁধনহীন একরাশ খোলা হাওয়ার মত হা-হা করে হেসেছিল মানুষটা। কিচ্ছু মনে করেনি, বরং বুড়ো নামটা ভালবেসেই গায়ে-মাথায় মেখে নিয়েছিল।
‘বুড়ো কিন্তু বৃদ্ধ নয়, বৃদ্ধ হলে বদ্ধতা আসে’, বিরাট বড় একটা বিয়ার মাগ একনিশ্বাসে শেষ করে ঠোঁটের উপর লেগে থাকা ফেনাটা হাতের উল্টো চেটো দিয়ে মুছে বলেছিল বুড়ো। বলেই আবার হো-হো করে হাসি। সেই থেকেই বন্ধুত্বের শুরু, অবাক হওয়ার শুরু সারির, আর শুরু গল্প শোনার। ভারি অবাক-অবাক কথা বলত বুড়ো, বইপড়া কথা নয়। বেঁচে নেওয়া জীবনের কথা, কিংবা জীবন থেকে বেছে নেওয়া গল্প। আটমাস জাহাজে, প্রতি দু’সপ্তাহে এক-একটা দেশ, এক-একটা বন্দর, নতুন মানুষ, নতুন দোলাচল। বিগত কুড়িবছরে বড় কম গল্প জমেনি মানুষটার জীবনে। ডাঙার মানুষ সারি, তার বাবা-মা, পিতামহ-প্রপিতামহ সবাই মাটিতে থেকেছে, একস্থানে, এক উষ্ণতায়, তারা জোয়ারভাটা দেখেনি, প্রাণ হাতে করা সমুদ্র-ঝড়ে পাহাড়প্রমাণ ঢেউয়ের মাথায় তাদের মোচার খোলার মত জাহাজ উথালপাথাল হয়ে তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়নি কোনও দিন। বড় হয়েছে গাছের মতই, একই মাটিতে, শিকড় ছড়িয়েছে, বীজ ছড়িয়েছে। বংশ বেড়েছে। তারাও স্থিত হয়েছে। তাই স্থিতি বোঝে সারি। সকালবেলা হাতে মাটি মেখে গাছের পরিচর্যা করে সে। সেই গাছেরাও নিয়ম মেনে ফুল ফোটায়, সারি অফিস করে, রেসিপি বই দেখে রাঁধে এটা-সেটা। সৌরদীপ আপিস যায়, বাড়ি ফেরে নিয়ম মেনে, সপ্তাহান্তে আদরও করে নিয়ম মেনে। এই ভাল, এই তো সুখ। স্থিতি ভালবাসে সারি, তার বাবা, মা আত্মীয়-পরিজন সকলেই ভালবাসে থিতু হতে। মাঝে-মাঝে তারা সমুদ্রে গেছে বটে, নিরাপদ সি-বিচ, ক্রমাগত বয়ে চলা ঢেউ। নিশ্চিন্ত করা নুলিয়ার দল। দূর থেকে সমুদ্র বড় ভাল লাগে সারির।

পাহাড়ে সন্ধে নামার আগে সন্ধের গন্ধ নামে। জলজ বাষ্পে সবুজ গাছগুলো অনন্য গন্ধ ছড়ায়, তাপ নিষ্প্রভ হতে-হতেই, পাহাড় জুড়ে অজানা, অচেনা গাছগাছালি তাদের ঝুলি খুলে ধরে, সূর্য নামে, আর এক-একটা পাহাড়ের সারিতে ছায়ার মত সন্ধে নামে। সব রং একাকার শুষে নিয়ে প্রথমে ধূসরের নানা পরত, তারপর ধূসর গাঢ় আরও গাঢ় এবং শেষ অবধি ঘন কালো। পাহাড়ে সন্ধে নামা দেখছিল সারি।
‘সমুদ্রে এভাবে নামে না সন্ধে।’ দিগন্তে দৃষ্টি ছড়িয়ে বলেছিল বুড়ো।
‘কীভাবে নামে তবে?’
‘সে এক মজার খেলা। প্রতিদিনের নতুন নতুন চিত্র-প্রদর্শনী যেন। এত বড় খোলা ক্যানভাস পেয়ে, আকাশ তার কেরামতি দেখায়, দেখায় তার শিল্পনৈপুণ্য। কী অসাধারণ সে রং, কী অদ্ভুত সে বিন্যাস, কোনও শব্দেই ব্যাখ্যা হয় না। সূর্যের আলো হালকা হতে হতে কলুষহীন নীল আকাশের প্রথম পোঁচ পড়ে। উজ্জ্বল ক্যাডমিয়াম ইয়েলো আর তার মাঝে-মাঝে কোথাও কোথাও ইয়েলো ওকর, এলামাটির রং। তার পর সহসা কৃষ্ণচূড়া রঙের স্কারলেট রেড একমুঠো কেউ ছুড়ে মারে সেই সুবিশাল ক্যানভাসে। ব্যস, সেই শুরু, তার পর যেন রঙের হোরি খেলা, এপাশ-ওপাশ থেকে ক্রমাগত ছুটে আসে নানাবিধ লালের রকমফের, এত রকমের লাল, এত তাদের নাম, এত উষ্ণতা কখনও দেখোনি তুমি। তার পর একসময় বদলে যায় লাল, লাল আর আগুনরঙা কমলা হঠাৎ বদলে গিয়ে মেলন অরেঞ্জ আর তার মাঝে হালকা একপোঁচ নরম গোলাপি বা কার্নেশন পিঙ্ক। সেই কার্নেশন পিঙ্কে একটু প্রুশিয়ান ব্লু মেশে, সেটাই আঁধারের জন্মমুহূর্ত, এবার ধীরে দু’পাশ থেকে এগিয়ে আসে নীলের নানা রকম রংবৈচিত্র্য, প্রুশিয়ান ব্লু, হালকা আকাশ-নীল আর মৃদু সবুজের সংমিশ্রণ, তারপর পান্না-সবুজ টারকইয়েজ ব্লু থেকে একলাফে আল্ট্রামেরিন বা সমুদ্র নীল রং। প্রতিটি রঙের সাথে-সাথে বদল হয় জলের রং, জলজের রং, জলযানের রং, আমার চুল, দাড়ি, অস্তিত্বের রং, বদল হয় প্রতিদিন, প্রতি সূর্যোদয়ে, প্রতি সূর্যাস্তে।’ আবার হো-হো করে হেসে ওঠে বুড়ো। হাসার অজুহাত চাই যেন মানুষটার, প্রতিটি হাসিতে ভরে নেওয়া আরও বেশি জীবনীশক্তি। সাদা লিনেনের ঢিলেঢালা প্যান্ট আর বুকখোলা হাওয়াইয়ান সাদা শার্টে খোলা হাওয়ার মত উন্মুক্ত মনে হয় বুড়োকে, তার হাসিতে, দাড়িতে, ঠোঁটে সব জায়গায় লেপটে থাকে টাটকা, তাজা, সমুদ্রের গন্ধ। ঠোঁটে? হ্যাঁ, ঠোঁট জুড়েও তার সমুদ্রের গন্ধ। সমস্ত জীবনীশক্তি শুষে নেওয়ার মত দীর্ঘ, উদ্দাম ভাল লাগার স্মৃতিতে শিউরে উঠল সারি।
জোরে-জোরে মাথা ঝাঁকাল সে। না না এ চলবে না, এ অনুপ্রবেশ কিছুতেই মেনে নেবে না সারি। দ্রুত ঘরের দিকে পা চালাল সে, গুনগুনের সাথে বিছানায় খুনসুটি করছে সৌরদীপ। বিছানা, বালিশ ওলট-পালট। খিলখিলে হাসি ধরে রাখছে হোটেলের শব্দ-নিরোধক ঘর। সে-দিকে চাইতেই আবার সব স্বাভাবিক, সব বর্তমান। দেওয়াল জোড়া আয়না, টেবলে ফ্রুট-বাস্কেট, মিনি ফ্রিজ, তার স্বামী, তার কন্যা, তার পৃথিবী, আর অন্য কিছু চায় কে?
গুনগুনের জন্য চিকেন সুপ এসেছে পোর্সিলিনের বড় সাদা সুপ বোলে, ওপরের ঢাকা সরাতেই সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ল, হালকা সোনালি সুপ আর তার মধ্যে হালকা সবুজ পকচয়, চৌকো করে কাটা গাজর, লাল সবুজ ক্যাপসিকাম। খাবারটা এরা বড় যত্নে বানায়। বড় যত্নে পরিবেশন করে। একচামচ মুখে দিল সারি, সামান্য নুন মিশিয়ে নিতে, নুনদানিটা তুলেছিল সবে, কে যেন কানের পাশে বলে উঠল, ‘হ্যাভ ইট ক্লোজেস্ট টু দ্য নেচার।’ ঠিক প্রকৃতি থেকে যেভাবে উঠে আসে, যে স্বাদে, যে গন্ধে, যে মিশ্রণে, তার বাইরের আর কিচ্ছু যোগ কোরো না।
‘তোমার কথা শুনব না বুড়ো, কিছুতেই শুনব না’, মাথা ঝাঁকাল সারি। সামান্য নুনের দানা যেন জোর করেই মিশিয়ে দিল সুপটাতে, ‘খেতে এসো গুনগুন, নইলে জিয়ান এসে সব খেয়ে নেবে কিন্তু।’ ডোরেমন দেখতে-দেখতে খাওয়া অভ্যাস করেছে গুনগুন, সৌরদীপ মাথায় তুলেছে, নইলে সে কিছুতেই খেতে-খেতে কার্টুন দেখতে দিত না। ‘ফোকাস…ফোকাস’ ছোটবেলা থেকে অভ্যাস করেছে সারি। বর্তমান মুহূর্তগুলোয় চেঁচে-পুঁছে থাকো প্রতিমুহূর্তে।
মোবাইলে ডোরেমন দেখতে-দেখতে খায় গুনগুন। ‘তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও গুনগুন, কাল সকালে রোপ-ওয়ে চড়তে যেতে হবে তো।’ তাড়া দেয় সারি, সৌরদীপ উসখুস করছে, সন্ধেটা রোজকার মত কেটে যাক, এমন চায় না সে।
গরমজলের শাওয়ারের নীচে উন্মুক্ত হল সারি, প্রতিটি রোমকূপে জলধারা, সারাগায়ে পাচৌলি ফুলের গন্ধে ভরা শাওয়ার-জেলের ফেনা। প্রতিটি শরীরী উৎসবের আগে সারি শরীরকে আবাহন করে সুগন্ধে। লিলি অব ভ্যালি, এ সন্ধের উপযুক্ত সুগন্ধী। দিনের সময় মেপে, ঋতু আর আর আবেগ অনুযায়ী পরতে হয় সুগন্ধ। সব সময়ের, সব ঋতুর এক সুগন্ধ নয়। গোপন অঙ্গে বিন্দু-বিন্দু নির্যাসের ছোঁয়া, এ গন্ধের কাছে বশ মানবে মস্তিষ্ক, আর মস্তিষ্কের আদেশে শিরা-উপশিরায় দ্রুত হবে পুরুষের রক্ত চলাচল। উন্মুক্ত শরীরে হালকা রাত্রিবাস চাপিয়ে নিল সারি। অন্তর্বাসহীন। পূর্ণচোখে আয়নায় তাকাতেই, কানের লতিতে ওষ্ঠ স্পর্শ করে কে যেন ফিসফিস করে উঠল, একটা ছোঁয়া বাকি রয়ে গেল যে? চমকে উঠল সারি, তুমি কোথা থেকে, কোথা থেকে আমায় দেখছ বুড়ো? কীভাবে, অজান্তেই দু’হাত জড়ো হল বুকের কাছে। কেউ কোথাও নেই তো। আচমকা থমকে গিয়েছিল সারি। স্বাভাবিক হয়ে এল দ্রুত আর তখনই মনে হল, বাকি রয়ে গেল? ও হ্যাঁ, তাই তো। বাকি রয়ে গেছে শরীরের সেই বিশেষ অংশ, যে অংশে শিরা উপস্থিতি সবচেয়ে প্রকট, শুধু হালকা চামড়ার আবরণ আর সেই চামড়ার নীচে নীল শিরা বেয়ে ক্রমাগত ছুটে চলেছে শোণিতধারা। কব্জিতে, নীলচে শিরার উপরে একবিন্দু নির্যাস রাখল সারি। অনেকটা ভেপোরাইজারের মত কাজ করে। শরীর আর শোণিতের উষ্ণতায় গন্ধ ছড়ায়। ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের কাছাকাছি বাহুর আলতো বেষ্টন, বাহু বেয়ে ওঠা সুগন্ধ আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে যে কোনও পুরুষের শরীরে। জানি জানি, সব মনে আছে বুড়ো, যা যা শিখিয়েছ কবে কখন যেন গেঁথে গেছে মজ্জায়। এতদিন এতবছর পরে আজ তুমি মাথায় থাকছ কেন? অভ্যাসে ঢুকে চুপচাপ ঘুমিয়ে ছিলে যেমন, তেমনই তো থাকতে পারতে। আজ চারবছর পর কেন জেগে উঠলে তবে?
‘তোমায় আজ অন্যরকম দেখাচ্ছে!’ ক্রিস্টাল গ্লাসে বরফ তার উপর ল্যাফ্রয়েগ, ঢালতে-ঢালতে আচ্ছন্ন গলায় বলল সৌরদীপ।
‘ভাল, না খারাপ?’ প্রশ্ন করে সারি।
‘নতুন, অন্যরকম যেন।’
‘ভাল তো…’, সৌরদীপের গেলাসটা তুলে নিয়ে চোখ বুজে নাকের কাছে এনে গন্ধ নেয় সারি। ‘ভডকা নয়, আমিও স্কচ খাব আজ, অন দ্য রক্‌স।’
সৌরদীপ সত্যিই অবাক হয় এবার অবিশ্বাসের সুরে বলে, ‘স্কচ খাবে? পারবে?’
হাসে সারি, অচেনা সারি, হালকা সিপ জিভে রাখে প্রথমে, সারা ঘ্রাণেন্দ্রিয় জুড়ে ধোঁয়াগন্ধ সোনালি তরল, গলা বেয়ে নেমে আসে সামান্য তিতকুটে স্বাদ। সাদা ধবধবে মার্চেন্ট নেভির বাংক বেডে বসেছিল সারি, টিনের চেয়ারে মুখোমুখি বুড়ো। গোল জানালা দিয়ে যতদূর দেখা যায় শুধু নীল জল। কেবিনের দরজা খুলে দিতেই, একরাশ নোনা হাওয়া হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়েছিল কেবিনে। ‘পারব বুড়ো? যদি নেশা হয়ে যায়?’ হো-হো করে হেসেছিল বুড়ো, সব কিছু উড়িয়ে দিতে জুড়ি নেই ওর। পৃথিবীর কোনও সমস্যাই ধর্তব্যের মধ্যে আনত না বুড়ো।
প্রথম পানীয়টা শেষ করে স্থানবদল করেছে সৌরদীপ। কখন পাশে এসে বসেছে খেয়াল করেনি সারি। খেয়াল হল ঘাড় আর শিরদাঁড়ার সন্ধিস্থলে সৌরদীপের ঠোঁটের উষ্ণ স্পর্শ পেয়ে।
ছোট কেবিনে দু’হাতের তালুতে পেটমোটা গ্লাস নিয়ে বসে খেলা চলত র‍্যাপিড ফায়ার।
‘শীত না বর্ষা?’
‘ভোর না সন্ধে?’
‘পাহাড় না সমুদ্র?’
‘পাহাড়… তোমার?’
সমুদ্র, অফকোর্স সমুদ্র। সমুদ্রের দেবতার মতই দু’হাত দু’পাশে ছড়িয়ে হাসত বুড়ো, জাহাজের দুলুনি ছাড়া আমার ঘুম আসে না। ভোরের হাওয়ায় নোনা জলের ঝাপটা না হলে আমার ঘুম ভাঙে না। বসন্তের কোকিলের চেয়ে লম্বা ডানা সিগাল পাখির তীক্ষ্ণ ডাকে আমি বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করি।
‘সমুদ্রে বড় ভয় হয় আমার’ বুড়োর বুকে মাথা গুঁজত সারি। ‘এত বিশাল, এত গভীর।’
বিশাল থাবা আলতো করে রাখত বুড়ো সারির মাথায়। চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলত, ‘আছি তো, আছি তো আমি।’
সৌরদীপের ঠোঁট শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে আসছে নিচে, ওপেন শোল্ডারগাউন আলগা হয়ে নেমে এসেছে পা গলিয়ে, নিরাবরণ সারি। এর পরের প্রতিটি চলন সারির মুখস্থ। সারির প্লেজার পয়েন্টগুলো সারিই চিনিয়েছিল সৌরদীপকে, হেসে বলেছিল, নাও তোমার হাতে তুলে দিলাম আমার সব ক’টা মরণবাণ। আর সারিকে চিনিয়েছিল…। সারি ছটফট করে ওঠে, দম আটকে আসছে তার, বড্ড গরম লাগছে, একঝলক নোনতা তাজা হাওয়ার জন্য ছটফট করে সে। না না ঠিক হচ্ছে না, এভাবে নয়, ডাঙায় তোলা মাছের মত খাবি খায় সারি। নোনা, তাজা, একঝলক বাতাসের জন্য হাঁকপাঁক করে ওঠে সারি, আকাশ হাতড়ায়। সৌরদীপ বোঝে না, সব যুদ্ধ শেষ ততক্ষণে। রিক্ত, অবসন্ন, শিথিল সৌরদীপ শুয়ে থাকে ওপর হয়ে। একটা হাত তখনও বেষ্টন করে আছে সারির কোমর। সময় নেয় সারি, সময় দেয়। তার পর একসময় ধীরে-ধীরে উঠে কলঘরে ঢুকে, শাওয়ার চালিয়ে দেয়।

‘এক বৈজ্ঞানিক অদ্ভুত পরীক্ষা করেছিল একবার। ছোট একটি শিশুর শরীরে সংযোজন করেছিল মাছের শ্বসন যন্ত্র। ফুসফুসও ছিল, তবে শিশুটি সাধারণত কানকো দিয়েই শ্বাসপ্রশ্বাস চালাত। হ্যাঁ, সমুদ্রের অভ্যন্তরেই থাকত শিশুটি। জলতলের অভ্যন্তর ছিল তার জগৎ, তার সাবলীল বিচরণস্থল। সাগরতলের খুঁটিনাটির খবর রাখত সে। কিন্তু ডাঙার ভাষা, পোশাক, নিয়মকানুন কিছুই শেখেনি কোনওদিন। তার কাছে ডাঙার মানুষমাত্রেই ছিল ঘাতক। তাই মাঝে-মাঝেই ডাঙার মানুষদের ফেলা জাল কেটে প্রায়ই মুক্ত করে দিত মাছ, শুশুক, শঙ্কর মাছ। মাঝসমুদ্রে উলটে ফেলত জেলে নৌকো। মুক্ত করা শুশুকদের পিঠে চেপে ঝাঁপাত এক ঢেউ থেকে আর-এক ঢেউয়ে, এক স্রোত থেকে আর-এক স্রোতে। আর মাঝরাতে কখনও বিজয়োল্লাসে বেজে উঠত তার শিঙে। তীব্র খান-খান স্বর। সেই তীব্র স্বরে ভয়ে মাথায় হাত ঠেকাত মাঝিমাল্লার দল, মানত করত সুস্থ ঘরে ফেরার। ক্রস আঁকতে আঁকতে ফিসফিস করে বলত, চুপ চুপ, ওই শোন, শুনতে পাচ্ছিস, ওই শোন দরিয়ার দানো। আর কলের জাহাজের শিক্ষিত জাহাজিরা বলত ‘উভচর মানুষ’, অ্যালেক্সান্ডার বেলায়েভের লেখা ‘উভচর মানুষের গল্প’ শুনিয়েছিল বুড়ো।
তার পর? প্রতিবারের মত বড়-বড় চোখ মেলে জিজ্ঞাসা করেছিল সারি। ভয়ে-ভয়ে তাকিয়েছিল সাঁঝ নামা দিগন্তবিলীন সমুদ্রে।
তার পর একদিন, ততদিনে কৈশোর কাটিয়ে সদ্য তরুণ হয়েছে উভচর মানুষ। একদিন সে দেখল বালির চরায় বসে আছে তারই মত একটি মানুষ, তারই মত কিন্তু তবু একটু অন্যরকম যেন, এই মানুষটির সোনালি চুল নেমেছে পিঠ ছাপিয়ে, আলগোছে ফেলে রাখা নিটোল দু’টি হাত, কমনীয় মুখমণ্ডলে পাতলা সরু ঠোঁট আর সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল তার চোখ দুটো, অমন বিষাদমাখা নীল চোখ এর আগে কখনও দেখেনি সেই তরুণ। অবাক চোখে লুকিয়ে-লুকিয়ে দেখে তরুণ।
তার পর নির্দিষ্ট সময় প্রতিদিন আসে আর লুকিয়ে-লুকিয়ে দেখে, অবাক হয়ে, অপলক তাকিয়ে থাকে তরুণটি, যতক্ষণ না সূর্যাস্ত হয়, যতক্ষণ না সেই মানুষটি উঠে হাঁটা দেয়। সারাদিন কেমন যেন উন্মনা লাগে তরুণটির, অপেক্ষা করে থাকে অপরাহ্নের, কখন আসবে সে। কেন যেন তার দিকে চেয়ে থাকতে বড় ভাল লাগে উভচর মানুষের। কেমন যেন বদলে গেছে সে, সে এখনও বাঁচায় তার সমুদ্রের বন্ধুদের, কিন্তু এখন আর সে রাতবিরেতে জেলে ডিঙি উলটে দেয় না, বিজয়োল্লাসে তীব্র শব্দে শিঙা বাজায় না আর। শুধু উন্মনা হয়ে অপরাহ্ণের অপেক্ষা করে। তার পর একদিন কী হয়েছে, সেই তরুণ ঠিক করেছে তাকে একটা উপহার দেবে। জলের তলায় মণিমুক্তার ছড়াছড়ি। সে সবচেয়ে বড় গোলাপি মুক্তোখানা ঝিনুকসুদ্ধ তুলে এনে পৌঁছুল নির্দিষ্ট স্থানের কাছাকাছি। একটু আগেই পৌঁছুল সে। আর একটু পরেই আসবে সে। সময় যেন কাটতেই চায় না। অপেক্ষা করে তরুণ। আজ যেন একটু বেশিই সময় লাগছে, তা হোক, সে ঠিক অপেক্ষা করবে ধৈর্য ধরে, ডাঙার কাছাকাছি জল যেন পাঁকে ভর্তি, কষ্ট হয় নিশ্বাস নিতে, দম আটকে আসে, তবু অপেক্ষা করে উভচর মানুষ। পাড়ের সেই পাথরটার দিকে হেঁটে আসা সকল সোনালি চুলওয়ালা মানুষ দেখেই চমকে ওঠে সে। এই এল বুঝি। কিন্তু সে এল না সেদিন। বুকের মধ্যে কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে ফিরল উভচর মানুষ। এমন অনুভূতি তার আগে কখনও হয়নি। কোথাও আঘাতের চিহ্নমাত্র নেই, তবু অদ্ভুত যন্ত্রণা হচ্ছে। সমুদ্রের নীচে সমস্ত ব্যারামের নিদান তার জানা। সে এটা খায়, ওটা লাগায়, এটা টানে, সেটা বাঁধে তবু সে ব্যথার উপশম হয় না। শুশুকের পিঠে চড়ে লাফিয়ে বেড়ায় বেলাভূমির পার ধরে যদি দেখা মেলে, কোনও ভাবে যদি দেখা মেলে, কিন্তু দেখা মেলে না। তার পরের দিনও আসে না সোনালি চুলের কমনীয় মুখ, গভীর বিষাদমাখা দুই চোখ, তার পরদিনও না।
প্রতিটি ঋতুর মতই, সারির চোখে তার প্রতিটি অনুভূতি প্রতিফলিত হয় সহজেই। তার ভ্রূ-পল্লবে, তার চোখের পাতায়, তার পাতলা গোলাপি ঠোঁটে, কান্নামাখা অভিব্যক্তি। কোনও রকমে চোখের জল গিলে সে বলে, ‘তারপর?’
বুড়ো কিন্তু হো-হো করে হেসে উঠল না এবার, সারির বিষাদ যেন ছুঁয়ে গেল বুড়োকে।
‘তার পর একদিন সেই উভচর মানুষ ঠিক করে সে খুঁজে বের করবেই সোনালি চুল, কমনীয় মুখের ডাঙার মানুষটিকে, যার ভারী আঁখিপল্লব আর নীল গভীর বিষণ্ণ চোখ দু’টির কথা ভেবে তার ঘুম আসে না।
সে ডাঙায় উঠে এল, যোগাড় করল পোশাক, তার পর শুরু হল তার খোঁজা, ধুলো, মোটরগাড়ি আর কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া, কলুষের মধ্যে দিয়ে প্রতিদিন তন্নতন্ন করে খুঁজত সেই তরুণ। মাঝে-মাঝে শ্বাসকষ্টে তার দম ফেটে যেত, সে ছুটে গিয়ে ঝাঁপ দিত সমুদ্রে। কিন্তু আবার ফিরে আসত পরের দিন। সে ধীরে-ধীরে আবিষ্কার করতে লাগল, কী স্বার্থপর আর কলুষমাখা ডাঙার জগৎ। হিংসা, দ্বেষ, মারামারি আর সর্বোপরি বাতাসময় বিষ। দিন আসে, রাত যায় প্রতিদিন সকাল থেকে সাঁঝ উভচর মানুষ ইট, কাঠ, পাথরের শহরে খুঁজে ফেরে সেই সোনালি চুল, দীঘল আঁখি আর…।’
সারির চোখে তখন টলটল করছে জল, আঁকড়ে ধরেছে বুড়োর বাহু, ‘তার পর?’
‘তার পর একদিন তাকে খুঁজে পেল উভচর মানুষ। এক নিষ্ঠুর মানুষের ঘরণী সে। আনন্দে ছুটে তার হাত জড়িয়ে ধরতে যাবে, সেই সময় তার দমবন্ধ হয়ে এল প্রচণ্ড যন্ত্রণায়। কোনওরকমে ছুটতে-ছুটতে যে ঝাঁপ মারল সমুদ্রে, ঝাঁপ মেরেই চেতনা হারাল।’
‘না বুড়ো, প্লিজ ডোন্ট কিল হিম’, শিশিরে ভেজা ফুলের মত আর্দ্র সারির কণ্ঠস্বর।
‘না মারা গেল না সে’, বড় ক্লান্ত স্বর বুড়োর, এমন কখনও আগে শোনেনি সারি।
‘সেই বৈজ্ঞানিক বাঁচিয়ে তুলল তাকে, কিন্তু মরে গেলেই বুঝি ভাল হত, কারণ উভচর মানুষ আর কখনওই পৌঁছুতে পারবে না তার প্রেমিকার কাছে।’
‘কেন বুড়ো?’ আর্তনাদ করে উঠল সারি।
‘বহু চেষ্টায় সেই বৈজ্ঞানিক বাঁচিয়ে তুলল তাকে, কিন্তু দীর্ঘদিনের অনিয়ম আর দূষণে তার ফুসফুস ততদিনে অকেজো হয়ে গেছে। সে আর কোনওদিন ফিরে যেতে পারবে না জলের উপরের জগতে। জলতলের জগতে আমৃত্যু তার চিরনির্বাসন।’
ধু-ধু রাতে একা ব্যালকনিতে বসে থাকে সারি। ভেতরে অঘোরে ঘুমোচ্ছে সৌরদীপ আর গুনগুন। নিশ্চিন্ত, সুখের ঘুম, তবে তার ঘুম আসছে না কেন আজ? থিরথির হাওয়া ছুঁয়ে যায় গালের উন্মুক্ত অংশ, হাত, তবু চাদর ঢেকে নিতে আলস্য লাগে সারির। পাহাড়ের মাথা ছুঁয়ে ঝকঝকে স্থির শুক্রগ্রহ, এখানে আকাশভরা হিরের কুচির মত ঝকঝকে তারা। এক-এক করে অনেকগুলো তারা চিনিয়েছিল বুড়ো। সমুদ্রে থাকলে আকাশ জানতে হবে বইকী, যদি কোনওদিন যন্ত্র কাজ না করে, তবে এরাই তো দেখাবে পথ।
মাত্র সাতটা মাস, তাতেই কেমন যেন ওতপ্রোত হয়ে গিয়েছিল সারি, তবে তার চেয়েও জড়িয়ে গিয়েছিল বুড়ো। আগের মত দু’হাত ছড়িয়ে হো-হো হাসিতে আকাশ ভরিয়ে দিত না আর।
পাহাড় না সমুদ্র? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে থমকে যেত। অনেকক্ষণ সেই তারাভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞাসা করত, ‘বাগান করা শিখিয়ে দিবি আমায়?’
শেখাতে পারেনি সারি, অনেক আগে কথা দিয়ে ফেলেছিল যে সৌরদীপকে, বাবা–মা, দিদি সবাইকে। সবাই মিলে গড়ে তুলেছিল বন্ধন, সে বাঁধন ভাঙার সামর্থ্য ছিল না সারির, সাহসও নয়।
তবে সম্পর্ক থেকে সরে আসার নিয়মগুলো জানত সারি। একঝটকায় ভাঙতে হয়। ধীরে-ধীরে সইয়ে-সইয়ে ভাঙা যায় না। রেশ রাখতে নেই। তাই একঝটকায় সব কিছু কেটে ফেলেছিল সারি। একফোঁটা জল গড়াতে দেয়নি চোখ থেকে। তাই তো এত সুখের জীবন সারি আর সৌরদীপের। পেছনে ফিরে তাকাতে নেই। এটাই নিয়ম।
‘আচ্ছা বুড়ো কেমন আছে?’ আজ চারবছর বাদে প্রশ্নটা তীক্ষ্ণ কাঁটার মত বিঁধল সারির। একবারের জন্যেও তো সারির কৌতূহল হয়নি বুড়ো কেমন আছে? আহ, জানি, জানি সেটাই নিয়ম। মন দুর্বল হয় এমন কিছুই করতে নেই, এমন কিছুই দেখতে নেই, এমন কিছুই জানতে নেই।
হঠাৎ বিদ্যুৎ-চমকের মত একটা কথা মাথায় এল সারির।
পাহাড় না সমুদ্র?
পাহাড়…পাহাড়, চিরকাল স্বতঃস্ফূর্ত হত সারি।
তবে কি বুড়ো? বুড়োই কি তবে এই একটামাত্র সূত্র ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছে তাকে?
কেঁপে উঠল সারি। তবে কি বুড়োই তার কাছে পৌঁছে দিতে চাইছে এই জিজ্ঞাসা?
দেশের প্রতিটি পাহাড়ে ঘুরে ঘুরে, এঁকে রাখছে প্রশ্নচিহ্ন।
থরথর করে কেঁপে উঠল সারি।
ছুটে গিয়ে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলল সৌরদীপকে, তার ঠোঁট কাঁপছে, গাল, চিবুক, বুক চোখের জলে মাখামাখি।
‘প্লিজ এখান থেকে চলো, কিচ্ছু জিজ্ঞেস কোরো না লক্ষ্মীটি, এখান থেকে নিয়ে চলো আমায় এখুনি। প্লিজ দীপ’, কান্নার দমকে সারির শব্দ মাখামাখি।
‘আর কখনও কোনও পাহাড়ে নিয়ে এসো না আমায়, পাগলের মত বার-বার বলতে থাকে সারি।’ ততক্ষণে গভীর মমতায় সৌরদীপ আঁকড়ে ধরেছে সারিকে।
সৌরদীপের সবচেয়ে বড় গুণ, তার মাথা খুব ঠান্ডা, সে অকারণ উত্তেজিত হয় না। প্রশ্ন করে না।
ঘণ্টাদুয়েকের মধ্যে ইয়ারকাড ছাড়ল সৌরদীপের বোলেরো।
এতক্ষণ আর একটাও কথা বলেনি সারি। সৌরদীপও নয়।
পাহাড় বেয়ে ভোরের নরম আলো ছুঁয়েছে ততক্ষণে। সৌরদীপের বোলেরো খুব ধীর গতিতে ম্যালের রাস্তা থেকে বাঁক নিল। দু’হাত দিয়ে সৌরদীপের হাতটা জড়িয়ে রেখেছে সারি। পেছনের সিটে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে গুনগুন। ফাঁকা রাস্তায় এগিয়ে চলল সারি আর সৌরদীপের বোলেরো। জানালার কাচে চোখ রেখে শেষবারের মত বাংলোটা দেখে নিল সারি। পুরনো বাংলোর হলদে দেওয়াল বেয়ে নেমে এসেছে লোহার জলনিকাশি পাইপ। লোহার পাইপ রোদে-জলে জীর্ণ। সেই পাইপ বেয়ে মরচেরঙা জল বেরিয়ে ভিজে আছে দেওয়ালের বেশ কিছুটা। আর সেই দেওয়ালে, কাঠকয়লায়, গোটা-গোটা অক্ষরে, খুব ধরে-ধরে, যত্ন করে কেউ বাংলায় লিখেছে, ‘মনে পড়ে না, না?’

চিত্রকর: মৃণাল শীল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More