তোর জন্য সুখসায়র

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দেবনারায়ণ চক্রবর্তী

    আজ প্রসূনের মৃত্যুদিন। একবছর পূর্ণ হল।

    অত্রির চেয়ে মাত্রই তিন বছরের বড় ছিল ওর দাদা প্রসূন। মা’র এখনও সন্দেহ তাঁর বড় ছেলে অ্যাক্সিডেন্টে মরেনি।

    আচ্ছা কেনই বা প্রসূন আত্মহত্যা করবে?

    বেসরকারি হলেও নাম করা কোম্পানিতে চাকরি। শান্ত ভদ্র সুন্দরী স্ত্রী ধীরা। এক বছরের মেয়ে অথৈ। বাবার পেনশান! নিজেদের বাড়ি। অত্রিও ক্যাম্পাসিঙে মোটামুটি একটা চাকরি পেয়েছিল প্রথমে কলকাতায়। এক বছরের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে লড়ছিল। পরে পেয়েছে অন্য একটা বড় কোম্পানিতে। বাইরে বলতে এই তো নাকের ডগায় ব্যাঙ্গালোর। এখন আর দূর বলে দুনিয়ায় কোনও জায়গা আছে নাকি? অত্রির সঙ্গে দাদার সম্পর্কও খুব ভালো — তবু কেন যে প্রসূন দিন দিন একা হয়ে যাচ্ছিল! কলেজ, থেকেই নেশা ধরেছিল। প্রসূনের বন্ধুরা কোনওদিনই ভাল ছিল না। অত্রি তো সবাইকেই চিনত। কু–সঙ্গে পড়েই দাদার ফিজিক্সে অনার্স কেটে যায়। দু’ভাই এক ঘরেই শোয়। অত্রি মা’কে বলেছিল। মা কয়েকদিন বাবার আড়ালে বকাবকি করতে নেশা ছেড়ে দেয় প্রসূন।

    বাবা তাঁর এক বন্ধুকে ধরে দাদার চাকরিটা করে দেয়। চাকরি পাবার পর আবার প্রসূন সেই আলেয়ায়—

    দাদার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে খবর পেয়ে ব্যাঙ্গালোর থেকে ছুটে এসেছে অত্রি। জি.আর.পি, হাসপাতাল, মর্গ ছুটোছুটি করে প্রসূনের ছিন্ন ভিন্ন দেহ ফিরে পেয়ে মর্গ থেকেই শ্মশান ঘাটে। বাবা মা কেউই যাননি ছেলের ঐ বীভৎস দেহ দেখতে। অত্রির বন্ধুরাই সারাক্ষণ ওর সঙ্গে থেকেছে।

    ওদের এক দূর সম্পর্কের কাকিমা আর কয়েকজন পাড়ার দিদি মাসিরা নিমপাতা আগুন আর লোহা নিয়ে অপেক্ষা করছিল শ্মশানযাত্রীদের জন্য।

    বসার ঘরে ধীরা একা পিছন ফিরে বসে অথৈকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে। দাদার ঐ দেহে মুখাগ্নি করার সময়ও একটুও চোখে জল আসেনি অত্রির। কিন্তু এই দৃশ্য দেখে ওর বুক ঠেলে উঠে এসেছে কান্না। সে ছুটে ছাদে পালিয়েছে।

    কখন পায়ে পায়ে মা এসেছে ওপরে। মা ওর কাঁধে হাত রাখতে চমকে উঠেছে অত্রি।

    মা’র গলা কান্নাভেজা। বলেছে, ‘‘পুনু কী আত্মহত্যা করল না কী রে অত্রি? ব্যারাকপুর থেকে ফাঁকা ব্যারাকপুর লোকালে বসার জায়গা নিয়ে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে গল্প করতে করতে যেত। হঠাৎ সে ট্রেনের দরজায় গিয়ে দাঁড়াবে কেন?’’

    বড় ছেলে প্রসূনের ডাক নাম পুনু হলেও অত্রির নামটা তো এমনিতেই ছোট তাই ও বাবা মার কাছ থেকে কোনো ডাকনাম উপহার পায়নি।

    অত্রি ধরা গলায় বলেছে, ‘‘দাদা কেন আত্মহত্যা করতে যাবে মা!’’

    ‘‘মানুষের মনে মনে কী থাকে কে বলতে পারে বল?’’ মা বলে। তখনই নীচে থেকে কে একজন মাকে ডাকল।

    খানিক পরই অথৈ’র কান্না শুনে পা চালিয়ে অত্রি নিচে নেমে আসে।

    ঠাকুমার সঙ্গে তো মেয়ের খুব ভাব। তাহলে অথৈ অত কাঁদছে কেন?

    জিজ্ঞেস করতে মা বলে, ‘‘ওর মা’র বুকের দুধ খাচ্ছিল, ছাড়িয়ে নিয়ে ধীরাকে পুকুর ঘাটে নিয়ে গেল। তাই অত কাঁদছে। অনেকক্ষণ থেকে ধীরাকে বলছি, যা পুকুর থেকে ঘুরে আয়। পাথরের মূর্তির মতো মেয়েকে বুকে আঁকড়ে বসেছিল।’’

    ‘‘দাও ওকে আমার কোলে দাও।’’ অত্রি দু’হাত বাড়াতে অথৈ ঝাঁপিয়ে এল বুকে। কাকাইয়ের কাঁধে মাথা রেখে ফুলে ফুলে ক্ষুন্ ক্ষুন্ কাঁদছে, তবে অনেক শান্ত হয়ে গেল অথৈ। অত্রি মা কে জিজ্ঞেস করে, ‘‘ওকে নিয়ে পুকুরঘাটে যাব?’’

    ‘‘না।আজকের রাতে ওকে নিয়ে বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না।’’ মা বলে।

    ধীরাকে নিয়ে ওরা ফিরল। মা বুদ্ধি করে একটা রঙিন শাড়ি দিয়েছে ধীরার পরার জন্য। মাকে অন্য বসনে দেখলে অথৈ ভয় পেয়ে যেত।

    ধীরা মাথা নিচু করে ফুলে ফুলে কাঁদছে। অত্রি তাড়াতাড়ি অথৈকে নিয়ে সরে যায়।

    সেদিনের পর আজ শুধু নয়, আগেও বেশ কয়েকবার মা একই কথা জিজ্ঞেস করেছে। পুনু কী আত্মহত্যা করল না কী অত্রি? অবুঝ মাকে কে বোঝাবে? কেন দাদা আত্মহত্যা করতে যাবে? তার একই কথা, মানুষের মনে মনে কী আছে কে বলতে পারে বল?

    ‘‘আপনি অত্রি বসু?’’

    ‘‘হ্যাঁ স্যার।’’

    ‘‘আপনাকে কেন থানায় ডেকে আনা হয়েছে জানেন?’’

    ‘‘জানি। কিন্তু সেটা মিথ্যা অভিযোগ।’’

    ‘‘আপনার দাদা প্রসূন বসু সুইসাইড নোট-এ পরিষ্কার লিখে রেখে গিয়েছে। আমার মৃত্যুর জন্য আমার ছোট ভাই অত্রি বসু দায়ী। আপনি নির্দোষ কিন্তু সে প্রমাণ হবে তো আদালতে।’’

    ‘‘দাদা তো অ্যাক্সিডেন্টে মারা গিয়েছে। চলন্ত রেলগাড়ির দরজায় দাঁড়িয়েছিল। সিগন্যালের আলো খাম্বায় ধাক্কা লেগে পড়ে যায়। সুইসাইড নোটটা একটু দেখাবেন?’’

    ‘‘খেপেছেন, নোটটা আপনার হাতে দিই আর আপনি ছিঁড়ে ফেলুন।’’

    ‘‘মিথ্যে কথা লিখে রেখে গিয়েছে প্রসূন। রুক্ষ্ম মেজাজী সন্দেহপ্রবণ আর অহঙ্কারী ছিল সে। প্রতিদিন রাতে নেশা করে এসে ওর স্ত্রী ধীরার ওপর অত্যাচার করত। এমন কী মেয়ে অথৈ-এর পিতৃত্ব নিয়েও সন্দেহ ছিল তার। এত নীচ প্রকৃতির মানুষ ছিল আমার দাদা!’’

    ‘‘চিৎকার করবেন না অত্রি। অন্যায় করেছেন। যা প্রশ্ন করি, মাথা নীচু করে উত্তর দেবেন। আমাদের কাছে খবর আছে। আপনিই বা ধীরার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে গিয়েছেন কোন সাহসে? সংসারের নিয়ম-কানুন আপনি কিছু জানেন? বেশির ভাগ মানুষই বন্ধুত্ব সহ্য করতে পারে না। ভয় পায়।’’

    ‘‘বিশ্বাস করুন অফিসার। আমার দাদার মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী নই। আর বন্ধুত্ব তো হিসাব করে হয় না। নারী পুরুষ সব ক্ষেত্রেই মূল্যবোধের মিল হলেই বন্ধুত্ব হয়। এমনিতে আমরা দু’জনই সমবয়সী। ধীরা আমার কাছে মানবিক আশ্রয় পায়। তাই হয়তো আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বটা গড়ে উঠেছে।’’

    ‘‘ওসব মানবিকতার কথা-টথা বলবেন না। পুলিশ লাইনে চাকরি করতে এসে কত দেখলাম। এখনও মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ যাঁরা মানবিকতা বস্তুটা টিকিয়ে রেখেছেন কত রকম ভাবে তাঁদের হেনস্থা হতে হয় আপনি জানেন? এই যেমন বিচারে আপনার ফাঁসী না হলেও, নির্জন কারাবাস হতে পারে। হয়তো আপনার সেলের বাইরেই বিশাল ফুলবাগান। রাজ্যের পাখি এসে বসবে, আর আপনি যন্ত্রণায় ছট্ফট্ করবেন। আপনি কী ভেবেছেন ধীরা আর অথৈ ওরা মা মেয়ে আপনাকে কোনওদিন ক্ষমা করবে ?’’

    ‘‘না না, এটা আমি মানতে পারি না অফিসার। প্রতিদিন আমি যখন অফিসে বেরুই ধীরা মেয়েকে কোলে নিয়ে সদরে এসে দাঁড়ায়। হাসতে হাসতে হাত নাড়ে। এক বছরের অথৈ ও ওর মার দেখাদেখি হাত নাড়ে। পথে অফিসে ধীরার হাসি মুখ আমাকে আগলে রাখে। একথা কোনওদিন অবশ্য ধীরার সামনে প্রকাশ করতে পারিনি। রাতে আমার ফিরতে দেরি হলে ধীরা না খেয়ে বসে থাকে। আমি রাগারাগী করলেও শোনে না। আপনি পুলিশের লোক এ সব বুঝবেন না।’’

    ‘‘সত্যিই আপনি হাসালেন অত্রি। সে তো প্রসূন যখন অফিসে বেরুত তখনও ধীরা হাত নেড়ে তাকে বিদায় জানাত। তার অবশ্য এ সবে কোনও হেলদোল ছিল না। আরে এটা একটা তুক। ঘরের ফিকির বলতে পারেন। পথ যদি ঘরের মানুষকে আপন করে নেয় তাই, আর আপনি ভাবলেন— থাক ও সব কথা। অভিযোগ আছে, ধীরার টানেই তো আপনি ব্যাঙ্গালোরের চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে চলে এসেছেন কলকাতায়!’’

    ‘‘আমার মনে হয়, আপনার লোক ভুল রিপোর্ট দিয়েছে। দাদার যখন বিয়ে হয় তখন কলেজ ক্যাম্পাসিঙে পাওয়া চাকরিটা করছিলাম। এক বছর পর ভালো অফার পেয়ে ব্যাঙ্গালোর চলে যাই। দাদার মৃত্যুর পর বাবা–মা’র পীড়াপীড়িতে কলকাতায় চেষ্টা করছিলাম।’’

    ‘‘আপনার সঙ্গে তো নিয়মিত ফোনে যোগাযোগ ছিল ধীরার?’’

    ‘‘হ্যাঁ, ফোন করতাম। বাবা মা দাদার সঙ্গে কথা বলে ধীরাকে চাইতাম।’’

    ‘‘আমাদের কাছে খবর আছে আপনি বউটাকে উসকাতেন। দাদার সন্দেহ বাতিক আছে জেনেও কী দরকার ছিল ধীরার সঙ্গে রোজ রোজ কথা বলার?’’

    ‘‘কে বলেছে রোজ কথা বলতাম? আর উসকানো মানে! কোনওদিন হয়তো ধীরা কে বললাম, আজ আমাদের মেসে ইলিশ মাছ হয়েছে। খেতে খেতে তোর কথা খুব মনে পড়ছিল। তুই ইলিশ মাছ খেতে ভালবাসিস। দাদাকে ছুটি নিতে বল। তোরা ক’দিন ঘুরে যা। ভালো লাগবে।

    ‘‘আমি তো জানি ধীরা খুব কষ্টে আছে। একবার বলেছিলাম, এবার রথের মেলা থেকে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছের চাড়া এনে আমাদের উঠোনের পূর্বদিকের ফাঁকা জায়গাটায় লাগিয়ে দিস। বড় হলে অনেক পাখি এসে বসবে।

    ‘‘আমাদের ছাদে খুব দোয়েল পাখি এসে বসে। ছাদে ধীরার ঘরের খাটে বসে পাখিদের খেলা দেখা যায়। তাই বলেছিলাম মাঝে মাঝে পাখিদের খেলা দেখবি। মন ভালো হয়ে যাবে। ধীরা হাসতে হাসতে বলত, তুই না কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। পাগল একটা। ঠিক আছে।

    ‘‘সত্যিই ধীরা কৃষ্ণচূড়া গাছের চাড়া এনে লাগিয়েছে। বেশ বড় হয়ে গিয়েছে। এখন। আপনি আমাদের বাড়ি গেলে দেখবেন।’’

    ‘‘চুপ করুন! চুপ করবেন আপনি? ভালো লাগছে না এসব কাব্য। আপনি জানেন, প্রসূন ধীরার উচ্ছ্বাস দেখে কটমট করে তাকিয়ে থাকত। যেন ধীরাকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। প্রসূনকে দেখে মনে হত সে যেন কল্পবিজ্ঞানের কোনও আদিম মানব। হাসি কাকে বলে সে জানেই না। ফল হত বউটার ওপর, সে অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিত। সে সব কথা তো ধীরা আপনাকে বলেনি। আপনি দুঃখ পাবেন বলে।’’

    ‘‘ঠিকই বলেছেন অফিসার। আপনি আমার চোখ খুলে দিলেন। এখন মনে হচ্ছে সত্যিই আমি অন্যায় করতাম। প্রসূনের মৃত্যুর জন্য বোধহয় আমিই দায়ী।’’

    ‘‘পথে আসুন তাহলে আপনি অত্রি বসু স্বীকার করলেন, প্রসূন বসুর মৃত্যুর জন্য আপনিই দায়ী। এবার সুর নরম হয়েছে দেখছি। আপনার হয়ে কোর্টে কে প্লিড করবেন, কারও সঙ্গে কথা বলেছেন?’’

    ‘‘হ্যাঁ। আমার বন্ধু দেবদিত্য গাঙ্গুলী খুব বড় উকিল। ওর সঙ্গে কথা বলব। ও আমার হয়ে কোর্টে প্লিড করবে।’’

    ‘‘ধীরার তো বাবা নেই। ওর মা দুই ছেলের কাছে ছ’মাস ছ’মাস করে থাকেন। ধীরার ভাইরা নিজেদের সংসার নিয়ে এত ব্যস্ত যে কেউ ধীরার খোঁজও নেয় না। অথৈ কে নিয়ে ধীরার জীবনটা কী করে কাটবে চিন্তা করেছেন কিছু?’’

    ‘‘বাবা মা ধীরাকে নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করেন। মা ধীরাকে একদিন বললেন, ‘তোকে এই অবস্থায় ফেলে রেখে গিয়ে আমরা মরেও শান্তি পাব না।  তোর বাবার অবস্থা তো দেখছিস, কবে কী হয়ে যায় কিছু বলা যায় না। তোর প্রতি আমরা খুব অন্যায় করেছি। আমাদের ছেলেটাই অ-মানুষ ছিল। ভেবেছিলাম বিয়ের পর ও পাল্টে যাবে।

    ‘তোকে আমরা টোপ হিসাবে ব্যবহার করেছিলাম। আমরা ভেবেছি আবার বিয়ে দেব তোকে। অথৈ থাকবে আমাদের কাছে। তোর মা’র সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। তাঁরও মত আছে। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিচ্ছি। তুই চিন্তা করে কয়েকদিনের মধ্যে আমাদের জানাবি কিন্তু।’’

    ‘‘বাহ, থ্যাঙ্ক গড! আপনার বাবা সুখেনবাবু তো সত্যি খুব অসুস্থ। দু’বার অ্যাটাক হয়ে গিয়েছে। দীর্ঘদিন পক্ষঘাতে পঙ্গু হয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী ছিলেন। এখন ফিজিওথেরাপি নিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটতে পারেন। তাও তো সঙ্গে কাউকে থাকতে হয়। ভোরে আপনার মা সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে বেরোন। আমরা সব খবর নিয়েছি। তারপর? ধীরার বিয়েতে আপনি নিশ্চয়ই বাগড়া দেবেন! সত্যি কথা বলবেন অত্রি। এটা পুলিশ কাস্টোডি। বিয়েটা ভালয় ভালয় মিটে যাক। তারপরই না হয় আপনার কেসটা নিয়ে—অবশ্য আপনার ব্যাপারটা তো আলাদা চ্যাপ্টার স্বীকার করে নিয়েছেন, আপনিই আপনার দাদার মৃত্যুর জন্য দায়ী।’’

    ‘‘ব্যাগড়া দেব কেন। খবরটা শুনে সত্যি আমি খুব খুশি হলাম। ধীরাকে বললাম, তুই রাজি হয়ে যা। ধীরা শুকনো মুখে বলে, আমার খুব ভয় করছে রে অত্রি!

    ‘‘আপনাকে কী বলব অফিসার। এমন করুণ চোখে ধীরা আমার দিকে  তাকিয়ে আছে যেন মেয়েটাকে আমরা বনবাসে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’’

    ‘‘তারপর খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছেন?’’

    ‘‘মা-ই ধীরার বায়োডাটা লিখে আমাকে দিয়ে বলল, অত্রি বিজ্ঞাপনটা কাগজে ছাপতে দিয়ে দে। আমি মা কে বললাম, ধীরা কী চিন্তা ভাবনা করে তার সিদ্ধান্ত কিছু জানিয়েছে তোমাকে?

    ‘‘মা বললেন, না তা জানায়নি। নিজেরাই ওকে প্রস্তাবটা দিলাম কিন্তু মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে আমরাই এখনও কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি। তোর বাবা বলছিল এখন যেমন আছে সে একরকম। কেমন হবে নতুন মানুষ। ওকে কীভাবে নেবে? আমারও খুব ভয় করছে। কোন অনিশ্চয়তার মধ্যে মেয়েটাকে ঠেলে দেব! এমনিতেই মেয়েদের জীবন মানেই অনিশ্চিতের। তাহলে থাক। ক’দিন পরেই না হয় বিজ্ঞাপনটা দিস। কাগজটা তোর কাছে রাখ এখন।’’

    ‘‘অত চিন্তা করে কোনও লাভ আছে? জীবন তো শালা তার নিজের মর্জি মতো চলবে। এই কেমন দেখুন না, আমাদের কনস্টেবল কুঞ্জবিহারীর পোয়াতি বউ ওদের গ্রামের বাড়ি ঈশ্বরীপুর থাকে। কুঞ্জ এখানে থানার কোয়ার্টারে। সেদিন খবরের কাগজে ছবি সহ খবর বেরিয়েছে। বিলেতে রাজবাড়ির বউয়ের বাচ্চা হয়েছে। ফুটফুটে সুন্দর। কুঞ্জ সেই ছবি দেখে খবর পড়ে আহ্লাদে আশি হয়ে লাফাচ্ছে! ক’দিন পরই কুঞ্জদের গ্রাম থেকে অনেক দূরে মফসসল শহরের এক নার্সিংহোমে কুঞ্জর বউয়ের পেট ফালা করে চিরে ডিমের কুসুমের মতো একটা সকাল বার করে আনল ডাক্তার। কিন্তু সেই সকালের শালা প্রাণ নেই। ওদিকে হয়তো রাজবাড়ির ছেলেকে নিয়ে লেখা রূপকথার গল্পের বই সারা ইওরোপে বেস্টসেলার হয়ে গেল আর কুঞ্জর বউয়ের গর্ভচ্যুত মরা সকালকে ঈশ্বরীপাটনির খেয়াঘাটের পাশের শ্মশানে কবর দিয়ে এসে তাকে নিয়ে একটা কবিতা লিখল কল্কে না পাওয়া এক কবি। সেই কবিতা কোনো নামী কাগজের সম্পাদক কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলল!

    ‘‘থাকগে, ওসব কথা থাক। তারপর কী হল বলুন অত্রি?’’

    ‘‘কয়েকদিন পরে একটা রবিববার সকালে সবাই একসঙ্গে বসে টিফিন করছি। মা উত্থাপন করলেন প্রসঙ্গটা— অত্রি, আমরা অনেক চিন্তা করে দেখলাম, তুই আর ধীরা তো খুব ভাল বন্ধু। তোরা বিয়ে করলে খুব সুখী হবি। অমত করিস না। নিজেরা আলোচনা করে দেখ।’’

    ‘‘ইউরেকা! দারুণ প্রস্তাব। তা কী ঠিক করলেন আপনারা?’’

    ‘‘মা’র মুখের ওপর তখন কিছুই বলতে পারিনি। পরে ধীরাকে বললাম, তোকে বিয়ে করা আমার পক্ষে কোনোদিনই সম্ভব নয়।

    ‘‘আমরা দু’জনই বন্ধু, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়। সারা জীবন দু’জন বন্ধুই থাকব। তুই দেখিস, আমি তোর জন্য একদিন একজন সত্যিকারের হৃদয়বান মানুষ খুঁজে এনে দেব।’’

    ধীরার চোখে জল এসে গিয়েছে। ও বলল, ‘‘ঠিকই বলেছিস। আমারও তাই  মত। তোর সঙ্গে অন্যরকম সম্পর্কের কথা ভাবতেই পারি না রে অত্রি!’’

    ‘‘সত্যিই আপনি আশ্চর্য মানুষ। সাতাশ আঠাশ বছর বয়েস হল, এখনও কোনও মেয়ে আপনাকে তেমন করে ভালবাসতে আসেনি কেন, এখন বুঝতে পারছি। যাকগে। আপনি যদি ধীরাকে বিয়ে করতেন তাহলে প্রসূনকে হত্যার দায় আমি আপনার ঘাড় থেকে নামিয়ে নিতাম। আর ধীরার জীবনের এই অবস্থার জন্য তো আপনিই দায়ী। অথচ কাব্য করছেন! ধীরার জন্য আপনি কবে কোথায় খুঁজে পাবেন একজন হৃদয়বান মানুষ। যত্তসব আজগুবি চিন্তা!’’

     

    সুখেন আর কুসুমীকা ভোরে হাঁটতে বেরিয়ে গেলে ধীরা সদর দরজা বন্ধ করে দিয়ে এসে রান্নাঘরের কাজে হাত লাগায়। অত্রি ভাত খেয়ে বেরুবে।  ন’টায় ওর অফিসের গাড়ি আসে। অথৈ ওপরে একা ঘুমায়। মাঝে মাঝে মেয়েকে দেখে আসতে হয়।

    অত্রির ঘর থেকে গোঙানির শব্দ ভেসে আসছে শুনে ধীরা ছুটে এসেছে অত্রির ঘরে।

    অত্রি ঘুমের মধ্যে গোঁ গোঁ করছে।

    ধীরা অত্রির পায়ে ধাক্কা দিয়ে ডাকে— ‘‘এই অত্রি ওঠ! কী হয়েছে? সারাদিন আজেবাজে চিন্তা করবি আর ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখবি! ওঠ চা বসাচ্ছি। ছ’টা বাজে। মা বাবা এখনই এসে পড়বেন।’’

    অত্রি বিছানায় উঠে বসে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ধীরার দিকে। স্বপ্নের ঘোর এখনও ওর চোখে মুখে। আসলে মার কথাটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল যখন ও রাতে ঘুমাতে যায়। কিন্তু ধীরাকে কিছু বলতে পারেনি।

    ধীরা হেসে জিজ্ঞেস করে— ‘‘তোর নতুন বন্ধু দেবাদিত্যর সঙ্গে ঝগড়া করেছিস না কী?’’

    ঢুলু ঢুলু চোখ মেলে অত্রি বলে— ‘‘বাবা ওর সঙ্গে ঝগড়া করব! ও আমার ইমিডিয়েট বস। সদ্যই বাইরে থেকে ঘুরে এসেছে। খুব ভালো ছেলে। ওকে বলেছি আমাদের বাড়ির সব কথা। একদিন আসবে বলেছে। তোদের ওদিকে কৃষ্ণসায়রে থাকে দেবাদিত্য। তুই চিনিস এরকম নামের কাউকে?’’

    ‘‘মনে করতে পারছি না।’’ আলগা হাসি হলেও মুখটা আলোকিত হয়ে উঠেছে ধীরার।

    অত্রি বলে— ‘‘দেবাদিত্য কিন্তু বলল, ধীরাকে আমি বোধহয় চিনি।’’ অত্রির মাথার চুল ঘেঁটে দিয়ে ধীরা বলে— ‘‘আনিস একদিন। আচ্ছা একটু শুয়ে থাক।   হাঁপাচ্ছিস তো। আমি চা নিয়ে আসছি। চা খেয়ে কৃষ্ণচূড়া গাছটার গোড়ায় একটু জল দিস তো। আর একটু বড় হয়ে  গেলে আর জল দিতে হবে না। নিজেই শিকড় নামিয়ে দেবে মাটির অনেক নিচে। তখনই ফুল ফুটবে!’’

    অত্রি অস্ফুটে বিড় বিড় করে বলে, ‘‘তাই যেন হয়।’’

    চিত্রকর: মৃণাল শীল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More