সাঁওতাল পরিবার

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শঙ্খদীপ ভট্টাচার্য

    সাঁওতাল পরিবারের সামনে দাঁড়িয়ে পৌষালি চক্রবর্তী। মুনমুন বলল, এগুলো কী রে? রাক্ষস রাক্ষস দেখতে।

    — যাহ্‌, এটা ফেমাস স্কাল্পচার। স্যান্ঠাল ফ্যামিলি। রামকিঙ্কর বেজ বানিয়েছিল।

    — ফ্যামিলি! কী রকম ফ্যামিলি রে? কে দাঁড়িয়ে কে বসে ,আমার তো কিছুই মাথায় ঢুকছেনা।

    — ঠিক করে দ্যাখ, ওই তো লোকটা কাঁধে বাচ্চাকে ঝুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আর পাশে ওর ওয়াইফ। ওর কোলে আরেকটা বাচ্চা। সবাই সাঁওতাল। ওদের সাথে একটা কুকুর আছে। ওই দ্যাখ।

    — জারমান শেপার্ড?

    পৌষালি হাসল। বলল, তোর সবেতেই মজা না। আর্টের মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝিস না। বাদ দে।

    — আমি তো বুঝি না। আই অ্যাডমিট। তুই এত জানলি কোথা থেকে? ইউটিউব?

    — হোয়াটেভার। তোর চেয়ে অ্যাট লিস্ট বেশি বুঝি। এদিকে আয় একটা সেলফি নিই।

    সেলফি তোলার পর কলাভবনের গেটের বাইরে এসে দাঁড়াল পৌষালি মুনমুন।রাস্তায় লোকজন প্রায় নেই বললেই চলে। মিউজিয়ামের দিকটায় এখনও ভিড়। সেখানে কুড়ি টাকার দই দরদাম করে দশ টাকায় একটু আগেই খেয়েছে তারা। প্ল্যানমাফিক প্রথমে মিউজিয়ামটাই কভার করেছে। নোবেল পদকের রেপ্লিকাকে আসল ভেবে উল্লসিত হলেও  মুনমুনের কলাভবন খুব একটা ভালো লাগেনি।কারণ গান্ধীর ভাস্কর্য । টিভি আর ইন্টারনেটে দেখা গান্ধী অনেক বেশি ম্যাজেস্টিক। এখানে পা–গুলো মোটা আর বেশিই লম্বা। পৌষালি সেলফি ক্যামেরায় নিজের মুখ দেখছে। মুনমুন রাস্তার দিকে হাত দেখিয়ে বলল, ওটা কী রে? সাইকেলের উপর। এ তো স্কাল্পচার নয়। রিয়েল রাক্ষস মনে হচ্ছে।

    পৌষালি দেখল সত্যিই একজন রাক্ষসের মতো সেজে সাইকেল চালিয়ে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। ফোন হাতেই ছিল। ছবি তুলল পৌষালি। রাক্ষস টাটা করল। পৌষালির মুখে হাসি। চিনতে পেরেছে। বলল, বহুরূপী। আগের বছর যখন এসেছিলাম সন্দীপনের সঙ্গে, ওর সাথে ছবি তুলেছি। অনেকদিন হোয়াটসঅ্যাপের ডিপি ছিল। শনিবারের হাটে বসে। আমরাই ওর কাস্টমার। সবাই ছবি তোলে, পয়সা দেয়।

    মুনমুন বলল, ভাগ্যিস আমায় জোর করে নিয়ে এলি। নইলে জানতেই পারতাম না শান্তিনিকেতন ইজ ফুল অফ মনস্টারস।

    দুজনেই হেসে উঠল।

    সাইকেলে হাট থেকে বনেরপুকুরডাঙায় পৌঁছতে মিনিট দশেক লাগে ছিটে কিস্কুর। ঘরে যখন পৌঁছল তখন পাশের নোংরা কাদায় মুখ ঘষছিল শুয়োরটা। ওর গোটা সাতেক বাচ্চা এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। উঠোনের চৌকিতে তিড়িং বিড়িং লাফাচ্ছে একটা ছাগল ছানা। ছিটে ঘরে ঢুকে রাক্ষসের মুখ আর হাতদুটো খুলে রাখল। কলসি থেকে জল খেল। মেয়ের কপালে হাত দিয়ে বুঝল জ্বর খানিকটা কম। নাকের সর্দি শুকিয়ে এসেছে। পোষা কুকুরটা উঠনে বসে। হাঁপাচ্ছে। ছিটে যেখানে যায় পেছন পেছন সেও দৌড়ায়। নাম পাহারা।

    ছিটের মেয়ে বলল, আমিও হাটে যাব।

    — তোর শরীর খারাপ না! তুই কেন যাবি?

    মেয়ে রাগ করে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

    কদিন আগেই বৃষ্টিতে ঘরের চালা একদিকে ধসে পড়েছে। সূর্যের আলো তাই এখন সোজা ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে। সেই আলোয় ঢেকে রাখা জলভাত খানিক গরম হয়ে উঠেছে। পেঁয়াজ আর লঙ্কা দিয়ে মেখে ভাতটুকু গোগ্রাসে সাবাড় করল ছিটে। মুখ ধুলো সাবধানে যাতে হাত আর গলার কালিতে বেশি জল না লাগে। কুলকুচি করতে করতে করতে দেখল কাঁঠাল গাছটার গোড়ার কাছে কোলের ছানার মতো একটা লোমশ এঁচোড় ঝুলছে। ছিটে ঠিক করল কাল হাট শেষ হলেই পালমণিকে তরকারি করে খাওয়াবে।                     

    পৌষালি আর মুনমুন গেস্ট হাউসে ফিরে এসেছে। আজ ওয়েদার হিউমিড। ঘাম বেশি হওয়ায় পোশাক বদলানোর তাগিদটা পৌষালিই বেশি দেখিয়েছে। লাঞ্চ বলাই ছিল। মুরগির ঝোল। স্নান সেরে লাঞ্চ সেরে শনিবারের হাটে যাওয়ার জন্য বিশেষ সাঁওতালি গয়না এবং হাতে বোনা শাড়িতে দুজনেই প্রস্তুত। কমপ্যাক্ট পাউডার লাগাচ্ছে মুনমুন। পৌষালি আয়নায় নিজেকে দেখে নিল। পোশাকে যেন রবিঠাকুর ঝলসে উঠছে।

    পৌষালি ছোটবেলাতেই ড্রাইভিং শিখেছে। সন্দীপন ছুটি পায়নি। পুরনো গাড়িটা তার জিম্মায় রেখে নতুন গ্র্যান্ড আইটেন–টা ম্যানেজ করেছে দুদিনের জন্য। মুনমুনের বর মাসখানেকের জন্য মুম্বাই। পৌষালির  প্লিজ প্লিজ রিকোয়েস্টে প্রথমবার শান্তিনিকেতনে এল মুনমুন।

    শনিবারের হাটে যখন তারা পৌঁছল তখন দুপুর তিনটে। গাড়িটা পার্ক করতে অনেকটাই কসরত করতে হয়েছে। প্রচণ্ড ভিড়।

    পার্কিঙে আধঘণ্টা সময় নষ্ট হওয়ায় আর এক মুহূর্ত দেরি না করে কেনাকাটি জোর কদমে শুরু করল দু’জন। মুনমুন তিনটে গামছা প্রিন্টের সালোয়ার কিনেছে। গামছা তার খুব প্রিয়। ইদানিং শাড়ি ব্লাউজ সবই প্রায় গামছা প্রিন্টেরই। গামছা পোশাকের একটা দেখার মতো কালেকশন করতে চায় এই বছর। স্নানের পর অবশ্য টাওয়েলই মুনমুনের পছন্দ। পৌষালির ঝোঁক আদিবাসী গয়নার দিকে। হাজার তিনেক টাকার গয়না কিনে ফেলেছে। কোন গয়না কোন আদিবাসী সম্প্রদায়ের সেটা না জেনেই কিনছে।

    ছিটে কিস্কুকে দেখতে পেয়েছে মুনমুন। দ্যাখ দ্যাখ ওই বহুরূপী রাক্ষসটা। পৌষালি ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখল। বলল, যাওয়ার আগে মনে করিস মুন। তোর কাঁধে চড়িয়ে একটা ঘ্যামা ছবি নেব। তারপর দেখিস লাইকের ল্যান্ডস্লাইড।

    ছিটের বসার জায়গাটা শক্তপোক্ত। মাঝারি সাইজের একটা চৌকো পাথর। এই ধরনের অনেক পাথর কলাভবনের স্কাল্পচার ডিপার্টমেন্টের বাইরে রাখা থাকে। আগামী কোনও মূর্তির হাড় মাংস হিসেবে। ছিটে কিস্কু নড়ছে না। মুখোশ পরে হাতদুটো হাঁটুর উপর রেখে একদম মূর্তির মতোই স্থির। মুখোশটা দেখলে ঠাকুরমার ঝুলির হাউ মাউ খাউ মানুষের গন্ধ পাউ বলা রাক্ষসের কথাই চোখে ভাসে। মুখোশে নীল, ছাই কালো, লাল রঙ ছড়িয়ে ছিটিয়ে। নাকের কাছটায় লালচে কালো। যেন কেউ মাংস খুবলে নিয়েছে। নোংরা এবড়োখেবড়ো দাঁতগুলো বার করে মুখে আধখানা হাঁ। ঝাঁকড়া মাথার চুল দুর্গাপুজোর ভয়ংকরতম অসুরকেও হার মানায়। ছ ইঞ্চির হাতের নখগুলো মাটির দিকে মুখ করে ঝিমিয়ে আছে। বড় ক্লান্ত দেখাচ্ছে এই রাক্ষসকে।

    কাছাকাছি একটা বাচ্চা ছেলে আসতেই ছিটের রাক্ষুসে মেজাজটা চাঙ্গা হয়ে উঠল। দাঁড়িয়ে হাত পা নাড়াতেই বেজে উঠল দু পায়ের ঘুঙুর। বাচ্চাটা মোটেই ভয় পায়নি। তার বাবা জিজ্ঞেস করল , এরকম ভূতের মতো সেজেছ কেন ভাই?

    ছিটে ওর সামনে রাখা একটা বোর্ডের দিকে আঙুল দেখাল। বোর্ডে বাংলা ভাষায় বড় বড় অক্ষরে লেখা,

    “সোনাঝুড়ি খোয়াই হাটের বহুরূপীর মেয়ের দুটি কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। বহুরূপী টাকার অভাবে ওনার মেয়ের চিকিৎসা করাতে পারছেন না। তাই আপনারা বহুরূপীর মেয়েকে সুস্থ করার জন্য দয়া করে কিছু মূল্য দিয়ে সাহায্য করুন। যদি আপনাদের একথা সত্য মনে না হয় তাহলে আপনারা বহুরূপীর বাড়ি গিয়ে ওনার মেয়েকে দেখে আসতে পারেন।

    রোগীর নাম – পালমণি কিস্কু।

    শিল্পীর নাম – ছিটে কিস্কু, ঠিকানা – বনেরপুকুরডাঙা। ফোন –  9944265683”   

      বোর্ডটার সামনেই ল্যামিনেট করা কাগজ পাথর চাপা দেওয়া। ওতে একই কথা ইংরেজিতে। কোনও এক সহৃদয় বাবু লিখে দিয়েছেন। পাশেই পাথরে চাপা মেয়ের মেডিক্যাল রিপোর্ট।  ছিটের গা ঘেঁষে বাবু হয়ে বসে পালমণি। কুঁজো হয়ে বাচ্চাটিকে দেখছে। বাচ্চাটির হাতে আইস্ক্রিম।ঠোঁটের কোণা থেকে ক্রিম গড়াচ্ছে। ছেলেটির বাবা পালমণিকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, তোমার মেয়ে?

    ছিটে মাথা নাড়ল।

    ওর তো শরীর খারাপ । এখানে এনেছ কেন এই গরমে?

    আনতে চাইনি। না আনলে কাদা মাটি খেয়ে নেয়। খুব জেদ গো।

    ছিটের সামনে বস্তা। চারদিকে চারটে ঢেলা। তাতে দশ কুড়ি পঞ্চাশের কিছু নোট। ভদ্রলোক সেখানে একটা কুড়ি টাকার নোট রেখে বলল, কাজ টাজ করতে পারো তো। ভূত সেজে আর কত ইনকাম হবে।

    ছিটে আরও একটা বোর্ডের দিকে আঙুল দেখাল। একদম শেষের এই বোর্ডটা চেহারায় একটু ছোট। তাতে কমা দাড়ি বাদ দিয়ে বাংলায় একই হরফে লেখা,

    ” শিল্পী ছিটে কিস্কু আজও এই বহুরূপীর ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে চার প্রজন্ম ধরে এই শিল্পের সঙ্গে আশা করি আপনারাও এই বহুরূপীর ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করবেন”

    পৌষালি মুনমুনকে ছেড়ে ইউক্যালিপটাসের বনের দিকটায় চলে এসেছে। এখানে নাচ হচ্ছে সেই সকাল থেকেই। ছজন আদিবাসী মহিলা গোল করে নাচছে। লাল রঙের ব্লাউজ। হলুদ রঙের শাড়ি। গলায় দড়ির মালা। খোঁপায় রঙ বেরঙের ফুল। যেন খোঁপা ফুঁড়ে ফুল ফুটেছে। মাথায় কাঁসার দুটো ছোট ঘটি। তার উপরে আরও ফুল। মহিলাদের পেছনেই ধামসা মাদল নিয়ে চারজন পুরুষ। এদেরই মধ্যে একটি ফর্সা মেয়ে মহিলাদের মধ্যেই কোমর দুলিয়ে নাচছে। পৌষালি মেয়েটার পঞ্চুকোটটা দেখছিল। কদিন আগেই ঠিক এইরকম একটা পোশাক অনলাইন অর্ডার করেছে। এখনও ডেলিভারি হয়নি।

    গানের কথাগুলো সব বুঝতে পারছে না পৌষালি । ‘মারাংবুরুর পাহাড়ে’ বলছে আর মাঝে মাঝেই সবাই কুকুরকুউউউ কুকুরকুউউউ কুহু কুহু বলে উঠছিল।

    কাছেই একটা বাঁশের মাচা। আশেপাশে শসা পেয়ারা কাঁচা আম বিক্রি হচ্ছে। পরন্তপ ওখানেই বসে। কলাভবনের উঠতি ভাস্কর। মূর্তি গড়ে। প্লাস্টার অফ প্যারিসে ছাঁচ তোলে। সিনিয়াররা ওকে পান্তুয়া বলে ডাকে। ছোটবেলায় পৈতের দড়ি দিয়ে সে নাকি ধনুকের ছিলা বানিয়েছিল। তির মেরে  ফুটো করেছিল রান্নাঘরে রাখা সবকটা বেগুন। এটা শোনার পর থেকেই পরন্তপ হয়ে যায় পান্তুয়া। শামিমের সঙ্গে প্রায়দিন এখানে আসে। শামিম আসতে পারেনি। আজ সে একাই।

    পান্তুয়ার কোলে রাখা স্কেচের ঝোলা। স্কেচবুকে অনেকক্ষণ ধরেই পৌষালিকে দেখছে। তার দাঁড়ানোর স্টাইল, মুখের ভাব, গায়ের রঙ, নদিয়ার লিনেন শাড়ি আর আদিবাসী গয়না খুঁটিয়ে ধরার চেষ্টা করছে। চটপট কয়েকটা স্কেচ করে ফেলল পান্তুয়া। নাম রাখল ‘বহুরূপী’।

    নাচের দলের এক মহিলা একটু আগেই ভাত মেখে এসেছে ছেলে মেয়ের। এক গরাস ছেলের মুখে দিয়েই মা আবার সামিল নাচের দলে। ইউক্যালিপটাসের নিচে ছেলেটাকে এখন খাইয়ে দিচ্ছে ওর দিদি।

    পৌষালিকে ফোন করে মুনমুন এখন তার পাশেই। বলল, চল না একটু নেচে নি। কভার ফোটো অনেকদিন চেঞ্জ করা হয়নি। ওয়াইড অ্যাঙ্গেলে তুলবি কিন্তু। সেলফিতে অতজন সাঁওতাল আসবে না। আমার একটা সিঙ্গেল নিবি তারপর তোর একটা। ওকে?

    আগের নাচ শেষ হতেই তারা এগিয়ে গেল। পৌষালি সুর করে বলল, তোমরা ওই গানটা জান গো পিঁদারে পলাশের বন পালাব পালাব মন। ন্যাংটা ইঁদুরে ঢোল কাটে, ও কাটে রে গতরে পিরিতের ফুল ফুটে। জানো? সবাই মাথা নাড়ল।

    নাচ আর তারপর ফোটো নেওয়া শেষ হতেই পৌষালি বলল, বহুরূপীটার সাথে কয়েকটা ছবি নিয়েনি চল, কেনকী এরপর আর কিছু দেখা যাবে না। ওই দ্যাখ মেঘ করছে।

    মুনমুন চেঁচিয়ে উঠল। ওই রাক্ষসটার সাথে? চল চল। এত জোরে  কথাটা সে বলল মিটার দশেক দূর থেকেও পান্তুয়া শুনতে পেল।

    পান্তুয়া দেখল ছিটে কিস্কুর সঙ্গে ছবি তুলছে তিনজন কলেজ পড়ুয়া। ছিটে তাদের আক্রমণ করছে।  তারা সবাই ভি ফোর ভিক্ট্রি পোজে ছিটের আক্রমণ সামলাচ্ছে। ছবি উঠছে। পৌষালি মুনমুন লাইনে।

    স্মার্টফোনে সবে তোলা ছবিগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে সবাই চলে যেতেই পৌষালি বলে উঠল, আপনার সাথে আগের বছর আমি ছবি তুলেছি। এইখানেই। আমার বর তুলেছিল। ছিটে মাথা নাড়ল। মুনমুন পালমণির পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। জিজ্ঞেস করল, তোমার মেয়ে?

    ছিটে মাথা নাড়ল।

    ওকে একটা আইস্ক্রিম কিনে দি?

    ওর জ্বর আছে।

    মুনমুন পালমণিকে জিজ্ঞেস করল, আইস্ক্রিম খাবে না তো কী খাবে। দুপুরে খেয়েছ? কী খেয়েছ?

    পালমণি বলল, ভাত।

    ভাতের সাথে কী খাও?

    মাঝে মাঝে ডাল হয়।

    মুনমুন দেখল ছিটের পাশে একটা অ্যালবাম।

    একটু দেখতে পারি।

    ছিটে মাথা নাড়ল।

    অ্যালবামে সবই ছিটের ছবি। সারা শরীরে সাদা রঙ মেখে কঙ্কাল সেজে রাস্তার লোককে ভয় দেখাচ্ছে। ছিটে বলল, এই সাজটার নাম তারাসুন্দরী। আর ওইটা কমলমণি। ছবিটা দেখে পৌষালি মুনমুনকে কানে কানে বলল, অনেকটা ওই মহাভারতের পূতনা রাক্ষসীর মতো না?

    দুজনেই লুকিয়ে হাসল।

    আর এই বহুরূপীটার নাম কী?

    কনকচাঁপা।

    এইরকমই আরও সতেরো রকমের সুন্দরীর ছবি দেখে মুচকি হেসে একটা কড়কড়ে একশ টাকার নোট পৌষালি বস্তার উপর রাখল। বোর্ডের লেখা পড়েছে সে। ছবিও নিয়েছে লেখাগুলোর। যাওয়ার আগে জেনে নিল এখনকার সাজটার নাম রাধারাণী। পালমণিকে দেখিয়ে পৌষালি ছিটেকে বলল, ওকে ভালো ডাক্তার দেখান। আমি ফেসবুকে ছবি দেব আপনার আর আপনার মেয়ের। সবাই যাতে জানতে পারে। ঠিকাছে? আসি।

    পান্তুয়া দেখল ছিটে কিস্কু রাক্ষস চোখে পৌষালির চলে যাওয়া দেখছে। পালমণি বাবার কোলে হাত রেখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে। ইউক্যালিপটাসের নিচে এতক্ষণে ভাই বোন ভাত খেয়ে সেখানেই শুয়ে পড়েছে। তাদের মা এখনও নাচে মগ্ন। শেষ বিকেলে ভিড় অনেকটাই বেশি। পান্তুয়ার চোখে পশ্চিমের মেঘ ক্রমশ কালো হয়ে উঠছে। হঠাৎ ঠাণ্ডা হাওয়ায় বুনো ফুলের গন্ধ। নিজের খেয়ালেই সে হেসে উঠল। আচমকা পেয়ে বসা কল্পনায় পৌষালিকে বসিয়ে দিল রাক্ষসের পাশে। আরও একটু ঘেঁষে বসাল তাকে রাক্ষসের দিকে। পৌষালিও হাত রাখল রাক্ষসের হাতে। পালমণি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল পৌষালিকে। হাসল।

    পৌষালি বলল, বিড়ি দে। রাক্ষসের কোমরে গামছা বাঁধা। সেখানেই গোঁজা দুটো বিড়ি। বিড়িতে টান দিয়ে পৌষালি বলল, অ্যাপি ফিজ খাবি? রাক্ষস মাথা নাড়ল। অ্যাপি ফিজ খেল ঢকঢক করে। পালমণিকে এগিয়ে দিল। সেও খেল। পৌষালি ব্যাগ থেকে ফেসপ্যাক বার করল। আস্তে আস্তে মাখিয়ে দিল রাক্ষসের মুখে। রাক্ষসও আদিবাসী পদ্ধতিতে প্রস্তুত বিশেষ কালিটা পৌষালির গালে কপালে ঘষতে লাগল পরম আদরে। সাদা কালোয় মিশে তাদের মুখের রঙ এখন অনেকটাই একইরকম। একমাত্র পোশাক দেখলেই বোঝা যায় কে কোথায় থাকে। দুজন বাঁ হাত পরস্পরের দিকে ধাক্কা মেরে তালি মেরে উঠতেই পোশাকও ওলটপালট হয়ে গেল। তাদের এই নতুন চেহারায় পান্তুয়া খুব খুশি। পৌষালি চুমু খেল পালমণির কপালে। ছিটে  সাইকেলের সামনের বাস্কেটে তাকে বসাল। পৌষালিকে বসাল পেছনের সিটে। প্যাডেলে চাপ দিতেই ঝোপের পিছন থেকে বেরিয়ে এল পাহারা। সাইকেলের পেছনে দৌড়তে থাকল সমানে পাল্লা দিয়ে। পৌষালির খোঁপায় এখন কৃষ্ণচূড়া। গঙ্গার গেরিমাটি রঙের আঁচল প্রায় খসে পড়েছে। সে মাথা রাখল ছিটের ঘাম ভেজা পিঠে। দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল তার মজবুত বুক। একটা মদ গন্ধ পৌষালির রক্তে ছড়াচ্ছে। চোখ বন্ধ করে নেশার ঘোরে সে বলে উঠল, আহ্ কী পুণ্যি গ! গতরে কী বুলচে। পাখি ডেকে উঠল । দোয়েল। শিস দিল টুনটুনি। সুর দিল বুলবুলি। শালবনের গোধূলি হাওয়া পালমণির তেলা চুলের পাশ কেটে গিয়ে মিশছে ছিটে আর পৌষালির শরীরে ।

     

    অন্ধকার গাঢ় হচ্ছে। এই অমাবস্যার আকাশে পান্তুয়া খুঁজে বার করল একটা ডাগর চাঁদ। চাঁদটাকে বসিয়ে দিল আকাশের দক্ষিণ দিকে ।পালমণির ঠোঁটের উপরের তিলের সাইজের কিছু তারাও ফুটিয়ে তুলল এদিক ওদিক। টাটকা জ্যোৎস্নায় শাল ইউক্যালিপটাসের মধ্যে সরসর করে এগিয়ে চলেছে নতুন পরিবার। চাকার ধাক্কায় ছিটকে যাচ্ছে নকুলদানার মতো কাঁকড়গুলো। দূরে কোপাইয়ের বুকে গা ডুবিয়ে বসে আছে গাজনের সন্ন্যাসীরা। পান্তুয়ার চোখে ভারী চমৎকার দেখাচ্ছে এই সবকিছুই। তার কল্পনার আগামী অংশে পালমণির দুটো কিডনিই সেরে উঠবে কিন্তু আপাতত শনিবারের হাটে এখন বড্ড ভিড়। মুনমুন আর পৌষালি কোথায় কী কেনাকাটি করছে কে জানে! ছিটে তার ছুঁচোলো নখওয়ালা রাক্ষুসে হাতদুটো ভিড়ের দিকেই তাক করে পাথরের উপর বসে। স্থির। পালমণি বস্তার উপর শুয়ে। খিদে পেয়েছে। ঝোপের আড়ালে পাহারা। ছিটে একইসঙ্গে ভাবছে কাস্টমার আর কিডনির কথা আর অন্যদিকে পান্তুয়া রাক্ষসের দিকে চোখ রেখে হাসিমুখে সবকিছু ওলটপালট করে চলেছে। এই ভিড়ে কেউ কিছু বুঝতেই পারছে না।

    চিত্রকর: মৃণাল শীল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More