সহজপাচ্য      

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

                         ঋভু চট্টোপাধ্যায়

বাইরের দরজায় দুপুর। শর্মিলা দিদিমণি সেই মাত্র কিচেনশেড থেকে এসে অফিসে বসল। তিনজনের স্কুলে একজন না এলে বাকি দুজনের ওপর চাপ পড়ে যায়। শর্মিলাদিই হেডদি, বাকি আছে করবী আর গিয়াস। অন্য দিন গিয়াস এই খাওয়ানোর ব্যাপারটা সামলায়, করবী প্রতিদিনের হিসেবটা এই ফাঁকে করে নেয়, বিডিও অফিসের কড়া নির্দেশ, দুপুর দু’টোর মধ্যে যেন মিড’ডে মিলের এস.এম.এস পৌঁছে যায়, না হলে কিন্তু অফিস কোনও দায় নেবে না। শুধু কি হিসাব, তার মধ্যে আবার একটা টেস্ট রেজিস্টার করতে হবে, সেখানে প্রতিদিন একজন টিচার আর একজন রাঁধুনির সই থাকবে, তারা বলবে খাবারটা কতটা ভালো আর কতটা খারাপ অথবা মাঝারি। মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় এটা কী স্কুল না রেশনের দোকান!

সেদিন হাতটা ধুয়ে সবে মাত্র ব্যাগ থেকে টিফিনের কৌটোটা বের করতে যাবে এমন সময় ফোনটা বেজে উঠল। এমনিতে এখন ক্লাসে গেলে ফোনটা অফিসেই রেখে যেতে হয়, বাড়ির থেকে এই সময় কেউ ফোন করে না। তাও  অসময়ে ফোন এলেই ভয় লাগে। হেডদি হাতে তুলতেই দেখে স্ক্রিনে ভেসে উঠল, ‘অফিস কলিং।’

দিদিমনি এখনও স্মার্ট ফোন ব্যবহার করে না, গিয়াসের দেওয়া নম্বরটাতেই অফিসের হোয়াটস্অ্যাপে সপ্তাহে মিনিমাম একবার মিটিঙের নোটিস আসে, সেই বিরক্তি নিয়ে ফোনটা রিসিভ করতেই ওপার থেকে দেবেনদার খ্যাড়খ্যাড়ে আওয়াজ শোনা গেল, ‘ দিদিমনি, ছুটির পর অফিসে আসবেন, শো’কজ লেটার আছে।’

– শো’কজ! একটু অবাক হল শর্মিলাদি, তাও উত্তর দিল, ‘কেন ? কে করেছে?’

– ডি.আই।

– ডি.আই! কেন ?

– অতো জানি না, এসে চিঠি নিয়ে যাবেন, সাতদিনের মধ্যেই জবাব দিতে হবে।

ফোনটা রেখে আর টিফিন কৌটোটা খুলতে ইচ্ছে করল না।

একটা লম্বা শ্বাস ফেলে  দুটো হাতের মধ্যে মাথাটা রাখতেই করবী বলে উঠল, ‘দিদি, শরীর খারাপ লাগছে?   কে ফোন করেছিল ?’

– দেবেন দা, শো’কজ লেটার আছে।

– শো’কজ! কার নামে? আপনার, কেন ?

– কি করে জানব ? এ তো মহা মুশকিল, যাকে পাচ্ছে তাকেই শো’কজ করে দিচ্ছে!

বাইরে তখন হাল্কা মেঘ জমতে আরম্ভ করেছে। সেদিনও করেছিল, টিফিন খেয়ে অফিসের বাইরে দাঁড়িয়ে এই মেঘের দিকে চোখদুটো রাখতেই ছোটবেলায় এই মেঘ–বৃষ্টির দিনে জানলা দিয়ে বাইরে হাত রেখে হাত ভেজানোর কথা মনে পড়ে গেল। সেদিনও হারিয়ে যাওয়া মন একটা গাড়ির আওয়াজে আবার ফিরে এসেছিল, ‘এখন আবার কে এল? এই তো সেশন আরম্ভ হল এই মধ্যেই ভিসিট!’

শর্মিলাদি গাড়িটার দিকেই চোখ রেখে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই গাড়ি থেকে দুজন সিস্টারকে নেমে স্কুলের দিকে আসতে দেখল। দিদি দুজনের মুখ চেনে, কাছে  আসতেই হেডদি তাদের স্কুলের ভিতরে ডেকে নিয়ে বসাল। একজন নিজেকে সামনের আশ্রমের সিস্টার নামে পরিচয় দিয়ে কথা আরম্ভ করে। বেশ অনেকক্ষণ কথা হয়, শর্মিলাদির সাথে গিয়াস ও করবীও আলোচনায় যোগ দেয়। তারপরের দিনেই সিস্টার এসে দু’জন ছেলেকে ভর্তি করে দিয়ে যায়। শর্মিলাদি একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচে, এমনিতেই স্কুলের  ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা দিন দিন কমছে, বাষট্টি’র থেকে দুটো কি তিনটে কমে গেলে যে কোনও দিন একজন টিচার আর একজন রাঁধুনিকে তুলে নেবে। দু–তিন জন অন্য ছাত্রছাত্রী ভর্তি হলে অসুবিধার থেকে সুবিধাই বেশি। ছেলে দুটোও বেশ ভালো, সিস্টার অন্য একটা স্কুলের থেকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেটও নিয়ে এসেছে, শর্মিলাদি সব দেখে এক্কেবারে সোজা ক্লাস টুতে ভর্তি করে দিয়ে বলেছে, ‘বই পেতে একটু দেরি হবে, এখন নামে নামে বই আসে, অফিসে না গেলে বইয়ের ব্যবস্থা করতে পারব না।’

সিস্টাররাও কোনও আপত্তি করেনি। ছেলেদুটো দুদিন ক্লাসও করে, তিনদিনের দিন সকালে স্কুলের গেটের কাছে আসতেই একটা ভিড় দেখে হেডদিকে থমকে দাঁড়াতে হয়। এমনিতে গিয়াসই প্রথম স্কুলে আসে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি দেখে চাল দেয়, দোকান করতে পাঠায়। সেদিনের ভিড়টা দেখে মনে একটু খটকা লাগে, গিয়াস আবার কোনও ছেলেকে মারল নাকি ? এমনিতে স্কুলের কেউই কারওর গায়ে হাত তোলা দূর, বকেও না। তাও মানুষের মন তো বলা যায় না। হেডদি স্কুলের গেটের কাছে যেতেই একজন অভিভাবক মেজাজ করেই বলে ওঠে, ‘দিদিমনি এটা কি ভালো করলেন?’ শর্মিলাদি একটু অবাক হয়ে ওখানে দাঁড়িয়েই জিজ্ঞেস করে, ‘কেন কী হল, আমি তো জ্ঞানত কোনও অন্যায় করিনি।’

– করেননি ? তাহলে ওদের ভর্তি করলেন কেন ?

এবার ঘটনাটা পরিষ্কার হল, তবুও খুব স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিল, ‘ওদের ভর্তি নিয়ে আমি তো কোনও অন্যায় করিনি।’

– অত ন্যায় অন্যায় বুঝিনা, ঐ আশ্রমের রুগিগুলোকে আমাদের এখানে ভর্তি করলে আমরা ছেলেমেয়েদের এই স্কুলে পাঠাব না।

– তোমরা কেউ কিছু বোঝো না, ওরা তো একটা আশ্র্রমে থাকে। এখানে ভর্তি হলে একটু ক্লাস করবে, তাছাড়া এখন রাইট টু এডুকেশন অ্যাক্টে আমি কাউকে স্কুলে ভর্তিতে বাধা দিতে পারি না।

– আমাদের ছেলে মেয়েদের সাথে এক জায়গায় বসে ওই এইডস রুগিগুলো ক্লাস করবে, মিডডে মিল খাবে, খেলবে?

দিদিমণির সাথে গিয়াস ও করবী সবাইকে বোঝাতে আরম্ভ করে। কথাও চলে, চিত্কার আরম্ভ হয়, কিন্তু কয়েকজন অভিভাবক স্কুলে এসে বাকি সবাইকে জোর করে স্কুল থেকে ফিরিয়ে নিয়ে চলে যাবার সময় বলে গেল, ‘যতদিন আপনি এভাবে ঐ রুগিদের পড়াবেন ততদিন আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের এখানে পাঠাবো না।’

মুহূর্তের মধ্যে পুরো স্কুল ফাঁকা হয়ে যায়। রাঁধুনিদের ততক্ষণে সবজি কাটা হয়ে গেছে, শুধু ছাত্রছাত্রী গুনে চাল দিতে বাকি। এভাবে স্কুলটা ফাঁকা হয়ে যেতেই একজন রাঁধুনি এসে জিজ্ঞেস করে, ‘দিদিমণি, তাহলে কি আর রান্না চাপাবো না?’

শর্মিলাদির মাথাটা হঠাৎ করে জ্বলে ওঠে, ‘এখনি সবাইকে রান্নার কথা জিজ্ঞেস করতে হবে?’ আরও কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যায়, সত্যি তো, স্কুলে রান্না না হলে ওরাও বাড়তি ভাত তরকারিগুলো পাবে না, বসে বসে সময় নষ্ট করলে ঘরেও রান্না করবার সময় থাকবে না, তখন এরাও বা খাবে কী ?

আর ভাবা যাচ্ছে না, দিন দিন শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

– দিদি, কি করবেন কিছু ভাবলেন?

শর্মিলাদি গিয়াসের মুখের দিকে তাকিয়ে একটু জোরেই বলে উঠল, ‘রোডে গিয়ে নাচব?’

নাচতেই হল। ঠিক তিনটের সময় বিডিও অফিসে মিডডে মিলের নো রিপোর্ট দিতেই অফিস থেকে ফোন এল, ‘কী হল ম্যাডাম আজ মিল বন্ধ কেন?’ দিদিমণির উত্তর শুনে  ক্লার্ক বলে উঠল, ‘আমাদের জানাননি কেন?’

– জানানোর মতো অবস্থায় ছিলাম না।

– ঠিক আছে, ছুটির পর অফিসে এসে দেখা করুন।

একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ে  হেডদিদিমণি। সকাল সাড়ে নটার সময় একটু খেয়ে বেরিয়েছে, এখনও টিফিনটা পর্যন্ত খেতে পারেনি। স্কুলের সব ছাত্রছাত্রী ফিরে চলে যাবার পর এক্কেবারে পাগল পাগল লাগছিল। অফিসে ঢুকতে যাবে সেই সময় আশ্রম থেকে গাড়ি আসে, সঙ্গে ওদের চারটে ছেলে। দিদিমণি অবশ্য কাউকেই নামতে না দিয়ে, গাড়ির মধ্যে থেকেই সবাইকে ফেরত চলে যেতে বলে, ওরাও কোনও কথা না বলে সেদিনের মতো ফিরে যায়। দিদিমণি সঙ্গে সঙ্গে স্কুলের ভি.ই.সি কমিটির সভাপতিকে ফোন করে।

সভাপতি ফোন ধরে জানিয়ে দেন, ‘দিদিমণি যেতে পারব নাই, পার্টির মিটিং রইছে, আর ইটো তো গাঁয়ের ব্যাপার বটে কিছু হবেক নাই।’

‘কিছু হবেক নাই।’ মানে? মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে  হেডদি সমস্ত সংগঠনের নেতাদের ফোন করতে আরম্ভ করে। একজন বলে ওঠে, ‘একবার এস.আই স্যারকে ফোন কর।’

– এস. আই.কে! আবার তো জ্ঞান দেবে, বলবে আমার দোষ, স্কুল ঠিক করে চালাতে পারছি না। ভিজিটে এসে খুব বাজে ব্যবহার করেছিল।

– তা হলেও আমাদের ইমিডিয়েট বস তো এস.আই.।

শর্মিলা দিদিমণি সঙ্গে সঙ্গেই এস.আই স্যারকে ফোন করলেও স্যারকে ব্যস্ত পেল। একবার হেড টিচার মিটিঙে স্যার বলেছিলেন, ‘আমাকে একবার ফোনে না পেলে বার বার ফোন করে বিরক্ত করবেন না, বুঝবেন আমি নিশ্চয়ই কোনও কাজে আছি, আমার সময় করে আমি ঠিক ফোন করে নেব।’ কথাগুলো অফিসে বলতেই গিয়াস বলে উঠল, ‘এসব কথা বলতেই, স্যার কোন দিনও ঘুরিয়ে ফোন করেন না, বরং একবারের বেশি ফোন হলেই রেগে যান।’

– সে না হয় হল, কিন্তু এখন কি করা যাবে ?

– কিছু করতে হবে না, মিডডে অফ্ দেখিয়ে দিয়েছেন, এবার বাড়ি চলুন।

– সেই ভালো, আশা করি আগামিকালের মধ্যে সব কিছু মিটে যাবে, বিশেষ করে আমরা যখন ঐ আশ্রমের কাউকে স্কুলে ভর্তি করছি না।

পরের দিন একই ভাবে স্কুলে কোনও ছাত্রছাত্রী নেই, শর্মিলা দিদিমণি স্কুলে এসেই গিয়াসকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের প্রায় প্রতি ঘরে গিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলে, সবাইকে জানায় ‘ঐ আশ্রমের কাউকে স্কুলে ভর্তি করা হচ্ছে না।’ কয়েকজন অভিভাবক বলে ওঠে, ‘ঠিক আছে একটু পরে গ্রাম থেকে লোক গিয়ে সব দেখে আসবে তারপর ছেলে পাঠাব।’

দিদিমণিকে মেনে নিতে হয়। স্কুল আবার আগের নিয়মে চলতে আরম্ভ করে।

তিনদিন পরেই মিডডে মিলের ঠিক একটু আগে ডি.আই এসে হাজির হন, সঙ্গে আরও কয়েকজন অফিসার। কাউকে কিছু না বলে স্কুলের চারদিক, রান্নাঘর, টয়লেট সব ঘুরে অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে বেশ জোরেই বলে ওঠেন, ‘হেড টিচার কে আছেন?’ এতক্ষণ শর্মিলা দিদিমণি ক্লাস করতে করতে ডি.আইকে আড় চোখে দেখছিলেন, কিন্তু সামনে আসেননি। কয়েকমাস আগে এস.আই এসেছিলেন, দিদিমণি কাছে যেতেই এস.আই বেশ ঝাঁঝিয়ে বলে ওঠেন, ‘কি ব্যাপার, আপনাকে আসতে বলেছি?’ দিদিমণির খুব অপমানে লাগে। এবার ডি.আই স্যার ডাকতে অফিসের দরজা খুলে ভিতরে আসতে বলতেই ডি.আই বাইরে থেকেই চিৎকার করে ওঠেন, ‘স্কুলটা কি নিজের বাড়ি পেয়েছেন, যাকে খুশি ভর্তি করবেন আর যাকে খুশি হবে তাড়িয়ে দেবেন, আর.টি.আই রুল টুল তো কিছু মানবেন নাকি?’

– কিন্তু স্যার আমি তো সেরকম কিছু করিনি। ভালো পড়ানোও হয়, আপনি স্কুলের চারদিকটা ঘুরলেন কোনও নোংরা আবর্জনা পেলেন কি, রান্নাঘরও পরিষ্কার।

ডি.আই. স্যার কিছু সময় চুপ থেকে বলে ওঠেন, ‘সংখ্যালঘু ডিপার্টমেন্ট থেকে অফিসে ফোন করেছিল, আপনার স্কুলে কোন খ্রিষ্টান আশ্রম থেকে কেউ ভর্তি হতে এসেছিল?’

দিদিমণি এবার ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ডি.আই স্যারকে সব কথা বলে। স্যার সবকিছু শুনে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলেন, ‘দিদিমণি, আপনার স্কুলে চায়ের ব্যাবস্থা আছে?’ এর পরের কয়েকটা দিন স্কুলে একরকম মেলা বসে যায়, বিডিও, এস.আই থেকে এস.ডি.ও থেকে ডি.এম থেকে স্থানীয় মন্ত্রী কেউ বাদ যায় না। দিন নেই রাত্রি নেই সব সময় ফোন, ‘দিদিমণি আজকে একটু তাড়াতাড়ি আসবেন আজকে ইনি যাবেন, কাল উনি যাবেন।’ দুটো সপ্তাহে তো রবিবারেও স্কুল যেতে হয়েছে। গ্রামবাসীদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক চলে, আলোচনা চলে, বোঝানো হয়, এমনকী গ্রামে নতুন করে সব রাস্তাঘাট তৈরি থেকে আরও অনেক কিছু প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। গ্রামবাসীরা কিন্তু নির্বিকার, তাদের একটাই কথা, ‘কোনও এইডস রুগির সাথে আমাদের গ্রামের কোনও ছেলেমেয়ে পড়বে না।’ দিদিমণির শরীর খারাপ হয়ে যায়, ডাক্তার দেখাতে যেতে হয়, বাড়ির লোকজনকে কিছু বোঝানো যায় না, স্কুলের বাকি টিচারদের সুবিধা অসুবিধা আছে। এই সবের মধ্যেই আবার নতুন করে শো’কজের চিঠি।

বেরোনোর সময় গিয়াস অবশ্য বলেছিল, ‘দিদি, ছেড়ে দিন যা করছে করুক, আপনি তো সবাইকে জানিয়েছেন, স্কুলেও সবাই এসেছে, ইনস্পেকশন বুকে সবাই সিগনেচার করেছে, ডি.এম, ডি.আই কেউ বাদ নেই। আপনাকে অফিসে যেতে হবে না।’ হেডদি  কিছু বলতে পারেনি। এমনিতেই অফিসের দেবেনদারা কথায় কথায় অপমান করে, কিছু বললেই বলে, ‘এস.আইকে বলছি।’ হেডদির নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়। গিয়াস বলে, ‘আপনারা কিছু বলেন না কেন? প্রতিবাদ করেন না কেন?’ কি হবে বলে, আর তো বছর দুই চাকরি, কোনও দিন কিছু বলিনি আবার এখন কেন ?

– এটাই তো খারাপ, আপনি যত চুপ থাকবেন সবাই তত চেপে বসবে।

বাসে আসতে আসতেও এই কথাগুলো মাথার মধ্যে কিলবিল করছিল, নিজেকে বোঝালো, ‘অনেক হয়েছে এবার কিছু একটা বলতে হবে।’

হেডদি কয়েকদিন আগে মৃন্ময়কে ফোন করে সব কিছু জানিয়ে ছিল। মৃন্ময়ও শিক্ষক। তার পাশাপাশি একটা এন.জি.ও–র সঙ্গেও আছে, বিভিন্ন দিকে খুব সাহায্য করে। সম্প্রতি একটা ফুড ব্যাঙ্ক করেছে। স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড সহ বিভিন্ন জায়গায় গরিব দুঃখীদের খাবার বিতরণ করে। হেডদি প্রতিমাসে টাকা দেয়। ওকে কথাগুলো বলতেই উত্তর দেয়, ‘সব শুনেছি, আমরা আলোচনা করছি, প্রয়োজনে ওদের আশ্রমে গিয়ে পড়িয়ে আসব, আপনারাও সময় মতো যাবেন, স্কুলে নামটা থাক।’

সেদিনও হেডদি যখন অফিসে ঢোকে জামা কাপড় এক্কেবারে ভিজে গেছে, এতে অবশ্য অফিসের লোকজনের সেরকম কোনও নজর নেই, একজন মহিলা ভিজে ভিজে অফিসে এল কেউ একবার জিজ্ঞেসও করল না, বরং ছাতাটা একটা কোণের কাছে মেলতেই একজন বলে ওঠে, ‘দেখবেন জল ফেলবেন না।’ শো’কজের চিঠিটা হাতে নিয়ে চিঠিতে কী রয়েছে জিজ্ঞেস করতেই দেবেনদা চিৎকার করে ওঠে, ‘আমরা কি করে জানব, সব জেনে বসে আছি নাকি, আপনারা সব ভুল করবেন আর আমাদের সব কিছু জানতে হবে।’

অফিসের ভিতরে ঢুকলে অবশ্য সেসব কিছু মাথাতে থাকে না, ভয় লাগে, সেই ভয় সঙ্গে করেই শোকজের চিঠিটা নিয়ে অফিসের বাইরে আসে। বাইরে তখন তুমুল বৃষ্টি, অফিসের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকবার সময় মেঘ বৃষ্টির মধ্যেই গিয়াস করবী মৃন্ময় সবাই চারদিক ছুটে বেড়াতে আরম্ভ করে। হেডদি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখে, হাতে থাকা শো’কজের চিঠি ভিজে যায়। একটা বিদ্যুৎ চমকানোতে হেডদি  চমকে ওঠে। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে  তারপর আবার অফিসে ফিরে গিয়ে দেবেনদার টেবিলে চিঠিটা রেখে বলে ওঠে, ‘রইল, আমি ও আমার স্কুলের বাকি স্টাফ দরকার হলে আশ্রমে গিয়ে ঐ অসুস্থ ছেলে দুটোকে পড়িয়ে আসব, তবুও কোনও জবাব দেব না, যা পারেন করতে বলুন, সব চিঠিপত্রের জেরক্স কপি অফিসের আলমারির সাথে আমার কাছেও রাখা আছে, প্রয়োজনে…।’ শেষের কথাগুলো বলবার পরেই আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে থেকে হেডদি বাইরে বেরিয়ে যায়। বৃষ্টিটা তুমুল হলেও খুব ভালো লাগে, সেই মেঘের নীচে হাত পেতে বৃষ্টির ফোঁটা ধরবার চেষ্টা করতেই চোখের সামনে ছেলেবেলা নেমে আসে, কিতকিত কিতকিত ….।

চিত্রকর: মৃণাল শীল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More