সাফল্যের গল্প

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    ঋতুপর্ণ বিশ্বাস

    শঙ্খমালার দু’চোখ ছাপিয়ে গেছে খুশিতে। বলল, ‘আমি যেন একটি টিয়ে। বন্দি ছিলেম খাঁচায়। আমি মুক্তি পেয়েছি।’ তার মাথার উপর দিয়ে দু’হাতের সোনালি আঙুলে সে উঁচু করে ধরেছে তার সবুজ আঁচল। বাতাস তা উড়িয়ে দিলে শুভব্রতর মনে হল, তার সামনে এখন সত্যিই একটা টিয়ে। ফরফর করে উড়ছে। উবু হয়ে চিনে বাদামের ফুল দেখছিল শুভ। দুটো ঘন হলুদ ফুল তুলে এনে গুঁজে দিল শঙ্খমালার চুলে।

    মুখোমুখি শঙ্খমালা। তার চোখে আবেশের রোদ। বলল, ‘তুমি আগে তো কখনও আমাকে এমনি করে সাজাওনি!’

    ‘পরিবেশ কোথায় পেলাম বলো?’

    বেজে উঠল শঙ্খমালা, ‘কেমন করে পাবে! হানিমুনেও তো বোন–ভগ্নিপতিকে নিয়ে গিয়েছিলে!’

    শঙ্খমালার সোনালি আঙুল থেকে খসে গেল সবুজ আঁচল। শুভব্রত তার সামনে এখন আর টিয়াপাখি দেখছে না।

    সব কথার যেমন উত্তর হয় না, বহু আলোচিত বিষয় নিয়ে নতুন করে আলোচনায় যাওয়াও নিরর্থক। এক্ষত্রে সে কারণেই চুপ রইল শুভব্রত। তার স্বভাব নিজেকেই দায়ী করা। যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ানো। শুভ ভাবছিল, পরিবেশ কোথায় পেলাম– কথাটা না বললেই ভালো হতো। আর সে জন্যই সে এই মুহূর্তে এমন কিছু বলতে চাইল যাতে পুরনো আবহাওয়া ফিরে আসে। জিজ্ঞেস করল, ‘চিনেবাদামের ফুল তুমি আগে দেখেছো, মালা?’

    ‘নাহ্, পরিবেশ পেলাম কোথায়?’

    পিছন ফিরল মালা। মাথা থেকে খসে গেছে বাদামের ফুল। কিংবা সে নিজেই ফেলে দিয়েছে। ঘাসের জাজিম মাড়িয়ে উঠোন। সেখান থেকে গিয়ে উঠল সিঁড়িতে। শুভ হাসছিল। আঘাত করে যদি স্বস্তি পায় মালা, পাক। তার কাছে না–পারা তো অনেক। মেয়ে দেখতে গিয়ে মালাকে খুব পছন্দ হয়ে গিয়েছিল বাবার। কম মাইনে শুনে যদি রাজি না হয় মেয়েপক্ষ ছেলের মাইনে তাই বাড়িয়ে বলেছিল। পরে সেই মাইনে আর প্রাপ্ত মাইনে নিয়ে মালার মনে গড়ে ওঠা বিশ্বাস–অবিশ্বাসে স্বাভাবিকতা আনতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে শুভর। অনেক সুখের মুহূর্তই ভরেছে অ–সুখে। শুভ যে বাবাকেও নস্যাৎ করতে পারেনি। তার ভালোই তো চেয়েছিল বাবা। তাই দুষেছে সে নিজেকেই। তার জন্যই বাবাকে মিথ্যের আশ্রয় নিতে হয়েছে। তার আয় কথনযোগ্য হলে নিশ্চয়ই এই কালিটুকু তাকে মাথায় তুলতে হতো না।

    নজর ফিরিয়ে আবারও চিনে বাদামের ফুলে শুভব্রত। সেখান থেকে সামনে, দূরে। আজ সকালেই নবারুণপুরে এসেছে তারা। বিয়ের পর থেকে অনেকবারই আমন্ত্রণ করেছেন শঙ্খমালার কাকিমা। এই আসা হল। বাস থেকে নেমেই ডান হাতে নবারুণপুর মাধ্যমিক স্কুল। তা ছাড়াতেই শুরু হয়ে যায় গাছপালার রাজ্য। একসঙ্গে এত গাছপালা আগে দেখেনি শুভ। সিকি মাইল হেঁটে এলে বাঁ–হাতে প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র। ডান হাতে পুকুর। এক টুকরো মাঠ। মাঠের একপাশে শঙ্খমালার বাবার জ্যাঠতুতো ভাইয়ের বাড়ি। অনুকাকু চাকরি করেন এখানকার ল্যান্ড রেজিস্ট্রি অফিসে। বাম জমানায় তাঁকে চতুর্থশ্রেণির এই কাজটি পাইয়ে দিয়েছিলেন শঙ্খমালার বাবা। পুরনো কর্মী। কথা ফেলতে পারেননি তৎকালীন এমএলএ। পড়াশুনোয় কখনওই ভালো ছিলেন না কাকু। মাধ্যমিকের বেড়া ডিঙোতে লাফাতে হয়েছিল বার তিনেক। অক্লান্ত অধ্যাবসায়ী অনুকাকুর আরও পড়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু পিতৃবিয়োগ ঘটতে তা আর সম্ভব হয়নি। তখন অবশ্য কাকু সুস্থ মস্তিষ্কের ছিলেন। বিয়ের বছর দুই পর থেকেই তাঁর আচার–আচরণে ছন্দহীনতা প্রকাশ পেতে  থাকে। এখন সব কাজেই তিনি আড়ষ্ট। কী যেন ভাবেন সবসময়। পুকুরে স্নান করতে নেমেছেন তো আর ওঠার নাম নেই। খাচ্ছেন তো খাচ্ছেনই। বেলা বয়ে যাচ্ছে অফিসের। আবার অফিসে গেলেন তো কখন ফিরবেন কেউ জানে না। কাকিমা খোঁজ নিতে গেলে এমনও শোনেন, আজ তিনি অফিসেই আসেননি। ছেলেদের মুখ চেয়ে নাকি অফিসবাবুরা আজও তাঁর চাকরি খাননি।

    পুকুরপাড়ের আকাশমণি গাছে অনেক ফুল। কৃষ্ণচূড়া বসন্তে। এখন সে কেবলই পাতা মেলে দাঁড়িয়ে। মাঠের গা ছুঁয়ে রাস্তা। ওপাশে কাকিমাদের ফলের বাগান। আম–কাঁঠাল–জাম–তেঁতুল–নারকেল। বোলে ভরা আমগাছ। ফুল আসতে শুরু করেছে কাঁঠালের। এখন ভোরবেলা প্রচুর কুয়াশা। এই কুয়াশা নাকি আমের বোলের বড়ই অনিষ্টকারী। বেলা বাড়ার আগেই স্প্রে মেশিনে জল স্প্রে করে গাছ ভাল করে ধুয়ে না দিলে সব বোলেই পোকা এসে যাবে। অসময়ে যত কুয়াশা, আমের ক্ষয়, কাঁঠালের কিছু নয়। দুরন্ত কুয়াশায় হলুদ লাইট জ্বেলে এগোনো বাসে এমনটিই আলোচনা করছিল শুভব্রতদের সহযাত্রীরা। অত ভোরেও গাড়িতে বেশ ভিড়। শহর থেকে আসছিল চালানি মাছ, পাউরুটির ট্রে। খবরের কাগজের ফেরিওয়ালা ছেলেটি কাগজ গোল করে কেমন আন্দাজ করে জানলা নামিয়ে ছুড়ে দিচ্ছিল কখনও দোকান, কখনও বা কোনও বাড়ির সামনে।

    রাস্তাঘাট এখানে বেশ উন্নত। এতখানি ভিতরেও বিজলি বাতির খুঁটি, তার। সামনের এই রাস্তা  কোথায় গেছে জানতে হবে। এমনিই। কোথাও গেলে সবকিছুই খুঁটিয়ে জানতে ইচ্ছে করে শুভব্রতর। মাঠ পেরিয়ে রাস্তার দিকে এগোচ্ছিল। বারান্দার সিঁড়ি থেকে উড়ে এল অনুকাকুর বড় ছেলে সুবীরের ডাক। ‘জামাইবাবু, মা ডাকছে।’

    বারান্দার টেবিলে অনেক লুচির সঙ্গে ভাজাভুজির আয়োজন। রাঢ়ভূমির রঙে নলেনগুড়ের সন্দেশ, দানাদার, রসগোল্লা। মেঝেতে বসে নারকেল কুরছেন কাকিমা। উঠোনে ডাব কাটছে সুবীর। তার জলও আসবে। শুভ বলল, ‘আর কী কারও খেতে আসার কথা, কাকিমা?’

    একটু চিন্তিত হলেন কাকিমা। পরমুহূর্তেই খিলখিলিয়ে উঠে বললেন, ‘এই প্রথম পাচ্ছি তোমাকে। এটুকু তো খেতেই হবে।’

    ‘কাকু?’

    ‘কাকু সকালে চা–বিস্কুট খেয়েছে। একটু পরে খেয়ে অফিসে যাবে।’

    কাকিমাদের ওপাশের বারান্দায় পা ঝুলিয়ে বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে অনুকাকু। কিছু ভাবছেন। হাসি হাসি মুখ। তাঁকে বেশ বয়স্ক লাগে। তুলনায় কাকিমা অনেক কম বয়সি। দু’সন্তানের জননী বোঝাই যায় না। প্লাক করা ভ্রু। দামি শাড়ি, গয়না, আলতা–সিঁদুর–টিপ কাজলে সজ্জিতা রমণী।

    ‘এখানে জমির দাম কেমন কাকিমা?’

    ‘কেন গো, কিনবে?’

    পাশে বসে থালায় লুচি ভাঙছিল শঙ্খমালা। বলল, ‘ওমা, আমরা এখানে জমি কিনে কী করব! আসলে তোমার জামাই কোথাও গেলে সেখানকার সব কিছুই খুঁটিয়ে জানতে চায়।’

    ‘বাহ্, ভালো তো।’

    ‘বাসে কন্ডাকটরকে জিজ্ঞেস করছিল, ক’খানা বাস চলে এখানে? ফার্স্ট কার কখন যায়? লাস্ট কার কখন? আমি কী বলেছি জানো কাকিমা? তুমি যতই লাস্ট কারের খোঁজ নাও, আজ আমি এখান থেকে নড়ছি না।’

    কাকিমার সঙ্গে হেসে উঠল শঙ্খমালাও। কাকিমা শুভকে নারকেল কোরা দিতে উঠে এলে শুভ তাকাল মালার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে সে মুখ ঘুরিয়ে নিল। ভিতর তেমনই শক্ত হয়ে আছে। আসলে সে কাকিমার সঙ্গে বজায় রাখছে বাইরের ঠাঁট।

    সকালের খাওয়ার পর্ব চুকলে রান্নায় গেলেন কাকিমা। তাঁকে সাহায্য করতে গেল শঙ্খমালা। অনুকাকু এপাশে সরে এসেছেন। শুভর সঙ্গে কথা বলছেন আপনি করে। এক দু’বার তাঁকে ‘না’ করে চুপ রইল শুভ।

    কাকু জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাদের আজ কিসের ছুটি?’

    শুভ বলল, ‘আমি ছুটি নিয়েছি। সারা বছরই দু–একটা করে না নিলে বছরের শেষে নষ্ট হয়।’

    ‘আমি ছুটি পাইনে। বাবুরা আসে তো।’

    ‘বাবুরা খুব পছন্দ করে আপনাকে?’

    ‘তা করে।’

    ছুটে এলেন কাকিমা। ‘কী গল্প হচ্ছে জামাইয়ের সঙ্গে! বাড়ি এসে কোরো। অফিসের দেরি হয়ে যাবে। শিগগির যাও। স্নান করে এসো। একটু চা খাবে শুভ?’

    ‘না না, আমার কেবল সকাল সন্ধে।’

    ‘খুব ভালো। আমি তো বলি তোমার কাকুকে। চা খেয়ে খেয়েই শরীরের বারোটা বাজালো, জানো! আরে, এখনও দাঁড়িয়ে আছো! যাও যাও।’ কাকিমা ফের রান্নাঘরে ছুটলেন।

    অনুকাকু ঘর থেকে নারকেল আর সরষে– দু’রকমের তেল বের করে আনলেন। উঠোনে নেমে মাখতে থাকলেন। রান্নাঘর থেকে শঙ্খমালাকে ঠেলে বের করে দিলেন কাকিমা। ‘একলা বসে আছে জামাই। সঙ্গে করে একটু এদিক ওদিক ঘোর না। ঘরগুলো সব দেখেছিস?’

    পাশাপাশি তিনখানা ঘর। ওপাশে রান্নাঘর। তার ওপাশে বাথরুম। সবার সামনে দিয়ে টানা বারান্দা নিয়ে পুরোটাই এক ছাদের নীচে। সামনে দিয়ে শেষের ঘরে যাচ্ছিল মালা। শুভ সঙ্গ ধরলে দাঁড়াল।

    ‘আমার সঙ্গে কী! আমি এখন বিশ্রাম করব।’ তার চোখে কপট রাগ। তা চিনতে পেরে দু’হাত উপরে তুলে শরীর ভাঙল শুভ। বলল, ‘আমিও। খুব ক্লান্ত লাগছে।’

    আবারও রান্নাঘরমুখো হচ্ছিল শঙ্খমালা। এদিক ওদিক দেখে তার হাত চেপে ধরল শুভ। ‘বড্ড কম সময় আমাদের। হৈ চৈ করবে বলে এসেছিলে। কেন মন খারাপ করে সময় নষ্ট করছ বলো তো!’

    ‘তুমি তো দিচ্ছ করিয়ে।’

    ‘আমি! তুমিই তো আমাকে কড়া কথা শোনালে!’

    ‘অমন কথা শুনলে রাগ হয় না! পরিবেশ পেলাম কোথায়! কেমন করে পাবে! দাদা–ভাইয়ের ঘরের পিছনে থাকো একচিলতে ঘরে। গেলে হানিমুনে, সঙ্গে একদল। তাও যদি নিজের বোন ভগ্নিপতি হতো।’

    ‘এই তো আমার মুশকিল। কেউ ধরলে না করতে পারি না।’

    ‘আমিও তো ধরছি। আমার একটা বাড়ি চাই। ময়লা ফেলতে গেলেও আমাকে অন্যের উপর দিয়ে যেতে হয়। অমন করে আর আমি পারছি না।’ গলা ভাঙল শঙ্খমালার। এখুনি উঠে আসবে কান্না। সে ঠোঁট চাপল।

    কাকিমা রান্নায়। অনুকাকু তেল মেখে চলেছেন একমনে। ছোটছেলে মামার বাড়ি। সুবীরকে কোথাও পাঠিয়েছেন কাকিমা। শঙ্খমালার হাত ধরে ঘরে আনল শুভ। তার চোখে ফুটে ওঠা অশ্রুকণা মুছে দিল রুমালে। বলল, ‘তোমার কষ্টের কথা আমি কি জানি না? কিন্তু তোমার চাওয়াটা যে বড্ড দামি। আমার মতো মানুষের পক্ষে–’

    আবারও গর্জে উঠল শঙ্খমালা। তবে সেই গর্জনে অভিমানই ছিল বেশি। ‘তোমার লজ্জা করা উচিত। অনুকাকুর মতো মানুষ যদি জমি কিনে এই বাড়ি বানাতে পারে, তুমি কেন পারবে না?’

    ‘এসে অবধি আমিও তাই ভাবছি, জানো? একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সংসার টেনে কত জমাতে পারেন যাতে এই বাড়ি হতে পারে। কাকিমার তো লোকলৌকিকতা করার হাতও বেশ।’

    ‘তা তো আছেই। অনুষ্ঠানাদিতে মন খুলে দেন কাকিমা। আত্মীয় স্বজনের মধ্যে এ ব্যাপারে তার নাম আছে।’

    ‘তাহলে! কোথাও নাকি এক পয়সা ঋণ নেই কাকুর। ঘরে ঘরে জিনিসপত্র ঠাসা। কী করে হয়?’

    ‘কী বলতে চাইছ?’

    ‘জানি না।’ হাসল শুভ। ‘ছাড়ো। একদিনের জন্য এসে আমরা কেন এত বিষয়ী হব! এমন সুন্দর ঘর। এসো, একটু জমিয়ে প্রেম করে নিই।’

    #  #  #

    ভালো রাঁধেন কাকিমা। দারুণ মাংস রেঁধেছেন। পাতের পাশে বসেই খাওয়ালেন। আপ্যায়নে কোনও ত্রুটি নেই। তবে আত্মীয়–স্বজনের বাড়ি, উৎসবাদিতে দেখা হলে কাকিমার যে উচ্ছলতা তা কিন্তু তারা এখানে আসায় সকালে ততটা ছিল না। যা ছিল, এখন আরও কম। কোনও ব্যাপারে তিনি কি দুর্ভাবনায় আছেন? সুবীর ফিরলে বকছিলেন, ‘যা বলে দিয়েছিলাম তুই নিশ্চয়ই গুছিয়ে বলতে পারিসনি। তোর তো আবার ভুলো মন।’ কারও কী আসার কথা বাড়িতে? তারা আসার আগেই মাংস এসেছে। অনুকাকুদের প্রয়োজনেরও অনেক বেশি। কেন?

    শঙ্খমালা আবারও খুশির হাওয়ায়। খুব গল্প করছে কাকিমা আর সুবীরের সঙ্গে। দুপুরের পর ফেরার কথা বললে জিদ করল, ‘যাব না।’ কারও ছিটেফোঁটা আগ্রহে সেখানে থাকতে চায় না শুভ। সকালে এ ব্যাপারে খানিকটা আগ্রহ দেখিয়েছিলেন কাকিমা। এখন একেবারেই নিয়ম রক্ষা করছেন। বোকা মেয়ের তা মাথায়ই এল না। শুভ জোর করল না। এতটা এসে এক বেলা থাকলে সত্যিই পোষায় না। মা–বাবা নেই। দাদারা যে যার মতো হয়ে যাওয়ায় বাপের বাড়ির মজা শেষ। কাকার বাড়ি এসেছেই যখন, একটা দিন অন্তত হুল্লোড়ে থাক। খোলামেলায় থাক শঙ্খমেলা।

    বিকেলে চা হয়ে গেলে শুভদের নিয়ে বেড়াতে বেরোলেন কাকিমা। এত গাছপালা– রাস্তাগুলোকে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে মনে হয়। চারপাশে এখন আম, তাল, জামের সঙ্গে শিরীষ, কাঠবাদাম, পাকুড়ও। সবেদা গাছে প্রচুর সবেদা। জামরুল গাছ ফাঁকা। দিন দুই আগে কলেজ স্ট্রিটে একজনকে চমৎকার জামরুল বেচতে দেখেছিল শুভ। কোথা থেকে কী সব যে চলে আসে কলকাতায়! বারোমেসে জামরুল গাছও আছে নিশ্চয়ই। গাছপালার ফাঁকফোকরে হঠাৎ হঠাৎ বাড়িঘর, দোকানপাট। দু’একটা বাড়ি বেশ ভালোই। খরচ করে করা। দেখা হল বাজার, সিনেমা হল, স্কুল, ফুটবল গ্রাউন্ড, থানা, বিডিও অফিস। রেজিস্ট্রি অফিসের দিকে গেলেন না কাকিমা। বললেন, ‘ওটা একটু দূরে। রাত হয়ে যাবে।’

    ফিরতে ফিরতে সন্ধে। গোটা বাড়ি আলোময় করে ফ্রেশ হতে গেলেন কাকিমা। খেলে এসে প্রাইভেট পড়তে গেছে সুবীর। বাইরে চমৎকার চাঁদ। নারকেল পাতায় বসা শিশির জ্যোৎস্নায় ঝলমল করছিল। বাইরের পোশাক তখনও বদলানো হয়নি। হাত ধরে শঙ্খমালাকে উঠোনে টানল শুভ। ‘চাঁদ দেখবে এসো। রাতে শিরীষের পাতা কেমন জুড়ে যায় দেখাব তোমাকে।’

    ‘ছাড়ো, আমার শীত করছে।’

    ‘আমার হাত ধরেও?’

    ‘তোমার হাত ধরেই তো ডুবেছি। তুমি একটা অপদার্থ। কিছু করার ক্ষমতা নেই তোমার। শেয়ার কেনাবেচা করেও কত লোক গাড়িবাড়ি করছে এখন। তুমি খোঁজও রাখো না।’ একটানে এতটা বলে ফেলে মালা হাঁপাচ্ছিল।

    আচমকা আক্রমণে বিস্ময় বিহ্বল শুভ। দু’বাহু ধরে ঝাঁকুনি দিল। ‘কী হয়েছে তোমার মালা?’

    দু’চোখে ক্রোধ ভরে মালা বলল, ‘আমি শুতে দিতে পারব না বলে দাদারা নাকি আমার বাড়ি যায় না। কাকিমাকে যাবার কথা বললে তিনিও আমাকে এসবই শোনালেন।’

    ‘বাহ্, এই না হলে আত্মীয়!’

    ‘কেন? কিছু কি মিথ্যে বলেছে তারা! কেন নিজের ঘাটতিটা তোমার চোখে পড়ে না! চারপাশের কতটুকুনির খোঁজ রাখো তুমি? অপমানেও জ্বলে উঠতে পারো না, এমনই অপদার্থ!’

    ‘আঃ!’ ফেটে পড়ল শুভ। ‘বারবার কথাটা উচ্চারণ কোরো না। তাহলে আমার চোখে তুমিও আর পাঁচজন আত্মীয় স্বজনের মতো হয়ে যাবে।’

    ‘ভয় দেখাচ্ছো?’

    ‘না।’ গলা নামাল শুভ। ‘আমি সাবধান করতে চাইছি। আমিও তো সাধারণ মানুষ। সুখে থাকার বাসনা কার না থাকে? তা বলে সাধ্যের বাইরে গিয়ে জ্বলতে নেই। সে জ্বলা ক্ষণস্থায়ী হয়। মালিন্যেরও। আমিও যে এগোচ্ছি বা এগোতে চাইছি, আমার অল্প–বিস্তর সঞ্চয় কিংবা সঞ্চয়ের ইচ্ছে কি তা প্রমাণ করে না?’

    শঙ্খমালা ভাঙল। ‘জানি, তবু যে কেন মাথা গরম হয়ে যায়! তুমি যখন সিনেমা হলের সামনে সিগারেট কিনতে গেলে, আমরা পায়চারি করছিলাম ফুটবল মাঠে, তখন আমাদের বাড়ি যাবার প্রস্তাবে এমন এমন সব কথা শোনালেন কাকিমা।’

    ‘তাই তুমি ফেরার সময় কথা বলছিলে না! আমি ধরতেই পারিনি।’

    কিছু বলতে যাচ্ছিল শঙ্খমালা। সামনের মাঠে একখানা অ্যামবাসেডর এসে দাঁড়াল। দরজা খুলে হুড়মুড় করে নেমে এল তিন–চারজন। জুতো মশমশিয়ে উঠোন, তারপর উঠে এল সিঁড়িতে। ‘কই, কোথায় সোনালি? সোনালি গো–।’ শঙ্খমালাকে দেখে একজন বলে উঠল, ‘উরিব্বাস, পরি কোথা থেকে এল ভাই!’

    টয়লেট থেকে দৌড়ে এলেন আধসাজা কাকিমা। ‘আরে দাদারা যে! দাঁড়িয়ে কেন, উঠে আসুন।’

    ততক্ষণে তিনজন উঠেই পড়েছে। একটা মাঝারি ভারী প্যাকিংবাক্স নিয়ে একজন সোজা চলে গেল রান্নাঘরের এপাশের ঘরটার দিকে। একজন ড্যাবড্যাব করে মালাকে দেখছিল। অপেক্ষাকৃত কম বয়সি, লম্বা চুল, বালা হাতে, জ্যাকেট পরা ছেলেটি বারান্দায় উঠেই বাইরের আলোটা কেবল জ্বালছে নেভাচ্ছে।

    প্রশ্রয়ের তাড়া দিলেন কাকিমা, ‘এ্যাই তপনদা, কী হচ্ছে!’ সিঁড়ির নীচে দাঁড়ানো জনকে বললেন, ‘ঘোষদা আসুন, ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে কেন!’ সবার উদ্দেশ্যেই বললেন, ‘পরিচয় করিয়ে দিই। এরা সম্পর্কে আমার মেয়ে–জামাই। আর শুভ, এঁরা হলেন তোমার কাকুর অফিসের। ঘোষদা আমাদের রেজিস্টারবাবু।’

    হাতজোড় করল শুভ। কিন্তু কেউ তাকে প্রতিউত্তর করল না। কোট গায়ে, সোনালি চশমার ঘোষবাবুর ডান পায়ে কোনও সমস্যা আছে। সিঁড়ি বাইছিলেন টেনে টেনে। ডান হাতের সিগারেট মুখে তুলে লোভী চোখে দেখছিলেন মালাকে। জিজ্ঞেস করলেন, কী নাম? আমি আবার মেয়েলোকদের নাম ধরে ছাড়া ডাকতে পারিনে।’

    কাকিমা তাদের সবাইকে ঠেলে নিয়ে গেলেন রান্নাঘর সংলগ্ন ঘরের দিকে। একজন বলল, ‘এমা। সোনালি শাশুড়ি হয়ে গেছে! এমা–’

    কেউ বলল, ‘এ জন্যই ছেলে পাঠিয়েছিলে আমাদের না আসার জন্যে!’

    বাঁ হাতে কাকিমার কোমর জড়িয়ে ধরেছেন ঘোষবাবু। সম্ভবত কথাটা তাঁরই। ‘চমৎকার মেয়ে তোমার। ডাকো না সোনালি, একটু গল্পটল্প করি।’

    হাত জড়িয়ে ধরল শঙ্খমালা। শুভকে দ্রুত টেনে আনল ঘরে। প্রবল উৎকণ্ঠায় জিজ্ঞেস করল, ‘এখন বেরোলে আমরা বাস পাবো?’

    শুভ ঘড়ি দেখল। ‘পাবো।’

    ‘চলো। এক্ষুনি, আমি আর একদণ্ড এখানে থাকব না।’ খাটের নীচ থেকে টেনে আনল ব্যাগ। দ্রুত গুছিয়ে নিয়ে ঝুলিয়ে দিল শুভর কাঁধে। ‘চলো। তাড়াতাড়ি নিয়ে চলো আমাকে।’

    ‘বলে যাবে না কাকিমাকে?’

    মাথা নাড়ল মালা। ‘কোনও প্রয়োজন নেই।’

    চাঁদ খেলছে আকাশে। তার আলো কখনও পথে, কখনও মাথার উপরের গাছপালায়। প্রকৃতির মতন শুভর মনেও এখন আলো–আঁধারির খেলা। একটা জটিল অঙ্কের সমাধান হয়ে যাওয়ায় মিটমিট করে হাসছিল। কার সাফল্য যে লুকিয়ে কোথায়! আবার অনুকাকুর জন্য, তাদের সকলের জন্য খারাপও লাগছিল। শঙ্খমালার মধ্যে এখন কেবলই ভয়ের দাপাদাপি। শুভর শরীরে লেপ্টে গিয়ে প্রায় দৌড়চ্ছে সে। হাঁপাচ্ছিল। জিজ্ঞেস করল, ‘আর কত দূর বলো তো?’

    গাছপালা ভেদ করে একটা আলো আসছিল পিছন থেকে। গাড়ি কিনা কিংবা কী গাড়ি বোঝা যাবে মোড় ঘুরে এলে। তার আগেই রাস্তা থেকে নেমে গিয়ে গাছের আড়ালে দাঁড়াল শুভরা। মালাকে জড়িয়ে রেখেছিল শুভ। তবু সে কাঁপছিল। একটা অ্যামবাসেডর গেল। সেটাই কিনা কিংবা কারা আছে ভেতরে বোঝা গেল না। রাস্তা আর একটু গিয়েই দুটো হয়ে গেছে। গাড়ি সোজা বেরিয়ে যেতেই শুভরা রাস্তায় উঠল। ধরল ডান হাতের রাস্তাটি।

    শুভব্রত বলল, ‘এতে একটু ঘুর হবে।’

    শঙ্খমালা বলল, ‘তা হোক, নিষ্কন্টকের বেড়ই ভালো।’

    চিত্রকর : মৃণাল শীল 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More