রবে নীরবে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সুব্রত বসু

    সারাদিন নন-সিগন্যাল জোনে থাকার পর অফিসে ঢোকা মাত্রই মোবাইল ফোনের মেসেজ টিউনের শব্দ বলে দিচ্ছিল একের পর এক মেসেজ আসছে। চেয়ারে বসে এক নিশ্বাসে এক গ্লাস জল খেয়ে ফেললাম। টেবিলে একটা ফাইল পড়ে আছে বটে, তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। পরে দেখলেও চলবে। মোবাইল ফোনটা বার করে হোয়াটস্‌ অ্যাপ খুলতেই দাদার মেসেজে চোখ আটকে গেল। “মাদার’স কনন্ডিসন ক্রিটিক্যাল, রেনাল ফেলিওর।” সঙ্গে সঙ্গে দাদাকে ফোন করলাম,- “কিরে কোথায় ছিলি?”

    “সাইটে।”

    “যেমন করে পারিস কালকের মধ্যে চলে আয়।” মনে মনে বলছি চলে আয় বললেই তো চলে আসা যায় না, তাই বললাম- “অন্যবারের মতন নার্সিং হোমে অ্যাডমিট করলে কি হয়?”

    “সেটা আর সম্ভব নয়, ব্লাড ইউরিয়া হুড়হুড় করে বেড়ে যাচ্ছে।” দাদা যেটা বলছে সেটা যে বুঝছি না তা নয়, তবু আবার বললাম- “দেখনা যদি ডায়লেসিস করানো যায়।”

    “কি বলছিস কি! ডাক্তার বলছে সামান্য ইঞ্জেকশনের প্রিক্‌ শক্‌’টুকু নেবার ক্ষমতা মায়ের নেই, তখনই হয়তো হার্টফেল করে যেতে পারে, সুতরাং লেট হার ডাই পিসফুলি, ব্যাপারটা তো কম দিন ধরে চলছে না, কোনও এক সময়ে তো শেষ হওয়া দরকার, না’কি? দ্যাখ যেটা ভাল বুঝিস।” লাইনটা কেটে দিল দাদা। আমার কথাগুলো দাদার ভালো লাগছিল না। স্বাভাবিক, এতদিন ধরে মা’য়ের দেখাশোনা তো দাদাই করছিল। এবার একটু নিষ্কৃতি চাইছে।

    চুপ করে বসে রইলাম খানিকক্ষণ, এর আগে মায়ের অসুখের জন্য তিনবার ছুটি নিয়েছি। এখন দরখাস্ত নিয়ে গেলে সেনগুপ্ত সাহেবই বা কী বলবেন! হোয়াটস্‌ অ্যাপের মেসেজটা না হয় দেখাব। দাদার শেষ কথাগুলোই ভাবছিলাম, কেমন অবলীলায় বলে দিল এবার মায়ের মরা দরকার। বেশি কিছু বললে হয়তো বলবে তুই তো সেভাবে মায়ের দায়িত্ব কোনও সময়েই নিলি না। কথাটা তো মিথ্যে নয়। খারাপ লাগছিল, যে আর হয়ত চব্বিশ ঘণ্টা কি বড়জোর ছত্রিশ ঘন্টা পর মা সত্যি সত্যিই চলে যাবে। এসব ক্ষেত্রে যা হয় আর কী। অনেক পুরনো কথা মনে পড়ে। সেই দুপুরবেলা গানের আসর বসানো, যার মধ্যে দিয়ে কিছুটা হলেও অনাবিল আনন্দ পেত মা।  মাঝে মাঝেই বলত, “দেখিস আমার শ্রাদ্ধের সময় যেন রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া হয়।” বুক ফাঁকা হয়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।

    বাবার একার রোজগারে আমাদের সংসারে বিলাসবহুল জিনিসের বাহুল্য ছিল না। শুধুমাত্র মায়ের একটি সিঙ্গল রিডের হারমোনিয়াম। সেটাও মামার বাড়ি থেকে নিয়ে আসা। ওই বাড়িতে গানের চল ছিল, মা মাস্টারমশাই’এর কাছে গান শিখতেন। ঠাকুমার মুখেই শুনেছি, বাবার সঙ্গে মায়ের বিয়ের যখন সম্বন্ধ হচ্ছিল, তখনই বাবা পিসেমশাইয়ের সঙ্গে বরের বন্ধু সেজে মাকে দেখতে গিয়েছিল। এই প্রসঙ্গ উঠলেই হাসাহাসি হত। ওই হারমোনিয়াম বাজিয়েই মা শুনিয়েছিল “শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে”। বিয়ের আগে পাত্রীর গান জানার প্রসঙ্গ ওঠে বটে তবে শ্বশুরবাড়ি এসে আর সেই চর্চা থাকে না।  মায়ের বেলাতেও ঠিক তাই হয়েছিল। বাবা ঠাকুমা কারুরই সায় ছিল না যে মা গান নিয়ে চর্চা করুক। এমনি তো শখ আহ্লাদ  তেমন কিছু  ছিল না, মাঝে মাঝেই দুপুরবেলা পাড়ার নানা বয়সি মেয়েদের জুটিয়ে মা গানের আসর বসাত আর ঠাকুমা পাশের ঘরে গজগজ করত দুপুরে ঘুম না হওয়ার জন্যে। তখন থেকেই  আমার গান আর সুরের সঙ্গে পরিচয়। কিন্তু  মা কখনোই আমাকে হারমোনিয়ামে হাত দিতে দিত না, বলত- “এই যে তোর দাদা এই রিডটা ভেঙ্গে দিল সারানো হল আর।” জানতাম হারমোনিয়ামটা বোনের, সে আর একটু বড় হয়ে গান শিখবে।

    একবার বাবার কয়েকজন অফিসের বন্ধু আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন কোনও একটা ঘরোয়া অনুষ্ঠান উপলক্ষে। বাবাই হয়ত কোনও এক সময়ে মায়ের গানের কথা বলেছিল তাদের কাছে, তাই বিশেষত অমলেন্দুকাকু বারে বারে মাকে অনুরোধ করছিলেন গান গাওয়ার জন্য। নানান বাহানায় মা এড়িয়ে যাচ্ছিল, বাবার কাছ থেকে গ্রিন সিগন্যাল পাবার আশায়। শেষ পর্যন্ত মাকে গান শোনাতে হয়েছিল- “কেন চোখের জলে ভিজিয়ে দিলেম না…”। আক্ষেপ করেছিল অমলেন্দুকাকু মা আর গানের চর্চা করে না বলে।  এসবই একদিনে ওলট পালট হয়ে গেল অফিসের মধ্যে ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে বাবা মারা যাবার পর।

    যখন বাড়িতে এলাম দাদা নেই, অফিসে গেছে। বৌদি বলল, “ফিরবে তাড়াতাড়ি অর্ধেক অফিস করে, যাক তুমি এসে গেছ ভালই হয়েছে, আমার খুব ভয় করছিল যদি এর মধ্যেই কিছু হয়ে যায়।”

    মা শুয়ে আছে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো, ড্রিপ চলছে, ইউরো ব্যাগে আর কিছু জমা হচ্ছে না। কপালে হাত দিয়ে মাকে ডাকলাম। চোখ মেলে তাকালো। “আমি বরুণ, কি কষ্ট হচ্ছে”। মা হাতটা তুলছিল, আমার হাতটা ধরবে বলেই বোধহয়। তাড়াতাড়ি মায়ের হাতটা ধরে নিলাম। মা মাথাটা সামান্য উঁচু করে চোখ ওপর দিকে তুলে জড়ানো গলায় বলল’ “এসেছিস, যাক। একটু আগে তোর বাবা এসেছিল”। বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। মৃত্যুর আগে এইসব লক্ষণের কথা অনেকের কাছেই শুনেছি।

    বৌদি পাশেই দাঁড়িয়েছিল, কথাটা কানে গিয়ে থাকবে। “দ্যাখো না কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলেই ওই কথা বলছে, মাথার দিকে কিছু দেখার চেষ্টা করছে।” চেয়ারটা টেনে নিয়ে মায়ের বিছানার কাছেই বসলাম। মায়ের হাতটা ধরাই আছে। বৌদিকে জিজ্ঞাসা করলাম, “দাদা কি মিলিকে খবর দিয়েছে?” মিলি আমার বোন।

    “হ্যাঁ। আজ বিকেলে রাজধানী এক্সপ্রেসে রওনা দেবে।”

    “তার মানে তো এখানে আসতে কাল বেলা এগারোটা যদি সঠিক সময়ে ট্রেন আসে।” বৌদি দাঁড়িয়েছিল পাশেই হঠাৎই বোধহয় মনে পড়েছে , “ওহো তুমি অনেকক্ষণই এসেছ জল দেওয়া হয়নি।” বৌদি চলে গেল। মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম। জানি এতে রোগীর কোনও কিছুই উপশম হয় না। তবুও মনে হয় মা বোধহয় স্বস্তি পাচ্ছে। বৌদি একগ্লাস জল আর ছোট একটা মিষ্টি নিয়ে এল। গ্লাসের জলেই সামান্য হাত ধুয়ে মিষ্টিটা গালে ফেললাম। জল খেয়ে গ্লাস আর ডিসটা মাটিতে নামিয়ে রাখার সময় দেখলাম খাটের তলায় বেডপ্যানটা রাখা আছে, কিন্তু  হারমোনিয়ামটা নেই। বৌদি নিশ্চয়ই জানবে না, কাকেই বা জিজ্ঞাসা করব।

    মায়ের কপালে হাত রাখতেই, অল্প চোখ মেলল। ঘোলা চোখে আমাকে দেখার চেষ্টা করছিল। কপালে হাত বোলাতে বোলাতেই বললাম, “কিছু বলবে?” মনে হল যেন অল্প ঘাড় নাড়ল। অক্সিজেন মাস্কের কাছে মুখটা নিয়ে যেতেই খুবই আস্তে, জড়ানো গলায় বলল, “অমলেন্দুবাবুকে একবার  খবর দিতে পারিস?”

    কথাটা শুনেই মনে পড়ল, মায়ের অমলেন্দুবাবুর মোটরসাইকেলের পিছনে বসে একটা হাত  তার কাঁধে রেখে  হুস করে বেরিয়ে যাওয়া। বাবা মারা যাবার পর মা এবং নিকট আত্মীয়রা বুঝতে পেরেছিল কিছুদিন পরে আমাদের আর খাবার সংস্থান থাকবে না, সেইজন্যেই তারা যোগাযোগ রাখা বন্ধ করে দিয়েছিল। আর মা অমলেন্দুবাবুর কাছে একটু আশ্রয় পেতে চাইছিল। কারণ তিনি ওই অফিসের ইউনিয়নের লিডার গোছের একজন। যেহেতু বাবা অন ডিউটিতে মারা যান তাই নিজেকে চাকরির দাবিদার হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে অমলেন্দুবাবুর সাহায্যের দরকার ছিল। প্রায়ই মা অমলেন্দুবাবুর সঙ্গে বেরিয়ে যেত চাকরির তদবির করতে। মাস ছয়েক পরে মায়ের চাকরিটা হয়ে গেল বাবারই অফিসে।

    তারপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই অফিস ফেরত অমলেন্দুবাবু আমাদের বাড়িতে আসতেন মাকে সঙ্গে নিয়ে। চা জলখাবার খেয়ে বাড়ি ফিরতেন, কোনও কোনও দিন মা গানও শোনাতেন। গান শুনে প্রশংসার পর মাকে বলতেন “এবার কিন্তু গানের চর্চাটা আবার শুরু করতে হবে।” মা কোনও  উত্তর না দিয়ে হাসত। এরপর মা একদিন আড়ালে ডেকে বলে দিলেন এবার থেকে অমলেন্দুবাবু’কে আর কাকু নয়, মামু বলেই সম্বোধন করতে। হঠাৎ করে একটা মানুষ কী করে কাকু থেকে মামু হয়ে যান সেই বোধ কিন্তু তৈরি হয়নি আমাদের। তবে মায়ের এই অমলেন্দুবাবুর সঙ্গে মেলামেশা নিয়ে দাদার মনে একটা অসন্তোষ দানা বাঁধছিল।

    আমি তখন সেভেন, দাদা টেন, নীচের ঘরে মাস্টারমশাই’এর কাছে পড়ছি। ওপরের ঘর থেকে অমলেন্দু আর মায়ের হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছিল মাঝে মাঝে। তখনই মাস্টারমশাই জিজ্ঞাসা করলেন, “উনি তোমাদের কিরকম মামা হন?” কোনও উত্তর না দিয়ে ওনার দেওয়া টাস্ক’টাই করছিলাম। কিছুক্ষণ পর আবার জিজ্ঞাসা করলেন “উনি থাকেন কোথায়?” সেকথারও যখন উত্তর পেলেন না,  বললেন, “ওহ্! জানো না বুঝি।” মুখে একটা ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি খেলে গেল তাঁর।

    মাস্টার মশাই চলে গেলে দাদা হুড়মুড় করে ওপরে এসে মা ও অমলেন্দুবাবু যে ঘরে  বসেছিলেন সেখানে ঢুকে সেন্টার টেবিলটা চায়ের কাপ ডিস সমেত উলটে দিল। চীৎকার করে অমলেন্দুবাবুকে জিজ্ঞাসা করল, “কি জন্য আপনি রোজ রোজ আমাদের বাড়িতে আসেন?” মা সামাল দেবার চেষ্টা করেছিল। “কাকে কি বলছিস?” কিন্তু দাদার চীৎকার তাতে থামেনি। মা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাদাকে ঠাস ঠাস করে চড় মারছিল। সেই সময়ে অমলেন্দুবাবু উঠে চলে যান। আর কোনওদিন আমাদের বাড়িতে আসেননি। মা নিজের ঘরে গিয়ে বালিশে মুখ গুঁজে খুব কান্নাকাটি করছিল। এরপর মা দিন দশেক অফিস যায়নি মেডিকেল লিভ নিয়ে। পরে অফিসে গিয়ে মা জানতে পারে অমলেন্দুবাবু বদলি হয়ে দুর্গাপুর চলে গেছেন, দেশের বাড়ি কাছাকাছি হবে বলে।

    আজ এতদিন পর আবার অমলেন্দুবাবুর নাম শুনলাম মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের মুখে। কোনও যোগাযোগ ছিল না তারপর থেকে। কীভাবেই বা মায়ের শেষ ইচ্ছেটা পূরণ করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। কোথায় যে উনি থাকতেন বা দেশের বাড়ি কোথায় তাও জানা নেই।  তবু পুরনো ডায়রি বা সেই সময়ের কোনও খাতা যাতে টেলিফোন নম্বর লিখে রাখা হত, আতিপাতি করে খুঁজছিলাম। দাদা কখন অফিস থেকে ফিরে এসেছে খেয়াল করিনি।

    “কি খুঁজছিস পুরনো সুটকেশে?”

    “তোর মনে আছে নিশ্চয়ই অমলেন্দুবাবু আমাদের বাড়িতে আসতেন, তাঁর যদি কোনও ফোন নাম্বার পাওয়া যায়।”

    “কেন? কী হবে এতদিন পরে?”

    “মা বলছিল, অমলেন্দুবাবুকে একটা খবর দেবার জন্য।”

    “আচ্ছা মরণকালে না হয় মায়ের মাথার ঠিক নেই, তা বলে তোর মাথাও খারাপ হয়ে গেছে, দুশ্চরিত্র একটা লোক, এতদিনে হয়ত মরে হেজে গেছে, তার ঠিক ঠিকানা নেই, তার  পিছনে সময় নষ্ট করার কোনও অর্থ আছে?”

    কোনও উত্তর দিলাম না। সেই মানুষটার প্রতি দাদার অশ্রদ্ধা এখনও যায়নি। একটা সময় তো উপকারই করেছিলেন। বাবার কোনও পেনশন ছিল না। সামান্য জমানো টাকা রোজ খরচ হলে  ক’দিনই বা যেত। মায়ের মুখেই পরে শুনেছিলাম এক্সজেম্পটেড্‌ ক্যাটাগরির প্যানেলে অনেক নীচের দিকেই মায়ের নাম ছিল। অমলেন্দুবাবুই ইনফ্লুয়েন্স করে তাড়াতাড়ি চাকরিটা পাইয়ে দিয়েছিলেন। মা সেই উপকারের কথা যদি না ভোলে সেটা অন্যায় কিছু নয়। এই সময় দাদার সঙ্গে তর্কবিতর্কে যেতে ভাল লাগছিল না বলে চুপ করেই ছিলাম। তবে দাদার কথায় খোঁজাখুঁজি   বন্ধ করিনি। সেই সময় বৌদি এসে ডাক দিল-

    “ছোড়দা ভাত  খাবে এসো। তোমার দাদাও খেয়ে যায়নি, দুজনকে একসাথেই দিচ্ছি।”

    “দাঁড়াও বৌদি আমার স্নান হয়নি, আমি চট করে দু’মগ ঢেলে আসি।”

    পেটে খিদে থাকলেও মুখে রুচি ছিল না। মা ওই অবস্থায় পড়ে আছে। মায়ের শেষ ইচ্ছেটাও রাখতে পারব না। আজ মা না থাকলে আমরা কোথায় ভেসে যেতাম। বাবা মারা যাবার সময় কতই বা বয়স আমাদের। আনমনে থাকলে এক এক সময় মনে হত বাবা বোধহয় কোথাও গেছে ফিরে আসবে, পরক্ষণেই ভুল ভাঙত তাইতো বাবা তো মারা গেছে। তখন থেকে মা একলাই সব কিছু সামলেছে। খেতে খেতে মায়ের সম্বন্ধে সাত পাঁচ অনেক কথাই মনে পড়ছিল। হঠাৎই মনে পড়ল মায়ের হারমোনিয়ামটার কথা।

    “হ্যাঁরে দাদা, খাটের তলায়  মায়ের হারমোনিয়ামটা দেখলাম না তো।”

    “ হঠাৎ হারমোনিয়ামের খোঁজ, ওটা  নিয়ে কী করবি, মায়ের শ্রাদ্ধবাসরে রবীন্দ্রসংগীত গাইবি!”

    “ দ্যাখ দাদা, মায়ের ইচ্ছেগুলো নিয়ে ব্যঙ্গ করিস না, যখন সেই মানুষটা মরতে বসেছে।”

    “কী আবার হবে মিলি বা তার মেয়ে ওই পুরানো হারমোনিয়াম নেবে না, নীচে বাথরুমের মাথায় লফ্‌টের ওপর তোলা আছে। ওপরের ঘরে রেখে জঞ্জাল বাড়িয়ে কী লাভ।  তুই যদি নিতে চাস নিয়ে যা এবারে, দুনিয়ার আরশোলার বাসা ওটার মধ্যে।” আমি আর কোন কথা বললাম না। খাওয়া শেষ করে উঠে পড়লাম।

    দাদা চিরদিনই উদ্ধত প্রকৃতির। মা দাদার কাছে থাকত বটে তবে খুব যে সুখে ছিল বলে মনে হয় না। যখন মা সুস্থ ছিল তখনও তো এসেছি। দুঃখ করে বলত, সারাদিন তার সঙ্গে কেউ একটা কথা বলে না। দাদা তো সারাদিন অফিস আর ব্যবসা। টাকা ছাড়া তো আর কিছু চিনল না। ভাইপোটাকেও বোর্ডিং’এ পাঠিয়ে দিয়েছে। বছরে একবার দু’বার আসে। বড় হয়েছে তার নিজস্ব একটা  জগৎ  আছে। বুঝতে পারতাম মা খুব একলা হয়ে গিয়েছিল।

    খাওয়া দাওয়া সেরে দাদা ঘরে এলে বললাম, “একবার ডাক্তার’কে কল দিবি নাকি?”

    “কী হবে ডেকে, বলেই তো দিয়েছে আর কিছু করার নেই।” দাদা খবরের কাগজটা হাতে করে নিজের ঘরে চলে গেল। দাদা চলে যেতে আমি ওই ঘরেরই দেওয়াল আলমারির পাল্লা খুলে খুঁজতে লাগলাম যদি কিছু পাওয়া যায়। আজেবাজে জিনিসে ভর্তি। এখানে কোথায় কী খুঁজব।

    মায়ের অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপ হচ্ছে। এখন ডাকলেও আর কোনওরকম সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।  প্রায় কোমায় চলে গেছে বলা যায়। শ্বাসকষ্ট যেন আস্তে আস্তে বাড়ছে। দাদার কথাটা একদিক দিয়ে ঠিক, এতদিন পরে কি আর কোনও খোঁজখবর পাওয়া যায়। মারা যাওয়া বিচিত্র নয়। বেঁচে থাকলেও বয়স কম হবে না। হঠাৎ মনে পড়ল। মায়ের একটা ব্রিফকেস ছিল। মা তাতে অফিসের কাগজপত্র রাখত। সেটা তো দেখছি না। দাদাকে জিজ্ঞাসা করে লাভ নেই, আবার কিছু একটা মন্তব্য করে বসবে। তাই বৌদিকে ডাকলাম।

    “বৌদি মায়ের একটা ব্রিফকেস ছিল না, মা যার মধ্যে অফিসের কাগজপত্র রাখত, জানো তুমি?”

    “দেখেছি কিন্তু কোথায় আছে বলতে পারছি না। তোমার দাদা তো ঘরে বাড়তি জিনিস রাখতে দেয় না, ফেলে দেওয়া হয়নি একতলায় সিঁড়ির নীচটা একবার দেখতে পারো।”

    ভালো লাগছিল না নীচে গিয়ে নোংরা ঘাটতে। হঠাৎ মনে পড়ল মায়ের মোবাইলটা ছিল না?  একবার দেখলে তো হয়। বৌদিকে বলতে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এনে দিল।

    “অনেকদিন ব্যবহার হয়নি, চার্জ আছে কিনা বলতে পারব না, না হলে একটা চার্জারে লাগিয়ে দেখো, ঠিকই তো ছিল, দিল্লি থেকে ছোড়দি মাঝে মাঝে ফোন করত।”

    খুব একটা পরিশ্রম করতে হল না। ফোনটা চালু হতেই ফোনবুক খুলে দেখা গেল অমলেন্দু রায়ের একটা নাম্বার রয়েছে। কল হিস্ট্রিতে মাসচারেক আগে প্রায় মিনিট আটেক কথা হয়েছে। তার মানে তো ভদ্রলোক বেঁচে আছেন। নিজের মোবাইল থেকেই ডায়াল করলাম, এ কী কলার টিউনে বেজে উঠল “কেন চোখের জলে ভিজিয়ে দিলেম না…”! না মায়ের গলা নয়। মা যখন গাইত তখন তো স্মার্টফোনের কোনও অস্তিত্ব ছিল না। মায়ের কথা মনে রেখেই পরে বোধহয় অন্য কারও গান ডাউনলোড করে কলার টিউন বানিয়েছেন। আমার কানে তখন  “কে জানিত আসবে তুমি গো অনাহূতের মতো… ”,  আর মা তার বরাদ্দের শেষ কটি শ্বাস খুব কষ্টে নেবার চেষ্টা করে চলেছে।

    চিত্রকর : মৃণাল শীল 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More