একটা পেঁপে গাছ ও যাদবলালের স্ত্রী

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

     শ্রীকান্ত অধিকারী

    গাছের কাটা মাথাটা দেখা ইস্তক বিমলা কেঁদেই যাচ্ছে। বড় বড় চোখ করে যাদবলালের দেখা ছাড়া কোনও উপায় নেই । বোঝানোরও কিছু নেই। তবু যাদবলাল একবার মরিয়া চেষ্টা করে , ”সামান্য পেঁপে গাছ বই তো নয়। কত লোকের কত কী যে যায়!”

    বিমলা তবু কাঁদে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। যাদবলাল সেই রাতভোর থেকেই বিমলার পাশে বসে। যাদবলালেরও মন খারাপ। ক’দিন থেকেই বিমলা বলেছিল বটে ”গাছটাকে খানিক ঝেড়ে দাও না গো। নয়তো বস্তা দিয়ে পেঁপে ক’টাকে ঢেকে দাও।” যাদবলাল বিমলার দুটো কথার একটাও রাখে নাই।

    পাশে মরে যাওয়া চিনিকলের গায়ে উঁকি দেওয়া ছোট্ট পেঁপের চারাটাকে একদিন বড় স্নেহবশে তুলে এনে চিৎকার জুড়েছিল, ”শুনছ?”

    তখন যাদবলাল খদ্দেরকে বারো টাকার সরষের তেল, দু’টাকার হলুদ আর এক টাকার নুন দিচ্ছিল। বিমলার এই এক বদ অভ্যাস। যেখানে যা পাবে কুড়িয়ে বুড়িয়ে ঘরে এনে তুলবে। তাতে ঘরে জায়গা থাক আর না থাক। আজকে কুনুরে শাক তো কোনওদিন চালতা। বা কোনও জলা থেকে শুষনি হেলেঞ্চা কিংবা আমড়ার ডাল। সবসময় যে সব গাছ লাগে তাও না। গাছ লাগানোর মত সবজিবাগান করার জায়গাও নেই। তবু গাছ লাগায়। সবজি বোনে। তবে এ সব ব্যাপারে ওকে ডাকে না। একাই খুন্তি দিয়ে বা কোনও খুরপি দিয়ে গাছ লাগিয়ে দেয়।

    পেঁপে গাছের ক্ষেত্রে কিন্তু বিমলা চেঁচিয়ে ওঠে, ”শুনছ ওখানে মাছি না তাড়িয়ে এদিক পানে খানিক এসো দেকিনি। গাছটা ভালো করে বসিয়ে দাও।”

    একটা ছোট্ট খোঁচা। কিন্তু অত্যন্ত ধারালো। মাঝে মাঝে বিমলা তুলে ধরে ভুলে যাওয়া কিছু ভুলচুকের হালখাতা। পুরনো ক্ষতে হয়তো সেরকম যন্ত্রণা হয় না তবে কিছু ঠেকলে চমকে ওঠে। নিজের আর আখের গোছানো হল কই!

    সেই কবে চাকরির জন্য ঘর ছেড়ে এসে এখানে এই আমুদপুরে চিনির কলে কাজে লেগে গেল, তারপর ঘরবাড়ি ছেলেপুলে বন্ধু-বান্ধব করতে করতে আমুদপুরের স্টেশন দিয়ে কত ট্রেন পেরিয়ে গেল। চেতন ফিরল তখন, যখন চিনির কলটা বন্ধ হয়ে গেল। সে বাড়ি গেল। তার জমি জায়গার ভাগ যেটুকু পাওয়া যায়, তা বেচেবুচে আমুদপুরে দিব্যি একটা বাড়ি বানাতে পারবে। কিন্তু দিনে দিনে পরিবর্তন হয়ে গেছে গাঁয়ের মানুষজন আত্মীয়স্বজনের। তাদের মতে যে যায় সে যায়। তার সঙ্গে আবার অংশীদারিত্ব কীসের? যাদবলাল দেখে দিনকাল পাল্টেছে। পঞ্চায়েত করে জায়গা জমির দখলও যদি নেয়, তবে সেই সম্পত্তি বেচতে পারবে না। হুজ্জুত হবে। যাদবলালের আখের গো্ছানো হল না। খালি হাতে ফিরে এল সেই আধাশহর আমুদপুরে।

    ঠিক করে, যে করেই হোক কারখানার পাশে বাঙলা ভাটা ইটে কাদা লেপেও মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নেবে।   সে নিজে নটকন দোকান দেয়। দেখতে দেখতে একটা দুটো করে ঘর করে নতুন পাড়া বসে। ওরাই যাদবলালের খদ্দের। খুচরো থেকে অতি খুচরো। বাকি সময়টা বসে থাকে। মাছি তাড়ায়। আর ভাবে, বিমলারও তো দোষ নেই। ও তো চেষ্টা করে যাচ্ছে সংসারটা যাতে সংসারের মত চলে। ওর মতো করে চলে।

    বিমলার বড় সাধ ঘরে একটা পেঁপে গাছ লাগায়। তাহলে আর সবসময় ‘পেঁপে আনো গো পেঁপে আনো গো’ করতে হয় না। গাছ থেকে টুক টাক করে পেড়ে নিলেই হল। ঘরে ফলন্ত পেঁপের স্বাদই আলাদা।

    এমনিতে বিমলার নিজের পছন্দ পেঁপে কাঁচকলার সঙ্গে বাটা মাছের ঝোল। তাতে দু–চারটে সয়াবিনের বড়ি। যাদবলাল খেতে খেতে অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে। কচিমাছের ঝোলে অবশ্য রোগ জ্বালা সারে। তাই বলে সয়াবিনের বড়ি আবার কেন? তবু পেঁপের পদ বিমলা করবেই। আর যাদবলাল সেই নাক সিটকিয়ে কোনও রকমে মুখে তোলে। অবশেষে সে মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে সবজিবাজার থেকে পেঁপে আনা বন্ধ করে দেয়। বিমলা বাজারথলি আঁতিপাঁতি খোঁজে। যাদবলাল ডাহা মিথ্যে বলে দেয়। –”বাজারে আজ পেঁপে নামে নি গো।”

    বিমলা অম্লান বদনে বিশ্বাস করেও নেয়। তবে সে যে খুশি হয় না সেটা যাদবলাল দেখেও দেখে না। কারণ বাজারের থলিতে যা এনেছে তাতে ওরই মুখে ওঠে না। আর তখনই বিমলাকে বাইরে বেরোতে হয়। সঙ্গে করে নিয়ে আসে পুঁই অথবা সজনের ডাল। কখনও কখনও তেলাকুচো বা কচুর পাতা। তবে এসব ব্যাপারে কোনওদিন বিমলা ওকে ডাকেনি। ঠিক সময়ে পাতে নতুন নতুন পদ এনে হাজির করে। আর যাদবলাল সহাস্যে মুখে তোলে। আজ অবশ্য অন্য রকম।

    পেঁপে চারাটা সে আড়চোখে মাপে। শীর্ণ, দু–একটা পাতা উঁকি দিচ্ছে। মনে মনে যাদবলাল খুশি হয়। তাই সে হালকা করে বলে, ”সেরকম জায়গা কই, বড় হলে ওর শেকড়ে আমার পাঁচিল ফাটিয়ে দেবে।”

    – ”পাঁচিল ফাটাক। যাদের কপালই ফাটা তাদের আবার পাঁচিল। কার পাঁচিল। সবই তো ওই চিনিকলের। কারও সব্বনাশ তো কারও পোষমাস। কার চিনিকল কোথায় গেল আর তোমরা সবাই মিলে ঘর বানালে। পরের ধনে পোদ্দারি!”

    যাদবলাল আর কথা বাড়ায় না। চিনিকলে কাজ করার সময় এক এক করে চিনিকলের পাঁচিল ঘেঁসে যারা ফোকটে ঘর বানিয়েছিল, তাদের মধ্যে যাদবলালও আছে। সেই সময় ম্যানেজারবাবু অবশ্য কিছু বলে নাই এই ভেবে, কর্মচারীরা যত কাছে থাকে তত কোম্পানির লাভ। সময়মত কাজে আসতে পারবে। আর কারখানার রক্ষণাবেক্ষণও হবে। এদিকে এরা ভাবল আমাদের বাড়ি করার জায়গাটা তো কিনতে হল না। কিন্তু কে জানত যাকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকা সেই কিনা একদিন শেষ হয়ে যাবে! কারখানা একদিন বন্ধ হয়ে গেলে যে যার মতো করে দখলপনা শুরু করে নিজের এরিয়া বড় করেছে। সে কথা বিমলা শুধু নয় ভানু, সোমনাথ, ডাকু, রহিম সব বাসিন্দারই জানে।

    যাদবলাল এদিক ওদিক তাকিয়ে তুলসীতলার পেছনে পাঁচিল ঘেঁসে লোহার খুন্তি দিয়ে মাটি কুপিয়ে যেমন তেমন করে চারা বসিয়ে দেয়।

    সে দেখিয়ে দেখিয়ে বালি কাদা মেখে হাত ঝেড়ে ফুরে যখন উঠতে যাবে , তখন বিমলা পিতলের ছোট ঘটিতে এক ঘটি জল আর গোটা কতক ফুল তুলসী পাতা দিয়ে বলে , –”সোনা আমার, পৈতেটা বার করে ওম বিষ্ণু করে দাও না। দোষ ঘাট সব চলে যাবে। গাছটা বড় হয়ে ভালো ফলন দেবে।”

    এতক্ষণ ব্যাপারটা হালকা ভাবে নিচ্ছিল। ভালো করেই জানে রাস্তার এই উড়ে আদিরে গাছ লাগালেও লাগবে না। প্রথম প্রথম জল টল দেবে তারপর দুদিন যেতে না যেতেই ভুলে যাবে। কিন্তু বিমলার এই চারা লাগানোর ব্যাপারে এত বাড়াবাড়ি যাদবলালকে অবাক করে। সে শুধু একবার বলে, ”আমি তো চান করি নি।” বিমলা বলে, ”তুমি বামুন মানুষ চান না করলেও শুদ্ধ। দাও দেকিনি ভাল্লো করে গাছটাকে বেঁধে।”

    যাদবলাল ভেতর থেকে একটা কোদাল এনে মাটি কুপিয়ে আবার নতুন করে গর্ত করে। ভাদর মাসের রোদে মাথা সিন সিন করে। বিমলাও গতর গলানো রোদে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে।

     # # #

    সেদিন খুচরো খদ্দেরের ঝাঁকটা সামলিয়ে যাদবলাল বসে বসে ভাবছিল, জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কথা। কেমন এই ক’দিনেই নুন তেল চালের দাম হু হু করে বেড়ে গেল। খদ্দেররা এসে গল্প করে আগে নাকি একশ টাকা নিয়ে বাজারে বেরোলে ব্যাগ ভরে যেত এখন সেটা পাঁচশ দাঁড়িয়েছে।

    কারখানার ঝোঁপেঝাড়ে কাশফুল ফুটেছে। আশপাশে এ পাড়ায় ও পাড়ায় মানুষের মনে উৎসবের রঙ। বাড়ি, দরজা জানলা গ্রিল সব ঝাড়পোঁছ করা, আলকাতরা দেওয়া, রং করা শুরু হয়েছে। যাদবলালও লেগে পড়েছে গোছগাছে। সারা বছর তো হেথা হোথা করে সব ফেলেঝেলে রাখা হয়। কোথায় কোন জিনিস পড়ে আছে। কত আবজগাবজ জিনিসপত্রের জঞ্জালে ঘর অগোছালো। ছেলে সুমন পড়াশুনা শেষ করে এখন কাজের চেষ্টায় উঠেপড়ে লেগেছে। এটা ওটা করে কম্পিটিশনে বসছে। যদি একবার ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। সুমনকে যাদবলাল কোনও কাজে ডাকে না। যদি বাড়ির কাজ করতে গিয়ে পড়াশুনার ক্ষতি হয়। নিজেই নেমে পড়ে নাক মুখ মাথা বেঁধে। টানা এ ঘর সে ঘরের কাজ শেষ করে প্রায় সাজিয়ে গুছিয়ে এনেছে। বারান্দা থেকে সামনের রাস্তা দেখে যাদবলাল থমকে দাঁড়ায়। মনে পড়ে পুজোর সময় এই রাস্তা কত জমজমাট থাকত। বিশ্বকর্মা পুজো থেকে শুরু হয়ে দুর্গা পুজো কালী পুজো পর্যন্ত গমগম করত। কত লাইট কত মাইকের গান, আর কত মানুযের আনাগোনা। আর এখন! কুকুর বেড়ালেও দুপুরবেলা যেতে ভয় পায়। যাদবলাল দাঁড়াবার শক্তি পায় না। ঠিক তখনি বিমলা লিকার চায়ের কাপটা হাতে ধরিয়ে বলে, ”কি গো শরীর খারাপ করছে?”

    এমনিতে  কারখানার কাজ বন্ধ হওয়া বছর আটেক হয়ে গেছে। বয়স তো ফ্যাক্ট করেই। বেশি পরিশ্রম শরীরে আর নেয় না। জানিয়ে দেয়। কিন্তু এখন শরীর নয়, মনে বিমর্ষতার ছাপ। বলে, ”জানো চিনিকলের ওপাশে সদাইদার বাড়িতে চুরি হয়েছে। আর যাবার আগে সদাইদার পা দুটো ভেঙে দিয়ে গেছে। বৌদিরও নাকে মুখে ফ্র্যাকচার।  আটকাতে গেছিল।”

    বিমলা কথাটা শুনে আরও বিমর্ষ হয়। বলে, ”এভাবে আর কদ্দিন! পাড়াটাতে তো এরকম ছিল না। যাব কোথায়?”

    ”আরও হবে । কাজকম্ম নেই, অথচ চাহিদা আছে। ভোগের চাহিদা।” যাদবলাল অন্যমনস্ক হয়ে চায়ে চুমুক দেয়, বলে ”সুমন পৌঁছানোর খবর দিয়েছে?”

    বিমলা ঝামড়ে ওঠে, ”বুড়োর ভিমরতি ধরেছে। এখন পৌঁছাবে নাকি? পৌঁছালে ঠিক খবর দেবে।”

    সে বিড় বিড় করে, ”যাক যাক। পরীক্ষা দেক, একটা পাকাপোক্ত চাকরি অন্তত সে জোটাক। তাহলে অন্তত আমার মত মাঝ পথে পথ হারাতে হবে না।”

    সে রাতে আর ঘুম এলো না। এমনিতে অবশ্য আগের মত শুয়ে শুয়ে ঘুম আসে না । নানান চিন্তা মনের ময়দানে ছুটোছুটি করে। কে প্রথম উঁকি দিতে পারে। আগে হলে হয়ত সেভাবে সদাইদা আর বৌদির কথা নিয়ে চিন্তা হত না। সেই সকাল থেকে মনের মধ্যে শুধু এক ভাবনা, কী করে হল এইসব? তেমন যে টাকাকড়ি আছে তাও না। ভদ্র মিশুকে বলেও পাড়াতে সম্মান পায়। তা সত্ত্বেও! আসলে এগুলো কোনও চোরের চুরি নয় –অভ্যাস। লোককে অতিষ্ঠ করে তোলা। মানুষের মনে বিশ্বাস ভালোবাসা সব চুরি করে নেওয়া। মানুষের এত যত্ন করে রাখা সত্ত্বেও কোথায় যে সে সব হারিয়ে গেল! এভাবেই কি সব কিছু হারিয়ে যায়! চোখের সামনে থাকতে থাকতে একদিন চোখের আড়ালে চলে যায়। নিমেষে। জানতেও পারে না।

    মাঝে মাঝে সুমনের ভবিষ্যৎ চিন্তাও মনে সজোরে ধাক্বা মারে। কী যে করবে ছেলেটা! দিনকাল যা পড়েছে।

    তখন একটা সময় ছিল। একটা দুটো পাশ দিলে ডেকে ডেকে চাকরি। পুলিশ, স্কুলমাস্টারের চাকরিকে অবস্থাপন্ন চাষি পরিবারের লোকেরা আমলই দিত না। বড় মুখ করে বলত ঘরে যা আছে, তাই–ই খাবার লোক নাই আবার পরের দোরে চাকরগিরি। তবু একদিন পাড়ার এক দাদা এসে বলল, একটা কাজকম্ম করে ভালো দেখে মেয়ে আনতে হবে তো। যাদবলাল অবাক। সুবোধদা বলে, –”চাকরি করবি? ভালো চাকরি। সরকারি।”

    ”বেশ কয়েক দিন হয়ে গেছে আমুদপুরের রেল লাইনের ওদিকে একটা চিনির কল হয়েছে। খুব শিগগির প্রোডাকশন শুরু হবে। ভালো কর্মঠ বিশ্বস্ত ছেলে নিচ্ছে। রাজি আছিস তো বল।”

    যাদবলালের সম্মতিতে তৎক্ষনাৎ একটা সিগারেটের ছেঁড়া প্যাকেটে ওর নাম ঠিকানা লিখে নীচে সহি করে দিলেন। বললেন, ওখানে রহমতুল্লা বলে একজন থাকবে তার হাতে দিলে চাকরি পাকা।

    সুবোধদা পার্টির লোক। সত্যি বলবে কি!

    যাদবলাল তবু সুবোধদার কথা মতো চিরকুট নিয়ে গিয়ে রহমতুল্লার হাতে দিতেই চাকরিতে জয়েন হয়ে গেল। রতনের গড়গড় করে মনে পড়ছে সব। আসলে সে ঐ দিনগুলোকে কোনওদিনই ভুলতে পারে না। মনের কোণে তো নয় শরীরে প্রবাহিত রক্তের সঙ্গে অঙ্গ প্রত্যঙ্গে ঢুকে গেছে। নটকোনার দোকানে বসে বসে কোমর পিঠ যখন টন টন করে ওঠে, কিংবা কোনও খদ্দের এসে মাল খারাপের কারণ দেখিয়ে গালমন্দ করে তখন ধারালো ফলার মত সেই সব দিনগুলো সর্বদা খোঁচা মারে।

    বাষট্টি তেষট্টি সালের শেষ। একদল চাকরিতে ঢোকা নতুন ছেলে। কাজ করার কি আনন্দ! ভোঁ ও ও করে বাঁশি বেজে উঠলেই সকলে মিলে ছোটে। শুরু করে কাজ। আখ আসে লরি লরি। তারপর সেই আখের বান্ডিল ছাটাই –কাটাই – পেষাই –প্রোসেসিং। আহা, সোনার দিন! তারপর বিয়েসাদি ছেলেপুলে। সকলে মিলে কাছাকাছি। জায়গা দেখে বাড়িঘর তোলা। দেখতে দেখতে পাড়া হয়ে ওঠা – কলপাড়া। গ্রাম থেকে উঠে আসা নতুন কলোনিতে সবার ছেলেপুলে নিয়ে সংসার। সকালে উঠে কাজে যাওয়া, সন্ধ্যায় ফিরে আসা। তারপর আবার রাত ন”টা-দশটা পর্যন্ত বন্ধুদের নিয়ে  আড্ডা। নোটন ভানু পটল রাজু সোমনাথ কত সব। কত তাড়াতাড়ি সে সব সুখের দিন পেরিয়ে যায় ।

    এরই মাঝে সবার চোখের আড়ালে দিনের দিন লরি আসা কমতে থাকে। তারপর একদিন খবর আসে এই কারখানা আর মাসখানেকের মধ্যে লক হয়ে যাবে। সরকার কারখানার ওপর থেকে ইললিজিবিলিটি তুলে নিচ্ছে। কলটাকে আর গভর্নমেন্ট আন্ডারটেকিং বলা যাবে না।

    দিন যত পেরোতে লাগে স্থায়িত্বের শেকড়বাকড় আলগা হতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে কর্মচারীদের একসঙ্গে জোড়ালো    প্রতিবাদের মঞ্চ তৈরি হয়। ইউনিয়ন – ইউনিটি ওদের তখন পাখির চোখ। অফিস আদালত নেতা মন্ত্রী কোনওটাই বাদ থাকল না। তারপর কবে যে আচমকা শো পুরো শেষ হওয়ার আগেই মঞ্চে ড্রপসিন পড়ে গেল! তখন সামনে অন্ধকার। অসহ্য ঘুটঘুটে অন্ধকার।

    শরতের মাঝামাঝিতেও কেমন গুমোট গরম। যাদবলাল জানলার পর্দাগুলো সরিয়ে দেয়। যদি একটু আধটু উত্তুরে হাওয়া আসে। ট্রান্সফর্মারে ওদের লাইনে কোন ফেজ কেটে গেছে। সে অনেকক্ষণ জানলার ধারে কারেন্টের জন্য অপেক্ষা করে করে এক সময় হাল ছেড়ে দেয়। বিমলা ঘুমোচ্ছে। সে বিমলার পাশে শুয়ে পড়ে। ঘুমোবার চেষ্টা করে। একসময় ঘুমিয়েও যায়। ঘুম ভাঙে ঝপাৎ করে কোনও কিছু পড়ার শব্দে। যাদবলাল কান খাড়া করে থাকে কিছুক্ষণ। শব্দটা কোত্থেকে এলো ঠাওর করতে পারল না। ঘুম জড়ানো চোখে দেয়ালঘড়িটা দেখার চেষ্টা করল। কাঁটাগুলো দেখতে পেল না।  ঝুপ করে তক্ষুনি আরেকটা শব্দ হতেই সে জানলা থেকে দেখল একটা ছায়ামূর্তি পাঁচিলের গা থেকে নেমে অদূরে রাস্তায় দাঁড়ানো ছ’সাতজনের দলে মিশে গেল। বিস্মিত চোখে এদিক ওদিক তাকাতেই লক্ষ্য করে পেঁপে গাছটার মাথাটা মাটিতে পড়ে। শুধু মাথাকাটা শরীর নিয়ে অর্ধেক গাছ একলা দাঁড়িয়ে ।

    # # #

    চিনির কল বন্ধ হয়ে যাবার পর কিছুলোক আধা দামে ঘরবাড়ি বেচে আবার যে যার গাঁয়ে ফিরে গেছিল । বেশিরভাগ কর্মচারী অবশ্য এধার ওধার কি্ছু একটা কাজ জুটিয়ে নিয়ে ওই কলপাড়াতেই থেকে গেছিল। কেউ মোড়ের ধারে চায়ের দোকান, লটারির কেবিন, বাস ট্রেনের হকার। কেউ বা টিউশন ধরে কোনও রকমে কুঁথিয়ে কুঁথিয়ে  গোছানো সংসারটার একই গতি ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে।

    সে সময় বড় দুঃসময় ছিল। চলন্ত গাড়িতে হঠাৎ ইঞ্জিন বিগড়ে গেলে গাড়ি যেমন গতি হারিয়ে যায়, জীবনটা যে চলন্ত এক গাড়ি, সবসময় একই গতি ধরে রাখা কঠিন, যাদবলাল সেই তখন থেকেই বুঝে গেছিল। ঠেকে বুঝেছিল। তবে সবচেয়ে বড় কথা ঐ ডুবন্ত অবস্থায় যে কজন ওখানে থেকে গেছিল তারা কেউ সঙ্গ ছাড়েনি। কাজের চাপে সকাল থেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও সন্ধ্যার সেই আড্ডাটা আজও আছে।

    শুধু আছে নয়, আছে বলেই ওরা ভুলে গেছে সেই যন্ত্রণাকাল পেরোনোর যন্ত্রণা। এই বুঝি কর্ম জীবনের ছেদ পড়বে। এই বুঝি কারখানার মেন গেটে বিশাল তালা বলবে, থামো। এবার তোমাদের চলা বন্ধ। তোমরা এই কারখানার বর্জ্য। তোমাদেরকে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

    সাতান্নোর কোঠায় পা দেওয়া যাদবলাল প্লাসটার চটা ইটের ধারিতে শরীর ফেলে দিয়ে খাঁ খাঁ আকাশের দিকে চেয়ে থাকে, যতক্ষণ না ঐ মৃত কারখানার বাসি গন্ধ না আসে। একটা দীঘল কালো ছায়া ওকে জড়িয়ে ধরে। যাদবলাল আসমানের রাতচরা পাখি হয়ে ওই কারখানার চারপাশে ঘুরে বেড়াতে লাগল। আর ওর সেই হকার চা ওয়ালা লটারি ওয়ালা টিউশন মাষ্টার বন্ধুরা তখন পাড়ায় চোর ছ্যাঁচড়ের উৎপাতে জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে, তাই জোর হল্লা। একটা তো ব্যবস্থা করা খুবই দরকার। তা না হলে মেয়ে বউ নিয়ে পাড়াতে টেকা যাচ্ছে না। মুশকিল হল গিয়ে চুরি ফুরি যা করবি করবি, ঘরের নিরীহ লোকগুলোকে যাচ্ছেতাই ভাবে পেটাবি?

    কথা হয় পুলিশি প্রচেষ্টারও। তবে ওরা নাকি ধুরন্ধর।

    – ”ওই তিলে বজ্জাত গুলোর কি বুদ্ধির অভাব আছে। পুলিশের গাড়ির শব্দ যেই মিলিয়ে যায়, ওমনি ওদের আবির্ভাব ঘটে।” কে যেন বলে।

    – ”যত নষ্টের মূল ওই কারখানাটা।” নোটন দাঁত খিচিয়ে ওঠে। ”দেখ দেখ ওদিকে একবার। লাইট নেই লোক নেই শ্মশানের অন্ধকার নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।”

    যাদবলাল চোখ মেলে তাকায়। ভাঙাচোরা কারাখানাটা মৃত্যুপুরীর মতন গুম মেরে আছে। মুখ খুললেই যেন শত শত মানুষের দমচাপা গোঙানি একসঙ্গে হা হা করে বেরিয়ে আসবে। অথচ এই তো সেদিন …যাদবলাল যেন দেখতে পায়, অদূরে আমবাগান। বাগানের মাঝে ছায়াছেটানো কালো জল। তার ওপাশে প্রাচীর। সেই প্রাচীরের গোড়া ঘেঁসে সরু বাঁধানো রাস্তা। ধারে ধারে আখ বোঝাই লরি আর লরি। গোগ্রাসে গিলছে আখের বান্ডিল। রাস্তা দিয়ে টর্চ জ্বেলে জ্বেলে হাঁটছে পাঁড়েজি। বড় বাঁশের লাঠি দিয়ে রাস্তা ঠুকে ঠুকে চলছে …ঠক ঠক ঠকাস ঠকাস।

    যাদবলাল বিড় বিড় করে, ”কে জাগে —, কে–? তফাৎ যাও …।”

    # # #

    বেশ কিছুদুরে থানা। মাইল তিনেক হবে। সেখান থেকে ঢং ঢং করে আটবার ঘণ্টা বাজলে রতন মোবাইল ফোনটা মিলিয়ে নেয়। ডিজিট্যাল নম্বরও আটটা পেরিয়ে গেছে। জামা প্যান্ট পড়ে খাওয়া দাওয়া সেরে নিয়েছে অনেক আগেই। হাতে কাঁচা বাঁশের লাঠি, যেটা সকালে মাইল খানেক দুরে ক্ষিদেরডাঙা থেকে বানিয়েছে। তাতে সরষের তেল মাখিয়ে হালকা আগুনের ছোঁয়া দিয়ে আরও শক্ত করে। লোকাল পুলিশ স্টেশন থেকে পাওয়া গোটা ছয়েক বাঁশি আর হাতে তিনসেলের টর্চ। সুইচ অনের সঙ্গে সঙ্গে গোটা ঘর ঝকমক করে ওঠে। যাদবলালের মুখে হাসি ঝলকে ওঠে।

    পাড়াতে সুরক্ষা কমিটি হয়েছে। যাদবলাল তার হেড। থানা থেকে বার বার অনুরোধ করেছে, ”আপনারা সুরক্ষা কমিটি করুন আমরা আছি। আপনারা আপনাদের সুরক্ষার একমাত্র হাতিয়ার। এগিয়ে আসুন। আপনাদের পরিবার নিশ্চিন্ত থাকবে। দায়িত্ব আমাদের।”

    বিমলা বলে, ”ওরা তো ব’লে খালাস। তোমরা ওই কটা বুড়োতে কী করবে?”

    যাদবলাল কোনও উত্তর করে না। সে বিমলার দিকে চেয়ে থাকে। বিমলার চোখেমুখে উদ্বেগের ছায়া।

    বিমলা আবার বলে, ”ওরা একা নয়, দলে অনেক।”

    যাদবলাল মনে মনে গরম জলের মত ফোটে। ”এখন যদি ঘরে চুপ করে বসে থাকি, আর কোনওদিন শিরদাঁড়া উঁচু করে রুখে দাঁড়াতে পারব না। এই সুযোগ।” সে অনেকদিন পর আবার সেই চিনিকলে ডিউটি ধরার জন্য ছটফট করে। আবার রাইট টাইমে বেরোতে হবে। আবার একসঙ্গে। হোক না চৌকিদারি। না থাক মাসমাহিনা। এইমাত্র মিলের ভোঁ বেজে উঠল হয়তো। বাঁ হাতে টর্চ, ডান হাতে বাঁশের লাঠি আর মুখে বাঁশি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে যাদবলাল। রাস্তায় ওর সেই পুরনো দিনের সঙ্গীরা। ভানু সোমনাথ রবি সবাই।

    দরজায় দাঁড়িয়ে বিমলা দেখে মুদিখানার দোকান দেওয়া মেজাজ বিগড়ানো একটা লোক, জীবনযুদ্ধে ছিটকে যাওয়া ওদের গাঁয়ের সেই নিমু চৌকিদার। যার আর গাঁয়ে গঞ্জে দরকার নেই। একটা সময় ছিল গ্রাম পাহারা দিত। এখন ওই পোষ্টটাও সরকার তুলে দিয়েছে। অথচ কোনও রাত সে ডিউটি যেতে ভুল করে না। হাতে সেই টিমটিমে লন্ঠন। আর অন্য হাতে লাঠি। মুখে বাঁশি। বাজিয়ে বাজিয়ে পাড়াগাঁ আগল দেয়। লোককে বলে ভয় নেই। আমি আছি। জীবনে বহুকথা  উচ্চারণ করা ওই গলা হেঁকে ওঠে –”কে আছ ওখানে … কে?”

    বিমলা অনুভব করে, আজ যে লোকটা শত ঝুঁকি নিয়ে রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে গেল, এ তো শুধু বেঁচে থাকার জন্যে নয়। এই যুদ্ধে যাওয়া পরম্পরাকে নিশ্চিন্তে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদ। বিমলার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।

    যাদবলাল বাঁশিতে ফুঁ দেয়। ফ্রুউউ ফ্রুউউ। মুখর্জিবাবুর বাড়ি থেকে ওদিকে মাঠের ধার। আর ওই অলিফবাবা মসজিদ থেকে এ পাশে চিনির কল। ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় রাতভর। আবার সে খুঁজে পায় বেঁচে থাকার শর্ত। নতুন কাজ। নতুন দায়। বুকের ভেতর জমে থাকা রক্ত চাপের মতো এতদিনের হতাশাগুলো প্রতি বাঁশির সুরের সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে –– আর কি ওই চিনি কল খোলা যায় না? আর কি আগের মত পোঁ করে কারখানার হুইশ্যাল বেজে উঠতে পারে না?  হয়তো অন্য কল অন্য কিছু। যাতে আমাদের ছেলেপুলেগুলো অন্তত ঘি নুন ভাত খেয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে পারে। যাদবলাল আরও জোরে জোরে বাঁশিতে ফুঁ দেয়। বাঁশি বেজে ওঠে ফ্রুউউ ফ্রুউউ ফ্রুউউ

    সেদিন সকাল সকাল ঝটপট করে বিমলা যাদবলালকে বিছানা থেকে টানতে টানতে উঠোনে নিয়ে আসে। ”দ্যাখো দ্যাখো, আমদের পেঁপে গাছে তিন তিনখানা ফ্যারাঙ বেরিয়েছে।” বিমলা খুশিতে হাততালি দিয়ে লাফিয়ে ওঠে। ”বলেছিলাম না, বল তোমায় বলেছিলাম না…” বিমলার চোখ চক চক করে ওঠে। যাদবলাল রাতজাগা চোখে দেখে, সত্যি সত্যি সেই মাথাকাটা পেঁপে গাছটা যেটা একদিন মরেই গেছিল, সেই গাছের গায়ে কচি কচি পাতা গজিয়েছে ।

    চিত্রকর : মৃণাল শীল 

    আরও একটি গল্প। শুনুন লেখকের মুখ থেকে।

    চন্দননগরের ‘গল্পমেলা ‘ গল্পের লেখক ও পাঠকদের কাছে সুপরিচিত একটি নাম। গত সাত -আট ডিসেম্বর চন্দননগর রবীন্দ্রভবনের জ্যোতিরিন্দ্র সভাগৃহে অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাদের বার্ষিক অনুষ্ঠান। এবারের ‘গল্পমেলা ‘ -র মিডিয়া পার্টনার ছিল “দ্য ওয়াল ‘। সেই অনুষ্ঠানে পঠিত চারটি সরস গল্প ‘দ্য ওয়াল ‘ -এর পক্ষ থেকে সরাসরি রেকর্ড করা হয়। ‘দ্য ওয়াল ‘ -এর গল্পের পাতায় পাঠকের সামনে এবার উপস্থিত করা হচ্ছে সেইসব গল্প যেখানে পাঠক জনপ্রিয় লেখকদের দেখতে পাবেন এবং তাঁদের মুখ থেকেই শুনতে পাবেন তাঁদের গল্প। ‘গল্পওয়ালা ‘ বিভাগে প্রতি রবিবার যে গল্প প্রকাশিত হয় তার সঙ্গেই পাঠকদের জন্য সংযোজিত হল এই উপহার।

    আজকের গল্প: দাঁত 
    লেখক : তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

    এবার আরও এক 'গল্পওয়ালা '। লেখকের মুখ থেকে সরাসরি শুনুন গল্পপাঠ।

    এবার আরও এক 'গল্পওয়ালা '। লেখকের মুখ থেকে সরাসরি শুনুন গল্পপাঠ।গল্প : দাঁতলেখক : তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

    The Wall এতে পোস্ট করেছেন রবিবার, 5 জানুয়ারি, 2020

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More