বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১২
TheWall
TheWall

পেইনকিলার

মুর্শিদ এ এম

একহাতে কাগজের চায়ের কাপ আর অন্য হাতে বিস্কুটের বয়াম। রাস্তা পেরোবে টুনু। ওপারের দোকানে রেগুলার চা দেয়ার এই এক নিয়ম। টুনু পা ফেলছে ট্যারা ট্যারা। কোমরে ব্যথা লেগেছে। ব্যথা খুব। মালিশ-ফালিশে কাজ হয়নি। পেনকিলার খেয়েছে। খানিক আরাম। কিন্তু একটু এদিক-সেদিক হলেই চাগাড় দিচ্ছে ,সে আছে। যায়নি।

কী করে লাগল?

তপু বলে, কাকলি। এই বয়সে কাকলি! ঠেলা বুঝতে হবে না? বোঝো এবার। কাকলি হল ডাইনি। দিনে দুপুরে ব্যাটাছেলেদের কাত করে ফেলে, রাত হলে তো কথাই নেই! ভয়ংকর।

তা, টুনুর বয়েস হলে কি আর দোকান ঠেলতে পারত? দোকান যখন ঠেলতে পারে কাকলিকেও ম্যানেজ না-করার কী আছে? টুনুকে দোকানদার বলাই সংগত। চা-অলা আর বলা যাচ্ছে না। সেখানে একচিলতে নাকি রাজনীতি ঢুকে গেছে। ঠিক আছে বললুম না। টুনু এখন দোকানদার। সবাই বলছে। আপনিও বলুন।

বিপিনদা চা চেয়েছিল। জিজ্ঞেস করল, কীরে খোঁড়াচ্ছিস কেন?

সেই একই প্রশ্ন, একই উত্তর।

ভালো কোনো অর্থো দেখা। কোমর তো? স্পাইনাল কর্ড ধরে নেবে। দেখিস!

টুনু মানে বোঝে না। বিপিনদা পার্টি করা লোক। দিনরাত নানা কথার মারপ্যাঁচ কষা হচ্ছে মগজে। পাবলিক নিয়ে কাজ। পাবলিকের বোধগম্য করে কথা বলা প্র্যাকটিস করে চুল পাকিয়ে ফেলেছেন।

টুনু হাঁ করে কিছুক্ষণ। মাথা হেলায়, হাসপাতালে গেছলুম তো।

বিপিনদা অসন্তোষ ব্যক্ত করেন, চিকিৎসা ব্যবস্থায় নাভিশ্বাস, বুঝলি। ভালো ডাক্তার পাবি কোথায়? সব প্রাইভেট প্র্যাকটিসে ঢুকে গেছে। আর ব্রিলিয়ান্ট স্কলাররা তো বিলেতের খাদ্য। হুঃ!

টুনু এসবে ব্যথা কমার লক্ষণ খুঁজে পায় না। সে ফেরে। আবার রাস্তা পেরোতে হয়। একে কোমরের এই অবস্থা তার ওপর যদি কেউ ধাক্কা দিয়েছে তো অক্কা। টুনুর দোকানের পেছনে সরু গলি। মুখপাতটা ওর আলোয় আলোকিত। ভেতরে অন্ধকার। সেখানে অনেক কিছু করা যায়। সেসব করার অবশেষ পড়ে থাকার সুযোগ আছে। সকালে করপোরেশনের সদানন্দ এসে হুমকি মারে, এভাবে চলতে পারে না। এই নোংরা আবর্জনা সরাতে হবে। নইলে কেস দোবো। নাও সই করো।

কিসের সই?

ভিজিট করে গেলাম, তার ডকুমেন্ট। দে ভাই, সই দে।

সদানন্দই রাতে টুকুস করে। ওই গলিতে। সেখানে বহুত কিছু করা হয়। বাংলাবাদীরা, চুমুকবাদীরা, কাকলিবাদীরা। দুনিয়া পালটে দিতে পারে যে কোনও সময়।

কাকলি উবু হয়ে বসে ফুটপাথে। ঝাঁকায় কয়েকআঁটি মরা কলমি। গোটাচারেক পাতি লেবু। একছড়া কাঁচকলা। সারা গায়ে কাকলির চোয়ালের মতো মেচেতা। কাকলির কপালে ভুরুর পাশে চিবুকে বড় কালশিটে। গারনিয়ের লাইট অ্যাপ্লাই করতে পারেনি। এক সপ্তায় স্পট-ছোপ হাপিস হয়ে যেত। থাকবে মনে হয়। রয়ে যাবে দাগগুলো। পুরুষের দাপটের দাগ। বাইরে দেখা যাচ্ছে বলেই, নয়তো লুকোনো কত দাগ কেউ বয়ে বেড়ায়। দাগ আড়াল করে না কাকলি। কে দাগ দিয়েছে জানাতে যায়। জানতে দেয় জগতকে। চরু। ওর বিয়ে করা বর। সপ্তায় একবার করে ফেরে শহরে। সারা মাস কী খেয়ে থাকল না-থাকল খোঁজ নেই। কী করবে খোঁজ নিয়ে! মেসিন ফাংশান করলেই হল। পেপারে বেরিয়েছে, জগাদা বলছিল, যেখানে খিদের জ্বালা, সেখানেই বেশি পয়দা। সে সারা সপ্তাহ গাড়িতে। স্টিয়ারিং–এ। আকণ্ঠ খেয়ে ফুটে গড়াগড়ি। ভোর। অস্বচ্ছ, কালো, কম আলোর পৃথিবী। কম আলোয় কালো ঘোর অতি মেসিন। কাকলি এখনও সিঁদুর পরে। তাকিয়ে থাকে টুনুর পানে।

তাকিয়ে থাকে আর মলিন হাসি নিয়ে হাসে। নিয়তই সে হাসি। টুনু যদি ওর সঙ্গে পাকাপাকিভাবে থেকে যেত! ওর দিন আনি দিন খাই-এর লফড়া মিটে যেত তাহলে। গোলমাল ছিল, আছে। থাকে নানারকম গোলমাল। একেক জগতের একেক গোলমাল। কাকলির যার সঙ্গে বিয়ে হয়নি অথচ সংসার খরচা দেয়, অমু। এতদিন অমুই এটা সেটা কাজ ধরে দিত। এখন দেয় টুনু। টুনুর সঙ্গে বেজায় হল সেদিন। টুনু আর অমু। কামড়া-কামড়ি, জাপটা-জাপটি। দুজনেই কঙ্কালসার। হাড্ডি হাড্ডিতে লড়াই। তোমার মনে হল সেয়ানে সেয়ানে। দেখো, কোনও ডিস্ক্রিমিনেশন নিয়ে কথা হচ্ছে না কিন্তু। প্রবল প্রতাপিত ট্রাম্প আর ওভারট্রাম্প নিয়ে হচ্ছে না। যেটা হয়, ঘটে। কুকুরের মতো তাদের লড়াই। কিছু মানুষ, যারা যে কোনও মুহূর্তেই কুকুর-মহিমায় কনভার্ট করে যেতে পারে, তারা দাঁডিয়ে দাঁড়িয়ে উপভোগ করছে। কেউ ভিডিয়ো তুলছে মনে হল না। সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক এক লড়াই, কার কী দরকার? গোমাংস বা রাম হলে কথা ছিল। ভাইরাল করা। বেশ। কাকে নিয়ে শোবে তার লড়াই। ডিসিশনটা কাকলির না, দুই কঙ্কালের।

তো জিতে ঠিক গেল না কেউ। মানে একতরফা, আমিই শেষ কথা, যা বলব সেটাই গণতন্ত্র— এমনটা হল না। রফা। কাকলি ফাইনালি বলল, টুনু। যদিচ টুনু আটান্ন আর অমু বিয়াল্লিশ।

বীরেন ডেকে জিজ্ঞেস করল, তোর ওভিজ্ঞতার দাম, বুজলি? তোর কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিস গড়পরতা বাঙালির চাইতে খানিক সরেস।

কীরম? গদগদ টুনু। হাতে কব্জির কাছে পট্টি। কপালে শুকনো মারকিউকোর্ম-এর সার্জিকাল অ্যাটাকের জয়-মেডেল।

তোর ফ্যামিলির কথা ধর। তিন ছেলে, তিন মেয়ে, বউ। নাতি নাতনি…। এক নাতনিরও বিয়ের কথা চলছে।

হ্যাঁ, ওই হয়েছে ওপরঅলার দয়ায়।

এবার কিছুটা টেরা চাউনি বীরেন, ফ্যামিলি প্ল্যানিং তোদের করতে নেই, তাই সব ওপরঅলা- প্ল্যানিং। তা কাকলিও কি ওপরওলার নেক্সট এস্টিমেটে ধরা আছে?

টুনুর হাসি থেমে গেল। একটা জাত-বেজাতের গন্ধ যেন বীরেনদার কথায়। রাগল না। টুনুর রাগতে নেই। বীরেনদার মতো বা নরেনদার মতো লোকের কথাতে তো  নয়ই। নরেনবাবু বলেই দিয়েছে, এ দেশ থেকে কিছু লোককে তাড়িয়ে দেয়া হবে। কী কার্ড যেন দেখাতে পারলে রেহাই। টুনুর বাপের ছিল বোধহয়। ওর থাকবে কীভাবে? ঘর থেকে বাপেও তো ওকে তাড়িয়েছে জারিনাকে বিয়ে করার পর। জারিনার ধর্ম নিজের বলে চালানোর পর।

বলল, না না ও তো রাঁড়, ওরে ঘরে নোব কী করে?

কেন? দুটো তিনটে করে তো। তুইও পারিস! সিঁদুর পরে বলে? মুছে দিবি। নাম পালটে…

না না, বলছি কী, ও তো…। আরেকবার রাঁড় শব্দটা বলতে পারল না। কেন পারল না? বলল, ওর বর ছাড়বে?

ওব্বাবা, এ যে রাধাকেষ্টর পিরিত দেখছি! তা এক কাজ তো করতে পারিস। আগের জায়গায় ফিরে যা না। মা-ভাই বেঁচে, গিয়ে হাতে-পায়ে পড়ে বল, দেখবি বিষয়-সম্পত্তি থেকে শুরু করে স-ব পাবি। তোকে আর চা বিক্রি করে সংসার চালাতে হবে না।

কাকলির মাথায় দুপুর নামে। ঝাঁকায় রোদ্দুর খেলতে থাকে লেবু-লংকা নিয়ে।  হঠাৎ হঠাৎ রাস্তা খালি। টুনু লেংচে ঝাঁকা সরিয়ে নেয়। গলির অন্ধকারে রেখে দেবে। একটা প্ল্যাস্টিকের ক্যারি ব্যাগ। টুনুর হাত থেকে কাকলির হাতে ট্রান্সফার হয়। কাকলি আঁচল সরিয়ে নাতিশিথিল স্তনের দু-ফাঁকে ঢুকিয়ে তাকায়। টুনু গম্ভীর। অস্বাভাবিক চুপচাপ।

ইশারায় বলে, শ্যামচাঁদের বাড়ির কাছে…

কাকলি মাথা নাড়ে।

যা ভয় করেছিল টুনু! একটু আগে হলেই কেস খেয়ে যেত। এল মেয়ে-জামাই। তাদের তীক্ষ্ণ নজর রাস্তার ওপারে, কাকলি। কাকলি ততক্ষণে সিসিটিভির সারভিলেন্সের বাইরে। কীভাবে যেন টুনুর সবাই জেনে গেছে কেস। মেয়ের হাতে ধরা চারবছরের নাতিটা। প্রহ্লাদ বাছাড়। বাপের টাইটেল। মেয়ের সিঁথিতে সিঁদুরের জ্বলজ্বলে।

কী খাবি রে ভাই, প্রহ্লাদ?

নাতি নানা-ভাইয়ের হাতে হাত রাখে—চিপস দাও। কোলরিং? খাবো।

চ, বাড়িতে চ। তোরা এখেনে দাঁড়া মোমেনা, ওর জন্যি চিপস নে আসি।

প্রহ্লাদের বাবা বউয়ের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায়। মাগিটা এতক্ষণ ছিল যেন মনে হয়! পচা সেন্টের বাস!

ছাড়ো তো। তুমি জামাই মানুষ, তোমার তাতে কী?

মানসম্মানের ব্যাপার আছে না? এর ফল তোমারে ভুগতে হবে বলে দিলুম। বংশের রোগ ওসব। আমাদের বাবা-কাকাদের মধ্যে ওই নচ্ছারমো দেখেছ কখনও?

নচ্ছারমো কী বাবা? প্রহ্লাদ জিজ্ঞেস করে। তার নজর হেলতে দুলতে আসা নানা-ভাইয়ের পথে।

হঠাৎ রাস্তায় একগাদা গাড়ি রিকশা মানুষের জট আর রোদ্দুরের আঠা লেগে এলাকা দাঁড়িয়ে যায়। এর মাঝে কোথায় বংশ কোথায় জাত কোথায় ভোগান্তি। সূক্ষ্মভাবে সেসব যেন পোকা, কেউ খুঁচিয়ে দেখলে, আলমারিতে ডাঁই থাকা উইয়ে ধরা বইয়ের ভেঙে পড়া সাম্রাজ্যের মতো।

প্রহ্লাদের মা-বাবা রিকশায়। সাইকেলের পেছনে প্রহ্লাদকে বসিয়ে বাড়ির দিকে টুনু। জিন্দেগি এক সফর হ্যায় সুহানাঁ আঁ আঁ আঁ…

অমু ছেঁড়া মাদুরটাকে সরিয়ে মাটিতে রাখা ইঁটের ওপর বসে কাকলির সঙ্গে।

টাকা দে…

আরে, আমার কথাটা শুনবি তো।

তোর কথা শুনে কোনও লাভ নেই। আগে বাকি টাকাক’টা ফ্যাল, তারপর… এক্ষুনি নাইলে টুনুরে ডাকব।

উঁহ, খুব যে! এইবার আমার সাথে লাগতে এলি এন্ডা ফেটিয়ে দোবো। শোন, যা বলি ভালো করে শোন। পোমোটার ঘুরঘুর করচে চাদ্দিকে। তোদের এ-বস্তিও আগুন লাগল বলে! ত্যাখন বাঁচবি? কে? ওই টুনে? ওই কাটা-টা?

অ্যাই, একদম কাটা-ফাটা বলবিনে।

কেন? প্রশ্নটা করে একটু দমে যায় অমু। সে তো সত্যিই জানে না টুনুর ভেতরে কী হয়ে আছে। যাকগে, কাজের কতা…সরকার গীহঋণ দিচ্চে। লাখের ওপর। তুই যাতে পাস, সে ব্যবস্তা করেচি। কাল বাদ পরশু এক বাবুরে নিয়ে আসব, কাগজপত্তর, মানে ভোটার কাড, র‍্যাশন কাড, আঁধার –এইসব। গুচিয়ে রাকবি।

সে কি খালি কাগজপত্তর দেখবে, না অন্য কিচু?

দাঁত বার করে হাসি, অমু। তাইলে তো চটপট কাজ হাসিল, হ্যাঃ হ্যাঃ!

বেরো, বেরিয়ে যা ঢ্যামনা কোথাকার।

উঠে পড়তে হয়। অমু দাঁড়িয়ে মুখ বেঁকিয়ে— ও, একন গতরে তাইলে তালাচাবি? শুধু টুনু ?

সে আমার ব্যাপার। টাকাটা দে যাবি বলে দিলুম।

এত কিছু করার পর, লাখের গল্পের পর সামান্য টাকার কথাটা কিছুতেই ভোলে না কাকলি, কেন? বাইরে অজস্র আলো, চোখধাঁধানো, সাদা আকাশ, পরিচ্ছন্ন শহরের শীৎকার, উন্নয়ন-কবলিত মানুষেরা।

ডাক্তারবাবু বললেন, এই শরীরে, রিস্ক হয়ে যাবে। সঙ্গে কেউ এসেছে?

ডাক্তারবাবু, উনি। বাইরে আছেন, ডাকব? নীচু স্বরে বলল কাকলি।

ডাকুন।

শুনুন, ইনি আপনার মেয়ে তো? বেবির পজিশন ভালো না।

মুহূর্তে টুনুর শরীর লাল হয়ে যায়। –না, মানে …

ও। অনেক বয়েস তো আপনার, তাই…। শুনুন, একটা এইচআইভি টেস্ট করা দরকার। মানে আপনাদের দুজনেরই করতে হবে। আর নিয়ম করে ওষুধ টেস্ট চলবে।

কত লাগবে ডাক্তারবাবু?

বাইরে যান, কাউন্টারে বলে দেবে।

রিকশায় নরম বেড়ালের মতো গায়ে গা লাগিয়ে টুনু আর কাকলি। ফিরে আসছে প্রেসক্রিপসনের মোড়ক ধরা। খেয়াল করেনি, বেরোনোর সময়— প্রহ্লাদের বাপ হসপিটালের গেটে, তাদের দুজনকে ভালোভাবে দেখেছে। সে এই ডাক্তারের প্রাইভেট পেশেন্টের প্যাথলজি টেস্ট সেন্টারের কর্মী। ঢুকেই ডাক্তারবাবুকে জিজ্ঞাসাবাদ…দুয়ে দুয়ে চার।

বাড়িতে প্রহ্লাদের মায়ের ওপর চোটপাট। যেমনটি সংসারে হয়, হয়ে থাকে। মোমেনা কেন তার অবৈধ সৎ মায়ের সন্তান পেটে আসার জন্য দায়ী হবে, বোঝে না। সংসারের নিয়মে ওই সন্তান আসা এবং টুনু কর্তৃক পিতৃত্ব গ্রহণও তা-ই, বোঝে কজনা! আপনারা অবশ্য সংসার এবং অসংসার কিংবা অতিসংসার বলতে পারেন। বলুন। আমরাও বলব।

কিন্তু তাতে মোমেনা যখন কালশিটে চোখ, মুখ, বুক নিয়ে ঠিক কাকলির মতো, মোটা দড়ি বা ওড়না পরখ করে দেখতে চাইবে ওর ওজন সিলিং-ফ্যান সইতে পারবে কি না, ওর ব্যথা তাতে নিরাময় কিনা— ততক্ষণে দেরি হয়ে যাবার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। কিংবা দেরি হলে তা-ও একপ্রকার সংসার-যাপন কি না ভেবে দেখা খুব দরকার।

চিত্রকর: মৃণাল শীল

Comments are closed.