নীলঢেউ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    নিয়তি রায়চৌধুরী

    নষ্ট্রাকশন চলছে ব্লু ওয়েভস-এর। তাই বলে এই হোটেল নতুন নয়। তিনবার হাতবদল হয়েছে। বিশেষ কারণ বশত সস্তায় পেয়ে গেলেন যিনি, তিনিই এর বর্তমান মালিক বিভাস গুপ্ত। পঞ্চাশ প্লাস। কোলফিল্ড এরিয়ার পরিচিত ব্যবসায়ী। হোটেলের মতো মর্ডান বিজনেস নিয়ে বিস্তর পরিকল্পনা তাঁর। যে জন্য আর একটি ব্যাঙ্কোয়েট সংযোজন করছেন।

    নীচের একটি মাত্র ব্যাঙ্কোয়েট আর সংলগ্ন সোনাঝুরি লন নিয়ে এযাবৎ যে কোনও অকেশনে পরিষেবা দিতে হয়েছে। তার বেশিটাই গুরুত্ব পেয়েছে বিভিন্ন মানুষের আনাগোনায় সরগরম বোতল শোভিত কাঁচ-ঘেরা ঘরটির। এর একটা বর্ণবাহারি সুধাভাণ্ডের ফ্লেক্সও ঝুলছে হোটেল ঢুকতেই। এদিকে অতিথি দেবো ভবঃ বলতে যে ফুড–লজিং-এর ব্যবস্থায় চারতলা বিল্ডিং জুড়ে কম করেও চল্লিশখানা ঘর পড়ে আছে, তার দশখানিও বুক হয় কিনা সন্দেহ। শুধুমাত্র চালু একটি ‘বার’ তো কোনও হোটেলের পরিচয় হতে পারে না!

    অথচ কলকাতা টু দিল্লি এই ব্যস্ত হাইওয়ের ধারে এ হোটেল মানুষের নজর কাড়ে। রোড ফেসিং রুমগুলোর জানলা থেকে সামনে তাকালে মনে হয় সমুদ্রস্রোতের মতো অবিরাম যানবাহনের তোড় বইছে। বস্তুত কোলিয়ারি এলাকা। দূরে হেডগিয়ারের হুইল দেখা যায়। সাইরেন বাজে। ঘেঁষাঘেঁসি বিবর্ণ সব কোয়ার্টার লাইন। কোলিয়ারির কিছু প্রযুক্তিগত কাজে কয়েকজন রাশিয়ান ইঞ্জিনিয়ার এসে ব্লু ওয়েভস-এর বোর্ডার হয়ে এর মর্যাদা বাড়িয়েছে। বিভাস গুপ্ত–ও সেই মাফিক কলকাতার নামী হোটেলের এক ডিউটি ম্যানেজারকে বেশি বেতন কবলে এখানে এনে জি.এম. করে দিয়েছেন। এখন সেই জি.এম অনন্তিম সান্যাল হোটেল কম্পাউন্ডে মালিকের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে তাঁর আগামী পরিকল্পনা শুনছেন।

    জয়েনিং–এর পর বিস্তৃত আলোচনা তাঁর সঙ্গে এই প্রথম। পদ ও বেতনের কথা ভাবলে এতে অনন্তিমেরও দায় থেকে যায়। উন্মুখ আগ্রহে সেটাই সে জানান দিচ্ছে।

    বিভাসের বক্তব্যে ব্যাঙ্কোয়েট–এর পরই তিনি একটি কিচেনে নামবেন। রাশিয়ানদের কাজ এখন চলবে। ওঁদের ফুড-হ্যাবিটে পৃথক কিচেন কুক খুব জরুরি।

    বললেন, এখন যে কুক–কে দেখছেন, ওই পরাশর রথথো-কে আমি বারিপদা থেকে এনেছি। আগে বড় একটা রেষ্টুরেন্টের শেফ ছিল। এক্সপার্ট কুক। আমার এ হোটেল আপাতত কিচেন ফুডেই ফেমাস – জানবেন। ইসিএল অফিসে কি পুলিশ ব্যারাকে এমন কি টাউনশিপে যে কোনও অকেশনে ব্লু ওয়েভস-ই ফার্স্ট চয়েস। আগের ম্যানেজারের তো রেডি টু গো একটা লাঞ্চ টিম-ই ছিল। অনন্তিম বলে ফেলল, তিনি হঠাৎ চলে গেলেন কেন?

    -সেটা তার ব্যাপার। বিভাস দ্রুত নিজের কথায় ফিরলেন, – আমি চাই, এই কিচেন-ফুড আর রাশিয়ান বোর্ডারের সুবাদে কিছু লোক টানুন। যদিও এটা আপনার কাজ নয় জানি। কিন্তু মার্কেটিং-এ আমার আপাতত কর্মী নেই। একটু সময় লাগবে। খুচরো মিল সাপ্লাই আর বার্থ-ডে, ওয়েডিং পার্টিতে ক’টা পয়সা আসবে বলুন। আসল পয়সা তো বোর্ডার, নাকি?

    -অবশ্যই। কলকাতায় ভিআইপি রোড হবার পরে তো বাইপাসের হোটেল ব্যবসা তুঙ্গে উঠল। আসলে গেস্টদের সবরকম সুবিধাই আপনাকে মাথায় রাখতে হবে। যেমন –

    -যেমন? বিভাস সিগারেট অফার করলেন।

    -যেমন ধরুন কিচেন, ব্যাঙ্কোয়েট-এর সঙ্গে আপনি একটা সুইমিং পুলের কথাও ভাবুন। হোটেল বিজনেসে এটা মাস্ট। সামনে অনেকটা স্পেস তো ফাঁকা আছে।

    -ফাঁকা? অনন্তিমকে নিয়ে পায়ে পায়ে যেখানে এসেছেন বিভাস, বিনা হোঁচটেই মাথা ঝিমঝিম করে উঠল তাঁর। ফ্যাকাসে মুখ থেকে সিগারেট নামিয়ে বললেন, সুইমিং পুল! বলছেন কী মশায়! তাঁর বলার ধরনে ঘাবড়ে গেল অনন্তিম। বিভাস অবশ্য পরক্ষণেই সামলে নিয়ে বললেন, – ও- ও। আপনি নতুন এসেছেন। না?

    সকালের রাউন্ডে নেমে লাউঞ্জে এক বোর্ডার দম্পতি দেখে বেশ আশ্বস্ত হল অনন্তিম। দূর থেকে এখানে বিখ্যাত মন্দিরে পুজো দিতে এসে দ্রষ্টব্য হিসেবে – ছোট ছোট পাহাড়-ঘেরা প্রাকৃতিক নিসর্গে দামোদর দেখা, আর ড্যামের ছলছলে মায়াবী আবহে স্টিম লঞ্চে জল বিহার, এসবের জন্য এ হোটেলে রাত্রিবাস যে কেউ করে না তা নয়। তবে ওই রাত্রিটুকুই। অফিসিয়াল ট্যুর কী ইন্ডাস্ট্রির সময় সাপেক্ষ কাজের জন্য শহরের ভেতরের হোটেল ও গেস্টহাউস-ই অনেকের পছন্দ।

    স্থানীয় মেয়ে সুলেখা সেন এখানে রিসেপশন সামলায়। হাসিখুশি, ভদ্র, বিবাহিত। দেখলে মাথা নোয়ায় মৃদু হেসে। আজও কাউন্টারপার্ট থেকে তার ব্যতিক্রম হল না। চিত্রা, রনিতা এবং আরও কয়েকটি মেয়েকে বিভিন্ন কাজে দেখা যায়। এরা কেউই সুলেখার মতো পজিশনে নেই।

    অনেকগুলি পুরুষ কর্মী আছে – যেমন মনোহর, দেবেন, কৌশিক, রুস্তম বা আরও কেউ। এরা মূলত ওয়েটার। কিন্তু সব কাজেই এদের হাত লাগাতে হয়।

    বোর্ডার–এর লাগেজ নিয়ে মনোহরকে ওপরে উঠতে দেখে অনন্তিম তাকে বিশেষ জোর দিয়ে নয় নম্বর রুমটি খুলে দিতে বলল। আসলে তার রুমের সামনে ওই ন’নম্বর রুম, আশপাশের বন্ধ ঘরের থিতনো নৈশব্দ জড়িয়ে কেমন একটা থম মেরে থাকে যে, পুরো প্যাসেজটা বিচ্ছিন্ন লাগে। কলকাতার ঝাঁ চকচকে হোটেলের পরবর্তী অভিজ্ঞতায় এটা তার অচেনা।

    দুপুরে লাঞ্চ ব্রেক-এর অল্প সময়ের বিশ্রামে নিজের রুমে আসতে অনন্তিম ন’নম্বর ওভারলুক করে গেলেও রাত্রে ফেরার সময় সেটা নজরে আসে। মনোহর আর কৌশিক প্রতিদিনের মতে তার ঘরে খাবার পৌঁছতে এলে, অনন্তিম বলল, ন’নম্বর তো বোর্ডারকে খুলে দাওনি মনোহর, বলেছিলাম যে!

    -ন’নম্বরের চাবি কিবোর্ডে থাকে না স্যার। উত্তরটা কৌশিক দিল।

    অনন্তিম বলল, কোথায় থাকে?

    -তা জানি না। বিস্তর রুম তো খালি। ও ঘর দরকার পড়ে না। অনন্তিম ঝাঁজ নিয়ে বলল, এসব বুঝি তোমাদের খেয়াল খুশিতেই হয়? কোনও নিয়ম নেই!

    দু’টি মানুষ চুপচাপ ক্রেট থেকে খাবার নামাচ্ছে। হাত খালি করে মনোহর বলল, সেই যখন দিল্লি থেকে জিনিয়া ম্যাম আসত তখন খুলত। প্রায়ই আসত তো, জিনিসপত্তর সব রেখে যেত। কতরকম সুবাসে যে ঘরখানা ম’ ম’ করত। এখনও মনে হয় যেন, জানাল দরজার ছিদ্র দিয়ে ওই সুবাস বেরচ্ছে।

    মনোহর নাক টানতে শুরু করেছে। অনন্তিম অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলল, কিসের সুবাস! কই আমি তো পাই না। আমার সামনেই তো ওই রুম।

    -আগের ম্যানেজার পেতেন স্যার! পেতেন বলেই তো…

    -তো?

    তো আর রা নেই। চলে যেতে ব্যস্ত দু’জন। ঘাড় ফিরিয়ে মনোহর বলল, আপনি নতুন এসেছেন তো স্যার!

    অনন্তিম আবারও বিরক্ত হয়ে বলল, যাও তোমরা। আমি খোঁজ নেব।

    কর্মী সংখ্যা কমের জন্য এখানে ডিউটি-মানেজার দু’জন মাত্র। একজন সদ্য এসেছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং থেকে এফএনবি সেরে, বিপ্লব দাস। কাজকর্মে রপ্ত হয়নি এখনও। অন্যজন বহু পুরনো অবিনাশ হালদার। তিনি অনন্তিমের ন’নম্বরের প্রসঙ্গে চোখের ইঙ্গিতে পায়ের তলার মাটি দেখালেন। যাতে স্পষ্ট হল না কিছু। কয়েকদিন আগে বিভাস গুপ্তের সঙ্গে অনন্তিমের সুইমিং পুল নিয়ে প্রসঙ্গটা ঠিক এখানেই হয়েছিল। আজও একই জায়গায় একই কথার জেরে অবিনাশ যখন বললেন, সুইমিং পুল তো ছিল মশাই, এই তো, এইখানে।

    কেমন এক সাজুয্য পেয়ে অনন্তিম না চমকে পারল না, বলল,

    -তাই? তো কী হল!

    -ওটা এখন ফল্গু। নতুন মালিক তো হোটেলের নাম বদলে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কে চিনবে সেই নাম। তবে নীল বার্নিসের ওপর টলটলে পুলের জল কে যদি ব্লু ওয়েভস ধরা হয়, তাহলে নাম পাল্টাবার যুক্তি থাকে, তাই না?

    অনন্তিম বুঝে নিল, যুক্তি বলতে পুল-টা আর নেই। কিন্তু কেন নেই। সেই বিস্তারে অবকাশ রাখতে দ্বিতীয় প্রশ্নে গেল না সে।

    এখন জায়গাটা পাঁচিল-ঘেরা কার পার্কিং জোন। ধারে ধারে গুলমোহর আর অমলতাসের বন্ধনী। এপ্রিলের উড়ো হাওয়ায় ফিনফিনে বাসন্তী পাপড়িগুলো টুপটাপ ঝরে পড়ছে ঘাসে। বাউন্ডারির ওপারে হাইওয়ে। ওদিকের ধারে ধারে হার্ডওয়্যারের দোকান, গাড়ি রিপেয়ারিং শপ, পেট্রল পাম্প এবং বড়সড় একটা ধাবা। নানা রঙের আলো চমকায়। মধ্যরাত অবধি ট্রাক লরি থামিয়ে ড্রাইভার খালাসিরা খাওয়া-দাওয়া সারে।

    ব্লু ওয়েভস-এর গা-ঘেঁসে সোনাঝুরি লন। সবুজে সবুজ। বাউন্ডারি ওয়ালের ভেতরে চতুর্দিকে সযত্নে বাড়িয়ে তোলা বড় বড় সোনাঝুরি গাছের জন্যই বোধহয় এই নাম। আলো-কোলাহল আর হাই ডেসিবল-এর গানাবাজনা ছাড়া এ মাঠকে খুব কম পাওয়া যায়। তবে একবার পেলে দু’দণ্ড বসতে ইচ্ছা করে। নানারকম ফুল অর্কিড আর ঝাউ চারার দূরত্ব রেখে কয়েকটা চেয়ার সেন্টার টেবিল এখানে পাতা থাকে, রশিদের ব্যবস্থায়। এটা দেখা-শোনা করে সর্বক্ষনের কর্মী রশিদ-ই।

    অবিনাশবাবু এসে চেয়ারে বসে পড়েই শুরু করলেন, ”আগের প্রোপাইটারের কথা জানি না। তখন তো বেশিটাই ছিল ওয়াইনের কারবার। তবে দ্বিতীয় মালিক ভৃঙ্গরাজ লাডিয়াকে জানি। কর্মঠ মানুষ ছিলেন। হোটেল টিকে থাকলে আজ কোথায় উঠে যেত। কিন্তু তাঁর তো আরও অন্য ব্যবসা ছিল কিনা। হোটেল দেখত ছেলে ভুজঙ্গ লাডিয়া। ভুজঙ্গ’র বয়স কম। বিজনেস-এর মুনাফা নিজের এনজয়ের চেয়ে বেশি বুঝত না। এমবিএ পড়তে পড়তে বিয়ে করেছিল যাকে সেই তানিয়া ম্যামের সঙ্গে বনিবনা হয় না। স্ত্রী তার কলকাতার পরিবারে থাকলেও শোনা যায় সম্পর্ক ভাঙার মুখে। তবে ম্যাডামের এক বোন দিল্লিতে পড়াশুনা করত। এখানে সে এসে চুটিয়ে ছুটি কাটিয়ে যেত প্রায়ই।

    অনন্তিমের একটি প্রশ্নের মুখে হালদারের মোবাইলে রিংটোন শুরু হয়েছে। দাঁড়ান স্যার! বলতে বলতে তিনি কথার সঙ্গে পায়চারি শুরু করেছেন। পরে ফোন নামিয়ে বললেন, সুলেখা সেন। অনন্তিম বলল, আজ তো নাইট নিয়েছে সুলেখা।

    -নেবেই তো। হাসছেন অবিনাশ। বললেন, সে জন্যই কাজের ফিরিস্তি ধরাতে ডাকছে।

    অনন্তিম ভ্রু কোঁচকাল – আপনাকে! কেন?

    অবিনাশ সামান্য ইতস্তত করে বললেন, দেখুন স্যর। নাইট ডিউটি বলে যদি কেউ মাল্টিপ্লেক্সে

    কাটায়, তার দায় তো …

    অনন্তিম বাধা দিয়ে বলল, তা কি করে সম্ভব! আমি এসে থেকে শিডিউল টাইমে এসব তো দেখিনি।

    অর্থপূর্ণ হাসলেন অবিনাশ – বেশ তো দেখুন না। সবে তো এসেছেন। এরপর অবিনাশ অন্য সুরে বললেন,  যাকগে, আমরা অ–পদস্থ ছোট কর্মী। ফরমাস খাটি। ছোট মুখে বড় কথা না আনাই ভাল। অনন্তিমের কপালে ভাঁজ পড়ল। কিন্তু কথা বাড়াল না।

    নাইটের একটা পার্টি ছিল। খাদান এলাকার কোনও মেহমানের। প্রায় মধ্যরাতের কাছাকাছি রুমে ফিরে অনন্তিমের বউকে স্কাইপ করার কথা। সিঁড়িতে উঠতে শুনল রাশিয়ানদের রুমে মাউথঅর্গ্যান বাজছে চড়া সুরে। এটা ওদের মিডনাইটের রোজকার বিনোদন। স্কাইপে আজ অল্পে রেহাই মিলল। অন্যদিনের মতো খুঁটিনাটিতে গেল না নন্দিতা। প্রথম কারণ, নেট ডিস্টার্ব করছিল; দ্বিতীয়টা ঘুমের চোরাটান।

    কিন্তু অনন্তিমের যে ঘুম আসে না। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে, জল খেয়ে বিছানায় গড়িয়েও জেগে থাকে। ফোন নাড়াচাড়া করে। মনে হল মিষ্টি মধুর একটা সুবাস আসছে। রুম স্প্রে কি ধূপ তো জ্বালানো হয় না। গাঢ় এমন সুগন্ধ কোথা থেকে আসছে! প্রথমে অবাক হলেও পরে হাসি পেল। সামনে ওয়াড্রোবের ওপর রাখা একগুচ্ছ গোলাপের দিকে তাকিয়ে। গেস্টদের জন্য আনা রাশিকৃত গোলাপের একটি স্তবক সবার সঙ্গে জি.এম-কেও দিয়েছিল সুলেখা মাথা নুইয়ে-সসম্ভ্রমে।

    -গুড ইভনিং স্যর !

    – গুড ইভনিং। মনে পড়ল, অনন্তিম নিজেই তো ওটা রেখেছে ওখানে। ক্রমশ গোলাপের গন্ধে চোখ জুড়ে আসছিল। আবার কেটেও যাচ্ছিল নানা মুখে শোনা অদ্ভুত কিছু কথার স্মরণে। পাশে রাখা ফোনে একটা মেসেজ ঢুকল। এত রাতে! তুলে অবাক হতে হল। সুলেখা সেন। সে জানাচ্ছে, স্যার আপনাকে কি গোলাপগুচ্ছ-টি আমি দিতে পেরেছি! নাকি টেবিলে রেখে এলাম! শুভেচ্ছা সহ ওটা গ্রহণ করবেন, প্লিজ।

    সঙ্গে সঙ্গে অনন্তিমও সুন্দর কয়েকটা শব্দ সাজিয়ে ভুলটা শুধরে দিল, ”সুন্দর সন্ধ্যা জানিয়ে, ফুল যে তুমি দিলে সুলেখা!”

    গোলাপ দেবার পরে সুলেখাকে তার কাউন্টারে আর দেখা যায়নি। নাইট নিলে তো সেটাই হত। ভাবল সত্যিই কি এটা ভুল সুলেখার! সদ্য দেওয়া গোলাপের ইভনিং-টা এত তাড়াতাড়ি মুছে যায়! নাকি নানা মুখে শোনা- বিভাস গুপ্তের নির্দেশ মতো সূচনা তৈরির এটা বাহানা! মালিকের বিশেষ মনোযোগ থেকে সুলেখার যেমন সাধারণ কর্মী থেকে সহজেই রিসেপশনিস্ট হয়ে ওঠা, সেই অভীপ্সা থেকে জি.এম-কে ধরে রেখে হোটেলের উন্নয়নে আরও নজরে পড়তে চায়? কিন্তু সব মিলিয়ে সুলেখার এমন ট্রাপিজের খেলাটি বিভাস নিতে পারবেন তো! নিঘুম অস্থিরতায় অনন্তিম হাই তোলে। বিছানায় এপাশ ওপাশ করে। পরাশর আজ প্রসঙ্গত ওকে বলেছিল, আগের ম্যানেজার যথেষ্ট ফুডি ছিলেন। রাউণ্ডে কিচেনে ঢুকে খাবার টেস্ট করে দেখতেন। অনন্তিম বলেছিল, তাই নাকি। তো চলে গেলেন কেন? আদার জব? একথায় উত্তরটা পাশে রেখে রথথো ওকে একটা প্লেট ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল, টেস্ট করুন স্যর। আজকের জন্য আমার স্পেশ্যাল প্রিপারেশন।

    –ওড়িশি মেনু ?

    –সেটাই তো বোঝার স্যর। অলিভ অয়েলের ওপর পুরো আইটেমটায় হ্যম, ক্রিম, পারমেশন চিজ আর তুলসীপাতা ছড়িয়ে ফ্রাইপ্যানটা টস করতে করতে রথথো বলল, আদার জব কিনা জানি না স্যর। উনি ঝাড়খন্ডের লোক ছিলেন জানি। শুনেছি ভয় পেয়ে পালিয়েছেন।

    –কিসের ভয় ?

    –মাঝরাতে ছাদে ধুপধাপ আওয়াজ উঠত। খিলখিল হাসি – কান্না গোঙানি শুনতে পেতেন। শেষে ছাদে উঠে যেদিন দেখলেন সত্যিসত্যি একটা নীল ওড়না উড়ছে সামনে, দুদ্দাড় সিঁড়ি টপকে নীচে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকলেন।

    অনন্তিম বিছানা থেকে উঠে গোলাপের স্তবকটি ড্রয়ারে ভরে দিল। তবু যেন গন্ধ আসছে। ড্রয়ার কি ফাঁকা আছে তাহলে। ছিদ্র বা ফাটা ?

    অবিনাশ হালদার যেভাবে আখ্যানটি শেষ করেছিলেন তাতে ন’নম্বরের চেয়ে গুরুত্ব পেয়েছিল সুইমিং পুল। তখন তার ধারে ধারে রক্তকরবী আর পান্থপাদপের ঘেরাটোপ ছিল নাকি। ভুজঙ্গ ওখানে নিরিবিলি সাঁতার কাটত সময় বুঝে। সঙ্গে প্রায়ই থাকত বিষুব অগ্রবাল। দুর্গাপুরের নিজের কাজ কারবার সামলে তার বন্ধু আসত এবং থেকেও যেত। এদের বিশেষ হুকুম খাটতে নির্দিষ্ট থাকত বদ্‌রি বাউরি।

    –বদ্‌রি কে?

    –বদ্‌রি রুম সার্ভিসের কর্মী। শক্ত কাঠের মতো কাঠামো। বাইশ- চব্বিশের শক্তপোক্ত যুবক। স্থানীয় হলেও শোনা যায় লিঙ্ক ছিল লাডিয়া পরিবারের সঙ্গে।

    রশিদকে আসতে দেখে থেমে গিয়েছিলেন অবিনাশ। কথা এগোয়নি। একদিন এই সোনাঝুরি লনেই একা পেয়ে, রশিদ আগ বাড়িয়ে জিএম–কে বলেছিল। অবিনাশ হালদার সবটা জানেন না। বদরি কেন স্পাই হতে যাবে ভুজঙ্গবাবুর বউ-এর? আর যদি হয়ও সেটা ঘটনা নয়। আসলে ভুজঙ্গবাবু টের পাচ্ছিল তার মহব্বতে টান পড়ছে। কেন বলুন তো?

    আগাপাস্তলা এ ঘটনার কেন–র জবাব সম্ভব নয়। অনন্তিম তাই পাশ কেটে বলল, রশিদভাই, আপনি এখানে অনেকদিন আছেন, তাই না ?

    প্রশ্নটা রশিদকে কোথাও ঘেঁটে দিল যেন। আবেগে বলল, সুইমিং পুল তৈরি হতে দেখেছি স্যার! আবার বুজিয়ে ফেলতেও দেখলাম। আর এই দুটো দেখার মাঝখানে যা দেখলাম সে আর কি বলব, ওহ! অনন্তিম শ্রোতার ভূমিকায় উদগ্রীব। রশিদ বলল, দেখলাম ভোর রাতের ঝোড়ো বাতাসে ঢেউ উঠছে যে জলের – জিনিয়া ম্যাম সেখানে উবু শুয়ে দুলছে। হলুদ কামিজ ফালাফালা। ওহ্‌ সেকি দৃশ্য স্যার!

    কথা হারিয়ে অনন্তিম চুপ। এ দৃশ্যকল্পনা তার ধারণায় ছিল না। বিস্ময় সামলে বলল, তার মানে, অন্যান্য দিনও সে আসত তো।

    –আসত তো। জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকত। কলকল করে কথা বলত। খিলখিল করে হাসত। সে এক অদ্ভুত জলতরঙ্গের মতো হাসি। দেখতেও এক জলপরি কিনা। গাছের ফাঁক দিয়ে কখনও সেসব দেখা যেত। ভুজঙ্গবাবুও তার কেয়ার নিত। তখন তো ভুজঙ্গই জিনিয়ার সব ছিল কিনা। বিষুব অগ্রবাল তো পরে এল। তরতাজা যুবক। আনম্যারেড। বিস্তর হুল্লোড়বাজ। জিনিয়াকে ধরে পাক খাইয়ে জোর করে জলে নামাত। ওকে নিয়ে লোফালুফি খেলত। বেশ জমত তিন মাথার খেলা। পরে পরে হল অবশ্য দুই। রশিদ এবার একটু মজার চোখে চেয়ে বলল, এরপর যদি ভুজঙ্গবাবুকে রুমে একা একা ড্রিঙ্কস নিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়, ডাল্‌মে কুছ কালা – মনে হয় না কি?

    হবেও বা। অনন্তিম মনে মনে বলল।

    -আর এক আশ্চর্যের কথা, রশিদ সামান্য থেমে বলল, মাঝরাতে জিনিয়ার সঙ্গে ছাদে যার কথা কাটাকাটি চলত, হোটেলের লনড্রিম্যান গোপীচাঁদ রাত অবধি ইস্ত্রি করতে করতে দেখেছে মানুষটা বিষুব অগ্রবাল। রহস্যের ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল রশিদ – বুঝুন। একজন সঙ্গ-ছুট, একজন সঙ্গে আছে; সেখানেও মনান্তর। মহব্বত-টা তাহলে কার?

    অনন্তিম সেটা বোধগম্যতার বাইরে বোঝাতে, নি:শব্দে হাত নাড়ল।

    রশিদ একবার নিজের হাতঘড়িটা দেখে নিয়ে বলল, ঘটনার দিন বিষুবকে ফোনে পাওয়া গেলেও সে কোথাও একটা গাড়িতে ছিল। আর ভুজঙ্গবাবু দু’দিন আগে থেকেই আউট অফ ষ্টেশন। অথচ তার বউ ঘনঘন বদরিকে ফোন করত কার বা কিসের জন্য কে জানে।

    রশিদ চুপ করতে গিয়েও আবার বলল, এরপর ভুজঙ্গবাবু বার দুই এসেছে। তখনও হোটেল বিক্রি হয়নি। গভীর রাতে ছাত থেকে তাকে নেমে যেতে দেখেছে কেউ কেউ।

    অনন্তিমকে বলতেই হল, তদন্তে কি উঠে এসেছে?

    অস্পষ্ট হাসল রশিদ, এসব ব্যাপারে সত্যটা কি সামনে আসে স্যার? বিশেষত এমন ঘটনায়? তাই ঝড়ের রাতে জিনিয়াকে জলে যেতে কে ডেকেছিল, কে জলে মুখ গুঁজে দিল, কার হাত কাজ করেছিল কে বলবে? জিজ্ঞাসাবাদে হোটেলের কেউ মুখ খোলেনি। তাদের সম্পর্ক নিয়েও কেউ কিছু বলেনি। তবু বাতাসে একাধিক নাম ঘুরপাক খায়। রশিদ এবার থামতে চায়। ইতস্তত করে দু’পা বাড়িয়ে বলল, বেচারা বদরির খামোকা চাকরি-টা গেল।

    অনন্তিম এখানে এসেছে একাধিক হাত ফেরৎ এক হোটেলের শস্ত্রহীন নিধিরাম হয়ে। বেতনের শর্তে তার ব্যবসা চাঙ্গা করার কথা। গল্পগাছায় প্রেক্ষিত চিনে নেওয়া তার সেই কর্তব্যে পড়ে। তাই বলল, হোটেলে তো এসব হয়েই থাকে। তার জন্য পুল বুজিয়ে দেওয়া হল কেন?

    রশিদ বলল, কি বলছেন স্যর! ওই ঘটনার পরে মদের বার-এও লোক আসে না। হাইওয়ে বাদ দিলে এখানে তো সবটাই জলাজংলা মাঠ আর কোলিয়ারি। শর্টকাটে বাইকে আসতে দুঁদে পুলিশও ভূতের ভয় পায়।

    ভৃঙ্গরাজ লাডিয়া স্টিল কারখানা থেকে লরি লরি স্ল্যাগ এনে পুল বুজিয়েও গল্প চাপা দিতে পারেননি। শেষে বেচে দিলেন জলের দরে।

         +               +               +               +

    তবু হোটেল যখন ব্লু ওয়েভস, নীল ঢেউ তো থাকবেই। অনন্তিম শেষ পর্যন্ত মালিককে একটি সুইমিং পুল তৈরিতে রাজি করিয়ে ফেলেছিল। উন্নয়নের ভরসাও সে মালিককে দিয়েছিল। তারপর থেকে পুলটির ভবিষ্য-চিত্ররূপ সে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা শুরু করে দিয়েছিল। ঘটন-অঘটন বিস্তর বৈচিত্র্য ভেদ করা তার চিন্তায় কাজ করেছে। হোটেলের উন্নতির সঙ্গে উন্নত কিছু সম্পর্কের আগাম আশঙ্কাও সেখানে স্পার্ক করে থাকতে পারে; নিঘুম রাত তো তার ছিলই।

    এসব নানা গুঞ্জনে, নানা ধারণায় চাউর ছিল। বাকি কিছু ফিসফিসে হয়ে আছে সোনাঝুরি বাতাসে। যেমন, মধ্যরাতে ঘোলাটে অন্ধকারে ন’নম্বরের সামনের রুম থেকে পা টিপেটিপে কেউ উঠে গিয়েছে চারতলার ফাঁকা ছাদে। কোনও কারণে থমকে দঁড়িয়েছে যেখানে, সামনে তার গভীর খাদের মতো নীচের আলোছায়ার পার্কিং জোন … তার ঠিক তলায় মাটি চাপা নীলঢেউ …

    সেদিনও  পুরনো লনড্রিম্যান ইস্ত্রি থামিয়ে চমকে উঠেছিল, ভুজঙ্গবাবু।

    মাথা চাদরে ঢাকা, আলোর দিকে পিছু ফেরা সেই ছায়ামানুষ দু’দিকে ঘাড় নেড়েছিল কিনা স্মরণে নেই লনড্রিম্যানের। তবে ইঙ্গিতে ঠোঁটে আঙুল চেপেছিল এটা ঠিক। দ্বিতীয় কথার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত নেমে মিলিয়ে গিয়েছিল ছায়াটি করিডরে।

    রাত তখনও কিছুটা বাকি ছিল। বাকি কিছু কারও জানা নেই। সকাল সকালের মতোই পরিষ্কার। হোটেল থেকে এফএনবি কর্মী বিপ্লব দাসের ফোন পেয়ে দ্রুত এসে হাজির হয়েছেন বিভাস গুপ্ত। পুরো বিল্ডিং ঘুরে  দাপিয়ে ন’নম্বরের মুখোমুখি ঘরের সামনে থেমে সিগারেট ধরিয়েছেন। মুখভর্তি ধোঁয়া সামনে উড়িয়ে এগিয়ে গেলেন ভেতরে। তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা কর্মীদের পাশ কেটে ম্যানেজারের ফাঁকা টেবিল থেকে হোটেলের লোগো-টি তুলে নিয়ে বললেন, ধুস্‌-স্‌, ব্লু ওয়েভস নামটাই এবার পাল্টে দেবো…

    চিত্রকর : মৃণাল শীল 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More