বুধবার, নভেম্বর ১৩

ম্যাও

সায়ন্তনী ভট্টাচার্য

রায়দের বাড়ির সাদা, ফুলো, ধুমসো, গম্ভীর নেংটির কোনও পাত্তা নেই সকাল থেকে। নেংটির বয়স সাড়ে তিন বছর, ইঁদুর খেতে মোটেই পছন্দ করে না, আমুদি মাছ দেখলে চোখদুটো আরও গোল গোল হয়ে যায়। প্রিয় কাজ হল ইজি চেয়ারে বসে ঘুমনো। মাঝে মাঝে খুব আস্তে মিউ–মিউ করে আওয়াজ বের করে। নেংটি কোথায় গেল বোঝা যাচ্ছে না। বুঁচি চিন্তায় সকালের জলখাবারে তিনটে লুচি বেশি খেয়ে ফেলল। ভয়ানক মন খারাপ করছে। ইউনিভার্সিটি যেতে একটুও ইচ্ছে করছে না। ঠোঁটে লিপগ্লস লাগাতে লাগাতে বিড়বিড় করে বলল, নেংটিটা যে কোথায় গেল! সকালের দুধ এখনও বাটিতে পড়ে। উফ্, আজব একটা বেড়াল। কে জানে রাস্তার কোন বেড়ালির প্রেমে পড়ল কি না!

বাড়ির বাকি সকলে অবশ্য নেংটির অন্তর্ধান নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নয়। বেড়াল নিয়ে আদিখ্যেতা করে একমাত্র বুঁচি। তার আশকারাতেই নেংটির বড্ড বাড় বেড়েছে। যখন–তখন খাবারে মুখ দেয়, ইলিশ মাছ চুরি করে পালায়। মাঝরাতে প্রায় দিনিই দেখা যায় নেংটি পরম আরামে থাবা চাটছে, সকালে আবিষ্কৃত হয় বাসি মাছ হাওয়া অথবা দুধের বোতল সাবাড়। তাই নেংটি বাড়ি থেকে বিদায় হওয়াতে অনেকেই খুশি।

নেংটি অনেকটা সময় ঘুমের পর চোখ খুলল। সামনেই একটা পুকুর। একটু এগিয়ে পুকুরের টলটলে জলের দিকে ঝুঁকে নিজেকে ঘুরিয়ে–ফিরিয়ে দেখল। সাদা তুলোর বলের মতো শরীর। ভারিক্কি একটা ব্যাপার রয়েছে। চোখ নীলচে, ঝাঁটার আকারের গোঁফ নাকের নীচে দুপাশে ছড়িয়ে আছে। নাকটা লালচে, ঠান্ডা, নরম। নিজেকে দেখে নেংটি কনভিনসড। ভাবল, আমার মতো সুন্দর বেড়াল পৃথিবীতে আর দুটো আছে কি না সন্দেহ।

তবে হঠাৎ করে ও বুঝতে পারল না যে কোথায় চলে এসেছে! একটু দূরে কাঁটাতারের বেড়া দেখা যাচ্ছে। মিলিটারি পোষাক পরে বেশ কিছু লোকজন দাঁড়িয়ে আছে, গোরু–ছাগল নিয়ে গ্রাম্য চেহারার মানুষজন, কয়েকটা মালবোঝাই ট্রাক, তিনটে কালো কুকুর, চায়ের দোকান, সাইকেল রিক্সা, ভ্যান, বারোভাজা জায়গা। খুঁটিয়ে নেংটি সবকিছুই চিনতে পারল। বুঁচি ছবি দেখিয়ে জেনারেল নলেজ বাড়ানোর জন্য রীতিমতো ক্লাস নিয়েছে। ও ল্যাজ দোলাতে দোলাতে, আয়েসি ভঙ্গিতে একটু এগিয়ে গেল। দেখেশুনে যা মনে হচ্ছে ওপারে বাংলাদেশ। এটা বর্ডার।

এতক্ষণে মনে পড়ল, শুকনো মাছের গন্ধ নিয়ে একটা টেম্পো দাঁড়িয়েছিল বুঁচিদের বাড়ির সামনে। সেই মাছের গন্ধে পাড়াশুদ্ধ লোক নাক কোঁচকাচ্ছে। নেংটির গন্ধটা মন্দ লাগেনি। ও এক লাফে টেম্পোতে উঠে পড়ল। আরে আরে, ওটা কী? লটে মাছের শুঁটকি না? জুলুজুলু চোখে এগিয়ে প্ল্যাস্টিকের বাক্সটাতে মুখ দিল। খেতে খেতে টেম্পো ছেড়েছে। নেংটি গা করেনি। যাক না কতদূর যাবে। বেড়াল তো, রাস্তা চিনে ঠিক ফিরে আসবে বুঁচির কাছে। পেটটা ভরে গেছে, রোদ্দুরও বেশ নরম নরমর, নেংটি মৌরলা শুঁটকির বাক্সটাতে মুখ ডুবিয়ে, পা এলিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। তারপর চোখ খুলতে দেখে সামনে পুকুর। কতটা সময় ঘুমিয়েছে, টেম্পো থেকে নেমে পুকুরের কাছে চলে এসেছে কখন কিছুই মনে পড়ছে না।

ও ভিড় থেকে একটু সরে এল। কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ফাঁকা জায়গার প্রয়োজন। এখন হাতে রয়েছে দুটো অপশন। বাংলাদেশ ঘুরে আসা যেতে পারে, বেড়ালের পাসপোর্ট–ভিসা লাগে না, সুতরাং সমস্যা নেই। তা না হলে বালিগঞ্জে বুঁচিদের বাড়ি ফিরে যাওয়া যায়। কিন্তু এতটা রাস্তা ঘুমোতে ঘুমোতে এসেছে, চিনে ফেরত যেতে পারবে কি না সে বিষয়ে নেংটির যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তবে ফিরে না গেলে বুঁচির সঙ্গে বেইমানি করা হবে। মেয়েটা এতদিন আদর–যত্নে রেখেছে, ভালো খাইয়েছে, শীতকালে গায়ে কম্বল চাপা দিয়েছে, ছবি দেখিয়ে পড়াশোনা শেখানোর চেষ্টা করেছে। একে ফেলে একা একা বাংলাদেশ ঘুরে আসবার বিষয়টা নেংটির পছন্দ হল না। নিজেকে বড্ড স্বার্থপর মনে হল। সবসময় কি সীমানা পেরোনো উচিত? গোঁফ ঝাড়া দিয়ে থাবাটা একবার চেটে নিল ও। এখনও শুঁটকির গন্ধ গায়ে লেগে আছে। অনেক ভেবে ফিরে যাওয়াই ঠিক হবে বলে মনে হল। সমস্যা একটাই, ফিরে যাবে কীভাবে? এভাবেও কি ফিরে যাওয়া যায়?

বুঁচি মনখারাপ কাটানোর জন্য ভোম্বলের মেস–এ ঢুকে পড়ল। অফিস টাইম। মেস ফাঁকা। ভোম্বলের ঘর সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলায়। পল্টু বলে এক শেয়ার ব্রোকার একই সঙ্গে রুম শেয়ার করে। এখন সে নির্ঘাত ঘরে নেই। ঘরের নোংরা, তেলচিটে পর্দা সরিয়ে বুঁচি উঁকি মারল। চৌকিতে প্রচুর বইয়ের স্তূপ, দেওয়াল আলমারির পাল্লা খোলা, জবরজং করে রাখা জামা–কাপড়, মেঝেতে ক্যাম্বিসের ব্যাগ। ভোম্বল স্যান্ডো গেঞ্জি আর বারমুডা পরে, কানে হেডফোন গুঁজে শুয়ে শুয়ে পা নাচাচ্ছে। ভুঁড়ি উঁচু হয়ে আছে।

বুঁচি ঘরে ঢুকেই ভোম্বলের থাইয়ে একটা থাপ্পর মেরে বলল, অ্যাই!

তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে কান থেকে হেডফোন খুলে রাখল ভোম্বল। বলল, আরে, তুই? এখন? ব্যাপার কী? আজকাল মেসে নতুন নিয়ম হয়েছে জানিস না? নারীদের প্রবেশ নিষেধ।

বুঁচির বড্ড মনখারাপ। ঝরঝর করে কেঁদে বলল, নেংটি কোথায় চলে গেছে, কোনও খোঁজ নেই, আর তুই এখন আমার সঙ্গে ফাজলামো করছিস? আমার ভেতর যে কী হচ্ছে…!

ভোম্বল ইকনমিক্সের ছাত্র। সবকিছুতেই কার্ভ দ্যাখে, চাহিদা আর জোগানের থিয়োরি বের করে। বুঁচির কান্নাটা এখন অনেকটা আদর ডিমান্ড করে বলে মনে হল। ও আস্তে করে উঠে দরজাটা ভেজিয়ে দিল। তারপর বুঁচিকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল।

বুঁচির যে কী প্রচণ্ড আরাম লাগছে… মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত শিরশির করা বিদ্যুৎ বয়ে যাচ্ছে। ভোম্বল, বুঁচির ভেজা চোখে চুমু খেল, তারপর ঠোঁটে, গলায়, লাল তিল–এ, আরেকটু নীচে…। বুঁচি কাঁপছে, ভোম্বলের হাত সমস্ত শরীরে আলপনা আঁকছে। কামিজটা একটু সরিয়ে সাদা পেট, নাভি…। মাথা নামিয়ে মুখ ডুবিয়ে দিল। আহ্।

নেংটি এখন কোথায়? একটুও মনে পড়ছে না ওর কথা। ভোম্বল আদর করতে করতে বুঁচিকে বলল, তোর পেয়ারের নেংটি কেমন করে হাওয়া হয়ে গেল?

–বুঝতে পারছি না, জানিস। মা ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠেছে, তখন ওর দুধ খাওয়ার সময়। বাটিতে দুধ রেখে মা ঠাকুরঘরে ঢুকে গেছে, বেরিয়েছে সাড়ে ছ’টা। দ্যাখে, দুধ যেমন কে তেমন!

–যাক বাঁচা গেল।

–মানে?

–মানে দিনরাত তুই নেংটিকে নিয়ে যা আদিখ্যেতা করিস! মাঝে মাঝে আমার থেকেও বেশি ইম্পর্ট্যান্স পায় ওই ন্যাকা বেড়ালটা। আপদ বিদেয় হয়েছে, বেশ হয়েছে। এখন আবার ফিরে না এলেই হল।

বুঁচির খুব কড়া কথা শোনাতে ইচ্ছে করছে ভোম্বলকে। কিন্তু চেপে গেল। নেংটির চলে যাওয়ার থেকেও অনেক বড় একটা খবর ভোম্বলকে দেওয়ার আছে। নেংটি ইম্পর্ট্যান্ট ঠিকই, কিন্তু শরীরের কাছাকাছি আরেকটা শরীর থাকলে তখন আর অন্যকিছু মনেই থাকে না।

ধনঞ্জয় মণ্ডল একজন মোটা মানুষ। গলায়, কোমরে, গালে, পেটে থলথল করছে চর্বি। ধনঞ্জয় নিজেই ঠাট্টা করে বলে চর্বিত চর্বন। এত মোটা হওয়ার জন্য বেশ সমস্যায় পড়তে হয়। রিক্সায় দুজন প্যাসেঞ্জার ওঠানো যায় না বলে এক্সট্রা ভাড়া গচ্চা যায়। সামান্য আটত্রিশ বছর বয়েসেই রোগের ডিপো। বিয়ে হচ্ছে না, বেঢপ শরীরে কোনও জামাই ঠিকমতো ফিট করে না। নিজেকে নিয়ে তাই বেশ মন বেশ  খারাপ। এরকম না হয়ে যদি ও অন্যরকম হত, তাতে কার কী যায় আসত?

মন খারাপ হলে ধনঞ্জয়ের বেশি করে খিদে পায়। এখনও পেয়েছে। ভাতের হোটেলে বসে সবকিছু দু’প্লেট করে অর্ডার দিয়েছে। ভাত, ডাল, পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, আলু–পটলের তরকারি, কাতলার ঝোল। হাতের পুরো চেটো ডালে–ঝোলে মাখামাখি। বড় বড় দলা বানিয়ে মুখে দিচ্ছে।

এখন বেলা তিনটে। কলকাতা পৌঁছতে এগারোটা–বারোটা বাজবে। মাল খালাস হয়েছে, টাকাও পাওয়া গেছে। এত দুঃখের মধ্যেও এটুকুই স্বস্তি।

শেষ পাতে খান পাঁচেক রসগোল্লা খেয়ে বড়সড় ঢেকুর তুলে উঠে পড়ল ধনঞ্জয়। স্টিলের জাগ থেকে ঢকঢক করে খানিকটা জল খেল। ঘামে মাথা–মুখ সব জবজবে, গামছা দিয়ে মুখ মুছে নিয়ে ও একটা বিড়ি ধরাল। একটু দূরেই সবুজ রঙের টেম্পো রাখা। এখনও শুঁটকির গন্ধ ম–ম করছে। এদিকে শুঁটকির ভালো চাহিদা। গরম ভাতে মাখলে এক থালা ভাত উঠে যায়। গামছাটা গলায় ঝুলিয়ে ধনঞ্জয় টেম্পোর কাছে গেল। হেল্পার পটাই–এর পাত্তা নেই তিন দিন ধরে। জ্বরে কোঁকাচ্ছে। এই কদিন গাড়ি নিয়ে একাই বেরোচ্ছে ও। টেম্পোটা আছে তাই এই বাজারে করে খাচ্ছে। চাকরির যা হাল! মাধ্যমিক পাশ ধনঞ্জয়ের কপালে ভালো কিছু যে জুটত না তা বলাই বাহুল্য। তার থেকে এই বেশ! গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ছে, অর্ডার মতো মাল পৌঁছে দিচ্ছে, দিন চলে যাচ্ছে দিনের খেয়ালে।

গামছা দিয়ে ঘাড়–হাত আরেকবার মুছে নিয়ে ড্রাইভারের দিকের দরজাটা খুলে টেম্পোয় একটা পা রাখল ও। এমন সময় মিউ–মিউ!

চোখ ফিরিয়ে ধনঞ্জয় দেখল সাদা তুলোর বলের মতো একটা বেড়াল মাটি আঁচড়ে চলেছে। মায়া মায়া চোখ, আদুরে স্বর, একদম গোল্লু মার্কা। আয়, আয়, আয়, তুতুতু, ও হাত বাড়িয়ে একটু এগিয়ে যেতেই সাদা বেড়াল পায়ে মাথা ঘষছে। ওকে কোলে তুলে গলার কাছে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতেই ঘড়ঘড় শব্দ করছে। চেহারাখানাই এমন যে চটকা–মটকি না করে পারা যায় না।

নেংটি মনে মনে মতলব ঠাওরে দিব্যি ধনঞ্জয়ের গায়ের সঙ্গে লেপটে গেল। এই লোকটাই শুঁটকি মাছে ভর্তি টেম্পটা চালিয়ে নিয়ে এসেছে, সুতরাং যেখান থেকে এসেছে সেখানে ফেরত যেতে গেলে এই লোকটার গাড়িতে উঠে পড়লেই হবে। বুঁচির কাছে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনায় নেংটির চোখদুটো আরও গোল গোল হয়ে গেল। ধনঞ্জয় নেংটিকে তুলে ড্রাইভারের পাশের সিট, মানে যেখানে পটাই বসে, সেখানে বসিয়ে বলল, চলরে সাদা বেড়াল, আজ তু–ই আমার হেল্পার হ!

নেংটি সিট–টা ঘুরে দেখে নিল। পছন্দ হয়েছে। গুটিশুটি মেরে, লেজ মোটা করে শুয়ে জবাব দিল, মিউউউ!

–মিউ কিরে? মানে কী? দাঁড়া, তোর একটা নাম দিই। কী নাম, কী নাম… হয়েছে। তোকে আমি ম্যাও বলে ডাকব। বুঝলি, ম্যাও বলে ডাকলেই সাড়া দিবি কিন্তু।

নেংটি অনেক চেষ্টা করেও বোঝাতে পারল না যে ওর একটা নাম আছে। ভাবল, কয়েকটা তো মোটে ঘণ্টা, ডেকে নাও যা বলে ডাকতে ইচ্ছে করে। তারপর আমি বুঁচির কাছে কেটে পড়ছি! তখন আর তুমি আমায় পাচ্ছ কোথায়?

বুঁচির বাবা পরিমলবাবু বারান্দায় বসে পা দোলাতে দোলাতে বিকেলের আকাশের দিকে চেয়েছিলেন। মন খুশি খুশি। বেড়ালটার পাত্তা নেই সকাল থেকে। ছিচকাঁদুনে বুঁচির ভয়ে বেড়ালটাকে এতদিন তাড়াতে পারেননি। আজ অ্যাক্কেবারে মেঘ না চাইতেই জল। নেংটি নিজেই হাওয়া। আনন্দে পরিমলবাবুর নাচতে ইচ্ছে করছে। বেড়াল একটা জঘন্য প্রাণী, লোম ওড়ে, ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে বমি করে, পায়ে পায়ে ঘোরে… বিরক্তিকর। এমন একটা জিনিস বাড়িতে পোষার কোনও মানেই নেই। অথচ বুঁচির বায়না, নেংটিকে সে নাকি নিজের ছেলের মতো দ্যাখে। মেয়ের আবদারের কাছে পরিমলবাবু জব্দ। না হলে কবে লাথি মেরে ওটাকে বিদেয় করতেন!

বেড়ালকে গালি দিতে দিতে পরিমলবাবু কোলের ওপর ফেলে রাখা বইয়ের প্রথম পাতাটা খুললেন। বইয়ের নাম অ্যামেজিং ফ্যাক্টস। প্রথমেই বেড়ালের ছবি। হাবিজাবি কথা। প্যারাসিটামল আর পেনকিলার বেড়ালদের জন্য নাকি সাংঘাতিক বিষ। ইসসস, এই তথ্যটা আগে জানা থাকলে এতদিনে নেংটিকে পেনকিলার খাইয়েই… গলা থেকে আক্ষেপের আওয়াজ বেরোয়। আরও লিখেছে, পৃথিবীর সব থেকে বৃদ্ধ বেড়াল মারা গেছে আটত্রিশ বছর বয়েসে, একটা তিন বছরের বেড়াল নাকি একজন মানুষের একুশ বছরের সমান। তার মানে নেংটি এখন একুশ বছরের তরতাজা যুবক, এসময় তো একটু উড়ুউড়ু মন হবেই। জীবনবাবু যে কী বলে বেড়াল নামের কবিতা লিখলেন! জীবনবাবু মানে জীবনানন্দ দাশ।

পরিমলবাবু বিরক্তির মধ্যেই বুঁচির মা বিকেলের চা–এর সরঞ্জাম নিয়ে ঢুকে বললেন, হ্যাঁগো, নেংটির তো এখনও কোনও পাত্তা নেই। তোমার কি মনে হয় ও ফিরে আসবে? ফিরে না এলেই বাঁচি অবশ্য, বেড়াল জিনিসটা আমার সহ্য হয় না। কিন্তু বুঁচিটা কী অশান্তি করবে সেই ভাবনায় কাঁটা হয়ে আছি। একটা কিছু অলটারনেটিভ ব্যবস্থা যত তাড়াতাড়ি করা যায় তত ভালো।

পরিমলবাবুর ভুরু কুঁচকে গেল। বুঁচি বড্ড জেদি মেয়ে। নিজে যা ঠিক মনে করবে সেটাই করবে। আট বছর বয়েসে ওর পছন্দের পুতুল কিনে দেওয়া হয়নি বলে ঘরের দরজা বন্ধ করে রেখে সারাদিন বাড়িশুদ্ধু সবাইকে নাকানি–চোবানি খাইয়েছিল। শেষে জানলা দিয়ে লোক ঢোকাতে হয়। কিন্তু নেংটির অলটারনেটিভ কী হতে পারে? বুঁচি কি এখন আর বাচ্চা আছে যে যা হোক কিছু দিয়ে ওকে ভুলিয়ে রাখা যাবে? বিকেল থেকে আলো মুছে কেমন ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে আসছে, পরিমলবাবু যেন হঠাৎ বুঝতে পারলেন, মেয়ে বড় হচ্ছে, এবার জীবনের অজস্র দাবি এসে জড়ো হবে।

বুঁচির ভাই ভটকাই এদিক–ওদিক তাকিয়ে নিশ্চিন্ত হয়। কেউ নেই। মা–বাবা বারান্দায় বসে ঠ্যাং দোলাচ্ছে, কাকা অফিসে, কাকিমা ফোনে কার সঙ্গে গল্প করছে। ও ঘরে ঢুকে আসে। বুঁচির ঘর। সলমন আর শাহরুখের পাশাপাশি রাখা পোস্টার, খাটের ওপর গিটার, জয় গোস্বামীর কবিতার বই, প্লাগে আটকানো মোবাইলের চার্জার, ড্রেসিং টেবিলে রাখা মেক–আপ বক্স। না, এইসব চাই না ভটকাইয়ের। ও খাটের ডানপাশে কাঠের প্যাকিং বাক্সে যত্ন করে তৈরি করা নেংটির বিছানার দিকে চায়। ওখানেই আছে জিনিসটা। বিছানার অয়েল ক্লথ, ছোট্ট তোষক আর খড়গুলো তুলে মাটিতে ফেলে। তোষকটার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে, শালা ন্যাকামোর শেষ নেই। মানুষ ফুটপাথে ঘুমোয় আর এখানে বেড়ালের জন্য অর্ডার দিয়ে তৈরি করা তোষক! বাক্সের তলায় দুটো মেশিন আর তিন বাণ্ডিল দু’হাজার টাকার নোট। ঝটপট মেশিন আর নোট নিয়ে ঝোলা ব্যাগে ঢোকায়। নেংটিকে গালি দেয়, বলে বুর্জোয়া বেড়াল, পালাবার আর সময় পেলি না। এখন মেশিন আর টাকা লুকিয়ে রাখার জন্য আবার নতুন করে জায়গা খুঁজতে হবে। ভটকাইয়ের চোখ কেমন চকচক করে ওঠে। ছবি দ্যাখে, গাছে গাছে ফুল–ফল, মাঠে ধান, পুকুরে টলটলে জলে মাছ, মানুষের পেটে ভাত, মাথার ওপর ছাদ। আহ্, স্বপ্ন! সামনে কঠিন লড়াই, স্বপ্ন পূরণের লড়াই। ও প্যাকিং বাক্সটা আবার আগের মতো সাজিয়ে দেয়, কেউ যেন বুঝতে না পারে। যেমন তেমন ব্যাপার নয়, একে বলে রাজনীতি। ইউনিভার্সিটিতে মিটিং আছে। বুঁচির ঘরের দরজা ভেজিয়ে ভটকাই চটপট বেরিয়ে আসে।

সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতেই দ্যাখে কাকিমা খুব আদুরে স্বরে এখনও কথা চালিয়ে যাচ্ছে। ভটকাই খুব শার্প ছেলে। কাকিমার পার্ট–টাইম বয়ফ্রেন্ডের কথা জানে। কাকা অফিস থেকে ফেরার আগে কাকিমা কথাবার্তা সেরে নেয়। পরকীয়ায় ভটকাইয়ের আগ্রহ নেই। কাকিমা যা ইচ্ছা করুক, পুরনো মূল্যবোধ ভেঙে তৈরি হোক নতুন মূল্যবোধ।

কাকিমা এদিকে ফিসফিস করে বুঁচির বেড়ালের গল্প শোনাচ্ছে। বলছে, বেড়ালটার চোখদুটো না সাংঘাতিক বুঝলে। এই যে আমি তোমার সাথে গল্প করি, ও এসে আমার পায়ের কাছে বসে থাকে, যেন জরিপ করছে। কোথাকার কে আমার বিবেক রে! যেন খুব অপরাধ করছি, এখুনি ধরিয়ে দেবে, ফাঁস করে দেবে সব জালিয়াতি। আমার কী দোষ বলো, শুধু ভালোই তো বেসেছি তোমাকে। পৃথিবীর কোন নিয়মে বলে যে একজনকে বিয়ে করলে আর কারোকে ভালোবাসতে নেই? সামাজিকতা একদিকে থাকুক, মন চলুক নিজের মতো। কিন্তু ওই শয়তান বেড়ালটা প্রতি মুহূর্তে আমায় যেন গিলে খেতে আসত।

প্রেমিক ফোনের ওপাড় থেকে কি বলছে শোনা গেল না। তবে বেড়ালটা যাওয়াতে কাকিমার মনের ভেতরের আরশোলাটার চিড়বিড়ানি যে একটু হলেও কমেছে বোঝা গেল। ভুল–ঠিক, ভালো–মন্দের বিচার কি সত্যই নেংটি করছিল? সামাজিক সংস্কার একই সঙ্গে দুজন পুরুষকে ভালোবাসার অধিকার দেয় না, অনবরত নিজের কাছে নিজেকেই যাচাই করে চলা। ভয়ঙ্কর!

ঠাকুমাও আজ নিশ্চিন্ত। বেড়ালটা যখন–তখন ঠাকুরঘরে ঢুকে পুজোর মিষ্টি, দুধ, কলা যা পেত তাতেই মুখ দিত। তক্কে তক্কে থাকত, দরজায় একটু ফাঁক পেয়েছে কি ঢুকে এসেছে। তবু মনের মধ্যে একটু খচখচানি আছে, বেড়াল বলে কথা, আবার যদি ফিরে আসে। এখনই আপদটা সত্যিই বিদায় হয়েছে ধরে নেওয়া কি ঠিক হচ্ছে?

রান্নাঘরে এ বাড়ির সবসময়ের কাজের মেয়ে চাঁপা আর রাঁধুনি লালু বেড়ালটা যাওয়াতে খুশি। রাত হলে ওরা বাড়ির বারান্দায় আর সিঁড়ির নীচে শোয় মাদুর বিছিয়ে, বেড়ালটা শুত তোষকে মাথা রেখে, ওরা কী খেল না খেল কারুর নজরে নেই, কিন্তু বেড়ালের জন্য রোজ আলাদা করে মাছ আসে বাজার থেকে, জ্বর–অসুখবিসুখ কিছুতেই কামাইয়ের জো নেই, আর বেড়াল একটা হাঁচি দিলেও সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার ডাকা হচ্ছে। এইসব ন্যাকাপনা ওরা মোটেও ভালো চোখে নেয়নি এতদিন। কিন্তু বাড়ির কাজের লোকের তো আর এইসব বিষয়ে বক্তব্য থাকতে নেই, তাই চুপচাপ ছিল। তবে নেংটির জন্য ওদের দুঃখ একেবারেই নেই।

চাঁপা বলছিল, বুঁচিদিদি মেয়েটা একটা চিজ। একসঙ্গে সাত–আটটা ছেলেকে খেলাচ্ছে। পারমানেন্ট ওই ভোম্বলটা। সেদিন ঘর মুছতে গিয়ে বুঁচিদিদির খাটের তলায় একটা কনডোমের প্যাকেট পেয়েছি। তার যা জেদ, দ্যাখো, বেড়াল না পাওয়া গেলে এখন কী তুলকালামটাই না করে। জিনিসপত্র ভাঙবে, বালিশ ছিঁড়ে তুলো ওড়াবে, বাড়িতে কেউ টিকতে পারলে হয়। বড়লোক বাপের অবাধ্য মেয়ে হলে যা হয় আর কি!

বুঁচির মেজাজ নিয়ে বাড়ির সক্কলে তটস্থ। রাত ন’টা বাজতে চলল। এখনও সে বাড়ি ঢোকেনি। ফিরলে যে কী হবে! পরিমলবাবু ঘণ্টা দুয়েক আগে কোথায় বেরিয়েছিলেন, একটু আগেই বাড়ি ফিরেছেন, সঙ্গে একটা বড় প্যাকিং বাক্স। কি এনেছেন বোঝা যাচ্ছে না। নতুন কোনও বেড়াল?

নেংটি বসে আছে হেল্পার পটাইয়ের সিটে। কলকাতার কাছে চলে এসেছে, মনটা খুশ হয়ে আছে। রাস্তায় খুব জ্যাম, তাই দেরি হচ্ছে একটু। ধনঞ্জয় এদিকে ঢুকু ঢকু। অনেকগুলো পাত্তর পেটে পড়েছে। মুখ থেকে ভকভক করে গন্ধ আর আবেগ বেরিয়ে আসছে। এ হল খাঁটি বাংলার কামাল। একটু আগেই হড়হড় করে বমি করেছে, ফের গলায় ঢেলেছে। বমি অল্প ছিটকে এসেছে নেংটির লেজে। গাবদা–গোবদা মানুষটাকে ছোট্ট ছেলে মনে হচ্ছে। এত কঠিন যে নেংটি, বাংলাদেশের কাছাকাছি স্রেফ কয়েকটা শুঁটকি মাছের লোভে যে অ্যাডভেঞ্চার করে আসতে পারে, তারও ইচ্ছে করছে ধনঞ্জয় নামের এই মানুষটাকে একটু ভালোবাসা দিতে।

বকবক বকবক। বলেই চলেছে লোকটা, বুঝলি ম্যাও, নারকেলডাঙায় একটা দোতলা বাড়ির একতলায় দুটো ঘর ভাড়া নিয়ে থাকি। বাড়িটা দেখলেই মনে হবে এখুনি ভাঙবে। সামনে পাঁঠার দোকান, মাংস ঝোলে। একটু দূরে গরু বিক্রি হয়, মাছি ভিনভিন। কর্পোরেশনের কল থেকে জল খাই, চৌকির ওপর খালি গায়ে, লুঙি উঠিয়ে হাত–পা ছড়িয়ে ঘুমোই রাতে। মায়ের বয়স পঁয়ষট্টি। সে বুড়ি ভাত গুছিয়ে দেয় থালায় আর খিটখিট করে। জ্ঞাতি–গুষ্টি, আত্মীয়–স্বজনেরা কেউ খবর নেয় না। দুনিয়াটার এমনই নিয়ম রে ম্যাও, টাকা না থাকলে তোমার কেউ নেই, বউ–ও নেই।

নেংটি বলে, ফ্যাঁচ!

–ফ্যাঁচ কী রে? দুনিয়াটা চলে নিজের নিয়মে। আমার তো নসিব ফুটো। বাবা দিব্যি হাত–পা এলিয়ে, টাকা–পয়সা গুবলেট করে মরে গেছে। ব্যাস, কাকা–জ্যাঠারা খেদিয়ে দিয়েছে। ধুর শালা, লড়াই করে বাড়ির দখল নিতে ভালো লাগেনি বুঝলি। মা–কে নিয়ে বস্তিতে উঠেছি, গয়না বেচে টেম্পো কিনেছি। শালা পড়াশোনা হয়নি, কে কাজ দেবে? এখন এই টেম্পো ভাড়া দিয়ে করে খাচ্ছি। বড্ড কষ্ট রে! আমার যে কেউ নেই। তুই ছেড়ে যাস না রে ম্যাও, তোকে আমি ভালোবাসা দেব। রাতে আমার বিছানায় ঘুমোবি, আমার পাতের এঁটো–কাঁটা খাবি। কেউ নেই আমার, তুই থাক।

নেংটি গোঁফের ফাঁকে হাসে, ভাবে, আমার বয়ে গেছে থাকতে। আমার ভালোবাসার লোক আছে, বুঁচি, বুঁচির পরিবার। তুই বলে একটা মাতাল, তোর এঁটো খেতে যাব কোন দুঃখে?

ধনঞ্জয় ওর হাসি দেখতে পায় না। চোখ থেকে জল গড়ায়। মাতালের কান্না। একবার শুরু হলে থামা মুশকিল।

ব্যাপারটা যত সহজে মিটে যাবে বলে ভেবেছিল বুঁচি, তত সহজে মিটল না। ফলে ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস করতে যাওয়া হল না। এখন সাড়ে ন’টা। এবার বাড়ি ফিরতে হবে। গঙ্গার ঘাটে, সিঁড়ির ধাপ থেকে উঠতে যেতেই ভোম্বল ওর হাত ধরল। বলল, কোথায় যাচ্ছিস?

–বাড়ি।

–বাড়িতে গিয়ে কী বলবি?

–মায়ের কাছে যাব। জড়িয়ে ধরব, বলব, মা প্রেগনেন্সি টেস্টের রিপোর্ট পজিটিভ। আমি মা হতে চলেছি। বাচ্চার বাবা কে বলব না। কারণ সে আমাকে অ্যাবরশন করার পরামর্শ দিয়েছে। তার চাকরি নেই, অল্প বয়েস। এই বয়েসে এতটা দায়িত্ব সে নেয় কী করে! তবে হ্যাঁ, বাচ্চাটাতো আর আমি একা একা তৈরি করিনি। সে যাক, কারওকে দিয়ে জোর করে কিছু করানো আমি পছন্দ করি না। বাচ্চাটা আমি নষ্ট করব না। আমার শরীর, তাই নিযে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমার একার। তোমাদের আপত্তি থাকলে বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও যাচ্ছি।

–তুই কি পাগল হয়ে গেছিস? কাকু–কাকিমাকে এইসব কথা বলবি?

–না বলে আর উপায় কি বল? তোকে তো বললাম আমার সাথে চল। একসঙ্গে ওদের সামনে দাঁড়াই। তুই রাজি হলি না। শালা ভালোবাসার সময় মনে ছিল না? ভাবিস না আমি ভয় পাচ্ছি। যা ঠিক করেছি তাই করব। তোকে আমার দরকার নেই।

–আমাকে তোর দরকার নেই? ঠিক বলছিস? আমাকে ছাড়া আর কারওকে ভালোবেসেছিস কোনওদিন?

বুঁচি উত্তর দিল না। মন ভালো নেই। গত সপ্তাহেই জেনেছে ব্যাপারটা। তারপর থেকেই অন্যমনস্ক। বোধহয় নেংটিকেও অবহেলা করেছে। তাই হয়ত অভিমানে চলে গেছে বেড়ালটা। ও কীভাবে বুঝবে যে বুঁচি আর আর আগের মতো নেই, বড় হয়ে গেছে, জীবনের অসংখ্য চাওয়া–পাওয়া সামনে এসে পাঁচিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই পাঁচিলের সামনে নেংটি কোথায়? কোথাও নেই।

ভোম্বল উঠে দাঁড়িয়ে প্যান্ট ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, আলোক সরকারের কবিতা পড়ছিলাম বুঝলি। উনি লিখেছেন, যারা ভালোবাসতে জানে, তারা মনে রাখতেও জানে। আমিও তোকে মনে রাখতে চাই বুঁচি, ভুলে যেতে নয়। আমার জায়গায় থাকলে তুইও হয়তো আমার মতো রিঅ্যাক্ট করতি। চল, তোর মা–বাবার কাছে যাই। ভালোবাসাটা তো আর অপরাধ নয়। সেই সকাল থেকে এই নিয়ে হাজার রকম কথা বলেছি আমরা। মনে হচ্ছে কেউ কাউকে চিনি না। আর ভালো লাগছে না। তোর চোখ বিশ্বাসহীন হয়ে যাচ্ছে, আমার সহ্য হচ্ছে না। বিশ্বাস ছাড়া কী নিয়ে বাঁচবি তুই?

বুঁচির চোখ চকচক করে উঠল। বলল, তুই যাবি? সত্যি? আমাকে একা একা সমস্ত কিছু ফেস করতে হবে না? সত্যি বলছিস?

ভোম্বল ঘাড় নাড়ল।

ধনঞ্জয়ের টেম্পো থেমেছে সিগনালে। জায়গাটা চেনা চেনা মনে হল নেংটির। কেমন গড়িয়াহাট গড়িয়াহাট গন্ধ। এখানে মাল ডেলিভারির কাগজপত্র জমা দিয়ে তবে ধনঞ্জয় ফিরবে নারকেলডাঙায়। আসবার পথে কতবার যে নেংটির গলায়, মাথায় আরাম দিয়ে দিয়েছে। এমনকী চায়ের দোকান থেকে কিনে দুধও খাইয়েছে। নেংটি বেশ গর্ব করে ভেবেছে, এমন চেহারা, একটা মালখোর ড্রাইভারও আমার প্রেমে পড়ে গেছে। তবে এখন চেনা জায়গা দেখে নেংটির মন আনচান করে উঠল। একটু এগোলেই টেলিফোন এক্সচেঞ্জের কাছে বুঁচির বাড়ি, নেংটির বাড়ি। কোথাকার কে মদখোর ধনঞ্জয়, তার জন্য এই নোংরা, বমি মাখা টেম্পোতে বসে থেকে লাভ নেই। লোকটা বসে ঢুলছে। নেংটি দেখল এই সুযোগ। টেম্পোর ছোট কাচের জানলা দিয়ে আলতো পায়ে লাফ দিল। নরম থাবা পিচ রাস্তায় ঝড় তুলে দৌড় লাগাল বাড়ির দিকে। ধনঞ্জয় টের পেল না, যাকে একাকীত্বের সঙ্গী বানাতে চাইছে, সে কোথায় হাওয়া হয়ে গেল।

নেংটি বাস–অটো–ট্যাক্সির ভিড় কাটিয়ে চওড়া গলিটায় ঢুকে পড়ল। ভাবল, এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঁচির নাওয়া–খাওয়া মাথায় উঠেছে, বাড়ির লোকজনেরা আমায় খুঁজতে পুলিশে গেছে, হুলুস্থুলু কাণ্ড, হইচই ব্যাপার। আহ্, কী সুখ! আমাকে কেউ এতটা ভলোবাসে, আমার জন্য কারুর জীবন অন্যরকম হয়ে যেতে পারে ভাবলে আরাম হয়, মাছের কাঁটা চিবোনোর মতো আরাম। ওই তো বাড়ি দেখা যাচ্ছে। এত রাতেও আলো নেভেনি। তার মানে সব্বাই চিন্তায় জেগে বসে আছে। হঠাৎ করে নেংটিকে দেখতে পেয়ে সকলে কী খুশিটাই যে হবে, বুঁচি বোধহয় ছুটে এসে জড়িয়ে ধরবে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল ও। গায়ে এখনও ধনঞ্জয়ের বমির গন্ধ। ইসসস্!

একতলা খালি, দোতলা থেকে চিৎকারের আওয়াজ আসছে। সবাই তার মানে ওপরে জড়ো হয়ে কীভাবে কী করা যায় তার মিটিং–এ বসেছে। সিঁড়ির আলো নেভানো। নেংটি অন্ধকারে উঠে দাঁড়াল। সামনের বারান্দায় সকলে বসে, পরিমলবাবু, বুঁচি, ভোম্বল, বুঁচির মা, ভাই, কাকু–কাকিমা, ঠাকুমা সবাই। নেংটি চুপ করে শোনার চেষ্টা করল। বুঁচি বলছে, আমি ভোম্বলকে ভালোবাসি বাবা। অ্যান্ড আই অ্যাম প্রেগনেন্ট। একটু বোঝার চেষ্টা করো।

সবাই হইহই করছে। বুঁচির চোখে আবছা জল। নেংটির কথা কই কেউ বলছে না তো!

বুঁচির মা কি কিছু বলছে? নেংটি আবার শোনে, বলছে, অলুক্ষণে বেড়ালটা সকালে বিদেয় হয়েছে, ভাবলাম আপদ গেছে। তুই আবার কোথা থেকে এইসব ঝামেলা বাঁধালি? আমাদের কথা একটুও ভাবলি না। কবে এত বড় হলি? জীবন কবে এত বদলে গেল তোর? আমরা যে কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমাদের কাছে তুই সেই ছোট্ট বুঁচিই রয়ে গেলি! সারাদিন আমরা ভাবলাম নেংটিকে নিয়ে তোর মন খারাপ। সন্ধে হতে না হতেই তোর বাবা, এই দ্যাখ, তোর জন্য এই পাগ কিনে এনেছে। থ্যাবড়ামুখো কুকুর, তোর নতুন পেট। কিন্তু…

–নেংটি, এই পাগ কুকুরটা, ওরা আমার জীবন না মা… আমার ভেতর একটা শরীর, পাশে আমার ভালোবাসা। আমি সত্যিই তোমাদের সেই ছোট্ট মেয়েটা নেই যে বেড়ালের জন্য পাগলামো করব। এই সামান্য মনখারাপগুলো এখন আমি নিজেই হ্যান্ডেল করতে পারি। প্লিজ, আমার সামনে এখন অনেক বড় একটা বিষয়, সেটার দিকে তাকাও। নেংটি কোথায় পালালো, তাই নিয়ে আলোচনা আমরা পরে করব। তোমরা আমার বড় হওয়াটা কেন যে দেখতেই পেলে না মা! কেন?

এত আলোচনা, এত অসৌজন্য থেকে নেংটি চুপচাপ নেমে আসে। বারান্দা দিয়ে হেঁটে রাস্তায়। ভাবে, এখানে আমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। সবার প্রয়োজন একসময় ফুরিয়ে যায়, আমারও না হয় ফুরলো। কিন্তু কোথায় যাব এখন? গায়ে বমির গন্ধ শোঁকে। ভালো লাগে। ধনঞ্জয়ের কান্না মাখা মুখটা মনে পড়ে। নারকেলডাঙ্গা কত দূর? শিয়ালদা পর্যন্ত গেলে ও ঠিক চিনে নিতে পারবে।

আচ্ছা, বুঁচিকে ভালোবেসে, নিজের আশ্রয় ভেবে নেংটি কি ভুল করেছিল? না, তা কেন? সে মুহূর্তের সবটুকু ভালোবাসা ছিল খাঁটি। কিন্তু জীবন বদলে যায়, মানুষ বদলে যায়, পরিস্থিতিও। প্রকৃতি এমন ভাবে তৈরি করেছে আমাদের, ভুলে যে যাব তা জেনেই যেন প্রতিদিন মনে রাখার চেষ্টা। একটুও ফাঁকা রাখার উপায় নেই। কোথা থেকে কে ঢুকে পড়ে মনের গভীরে। মূল্যবানকে ধরে রাখতে কি কম কাঠখড় পোড়াতে হয়! নতুন নতুন ভালোবাসা খুঁজতে খুঁজতে এমনই আমাদের বেঁচে থাকা। এমনই অজস্র হারিয়ে যাওয়া মনুষের মুখ, মুখের মিছিল। আরও কত নতুন মানুষ।

নেংটি হাঁটতে থাকে। বুঁচি নেই তো কী? নতুন কাউকে ভালোবাসা উজার করে দেবে। একা? না একা বলে আবার কিছু হয় নাকি? পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ প্রতিদিন একা। আর সম্মিলিত একাদের ভিড়ে সবাই আমরা একসঙ্গে। প্রিয়জনের কাছে অনবরত নিজের দাম যাচাই করা।

সফিস্টিকেটেড, সাদা লোমের নেংটি নারকেলডাঙা বস্তিতে ভালোবাসা, সাহচর্য, বন্ধুত্ব চাওয়া ধনঞ্জয়কে খুঁজতে থাকে। কোথায় ও? কোন ঘরে?

নোংরা ঘরে ভুঁড়ি উঁচিয়ে শুয়ে আছে ধনঞ্জয়। বিড়বিড় করে আওড়ে চলেছে ছোটবেলাকার ছড়া, কাল ছিল ডাল খালি/ আজ ফুলে যায় ভরে/ বল দেখি তুই মালি/ হয় সে কেমন করে? ওর একা একা ফিরে আসার ঘর। একার বিছানা। পাশের ঘরে বুড়ি মা। একটু জিরোতে দিল না এই পৃথিবীটা, একটু নিশ্চিন্তে ভালোবাসা পাওয়ার যো নেই। আবার কাল নতুন দিন, একইরকম। আবার কাল শুঁটকি বোঝাই টেম্পো। কোথায় চলে গ্যাল ম্যাও? কেন গেল? হলই না হয় বেড়াল, তবু প্রাণ তো। ধুকধুক করা বুক। বুকের সঙ্গে আরেকটা বুক জাপটে ধরে থাকা। ধনঞ্জয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে। দরজায় আওয়াজ হয়। বিছানায় লাফ দিয়ে উঠে আসে আলতো দুটো পা। হাতে ঠেকে নরম লেজ। ধনঞ্জয় ফিসফিস করে বলে, কে?

নেংটি আদুরে স্বরে জবাব দেয়, ম্যাও!

চিত্রকর: মৃণাল শীল

Comments are closed.