সোমবার, অক্টোবর ২১

মেঘার অপ্রাপ্তি ও প্রাপ্তি

দেবদাস কুণ্ডু

 ফেব্রুয়ারি মাস। নরম আলোর মতো রোদ। শীত রয়েছে বাতাসে, ডিউটি ব্যাগ আর টিফিন নিয়ে হাসপাতাল।

ডিউটি শেষ দুটোয়। নার্সিংরুমে ড্রেস চেঞ্জ করে পরে নিল চুড়িদার। বাইরে একটা শোঁ শোঁ শব্দ হচ্ছে। জানলার সামনে দাঁড়াতে বুঝল কাঁচের বাইরেটা চাল ধোয়া জলের মতো ঘোলাটে। বেশ বৃষ্টি হচ্ছে। এই সময় বৃষ্টি!

আয়নায় চুল ঠিক করল মেঘা। সামনের কিছু চুল সাদা। মাঝে মাঝে রং করে। তখন মনে হয় কে দেখবে তাকে? তার তো কেউ নেই। বাবা মা ভাই বোন, কেউ নেই, এক মাসি ছাড়া। আবার নিজেই যুক্তি দেয় সারা দিনে ক’বার তো আয়নায় দাঁড়ানো হয়। তখন সবকটা চুল কালো থাকলে মুখের রূপটাই পালটে যায়। মনটাও ভালো লাগে।

‘দিদি যাবেন কি করে?’ ওয়ার্ড বয় আকাশ বলে।

‘দেখ তো ওয়ার্ডে কারও কাছে ছাতা পাস কি না।’

আকাশ মেল ফিমেল দু’টো ওয়ার্ড ঘুরে এসে বলে, ‘দিদি কারও কাছে ছাতা নেই। একটা ট্যাক্সি ডেকে দিচ্ছি। একেবারে বাড়ির কাছে গিয়ে নামবেন।’

‘না, না, ট্যাক্সির দরকার নেই। থামুক বৃষ্টি তারপর যাবো।’

মেঘা জানে, তার জন্য বাড়িতে কেউ অপেক্ষা করে নেই। দেরি হলে কিছু যায় আসে না।

জানালার দিকে চোখ রেখে বৃষ্টি দেখতে দেখতে হঠাৎ তার বাবার কথা মনে পড়ল। তখন সে কিশোরী। বর্ষাকালে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে স্কুল থেকে বাড়ি আসত। বাবা বকত আর মাথা মুছিয়ে দিত গামছা দিয়ে। মা বকাবকি করত। আর বলত, ‘এখন ঘন ঘন বৃষ্টিতে ভিজে আসছে, দেখবে একদিন মাথার ব্যামো হবে।’

হলও তাই। মার কথাই সত্যি হল। সেই মা দু’দিনের জ্বরে চলে গেল। বাবা শোক সহ্য করতে না পেরে হাসপাতালে যাবার পথে চিরতরে ঘুমিয়ে পড়ল। পৃথিবীতে একা হয়ে পড়ল মেঘা। এখন সে কী করবে?

মাসি বলল, ‘আমি আছি না! আমার কাছে থাকবি। পড়াশুনা করবি। চাকরি করবি। বিয়ে করবি। সংসার হবে। আর নিজেকে একা মনে হবে না।’

বারো ক্লাস পাশ করে বি. কম অনার্সে ভর্তি হল। একদিন কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে নার্সিং ট্রেনিং-এর জন্য অ্যাপ্লাই করল। সবে তখন ফার্স্ট ইয়ার শেষ হয়েছে। পড়াশুনা ইতি টেনে চলে গেল নার্সিং ট্রেনিং-এ।

‘দিদি বৃষ্টি থেমে গেছে। বাড়ি যাবেন না?’ আকাশ বলল। জানলার বাইরেটা পরিষ্কার। বুঝতে পারেনি। আসলে ভাবনার জগতে ছিল তো! মেঘা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে নীচে নেমে অটো ধরল। দশ মিনিট। মুচিবাজার নামল। ঝির ঝির বৃষ্টি। তারপর বড় বড় ফোঁটা। এবার কি হবে? চাদরটা মাথায় দিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটতে থাকল। দশ মিনিট হাঁটার পর ফ্ল্যাটে। রাতের খাওয়া সেরে উঠতে বুঝল মাথার শিরা লাফাচ্ছে। একটা ভেসোগ্রেন খেল। তীব্র বমি বমি ভাব আসছে।

দুই

কলিং বেল বাজল। মাথার যন্ত্রণা নিয়ে মেঘা দরজা খুলে দিল। পূর্ণিমা ঢুকল। পূর্ণিমা কালো। দিন দিন আরও কালো হয়ে যাচ্ছে। কালো মানুষের দুঃখের সান্ত্বনা হলো, নাম পূর্ণিমা। পূর্ণিমা বলল, ‘শরীল খারাপ নাকি?’

‘ঐ মাথার যন্ত্রণা।’

‘কতদিন ধরে শুনছি। কবে কমবে বলো তো?’

‘কে জানে।’ মনে পড়ল ডাঃ গাঙ্গুলির কথা। প্রথম পোস্টিং রামপুরহাট থেকে বদলি হয়ে কলকাতা মেডিকেল কলেজ। নিউরো ওয়ার্ডে ডিউটি। ডাঃ গাঙ্গুলি শুনে একটা ছ’ মাসের কোর্সের ওষুধ দিলেন। ছ’মাস বেশ ভালো। তারপর একদিন ট্রেনে যাচ্ছিল কোথায় যেন, বাড়ি ফিরে কী যন্ত্রণা! পরদিন ওয়ার্ডে ডাঃ গাঙ্গুলিকে বলতে বললেন, ‘মাইগ্রেন সারে না। পঞ্চাশ হলে আপনি কমে যাবে।’

মেঘা এখন পঞ্চান্ন। রোগটা যায়নি। আসলে সব হিসেব সব সময় মেলে না। মেডিকেল সায়েন্স বলো আর জীবন বলো, না হলে হঠাৎ মা, বাবা মারা যাবে কেন তাকে একা করে দিয়ে? একটা ভাই বা বোন রেখে গেল না কেন! কার কাছে সে নিজের দুঃখ আনন্দ শেয়ার করবে? তার জীবনটা তো এখন ওয়ান রুম ফ্ল্যাটের মতো। একটা ঘর। একটা মানুষ।

‘ওষুধ খেয়েছ।’ পূর্ণিমা বলল, ‘চা করি?’

‘ওষুধ খালি পেটে খাবো? আগে চা খাই তারপর…।’

চা খেতে খেতে মেঘা বলল, ‘ঠাকুরের বাসন কটা মেজে দিও তো।’

‘আজ পারব না। শরীল খারাপ হয়েছে। পিঙ্কি মেজে দেবে।’

মেঘার এখন এসব পাট নেই। ৪০ বছর বয়সে ধরা পড়লো জরায়ুতে টিউমার। টিউমার আর জরায়ু দুটো বাদ দিয়ে এ জীবন এখন নিশ্বাস নিচ্ছে। বিনিময়ে দিতে হল নারীর লাবণ্য। বুকের ভিতর ধু ধু শূন্যতা।

#     #   #

মোবাইল বাজছে। পূর্ণিমা চলে গেছে, পিঙ্কি ঢুকল, ‘কি গো মোবাইল বাজছে। শুনতে পারছ না।’ বলে পিঙ্কি মোবাইলটা মেঘার হাতে দিল। স্ক্রিনে আকাশ নামটা ভাসছে।

‘কি ব্যাপার ফোন করছিস কেন?’

‘আজ কখন ডিউটি?’

‘আজ ডিউটি যাচ্ছি না। মাথা যন্ত্রণা হচ্ছে।’

ইনকাম ট্যাক্সের কাগজে সই করতে হবে। কাল ফার্স্ট আওয়ারে পাঠাবে কৃষ্ণেন্দুদা। তুমি কি কাল মর্নিং-এ আসছ?’

‘না। ৭২ ঘণ্টা আগে যন্ত্রণা কমবে না।’

‘তাহলে কখন যাবো?’

‘সন্ধ্যা ৭টায় আয়।’

ফোনটা রেখে মেঘা বলল, ‘পিঙ্কি ঠাকুরের বাসনগুলো একটু মেজে দিয়ে যাস তো।’

‘এই বললে মাথার যন্ত্রণা  হচ্ছে। এর মধ্যে পুজো দেবে কি করে? তোমার  তো আবার এক ঘণ্টা লাগে পুজো দিতে।’

‘তুই শুধু এক ঘণ্টা দেখলি? আমি যে কি শান্তি পাই ঠাকুরের কাছে বসে তুই কি বুঝবি! প্রতিদিনের দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা সব ঠাকুরের পায়ে অঞ্জলি দেই। মন হালকা হয়, শান্তি পায়।’

‘পারও বটে তুমি! একটা কথা বলবো?’

‘বল।’

‘আচ্ছা তুমি বিয়ে করলে না কেন? তুমি তো ফর্সা, চাকরি করো। দেখতে সুন্দর!’

‘মাথা যন্ত্রণা নিয়ে তোর সঙ্গে এসব নিয়ে বকবক করি! যা বাসনগুলো মাজ গিয়ে। তারপর রান্না করে বাড়ি যা।’

পিঙ্কি বাসন নিয়ে বারান্দার কলেতে চলে গেল। ওটা শুধু ঠাকুরের জন্য।

মেঘার মনে পড়ল স্বপ্ননীলের কথা। বি. কম ফার্স্ট ইয়ার। কো-এডুকেশন কলেজে প্রথম দিনেই আলাপ স্বপ্ননীলের সঙ্গে। স্বপ্ননীল গল্প লেখে। আউটট্রাম ঘাট, দক্ষিণেশ্বর মন্দির চত্বর, ভিক্টোরিয়ার বেঞ্চে বসে কত গল্প শুনিয়েছে। এক একটা গল্প চমকে দিত তাকে। এভাবে গড়ে উঠল ঘনিষ্টতা। তারপর ভালোবাসা। স্বপ্ননীলের জন্মদিনে দিল একটা সাদা কার্ড, তাতে লেখা, ‘তোমার প্রতিটি জন্মদিন গোলাপের মতো রক্তিম হোক। শিউলির মতো গন্ধময় হোক  আর অশ্বত্থের মতো আয়ু হোক। তার নীচে ছোট্ট করে তার প্রেম নিবেদন ছিল। সে চেয়েছিল বি. কম পাশ করে চাকরি করবে। স্বপ্ননীল শুধু গল্প লিখবে। তার ফেরার অপেক্ষায় থাকবে। তাকে পাগলের মতো ভালোবাসবে। ভুল হলে শাসন করবে। আবার স্নেহের স্পর্শে আর্দ্র করে দেবে তার হৃদয়। স্বপ্ননীলই হয়ে উঠবে তার প্রেমিক, স্বামী, বন্ধু, বাবা, মা, ভাই সব। কোনও শূন্যতা থাকবে না। সব পূরণ করবে স্বপ্ননীল। কিন্তু দিন পনের চলে যায়। মাস চলে যায়। স্বপ্ননীল সাড়া দিলো না। এদিকে নার্সিং ট্রেনিং-এ চলে এল সে। আর দেখা হল না স্বপ্ননীলের সঙ্গে। এক বুক শূন্যতা নিয়ে কলেজ ছাড়ল।

হঠাৎ ডোর বেল বেজে উঠল। পিঙ্কি দরজা খুলে বলল, ‘একজন দেখা করতে চাইছে।’

খাটে শুয়েছিল মেঘা। উঠে বসে বলল, ‘ঘরে নিয়ে আয়।’ একটি  সৌম্য দর্শন যুবক ঘরে ঢুকে বলল, ‘নমস্কার। আমার নাম ঋতব্রত। গান শেখাই। সঙ্গীতা ম্যাম আমাকে পাঠিয়েছ।’

‘কিছু মনে করবেন না। আজ আমার খুব মাথা যন্ত্রণা করছে। আপনি দু’দিন পর ফোন করুন। আমিই শিখব।’

ঋতব্রত চলে যাবার পর মেঘা হারমোনিয়ামটার দিকে তাকাল। গত মাসে স্টেশন রোডের ‘সুর তরঙ্গ’ দোকান থেকে পাঁচ হাজার টাকায় কিনেছে। গানের চর্চা তার ছিল স্কুল লাইফে। কলেজে উঠে বাদ হয়ে গেল পড়ার চাপে। আবার গানের চর্চা করবে নতুন করে সুর ভাজতে। হয়ত সঠিক হবে না তাল লয় সুর। একজন শিক্ষক পথ দেখাবে। কিছুটা তো হবে। এখন তো গান শেষ নয়। নিজের আত্মাকে শোনাল নিজের কণ্ঠের সুর। বুকের ভিতর যে দুঃখগুলো জেগে ওঠে, সুর তাল লয় দিয়ে সেগুলোকে ঘুম পাড়ানো। গানের জোয়ারে নিঃসঙ্গতাকে দূর দেশে বিদায় দেওয়া।

‘কি রান্না হবে বলবে তো?’ পিঙ্কি বলে।

‘যা পারিস করে যা।’

তিন

আকাশ ঘরে ঢুকে সোফায় বসে কাগজগুলো এগিয়ে দিল।

ডাইনিং টেবিলের ওপর কাগজ রেখে পর পর সই করে দিল মেঘা। পড়ল না কিছুই। ইনকাম ট্যাক্সের জটিলতা তার মাথায় কোনওদিন ঢোকেনি। কেউ যদি তাকে জিগ্যেস করে, ‘তোমার স্যালারি কত? অনেক ভেবে মেঘা বলবে, ‘কৃষ্ণেন্দুদা জানে।’ ‘কে কৃষ্ণেন্দুদা?’ ‘আমাদের হাসপাতালের ক্লার্ক। যিনি স্যালারি শিট বানান।’ অনেকে অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। অদ্ভুত মানুষ তো? কিন্তু মেঘা জানে, জীবনের হিসেব যেখানে মেলেনি, সেখানে অন্য যাবতীয় হিসেব মিলল কি মিলল না তাতে যায় আসে না। জীবনের হিসেব মিললে অপার আনন্দ। কিন্তু না মিললে সীমাহীন শূন্যতা।

‘আচ্ছা শরীর খারাপের কথা বলছিলে। কি হয়েছে তোমার?’

আকাশের কথায় মেঘা বলে, ‘তুই তো জানিস। আমার মাইগ্রেন আছে।’

‘তা তুমি তো অনেক চিকিৎসা করেছ। তুমি তো জানো আমি টাচ থেরাপি করি। একবার দেখতে পারো।’

‘বড় বড় নিউরোলজিস্ট ফেল, তুই বলছিস…।

‘আ-হা। একবার করে দেখতে দোষ কি? ঘরের আলো নিভিয়ে দিতে হবে। আর প্রদীপটা জ্বলবে।’

মেঘা কিন্তু কিন্তু করে। তার পঞ্চান্ন, আকাশ ২৫ বা ২৭। ৫৫ বছরের সন্ন্যাসিনী…। তবু অবিশ্বাস বুকের মাঝখানে পাহাড়ের মতো দাঁড় করিয়ে রাখতে হয়। ঘরের আলো নিভল, মাটির প্রদীপ জ্বলল। শরীর রিলাক্স করে খাটের ওপর শুয়ে পড়ল মেঘা। চোখ বন্ধ করল। আকাশ বলল, ‘বাইরের জগৎ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে প্রিয় মানুষের মুখ কপালের মাঝখানে ভাসিয়ে রাখো।’

মেঘা ভাবে সে কার মুখ ভাসাবে? সে স্বপ্ননীলকে চেয়েছিল। ওর মুখটাই তার কাছে প্রিয় মানুষের মুখ হয়ে উঠতে পারত। স্বপ্ননীল। স্বপ্নের মতো বিলীন হয়ে গেছে। বলে, ‘আকাশ আমার তো কোনও প্রিয় মানুষের মুখ নেই। আমি কি করব?

‘তুমি ওঁ ভাবো।’

আকাশ মেঘার পঞ্চান্ন বছর বয়স্ক কপালে ময়েশ্চারাইজার ঢেলে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে প্রলেপ দিল। তারপর দু’হাতের আঙুলগুলো কপালের শিরাগুলোর ওপর বোলাতে থাকল যেন অবাধ্য শিশুকে আদর দিয়ে শান্ত করছে। যন্ত্রণাময় শিরাগুলি শীতল স্পর্শে কেমন নিস্তেজ হয়ে আসছে।

আকাশ জ্বলন্ত প্রদীপের শিখার ওপর হাত রেখে তপ্ত করল তালু। তারপর সেই হাতের উষ্ণতা মেঘার সারা কপালে চেপে চেপে ছড়িয়ে দিল। শিরাগুলো নিস্তেজ হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

মেঘার যখন ঘুম ভাঙল দেখল ঘর অন্ধকার। প্রদীপও জ্বলছে না। ডাইনিং স্পেসের আলোয় আকাশ কাগজ পড়ছে। মেঘা ডাক দিল। আকাশ ঘরে এল, ‘কেমন লাগছে?’

‘মাথাটা বড্ড হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে মাথার ভিতর কোনও শিরা উপশিরা নেই।’

‘ঠিক আছে, আজ চলি’

‘কাল কখন আসবি?’

‘কাল দেরি হবে। আটটা বেজে যেতে পারে।’

‘কেন?’

‘কাল ঢাকুরিয়া যাব। ওখানে একটা পেশেন্ট আছে। নাম করবী।’

‘তারও কি আমার মতো…’

‘না, না, ওর বাবা-মা কার অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। ভীষণ শক পেয়ে কোমর থেকে পা পর্যন্ত অবশ হয়ে গেছে। মডার্ন সায়েন্স সুস্থ করতে পারেনি। আমার চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছে।’

‘তাই!’ মেঘা অবাক হয়ে আকাশকে দেখে। আকাশের মতোই নীল চোখ ওর। নামটা সার্থক।

চার

গীতাঞ্জলি ঘড়িতে আটটার ঘণ্টা বাজল। বিছানায় শুয়ে টের পেল মেঘা। সেই মেন রাস্তায় সদ্য করা ঘড়িটার নীচে রবীন্দ্রনাথ দাঁড়িয়ে। হাতে বই। এত ভিতরেও শোনা যায় ঘণ্টার ধ্বনি। বাতাসে ভেসে আসে।

এখনও এল না আকাশ। অবশ্য ঢাকুরিয়া থেকে উল্টাডাঙা! সময় তো লাগবেই।

মেঘার খুব আনন্দ হচ্ছে আজ। যন্ত্রণাটা কম এই জন্য নয়। আকাশ আসছে শুধু তার জন্য। এর আগে একদিন এসেছিল। সেদিন ওয়ার্ডে ফোন ফেলে এসেছিল মেঘা। আজ আসবে তাকে স্পর্শ চিকিৎসা দিতে। হাত দিয়ে ভালোবাসার স্পর্শে মানুষকে যন্ত্রণামুক্ত করছে। আবার এই হাতই হয়ে উঠছে হিংস্র, খুন করছে। তার অর্থ এই হাতেই জীবন। এই হাতেই মরণ। আকাশ না এলে এই উপলব্ধি তার হত না। আকাশ আসবে কলিংবেল বাজবে। সারা দিনে বেলটা দু’বার বাজে। একবার পূর্ণিমা, আর একবার পিঙ্কি। তারপর সারা দিন ঘুমায় কলিং বেলটা। ওর কোনও দোষ নেই। কেউ যদি হাত না রাখে ওর গায়ে তবে বাজবে কেন? অর্থাৎ সেই হাত, তার স্পর্শ।

#     #   #

একটু রাত করেই আকাশ এল। মেঘা বলল, ‘রাত যখন হল, তুই আজ আমার এখানে খেয়ে যাবি। আকাশ মাথা নাড়ল, বলল, তার মা খাবার নিয়ে বসে থাকবে।

কষ্ট হল মেঘার। তার জন্য কেউ বসে নেই, সে এতটাকাল একা একা ভিখিরির মতো খেয়ে আসছে।

‘আজ কেমন আছো?’

‘ভালো, তোর এত দেরি হল কেন!’

‘করবী আটকে দিয়েছে যে!’

‘কে করবী?’

‘কাল বললাম না আমার পেশেন্ট।’

‘শুধু পেশেন্ট?’

আকাশ উত্তর দেয় না। বিছানায় শুয়ে পড়েছে মেঘা। আলো নেভানো। একটু আগে প্রদীপ জ্বেলেছে। তার আলোয় আকাশকে দেখা যাচ্ছে। আকাশ মেঘার কপালে ময়েশ্চারাইজার ঢেলে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত প্রলেপ দিচ্ছে। মেঘা বলে, ‘কিরে জবাব দিচ্ছিস না যে?’

‘হ্যাঁ। আমি ওকে ভালোবাসি।’

‘বিয়ে করবি তো?’

‘ও একটু সুস্থ হোক! কিন্তু একটু ভয়ও করছে দিদি।’

‘কিসের ভয়?’

‘চাকরিটা কনট্রাক্ট বেসিস।’

‘কত স্যালারি দেয়?’

‘ছয় হাজার। আর এই কাজ করে হাজার দু’য়েক হয়। এতে মা, আমি করবী তিনজনের চলবে? বলো?’

মেঘা ভাবছে, কী সুন্দর প্রেম! প্রেমিকার অবশ পায়ে স্পন্দন এনে দিচ্ছে! যতদিন না পূর্ণ স্পন্দন আসছে, ততদিন অপেক্ষা করবে। এত দুঃসাহসিক প্রেম। আর স্বপ্ননীল! নীরব প্রত্যাখানে তাকে এক গভীর শূন্যতায় ডুবিয়ে দিচ্ছে এত বছর পরও।

আকাশের আঙুলগুলো মেঘার কপালে ঘুরছে। আঙুল নয়, যেন ফুলের ছোঁয়া। সত্যি একটা ফুলের গন্ধ পাচ্ছে মেঘা। জিগ্যেস করতে আকাশ বলে, ‘এটা একটা ভেষজ অয়েল। এর মধ্যে টগর শঙ্খপুঙ্খী আর শিউলি আছে।’

শিউলির গন্ধ তার মনটাকে প্রসন্নতায় ভরিয়ে দিচ্ছে। টগর বা শঙ্খপুঙ্খী কেউ একজন তার মাথাটা শীতল করে দিচ্ছে। মেঘা আবেগঘন গলায় বলে, ‘তুই সংসার কর আকাশ। আমি আছি। তোর হাতের স্পর্শে করবী দাঁড়াতে পেরেছে। তোর হাত ধরেই উঠবে। ছুটবে। জীবন্ত হরিণের মতো।’

চিত্রকর: মৃণাল শীল

Comments are closed.