মঙ্গলকাব্য

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

ঋতা বসু

বালিগঞ্জ স্টেশনের কাছ থেকে একটা প্রাইভেট বাসের গুমোট খোলের মধ্যে অগুণতি তিরিক্ষি মেজাজের নারীপুরুষের মধ্যে লুটোপুটি খেতে খেতে শেয়ালদা স্টেশনে পৌঁছে নূপুর একটু দম নিল। সে একটা ফাঁকা জায়গা খুঁজছিল যেখানে দাঁড়িয়ে একটু দম নেওয়া যায়। কোথায় সেই দুর্লভভূমি? সন্ধের সময় স্রোতের মত ঘরমুখী জনতা উন্মত্ত হয়ে ছুটে চলেছে। নূপুরও ধাক্কা খেতে খেতে খানিকটা এগিয়ে গেল। সোনালি রঙের তেজীয়ান মর্তমান কলা নিয়ে যে লোকটা বসেছে তার তেজও কম নয়। ঝাঁকার সামনে ফালতু খদ্দের দাঁড়াতেই দিচ্ছে না। নূপুরকে কর্কশভাবে– বৌদি ওদিকটায় সরে দাঁড়ান, বলে সম্ভাব্য খদ্দেরদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

নূপুর শেষবারের মতো কলাগুলোর দিকে তাকিয়ে প্ল্যাটফর্মের ভেতরে ঢুকে গেল। টিটুকে বলেছিল, আজ কলা নিয়ে যাবে। শেষপাতে শুধু কলা ও চিনি দিয়ে ভাত মেখে খেতে পারলে টিটু উৎসবের স্বাদ পায়।

ভাগ্যিস আজ টুনটুনির মান্থলিটা নিয়ে এসেছে নয়ত টিকিটের পয়সাটাও বার করতে হত। সারাদিন নূপুর আজ নার্সিংহোমে কাজের আশায় বসে ছিল। গীতাদির ফাইফরমাশ খেটে দুপুরের খাওয়াটা জুটে গেছিল কিন্তু সংসারের সুরাহা হয়নি কিছু। প্ল্যাটফর্মগুলোয় চাপ চাপ মানুষের ভিড়। সবারই মনে উৎকণ্ঠা। কান ঘোষণার দিকে। টান টান কিছু মুহূর্তের উদ্বেগের অবসান ঘটিয়ে ফাটা গলায় গমগম করে ভেসে এল শান্তিপুর লোকাল বাতিল হয়েছে। থমকে থাকা জনসমুদ্র মুহূর্তের মধ্যে উত্তাল হয়ে ছুটল দু’নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে। চারপাশের বিরক্তি উদ্বেগ অসন্তোষের মাঝে নূপুরই বোধহয় একমাত্র মানুষ যে ঘোষণা শুনে খুশি হয়েছে। এইরকম গোলমালের দিনগুলোই বাড়তি রোজগারের সম্ভাবনা বয়ে আনে।

অভাব অনটনের হিংস্র কামড়ে নূপুরের সৌন্দর্যের প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। তবু গজদন্তে সাজানো হাসিটি হেসে সে যখন সহযাত্রিণীর ঘনিষ্ঠ হয়ে নিমেষে কাজ হাসিল করে ঘুণাক্ষরেও তাকে কেউ সন্দেহ করে না। নূপুরের চেহারাটি ভারি গেরস্তমতো। পরনের শাড়ি যতই সস্তা হোক না কেন পরিষ্কার থাকে সবসময়। হাতে মোটা শাঁখা ও পলা। কপালে ভেলভেটের টিপ। টান করে খোঁপা, সিঁথিতে সিঁদুর। এককালে রঙ পরিষ্কারই ছিল। বাবা  ঠাট্টা করে বলত, বিজ্ঞাপনে লিখব গৌরবর্ণা স্বাস্থ্যবতী, গৃহকর্মনিপুণা, সুন্দরী পাত্রীর জন্য উপযুক্ত পাত্র চাই।

এখন সেই গৌরবর্ণা উজ্জ্বল শ্যামও নয়। কর্মনৈপুণ্য গৃহ ছাড়িয়ে আরও বহুদূরে, স্বাস্থ্য কেমন জানে না। যতক্ষণ দু’পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বেঁচে থাকার মরণপণ লড়াই চলছে। নিজেকে নিয়ে ভাবার অবসরই নেই।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ডামাডোলে বাবা বাধ্য হয়ে যশোরের পাট গুটিয়ে ইছাপুর চলে এসেছিল। কাকার পরামর্শ মতো সঞ্চয় ভাঙিয়ে গোটাকতক সাইকেল রিক্সা কিনে ভাড়া দিতে গিয়ে আমও গেল ছালাও গেল। সেই অবস্থায় একটা ছোট কারখানার কর্মী পরিমলকেই সুপাত্র বলে মনে হয়েছিল। বিয়ের দু’বছরের মধ্যেই টিটু আর তিনবছরের মাথায় কারখানায় লক আউট।

তারপর থেকেই চলছে নূপুরের লড়াই।

বালিগঞ্জ স্টেশনের কাছে নার্সিংহোমটায় টুনটুনি নিয়ে গিয়েছিল। কাজ পেলে কাটাকুটির পরেও হাতে যা থাকে তা দিয়ে হয়ত নূপুর কোনওরকমে সংসার চালিয়ে নিত কিন্তু এখানেও কাজ পাওয়ার কোনও স্থিরতা নেই। তার মতো আরও অনেকে এসে তীর্থের কাকের মতো ধর্না দিয়ে পড়ে থাকে। সবদিন সবার ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে না।

এইরকম যাতায়াত করার সময় একদিন ভিড় ট্রেনে নূপুরের গলার হারটা গেল ছিনতাই হয়ে। নূপুরের তখন যেখানে যা কুচোকাচা সোনা ছিল সব গিয়ে ওই রূপোর ওপর সোনার জল করা হারটাই সম্বল। সবে বাড়ির গণ্ডি ছাড়িয়ে পা বাড়িয়েছে বাইরে। বেরোতে গেলেই ঠাকুমার কথা মনে পড়ত– সধবা মানুষের গলা খালি রাখতে নাই।

হারটা যাওয়াতে খুব কষ্ট হয়েছিল কিন্তু সেইসঙ্গে মনের চোরাকুঠরিতে জ্বলে উঠেছিল আশার আলো– এইভাবে তো অনায়াসেই কিছু রোজগার করা যায়। দেখে দেখে সহজ শিকার পাকড়ে তার অন্যমনস্কতার সুযোগে সামান্য হাতের কারিকুরি– এটুকু সে নিশ্চয়ই পারবে। হয়তো ততটা নিরাপদ নয় তবু ক’দিনের রসদ। তাই বা কম কী?

যাতায়াত এবং সংসারের জাঁতাকল দুইই নূপুরকে বেশ অভিজ্ঞ করে তুলেছে। ভিড়ের মধ্যে থেকে অনায়াসেই চিনে নিতে পারে সহজ শিকার।

রানাঘাট লোকালের মেয়েকামরায় উঠে নূপুর তার কাজের জন্য সুবিধেজনক জায়গা দেখে দাঁড়াল। একটি মাঝবয়সি হিন্দুস্থানি মেয়ে রুক্ষ গলায় বলল, এগিয়ে যান না ভেতরে। পথ জুড়ে আছেন কেন?

নূপুর তার মধুর হাসিটি হেসে বলল, নামব সামনেই।

সে লক্ষ্য করেছে এই ভিড়ে ঠাসা কামরা যেন এক রণভূমি। এখানে বিনাযুদ্ধে কেউ সূচ্যগ্রভূমিও ছাড়ে না। এই অবস্থায় নূপুরের নম্র ভঙ্গিটি সত্যিই কাজে দেয়। বিধাননগর, দমদম পেরিয়ে গেল। কামরায় ভিড়ের চাপ ক্রমশ বাড়ছে। জমাট নিশ্ছিদ্র মানুষের দেয়াল  সামনে। এইরকম অবস্থাটাই নূপুরের জন্য সুবিধেজনক।

সম্ভাব্য শিকারের খোঁজে তার চোখ ঘুরতে লাগল। আজকের অবস্থাটা একটু বেশি ঘোরালো হয়ে উঠেছে। কামরার একদিকে হিন্দুস্থানি মেয়েদের একটা দল মেঝের ওপর থেবড়ে বসা। অতএব সমস্ত ভিড়ের চাপটা এদিকের দরজার দিকে। বেলঘরিয়ার পর এমন অবস্থা হল  কাঁধের আর হাতের ব্যাগটারও আর জায়গা হয় না। সবাই মাথার ওপর ব্যাগ তুলে দাঁড়িয়ে আছে। নূপুরের ঠিক সামনেই একটি মারকুটে চেহারার জবরদস্ত মেয়ে মাথার ওপর লাল প্ল্যাস্টিকের গামলা ধরে দাঁড়িয়ে আছে যেন  চোখের সামনে একটা রক্তবর্ণ পাঁচিল সবকিছুকে আড়াল করে রেখেছে। সোদপুরে ভিড় খানিকটা পাতলা হবে এই আশায় নূপুর ঘন লাল রঙে চোখ ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

কত রকমের হাত কত রকমের সম্বল বুকে আঁকড়ে কামরার ছাদ থেকে ঝুলন্ত আংটা ধরে এই পথটুকু পার হচ্ছে। কারও চটের ব্যাগ, কারও হাল্কা ফোম বা নাইলন কারও বা চামড়া। নূপুর চোখটাকে এক্স রে রশ্মির মতো করে ব্যাগগুলোর ওপর চোখ বোলায়–– আহা যদি ওপর দিয়েই বোঝা যেত কোথায় লুকিয়ে আছে সাতরাজার ধনটি।

ঠিক সামনে যে মহিলা ঠেলাঠেলি করে এসে দাঁড়ালো তার কালো ঘামে ভেজা গলায় চিকচিক করে উঠল সোনার হার। নূপুরের চোখদুটো আশার আলোয় জ্বলজ্বল করেই নিভে গেল–– সিটি গোল্ড। জিনিসটা একেবারে নতুন বলে ধাঁধা লেগেছিল। হতাশ হয়ে নূপুর ভাবে লোকজনও কেমন সেয়ানা হয়ে গিয়েছে। গলায় নকল সোনা, বুকের ভেতর রুমালে গিঁট দেওয়া প্রাণভোমরা–– নুপূর কোনওকিছুরই নাগাল পায় না।

খুব সহজ ছিল হাতঘড়ি। কয়েকবছরের মধ্যে তার বাজার পড়ে গেল।নূপুর বিয়েতে পাওয়া ঘড়ি বেচেছিল সবার আগে।

এখন সবথেকে আদর মোবাইল ফোনের। নার্সিংহোমের বুড়ানের সঙ্গে বন্দোবস্ত আছে। সবাই সব জানে তবু ধোঁকার টাটি বজায় রেখে কথাবার্তা এগোয়। নূপুর বুড়ানকে বলে, এই ফোনটা আর ব্যবহার করতে ভালো লাগছে না রে বুড়ান। দ্যাখ না যদি ভাল দাম পাস।   আবার টেপা ফোনই নিয়ে নেব। পোষায় না এসব টাচ ফোন।

কদিন বাদেই তো আবার সেটা ভালো লাগবে না, বেচতে আসবে। তার থেকে রেখেই দাও। বেচতে গেলেই তো লস্‌।

বুড়ান কথার মারপ্যাঁচে প্রথমেই জিনিসটার দাম কমিয়ে দেয়।তবে হাতে এনেও দেয় কিছু না কিছু। এইভাবেই কোনওরকমে চলছে নূপুরের সংসার। পরিমলের মাসে পাঁচদিন আর নূপুরের নার্সিংহোমের ঠিকে কাজ– এর জোরেই চলছে তারা। নূপুরের এই গোপন বাড়তি রোজগারটুকুর কথা অবশ্য কেউই জানে না। নূপুর নিজেই কি ভাবতে চায়? মুহূর্তের কারসাজির অনিয়মিত এই রোজগারের উৎসটাকে সে নিজের কাছেও গোপন করতে পারলে বেঁচে যেত।

পরিমলের বেকার অবস্থায় কয়েক মাসের টিটুকে নিয়ে সে যখন অথৈ জলে টুনটুনিই তখন বলেছিল– গীতাদি কেটেকুটে হাতে যা দেয় তাতে সারা মাস নুনভাতও জুটবে না। তারপর কাজ থাকে না কতসময়। আমাদের কি শুধু এর ওপর ভরসা করলে চলে?

তখনই নূপুর জানতে পেরেছিল টুনটুনি এবং টুনটুনির মত মিলি গীতা ঝুমকি, সবাই কাজের খোঁজেই কলকাতা আসে। তারপর ছড়িয়ে পড়ে অন্ধকারে ময়দানে, গলিতে, স্টেশনে, আরও কত নাম না জানা জায়গায়। হাতে হাতে নগদ টাকা। বিপদের ঝুঁকি নেই। ভালো খদ্দের পেলে টাকার সঙ্গে দুশো মজা।

নূপুরকে চুপ করে থাকতে দেখে বলেছিল– ওসব শুচিবাই ছাড়ো তো নূপুরদি। এখনই ক’বছর পয়সাকড়ি পাবে। তারপর যতই রঙচঙ মাখো কেউ ফিরেও তাকাবে না। নূপুরের গা গুলিয়ে উঠেছিল– মা গো! সাতঘাটের ছোঁয়াছুঁয়ি, এ কাজ তাকে দিয়ে  মরে গেলেও হবে না। টুনটুনিদের বেপরোয়া ভাব, ব্যাগে গরম টাকা নুপূরকে হাতছানি দিলেও সে ওদের দলে ভিড়তে পারেনি। তার বদলে সে হল চোর।

নূপুরের মাঝে মাঝে মনে হয়– কোনটা ভালো? বেশ্যা না চোর? টাকার দিক দিয়ে দেখলে টুনটুনিদের দলটাই ভালো। সেখানে তবু পকেট ভারী লোকেদের দেখা মেলে। এখানে তো সবাই তারই মতো অভাবী। তারই মতো টিঁকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। যত সামান্য আর সস্তাই হোক না কেন সেটুকু খোয়ালে কত  তীব্র অভিশাপে তারা ছিন্নভিন্ন করতে চায় সেই বেজন্মা মানুষটাকে তা তো নূপুর জানে। গলা মিলিয়ে সায়ও দিয়েছে। যে সংসারের কথা ভেবে সে পা বাড়িয়েছে এই পেছল পথে, অভিশাপের ঝাঁঝ যদি এসে লাগে তার সেই সংসারে? শিউরে ওঠে নূপুর। এইজন্যই সে ভাবতে চায় না। না না, টাকার কোনও জাত নেই। ঢোলডগর তুমি কার? যে বাজায় তার।

টিটাগড়ে হিন্দুস্থানিদের বড় দলটা নেমে গেল। নূপুর হাঁপ ছেড়ে ঘাড়টা পেছন দিকে ঘোরাতেই চমকে উঠল। জানালার ধারে এক মহিলা বসে আছেন। দেখেই  বোঝা যায় লোকাল ট্রেনের যাত্রী নয়। এরাই সবথেকে সহজ শিকার। সঙ্গের ছেলেটিকে বোধহয় গল্প বলছেন আর ছেলেটিও জগৎসংসার ভুলে হাঁ করে শুনছে। মহিলার গলায়–– হ্যাঁ, সন্দেহের অবকাশ নেই, একেবারেই আসল, চিকচিক করছে। অত মিঠে দ্যুতি আসল ছাড়া হয় না। হারের তলায় বুকের ওপর সোহাগে লুটোপুটি খাচ্ছে চাঁদের আলো দিয়ে গড়া লকেট।

নূপুর মনে মনে দ্রুত হিসেব করে–– কতটা ওজন হতে পারে? বুড়ানকে না দিয়ে সে যদি নিজেই যায়। বালিগঞ্জ স্টেশন থেকে এগিয়ে গেলে গড়িয়াহাটের দুধারে সারি সারি গয়নার দোকান। কোনওদিন সে সব দোকানে ঢুকবার প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু এবার যদি সে নিজেই যায়? তাকে দেখে কি বোঝা যাবে এ হার কোনওদিন তার গলায় ওঠেনি, সে এর যোগ্যই নয়?

আচ্ছা, নূপুর যদি তার সবথেকে ভালো টাঙ্গাইল শাড়িটা যেটা টিটুর সাধে কলকাতার কাকিমা নিজে না এসে লোক দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, যেটা সে জীবনে মাত্র তিনবার পরেছে– যদি সেই শাড়িটা পরে যায়?

নূপুর যেন আয়নায় মোড়া ঝলমলে দোকানটার মধ্যে কল্পনায় নিজেকে দেখতে পাচ্ছে। গলা  থেকে হারটা খুলতে খুলতে কাউন্টারের ওদিকে জিজ্ঞাসু চোখে চেয়ে থাকা ছেলেটাকে বলছে, একটু দেখুন না এটার কত ওজন? পুরনো হয়েছে, ভাবছি অন্য ডিজাইনের কিছু নেব। তারপর এটা ওটা দেখবে, নাড়বে চাড়বে। দুল বালা হার আঙটির মধ্যে মন ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাবে। শেষে বলবে, নাঃ, কিছু পছন্দ হচ্ছে না। আচ্ছা এটার বদলে বরং আপাতত টাকাই নিয়েই যাই।

এভাবে পুরো ব্যাপারটা হলে ঝানু দোকানদারও ঘোল খেয়ে যাবে।নূপুর জানে তার চেহারাটা এত গেরস্ত, গজদন্তের হাসিটা এত নিষ্পাপ যে কারও মনেই সন্দেহ জাগায় না।

নূপুর একটু একটু করে এগোয়। এই অসম্ভব ভিড়েও মাসি উঠেছে ঝুড়িভাজা নিয়ে। বিক্রিও হচ্ছে টুকটাক। কচি ছেলের বায়না মেটাতে এক মা বার করল বুকের ভেতর থেকে গিঁট দেওয়া রুমাল। সাবধানে গুণে দিল পাঁচ টাকা। পাশে ঘামে নেতিয়ে আছে দুটো বেচারা দশ টাকার নোট। রুমালটা যথাস্থানে রাখার জন্য ব্লাউজটা ফাঁক করতেই নূপুরের নজরে পড়ল আর একটা গিঁট দেওয়া রুমাল। নূপুর জানে ওইটাই আসল। অন্যদিন হলে সে একবার চেষ্টা করতই কিন্তু আজ তার মন নেই। যে করেই হোক ঢুকতে হবে ভেতরে। এগোতে হবে জানালার ধারে। খুব কৌশলে ইঞ্চি ইঞ্চি করে গুঁড়ি মেরে সে এগোতে লাগল যেমন করে আনমনা হরিণীর দিকে এগোয় ধূর্ত চিতাবাঘ।

নূপুর একদম কাছে এসে পড়েছে। মহিলাটির কিন্তু  খেয়ালই নেই তার চারপাশে কি ঘটে চলেছে। সে তার ছেলেকে নিয়ে গল্পের মধ্যে মগ্ন হয়ে আছে। পাশেই যে খেয়োখেয়ি, চেঁচামেচি, অবিরল শব্দপ্রবাহ বয়ে চলেছে তা যেন তাদের স্পর্শই করছে না।

মহিলার ঠিক  পাশের আসনটাই ব্যারাকপুর আসতে খালি হয়ে গেল। নূপুর ধপ করে বসে পড়ল অনেকক্ষণ থেকে তাক করে থাকা আকাঙ্ক্ষিত জায়গাটাতে। ঘাড় গলার ঘাম মুছে নিঃশ্বাস ফেলে তাকালো বাইরের দিকে। আজ বোধহয় পূর্ণিমা। একটা মস্ত কাঁসার থালার মতো চাঁদ পাল্লা দিয়ে ছুটে চলেছে রেলগাড়িটার সঙ্গে। কী ঠান্ডা এই জায়গাটা! নাকি এক ঝলক বাতাস এল জানালা দিয়ে। এতক্ষণ সামনে পেছনে মানুষের দেয়ালে পিষ্ট হয়ে থাকার পর আরামে চোখ বুজে এল নূপুরের।

আর বেশি সময় নেই। কামরার আলোটা মাঝে মাঝে মৃদু হতে হতে একেবারে  নিভে গিয়ে আবার দপ করে জ্বলে উঠছে। এইরকম অন্ধকারের মধ্যেই কাজ হাসিল করতে হবে। নূপুর মহিলার দিকে আর একটু সরে বসল।খানিকটা কৌতূহলও আছে,  কি গল্প শুনছে ছেলেটি এত মনোযোগ দিয়ে? এত কাছে ঘেঁসে বসেছে বলে নূপুরও পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছে– কী সুন্দর মাদকতাময় গলায় মহিলাটি শ্রীমন্ত সওদাগরের সমুদ্রযাত্রা বর্ণনা করছে!

নূপুর একমুহূর্তে উজান বেয়ে চলে গেল মেঘনা নদীর ধারে বালিথুয়া গ্রামে। ঠাকুমাকে গোল করে ঘিরে বসে চণ্ডীমঙ্গলের ব্রতকথা শুনছে মা কাকিমা জেঠিমা। ছোট্ট নূপুর মায়ের আঁচলের খুঁট গায়ে জড়িয়ে বসে আছে। আজকাল কেউ কি আর শোনে এসব গল্প? সমুদ্রের মধ্যে শ্রীমন্ত সওদাগরের কমলেকামিনী দর্শন। কমলাসনা দেবী চণ্ডী মস্ত এক ঐরাবত গিলছেন আবার উগরে দিচ্ছেন। এই দৃশ্যের বর্ণনা শুনে শুনে আশ মিটত না নূপুরের। কী জাদুবলে রেলের কামরার মধ্যে ফিরে এল তার শৈশব?

শ্রীমন্ত সওদাগর কারাগারে বন্দি। তার স্ত্রী খুল্লনা চণ্ডীপুজোর আয়োজন করেছে। চালের গুঁড়ো দিয়ে আলপনা দিয়েছে। মঙ্গলঘট বসিয়ে তেলসিঁদুর মাখিয়ে আম্রপ্ললব সাজিয়ে দিয়েছে। কুলোয় মঙ্গলাচরণের দ্রব্য সাজানো। নূপুর পরিষ্কার দেখতে পেল ঠাকুমা কুলোর মধ্যে এক এক করে পান, সুপারি, ধান, তিল, সিঁদুর সব গুছিয়ে রাখছেন। মায়েরা হাতে হাতে সাহায্য করছে। বাতাসে ধূপধুনোর গন্ধ ভেসে আসছে।

এই জীবন, এই সময় সব এক নিমেষে মিথ্যে হয়ে গেল নূপুরের কাছে। কামরার আলো আবার চলে গিয়েছে। জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে মহিলার মুখে, কোলের ওপর ফেলে রাখা হাতে। মনে হয় কোনওদিন পৃথিবীর ধুলোময়লা লাগেনি ওই দেহে। নূপুর মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সেই অপার্থিব সৌন্দর্যের দিকে। ইনি কে? ছদ্মবেশী দেবী নন তো? দৈববলে আঁচলে বেঁধে নিয়ে এসেছেন এক খণ্ড হিরের মতো নূপুরের ছেলেবেলা। তার সমস্ত গা শিরশির করে কাঁটা দিয়ে উঠল। কামরার সমস্ত গোলমাল ছাপিয়ে নূপুরের কানে বাজতে লাগল দেবী চণ্ডীর মাহাত্ম্য বর্ণণা। চোখের সামনে ভেসে উঠল বালিথুয়া গ্রামের টিনের চালা দেওয়া ভারী লক্ষ্মীমন্ত বাড়িটা– মাটির ছড়া লেপা দাওয়া উঠোন। ঘরের চালে লাউডগা। সজনে পাতাবাদাম আর গাবগাছে বাড়ির পেছন দিকটা ঝুপসি হয়ে আছে। সে ঘরোয়া জঙ্গলের বুনো গন্ধটা পর্যন্ত নাকে এসে লাগল। পূর্ণিমার আলোয় উঠোন ভেসে যাচ্ছে।ঝুমঝুম করে পায়ের মল, আঁচলের চাবি বাজিয়ে কে যেন আসছে– আসছে। আবেশে নূপুরের চোখ বন্ধ হয়ে আসে। কখন তার গন্তব্য চলে গেল সে জানে না। দু চোখ বন্ধ করে চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া রেলগাড়ি করে সে তখন ছুটে চলেছে সেই সজনে পাতাবাদাম গাছেদের আশ্রয়ে। সেই তকতকে করে নিকানো আঙিনায়। সেই মঙ্গলঘটে সাজানো ব্রতকথার আসরে।

তার বন্ধ চোখের ফাঁক দিয়ে দু ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে আসে কিন্তু ঠোঁটের কোণে লেগে থাকে ভারী পবিত্র এক টুকরো হাসি।

চিত্রকর: মৃণাল শীল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More