সোমবার, অক্টোবর ২১

কথোপকথন

সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

বিকেল এখন ফুরোনোর অপেক্ষায়। আকাশের আলো ক্রমশ কমছে। ঘরের পর্দাগুলো ভালো করে টেনে দিয়ে একটা মোমবাতি জ্বালান রমা। আঁচল দিয়ে ফটোফ্রেমের কাঁচ মুছে সোজা করে রাখেন ছবিটা। তবু স্পষ্ট হয়না অনিমেশের চাহনি। চশমা পরা চোখদুটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন তিনি। চেয়ার টেনে আনেন। এখনই যা বলার বলতে হবে। আর সময় নেই।

“শোনো, এবাড়ি ছেড়ে আমাকে চলে যেতে হবে। তুমি রাজি তো?”

“প্রেসারের ওষুধ খেতে ভুলে গিয়েছ। ওটা খেয়ে নাও রমা।”

রমা হাসেন। “আর ওষুধ! ও আমি ইচ্ছে করেই খাইনি। কি হবে গুচ্ছের ওষুধ খেয়ে। তুমি চলে গেলে এবার আমি… ।”

একটু কাশেন অনিমেশ। খুকখুক আওয়াজটা স্পষ্ট শুনতে পান রমা। আসলে শেষকালে ওই কাশিই কাল হয়েছিল তো। বুকে সর্দি বসে…। থাক ওসব আর ভাববেন না। একটু নীরবতা। কাশি থামিয়ে অনিমেশ বলেন, “না আমার মত নেই। তুমি কোথাও যাবে না।”

“তা বললে হয়। বুড়ো বলেছে মুম্বাইয়ে নিয়ে যাবে। ছোটুও বলল আমি যদি চাই তাহলে ওর কাছে মাদ্রাজে থাকতে পারি। ভাবছি কি করব। তুমি কি বল?”

“রুনু ,মানে তোমার কন্যা, কিছু বলেনি?”

“হ্যাঁ রুনুও এবাড়িতে একা থাকতে দিতে চায় না। ওর ফ্ল্যাটে ঘর কম তো, তাই পাশের একটা ফ্ল্যাটে ব্যবস্থা করে দেবে বলছে।”

“ও!”

“ও বলছিল ওর একেবারে কাছেই রাখবে। এক কামরার ফ্ল্যাটে।”

“আর ভাড়া…?”

“সে তো আমিই দেব। তোমার জন্য পেনশান পাই তো।

“থাক।”

“থাকবে কেন? যাহোক কিছু বল।”

“তোমার বাতের ব্যথাটা কেমন আছে? রাতে যন্ত্রণা হয়? ম্যাসাজের মেয়েটা আসছে তো?”

“যন্ত্রণা তো আছেই। কতরকমের যন্ত্রণা। ও নিয়ে ভেবো না। ম্যাসাজের মেয়েটাকে আসতে বারণ করেছি।”

“কেন?”

“শুধু শুধু অতগুলো টাকা…।”

“শুধু শুধু হতে যাবে কেন? ওকে আসতে বলবে। টাকা নিয়ে ভাবার কিছু হয়নি। যেমন চলছিল তেমন ভাবেই…।”

“আচ্ছা আচ্ছা।” অনিমেশের গলায় আদেশের সুরটা কানে বাজে রমার। নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন, “তুমি কিন্তু এখনও বললে না আমি কার কাছে যাব।”

“বললেই তো ফুরিয়ে গেল। আগে শুনি।”

“তোমার মশকরা করার অভ্যেস এখনও গেল না। আমাকে একা ফেলে রেখে…। এভাবে চলে যেতে পারলে?”

“পারলাম কি আর, পারতে হল। আচ্ছা বেলা কাজে আসছে তো?”

“হ্যাঁ। ও তো কামাই করে না।”

“আর তারক? ফুলগাছগুলোর ঠিকমতো দেখাশুনা করছে, নাকি ফাঁকি মারছে?”

“তারক  তো দেশে গিয়েছে। আমিই আপাতত জল দিচ্ছি।”

“তারক এলে বোলো একটা হলুদ জবার গাছ লাগাতে। কবে বলে রেখেছি, ছেলেটা কথা শোনে না।”

“আর জবা লাগিয়ে কি হবে? এতবড় বাড়ি আমি সামলাব কি করে?”

“কেন ছেলেরা কিছু বলেছে বুঝি?”

“বললেই বা দোষের কী? কন্ট্রাক্টারের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনটে ফ্ল্যাট ওদের তিন ভাইবোনকে দেবে। আর টাকাটা আমাকে।”

“বাহ্!” এবার হাসলেন অনিমেশ। চেনা হাসির আওয়াজ শুনে চোখে জল আসে রমার।

“কেন? খারাপ কী? তুমি তো চলে গেলে। এবার আমি যে কদিন আছি, বুড়ো, ছোটু, রুনু, ওদের কাছেই বেশ থাকব।”

“তুমি কোথাও যাবে না।”

“ছেলেমেয়েরা ডাকছে তো। কী বলব ওদের?”

“কিছুই না। শুধু যাবে না ব্যাস।”

“ফরমান জারি হয়ে গেল?”

“হল।”

“এখানে কার জন্য থাকব? তুমিও নেই তো।” আঁচলের খুঁটে চোখের উপচে আসা জল মোছেন রমা।

“নিজের জন্য রমা। নিজেকে নিয়েই বেশ থাকবে। আর আমি তো আসব মাঝেমাঝে। এই যেমন আজ এসেছি।”

রমা ওঠেন এবার। ফটোটার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে ফুঁ দিয়ে নেভান মোমবাতি। আলোর সুইচ অন করেন, তারপর এগোন গুটিগুটি। কয়েকটা ফোন করতে হবে। মনস্থির করে ফেলেছেন। এবাড়ি ছেড়ে কোথাও যাবেন না।

কথা হচ্ছিল চায়ের দোকানের সামনে। ডাস্টবিনের পাশে। দুজনে একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এ ও’র দিকে তাকিয়ে ছিল ওরা।

“লালু মারা গেছে।”

“কখন?”

“কাল রাতে। তখন গাঙ্গুলিবাগানের গলি দিয়ে আমি সবে আসছি। দেখলাম গুলিটা ঠিক লালুর বুকে লাগল। লালু পড়ে গেল। আমি আর দাঁড়াইনি।”

“দাঁড়ালি না কেন? তেড়ে যেতে পারতিস।”

“লোকটা আমার দিকে তাকাচ্ছিল। ভয়ে আমি পালিয়েছি। আমাকেও যদি…।”

“ছিঃ! তুইও! এরকম আমাদের মানায় না।”

“আরে কী বলছিস কী? হালচাল পাল্টাচ্ছে। খাঁচাগাড়ি দেখেছিস? এই তো কদিন আগেই কটা বাচ্চাকে ধরে নিয়ে গেল। আমি দৌড়ে পালালাম তাই, নাহলে আমাকেও…।”

“বলিস কি? সাবধানে থাকতে হবে তো।”

“ওদের কোনওকালেই মায়া দয়া ছিল না। এখন আরও অন্যরকম হয়েছে। ওদের নিয়ম পাল্টাচ্ছে। দেখলি না দু–দুটো বাচ্চা আছে। তবু বরকে মেরে বউটা…।”

“কী করে পারে বলত? এতদিন একসঙ্গে ছিল। ও নিজে মেরেছে নাকি? মনে হয় না।”

“না। মেরেছে ওই লোকটা। সেই যে মোটরসাইকেলে ওদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াত। ওই লোকটার গুলিতেই তো,…। প্রথম গুলিতে লালু, দ্বিতীয় গুলিতে ওই বউটার বর। মেরেই পালাল জানিস।”

“কিন্তু লোকটারও তো বউ আছে, মেয়ে আছে। গড়িয়ার দিকে থাকে।”

“জানি। আমি দেখেছি ওই লোকটার গাড়িতে এই বউটা চেপে যাচ্ছিল একদিন। তখনই বুঝেছি।”

“ঘুরছিল ঠিক আছে। মারার কি দরকার পড়ল? আমার মনে হয় নিয়ম-টিয়মগুলো ওরা এবার বদলে ফেললেই পারে। এই আমাদের মত যার যাকে ইচ্ছে, যখন ইচ্ছে।”

“যা! ওরা তো  আমাদের মত না। ওরা যে মানুষ!”

“না বলছিলাম তাহলে লালুটা শুধুশুধু মরত না। বেচারি লালু! ওই দ্যাখ ওপাড়া থেকে কালুরা আসছে। গেটের ওপারে দাঁড়িয়ে গোল্ডি কাঁদছে। ও তো আসতে পারবে না। চেনে বাঁধা আছে। চল আমরাও যাই।”

“চল। লালুকে নিয়ে যাবার আগে একবার অন্তত দেখে আসি।”

ট্রেনের মেঝেতে ঠিক দরজার ওধারে বসেছিল লোকটা।

“বাবু দুটি পয়সা দেবেন?” একভাবে বলে যাচ্ছিল।

অলোক হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল দরজার এধারে। ভেতরে বড্ড ভিড়। বসারও জায়গা নেই। এ বরঞ্চ খানিকটা নিরিবিলিতে দাঁড়ানো গিয়েছে। ও দেখল ভিখারিটা ঘেঁষটে ঘেঁষটে ওর দিকেই আসছে। ও তাকায় না। এই এক হয়েছে। নিরিবিলিতে কোথাও দাঁড়াবার উপায় নেই ।

“বাবু দুটি পয়সা দেবেন।”

“কেন পয়সা দেব কেন?”

“দিন না বাবু। বড্ডো খিদে লেগেছে। একটা টাকা দিন অন্তত।”

“না। একটা পয়সাও দেব না। কাজ করে খেতে পার না।”

“কেন পারব না বাবু। কিন্তু কে কাজ দেবে?”

“যত সব বাজে কথা।”

“ঠিক আছে দিন একটা কাজ। আর পয়সা চাইব না।”

“যাও যাও।”

“দিন না বাবু, কাজ দিন না।”

“তুমি যাবে?”

“আপনি কাজ দেবেন? বললেন তো কাজ করতে।”

“এবার না গেলে পুলিশ ডাকব কিন্তু। দেখছেন এই সব ভিখারিরা কেমন জ্বালিয়ে মারে।”

“বাবু সত্যি বলছি, বড্ড অভাব। যদি একটা কাজ, আপনি কাজ করতে বললেন তো।”

“কে বলেছে কে? ব্যাটা মিথ্যেবাদী। যা এখান থেকে।”

পকেটের ভেতর থেকে মোবাইলটা বার করে আবার রেখে দেয় সোমা। গতকাল ফেসবুকে পোষ্ট দিয়েছিল রিয়া। ওর আর শান্তনুর ছবি। সেই থেকে ছটফট করছে ও। ওদের গোলমাল হওয়ার পর থেকেই কি রিয়া পিকচারে এলো? না । আগে থেকেই ছিল তো। এসব নিয়েই তো অশান্তি! শান্তনুকে একটা ফোন করা যাক। ওরা কি ডুবে ডুবে জল খাচ্ছিল?

“হ্যালো।”

“কে?”

“এই কদিনেই গলা ভুলে গেলি?”

“মানে, তোকে ঠিক এক্সপেক্ট করিনি।”

“বুঝেছি। তবে আজ নয়। অনেকদিন থেকেই তুই আর একজনকে এক্সপেক্ট করছিস।”

“যা বলবি বল। আমি কোনও উত্তর দেব না।”

“দেবার মত উত্তর থাকলে তো। রিয়ার সঙ্গে তোর সম্পর্ক থাকতেই পারে। তবে বলতে ভয় পাচ্ছিস কেন?”

“তুই ভালো করেই জানিস আমি ভয় পাইনা। রিয়া আমার বন্ধু ঠিকই। তবে তার বেশি কিছু নয়। আমার কথা তুই আগেও মানিসনি। জানি এখনো বিশ্বাস করবি না। সময়ই যা বলার বলে দেবে। এখন রাখছি আমি।”

“রাখিস না। যা বললি তা ঠিক?”

“আবার এক কথা! আমি রাখছি।”

“এত তাড়া কিসের ? কোথায় যাবি?”

“কোথাও না। বৃষ্টি আসছে। বাড়ি থেকে বেরনোর কোন মানে হয় না। কোথাও যাব না।”

“আমি থাকলে মানে হত?”

“হত হয়ত। তবে পাস্ট নিয়ে আলোচনা করে লাভ কি?”

“লাভ আছে। আছে। আমি আসছি। তুই আয়।”

“মানে, হঠাৎ!”

“হঠাৎই! আয়। সেই যেখানে…।”

“বুঝেছি। যদি না যাই?”

“আমি জানি তুই আসবি। ঠিক আধঘন্টা  বাদে কেমন..।”

“আমি কিন্তু সত্যিই জানি না আমি যাব কিনা।”

“আমি জানি। জানি তুই ঠিক আসবি। শোন বৃষ্টি নেমে গিয়েছে। ছাতা নিয়ে আসিস।”

চিত্রকর: মৃণাল শীল

Comments are closed.