শুক্রবার, আগস্ট ২৩

ইন্দুপ্রভা

চিরঞ্জয় চক্রবর্তী

‘ইন্দুপ্রভা’ নামটা শুনে পথিকের পছন্দ হয়নি। এখনও এইরকম নাম কেউ দেয়? ভাবলেই অবাক লাগে। নামটা শুনলে মনে হয় সাদা থান পরে একজন সাদা চুলের বুড়ি সামনে এসে দাঁড়াবে। নামটা শোনার থেকে মনটা খচখচ করছে। ঘুমের মধ্যেও উঠে বসেছে। সন্দেহ হয়েছে বাবা–মা মেয়েটাকে দেখেছে তো? কারও কথায় ভালো মেয়ে, নাম করা পরিবার এসব শুনে বিয়েটা ঠিক করে ফেলেনি তো?

#

গত পুজোর সময়ে যখন বাড়ি এসেছিল, সবার মধ্যে একটা বিয়ে বিয়ে সুর ছিল। বাড়ির প্রায় সবাই বিয়ে নিয়ে ফুট কাটছিল। পুজোতে বাড়ি আসা যায় না। মা অসুস্থ বলে এসেছে। অনেকদিন পর পাড়ার পুজোয় চুটিয়ে আনন্দ করতে গিয়ে এসব ব্যাপারে পথিক কান দিতে পারেনি। লক্ষ্মীপুজোর পরদিন রাতে খেতে বসেছিল। যেমন সবাই রাতে একসাথে খায়, রান্নাঘরে একলাইনে পিঁড়ি পেতে বাবা, দাদা, মেজদা আর পথিক। খাবার পরিবেশন করতে করতে মা বলেছিল, তপু তুই কি একবার মেয়েটাকে দেখবি?

পথিক মজা করে বলেছিল, আমার একটা শর্ত আছে।

সবাই খাওয়া থামিয়ে দিয়ে ওকে দেখছিল। সবার চোখে অন্য ভাষা, যেন গুরুতর কিছু একটা বলে ফেলেছে। মা পরিবেশনের হাতা নিয়ে স্ট্যাচু হয়ে গেছিল। এ বাড়িতে বিয়ে করতে গিয়ে ছেলে বা মেয়ে কোনও কথা বলেনি এতদিন। বাবা-মা যা বলেছেন, মাথা পেতে নিয়েছে। সবাই ভাবছে, দূরে, অন্য পরিবেশে থেকে থেকে মাথাটা গেছে। বিয়ে করতে শর্ত দিচ্ছে। রান্নাঘরে শব্দহীন সময় এগোচ্ছিল। বাবা নীরবতা ভেঙে বলেছিল, ঠিক আছে ওর শর্তটা শোনা যাক।

পথিক বলল, ‘খুব সাধারণ, আমার আগে মেজদা পরে বোন, আমি তো মায়ের কোলে বেশিদিন শুতে পারিনি, তাই এমন একটা শাশুড়ি দিও যার কোলে শুতে পারি, পা-মাথা বেরুবে না।’

কথাটা শুনে মা রেগে গেছিল। বড়বৌদি বলেছিল, তাহলে কুমোড়পাড়ায় যেতে হবে।

তারপর বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ, কেউ কোনও কথা বলছে না, খাওয়াও প্রায় বন্ধ। বাধ্য হয়েই পথিক বলে, শর্ত তুলে নিলাম।

[২]

বিয়ের পর কি নামে ডাকবে বউকে, একটা সমস্যা তৈরি হয়েছিল। ইন্দুপ্রভা নামে কাউকে ডাকা যায় না। অনেকটা সময় লাগবে, প্রেম চারমাত্রা পর্যন্ত স্থায়ী হয় কিনা পথিক জানে না, সন্দেহ ছিল। তাই ভেবেছিল প্রভা নামে ডাকবে। লোকে হয়তো বলবে, পথিকের প্রভা। কিন্তু পথিকের তো কোনও প্রভা নেই। আবার ইন্দু নামটা যেমন সেকেলে, রোমান্টিকতাও কম। নামটা যদি চন্দ্রপ্রভা হোত, তাহলে চাঁদু বলে ডাকা যেত। ‘চাঁদু’ শব্দটার মধ্যে একটা রোমান্স আছে। বিয়ের পর প্রথম কথাই জিজ্ঞাসা করেছিল পথিক, ‘তোমায় কি বলে ডাকব?’

‘ইন্দুপ্রভা’

‘নামটা বেশ বড়, ডাকতে কষ্ট হবে। আর…’

‘আর কি?’

‘পরে বলব।’

‘তাহলে তোমার যা ইচ্ছা।’

‘ভাবছি নামটা ভেঙে দেব। হয় ইন্দু নয় প্রভা বলে ডাকব।’

‘তাহলে ইন্দু বলে ডেকো!’

‘কেন?’

‘তাহলে সব সময়ে চাঁদকে ডাকা হবে।’

‘চাঁদ?’ পথিক শব্দটা দু-দুবার উচ্চারণ করল।

ইন্দুপ্রভা বিস্ময়ের সুরে জিজ্ঞাসা করল, ‘চাঁদকে ডাকতে আপত্তি আছে?’

পথিক হেসে ফেলেছিল, ‘না আপত্তি নেই। তবে ডাকতে ডাকতে যদি একসময়ে চাঁদ ঘরে নেমে আসে? তখন তো দুটো চাঁদ, কোথায় রাখব?’

‘অসুবিধা কোথায়?’

‘তখন তুমি মুনমুন হয়ে যাবে। আমার ইন্দুপ্রভা…’

[৩]

কলকাতা থেকে বর্ধমান রেল কোয়ার্টারের বারান্দায় ঢুকেই ও প্রশ্ন করেছিল, ‘এত জুতো কেন? কত লোক থাকে?’

‘আমি একাই থাকি!’

‘এত জুতো?’

‘এত কোথায়?’

‘কম হলেও পনেরো জোড়া হবে।’

‘সব আমার।’

‘সব ব্যবহার হয়?’

‘কিছু পুরনো আছে।’

‘অব্যবহার্যগুলো ফেলা হয় না?’

ঘরের দরজা খুলতে খুলতে পথিক বলেছিল, ‘না ফেলার একটা কারণ আছে।’

‘কি কারণ?’

‘একটা মিউজিয়াম তৈরি করব।’

‘কিসের?’

‘পথিকের পাদুকা মিউজিয়াম।’

ইন্দুপ্রভা হেসে ফেলেছিল। ভারতীয় রেলের একজন লোয়ার ডিভিসন ক্লার্ক স্বপ্ন দেখে তাঁর পাদুকা দিয়ে মিউজিয়াম হবে। মনে মনে বলল, ‘পাদুকার জয় হোক।’

[৪]

পথিক দরজা-জানালাগুলো খুলতে খুলতে নিজের মনেই বকবক করছিল, ‘এই বাড়িটায় আগে এক দম্পতি ছিল।তাঁদের কোনওদিন ভাব হয়নি। দুই মুখ একজায়গায় হলেই কলহ শুরু হোত। কিন্তু বাইরে বেরুলে কেউ ব্যাপারটা বুঝতে পারত না। জানত শুধু দু-পাশের দুই প্রতিবেশিরা।’ এই পর্যন্ত বলার পর ও লক্ষ্য করে বউ ঘরে নেই। এই অবসরে ইন্দুপ্রভা কোয়ার্টারটা ঘুরে দেখে নিল। কোথায় রান্নাঘর, কোথায় শোয়ার ঘর, খাওয়ার জায়গা এমনকি বাথরুম পর্যন্ত। পথিক আর কোনও দরজা-জানালা না খুলে বাইরের কাপড়েই টানটান হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল।

বউ জিজ্ঞাসা করল, ‘শুয়ে পড়লে যে?’

‘আমার কাজ শেষ।’

‘মানে?’

‘তুমি তো বুঝে নিয়েছো!’

‘কি বুঝে নিলাম?’

‘কোয়ার্টার।’

[৫]

বিকেলবেলা ইন্দুপ্রভা খাতা পেন্সিল নিয়ে বসল। একটা লিস্ট বানাতে হবে। বড় বড় করে কাগজের মাথায় লিখল, “আমাদের কী কী লাগবে?”

১) তিনটে বাজারের ব্যাগ

পথিক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘দুজন লোকের তিনটে কেন?’

‘একটা মাছের, একটা তরকারির অন্যটা ঠাকুরের ফল ও ফুলের।’

২) চারটে প্লাস্টিকের মগ

‘চারটে মগ কিসে লাগবে?’

‘দুটো বাথরুমে, একটা রান্নাঘরে, অন্যটা বাইরের বারান্দায়।’

‘বারান্দায় মগ কি কাজে লাগবে?’

‘বাইরে থেকে এসে হাত-পা ধুয়ে ঘরে ঢুকবে তো! লাগবে না?’

৩) চারটে বিভিন্ন সাইজের বালতি।একটা বাথরুমে, একটা রান্নাঘরে, একটা কাপড় কাচার জন্য অন্যটা বারান্দায় জল রাখার জন্য।

পথিক বলল, ‘আর আমাকে শোনাতে হবে না।তুমি তালিকা কর, বিকেলে বাজারে গিয়ে কিনে নেব।’

‘বাজার কতদূর?’

‘কাছেই, হেঁটে গেলে মিনিট তিনেক।’

[৬]

পথিক তালিকাটার সামান্য শুনে আর স্থির থাকতে পারল না। ঘরটা ছোট মনে হল। মাথা ঘামে ভিজে গেল। উঠে দাঁড়াল। ভেবেছিল, বাইরে বেরুবে। বাইরে গেল না। বিছানায় শুয়ে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে তৈরি আবাসনের ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, তার একটা ঘর গড়ে উঠছে। প্রায় দু বছর আগে মা জোর করায় এই কোয়ার্টার নেওয়া। মা এসেছিল সাতদিনের জন্য গুছিয়ে দেবে বলে। মা নিজেও একটা লিস্ট বানিয়েছিল। বাজারে গিয়ে কিনে আনার পর মা ব্যবহার পদ্ধতিও বুঝিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, যেখান থেকে জিনিস নিবি, সেখানেই রেখে দিবি। মা অনেক কিছু কিনেছিল। সেগুলো মা বিভিন্ন জায়গায় সাজিয়ে দিয়েছিল। তারপর হঠাৎ তিনদিনের মাথায় বাড়ি থেকে ফোন আসে বাবার শরীর ভালো নয়। মা’কে কলকাতা পৌঁছে দিতে হয়। মা বাড়ি চলে যায়। মা কি চেয়েছিল, পথিক জানে না। ওকে তিনি কিছু বলেননি। হয়ত আবার আসবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু নানা কারণে আসা হয়নি। তারপর যা হয়, বিভিন্ন সময়ে কারওর প্রয়োজনে একবেলার জন্য বালতি নিয়ে গেছে বা মগ নিয়ে গেছে। সেগুলো ফেরৎ এসেছে কিনা মনে নেই। কে নিয়েছে সেটাও মনে নেই। এমনকি বাইরে কাপড় শুকাবার জন্য মা যে দড়ি কিনেছিল সেটাও নিয়ে গেছে। কি কি আছে সেটা জানা নেই। প্রথমত পথিক জানে না মা কি কি কিনেছিল, দ্বিতীয় কারণ পথিক সকালে দাঁত মেজে অফিসে চলে যায়। সেখানেই স্নান, খাওয়া-দাওয়া, এমনকি রাতের খাওয়া মিটিয়ে বাড়িতে আসা। মেস থেকে এখনও নাম কাটায়নি। কখনও কখনও মেসে রাতেও থেকে গেছে। ফলে মা কি কিনেছিল সংসারের জন্য, তার কি আছে আর কি গেছে তার হিসেব পথিক দিতে পারে না। এসব কথা কাউকে বলাও যায় না। প্রথম প্রথম কাউকে টাকা ধার দিলে পথিক লিখে রাখত। এখন আর লেখে না। বেশিরভাগ লোক ধার নিয়ে শোধ করে না। মা বলে, ‘ডান হাতের কথা বাঁ হাতকে বলতে নেই’। মায়ের শিক্ষা তো ফেলা যায় না।

[৭]

বাজারে ঢুকেই ইন্দুপ্রভা প্লাস্টিকের ফুলের দোকানে ঢুকল। কতরকম ফুল, কতরঙের ফুল, ঘুরে ঘুরে দেখল, ‘যাওয়ার সময়ে কিছু ফুল নিয়ে যাব?’ পথিক ঘাড় নাড়ল। ‘লিস্টে নেই কিন্তু’। পথিক হাসল।

‘কিছু তো বললে না?’

‘কি বিষয়ে?’

‘কেন ফুলের ব্যাপারে!’

‘আমি তো সম্মতি দিয়েছি। তবে এতে তো গন্ধ নেই।’

‘গন্ধ চাইলে খরচ বাড়বে।’

শুনে পথিক হাসল, মনে মনে বলল, এ আবার কি রকম ফুল থাকবে গন্ধ থাকবে না?

‘এগুলো সাজানোর জন্য, ঘরটা সাজাতে হবে না! তোমার ঘরে ঢুকে লোকে বলবে, বউটার রুচি আছে। ঘর সাজাতে জানে। ঘরটাকে সেরকম তো বানাতে হবে!’

হাসিটা মুখে লেগেই ছিল। তাই নতুন করে কিছু বলল না।

#

দু’বছর আগে মায়ের সঙ্গে বাজারে এসে মা বার বার পাপোশের কথা বলছিল। কোনও দোকানেই মায়ের পছন্দমতো নারকোল দড়ির পাপোশ নেই। মা কিনল না। ফেরার পথে রিক্সায় বলেছিল, ‘এখন ছেঁড়া জামা-কাপড় ভাঁজ করে ব্যবহার কর। কলকাতায় গেলে পাপোশ নিয়ে আসবি।’

‘একটা প্লাস্টিকের না হয় কিনেই নিতাম।’

মা বলেছিল, ‘প্লাস্টিক খুব তাড়াতাড়ি গরম হয়, ঠান্ডা হতেও সময় নেয়। ঘরে প্লস্টিক রাখবি না। ঘর কম গরম হবে।’

#

ইন্দুপ্রভা লিস্ট মিলিয়ে সবকিছু কেনার পর সাতরকম প্লাস্টিকের ফুল কিনেছিল। প্রতিদিন সকালে পাল্টাবে বলে। ওর মতে এর ফলে মন, শরীর, সম্পর্ক ও ঘর প্রতিদিন নতুন হয়ে উঠবে। পথিক অনেকক্ষণ ইন্দুপ্রভার দিকে তাকিয়েছিল। সম্পর্ক, মন, শরীর ও ঘর প্রতিদিন নতুন হবে। কী অসাধারণ উচ্চারণ এবং তার অভিঘাতে ইন্দুপ্রভাকে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মনে হয়। পথিক নিষ্পলক ওর দিকে তাকিয়ে থাকায় ইন্দুপ্রভা বেশিক্ষণ চোখে চোখ রাখতে পারে না। নিজের বুকের মধ্যে বোধহয় দুরুদুরু আওয়াজ শুনতে পায়। কী করবে বুঝতে না পেরে ভয় থেকে বাঁচতে পথিকের বুকে মুখটা গুঁজে দেয়।

[৮]

পথিক ভেবেছিল পরদিন অফিস যাবে না। ওকে একটু সাহায্য করবে। ইন্দুই জোর করে পাঠাল, ‘কেন কামাই করবে, আমি সামলে নিতে পারব। কোনও অসুবিধা হবে না।’

‘নতুন বউকে একা রেখে যাব?’

‘কেন? কে আসবে নিতে?’

‘লঙ্কাপতি রাবণ যদি আসে?’

‘লক্ষ্মণ রেখার বাইরে আমি যাব না।’

‘এখানে তো কোনও লক্ষ্মণ নেই। আছে নাকি?’

‘তাহলে রামরেখার বাইরে যাব না। তুমি নিশ্চিন্তে অফিস যাও। বউ ঠিক থাকবে।’

#

আজ অফিসে গিয়ে বলেছে, বউ নিয়ে এসেছি। সবাই বউ দেখতে চায়। পরিচয় করতে চায়। সবাই তো কলকাতায় যেতে পারেনি। অফিসে বলতে গেলে আজ কাজ করতেই হয়নি। নানা জনের কথার উত্তর দিতেই সময় কেটে গেছে। একবার ভেবেছিল মাঝে বাড়ি যাবে। দেখে আসবে, সজলদা ফাজলামি করে বলেওছিল, ‘একবার বউটাকে দেখে আয়, একা একা কী করছে।’ কথাটা না বললে হয়তো আসত। সজলদা বলায় একটু দোনামনা হল। তারপর নানা কথায় বাড়ি আসা হয়নি। সহকর্মীরা যে আওয়াজ দেয়নি তাও নয়। তবে ইচ্ছা থাকলেও যাওয়া হয়নি। মনে হচ্ছিল ও একা একা কি করছে? হয়তো খেয়ে দেয়ে ঘুমাচ্ছে বা বই পড়ছে। পথিক অফিসে যাওয়ার সময়ে বলেছিল, ‘খাওয়া হয়ে গেলে অফিসে চলে এসো। ঢুকে ডানদিকের বড় ঘরে আমি বসি।’

‘ধ্যাৎ! আমি কেন অফিসে যাব? তুমি অফিস করে আস, তারপর বেরুব।’

#

অফিস থেকে ফিরে জুতোটা গুছিয়ে রাখতে গিয়ে দেখে, বেশির ভাগ জুতোই তাকে নেই। এই প্রথম পা ধুয়ে ঘরে ঢুকতে হল। জুতোগুলো না দেখে মনটা খারাপ হয়েছিল। পুরনো হলেও বাতিল হওয়ার মত নয়। মাঝে মাঝে যে ব্যবহার হয় না তাও নয়। ইন্দুপ্রভা দরজাতেই দাঁড়িয়ে ছিল। মুখোমুখি হতেই প্রশ্ন করল, ‘আমার জুতোগুলো?’

‘যাদুঘরে জনাব।’ হাসতে হাসতে ইন্দু বলল, ‘জুতোর যাদুঘর বানাতে গেলে, প্রত্যেকটা জুতোর তো ইতিহাস লিখতে হবে? ইতিহাস লেখার কাজ শুরু হবে। তাই অন্যত্র আছে।’

#

বউ এর পাশ দিয়ে ঘরে ঢুকে দেখল, একদিনেই বাড়িটা পাল্টে গেছে। অফিস থেকে ফিরে পথিক নিজেই চিনতে পারছে না। ও ভাবতে শুরু করেছে, ঘরগুলো কি সত্যি এইরকম ছিল? এত তাড়াতাড়ি পাল্টে ফেলল কি করে? সেই ঘর সেই আসবাব, সবকিছু নতুন লাগছে। ওর চোখ দেখেই বউ বুঝতে পেরেছিল, পাল্টাতে পেরেছি!

পথিক হাসতে হাসতে ভিতরের ঘরে গেল। রান্নাঘরে গেল, বাথরুমের দরজাটা খুলে দেখল, সবকিছু পাল্টে গেছে। ওর পিছন পিছন ইন্দুপ্রভাও ঘুরছিল। ফলে ও ঘুরে দাঁড়াতেই দেখে হাসিমুখে ইন্দু। মুখে হাসি লাগিয়ে রাখে পথিক।

ইন্দুপ্রভা জিজ্ঞাসা করে, ‘কিছু খেয়ে এখুনি বেরুবে না সন্ধ্যার পরে?’

পথিক কথা বলে না। হাসি মুখে মাথা নাড়ে।

 

[৯]

দ্বিতীয়দিন অফিসে গিয়ে পথিককে কিছু বলতে হয়নি, সবাই জেনে গেছে ও বউ নিয়ে এসেছে। বড়বাবু বললেন, ‘বৌমাকে নিয়ে এসেছো? তাহলে তো একদিন বৌমাকে আশীর্বাদ করতে যেতে হয়।’ সবাই আসতে চায়, কাউকে বাদ দেওয়া যায় না। অন্তত পনেরোজন হবে। এত লোক ও একা সামলাবে কী করে? সাহস করে বলতেও পারছে না। সবচেয়ে বড় কথা ওর নিজেরই সাহসে কুলাচ্ছে না। কোয়ার্টার থেকে বাজারে যাওয়া আসার পথে অনেকেই দেখছে এবং অনেকেই কথা বলছে। অনেকের সঙ্গে আলাপও হয়েছে। ইন্দু পাশাপাশি কোয়ার্টারের অনেককেই চিনে গেছে। যাদের সঙ্গে পথিক এই দু’বছরে কোনও কথা বলেনি। ও তাদেরও চিনে ফেলেছে। যেমন সজলদার বউ-মেয়ে বা বড়বাবুর দুই ছেলে ও বউ, সবাইকে চিনে ফেলেছে। তবু পথিক একটু ইতস্তত করছে। এতগুলো লোককে ডাকলে কিছু তো খাওয়াতে হয়! অন্তত চা-বিস্কুট, সেটাও কি ওর একার পক্ষে সম্ভব? প্রতিদিন বাজারে গিয়ে ও একটা তালিকা প্রকাশ করে, যা কিনতেই হবে। পথিক কথা বলে না। ও দেখছে এগুলোর মধ্যে সবই সংসারের জিনিস, শাড়িও নেই গহনাও নেই। কেন কথা বলবে?

আজ বাজারে ঢুকে ইন্দুপ্রভাই জিজ্ঞাসা করল, ‘বন্ধুদের কবে খাওয়াবে?’

‘কোন বন্ধু?’

‘কেন অফিসের?’

‘সবাই তো মুখিয়ে আছে।কিন্তু এত লোক..’

‘কতজন হবে?’

‘কম হলেও পনেরোজন।’

‘তুমি বলে দাও, আগামী শনিবার সন্ধ্যাবেলা সবাই আসুক।’

‘তুমি একা পারবে?’

পথিকের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘অতিথিদের কী খাওয়াতে চাও?’

‘তুমি যা পারবে।’

[১০]

শনিবার সন্ধ্যাবেলা সবাই এল, কেউ বাদ যায় নি। কোয়ার্টারে এসে সবাই চমকে গেছে। সাজানো-গোছানো, সুন্দর গন্ধে ভরপুর। একই কোয়ার্টারেই সবাই থাকে কিন্তু পথিকের ঘরের ভিতরগুলো পাল্টে গেছে। নতুন রঙ হয়নি বা অন্য কিছু করা হয়নি। তা সত্বেও একটা চোখে লাগার মত পরিবর্তন হয়েছে। ওর রান্না খেয়েও সবাই ধন্য ধন্য করেছে। বড়বাবু তো যাওয়ার সময়ে বলে গেলেন, ‘বামুনের হাতে চাঁদ এই প্রথম দেখলাম।’ পথিক প্রথমে বুঝতে পারেনি, বলে ফেলেছিল, ‘মানে?’

‘বউমাকে বলো উনি বুঝিয়ে দেবেন।’

সজলদা বলল, ‘কোথা থেকে এমন পূর্ণ মানবী ধরে এনেছিস?’

#

 

সবাই চলে গেলে ওরা দুজনে মুখোমুখি খেতে বসেছিল। পথিক ইন্দুকে দেখছিল। বলা যায় পর্যবেক্ষণ করছিল। নানা চিন্তা আসছিল মাথায় কিন্তু ভাবতে ইচ্ছা করছিল না। সামনে খাবার দেওয়া সত্বেও খাবারে হাত দিচ্ছিল না। নিজের খাবার নিয়ে মুখোমুখি বসতে গিয়ে ইন্দুর নজর পড়ে পথিক বসে আছে খাবার নিয়ে শুধু নয় এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

‘কি হল? না খেয়ে কি দেখছো?’

‘তোমাকে?’

‘কেন?’

‘সবাই তোমার খুব প্রশংসা করল।’

‘তোমার হিংসা হচ্ছে?’

‘না।’ একটু থেমে বলল, ‘চিন্তা হচ্ছে।’

‘কিসের চিন্তা?’

‘পরে বলব।’

‘না বলে ফেল। না বললে আমি রাতে ঘুমাতে পারব না।’

‘অন্য কিছু নয়, বড়বাবু বললেন, বামুনের হাতে চাঁদ দেখলাম।’

‘আর কে কি বলল?’

‘সজলদা বলল, কোথা থেকে পূর্ণ মানবী ধরে আনলি? সত্যি বল তো, ইন্দু তুমি কে?’

‘আমি তো ইন্দুপ্রভা।’

পথিক চোখ বুঁজে বসেছিল। চোখ খুলতে সাহস হচ্ছিল না।

চিত্রকর: মৃণাল শীল

Comments are closed.