হিবাকুশার ছেলে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

 রাজীবকুমার ঘোষ

১.

‘এই শুনছ… একটা খুব খারাপ খবর আছে। শুনলে তোমার খুব খারাপ লাগবে। তোমার ছোটোবেলার স্কুল বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।’

খুব মন দিয়ে শেয়ারের ওঠা-পড়া মাপছিলাম। সব কীরকম ঘেঁটে গেল। মুখ দিয়ে ফস্‌ করে বেরিয়ে গেল, ‘যাঃ, কী বলছ! সে আবার হয় নাকি!’

অন্তরার হাতে মোবাইল ধরা, মুখটা হাসি হাসি। অন্তরা মনে হয় আনন্দই পাচ্ছে। ওর বিশ্বাস মফস্‌সলের ওই বিলো স্ট্যান্ডার্ড স্কুলে পড়ার জন্যই আমি ঠিক জাতে উঠতে পারিনি। অন্তরা কলকাতার খানদানি স্কুলে পড়া মেয়ে। মাধ্যমিকের সময় টেস্ট পেপারে সেই স্কুলের নাম দেখলেই পেট গুড়গুড় করে উঠতো। তখন কি আর স্বপ্নেও ভেবেছিলাম ওই স্কুলের কোনও মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে হবে। অন্তরা কেন যে আমায় ভালোবেসেছিল কে জানে। এখন প্রতিদিন সেই ভালোবাসা মন্থন করে রকমারি বিষ তুলে আনাই তার কাজ। কিন্তু আজ এটা কী বলছে! এখন একবিংশ শতাব্দী। এখন জেলা সদরের কোনও হাইস্কুল বিক্রি হয়ে যাবে কী করে! হ্যাঁ শুনেছি অনেক বাংলা স্কুল উঠে যাচ্ছে –– সে তো ‘উঠে যাওয়া’, ছাত্রের অভাবে আরও পাঁচরকম কারণে। কিন্তু বিক্রি কী করে হয়!

‘ঠিকই বলছি। তোমাদের তো মিশনারি স্কুল। ওরা স্কুল বেচে দেবে। একেই তো বাজে স্কুল যত অগামার্কা ছেলে পড়ে আর এখন ছাত্রের সংখ্যাও কম। অতবড় স্কুল, অতবড় জায়গা কোনও প্রাইভেট স্কুলকে বেচে দেবে। বাজারে এইরকমই খবর।’

অন্তরা সোৎসাহে মেয়েকে খবরটা দেবার জন্য ছুটল। মেয়ের কাছে সে বাবাকে অনেকদিন আগেই ‘নিল’ বা ‘শূন্য’ করে ফেলেছে। আজ সেই অনন্ত শূন্যের পাহাড়ে আরেকটা শূন্য যোগ হবে। বাবার পড়াশুনা এতই বাজে স্কুলে যে সেই স্কুল বিক্রি হয়ে যায়।

আর পনেরো মিনিট রিসার্চ করলে শেয়ারে একটা বড় দাঁও মারার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু মাথাটা কীরকম আউলে গেছে। ব্যালকনিতে বেরিয়ে আসলাম। বহুদিন দিগন্ত দেখিনি, রোজ দিগন্ত আটকে থাকা বহুতলের সারি দেখি। ওটাই আসলে এ-ওয়ান সিটির দিগন্ত কিন্তু আমার মনে হয় এই দিগন্ত আসল দিগন্তটাকে আটকে রেখেছে। মাঝে মাঝে রাতের দিকে ব্যালকনিতে বসে হাততালি দিই। বৌ-মেয়ে শুনতে পায়না, দেওয়ালে লটকানো স্মার্ট টিভি, ডলবি সাউন্ড আমাকে আড়াল দেয়। নেশাটা জমে উঠলে আমি ঠিক তিন বার হাততালি দিই, আস্তে আস্তে বলি ‘চিচিং ফাঁক’। আমার তখন মনে হয় হাততালি দিলেই ম্যাজিকের মতন আটকে থাকা দিগন্তটা বেরিয়ে আসবে এই রাতে। আজ পর্যন্ত বেরোয়নি। কিন্তু নেশার ঘোরে মনে হয় একদিন ঠিক দিগন্তটাকে আমি বের করে ফেলব।

অন্তরার মোবাইল বেয়ে আসা খবরেরা আজ পর্যন্ত ভুল হয়নি। আমার বিশ্বাস এবারও হবে না। বহুকাল আগে ছেড়ে আসা সেই স্কুলের জন্য কিছু নোনা হাওয়া এখনও ফুসফুসে ঘোরে। এখন সেই হাওয়া বেরিয়ে আসতে চাইছে। বেরিয়ে আসলেই এই ফ্ল্যাটবাড়ির লোহার কাঠামোয় জং ধরে যাবে, ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়বে সব। যতবার অন্তরা স্কুল নিয়ে খোঁটা দেয় ততবার চোখের সামনে সিনেমার মতো লাফিয়ে ওঠে টুকরো টুকরো ছবি। সেই ছবিতে যাদের মুখ থাকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের কোনও নম্বর আজ আর আমার কাছে নেই। মুখগুলো ছড়িয়ে গেছে সেই কবেকার বিশ্বায়নের ঢেউতে দেশের নানা কোণে, দেশ-বিদেশে। কাকে জিজ্ঞেস করব আমি! আমি দেখতে পেলাম শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ন ফোন নম্বর জমে জমে ভারী হয়ে যাওয়া একটা স্মার্টফোন হাওয়ার সমুদ্রে হঠাৎ লাফিয়ে উঠেই ডুবে গেল আর এখন ফোনটা ক্রমশ নীচে আরো নীচে নেমে যাচ্ছে।

২.

ট্যুরের নাম করে কুড়ি বছর পরে যে স্টেশনে পা দিলাম, সেই স্টেশন আমি চিনি না। কুড়ি বছর আগের স্টেশনের অবশ্য আমার জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকার কথাও নয়। আমার কোনও তাড়া নেই, দু’দিনের ট্যুরের অজুহাত তৈরি করা আছে। একটা চায়ের স্টলের পাশেই বসে পড়লাম। রাস্তার চায়ের স্বাদ বহুকাল ভুলে গেছি। আপাতত সেই স্বাদটা মনে করা জরুরি। জরুরি এই ভাবনাটাও ভাবা যে এবার কী! আমি কি জনে জনে জিজ্ঞেস করে বেরোব, ‘আচ্ছা দাদা বলতে পারবেন আমার স্কুলটা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে কি না?’ একটা কাজ করলে অবশ্য হয়, স্কুলেই সোজা গিয়ে জিজ্ঞেস করা। কিন্তু সেটা কী করে সম্ভব! একটা স্কুলে ঢুকব, হেড স্যারের সঙ্গে দেখা করব তারপর তাকে বলব, ‘স্যার শুনলাম স্কুলটা বিক্রি হয়ে যাবে, এটা কি ঠিক খবর, স্যার?’

চায়ে চুমুক দিতে দিতে ঠিক করলাম আগে শহরটা একটু ঘুরে দেখি। একটা টোটো ভাড়া করে নিলেই হবে। সঙ্গে তো মাত্র একটা ব্যাগ, অসুবিধা হবে না। ঘুরতে ঘুরতে হোটেল থাকলে তাও দেখা হয়ে যাবে। অনেক্ষণ ধরেই দেখছি একটু দুরেই এক ভদ্রলোক একটা তারজালি ঢাকা বোর্ডে একটা হাতে লেখা পত্রিকা আটকাচ্ছেন। এখনও এসব হয় এখানে! আর্ট পেপারের ওপরের কোণটা গুটিয়ে যাবার উপক্রম করতেই তিনি দ্রুত ডান হাতের কনুই দিয়ে সেটা আটকে একটা বোর্ড পিন মেরে দিলেন আর এই আটকানোর ভঙ্গিটা ঝট করে আমাকে মনে পড়িয়ে দিল চয়নের কথা। এটা কি চয়ন ! উত্তেজনায় আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম ভদ্রলোকের দিকে। পাশ কাটিয়ে একটু গিয়ে ফিরে দেখতে লাগলাম। চয়নকে চিনতে পারলাম আমি। বয়স হলেও মুখের গড়ন খুব একটা বদলায়নি। আশ্চর্য এখনও ও সেই লেখা-লেখি, দেওয়াল পত্রিকার পাগলামো বজায় রেখেছে। ওকে খুব নিষ্ঠুরভাবে ‘পাগলার পোলা’ বলে ডাকা হত। চয়নের বাবার মাথায় গন্ডগোল ছিল। ওর বাড়ি যারা যেত তারাই স্কুলে ব্যাপারটা রটিয়ে দিয়েছিল। চয়ন সেইজন্য গুটিয়ে থাকত, খুব একটা মিশত না কারও সঙ্গে আর বই পড়ত, প্রচুর বই। আমি এগিয়ে গিয়ে প্রায় ফিসফিস করেই বললাম, ‘অনেক লণ্ঠন ওড়ে, হাওয়াবাতাসের রাত, কেউ এল আজ?’ চয়ন তারজালির পাল্লাটা চাবি লাগিয়ে ছোট তালাটা টেনে দেখছিল তালাটা লেগেছে কিনা, চমকে তাকাল। কয়েক পলক মাত্র তারপর বলে উঠল, ‘বাজাবো না আমাদের, বাজাবো না জলপাইকাঠের এসরাজ?’

এখন বেলা প্রায় এগারোটা, আমি আর চয়ন চুপ করে বসে আছি পাশাপাশি। আমাদের ঠিক সামনেই ব্যস্ত স্টেশনে সময়ের ভাঁজে আমরা দুজনেই অনেক অনেক বছর আগের স্কুল বয়সের আশ্চর্য বিকেলটা দেখতে পাচ্ছিলাম। চয়ন আমাকে টেনে নিয়ে গেছিল শহরের কোনও সাহিত্য উৎসবে ফ্রিতে সিঙাড়া খাওয়া যাবে বলে। সেখানে এক কবির মুখে আশ্চর্য কিছু লাইন শুনি আমরা। আমরা পাগল হয়ে যাই। পাঠ্য বইতে ওইরকম কবিতা কখনও পড়িনি আমরা। অনেককাল লাইনগুলো মুখে মুখে ফিরত আমাদের। কবির নাম আমার আজ মনে নেই কিন্তু সামনে সেই কবিকে আজ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। দেখতে পাচ্ছি তার কবিতাপাঠের ভঙ্গিটি। স্মৃতিতে ফিরে আসছে শব্দেরা, ‘কোনোদিন কিছুই ছিল না, কিছুই নেই আমাদের আজ/আমরা কি বাজাব না জলপাইকাঠের এসরাজ?’

আমি বললাম তোর কী জমল রে চয়ন এত বছরে? হাসল চয়ন, ‘জমেছে ভালোই –– জীবন অনেক দিয়েছে রে। প্রাইমারি স্কুলের একটা চাকরি — কচিকাঁচাদের নিয়ে হইহই, ভরপুর সংসার, কিছু লেখালেখি, কিছু আন্দোলন — এই বেশ আছি। তোর কী জমল ?

হেসে বললাম, ‘জমেছে শুধু নম্বর। বড় ছোট নম্বর। কোনওটা গাড়ির, কোনওটা প্যান কার্ডের, কোনওটা ক্রেডিট কার্ডের, কোনওটা ডি-ম্যাট অ্যাকাউন্টের, কোনওটা ই-মেলের পাসওয়ার্ড, কোনওটা পলিসি নম্বর— স্কুলে না পাওয়া সব নম্বরগুলো এখন আমার কাছে চলে এসেছে বুঝলি। এখন কাশলেও নম্বর ঝরে ঝরে পড়ে।’

চয়ন বলল, ‘আর স্বপ্ন দেখলে? সেখানেও নম্বর দেখিস?’

আমি থমকালাম, বললাম, ‘না রে। স্বপ্নে নম্বর দেখি না। স্বপ্নে স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে দূরে গঙ্গার ওপারে আকাশ আর মাটির মাঝের সবুজ রেখাটা দেখি।’

‘আমি, আমরা থাকি সেই স্বপ্নে?’

আমি নীরবে মাথা নাড়ি। স্টেশন কাঁপিয়ে একটা থ্রু ট্রেন চলে যায়। ছোট ছোট ঘূর্ণিগুলো প্ল্যাটফর্মে ঘুরতে থাকে, ঘুরতেই থাকে।

৩.

‘গর্ত, গর্ত খুঁড়ে ফেলো ইমিডিয়েটলি। লোক লাগাও, লোক লাগাও — তাড়াতাড়ি, দেরি কোরো না। কম সে কম ছ’ফুট। সবচেয়ে ভালো হয় যদি বাড়ির চারপাশে পুরু কংক্রিটের দেওয়াল গাঁথতে পারো। লোন নাও না ব্যাঙ্ক থেকে, কটা টাকাই বা লাগবে। দেওয়ালের পিছনে থাকা আর গর্তে ঢুকে যাওয়া। আর আমরা কী করতে পারি বলো? কী করতে পারি?’ এতক্ষণ ধরে বলতে বলতে মুখে ফেনা উঠে গেছে চয়নের বাবার। চয়ন আমাকে টেনে ওর বাড়িতে নিয়ে এসেছে। ওর বৌ, ছেলের সঙ্গে আড্ডা সেরে চয়নের বাবার পাল্লায় পড়েছি। সৌজন্যবশত এড়িয়ে যেতে পারিনি চয়নের বাবাকে। কেমন আছেন জিগ্যেস করতে গিয়ে ফেঁসে গেছি। স্টেশন থেকে আসার পথে চয়ন বলে রেখেছিল ওর বাবার কথা। ওর বাবা নিজেকে এখন হিবাকুশা ভাবেন। জাপানে যুদ্ধের সময় কেউ বোমার বিস্ফোরণ থেকে বেঁচে গেলে তাকে হিবাকুশা বলা হত। ‘হি’ মানে ক্ষতিগ্রস্ত, ‘বাকু’ মানে বোমা আর ‘শা’ মানে ব্যক্তি। হিরোশিমায় প্রথম পরমাণু বোমা পড়ার ঘটনা সবাই জানে। সেই বোমা থেকে সেদিন যারা বেঁচে গিয়েছিলেন তাদের জাপানি ভাষায় হিবাকুশাই বলা হয়েছিল কিন্তু সেই থেকে হিবাকুশা মানে এমন কেউ যে পরমাণু বোমার হামলা থেকে বেঁচে গেছে। এখনও পর্যন্ত হিরোসিমা আর নাগাসাকির পাঁচ লাখ হিবাকুশাদের পরিচয় পাওয়া গেছে। এই বছরের মার্চ অবধি এখনও বেঁচে আছেন এক লাখ পঁয়তাল্লিশ হাজার আটশ চুয়াল্লিশ জন হিবাকুশা। আমার এত কিছু জানার কথা নয়, চয়ন-ই জানিয়েছে এইসব তথ্য। বছর দুয়েক আগে চয়নের বাবার হঠাৎ মনে হতে থাকে যে এই শহরে পরমাণু বোমার হামলা হয়েছিল আর সেই হামলা থেকে তিনি কোনওভাবে বেঁচে গেছেন। বেঁচে গেছেন কিন্তু তেজস্ক্রিয়তায় ঝলসে গেছেন। ঝলসানোটা আর কিছু নয় তার গায়ে শ্বেতির ছোপগুলো। সেগুলোকেই তিনি মনে করেন পরমাণু বোমার বিকিরণের ফল।

আমি জানতাম চয়নের বাবার অনেক আগে থেকেই মাথায় গন্ডগোল ছিল তবুও বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেছিলাম হঠাৎ করে চয়নের বাবার এইরকম মনে হবেই বা কেন! ভাবা যায়! একটা লোক মনে করছে এই শহরে অ্যাটম বোমা পড়েছে, শহরটা ধ্বংস হয়ে গেছে, কাতারে কাতারে লোক মারা গেছে আর সে তেজস্ক্রিয়তা সহ্য করে বেঁচে আছে!

চয়ন স্টেশনে সাইকেলে রেখে এসেছিল তাই হাঁটছিলাম আমরা। চয়ন প্রশ্নটা শুনে চুপ হয়ে গেছিল তারপর বলেছিল, ‘চারপাশে তাকিয়ে দেখ, যতটা পথ হাঁটলি কিছু বুঝলি?’ বুঝতে পেরেছিলাম আমি স্টেশনের বাইরে পা দিয়েই। আগাপাশতলা পালটে গেছে শহরটা, একদম অচেনা লাগছে। চয়ন উত্তরের অপেক্ষা করল না, বলেই চলল, ‘বাবা খুব কম বেরোত বাইরে। তাও তো ডাক্তার দেখাতে বাইরে নিয়ে যেতেই হতো। বাবা শহরটাকে আর মেলাতে পারত না তার মাথার মধ্যে থাকা শহরটার সঙ্গে। ধীরে ধীরে কেন জানি না বাবার মাথায় ঢুকে গেল এই শহরটা পরমাণু বোমার হামলায় একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছিল তাই আবার সব নতুন করে গড়ে উঠেছে। এছাড়া আর কোনও যুক্তি বাবার মাথায় আসেনি। আমি শুনছিলাম আর দেখছিলাম আগাগোড়া পালটে যাওয়া মফস্‌সল শহরটাকে। এখন তার গায়ে আর মফস্‌সল দাগানো যাবে না। তার আর কোনও নিজস্বতা নেই। এখন সে এই দুনিয়ার যে কোনও একটা শহর। আমার যদি এইরকম লাগে তাহলে চয়নের বাবার কীরকম লাগতে পারে!

চয়নের বাবার কথাগুলো চুপ করে শুনে যাচ্ছিলাম। তিনি পারমাণবিক বিস্ফোরণের হাত থেকে বাঁচার উপায় বলে যাচ্ছিলেন –– কংক্রিটের দেওয়াল, গর্ত করে রাখা। কোথায় এগুলো জেনেছিলেন তিনি! আশ্চর্য নয়, সেই সময় পরমাণু বোমার আতঙ্ক সারা পৃথিবী জুড়েই ছিল। আলোচনা হতো এইসব প্রসঙ্গ নিয়ে। সেইসব আলোচনা থেকে তিনি হয়তো জেনেছিলেন। এর মধ্যেই দেখে নিয়েছি পুরনো বাড়ির পেছনের বাগানে একটা কংক্রিটের দেওয়াল আর স্ল্যাব চাপা দেওয়া একটা জায়গা। আমি জানি ওর নীচে নিশ্চিত একটা গর্ত আছে। চয়ন এইসবই করতে বাধ্য হয়েছে না হলে ওর বাবাকে শান্ত রাখা যাচ্ছিল না। আমি মাঝে মধ্যে হুঁ হাঁ করে তাল দিচ্ছিলাম, একসময় প্রশ্ন করলাম, ‘আচ্ছা কোথায় পড়েছিল বোমাটা?’ চয়নের বাবা হেসে উঠে বললেন, ‘তুমি নিজেই বুঝতে পারবে সেটা। বিস্ফোরণের কেন্দ্রে তো কিছুই বাঁচে না জড়-জীব কিছুই না –– সব ধ্বংস হয়ে যায়। তাই ওই জায়গাটাই একদম নতুন করে গড়তে হয়েছে, ওখানে পুরোনো কিছুর এক কণাও পাবে না। কিচ্ছু না। আমার বিভ্রম হতে থাকে, সত্যিই কি এখানে পরমাণু হামলা হয়েছিল! চয়নের বাবার মুখে শ্বেতির ছোপগুলোর দিকে তাকিয়ে আমার গা শিরশির করে ওঠে।

৪.

গঙ্গার ধারের মাঠটায় বসে ছিলাম দু’জনে। মাঠটা আছে তবে সেটা এখন পার্ক। পাশেই আমার, আমাদের সেই স্কুল চুপ করে দাঁড়িয়ে হলদে আলোয় ভিজছে। হোটেল পেয়ে গেছি। চয়ন দুপুরে ওর বাড়িতে খাইয়েছে তারপর হোটেলে নিয়ে গেছে। সারা বিকেল সন্ধে আমাকে নিয়ে ঘুরেছে। আমি খুঁজে পেয়ে গেছি চয়নের বাবার বলা সেই বিস্ফোরণের কেন্দ্র –– শহরের সবচেয়ে জমজমাট মোড়টি। দোকানে দোকানে আমার কাছে সে এক অচেনা মোড়। দোকানগুলোর পিছনে আকাশে মাথা উঁচু করে সারি সারি ফ্ল্যাটবাড়ি। পুরনো গির্জার চূড়াটা এখন আর দেখা যায় না।

জলে আলোর ছড়িয়ে যাওয়া দেখছি দু’জনে। স্কুলের খবরটা সত্যি, তবে এখনও অতটা ছড়ায়নি। চয়ন নানা রকম সংস্থার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই খবরটা ভেতর থেকে জানে। সব কিছু ঠিকঠাক চললে আর এক বছর। আমি উঠে দাঁড়ালাম, মাথাটা টলে গেল — অল্পেতেই আজ নেশা হয়ে গেল নাকি! চয়নকে বললাম, ‘চল স্কুলে যাব।’

‘এখন কোথায় স্কুলে যাবি! স্কুল তো বন্ধ। কাল তো আছিস। স্কুল টাইমে নিয়ে যাবো, সেই কথাই তো হল।’

আমি একটা খিস্তি করলাম, ‘এখনই যাবো। তোর শালা সব চেনা, তোর কাছে কোনও ব্যাপার! আর কাল সকালেই আমি ফিরে যাবো। তোর এই বোমফাটা শহরে আর থাকতে ভালো লাগছে না।’

‘তোর নেশা হয়ে গেছে। চল হোটেলে চল।’

আমি কোনও কথা না বলে হাঁটা দিলাম হলদে জোছনায় ভিজতে থাকা স্কুলবাড়ির দিকে।

* * *

বিভ্রান্ত লাগছে। অশ্বত্থ গাছটা আগের মতোই আছে কিন্তু গোটা স্কুলবাড়িটা পালটে গেছে। চয়নের ঠিক চেনা আছে সব — দারোয়ান গেট খুলে দিয়েছে। আমি এখন পাক খাচ্ছি স্কুলের মাঠের মধ্যে। চারপাশে যে বিল্ডিংগুলো সেগুলো একটাও চিনতে পারছি না। চয়ন হাল ছেড়ে মাঠে বসে আছে। কোথায় গেল ব্রিটিশ পিরিয়ডের স্কাইলাইটওয়ালা সেই বিল্ডিংটা! কোথায় গেল আমাদের জল খাবার জায়গাটা! নেশার জন্য বোধহয় সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। আমি চিৎকার করে চয়নকে বললাম, ‘এটা আমাদের স্কুল হতেই পারে না।’ চয়ন শুধু মাথা নাড়ল। আমি আবার চেঁচালাম, ‘এই শালা হিবাকুশার বাচ্চা… চুপ করে থাকলে হবে… জবাব দে আমাদের স্কুলটা কোথায় গেল?’ পায়ে পায়ে জড়িয়ে ধড়াম করে পড়ে গেলাম আর সব অন্ধকার হয়ে গেল। আমি ভাবলাম জ্ঞান হারিয়েছি আকাশে একদম গোল একটা সাদা ধাব্বা দেখে বুঝলাম পাওয়ার কাট — লোডশেডিং। সাদা আকাশে একটা মুখের শ্যিলুয়েট ফুটে উঠল। চয়ন আমাকে ধরে বসাল আর সেই চাঁদের আলোয় আমি হঠাৎ চিনতে পারলাম প্রাইমারি সেকশনের বিল্ডিংটাকে — ওটা এখনও মোটামুটি একই আছে। আমি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম, ‘শালা! একটা আইডেন্টিটি ছিল। এই দুনিয়ার কোথাও একটা স্কুল ছিল আমার, সেটাও হারিয়ে গেল।’

চয়ন বলল, ‘তোকে তো বললাম আমরা একটা মুভমেন্ট করার কথা ভাবছি।’

আমি ফোঁপাতে ফোঁপাতে হেসে উঠলাম, ‘মুভমেন্ট কাকে দেখাচ্ছিস! মগরমছ্‌ জানিস? কুমির? আমি শালা এখন কুমিরের খাবার জোগান দিই। জমি খেকো কুমির, প্লট খেকো কুমির, শরিকি বাড়ি খেকো কুমির। আমাকে আর মুভমেন্ট দেখাস না। আসার পথে রাস্তায় মোড়ে হোর্ডিং জুড়ে যে মালটা দাঁড়িয়ে আছে ওর পেটে এই স্কুল ঢুকে গেছে জেনে রাখ। পেটটা দেখলি না শিব মন্দিরের চূড়া থেকে শুরু হয়ে কোর্টের মাথায় জাতীয় পতাকার ডান্ডা অবধি উঠে গেছে।’ আমি পেটের সাইজ দেখাতে গিয়ে চাঁদের দিকে হাতটা তুলে ধরলাম। মনে হল ওটা চাঁদ নয় পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের মুহূর্তের মাশরুম ক্লাউড।

কারেন্ট চলে আসল, এলইডি আর সিএফএল গুলো থেকে সঙ্গে সঙ্গে আলো ছিটকে এল। আমি দেখতে পাচ্ছি হ্যালোজেনগুলো রাঙা হতে শুরু করছে। খুব তাড়াতাড়ি হলদে আলোয় ডুবে যাবে সবকিছু। চয়নের বাবা শুধু নয় আমার বাবাও তো হিবাকুশা। কিছুতেই বুঝে উঠতে চাইল না সময় পালটে যাচ্ছে। মিটিংগুলোয় বিব্রতকর প্রশ্ন ওঠাতো বলে পার্টি একসময় একেবারে বসিয়ে দিল বাবাকে। বাবা সেটা মেনে নিতে পারেনি। চুপ হয়ে গিয়েছিল, গুম হয়ে গিয়েছিল। তারপরেই এই শহর থেকে আমাদের চলে যাওয়া। তখন মেনে নিতে পারিনি এই শহর ছেড়ে দেওয়াটা। আজ বুঝতে পারছি বাবাও সেই বিস্ফোরণ দেখেছিল, ঝলসে গিয়েছিল। এই শহরটা বাবার কাছে ছিল পোড়া শহর।

চয়ন ধরে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে। চয়ন বলল, ‘তাহলেও আমরা কি বাজাব না জলপাই কাঠের এস্রাজ? ভুলে থাকার এই খেলা আর কত খেলবি? কত নিজেকে ভুলিয়ে রাখবি। একবার তো ঘুরে দাঁড়া।’ আর কয়েক পা এগোলেই স্কুলের গেট। আমি থমকে দাঁড়ালাম, বললাম, ‘চল ঘুরে দাঁড়াই।’ চয়নকে ধরে ঘুরে দাঁড়ালাম পেছনে ফেলে আসা স্কুলের দিকে। আমি জানি এই ঘুরে দাঁড়ানোই আমার শেষ ঘুরে দাঁড়ানো। চয়ন যাই বলুক সবাই ঘুরে দাঁড়াতে পারে না –– আমিও এই জীবনে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারব না। ঘুরে দেখার আমার আর কিছু নেই কিন্তু আজ এই রাতে আমি একবার শেষ চেষ্টা করতে চাই।

চয়নকে বললাম, ‘জানিস বহুকাল ধরে আমি একটা ম্যাজিক করতে চেয়েছি – করতে পারিনি। হয়ত ম্যাজিকটা একা একা করা যায় না। আজ আমার সাথে তুইও ম্যাজিকটা কর… কী ম্যাজিক তোর জানার দরকার নেই। ম্যাজিকটা হলে নিজেই দেখতে পাবি। তুই শুধু আমার সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে তিন বার জোর হাততালি দিবি।

চয়ন মাথা নাড়ল। আমি চয়নকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। আমার চারপাশ দুলছে, সামনে স্কুল দুলছে অজস্র হলুদ ঢেউয়ের আঘাতে। আমরা দু’জনে দু’হাত ফাঁক করে দাঁড়ালাম। প্রথম তালিজোড়ার শব্দ স্কুলের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হল খুব জোরে। আমি যেন দেখলাম ইঁট-বালি-চুন সুরকির ধোঁওয়া উঠল একটা। বিল্ডিংগুলো যেন কেঁপে উঠে সরে সরে যেতে লাগল। দ্বিতীয় হাততালি বাজতেই মনে হল খুব চেনা কিছু স্ট্রাকচার দেখতে পাচ্ছি ঘোলাটে ধুলোর ঝড়ের মধ্যে। মুখে সপাটে শুকনো পাতার রাশি এসে পড়ল। তবে কি ঝড় উঠেছে? অশ্বত্থগাছটা ভয়ানক দুলছে, শোঁ শোঁ করে তীব্র হাওয়া দুলিয়ে দিল আমাকে। আমি চিৎকার করে বললাম, ‘শেষ তালি চয়ন, শেষ তালি।’ তারপরেই রাশি রাশি ধুলো এসে ঢেকে ফেলল আমাদের। মুখের ভেতর বালি ঢুকে গেল, দাঁতে বালি কিচ্‌কিচ্‌ করছে, চোখ কড়কড় করছে, আগুনের মতো জ্বলছে। আমরা কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। এ কী ঝড় না পারমাণবিক বিস্ফোরণ!

*  *  *

দু’হাজার উনিশ।

এই শহরে একসময় যে অ্যাটম বোমা পড়েছিল তা শহরের লোকেরা অনেকে মনে রেখেছে, অনেকে মনে রাখেনি।

এই শহর যে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের শিকার তা অনেকে জানে, অনেকে জানে না।

এই শহরে যে ঘরে ঘরে কংক্রিটের দেওয়াল আর গভীর গর্ত খোঁড়া আছে তা কেউ কাউকে বলে না।

এই শহরে অনেকেই বিশ্বাস করে আরও বিস্ফোরণ হবে।

আমরা দুই হিবাকুশার ছেলে এইরকম কোনও দুই বিস্ফোরণের ইতিহাসের মাঝে — দু’জনেই হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি একই সঙ্গে তালি মারার জন্য।

ছবি: শুভ্রনীল ঘোষ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More