গুঁগা সরেনের জীবন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অমিত মাহাত

    ।। এক।।

    গুঁগা সরেনের ঝুপড়ির পিঁদাড় বরাবর এই পথটা সোজা চলে গেছে ঢাঙিকুসুম অব্দি। সেখান থেকে ডুংরিবন। ছাতি ফাটানো তেষ্টার শুরুয়াৎ। কিন্তু জল মেলা ভার। খিদে মেটানো তো দূর। চাষমাটি’ই এখানে দুর্লভ।

    খুব কাকভোরে –– যদিও কাক নামের পাখিটি এ তল্লাটে বিরল একপ্রকার।  এখন বনের মাথায় আর সে  ভাগাড় কোথায়। মরা গোরু মোষ দু–একটা ফেললেও ভিনগাঁয়ের সাঁওতাল নয় তো মুচি পরিবার চামড়া ছুলে সে পশুর মাংস ঝোলা কিংবা বস্তায় ভরে নিয়ে যায়। মানুষের খাবারে কুলোচ্ছে না কাকপক্ষী খাবে কী?

    গুঁগা সরেনের ঘুম ভাঙে এই সময়ে। তারপর উঠোনের কোণে ডিঙানো শুকনো খেজুর পাতা সহ কয়েকটি ডাল এনে উনুন ধরায়। রান্না চড়িয়ে দেয়। এ গাঁয়ের মাথায় টিউবওয়েল রয়েছে একটি। কয়েক বছর হল এ গাঁ সরকারের নজরে আসায় টিউবওয়েল একটি হয়েছে। তবে গরমের সময় মানুষের পিয়াস বাড়ে। কিন্তু জল তখন উঠতে চায় না। যতই হ্যাঁচকা লাগাও ওতে ঠিলি বালতি ভরবে না। দিনটি কাবার হবে। গুঁগা সেখান থেকে জল নিয়ে ফিরলে ভাত ফুটতে শুরু করে টগবগিয়ে। গরম ভাতের গন্ধ চাগিয়ে দেয় খিদে।  কাইলু আর ছেঁড়া চাটাইএ শুয়ে থাকতে পারে না। ভাতের গন্ধে উঠে পড়ে। উঠেই তার বাপকে তাগাদা লাগায় -,দে ভাত দে।

    গুঁগা নিজের ছেলের দিকে আড়চোখে তাকায়। কিছু বলে না। কতই বা বয়েস। এখনো সাত বছর হয়নি। খিদে তো পাবেই। ওর মা’র ওকে ছেড়ে যাওয়া চার বছর হয়ে গেল আজ। কাইলু তখনও মায়ের দুধ ছাড়েনি। আড়াই বছরের শিশু কীভাবে মা কে ছেড়ে এতদিন পার করে দিল। গুঁগা সেই থেকে ছেলেকে কাছছাড়া করেনি। একটিবারের জন্যেও। কাকভোর ফুরিয়ে আসছে এবার। তল্লাটে কাক যেমন বিরল, তেমনি বিরল চাষের ধানের ভাত। ভাত নেই তাই কাক নেই। কিন্তু কাকভোর আছে। এই কাকভোরে উঠেই কাইলু বায়না ধরে -দে ভাত দে।

    সকালবেলা’র প্রকৃতি খুবই মনোরম থাকে। বিশেষত এই চৈত্রের ভরামাসে। বেলা বাড়লে তা  বড় অসহ্যের। বেলা বাড়লে তাপ বেড়ে যায়। মাটি পাথর সব তখন তেতে আগুন বরাবর। ছ্যাঁকা। বাতাসেও আগুনের হলকা। গোটা দুপুর জুড়ে ঝরে পড়ে আগুন বৃষ্টি।

    ছোট্ট কাইলু বাপের পিছু নেয়। বাপ হাঁটা লাগায়। ওদের পথ পাথর চাটানির মাঠ বরাবর। পথ একসময় ওদের গাঁয়ের সীমানা ছাড়ায়। দূরের কালো পিচ রাস্তায় গিয়ে মিশেছে সে পথ। ওরা পিচ রাস্তায় না উঠে জঙ্গলের পথ ধরে। এই পথটিও পিচের সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে এগিয়ে গেছে। গুঁগা এবার ছেলের হাত ধরে। যা ছটফটে বাচ্চা। তার উপর এই পথ অতটা সুগম নয়। এ গাঁয়ের ক’ঘর মাত্র ব্যবহার করে এই পথ। চাটানিতে পাথর ভাঙার কাজে যাওয়া ও আসার সময়।

    পথের দুপাশে বুনো ঝোপ ঝাড়। কোথাও আবলুস ঝুড়। পুটুস লাটা। আড়ে বহরে এতটাই বেড়েছে যে পায়ে হাঁটা পথ এখানে বিলকুল গায়েব। কি ডাইনে কি বামে কোনও দিকেই আর পা বাড়ানোর মত ফাঁক-ফোঁকর এতটুকু নেই। গুঁগাকে থামতে হল এবার।

    রাস্তা দখলদারির খেলায় বুনো শিয়াকুলও কম যায় না। সরু লিকলিকে ডাল তার উঠছিল বেশ আকাশ ছোঁয়ার স্পর্ধায়। এখন সেও মাটিতে নুইয়ে দিয়েছে তার কাঁটাময় ডালটি।

    কাইলু বাপের হাত ছাড়িয়ে নিয়েছে কতক্ষণে। বাপকে বলে -ডহর যে ছেঁকে দিয়েছে বাপ! বেধুয়া কুল কাঁটায়।

    –তাই তো দেখছি রে। গুঁগা ভাবছিল, এই পথে ওদের নিত্য যাতায়াত। কখনও তো কুলগাছে রাস্তা আটকে কাজে বাগড়া দেয়নি এর আগে। মাঝেমধ্যে বরং শুকনো খেজুর ডাল পড়ে থাকত রাস্তায়। অসাবধানে পা চালালে বিপত্তি ঘটত। তবে ঘটেনি। পায়ে একবার এই গাছের কাঁটা ফুটলে দুরন্ত ঘোড়াও খোঁড়া। গুঁগা তখন শুকনো খেজুর ডালগুলো সব সরিয়ে দিত রাস্তা থেকে। ফেরার পথে সে সব গামছায় বেঁধে নিয়ে আসত। রান্নার জ্বালানি কাঠ জোগাড় হয়ে যেত এভাবেই।

    কাইলু কয়েক পা পিছিয়ে আসে। সেখান থেকে দৌড়ে একলাফে পার হয়ে যায় কাঁটাঝোপ। পুটুস ঝুড়ের ভেতর দিয়ে নতুন রাস্তা করে নেয়। গুঁগা ছেলের নকল করতে গিয়ে বিপত্তি ঘটায়। পরনের গামছা লটকে পড়ে শিয়াকুলে। টানহ্যাঁচড়া জোর জবরদস্তি চালিয়েও লাভ হয় না। উল্টে শিয়াকুলের বাঁকানো ভেড়াশিঙ কাঁটা তাকে ন্যাংটো করে ছাড়ে।

    –কাইলু রে। গুঁগা হাঁক পাড়ে। কাইলু ততক্ষণে অনেকটা এগিয়ে গেছে। দ্বিতীয়বার ডাকতে গিয়ে সে জিভ কামড়ায়। কী লজ্জার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবেক হঁঅ। ছেলেকে ডাকছে কি না নিজের ন্যাংটো পাছা দেখানোর জন্যে! কাঁটা কি কেবল পায়ে ফোটে, জলজ্যান্ত একটি লোককে ন্যাংটো পর্যন্ত করার ক্ষমতা রাখে।

    গুঁগা হাসি চেপে রাখতে পারে না। হেসে ফেলে।

     

    ।। দুই।।

    ঠুউঙ করে আওয়াজ হল একটা। সে আওয়াজে গুঁগার কলিজা পর্যন্ত কেঁপে উঠল। -এ নির্ঘাৎ মরণ! কোনও দিন তো এমন হয়নি। অথচ আজই হল! আজই গুঁগার হাত থেকে ছেনিটা পড়ে গেল চাটানির মুখে! চোখে আশঙ্কার ছবি ভেসে উঠল লহমায়। ছেনি নয় যেন শরীরের কর্মঠ হাতটিই খসে পড়েছে তার। ছেনিটা ঠিকরে গিয়ে ধাক্কা খায় পাথরে। তা গড়াতে গড়াতে একসময় থিতু হয় খাদানের পেটে।

    গুঁগা ভাবল -যাই তুলে আনি সেটা। পরমুহূর্তে নিজের মত বদলায়। না থাক। একটু বাদে তো নামতেই হবে খাদে। বারবার ওঠানামা আর কেনে! কিন্তু কেন এমন হল আজ? তবে কি শরীরের রক্ত কমতে শুরু করেছে? হাত–পা এমন ঝিমিঝিম করে কেন? মাথা চাঁ করে ওঠে হঠাৎ হঠাৎ। তখন কাজ ফেলে বসে পড়তে হয় গুঁগাকে। দেহিটা দিনেদিনে কেমন কমজোরি হয়ে যাচ্ছে। কাইলুর কী হবে? ওর কিছু যদি হয়ে যায় কে দেখবে ছেলেটাকে? মা তো ওর ভেগেছে অন্য এক পুরুষের হাত ধরে। টাটায় গুছিয়ে সংসার পেতেছে আবার। এতই যদি যাওয়ার বাচ্চাটাকে নিয়ে গেলি না কেনে!

    গুঁগা কীসব ভাবে ছাইপাঁশ সব। খানিক একলা হলে এইসব ভাবনা মাথায় চড়ে বসে। কিছুতেই নামতে চায় না মাথা থেকে। কেউ ডাকলেও তখন আর কান কাজ করে না তার।

    –কী বঅ। নাই দাঁড়ালে হে? লসো হাড়াম পেছন থেকে ছুড়ে দেয় কথাগুলো। গুঁগার সম্বিত ফেরে।

    –নাই বঅ। খেয়াল করি নাই। টুকচা অসতর ছিলি। এতক্ষণ সে দাঁড়িয়েছিল খাদের কিনারে। কয়েক পা পিছিয়ে এসে গুঁগা জবাব দেয়। – পাছুবাটে নাই ভালি অত।

    –আর কানেও টুকু কম শুনছ। আর শুনবে নাই কেনে। গোটাদিন সেই পাথরই পিটাচ্ছ তো।

    গুঁগা আর উত্তর দেয় না। লসো হাড়াম বিড়ি ধরিয়ে অন্যদিকে হাঁটা লাগায়। গুঁগার চোখ এখন খাদান দেখছে। খাদানের ওঠানামার পাথুরে পথে সে দেখে ওই আসছে লাগানিয়া। চামটু সিং। খাদানের মুখে এখন নামার হুড়োহুড়ি। কে আগে নামবে তার এক খেলা শুরু হল যেন।

    চামটু সিং গুঁগা’র উদ্দেশ্যে বলল, বেজায় তো হিহিফিফি চলল। ইবার নামা হোক।

    লসো হাড়াম কথাটা লুফে নেয়। -তো কী করবেক? লাগানিয়া নাই তো লেবার কি ঘাস ছিঁড়বেক!

    –বুডঢা লোগ এর কথা শুন। অ বে চাঁড়ে নাম। টুকু বাদে তো ব্যালা মাপবিস।

    –তো কি জাহান দিব?

    –ফেএর ফটর ফটর! যা নাম। সাঁঝকে হবেক তোর।

    লসো হাড়ামের এই এক দোষ। মুখ ওর চলতেই থাকে। ওর যুক্তি এই রকম, মানুষ যদি কথা’ই না বলে তবে কথা কি মাঠের গোরু বলবে। মানুষে আর পশুতে তবে আর তফাত রইল কী?

    একটা সময় ছিল, তখন ধিরি-চাটানির প্রকাণ্ড প্রান্তরে শুধুই সবুজ। হরেক গাছগাছালি। পাখ পাখালি। আকাশ ছোঁয়া সুবিশাল বনরাজি। এদিক দিয়ে বান্দোয়ান কিংবা ওদিকের ধলভূমগড় ঘাটশিলা এই রোড দুটি কালোপিচে জুড়ে যায়নি তখনও। অনেক পরে পিচ রাস্তা হয়। গ্রাম জুড়ে যায় শহর বাজারের সঙ্গে। বাজারের ওদিক থেকে আসতে শুরু করেছে নানান ধান্ধার নানান মানুষ। গাঁয়ে এলেই যে কারবার শুরু করা যাবে তা তো নয়। এ গাঁয়ের কাউকে না কাউকে তো হাত করতে হবে। হাতে রাখতে হবে। তা ছাড়া এ গাঁ তো তখন গাঁ ছিল না। কয়েকটা মাত্র ঘর। আর জনাকুড়ি মানুষের বাস। যার বেশির ভাগই জ্বালানি কাঠের সাপ্লায়ার হিসেবে কাজ করত। পিচরাস্তা হয়ে যাওয়ায় সুবিধা হল, শহর কিংবা বাজারের হাটগুলোতে জ্বালানি কাঠ যেত সহজে। তার পরে পরে বেবসিকের নজরে পড়ে যায়। শহরের বাজার থেকে তখন আসতে শুরু করেছে হাত-করাত, ধারালো কুড়ুল। কয়েক দশকের ব্যবধানে সাবাড় হয়ে যায় কয়েক যুগের পুরনো গাছগুলো। চালান হয়ে চলে যায়।

    এখন শুধু প্রান্তর। ধু ধু, খাঁ খাঁ খোলা প্রান্তর। প্রান্তর জুড়ে পাথর। ছোট বড় হরেক কিসিমের পাথর। পাথরের চাঁই। পৃথিবী ফুঁড়ে বেরিয়ে থাকা পাথরগুলো দূরের থেকে মনে হয় বুনো শুয়োরের পাল। মাঠময় চরে বেড়াচ্ছে। দলবেঁধে। পাথরগুলোও সব শুয়োর বর্ণ। ঠিক যেমন একলা দাঁড়িয়ে থাকা গজবুরুকে মনে হয় হাতি শুয়ে রয়েছে। গজবুরু যদিও এখান থেকে দেখা যায় না। পাঁচ পাঁচটি ডুংরি পেরোলে তবে গজবুরু।  গুঁগার সঙ্গে গজবুরুর ওই পারে পরিচয় হয়েছিল ওর বউয়ের। যদিও বউ তার ঘর করেনি। কাইলুর জন্ম দিয়ে ভেগেছে।

    গুঁগা দাঁড়িয়েছিল দুর্লভ মাহাতোর জমিটার উপর। যদিও একে জমি বলা চলে না। জমি মানে তো ধান ফলবে। জনার ফলবে ভাদরের গুমোটে। এ জমির সে ক্ষমতা নেই। কয়েকবিঘা জমির অর্ধেকের বেশি চাটানি। আর অর্ধেক জুড়ে পাথুরে শুয়োরের পাল। জোয়ান লসো হাড়াম বনে গেল এই জমিতে। দিনের শুরু তো খিদের শুরু। পেটে দেবার মতো তেমন আর কিচ্ছুটি নেই এই পাথর ছাড়া। সরাসরি এই পাথর তো গেলা যায় না। তাই লসো হাড়াম এখনও পাথর ভাঙে। গুঁগাও ওদের দলে ভিড়ে যায়। এখন জ্বালানি কাঠে অনেক হ্যাপা। ফরেষ্ট রেঞ্জের বনবাবুর কড়া নজর। বারকয়েক ধরা পড়েও ছাড়া পেলে হবে কি সাইকেল তার ছাড়া পায়নি আর। সেই থেকে জ্বালানি কাঠের ধান্ধা বন্ধ।

    চামটু সিং তখন লোক খুঁজছিল। যারা পাথর ভাঙতে পারবে এমন তাগদওয়ালা এবং সমর্থ পুরুষ।

    ।। তিন।।

    দুর্লভ মাহাতোর ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে শব্দটা। খুক খুক কাশির শব্দ। কাশি যখন শুরু হয় তখন আর থামতে চায় না। দীর্ঘক্ষণ ধরে চলে। দিনের বেলা যদিও সে কাশি পাথর ভাঙার শব্দে চাপা পড়ে যায়। গুঁগার কান অব্দি এসে পৌঁছায় না। সেদিন যদি না লসো হাড়াম বলত ও জানতই না দুর্লভের বেমারের খবর। ফেরার পথে একবার দুর্লভের ঘর হয়ে যাবে না হয় আজ। বেলা ঢলে পড়ছে একটু একটু এখন। রোদের সে তেজ এখন আর নেই।

    পাথর চাটানি আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে।  গুঁগার চোখ এখন লরিগুলোতে। সার সার লরি। লাইন বরাবর দাঁড়িয়ে। ঠিক যখন বিকেলের আলো ফুরিয়ে আসবে লরিগুলোর তখন দ্বিগুণ ব্যস্ততা। কে আগে আর কে পরে তার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। অর্ধেক রাত কাবার হয় কোনওদিন এই পাথর বোঝাইয়ে। গোটারাত হাল্লাচিল্লা চলে। অবশ্য সবদিন পাথর বোঝাই হয় না। এই যা। বিশ পঁচিশ দিন অন্তর একটা রাত আসে। যে রাতে হাজার চাইলেও ঘুমোনো যাবে না। জেগে থাকতে হবে। এবং হকের পয়সা বুঝে নিতে হবে।

    দুর্লভের জমিটা আর বেশিদিন আটকে রাখতে পারবে না ওদের। পাথরও ফুরিয়ে আসছে প্রায়।এই তো গত বর্ষায় চামটু সিং লিজ নিয়েছিল এই জমি। দুর্লভের হাতে এক থোক পঞ্চাশের পাত্তি দিয়ে বলেছিল -তোর জমি তোরই থাকবেক। আমরা শুধু পাথরটুকু লিব।

    দুর্লভ দোনোমনা করছিল দেখে চামটু বোঝায়। – দেখ ভাই, এ জমি তো আর তোকে ভাত দিবেক নাই। যা পাথর চাষ করেও পারবি নাই।

    দুর্লভ চুপ করেছিল দেখে চামটু ফের তাকে বোঝায়, যাচা ধন আর কাচা কাপড় ছাড়তে নাই। ইটা মানবিস তো।

    এখন বছর ঘুরতে না ঘুরতে সে জমি পুরো গায়েব। চামটু সিং আবার নতুন জমি খুঁজে নেবে। মিললে ভালো। বছরভরের খোরাকচিন্তা থাকবে না। ততদিনে কাইলুও বড় হয়ে উঠবে। কাইলু কি ওর বাপের মতো পাথর ভাঙবে? কাইলু যতদিনে তাগদওয়ালা পুরুষ বনবে ততদিনে পাথরই থাকবে না। চামটু সিং কিছু কি রেখে যাবে এ মাটির সন্তান সন্ততিদের জন্য!  তার চেয়ে কাইলু বরং লেখাপড়া শিখুক।  লেখা পড়া শিখলে অন্যকাজ খুঁজে নিতে কতক্ষণ।

    অন্যমনস্ক হয়ে ফিরছিল সে। দুর্লভের বাড়ির দোরগোড়ায় পা রাখতে কান্না শুনতে পেল গুঁগা। কিন্তু কে কাঁদে? এ কোনও শিশুর কান্না নয়। এ কান্না বড় কোনও মেয়ে মানুষের। ও এগিয়ে যেতে, দরজার সামনে থেকে একটি ছায়ামূর্তি সরে গেল। অন্ধকারে ঠাহর করল এই তবে কাঁদছিল এতক্ষণ। ছায়ামূর্তিটি দুর্লভের বউ।

    গুঁগা ভেতরে ঢোকে। বউটি আবার দরজা আগলে দাঁড়ায়। বাইরের মিশকালো আঁধার আর ভেতরে ডিবরি জ্বলছে। সে আলো ছোট্টো হাতের আড়ালে ঘিরে রেখেছে দুর্লভের একরত্তি মেয়ে মুনিয়া। গুঁগা এগিয়ে গিয়ে দুর্লভের পায়ের দিকে বসে। এতক্ষণ চুপচাপ ঠায় দাঁড়িয়েছিল লসো হাড়াম। দুর্লভের মুখের কাছে মুখ নামিয়ে সে জিজ্ঞেস করে -এখন কেমুন লাগছে বঅ? টুকু ভাল নঅ।

    –আর ভালঅ? রকতঝরা কাশি উঠছে পহরে পহরে। লসো কাকা, পুরা গোচ হয়ে গেলি বাপ।

    দুর্লভের বউ ফের কান্না জুড়ে দেয়। দুর্লভ তা দেখে মেজাজ হারায়। বউয়ের উদ্দেশ্যে ছুড়ে দেয় কয়েকটি কথা -ই কালামুহী ইখানে কেনে? ই কাঁদে আমাকে ফের দুবলা করে দিছে।

    –না থাক। উ তোর বউ বটে। গুঁগা বলে।

    –তো কি করবে? একবার টাটাকে গেলে হত্য যে। বেমার টা পাখলো হয়ে যাছে।

    –কিন্তুক পৈসা? দুর্লভের কাশি শুরু হল আবার। কাশির দমকে হাঁপিয়ে ওঠে ওর রোগা শরীর। বুকের হাড়-পাঁজর সব এক জায়গায় হয়ে গেল যেন। কুঁকড়ে এতটুকু হয়ে যায় শরীর। মুখ বেয়ে গলগল করে বেরিয়ে আসে রক্ত।

    ঘরের ভেতরে কান্না আছড়ে পড়ে।

    চিত্রকর : মৃণাল শীল 

    আরও একটি গল্প। শুনুন লেখকের মুখ থেকে।

    চন্দননগরের ‘গল্পমেলা ‘ গল্পের লেখক ও পাঠকদের কাছে সুপরিচিত একটি নাম। গত সাত -আট ডিসেম্বর চন্দননগর রবীন্দ্রভবনের জ্যোতিরিন্দ্র সভাগৃহে অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাদের বার্ষিক অনুষ্ঠান। এবারের ‘গল্পমেলা ‘ -র মিডিয়া পার্টনার ছিল  ‘দ্য ওয়াল ‘। সেই অনুষ্ঠানে পঠিত চারটি সরস গল্প ‘দ্য ওয়াল ‘ -এর পক্ষ থেকে সরাসরি রেকর্ড করা হয়। ‘দ্য ওয়াল ‘ -এর গল্পের পাতায় পাঠকের সামনে এবার উপস্থিত করা হচ্ছে সেইসব গল্প যেখানে পাঠক জনপ্রিয়  লেখকদের দেখতে পাবেন এবং তাঁদের মুখ থেকেই শুনতে পাবেন তাঁদের গল্প। ‘গল্পওয়ালা’ বিভাগে প্রতি রবিবার যে গল্প প্রকাশিত হয় তার সঙ্গেই পাঠকদের জন্য সংযোজিত হল এই উপহার। আজ থেকে শুরু হয়ে চারটি রবিবার থাকবে এইসব গল্প।

    আজকের গল্প: এক হাজার শব্দের গল্প

    লেখক : শতদ্রু মজুমদার

    এবার আরও এক 'গল্পওয়ালা '। লেখকের মুখ থেকে সরাসরি শুনুন গল্পপাঠ।

    এবার আরও এক 'গল্পওয়ালা '। লেখকের মুখ থেকে সরাসরি শুনুন গল্পপাঠ।আজকের গল্প: এক হাজার শব্দের গল্প লেখক : শতদ্রু মজুমদার

    The Wall এতে পোস্ট করেছেন রবিবার, 22 ডিসেম্বর, 2019

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More