বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২১
TheWall
TheWall

গাছ মা

জয়দেব দত্ত

টুকটুকির শরীর খারাপ। খুব শরীর খারাপ। খুব । খু – উ – ব। গা’টা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। গায়ে হাত দেওয়া যাচ্ছে না। বুকটা সাঁই সাঁই করছে। হাত-পা–গুলো ভেতর দিকে টানছে। খুক খুক কাশছে। আর নাক দিয়ে হরদম সর্দি বার হচ্ছে।  শান্তি নেই। মনে একদম শান্তি নেই।

গতকাল শরীরটা আরও খারাপ ছিল। আচমকা বেদম জ্বর বেড়ে গেছিল। টুকটুকির মা,  টুকটুকির মাথায় হড় হড় জল ঢেলে ছিল। সারাদিন , সারাটাদিন বিছানাতেই শুয়ে ছিল টুকটুকি। কারও সঙ্গে কথা বলতে পারছিল না। কানগুলো খুব গরম হয়ে গেছিল। শুনতে পারছিল না। মা সারাক্ষণ , সারাটাক্ষণ বুকে জড়িয়ে ধরে ছিল। আর ওষুধের বোতল গুলিয়ে গুলিয়ে টুকটুকির মুখে ঢেলে ছিল।

সেই ওষুধের জেরেই নাকি আজ টুকটুকি একটুখানি ভালো। সরু সরু পা–গুলো থ্যারব্যার থ্যারব্যার করতে করতে কোনওরকম সোজা হয়েছে। এখন মায়ের আঁচল ধরে, মায়ের চারপাশ ঘুরঘুর করছে। ঘুরঘুর করবে না তো কী!

ওর যে অসুখ !

অসুখে ভুগে ভুগে পা–গুলো সরু হয়ে গেছে। কোমরটা কাঁকালে নেই বললেই হয়। হাতগুলোও তথৈবচ।

টুকটুকির অসুখ সারাতে মা কম কিছু করেনি। ঘনঘন ডাক্তারখানা গেছে। ওষুধ আর ওষুধের বোতলে ঘর ভর্তি। বদ্যি, দিয়াসি, ওঝা, গুনিন কেউ বাদ নেই। যে যা বলেছে, মা তাই করেছে। এমন কি, মা কালীর ধুলোমাটির তাবিজ করে গলায় ঝুলিয়েছে। শ্বেত অপরাজিতার শিকড় আর ধনেশপাখির হাড়ও কোমরের ঘুনসিতে বেঁধে রেখেছে। তবুও কিছুতেই কিছু না।

নেহাৎ আজ জ্বরটা একটুখানি কমেছে তাই রক্ষা। মা আনাজের ঝুড়ি থেকে আনাজ নিয়ে, বঁটিতে আনাজ কুটছে। আর টুকটুকি মায়ের আঁচল ধরে, দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আনাজের ঝুড়িতে টপ টপ সিগনি ফেলছে। আনাজ কুটা হয়ে গেলে, মা টুকটুকিকে কোলে তুলে, আনাজের খোসাগুলো সারকুড়ে ফেলতে গেল। আর অমনি, সারকুড়ের ওধারে যে আমগাছ, সেই গাছ থেকে ঝুপ করে নেমে এল ময়না। বলল , এই টুকটুকি, তুই সব সময় মায়ের আঁচল ধরে ঘুরিস কেন বলত?

ময়নাকে দেখে টুকটুকি মায়ের কোল থেকে তাড়াতাড়ি নেমে এল। বলল, এ মা! তুই জানিস না, আমার যে অসুখ!

ময়না বলল, অসুখ না ছাই।

টুকটুকি সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা জবাব দিল, ছাই কী রে! অমন কথা বলিস না, বলতে নেই। তুই কী জানবি, কত কষ্ট আমার! শ্বাস নিতে পারি না। বুকটা জ্বলে যায়।

শুনে ময়না হেসে খুন। বলল, বুকে আগুন জ্বলে যায় না তো?

টুকটুকি বলল, যায় না আবার! খুব যায়। তখন কী কষ্ট …

ময়না বলল, তুই কষ্ট ভালোবাসিস, তাই কষ্ট তোকে পেয়ে বসেছে।

টুকটুকি বলল, কষ্ট ভালোবাসি কী রে! কেউ কোনওদিন কি সাধ করে কষ্ট চায়?

ময়না বলল, আমি দেখছি – তুই তো বেশ চাস।

টুকটুকি প্রতিবাদ করল, একদম মিথ্যা কথা বলবি না। অসুখ সারাতে কম ডাক্তার দেখিয়েছি? এই এতো এতো ওষুধ খেয়েছি।

ওষুধের কথা শুনে ময়না খিল খিল হাসল। হাসতে হাসতে বলল, ওষুধে কি আর রোগ সারে রে। রোগ সারে কিসে বলত?

টুকটুকি বেজার হয়ে উত্তর দিল, জানি না ।

ময়না বলল, জানিস না তো? রোগ সারে আনন্দে। বলি, মনের আনন্দে প্রাণ খুলে হেসেছিস কোনদিন?

টুকটুকি সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা প্রশ্ন করল, কার সঙ্গে হাসব বল? যাদের সঙ্গে হাসব, তারা কি ঘরে আছে? তারা তো পড়তে গেছে।

ময়না বলল, তারা ঘরে না থাকুক, আমি তো আছি।

টুকটুকি বলল, তুই থাকিস কোথায়, তুই তো থাকিস গাছে।

ময়না বলল, তাতে কি হয়েছে?

টুকটুকি বলল, ডাকলে তুই গাছ থেকে শুনতে পাবি তো, শুনে নামবি তো?

ময়না বলল, কেন নামব না, একবার ডাকলেই নামব। রোজ নামব। রোজ আমরা দু’জনে খেলব। খেলব – খেলব – খেলব, তিন-সত্যি করলাম।

 

                                                             দুই

ময়না আর টুকটুকি রোজ একসঙ্গে খেলা করে। টুকটুকি খেলার ঝোঁকে ভুলেই গেছে অসুখের কথা। এখন ওষুধ আর ওষুধের বোতলে হাতই দেয় না। কেন দেবে, অসুখ আর আছে নাকি!

টুকটুকি সেই আগের মতো রোগাপেটকা নেই। কচি কচি হাড়ের ওপর নরম নরম মাংস গজিয়েছে বিস্তর। কি সুন্দর তুলতুলে দেখতে হয়েছে! এখন ওর মা, যমের নজর আটকাতে ওর কপালে  গোবরের ধ্যাবড়া টিপ দেয়।

খেলতে খেলতে হঠাৎ ময়নার চোখ চলে গেল টুকটুকির কোমরে। বড় বড় চোখ করে বলল, তোর কোমরে লাল ওটা কী রে?

টুকটুকি বলল, তুই জানিস না, এটা কী? এটা হল – ঘুনসি।

ময়না বলল, ঘুনসি, সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু, ঘুনসিতে হাড়ের মত ওগুলো কি বাঁধা?

টুকটুকি মিনমিনে গলায় উত্তর দিল, শ্বেত অপরাজিতার শিকড় আর ধনেশপাখির হাড়।

ময়না, পাখির হাড় শুনে, হাসিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। হাসতে হাসতে বলল, ধনেশপাখির হাড়! তাহলে, পাখি জাতটাও তোদের কাজে লাগে?

টুকটুকি সায় দিল, লাগে না আবার, খুব লাগে। পাখির হাড় পরে কত মানুষ রোগ থেকে ভালো হয়ে গেল, জানিস?

ময়না টিপ্পনী কাটল, তাই নাকি! তাও আবার মরা পাখির হাড়ে!

টুকটুকি বলল, রোগের কাছে মরা আর বাঁচা আছে ?

ময়না বলল, তাহলে মরা পাখির হাড়ের গুণে তোদের রোগ সেরে যায় বলতে হয়!

টুকটুকি বলল, হ্যাঁ, তা যায় বইকি। নাহলে, মানুষ পরে কেন?

ময়না প্রশ্ন করল, পাখির হাড়ে তোর রোগ সেরেছে?

টুকটুকি কোনও উত্তর দিতে পারল না।

ময়না চোখ পাকিয়ে বলল, ফেল, ফেল ওইগুলো।

টুকটুকি কোমরের ঘুনসিতে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দাঁড়িয়েই রইল।

ময়না টুকটুকির গলার দিকে তাকিয়ে মজা করে বলল, তোর গলায়, ওটা কি ম্যাডেল ঝুলছে রে?

টুকটুকি গম্ভীর স্বরে উত্তর দিল, না, এটা নিয়ে মোটেই মজা করবি না। এটা হল – মা কালীর ধুলোমাটি। কত কষ্ট করে, গলায় হার করে পরেছি বলে।

ময়না বলল, বেশ বেশ! শুনেছি, মা কালীর ধুলোমাটি তোদের মাথায় থাকে। তা, মাথা ছেড়ে মা স্বয়ং তোর গলায় নেমে এল কী মতলবে? মায়ের চড় চড় করে নীচে নামার খুব সখ হয়েছে বুঝি?

টুকটুকি কোনও উত্তর করল না। উল্টে, রেগে গেল। বলল, জানি না, যা – আ।

ময়না ততোধিক রাগ দেখিয়ে বলল, ফেল, ফেল ওইসব। যতসব আদিখ্যেতা।

টুকটুকি ময়নার ধমক খেয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর একসময় ভ্যাঁ করে কেঁদে দিল।

ময়না টুকটুকিকে আশ্বস্ত করে বলল, আমি জানি, তোর মা তোকে খুব ভালোবাসে। খুব। তাই তোকে এতকিছু পরিয়েছে। কিন্তু, আমাকে পরাবে কে?

টুকটুকি কাঁদতে কাঁদতে বলল, কেন, তোর মা!

ময়না বলল, আমার মা আছে নাকি!

টুকটুকি কান্না থামিয়ে, হুঁসুরে হুঁসুরে বলল, তোর মা নেই?

ময়না হাসতে হাসতে বলল, থাকবে কোথায়? আমরা তো পাখির জাত। পাখিদের কি মা থাকে! আমাদের মা–বাবার আমোদ ফুর্তির সময় হলেই, মুখে করে খড়কুটো অথবা কাঠিখোঁচা এনে বাসা বানায়। মা বাসাতে বসে বসে ডিম দেয়। ডিম দেওয়া হয়ে গেলে, ডিমে তা দেয়। নিজের গায়ের ওম মিশিয়ে, ডিম গরম করে। ডিমে খস খস গা ঘষে ঘষে ডিমের ভেতর আমাদের জন্ম দেয়। আমাদের ডিম ফুটে বেরিয়ে আসার সময় হলেই মা টুক করে ঠুকে দেয় ডিমের খোলে। আমরা ডিম ফুটে বেরিয়ে আসি। তখন, আমাদের উদরপূর্তির জন্য মায়ের কী চিন্তা! রোজ সকাল হতে না হতেই মা বেরিয়ে যায় খাদ্যের সন্ধানে। দূর দূরান্ত থেকে মুখে করে খাবার আনে। আমরা খিদের চোটে, উপর দিকে হাঁ-মুখে চিঁ চিঁ করি। মা আমাদের হাঁ–মুখে খাবার ঢেলে দেয়। তবু কি আমাদের পেট ভরে? আমরা খিদে পেটেই বড় হই। আমাদের চোখ ফুটে, লোম গজায়, ডানা–পালক বার হয়। মা আমাদেরকে বাসা থেকে বার করে উড়তে শেখায়। আমরা একটু একটু এ ডাল, ও ডাল উড়ি। তারপর উড়তে শিখে গেলে, মা বাবাকে সঙ্গে নিয়ে একদিন ফু – ড়ু – ৎ …

শুনে, টুকটুকির মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। বলল, তুই তো খুব দুখি রে!

ময়না হাসতে হাসতে বলল, মোটেই নই। এটাই তো আমাদের স্বজাতির নিয়ম। তাবলে ভাবিস না, আমাদের মা নেই।

টুকটুকি ময়নার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

ময়না বলল, ওই যে তোদের সারকুড়ের পাশে যে গাছ, ওই আমগাছটা আমার মা।

টুকটুকি অবাক! বলল, কি রকম, কি রকম!

ময়না বলল, গাছ যে আমাদেরকে আশ্রয় দেয়। আর যে আশ্রয় দেয়, সে তো মা, নাকি।

টুকটুকি আনমনা হয়ে উত্তর দিল, হ্যাঁ, তা তো বটেই।

ময়না একটানা কথা বলে হাঁপিয়ে গেছে। খানিক জিরিয়ে নিয়ে গর্ব করে বলল, জানিস তো, আমার মা বিশ্বসুন্দরী!

টুকটুকি চোখ তুলে প্রশ্ন করল, বিশ্বসুন্দরী কেন?

ময়না চটপট উত্তর দিল, আমার মা যে ডালে ডালে একশোটা মিষ্টি ফল দেয়।

শুনে, টুকটুকি উৎফুল্ল হল। কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল, কি সেই তখন থেকে বক বক করছিস? তুই কি খেপে গেলি ? তোর মাথাটা কি পচে গেল?

ময়নার কি রাগ! রাগে ফুড়ুৎ করে উড়ে গেল কোন দিকে।

টুকটুকি ময়নাকে ডাকছে, কোথায় যাচ্ছিস ময়না? রাগ করে যাস না। শোন, শুনে যা, রাগ করিস না।

                                                        তিন

ময়না সেই যে গেল, আর ফিরে এল না। তবুও টুকটুকি ময়নার ফিরে আসার কথা ভেবে ভেবে ডালে  ডালে , পাতায় পাতায় , পাতার শিরায় শিরায় কত যে খুঁজেছে! তবু ময়নার দেখা পায়নি। কত কতবার গলা ফেড়ে ডেকেছে – ময়না, কথায় গেলি রে ময়না, দেখা দে, সাড়া দে। কিন্তু ময়নার আর সাড়া পায়নি।

এখন কার সঙ্গে খেলবে টুকটুকি? কার সঙ্গে হাসবে, নাচবে? ফলে, টুকটুকি আবার ঘরে ঢুকে গেল । আবার মায়ের আঁচল ধরল। আবার শরীর খারাপ হল। আবার সেই ঘরে ওষুধ আর ওষুধের বোতলের গড়াগড়ি। কিন্তু, কিছুতেই আর টুকটুকির অসুখ সারল না।

মা মহা চিন্তায় পড়ল – কি করা যায়, কার কাছে নিয়ে যাবে টুকটুকিকে! চিন্তায় চিন্তায় মা টুকটুকিকে কোলে নিয়ে সারকুড়ের পাশে গেল।

অমনি গাছ থেকে ধপ করে পড়ল ময়না। ময়নার পড়া দেখে টুকটুকি মায়ের কোল থেকে তাড়াতাড়ি নামল। অবাক হয়ে বলল, একী শরীরের হাল করেছিস রে ময়না!

ময়না কথা বলল না।

এত রোগা হলি কী করে?

ময়না সাড়া দিল না।

তোর কি শরীর খারাপ?

ময়না মুখ বন্ধ করে থাকল।

তুই কি কিছু খাস না নাকি? মত্যে বসেছিস যে …

ময়না উত্তর করল না।

এবার টুকটুকি রেগে গেল। বলল, কথা বলছিস না কেন?

ময়না এবার সব রাগ ঝেড়ে দিল। বলল, আমাকে কেন, তোর বাবাকে বলগা।

টুকটুকি রাগে বলল, বাপ তুলে কথা বলছিস!

ময়না ঘাড় তুলে উত্তর দিল, বলছি কি এমনি, তোর বাবা আমার যা ক্ষতি করেছে  …

টুকটুকি চোখ বড় বড় করে বলল, কি করেছে?

ময়না ডুকরে কেঁদে উঠল। বলল, সেদিন তোর বাবা একটা লোক নিয়ে গেছিল মায়ের কাছে। কি কুৎসিত দেখতে! লোকটা গজ ফিতে দিয়ে মেপে, মায়ের দরদাম করছিল। মা –কে কাটবে করাত দিয়ে …

ময়না চিৎকার করে কেঁদে উঠল। বুক ফেটে যাচ্ছে ময়নার!

আর এদিকে টুকটুকি ময়নার কান্না, আঙ্গুলের টোকা মেরে উড়িয়ে দিল। তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, অ, এই ব্যাপার! তা আগে বলিসনি কেন? তুই কি জানিস না, আমার বাবা আমার সঙ্গে কথা না বলে, কোনও কাজই করে না? যা, বাবাকে মানা করে দেব, তোর মাকে আর কেউ কাটবে না। অমন সুন্দরীকে কেউ কোনওদিন কাটে কি!

ময়না হাঁ করে তাকিয়ে থাকল টুকটুকির মুখে।

টুকটুকি বলল, কি হাঁ করে দেখছিস? আমাকে কোনওদিন দেখিসনি মনে হচ্ছে।

ময়না নীরব দুটি চোখে, টুকটুকিকে দেখছে। দেখছে তো দেখছেই …

টুকটুকি ময়নার কানে ফিসফিস করে বলল, একবার  তোর মায়ের কাছে ছুটে যা তো, একটা হামি খেয়ে আয় তো।

ময়না ছুটে গেল না, ফুড়ুৎ করে উড়ে গেল। ওড়ার কী শব্দ!

টুকটুকি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে ময়নার ওড়া। ময়না উড়ে যাচ্ছে – দূর থেকে দূরে, আরও দূরে, আরও…

পরিশুদ্ধ বাতাসে ময়নার পাখা ঝাপটানোর চিহ্ন থেকে যাচ্ছে ।

চিত্রকর: মৃণাল শীল

Comments are closed.