শুক্রবার, ডিসেম্বর ৬
TheWall
TheWall

একটি সম্বর্ধনা সভার বৃত্তান্ত

সত্যবান মিত্র

”… আমাদের এই ছোট্ট শহর অরূপনগরের প্রবীণতম মানুষ শতাব্দী–প্রাচীন শ্রী ভোলানাথ দাস ও তাঁর সুযোগ্য পত্নী দয়াময়ী দেবীকে বরণ করা হল। আপনারা যেরকম স্বতস্ফূর্ত এবং উচ্ছ্বসিত দীর্ঘ করতালি দিয়ে আপনাদের আনন্দ জ্ঞাপন করলেন সে জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। যে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা শঙ্খ বাজাল, মালাচন্দন, উত্তরীয় পরাল তাদের পিতা পিতামহের, এমনকি দু–একজন শিশুর তো পিতামহেরও পিতামহের সঙ্গে একদা শিশু ভোলানাথ ডান্ডাগুলি খেলতেন–একথা ভাবতেও রোমাঞ্চ হচ্ছে!

”আপনারা সকলেই জানেন এঁদের কথা। এই জীবনশিল্পী দম্পতি কিংবদন্তী হয়ে গেছেন। ভাগ্যবিধাতার কী বিচিত্র লীলা! ভোলানাথ দাদুর জন্মের এবং বিবাহের তারিখ একই– পুণ্য পয়লা এপ্রিল। এমন বিচিত্র মিল বিশ্বে ক’জনের ভাগ্যে ঘটে! আজ দাদুর একশতম জন্মদিন এবং আজই ওঁর বিবাহের পঁচাত্তর বর্ষ পূর্ণ হল। আজকে একই সঙ্গে পালিত হচ্ছে শতবর্ষের জন্মজয়ন্তী এবং বিবাহের প্লাটিনাম জয়ন্তী। কী মহান কোয়েনসিডেন্স!

”অরূপনগরবাসী এই উপলক্ষে ওঁদের সম্বর্ধনার আয়োজন করতে পেরে ধন্য। যাঁরা এই বিরল ঐতিহাসিক দিনটিতে উপস্থিত আছেন আজকের দিনটি তাঁদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে আশা করি।

”বিবাহ এক পবিত্র বন্ধন। কিন্তু আজ সে বন্ধন বড়ই আলগা। পরস্পরের প্রতি প্রেম, শ্রদ্ধা, বিশ্বাস আজ কোথায়! বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিচ্ছিন্নতাকামীদের সংখ্যা আরও বেশি। তাই এই মুহূর্তে এঁদের জীবনকথা আলোচনার, এঁদের জীবনগাথা গাইবার একান্ত প্রয়োজন। এই দম্পতির সুমহান জীবনচর্যাকে আদর্শ করতে পারলে ঘরে ঘরে শান্তির দুর্গ গড়ে উঠবে…”

বক্তৃতার এই স্থানটিতে বক্তা হরিশঙ্কর দত্ত’র দৃষ্টি সভার সামনের সারিতে উপবিষ্ট তাঁর স্ত্রী শ্যামা দত্ত’র উপর চকিতে ঘুরিয়া গেল… শ্যামাদেবী অস্ফুটে কিছু কি বলিলেন? অপর কেহ বুঝিল না কিন্তু হরিশঙ্করবাবু ঠিক শুনিলেন– ‘ভণ্ড হিপোক্রিট…’। শ্যামা দেবীর অধরে হালকা বিদ্রূপাত্মক হাসিও খেলিয়া গেল। যাই হোক হরিশঙ্করবাবু এগুলি উপেক্ষা করিয়া বলিয়া চলিলেন।

”… কিন্তু আমরা অমন আদর্শ ঠিক ফলো করতে পারি না। উদাহরণ হিসেবে আমার এক পুরনো সহকর্মী বন্ধু হরনাথের কথা বলি। তার প্রেমের বিয়ে হয়েছিল। অফিস ছুটির পর তাস, ক্যারম, মুড়ি, তেলেভাজা ইত্যাদি সহযোগে আড্ডাতে তার ছিল নিয়মিত হাজিরা। বিয়ের পর তাকে ছ’মাস ছাড় দিলাম আমরা। কিন্তু বছর গড়িয়ে যায়, সে অফিস ছুটি হওয়া মাত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে উৎক্ষিপ্ত রকেটের মতো গৃহাকাশের উদ্দেশে উড়ে পালায়। মুখে সর্বদা নতুন বউ তারার গুণকীর্তন– তারা অমুক, তারা তমুক… তাকে আটকাতে গেলেই কাঁদো কাঁদো মুখে ‘আমি মাইরি থাকতে পারব না’, ‘আমি গেলে বউ খাবে’, ‘আমায় ছেড়ে দে, আমি ফিরলে তবে বউ খায়’… ইত্যাদি বলে পাশ কাটায়। একদিন জোর করে চেপে ধরলাম সকলে। বললাম, ‘আমাদের বউরাও একসময় নতুন ছিল, আড্ডা কামাই করেছে কেউ! তোদের কী এত প্রেম যে একসঙ্গে দুজনে না খেলে খাবার হজম হয় না? আমি ফিরলে বউ খাবে– একই গদগদ বাক্য আউড়ে যাচ্ছিস!’ হরনাথ অত্যন্ত কাঁচুমাচু গলায় বলল, ‘তা না রে, আসলে আমি অফিস থেকে বাড়ি ফিরে রান্না করলে তবে তো বউ খাবে।’

”তো কাল সেই হরনাথের সঙ্গে বেশ কতগুলো বছর পর দেখা হাওড়া স্টেশনে। সে বদলি হয়ে গেছিল বলে মাঝে সেরকম যোগাযোগ ছিল না। তাকে দেখে কেমন যেন উদভ্রান্ত মনে হল। জানাল ডিভোর্সের কথা ভাবছে সে। জিজ্ঞেস করি, ‘সে কী! কেন?’ হরনাথ বলল, ‘হাজার এক কারণ। তোরা তো জানিস বিয়ের পর তারাকে মাথায় করে রেখেছিলাম, কাজকর্ম না করুক, আমি অফিস থেকে ফিরলে তারাও ছুট্টে আসত, চটি এগিয়ে দিত, জলের বোতল ধরিয়ে দিত, টুকটাক আদরযত্ন করত মোটের ওপর। কিন্তু ইয়ে চমচম, বউয়ের সঙ্গে বিয়ের পর বাপের বাড়ি থেকে সঙ্গে এসেছিল যে কুকুরছানাটা সে সমানে ঘেউ ঘেউ করত। আজ আট বছর বাদে ক্রমশ অবস্থা এত খারাপ হয়েছে যে এখন অফিস থেকে বাড়ি ফিরলেই চমচম ল্যাজ নাড়তে নাড়তে মুখে চটি নিয়ে দৌড়ে আসে আর বউ নাগাড়ে ঘেউ ঘেউ করে যায়।’

”শুধু সাধারণ মানুষ কেন, বিখ্যাত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদেরও কাউকে কাউকে আজীবন দুর্ভোগ পোয়াতে হয়েছে। সক্রেটিস, থার্ড নেপোলিয়ন, টলস্টয়, আব্রাহাম লিঙ্কন– এঁদের বিবাহিত জীবনও সুখের ছিল না। চার্লি চ্যাপলিন চারবারের বার সুখের মুখ দেখেছিলেন। আবার অপর দিকে ম্যান্ডেলা, আজাহারউদ্দিন, যুবরাজ চার্লস বা পেলে– তাঁরাও কিছু আদর্শ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেননি। কিন্তু আমাদের ভোলানাথ দাদু–দিদা পেরেছেন, অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন।

”এই শহরে যাঁরা নবাগত তাঁরা হয়তো ভাবছেন দীর্ঘ আয়ু পেলেই অটোমেটিক দীর্ঘ দাম্পত্যজীবন লাভ করা যায়। তা হয়তো বাহ্যত খানিকটা সত্য, পুরোটা নয়। বস্তুত এ কারণেই আমাদের ‘ভাই ভাই সংঘ’র উদ্যোগে এই সম্বর্ধনা সভার আয়োজনে এঁদের সম্মতি ছিল না প্রথমে। এর আগে সেদিনের গজিয়ে ওঠা ‘ভাইরাল ব্রাদার্স’ দাদুদের ‘মেড ফর ইচ আদার’ পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল, কিন্তু ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে সে প্রস্তাব। এঁরা সনাতন মূল্যবোধে বিশ্বাসী। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির পলকা তকমা কি হর–গৌরীর অঙ্গে শোভা পায়! আমাদেরও বলেছিলেন, ‘বুড়োবুড়িকে নিয়ে আবার টানাটানি কেন, কোন গৌরবের কর্ম আমরা করেছি তা তো জানি না।’

”হতেই পারে, পুষ্প কি জানে সে সুগন্ধ বিতরণ করছে! রামধনু কি উপলব্ধি করতে পারে তার বর্ণময় সুষমা! এভারেস্টের কোনও ধারণা আছে নিজের মহিমময় উচ্চতা সম্পর্কে! ইলিশ কি জীবিতকালে টের পায় তার শরীরের মনোহর আস্বাদের বিষয়টি! তেমনি এঁরাও জানেন না এঁদের যুগ্ম জীবনের স্নিগ্ধ সৌরভে আমরা কতটা আমোদিত!

”এই দম্পতির দিকে তাকিয়ে আমাদের বিস্ময়ের সীমা থাকে না যখন ভাবি পৌনে এক শতাব্দী কালে অশান্তি দূরের কথা, এমনকি সামান্য মনোমালিন্যও এঁদের কখনও হয়নি। একটি বারের তরেও নয়। এই কৃতিত্ব অকল্পনীয়, অবিশ্বাস্য, অলৌকিক। বিশেষত যাঁরা বিবাহিত তাঁরা বিস্ময়ে বিমোহিত হয়ে পড়েন। এখানে এমন কেউ আছেন যিনি এঁদের মৃদুতম কথা কাটাকাটি বা কুসুমউষ্ণ বাক্য বিনিময় শুনতে পেয়েছেন? কখনও? তেমন কেউ থাকলে হাত তুলবেন… না, জানতাম একটা হাতও উঠবে না। আমরা আমাদের জীবিত বা মৃত বাপ–ঠাকুরদার কাছেও শুনিনি এমন কথা। আমাদের বাড়িতে যেসব কাক–চিল বসতে পারে না যুগ যুগ ধরে তারা বংশ পরম্পরায় দাদুর গৃহমন্দির শীর্ষে অবাধে বিচরণ করে আসছে। কাকের কণ্ঠস্বরও পরিবেশের গুণে কতটা নম্র হতে পারে তা তাঁরাই জানে যাঁরা ওই পবিত্র শান্তিনিকেতনের পাশ দিয়ে চলাফেরা করেছেন।

”নিঃসন্তান এই দম্পতি দু’জনে দু’জনায় এমন মগ্ন যে কোনও খেদ কোনও অপূর্ণতা এঁদের ত্রিসীমানায় ছায়াপাত করতে পারেনি। ভোলাদাদুর কথা বিশেষ করে বলতে হয়। পরম ভালোবাসা, মমতা, যত্নে ‘এলআইসি’র হাত দুটির মতো দয়া দিদাকে আগলে রেখেছেন সারা জীবন। অপরদিকে দিদাও অতলান্তিক গভীর ভালোবাসায় দাদুর জীবনকে স্নিগ্ধ করেছেন যখনই ভোলাদাদুকে দেখেছি বদনমণ্ডলে কী প্রশান্তি, সমাহিত… যেন বুদ্ধ।

”তাই বলছিলাম সম্বর্ধনা তো তুচ্ছ, নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদান করলেও এই দম্পতিকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া যাবে না।

”আমি অনেকটা সময় নিলাম। আরও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অপেক্ষা করে আছেন তাঁরা এক এক করে দু–চার কথায় সংক্ষেপে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। বক্তৃতা, গান, আবৃতির পর দাদু দিদাকে আমাদের হৃদয়ের শ্রদ্ধার্ঘ হিসেবে সামান্য কিছু উপহার প্রদান করব। একেবারে শেষে আমরা এই দুজনের কাছে কিছু শুনব এমনই ঠিক করেছিলাম কিন্তু দয়া দিদা কিছু বলবেন না এই শর্তেই আসতে রাজি হয়েছেন। অগত্যা ভোলানাথ দাদুই তাঁর কথা বলবেন। তারপর সভা সমাপ্ত হবে।”

দ্বিতীয় বক্তা স্থানীয় বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা শ্যামাদেবী। প্রায় সকলেই জানেন তিনি প্রথম বক্তা হরিশঙ্করবাবুর স্ত্রী। হরিশঙ্কর বক্তৃতার প্রথমদিকে জনৈক বন্ধু হরনাথের বিবাহিত জীবনের দুর্দশার যে বর্ণনা দিলেন তাহা যে হরিশঙ্কর ও শ্যামাদেবীরই জীবনের ঘটনা সে কথা শ্যামাদেবীর বুঝিতে বাকি ছিল না। তাঁহাদের নিকট পাড়া–প্রতিবেশীও ধরিয়া ফেলিয়াছিল যে, যে–সব কাল্পনিক নাম উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে হরিশঙ্করবাবু ব্যবহার করিলেন সে শুধু আইন বাঁচাইবার জন্য। হরিশঙ্করই যে হরনাথ, বস্তুত ‘হরি’ ও ‘হর’ যে একই আত্মা, অভিন্ন ব্যক্তি এবং যিনিই শ্যামা তিনিই যে তারা এবং তাহাদের ‘পমপম’ নামক সারমেয়টির ছদ্মনাম যে ‘চমচম’ সে বিষয়ে ওই সকল প্রতিবেশীরা প্রায় নিঃসন্দেহ হইলেন। সর্বসমক্ষে এমত হেনস্থা! শ্যামাদেবীর সর্বশরীর ক্রোধে ‘ঋ ঋ’ ছাপাইয়া ‘৯ ৯’, ‘এ এ’, ‘ঐ ঐ’, ‘ও ও’, ‘ঔ ঔ’ অবধি করিতে লাগিল। নিজের স্ত্রীকে লইয়া এইসব বোকা বোকা রসিকতা! সম্বর্ধনা সভা কি মীরাক্কেল না কপিল শর্মা শো! মঞ্চে উঠিয়া তিনি ফাটিলেন।

”… আমার আগের বক্তা দাম্পত্য শান্তি বজায় রাখার পুরো কৃতিত্বটাই ভোলানাথদাদুকে দিয়ে বসলেন। এটাই অবশ্য স্বাভাবিক। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় একজন পুরুষের তো এমনটাই বলার কথা। বক্তা ‘হয়তো’ জানেন তাঁর গল্পের হরনাথের স্ত্রী ‘তারা’কে আমি যথেষ্ট চিনি, জানি। তিনি সত্যিই পোষ্য সহ শ্বশুরবাড়ি এসেছিলেন। ভালোবাসার বিয়ে, কিন্তু বিয়ের বড়জোর বছর দুয়েকের মধ্যে প্রেমিক–প্রভুর মুখোশ খুলল। নীচ, স্বার্থপর, অপদার্থ, অত্যাচারী, অবিশ্বাসী, অ্যামেচার–দুশ্চরিত্র স্বামীর ভালোবাসা ঘৃণায় পরিণত হল। ব্যক্তিত্বময়ী, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন নানা গুণে গুণী তারা বুঝলেন হরনাথের মতো ব্যক্তি তাঁর মতো সূক্ষ্ম রুচির বিদূষী মহিলার কড়ে কেন কোনও আঙুলেরই যোগ্য নয়। মনুষ্যেতর জীবই ওইরকম প্রভুত্বকামী মানুষের যোগ্য সঙ্গী হতে পারে। রাত এগারোটায় কম্পমান অবস্থায় বাড়ি ফিরলে চটি দেওয়া যায় না, চটি–পেটা করা যায় ও তাই করা উচিত। আমার ‘অভিন্নহৃদয়’ বান্ধবী তারা স্বামীর ওপর কিঞ্চিৎ দয়াপরবশ হয়েই কী যেন নাম বললেন কুকুরটার– হ্যাঁ, চমচমকে স্বামীর আশেপাশে একটু ঘুরঘুর করতে অ্যালাউ করেছিলেন। পশুরা অবোধ তাই নিজ গুণে, হরনাথ না কী যেন নাম, তার প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ে। এতে হরনাথের কৃতিত্ব কোথায়! কিন্তু আর না, আমার ওই ঘনিষ্ট বান্ধবী জানিয়েছেন স্বামীটি যে ভাবে খোলাখুলি, প্রকাশ্যে ব্যঙ্গবিদ্রুপ সহ তাঁর চরিত্রহনন করার চেষ্টা করছেন তখন তিনিও এই সিদ্ধান্তে এসেছেন এবার আর হুমকি নয়, সত্যিই ডিভোর্সের জন্য উকিলের কাছে দু–একদিনের মধ্যে যাবেনই যাবেন…।”

ক্রমশ শ্যামাদেবী আরও শানিত বাক্যবাণে, বাক্যবন্ধনে হরিশঙ্করবাবুর ন্যায় স্বামীদের প্রতি মিডিয়ায় নিত্যব্যবহৃত বিনা কামানের ‘তোপ’ দাগিয়া গেলেন মুহুর্মুহু। অবশ্য বক্তৃতার মাঝে মাঝেই ”…তাহলে ভাবুন”, ”…সুতরাং বুঝতে পারছেন”, ”এই দম্পতির স্থান কত উচ্চে…”, ”…এঁরা সংসারধর্মকে সংসারসাধনার স্তরে উন্নীত করেছেন…” ইত্যাদি মন্তব্য সহযোগে ভাষণটি প্রাসঙ্গিক রাখিবার চেষ্টা করিয়া গেলেন। এবং সব শেষে শ্রোতৃমণ্ডলীকে স্মরণ করাইতে ভুলিলেন না যে ভোলানাথের সংসারে শান্তি বিরাজের মূল কান্ডারি অবশ্যই দয়াময়ী দেবী।

শ্যামাদেবীর ভাষণ শেষে দর্শকগণের যে প্রতিক্রিয়া হইল তাহা এইরূপ– হরিশঙ্করের তথাকথিত বন্ধু হরনাথের দাম্পত্যের গল্প দুটি যে বক্তারই জীবনের বাস্তব ঘটনা এ সম্পর্কে যাঁহাদের সংশয় ছিল, শ্যামাদেবী’র বক্তব্য অনুধাবন করিয়া তাঁহারা নিঃসন্দেহ হইলেন। শ্যামদেবীর ভক্তকুল, যাঁহাদের সিংহভাগই মহিলা, ভাষণ সমাপ্ত হইবামাত্র তুমুল করতালিতে সভাপ্রাঙ্গন মুখরিত করিয়া তুলিলেন।

উক্ত ভক্ত সম্প্রদায় বাদে কিছুসংখ্যক শ্রোতা হরিশঙ্কর বাবুর বক্তব্যে কোথায় পুরুষতান্ত্রিকতা প্রকাশ পাইল তাহার সন্ধানসূত্র বিষয়ে পরস্পরকে ফিসফিসাইয়া প্রশ্ন বিনিময় করিতে লাগিলেন। তবে সার্বিক প্রতিক্রিয়া এই যে প্রায় সকলেই মঞ্চে দাম্পত্য–কাজিয়াটির বড়ই উপভোগ করিলেন। স্বয়ং হরিশঙ্কর কিন্তু কম্পনে থরহরিশঙ্কর হইলেন। না, কথার তোড়ে বাড়াবাড়িই করিয়া ফেলিয়াছেন। শ্যামা অনেকবার ডিভোর্সের হুমকি দিয়াছেন বটে কিন্তু এইবার যেরূপ চটিয়াছেন বাস্তবে সত্যিই বিচ্ছেদ ঘটাইবেন না তো! কলেজে পড়ুয়া নালায়েক পুত্র, নাবালিকা দুই কন্যা, বিধবা রুগ্না মা সহ সংসারে সকল ঝক্কি শ্যামা যে ভাবে সামলায়… সংসারের কী হইবে! পত্নী যদি রোজগেরে হন তবে কি খোরপোষ পাইতে পারেন? পাইলে কোন অনুপাতে– এমন সব দুর্ভাবনায় হরিশঙ্কর বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হইতে শুরু করিলেন। যাহাই হউক, আমরা আবার সভায় ফিরি।

শ্যামাদেবীর পরে বিশিষ্ট কিছু মানুষ বাঁধা গতের প্রশস্তিভরা ভাষণ দিলেন। ভাষণের ফাঁকে ফাঁকে কয়েকজন স্থানীয় শিল্পীপ্রতিম গায়ক গায়িকা একটি দুটি করিয়া সঙ্গীত পরিবেশন করিল। এক বালিকা কিছু ছন্দপতন ঘটাইল। সে গান ধরিয়া বসিল ‘সমুখে শান্তি পারাবার…’। আসলে তাহার বলিবার ভুলে তাহার সঙ্গীত শিক্ষিকা স্মরণসভা ধরিয়া উক্ত সঙ্গীতের তালিম দিয়াছিলেন। শ্রোতাদের মধ্য হইতে কিছু বিস্মিত গুঞ্জন উঠিল। ‘সমুখে শান্তি পারাবার’ কীভাবে সম্ভব যেখানে সমুখে স্বয়ং ভোলানাথ! এক উদ্যোক্তা অবোধ বালিকাটিকে নিবৃত্ত করিবার জন্য মঞ্চে উঠিবার উপক্রম করিলে স্বয়ং ভোলানাথই উদ্যোক্তাকে নিবৃত্ত করিলেন। পার্শ্বে উপবিষ্ট সভাপতিকে নিম্নস্বরে বলিলেন, ”আহা! রিহার্সালটা করেই রাখুক না।” উপহার ও মানপত্র পর্বের পর এবার সভা সমাপ্তির মুখে। সবশেষে সঞ্চালক ভোলানাথ দাদুকে অনুরোধ করিলেন ‘কিছু বলার জন্য’। সঞ্চালক এও আশা প্রকাশ করিলেন দাদু উপস্থিত সকল বর্তমান এবং ভাবী দম্পতিদের গৃহশান্তি সাধনার রহস্য বাতলাইয়া দিবেন। ভোলানাথের ভাষণ ছিল সক্ষিপ্ত। তাহা এইরূপ–

”রহস্য–টহস্য তেমন কিছু নেই বাবারা। আসল কথা একটি চুক্তি। ফাঁস করব কিনা ভাবছিলাম কিন্তু ওই যে টলস্টয়ের কথা উঠল না, সেই জ্ঞানী মানুষটার একটি উক্তি মনে পড়ে গেল। তিনি বলেছিলেন, ‘মহিলাদের সম্বন্ধে আমার শেষ কথা বলেই টুক করে কবরে ঢুকে যাব।’ এক্ষেত্রে ‘মহিলার’ জায়গায় ‘স্ত্রী’ বসানোই যায়। আর আমারও একশো হল, দু’পা বাড়িয়ে আছি বললেও কমই বলা হয়। তাছাড়া আমার স্ত্রী রত্নটিও কিছুই শুনতে না পেয়ে দেখুন কেমন ঝিমুচ্ছেন। আমি এখানে আসার আগে ওঁর কানে শোনার ঠুলিটি বদলে অকেজো পুরনো যন্ত্রটি লাগিয়ে দিয়েছি, কোনও ঝুঁকি নিইনি।

”আমরা বিবাহের দিনই একটি শান্তি চুক্তি করেছিলুম। জানতুম বিবাহ হল যখন, কলহ অনিবার্য। চুক্তিটি ছিল এই, কোনওরকম মতান্তরের সূচনাতেই একপক্ষ হার মেনে নিয়ে বাগানে গিয়ে পায়চারি করবে। তাহলে ঝগড়া গড়াতেই পারবে না। তা এই চুক্তি মেনে চলে শান্তি তো লাভ করেইছি। উপরন্তু দীর্ঘ পরমায়ুর অধিকারী হয়েছি। কেননা বাবারা, আমি প্রায় পঁচাত্তর বছর বাড়ির বাগানে পায়চারি করে করেই বেড়াচ্ছি।”

চিত্রকর : মৃণাল শীল 

Comments are closed.