ধূসর ছায়া

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    বিপুল দাস

    এক

    বাঁ পায়ের কড়ে আঙুলে ব্যান্ডেজ বেঁধে অফিসে এসেছে অসিত। ভয় পেয়েছিল, ভেবেছিল কোথাও আলটপকা গুঁতো লেগে গেলে যদি রক্ত পড়তে শুরু করে। বাসে কেউ পা মাড়িয়ে দিলেও সেটা হতে পারে। আবার অফিসেও হতে পারে। আর, রক্ত যদি গলগল করে বেরোতে শুরু করে, তখন পথেঘাটে বা অফিসে কোথায় তুলো–ব্যান্ডেজ, কোথায় ডেটল। ক্ষত যে একটা হয়েছে, সেটা বাইরে বোঝা না গেলেও অসিত তো স্পষ্টই টের পেয়েছে। সম্ভবত ইন্টারনাল হেমারেজ বলে এটাকে। কেউ যদি বেশি ভালোমানুষি দেখিয়ে জানতে চায়, দেখতে চায় কোথায় ক্ষত, সে তো দেখাতেই পারবে না। বাড়তি সতর্কতায় আজ ভারী জুতোটা পরেছে। গুঁতোটুতো লাগলে কিছুটা সামলানো যাবে।

    বহুদিন বাদে জুতো পরল অসিত। কেমন যেন অদ্ভুত লাগছিল। একটু অস্বস্তি, একটু লজ্জাও যেন। প্রায় নতুন, মশ্‌মশ্‌ শব্দ হচ্ছিল। লম্বা বারান্দায় বেশ ক’বার এ মাথা থেকে ও মাথা হাঁটল। এখন আর মনে হচ্ছে না বাঁ পায়ের কড়ে আঙুলে কিছু একটা হয়েছে। প্রথম ক’বার থপথপ করে হাঁটল, বাদে ভঙ্গিটা অনেক সহজ হয়ে গেল। জুতোর দিকে তাকিয়ে দেখল কালো জুতোর ওপরে ধুলোর একটা হালকা আস্তরণ পড়েছে। মনে পড়ল না জুতো পালিশের বুরুশ কোথায় আছে। এসব খবর রাখত নীপা। যে জিনিস যেখানে রাখার, টিপটপ সাজিয়ে রাখত। অসিত তার স্বভাবে আবার সব এলোমেলো করে দিত। তখন খুব রেগে যেত নীপা। ভাবল পুরনো কোনও কাপড় দিয়ে মুছে নেবে। কে জানে কোথায় আছে বুরুশ।

    অসিত শুনেছে এ রকম হয়। ওপরে ওপরে কিছু বোঝা যায় না, মসৃণ চামড়া, ভেতরে ভেতরে রক্ত পড়তে থাকে। ক্যান্টিনের মধুর হয়েছিল। পরে যখন মাংস পচে গেল, খসে পড়তে শুরু করল, তখন তার মনে পড়ল এক রাতে তার মনে হয়েছিল পায়ের আঙুলে কী যেন কামড়েছে। ঘুমের ঘোরে ভেবেছিল মশা। সকালে উঠে সেকথা মনেও ছিল না। কোনও দাগ ছিল না মশার কামড়ের বা অন্য কোনও কিছু কামড়ানোর। মাস ছয়েকের মধ্যে টের পেল পায়ের পাতা বেশ ভারী ভারী ঠেকছে। থপথপ করছে হাঁটার সময়। ডাক্তার দেখিয়েছিল। ডাক্তার বলেছিল পা কাটতে।

    ভয় পেয়েছিল মধু। বিকলাঙ্গ হয়ে যাওয়ার ভয়, একপেয়ে হয়ে হাঁটার লজ্জা। এমন কী মৃত্যুভয়ও হয়তো ছিল। জয়পুরী পায়ের কথা ডাক্তারবাবু বলেছিলেন। ভরসা পায়নি মধু। ভেবেছিল একটা পা ভারী, পায়াভারী হয়েই না হয় থাকবে, ওসব কাটাছেঁড়ার মধ্যে যাবে না। তাদের বংশের কারও শরীরেই নাকি অস্তরের দাগ নেই। বউ-ও বারণ করেছে। মরার ভয়ে পা কাটতে চায়নি মধু, অথচ কোথা থেকে একগাদা ঘুমের বড়ি জোগাড় করে খেয়ে ফেলতে ভয় পেল না। আশ্চর্য!

     

    অফিসে আজ কাজের চাপ ছিল। মাসের আজ দু’তারিখ। আজ পেনসনারদের ভিড় হবে। এমনিতেও প্রথম সপ্তাহে ভিড় থাকে। কাউন্টারে বসার কিছু সুবিধা, কিছু অসুবিধাও আছে। বয়স্ক পেন্‌সনাররা অনেক কিছু জানতে চায়। প্রথম সপ্তাহে কাউন্টারের ঝক্কি সামলে হিসেব মিলিয়ে বেরোতে একটু দেরি হয়। কাজের চাপে আঙুলের কথা মনেই ছিল না তার।  অফিসে ঢোকার সময় দেখেছিল বিনয়ের বউ তিন নম্বর কাউন্টারের সামনে দু’টো মোটা লেজার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অফিসে নিজের চেয়ারে বসেই ম্যাসিভ হার্ট-অ্যাটাক হয়েছিল বিনয়ের। বিনয়ের বউ এখানে জয়েন করার পর অসিতের অনেক দিন মনে হয়েছে তপতী কি জানে কোন চেয়ারে বসত বিনয়? অসিতের হঠাৎ মনে হয়েছিল তপতী তার হাঁটা লক্ষ করছে। সতর্ক হয়েছিল অসিত। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটার চেষ্টা করল। তখন একটু সময়ের জন্য মনে পড়ল মনিমাস্টারের কথা। ইস্কুলের নয়, মনি ছিল টেইলার-মাস্টার। ব্লাউজ-স্পেশালিস্ট। এ পাড়ার তো বটেই, দূরের কাস্টমারও আসত তার কাছে জুত্‌সই ফিটিংসের জন্য। মনিমাস্টারের গলায় ফিতে ঝুলত, হাতে খড়ি। মাপজোক করে কাটিং করে দিত। মেশিন টানত তার কর্মচারী। তো মনিমাস্টার সারাদিন মাপামাপি আর কাঁচি চালানোর পরিশ্রমে বাড়ি ফেরার পথে বাবলুর দোকানের পেছনে বসত। ওই ব্যথা মারার ওষুধ দু’পাত্তর চড়িয়ে পথে পা দিত। তখন সে খুব চেষ্টা করত স্বাভাবিক ভাবে হাঁটতে, স্টেডি পা ফেলার চেষ্টা করত। ততই টাল খেত। সামনে চেনা লোক পড়লে বোকার মত একগাল হাসত। শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে এলোমেলো হেঁটেই বাড়ি ফিরত।

    অসিত সতর্ক ভঙ্গিতেই অফিসে ঢুকল। খুব স্বাভাবিক পদক্ষেপে গিয়ে বসল নিজের চেয়ারে। বসেই টের পেল বাঁ পা ভারী লাগছে। জুতোজোড়া মনে হচ্ছে লোহার। বাঁ পায়ের পাতা যেন ফুলে ক্রমশ দশটাকা দামের বেলুন। এখনই ফেটে পড়বে লোহার জুতো। টুকরোগুলো বোমার স্প্লিন্টারের মত ছুটে যাবে লকার রুম, মুখ্য প্রাবন্ধিক, ভল্ট, সব কাউন্টারের দিকে। ডান পা দিয়ে বাঁ পায়ের জুতো চেপে ধরল অসিত।

    দুই

    ছোটভাই বিকাশের জন্য মেয়ে দেখতে গিয়ে অসিত নীপার বাবাকে বলেছিল ক’দিন পরে খবর দেবে। অসিতের একটু ধর্ম-ধর্ম বাতিক ছিল। ক্লাস টেনে বাবু মণ্ডল তাকে প্রথম পাপ কাজ শিখিয়েছিল। হস্তমৈথুন। তারপর সে সাতদিন শুধু কেঁদেছিল। তার মনে হয়েছিল এই শরীর অপবিত্র হয়ে গেছে। তার শরীরে পোকা ধরে গেছে, এই হাত দিয়ে সে আর কোনও দিন ঠাকুরপ্রণাম করতে পারবে না, সরস্বতীপুজোর অঞ্জলি দিতে পারবে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও পরে তারকদের ভেতরের পুকুরে কোনও এক দুপুরে তারকের দিদিকে স্নান করতে দেখে ফেলে। আকন্দের ঝোপের পেছনে বসে পড়েছিল অসিত। তখন বিকেল, পশ্চিমে ঢলেপড়া হলদে সূর্য থেকে সোনালি আলো এসে পড়েছিল মিনুদির অসম্ভব সাদা দুই বুকে। অসিতের মনে হয়েছিল

    মিনুদির সোনা-বাঁধানো বুক। কিন্তু সোনালি মহিমার আড়ালে তীক্ষ্ণ রক্তমাংসের গন্ধ প্রবল হয়ে উঠেছিল। তারকের দিদির স্নান করা দেখতে দেখতে আকন্দ ঝোপের আড়ালে বসে নাচার অসিত আবার পাপকাজ করেছিল। এবার অবশ্য অতটা খারাপ লাগেনি, শুধু মনে হয়েছিল তার মুখ দেখলেই মা বুঝে ফেলবে সে খুব অন্যায় কাজ করেছে। বাবু মণ্ডলের ওপর রাগ হচ্ছিল খুব।

    রাতে বিছানায় শুয়ে অসিত তাদের দরজার ওপর ঝোলানো মাকালীর ক্যালেন্ডারে যথাক্রমে আদ্যাকালী, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ এবং বিবেকানন্দের কাছে বারে বারে ক্ষমা প্রার্থনা করে। কিন্তু কেমন করে যেন ওই দৃশ্য বারে বারে ফিরে আসে, বুকের ভেতরে শব্দ হয়, হারামজাদা শরীর গরম হয়ে ওঠে। অসিত বুঝতে পারে কোনও ঠাকুর তাকে ক্ষমা করেনি।

    ছোটভাই বিকাশের জন্য মেয়ে দেখতে গিয়েছিল অসিত। সে তখন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মত শার্ট আর ধুতি পরে’ রোজ সন্ধেবেলা সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরে ঢাক বাজায়। মোটামুটি সব রকম তাল হাতে এসে গেছে। তারপর অরিজিনাল ঢাকি মধু দাসের হাতে কাঠি সঁপে দেয়। মুখে ঘনকালো চাপদাড়ি। মায়ের পায়ের কাছে বসে থাকে। ঠাকুরমশাই তার হাতে প্রসাদি ফুলবেলপাতা আর একটা সন্দেশ দিলে তার হুঁশ ফেরে। সবাই জানত অসিত মায়ের পায়ে জবা হয়েই জীবন কাটিয়ে দেবে। বিকাশ প্রাইমারি স্কুলে চাকরি পেতেই অসিত উঠেপড়ে লাগল তার বিয়ে দেবার জন্য।

    নীপাকে দেখে আসার পর অসিত কিছুদিন ছটফট করল। রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেল। নীপার মুখ আর লুকিয়ে দেখা শরীরের বিস্তারের কথা ভাবতে ভাবতে হারামজাদা শরীর আর কন্ট্রোলে থাকে না। ঢাকের বোলে–তাল কেটে যায়। নীপাদের বাড়িতে জানিয়ে দিল বিকাশ নয়, সে-ই নীপাকে বিয়ে করবে।

    নীপা জানত কেন হুটহাট অসিত বাড়িতে চলে আসে। বোকার মত হেসে বলে – হঠাৎ পেটটা ব্যথা করে উঠল। নীপা জানত কেন চূড়ান্ত সময়েও কেন হঠাৎ অসিত অন্যমনস্ক হয়ে যায়। নীপা জানে অসিতের মাথার ভেতরে একটা পোকা সবসময় কুটকুট করে কামড়ায়। নীপা বুঝতে পারে একটা ধূসর ছায়া ক্রমশ অসিতের আত্মা অধিকার করে নিচ্ছে। নইলে সে কেন এখন কালো টি-শার্ট আর জিনস্‌ পরে, কেন বিকাশের মত আলিগড়ি পাজামা আর লালনীল পাঞ্জাবি পরে।

    ধূসর একট ইঁদুর বা একটা সন্দেহজনক ইঁদুর ঘুরে বেড়ায় অসিতের বেডরুমে।

    চিত্রকর: মৃণাল শীল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More