শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৩
TheWall
TheWall

সিনেমার ভিতরে আমি  

মানস সরকার

– কী ব্যাপার, আপনি এখনও বেরোননি? এই সপ্তাহে ওদের হল শো কিন্ত চারটে থেকে নয়, চারটে পনেরো থেকে। আপনার বোধহয় মনে নেই। নিজের বুশশার্টের বাঁ পকেটের উপর একবার হাত বুলিয়ে নিয়ে আমাকে কথাগুলো ছুড়ে দিলেন হল-ম্যানেজার।

অল্প হেসে আমি ঘাড় নাড়িয়ে হ্যাঁ বললাম। এতদিন ধরে চুঁচুড়ার এই রুপালী হলে চাকরি করছি, কোন হলে শো এর টাইম কী চেঞ্জ হচ্ছে তার খবর রাখব না! আসলে পদমর্যাদায় উনি এই সিনেমা হলের ম্যানেজার আর আমি মূলত ‘রিল বাহক’। ওঁর পদের থেকে বেশ কিছুটা নিচে। হুকুমের সুর তো একটা ওঁর তরফে থাকবেই। বলতেই পারতাম, আমার চাকরিও প্রায় দশ বছর হয়ে গেছে। আটাত্তরে এই হলের চাকরি করতে এসেছিলাম। দেখতে দেখতে আজ হয়ে গেল অষ্টআশি সাল। 

যখন প্রথম আসি তার ঠিক তিনদিনের মাথায় এই হলে রিলিজ করল, অমিতাভ বচ্চনের ‘ডন’। উফ! ভিড় বটে। যাকে বলে চরকি নাচন নেচেছিলাম। টিকিটের লাইন ফার্স্ট শো থেকে প্রায় খরুয়াবাজারের পুলিশ ফাঁড়ি পর্যন্ত চলে গেছে। সেকেন্ড শো শুরু হবার আগেই সে কী ঝামেলা! ম্যানেজার বাধ্য হয়েই পুলিশ ডাকলেন। সেই অভিজ্ঞতার শুরু। পরের তিন বছরে এল, ‘দাদার কীর্তি’, ‘ওগো বধু সুন্দরী’ আর আবার অমিতাভের ‘নমকহালাল’। ততদিনে অবশ্য অনেক কিছু শিখে ফেলেছি। টিকিট দেওয়া, কারেন্ট চলে গেলে জেনারেটর চালানো, ব্ল্যাকারদের সঙ্গে ডিল। এ অঞ্চলে তখন সব ব্ল্যাকারদের কন্ট্রোল করছে হীরাদা। যেমন দেখতে, তেমনি তার প্রভাব। বছর তিনেক হল এখানে টিকিটের ব্ল্যাক কন্ট্রোল করে হীরাদা’র ভাই মানিকদা। এই মানিকদা যখন প্রথম এসেছিল, তখন হলে চলেছে শ্রীদেবীর ‘নাগিনা’। আমার সঙ্গে তো ধাক্কাধাক্কি হয়ে গেছিল। তবুও আমাদের মাথার উপর এখনও পর্যন্ত শেষ কথা বলেন এই মধুবাবু। হল ম্যানেজার। পদের ব্যাপারটা তো আছেই, বয়সেও অনেকটা বড়। তাই আমরা ওকে মালিকের মতোই সম্মান দিই।

এখন আমাদের হলে চলছে ‘কয়ামাত সে কয়ামাত তক’। নতুন এই ছেলেটা এসেই আমাদের ফিল্মি ভাষায় যাকে বলে ধুম মাচিয়ে দিয়েছে। ফিল্মটা খুব হিট করেছে। ছেলেটাকে দেখতেও খুব সুন্দর। কলকাতার হলগুলোতে অনেক সপ্তাহ ধরে চলল। আমাদের হলে থার্ড উইক চলছে। এই ফিল্মেরই ফাস্ট পার্টের রিলটা চন্দননগরের জ্যোতি হলে দিতে যাব।

হলের পাশের কোল্ড ড্রিংকসের দোকানের সামনে দাঁড় করানো থাকে আমার স্কুটারটা। স্ট্যান্ড থেকে স্কুটার নামিয়ে চেপে বসলাম। দোকানের আয়নায় একবার  দেখে নিলাম নিজের মুখ আর গোঁফটাকে। মাঝখানে সিঁথে করে চুলটা এইভাবে আঁচড়াই। আসলে অমিতাভকে নকল করি। চুলে বেশি সাবান দিই না, মিঠুনের মতো ফোলা চুল আমার পছন্দ নয়। আড়চোখে হলের সামনেটা একবার দেখে নিলাম। এখনই যা ভিড় জমেছে, এইট্টি পারসেন্ট হল ভরে যাবে। মানিকের সাকরেদ নান্টুকে দেখলাম বিড়ি খেতে খেতে জুলজুল চোখে এদিক-ওদিক দেখছে। টিকিট কাউন্টার খুললেই শুরু হয়ে যাবে ওর খদ্দের ধরার ম্যাজিক। স্কুটার স্টার্ট করে এগিয়ে গেলাম। রাস্তায় উঠছি, দেখা হয়ে গেল আমাদের হলের ‘অ্যাশার’ সাহিলের সঙ্গে। ওর কাজটা অনেকের কাছে সহজ লাগলেও আমার লাগে না। গোটা হলটার সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট ওর মুখস্থ। এমনকী অন্ধকারেও ঠিক হাতের টর্চ দিয়ে ও দর্শকদের দেখিয়ে দেয় তার নির্দিষ্ট আসনটা। সে হলের ফন্ট্র রো হোক বা রিয়ার স্টল, ডি.সি বা ব্যালকনি – প্রত্যেকটা সিট নিজের হাতের তালুর থেকেও বেশি চেনে সাহিল। আমাকে বেশ পছন্দ করে ও। ঈদে হল বন্ধ হবার পর আমরা সবাই মিলে ওর বাড়ি যাই। ও বিড়ি খায়। বোধহয় কিনতে বেরিয়েছিল। সাহিল চুলটাকে আজকে যেন একটু অদ্ভুতভাবে আঁচড়েছে। না না আঁচড়ায়নি, কেটেছে। আগে নজরে পড়েনি। কাটটা একদম অদ্ভুত। কোনও নায়কের স্টাইলের সঙ্গেই মিলছে না। কেন জানি না মনে হল, কোনও ফরেন ফিল্ম দেখে নকল করেছে। সময় নেই। এগিয়ে যেতেই হল। আমি স্কুটার খুব ধীরে চালাই। সময় লাগবে।

খড়ুয়াবাজার থেকে শুঁড়িপাড়া ঢুকছি, ব্যাপারটা নজরে এল হঠাৎই। পাশ দিয়ে দু–একটা অদ্ভুত দর্শন বাইক বেরিয়ে গেল। ‘অমরসঙ্গী’ সিনেমায় প্রসেনজিৎ মানে বিশ্বজিৎ চ্যাটার্জির ছেলে এইরকম দেখতে একটা বাইক ব্যবহার করেছিল। চুঁচুড়া শহরে এই বছরের মধ্যে ওরকম বাইক আর চোখে পড়েনি, মানে আমার চোখে পড়েনি। আমরা অবশ্য ডিস্ট্রিবিউটারের ঘর থেকে সিনেমাটা তুলতে পারিনি। ওটা পেয়ে গিয়েছিল আমাদের পাশের হল কৈরী। আগে নাম ছিল শেফালী। আমাদের রূপালী আর শেফালীকে লোকে দুই বোন বলত। যাই হোক, তাতে অবশ্য আমাদের ভিড়ে খুব একটা প্রভাব পড়েনি। গাজিপিরতলার সামনে আসতেই বেশ অবাক হয়ে গেলাম। পিরতলার উল্টোদিকের দেওয়ালে কতগুলো সিনেমার পোস্টার পড়ছে। আজকে বৃহস্পতিবার। কালকে শুক্র। কাল থেকে নতুন হল রিলিজ। সেটাই স্বাভাবিক। যতদুর জানি, আমাদের হলে সামনের সপ্তাহতে ‘কয়ামাত সে কয়ামাত তক’ই চলবে। কিন্তু পোস্টারে যেন অন্য নাম দেখলাম। মনে খটকা লাগল। স্কুটারটা পিছিয়ে নিয়ে থামলাম। সাধারণত এ শহরে যারা পোস্টার মারে তাদের সবাইকে আমি চিনি। কিন্তু কই, এদেরকে তো চিনতে পারছি না, ছোপ ছোপ জিন্স আর গোলগলা গেঞ্জি পরে এরা সব কারা! পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা সাইকেলগুলো কেমন অদ্ভুত সোজা হ্যান্ডেল মডেলের।

ওরাও আমাকে চিনতে পেরেছে বলে মনে হল না। ভালো করে সাঁটা পোস্টারগুলোর দিকে তাকালাম। একটু মোটা কাগজের। এর’ম কাগজ তো পোস্টারে ব্যবহার হয় না। তারিখটা তো আজকেরই। সিনেমার আর নায়কের নামও আগে শুনেছি বলে মনে হচ্ছে না। ‘সাজন!’ সলমন খান! এ আবার কোন নায়ক! নায়িকার নাম দেখছি মাধুরী দীক্ষিত। সেটা অবশ্যই চেনা। আশ্চর্য হয়ে ভাবছি। ছেলেগুলো চলে গেল।

পাশেই দুটো লোক ছোট মইয়ে করে উঠে পোস্টে দুটো মোটা কালো তার লাগাচ্ছিল। এই তারগুলো আমার অচেনা। আমাকে হাঁ করে চেয়ে থাকতে দেখে ওদের মধ্যে একজন বলে উঠলো, – “কী দেখছেন অমন হাঁ করে। বাড়িতে কি কেবল টিভি দেখেন না?”

এই রে! কেবল! সেটা আবার কী? বাড়িতে আমার একটা ছোট সাদা–কালো টিভি। তাতে দুটো চ্যানেল। রেগুলেটরের মতো ঘুরিয়ে দূরদর্শন ন্যাশনাল এক আর দুই করতে হয়। তাও চ্যানেল দুই করলে ছবি ঝিরঝির করে। বর্ষাকালে আরও বেশি। মেয়েকে তখন একতলা বাড়ির ছাদে তুলে অ্যান্টেনা ঘুরিয়ে ঠিকমতো ছবি আসছে কিনা দেখার জন্য পাঠাতে হয়।

– “আরও তিনটে বিদেশি চ্যানেল আসছে। সেই জন্যই তো তার লাগাচ্ছি। আর একটা চ্যানেলে রাত আটটা থেকে। খুব শিগগিরি সিনেমাও চালানো হবে। তাতে অবশ্য আমাদের রেটটা একটু বাড়বে।” লোকটা আপন মনে বলল।

যুগের হাওয়া বদলাচ্ছে বটে। আমার অবশ্য এইসব নতুন জিনিস বাড়িতে নেওয়ার পয়সা বা ইচ্ছে কোনওটাই নেই। সপ্তাহে একদিন আমার বউ হিট কোনও সিনেমা দেখতে চাইলে আমার হলে তা ফ্রিতেই দেখানোর বন্দোবস্ত করি। বউ সেটা গর্ব করে পাড়ায় প্রচারও করে। অনেকেরই শুনে চোখ গোলগোল হয়ে যায়। সুতরাং এসব জিনিস নিয়ে আমার মনে খুব একটা কৌতূহল নেই। শুধু একটা কথাই বুকের মধ্যে খচখচ করছে। এরা সিনেমা দেখাবে বলল তাতে আমাদের হলের ব্যবসা মার খাবে না তো! আরে যা যা। হলে সিনেমা দেখার মজা তোরা কোনওদিন দিতে পারবি? এই যে এত ভিডিও ক্যাসেট প্লেয়ার ভাড়া করে লোকে সিনেমা দেখছে, তাতে কি হল ব্যবসার কোনও ক্ষতি হয়েছে?

হাতঘড়ির দিকে তাকালাম। না, দেরি হয়ে যাচ্ছে। এগোতে হবে আমাকে। কালকেই গেছি এখান দিয়ে। এইসব রঙচঙে দোতলা বাড়িগুলো কবে হল। দু’নম্বর বাসগুলো অবশ্য একইরকম দেখছি। রাস্তায় কতরকমের সাইকেল বাইক আর স্কুটার। কই, এসব কিছু তো কোনদিন চোখে পড়েনি। চোখে কি ভুল দেখছি? বুনোকালীতলার সামনে দাঁড়িয়ে চোখটা একবার রগড়ে নিলাম। কিন্তু চোখ খুলেও সব কিছু এক। এর’ম হচ্ছে কেন! স্কুটার গিয়ারে ফেলে এগোতে থাকি। এবার আমার রোখ চাপছে। সামনে আর একটু এগিয়ে দেখি তো।

খাদিনামোড় ঢুকে দাঁড়াতেই আমার চোখ যাকে বলে গোলগোল হয়ে গেল। এসব দোকানপাট কবে উজিয়ে উঠল? যে সমস্ত বাল্ব আলোর পোস্ট দেখি তার একটাও অবশিষ্ট নেই। তার বদলে কলকাতার শহরের মতো হ্যালোজেন লাগানো হয়েছে।

খাদিনামোড় থেকে বিপ্লবী যতীশচন্দ্র ঘোষের মূর্তিকে ডানদিকে রেখে জি.টি. রোড ধরে চন্দননগরের দিকে বেঁকতেই বাসস্টপের উল্টোদিকের দেওয়ালটায় চোখ পড়ে। এখানে পড়েছে ‘মিলন’ আর ‘অরো’ সিনেমা হলের পোষ্টার। অবাক হয়ে থামতেই হয়। পোষ্টারে সিনেমার নাম দেখছি ‘কহোনা প্যায়ার হ্যায়’। নায়ক আর নায়িকার রোলে ঋত্বিক রোশন, আমিশা প্যাটেল। অরো এবং মিলন দুটো হলে তিনটে শো’তে ফ্লিমটা চলছে। সাধারণত নতুন ফ্লিম রিলিজ হলে আমরা খবর পাই। যে সমস্ত সিনেমা পত্রিকাগুলো হলে আসে খুললেই জানতে পারি। আমি পড়ি। কিন্তু যতদুর মনে পড়ছে এই সিনেমাটার রিলিজের কোনও খবর তো চোখে পড়েনি।

সামনে এসে একটা বিচিত্র দর্শনের বাইক থামে। না এরকম বাইক আগে দেখেছি, না কখনও চোখে পড়েছে এরকম গেঞ্জি পরা ছেলেদের। আমরা যারা সিনেমা হলে চাকরি করি পোশাক-পরিচ্ছদ বা চুলের স্টাইল আমাদের আশেপাশে কীরকমভাবে বদলাচ্ছে তা সবচেয়ে আগে জানতে পারি।

– “কী করবি রে, অরোতে ব্যালকনি ডি.সি.তে কুড়ি টাকা করে পড়বে।” যে চালাচ্ছে সে পেছনের ছেলেটাকে বলল।                  – “মিলনে যাব না। পেছনের পাখাগুলোর খুব খারাপ অবস্থা।” পেছনে বসা ছেলেটা বলে উঠল।                                                – “ঠিক আছে চ তাহলে। অরোতেই যাব। শালা রাকেশ রোশনের ছেলে। চিনিস তো ঋত্বিককে? ডান্সের যা স্টেপ ফেলছে না গুরু…” বাইক উড়ে চলে যায়। ধন্দে পড়ে যাই। রাকেশ রোশনের ছেলে এতবড় হয়ে গেছে! কবে হল! একগাদা চিন্তা মাথায় নিয়ে চন্দননগরের দিকে এগোতে থাকি।

তালডাঙার মোড়ে এসে দাঁড়িয়ে পড়তেই হয়। বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে গেছি। আমার মনে হচ্ছে আমি অন্য কোনও গ্রহে চলে এসেছি। কী হচ্ছে, কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। মাথাটা পুরোটাই গুলিয়ে গেল। তালডাঙার মোড়ে কলকাতার মতো এই ফ্ল্যাট বাড়িগুলো কবে হল!  বাইকের শোরুমগুলোই বা কবে হল! কাল অবধি তো কিছুই ছিল না। এই বাইক, চারচাকা, সাইকেল, মানুষের পোশাক-এসব তো কিছুই চিনি না। আর মানুষের হাতে এগুলো কী! আবার তাতে কথাও বলছে। অনেকটা ফোনের মতোই মনে হচ্ছে।                                                

আমি কি স্বপ্ন দেখছি? অথচ গাড়ির শব্দ, মানুষের কথাবার্তা, হাসি, গাড়ির হর্ন-সব, সব কিছু কানে আসছে। মেয়েদের দেখে শিহরিত হচ্ছি। বিদেশিদের মতো জিন্স, আঁটো পোশাক –– ভাবতেই পারছি না। কাল অবধিও মেয়েদের শাড়ি, সালোয়ার ছাড়া আর কিছুতে দেখিনি। কিছু একটা ভুল হচ্ছে আমার। হলের টিকিটের দাম কী করে এত টাকা হল! লোকজনের সংখ্যাও মনে হচ্ছে অনেক।

একটা বাইকের শোরুমের পাশের দেওয়ালে তাকালাম। একটা সিনেমার রঙিন পোষ্টার পড়েছে। সিনেমার নাম ‘প্রেমের কাহিনি’। রঞ্জিত মল্লিক এত বুড়ো হয়ে গেছে! সুপারস্টার দেব! এ আবার কে? নায়িকা কোয়েল। চলছে শ্রী দুর্গা ছবিঘরে। সবকিছু ভীষণভাবে ঘেঁটে যাচ্ছে। সিনেমার সঙ্গেই এতগুলো বছর কাটিয়েছি। এই প্রথম মনে হচ্ছে, আমি নিজেই সিনেমার ভিতরে। অন্য কারওর নির্দেশনায় এক সেলুলয়েড পৃথিবীতে পৌঁছে গেছি আমি। জ্যোতি সিনেমা হল অবধি আদৌ কি যাওয়া উচিত আমার! উঁহু, সিনেমা মাঝপথে ফেলে চলে যাওয়া সিনেমাভক্তির লক্ষণ নয়। যখন বেরিয়েছি, গিয়ে একবার দেখা যাক।

আর কোনও দিকে তাকাব না। মনকে একটু হালকা করতেই গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠলাম,–“আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাব…”। স্পষ্ট বুঝতে পারছি আমার আশেপাশের দৃশ্য অত্যন্ত দ্রুত বদলে যাচ্ছে। নিজের মাথা ঠান্ডা রাখতে চেষ্টা করলাম। বাগবাজার মোড়ে এসে যাকে বলে আকাশ থেকে পড়ার জোগাড় হল। আশপাশের দোকান বাড়িগুলো বদলে যাবে এটা আশা করতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু সিগনাল আলো বসেছে দেখে হতবাক হয়ে গেলাম। এত ভিড়, এত রকম গাড়ি। লাল সিগনালের চোখ রাঙানিতে সবাই দাঁড়িয়ে গেছে। দেখে আমিও দাঁড়িয়ে গেলাম। পাশের বিচিত্র রিক্সাটাকে দেখে আমার বাঁদিকের ফুটে দু’জন স্কার্ট পড়া বিবাহিত ভদ্রমহিলা চেঁচিয়ে উঠলেন ‘টোটো’ বলে। তাহলে এগুলো টোটো। একটু এগিয়ে লাইব্রেরির উল্টোদিকে দেখলাম পেট্রোল পাম্পটা থাকলেও কেমন যেন নতুন পোশাক পড়েছে। ঢুকলাম। পেট্রোলের এখন ইলেকট্রনিক বোর্ড মিটার। লিটার প্রতি দাম দেখে আমার আত্মারাম খাঁচাছাড়া। আমার মন পড়েছিল জ্যোতি সিনেমা হলে।

জ্যোতির মোড় বেঁকে হলটার সামনে এসে দাঁড়াতেই আমার মাথা ঘুরতে শুরু করল। হালকা স্কাই ব্লু আর কালোর বর্ডারে সেই আশ্চর্য সুন্দর থামগুলো কোনও দৈত্য রাতারাতি নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। ক্ষয়ে যাওয়া লাল রঙের ‘জ্যোতি’ লেখাটাও চোখে পড়ল না। আমার অতিপরিচিত ঝালমুড়ি, বাদামওলা বা খ্যাড়খ্যাড়ে গলায় কথা বলা বাপির ফুচকাও আশেপাশে কোথাও নেই। কোথায় ব্ল্যাকার, টিকিটের লম্বা লাইন আর গিজগিজ করা মানুষ?

ঝকঝকে কাচে সুসজ্জিত একটা বিশাল বড় বাড়ি আমার সামনে। এর কোনদিক দিয়ে ঢুকব, কোনদিক দিয়ে বেরব, কিছুই আঁচ করতে পারছি না। উল্টোদিকের ফাঁকা জায়গাটায় সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দারুণ দেখতে অনেকগুলো চারচাকা গাড়ি। পাশের বোর্ডে লেখা পার্কিং লট। উপরে খুব সুন্দর করে লেখা ‘জে-আইনক্স’।

বিদেশি পোশাক আর চেহারার দু-চারটি ছেলে-মেয়ে আমার আশেপাশে। চারপাশে দারুণ সুগন্ধ। আমার চিরপরিচিত ঘামের গন্ধটা নেই। প্রত্যেকের হাতে ফোনের মতো দেখতে একটা যন্ত্র। সেটা দিয়েই তারা অনবরত নিজের ছবি তুলে যাচ্ছে। প্রেমিক-প্রেমিকার হাতের থেকেও যত্ন দিয়ে মুড়ে রেখেছে সে যন্ত্রকে অনেক বেশি।

ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকি। এগুলোকে কি বিদেশি চিপস্‌ বলে! কোলড্রিংক ক্যানে খাওয়া হচ্ছে। চোঁ চোঁ করে টানার আওয়াজ নেই। লোকে খাচ্ছে কম, ফেলে দিচ্ছে বেশি। মদ খাওয়ার জায়গা আছে সিনেমার মধ্যেই। সিনেমা হল বলা হয় না। দেখলাম তার বিচিত্র নাম। স্ক্রিন ওয়ান, স্ক্রিন টু, স্ক্রিন থ্রি…।

প্রবলভাবে আমি সিনেমাকে দেখতে চাইছিলাম, সিনেমাকে ছুঁতে চাইছিলাম। বুঝতেই পারছি, সঙ্গে আনা এই রিলটার এখানে আর প্রয়োজন নেই। সামনের একটা আয়নায় চোখ পড়তেই চমকে উঠি। নিজেকে আয়নায় চিনতে পারছি না কেন! পাকা চুল, পাকা খোঁচা খোঁচা দাড়ি, ঝুলে পড়া গালের লোকটা কে? আমি তো এখন সিনেমার ভিতর। আমাকে তো হিরোর মতো দেখতে লাগা উচিত। তাহলে লাগছে না কেন! বেরিয়ে আসতে আসতে ভাবছিলাম, আসতে হয়তো পেরেছি। ফিরে যেতে পারব কি? একটু যেন কুঁজো হয়ে গেছি। প্রবল অনিশ্চয়তা নিয়ে আমার পুরনো স্কুটারে কিক করে সেটাকে স্টার্ট করি। পিছনে বেল বাজার মতো যেন কিছু বেজে উঠে এবার…

চিত্রকর: মৃণাল শীল

Comments are closed.