চোখ বদল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    কিঞ্জল রায়চৌধুরী

    থার্ড রাউন্ডের ইন্টারভিউ চলছে। বাইরে এখনো ছ’জন অপেক্ষায়। সোমনাথ ওদের পাশে অবশিষ্ট সাত নম্বর।

    সকাল ন’টায় সিকিউরিটি স্লিপ দিগেছিল সবাইকে। নাম আর নম্বর লেখা একেকটা টোকেনের মতো স্লিপ। ইন্টারভিউতে বসার এন্ট্রি পারমিট। তখন একতলার বসার ঘরটা একেবারে গমগম  করছিল। চটি জুতোর কচমচ, কাগজের খসখস। কলেজে পড়া ছেলেমেয়েদের একঝাঁক ভিড়। হাতে স্মার্টফোন। চুলবুল কথা। গুনগুন আলোচনা। কিছু মেয়ে রীতিমতো উচ্ছল।

    — এই অংশু আমার ফর্মটা একটু ফিল আপ করে দে না প্লিজ্!

    — দেবো। আগে বল আমায় কী দিবি?

    — স্মাইলি।

    ফুট কাটল আরেকটা ছেলে। হাসির ফোয়ারা ছড়িয়ে পড়ল গোটা ঘর জুড়ে।

    — একটু আস্তে! পাশের ঘরে ট্রেনিং চলছে। সিকিউরিটি বারবার এসে সাবধান করে যায়। পাঁচমিনিট যে যার মতো চুপ। তারপর আবার শুরু ছেলেদের হইহল্লা, মেয়েদের কানাকানি। জানাজানি..

    — তোমার কোন ইয়ার?

    — সেকেন্ড ইয়ার চলছে। অ্যাই শোনো না! তুমি কি জবটা পেলে সিরিয়াসলি করবে?

    — দেখি। ট্রাই তো করব। অন্তত একটা এক্সপিরিয়েন্স হবে।

    — আমি বাবা জাস্ট টাইমপাস করতেই এসেছি। দুটো ক্লাস অফ। পেপারে অ্যাড দেখলাম। ভাবলাম যাই, ইন্টারভিউ দিয়েই আসি।

    — হ্যাঁ। নিউজ পেপারে তো প্রতি শনিবারই এদের অ্যাড থাকে।

    পাশ থেকে আরেকটি মেয়ে গম্ভীর মুখে বলে। – শুনেছি আভানি সলিউশন অন্য কলসেন্টারগুলোর মতো নয়। এদের বেশ নাম আছে। আমি তো চান্স পেলে দাঁত কামড়ে পড়ে থাকব। সেজন্যই নাইট শিফ্ট প্রেফার করছিকলেজেরও অসুবিধে হবে না। একবার সার্টিফিকেটটা হাতে পেলেই ব্যস! টাটা! ‘

    — এই! আস্তে বলো, শুনে ফেলবে!

    — উপস্! সরিসরি! মেয়েটা জিভ কাটে।

    সোমনাথ ওদের কথার মধ্যে ছিল না। গুটিসুটি বসে ফর্মটা একমনে ফিল আপ করে চলেছিল। মিলিয়ে মিলিয়ে দেখছিল বারবার। যাতে   কোনও ভুলত্রুটি থেকে না যায়। তারপর ফর্মটা এক কপি ছবি সমেত বায়োডাটার সঙ্গে আটকে অপেক্ষা। বুকে চাপা ধুকপুক। মাথায় একটাই চিন্তা। যে করেই হোক কাজটা তাকে পেতেই হবে। অবশ্য, তার একটা ভরসা ছিলই। সেটা হল অঙ্কিতা ম্যাডামের দেওয়া আশ্বাস। কর্মখালির বিজ্ঞাপন দেখে একের পর এক ফোন করে করে সোমনাথ তখন ক্লান্ত। খানিকটা হতোদ্যম। জানতে চেয়েছিল, — চাকরিটা হবে তো ম্যাডাম?

    — নিশ্চয়ই! কেন হবেনা? এত লো কন্ফিডেন্স কেন তোমার? তুমি ইন্টারভিউটা অ্যাটেন্ড তো করো আগে!

    সোমনাথ বেশ জোর ফিরে পেয়েছিল কথাটা শুনে।

    বিজ্ঞাপনে দুটো নম্বর দেওয়া ছিল। সঙ্গে দুটো নাম। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চেষ্টা করে শেষমেশ অঙ্কিতা ম্যাডামকেই ফোনে পেয়েছিল সোমনাথ। সুন্দর করে সব প্রসিডিওর জানিয়ে ‘আভনি সলিউশনস’ এর ঠিকানা, এমন কি কোন বাসে উঠতে হবে কোথায় নামতে হবে সেটা পর্যন্ত ডিটেইলএ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।

    — তাহলে তুমি ন’টার মধ্যেই চলে এস। আর হ্যাঁ ইন্ট্রোডাকশনের সময় জানতে চাওয়া হবে তোমায় কে পাঠিয়েছে। তুমি কিন্তু আমার নামটা অবশ্যই বোলো। যদি কোনও প্রব্লেম হয় আমাকে ফোন করবে। ঠিক আছে তো?

    সোমনাথ পৌঁছেই ফোন করেছিল। — ম্যাডাম আমি এসে গেছি।

    — ওকে সোমনাথ। ভেরি গুড! তুমি ভেতরে আমার নাম বলে রিসেপশনএ গিয়ে দেখা কর।

    — আপনি কোথায়?

    — আমি তো কল্-এ বিজি আছি সোমনাথ। বাট তোমার কোনও অসুবিধা হবে না। ভেতরে চলে যাও, কী করতে হবে সব ওরা বুঝিয়ে দেবে। বেস্ট অফ লাক! কী হল না হল আমাকে জানিও। ঠিক আছে তো?

    রিনরিনে গলাটা ফোনের ওপারে মিলিয়ে গিয়েছিল। তবু যেন তার রেশ চলেছিল সোমনাথের কানে। আপনজনের মতো আশ্বাস পেলে অমনটা হয়। তাছাড়া গলাটা মনে হচ্ছিল যেন খুব চেনা। কথা বলার ধরনটাও। অনেকটা …অনেকটা টুসির মতো। ঠিক ওর মতোই মিষ্টি অথচ কাটাকাটা স্পষ্ট। শব্দগুলো শুনলে সোজা মগজে গিয়ে মেশে। আর শেষের ওই প্রশ্নবোধক শব্দগুলো,  নিজের কথা জোরালো প্রমাণ করতে প্রতি কথায় টুসিও ওরকমভাবেই জুড়ে দিতো – ‘ ঠিক আছে তো? ‘

    এখন কোথায় রয়েছে টুসি?  সত্যি তো কোনও খোঁজখবর নেই! বালিগঞ্জের ভাড়াবাড়ি ছেড়ে সোনারপুর চলে যাওয়ার পর থেকে আর একবারও দেখা হয়নি। বাবা মারা গেল। তারপর থেকে একমাত্র বেঁচে থাকা আর বাঁচতে চাওয়াটাই সোমনাথের জীবনে বর্তমান। ভাবনাহীন ফুলেল দিনগুলো কখন যেন হারিয়ে গেল! হারিয়ে গেল তার স্কুলবেলা। পাঁচজনের ভিড়ে মিশে হারিয়ে গেল টুসি। আকাশি স্কুলফ্রক পরে ছুটে বেড়ানো মেয়েটার ছবি আট বছরে অনেকটাই ঝাপসা। তবু সেই ঝাপসা ছবিটাই এখন হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

    (২)

    ‘সোমনাথ রায়!’

    থার্ড রাউন্ডের ডাক এসেছে। সজাগ হল সোমনাথ। সময় যত বাড়ছে আশা বাড়ছে ততই। পাশাপাশি একটা ভয়। শেষমেশ কিছু যদি না হয়! বাড়িভাড়া, মুদিদোকানের হাজার টাকা সেসব শোধ হবে কীকরে?

    কিউবিকলের ঘেরাটোপে পিছন দিক করে বসেছিলেন মহিলা। সামনে ফিরলেন। বয়স আন্দাজ করা যায় না। মুখে চড়া ফেসপ্যাক। চুলে বাদামি রঙ। হাত তুলে চেয়ার দেখালেন। — তুমিই সোমনাথ রায়? বোসো।

    ঠোঁটে হালকা হাসি ঝুলছে। অথবা মুখটাই অমনি হাসিখুশি। সোমনাথের বায়োডাটা এখন ওনারই হাতে। লালকালির দাগ আর অসংখ্য ইকিরমিকির মন্তব্যে ক্ষতবিক্ষত। কুড়ি টাকা নিয়েছিল টাইপ করিয়ে প্রিন্টআউট নিতে। ভাগ্যিস কয়েক কপি জেরক্স করে নিয়েছিল!

    –ওয়েল, তা হঠাৎ বিপিওতে আসার কথা মনে হল কেন তোমার ? কোনো ধারণা আছে বিপিও সম্পর্কে?  হ্যাভ এনি আইডিয়া অ্যাবাউট ভয়েস প্রসেসিং!

    খয়েরি নেলপালিশ করা আঙুলগুলো বায়োডাটার কোণ মোচড়াচ্ছিল। সোমনাথ চুপ।

    –হুম্, বুঝলাম। তার মানে নেই। তোমার সিভিটা আমি দেখেছি সোমনাথ। একটা চান্স দিতে পারি। ফিল্ডে কাজ করতে পারবে? ডকবয়। ক্লায়েন্টদের মিট করে ডকুমেন্ট কালেকশন করতে হবে, ফর্ম ফিলআপ করাতে হবে। পারবে?

    সোমনাথের শিরদাঁড়ায় টান। সোজা হয়ে বসে।  –পারব ম্যাডাম।

    –গুড! টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনগুলো ভালো করে বুঝে নাও। প্রথম একমাস ট্রেনিংয়ে কোনও স্যালারি পাবে না। হাজার টাকা স্টাইপেন্ড পাবে, প্লাস টিএ। একমাস পর স্টাফ হিসেবে সিলেক্ট হলে তোমার স্যালারি হবে ফোর থাউসেন্ড পার মান্থ। তুমি রাজি তো?

    –হ্যাঁ ম্যাডাম রাজি। কিন্ত…

    –কী বলো!

    –বলছিলাম আমার হাত একেবারে খালি। টিএ টা যদি অ্যাডভান্স দিয়ে দেওয়া হয়…

    –সেটা তোমাদের টিমহেড কে বোলো। নিশ্চয়ই সাপোর্ট পাবে। তাহলে কালই জয়েন করে যাও!

    সোমনাথ ভাবতে পারেনি এত সহজে কাজটা পেয়ে যাবে। অঙ্কিতা ম্যাডামকে খবরটা জানানো দরকার। নীচে নেমেই ফোনে ধরল নম্বরটা। প্রথমে এনগেজড। দ্বিতীয়বার সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ হল।

    –হ্যালো গুডমর্নিং আভনি সলিউশন!

    –হ্যাঁ হ্যালো ম্যাডাম, আমি সোমনাথ বলছি।

    –ও, বলো সোমনাথ। তোমার ইন্টারভিউ শেষ?

    –হ্যাঁ,  কাজটা হয়ে গেছে।

    –খুব ভাল খবর। তা কবে জয়েন করছ?

    –কাল।

    –কংগ্র্যাচুলেশনস! মন দিয়ে কাজ করো। ঠিক আছে তো?

    কট্ করে কেটে গেল লাইনটা। এমন আচমকা! তখনও রিনরিনে শব্দগুলো সোমনাথের কানে টোকা দিচ্ছে…

    –কেন তুই তোর বন্ধুদের আমার নাম বলতে গেলি। ব্রিজের ওপর থেকে সমানে ওরা চেঁচাচ্ছিল। –অঙ্কিতা, অঙ্কিতা! ইস সবাই হাঁ করে দেখছিল আমাকে…

    আটবছর আগেকার সেই কুসুম রোদের বিকেল। স্কুল থেকে ফেরার পথ। টুসির চোখের পাতায় কুচিকুচি জল।

    –সরি! আমি না বুঝে বলে ফেলেছি টুসি। বিশ্বাস কর…আচ্ছা বাবা আমি কাল স্কুলে যাই, ওদের আচ্ছা করে কথা শুনিয়ে দেব। এবার হাস!

    টুসি চোখ মুছে হেসেছিল। –আর কক্ষনও এরকম বোকামি করবি না। ঠিক আছে তো?

    সোমনাথ হাত কামড়ায়। ইস্! টুসির ভাল নামটা মনে করতে তার এত দেরি হল?

    (৩)

    একটা মাস যেতে না যেতেই সোমনাথ বুঝতে পারে, বড্ড বাড়াবাড়ি রকমের ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছে। এটা চাকরি নয়, একরকম বাজি ধরা। ছাব্বিশটা দিন টেনেটুনে চালানো তার পক্ষে খুব সহজ ব্যাপার নয়। যদি বা ধারদেনা করে আসা–যাওয়ার খরচ এবং টিফিন খরচটুকু জোগাড় করা যায়, তারপরেও থেকে যাচ্ছে আরও একমাসের অপেক্ষা। তাছাড়া সময় এখানে নিজের নিয়মে চলে না। টার্গেট তাকে চালায়। কানে মাথায় হেডফোন চাপিয়ে মুখে ফেনা তুলে অনবরত কলকল করে যারা কপচিয়ে চলেছে, তারা আসলে টার্গেটকে ছুঁয়ে ফেলতে চাইছে। টার্গেট ততই সরে সরে যাচ্ছে নাগালের বাইরে। ওদের সাফল্যের ওপরই নির্ভর করে সোমনাথের ডিউটি। ওরাই ফিক্স করে ক্লায়েন্ট অ্যাপয়েন্টমেন্ট। সোমনাথ তো দম দেওয়া পুতুল।

    ক্লায়েন্টরা ব্যস্ত মানুষ। কাজেই তাদের দেওয়া সময়টাই সময়। ডিউটি আওয়ার বলে আলাদা কিছু নেই। সেদিন ঠিক হল হাওড়া যেতে হবে। রাত তখন আটটা। সোমনাথ সেটা মনে করাতে চেয়েছিল। লাভ হয়নি।

    –শুভ্রদা, কাল ট্যাক্সিভাড়া লেগে গেছে একশো টাকা। দিয়ে দিলে ভাল হত।

    টিমহেড শুভ্রদা বিরক্ত। – কানের কাছে কি চব্বিশববার ঘ্যানঘ্যান করছ? এভাবে যখন তখন চাইলেই টাকা দেওয়া যায়! হিসেবে লিখে রাখো, মাসের শেষে পেয়ে যাবে।

    –কিন্ত আমাকে যে বলা হয়েছিল…

    –কী বলা হয়েছিল? কে যে তোমাদের এসব বলে! আচ্ছা যাও, আমি দেখছি।

    শুভ্রদা খালি বলেন দেখছি। কী দেখছেন উনি! দেখছেন কি এখনও সোমনাথ লাঞ্চে যায়নি!  মাথা ঘুরছে ওর। আরেকটা কথা প্রায় রোজই শুনতে পাচ্ছে –পারফরমেন্স। ওই শব্দটাদর ওপরেই নির্ভর করে সবার সব কিছু। প্রচুর ছেলেমেয়ে আসছে যাচ্ছে। প্রতি শনিবারেই নতুন কিছু মুখ। ছাঁক‌নিতে যাদের ছেঁকে তোলা হয় তারাই থাকে। বাকিরা…

    পুরনো ডকবয় শ্রীকান্ত বলছিল এখানে এরকমই হয়। প্রত্যেকের পারফরমেন্সের ওপর বেস করেই ম্যানেজমেন্ট সার্টিফিকেট দেয়। সেটা একমাসও হতে পারে, আবার দু’মাস তিনমাস। কোনও ঠিক নেই।

    –কিন্তু ইন্টারভিউয়ের সময় তো এত কিছু বলেনি!

    গোলগোল চোখ পাকায় শ্রীকান্ত। – কেন, তুই ফর্ম ভরবার আগে টার্মসগুলো ভাল করে পড়িসনি?

    –হ্যাঁ পড়েছি। লেখা ছিল কিছু কিছু কথা…

    –ওই ‘কিছুকিছু’টা কিছুনয়,  আবার অনেক কিছু। সেটা তোর ভাবা উচিত ছিল।

    কী করে ভাববে সোমনাথ! দেড়পাতা জুড়ে তরতরে ইংরেজি ভাষায় শর্তের পিঠে চাপানো শর্ত। ওটুকু সময়ে সবটা পড়ে বুঝে ফেলা কি এতই সহজ? তাছাড়া চাকরি দরকার ছিল, তখন এত কিছু ভাববার সময় কোথায়?

    এখন ভাবনা হচ্ছে। ভাবনা থেকে ভয়। কেউ কোনও কথাই শুনতে চায় না! এমনকি অঙ্কিতা ম্যাডামকেও ফোনে ধরা যাচ্ছে না। বিচ্ছিরি যান্ত্রিক  শব্দটা এক নাগাড়ে বেজেই চলেছে।

    (৪)

    বারোটা মিসড কল। স্ক্রিনে আজও জ্বলজ্বল করছে। গত একমাস দেখে দেখে নম্বরটা প্রায় মুখস্থ করে ফেলেছে অঙ্কিতা। সকালে বিকেলে নিয়ম করে চারটে কল আসবেই। ধরে না। অসংখ্য ফোনাফুনির ভিড়ে ওয়েটিংয়ে থাকা একটা নম্বর, যেটা দেখলেই অদ্ভুত এক অস্বস্তি তাকে চেপে ধরে। অফিসের ফোন। সুইচ অফ করার প্রশ্নই নেই। একমাত্র উপায় না ধরা। কিন্তু আজ যেন ধৈর্যের মাত্রা ছাড়াচ্ছে। ঘনঘন ডেকে ডেকে উঠছে নম্বরটা।

    প্রথম কলটা ছিল দিনকুড়ি আগেকার। একেবারে অপ্রত্যাশিত।

    –হ্যলো ম্যাডাম আমি সোমনাথ।

    নাম শুনে মানুষ চেনা অঙ্কিতার পক্ষে কঠিন। জানতে চেয়েছিল –সরি, কোন সোমনাথ? মন্ডল না চ্যাটার্জি!  বাগুইহাটি থেকে বলছ কি?

    -নানা ম্যডাম আমি রায়। সোমনাথ রায়। সেই যে সোনারপুর থেকে এসেছিলাম। একমাস হল জয়েন করেছি। আপনিই তো আসতে বলেছিলেন। মনে নেই?

    কী মুশকিল! প্রতিদিন এরকম কতজনকেই তো অঙ্কিতা আসতে বলে। এটাই তার কাজ। তবু ভদ্রতা রাখতে বলেছিল, — উম হ্যাঁ,  বোধহয় একটু একটু মনে করতে পারছি। বলো কী বলবে?

    ব্যাস! নরম সুর পেয়ে ছেলেটা একেবারে পেয়ে বসল।

    — আমার এখানে কিচ্ছু ঠিকঠাক লাগছে না।

    — কেন? কাজ করতে কোনও সমস্যা হচ্ছে?

    — সমস্যা অনেক। এভাবে ফোনে সব তো বলতে পারব না। আপনি একবার দেখা করলে খুব ভাল হয়…দশ মিনিটের জন্য…মানে…

    –শোনো শোনো সোমনাথ!

    অঙ্কিতা থামিয়ে দিয়েছিল তাকে। বোঝাবার চেষ্টা করেছিল।   – নতুন অবস্থায় সবারই একটুআধটু প্রব্লেম হয়। সেটা তুমি তোমার ডিপার্টমেন্টকে জানাও, ওরা নিশ্চয়ই ব্যাপারটা সিরিয়াসলি দেখবে।

    –কেউ কিছু দেখে না ম্যাডাম! এক একজন একেকরকম কথা বলে। এক মাস হতে চলল, এখন জানতে পারছি আরও একমাস ট্রেনিংয়ে থাকতে হবে। উইদাউট স্যালারি তিনমাস কাজ করে অলরেডি তিনজন ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে। আমি এখন কী করব বলুন!

    –বুঝতে পারছি সোমনাথ। বাট্ এ ব্যাপারে আমি কোনও হেল্পই করতে পারব না।

    –কিন্তু আপনিই তো বলেছিলেন,  কোনওরকম অসুবিধায় পড়লে আপনাকে ফোন করতে!

    –সেটা তোমার ইন্টারভিউ পর্যন্তই। তারপর সত্যিই আমার কিছু করার নেই।

    ছেলেটা তবু নাছোড়। — আচ্ছা। আপনাকে কিছু করতে হবে না। শুধু একটিবার আমার সাথে আপনি দেখা করুন। হয়তো সামনাসামনি দেখা হলে আপনার অনেক ভাবনাই বদলে যাবে!

    অঙ্কিতা অনেকক্ষণ ধৈর্য রেখে চলেছিল। বিরক্তিটা আর চেপে রাখতে পারল না।

    –বাট হোয়াই? আমার ভাবনা বদলাবার জন্যে আমি তোমার সাথে দেওয়া করতে যাবোই বা কেন?

    –নানা, ম্যাডাম আপনি কথাটার ভুল মানে করছেন! দেখুন আপনার সাথে আমার দেখা করা খুব দরকার।

    –আমার তো কোনও দরকার নেই!

    –আচ্ছা একটা ছোট্ট রিকোয়েস্ট,  আপনার কি কোনও ডাকনাম আছে? ডাকনামটা মানে..

    –হাউ ননসেন্স ইউ আর! ফোন রাখো…

    আবার রিং হচ্ছে। অঙ্কিতা কানে তুলল না। রিসিভ করে স্পিকারে দিয়ে, পরক্ষণেই কেটে দিল।  ‘প্লিজ ম্যাডাম! একবার আপনি আমার সঙ্গে দেখা করুন। কাজটা চলে গেলে আমার সুইসাইড করা ছাড়া উপায় থাকবেনা.. বোঝার চেষ্টা করুন প্লিজ্!’…

    — তুই নাম্বারটা ব্লক করে দিচ্ছিস না কেন?

    তমসা জুনিয়র। বেশ ফরোয়ার্ড। ঝটিতি সিদ্ধান্ত নিতে পারে। স্যান্ডুইচে শেষ কামড়টা দিয়ে কথাটা ওই বলল। তারপর ফুরফুর করে হেঁটে চলে গেল করিডোরের দিকে।

    ভুরু কুঁচকে মাথা নাড়ে অঙ্কিতা। — হুম্, সেটাই করব ভাবছি। তুমি কিছু বলছ না রিনাদি!

    রিনাদি কম্পিউটারে সিভি ডাউনলোড করছিল। স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, — কি আর বলি বল! আমি তোর জায়গায় থাকলে ছেলেটার সঙ্গে একবার দেখা করে নিতাম। হয়তো সত্যিই কিছু বলতে চায়, শুনতে দোষ কী?

    –তার মানে! একটা ক্যান্ডিডেটকে সিলেক্ট করেছি বলে সব দায় আমার?  সেটা কি সম্ভব?

    –না তা নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু এটাতো ঠিক, তোর নিজের টার্গেট ফুলফিলড করার পেছনে ওই ক্যান্ডিডেট নামক ছেলেটারও অজান্তে একটা ভূমিকা আছে। ভুলে যাস না তুই একজন এইচআর!

    –এইচআর –এর চাকরিটাও চাকরি রিনাদি! আমি এখানে চাকরিই করছি..

    –একশোবার। এটা তোর প্রফেশন। তাই বলে দায়িত্ব এড়ানো যায় না অঙ্কিতা। দে ডিপেন্ড অন ইউ!

    –হ্যাঁ দায়িত্ব আছে,  সেটা অস্বীকার করছি না। সেটা ততটুকুই, যতটুকু আমার ক্লজের মধ্য পড়ে। আর ঠিক এই কারনেই বিডিএম যখন আমাকে কাউন্সেলিংয়ের দায়িত্ব নিতে বললেন আমি রাজি হইনি। কাউন্সেলিংয়ের চাপ নেওয়া আমার পক্ষে ইম্পসিবল। আমার দায়িত্ব প্লেসমেন্ট-এর। ব্যাস্!

    রিনাদি কম্পিউটার থেকে মুখ ফেরায়। – যাকে তুই প্লেস করছিস, সে একজন হিউম্যান বিইং! কোনও প্রোডাক্ট বা মেশিনারি নয়। ওভাবে ভাবিসনা অঙ্কিতা!  একদিন ভীষণ ধাক্কা খাবি!

    –ওফ্! রিনাদি তুমি না…

    —  হ্যাঁ জানি কী বলবি। আমি হোপলেস। পাতি হাউস ওয়াইফ মেন্টালিটি। সংসার সামলে চাকরি করতে আসি। এই কারণেই প্রোগ্রেসের কোনও সম্ভাবনা নেই। তাই তো?

    –না মোটেও আমি সেসব বলতে চাইনি। তুমি রেগে গেছ। ধাক্কা যখন খাব তখন খাব, এখন ওঠো তো!  চলো ক্যান্টিনে যাই, আমার খুব খিদে পেয়েছে..চলো…

    –কী করে যাবি রে!  তোর দিওয়ানা সেই ক্যান্ডিডেট পথ আগলে বসে আছে যে!

    অঙ্কিতা ব্যাগ গোছাচ্ছিল। থমকে গেল তমসার কথা শুনে। রিনাদিও অবাক।

    –তার মানে!

    –মানে ছেলেটা খুঁজে খুঁজে আমাদের ফ্লোরে এসে হাজির হয়েছে। পুরো করিডোর ঘিরে হল্লা চলছে। এইমাত্র দেখে এলাম।

    (৫)

    যে যার টার্গেট লক্ষ্য করে ছুটছে। অঙ্কিতা ম্যাডাম লাইন কেটে দিলেন। শেষ ভরসাটুকুও যেতে বসেছে। একটাই রাস্তা খোলা সোমনাথের কাছে। মুখোমুখি দেখা করা, সে যেভাবেই হোক। এই অঙ্কিতা সেন যদি সেই টুসি হয়, তাহলে আর ভুল বোঝাবুঝির জায়গা নেই। তাকে চিনতে পারলে টুসি কি একটা কোনও উপায় বার করবে না!

    কিন্তু পাশের বিল্ডিংয়ে কড়া সিকিউরিটি। বাধা হল সেটাই।

    — যে কেউ এসে নাম বললেই আমরা দেখা করতে দিতে পারি না! নিয়ম নেই।

    — নিয়ম তো আপনারাই তৈরি করেছেন। চাইলে আপনি ভাঙতে পারেন… বিশ্বাস করুন, আমার দেখা করাটা সত্যি খুব জরুরি। আমাকে যেতেই হবে, সরুন…

    — দাঁড়াও!

    হাত বাড়িয়ে পথ আটকেছে সিকিউরিটি ইনচার্জ। আরও জনা চার –পাঁচ ইউনিফর্ম পরা লোক ঘিরে ধরেছে সোমনাথকে।

    — কী ব্যাপার! হয়েছেটা কী? এত ভিড় কিসের এখানে!

    চেনা গলা পেয়ে সোমনাথ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। সিকিউরিটি লোকটাও এগিয়ে যায় সেইদিকে।

    — দেখুন না ম্যাডাম, বারণ করা সত্ত্বেও ছেলেটা জোর করছে। আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়। বলছে আপনাকে চেনে। আপনি কি চেনেন নাকি ওকে?

    সোমনাথ হাঁ করে তাকিয়ে। মাত্র কয়েক হাত দূরেই অঙ্কিতা সেন। মুখের আদলে টুসির সঙ্গে কী আশ্চর্য মিল! শুধু গালদুটো আরেকটু বেশি ভরাট। আর চাহনিটা এক্কেবারে অন্যরকম। টুসির ঘনকালো চোখের মণি দুটো যেন সরিয়ে নিয়েছে কেউ। মণি দুটো সমুদ্রের মতো সবুজেনীল… মন বিবশ হয়ে যায়।

    অঙ্কিতা মাথা নাড়ল। — না চিনি না। তবে মনে হয় নতুন জয়েন করেছে। আর আপনারাই বা কীরকম!  জানেন না পাশের বিল্ডিংয়ের এমপ্লয়িদের আমাদের বিল্ডিংয়ে ঢোকার জন্য পারমিশন লাগে! হুট করে একজন তিনতলায় উঠে এল কী করে? আর তোমরা এত ভিড় করে ক্যাওস করছ কেন? ভিড় ক্লিয়ার করো! যাও যার যার টেবিলে যাও!

    — সরি ম্যাডাম! আমরা দেখছি। এই যে ভাই শুনলে তো উনি কি বললেন? এবার কিন্তু আমরা ফোর্স করতে বাধ্য হব।

    সোমনাথ হতভম্ব। অঙ্কিতা সেনের চোখের দিকে তাকিয়ে আরও একবার নিজের বিশ্বাসটা ঝালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সেখানে সমর্থনের চিহ্নটুকু নেই। নাঃ! এ চোখ টুসির নয়…হতে পারে না।

    পেছন থেকে জামার কলারে টান পড়ল। –কী হল ভাই, তুমি যাবে?

    (৬)

    আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় কন্ট্যাক্ট লেন্স খুলে ফেলল অঙ্কিতা। বেসিনের খোলা কল থেকে ফেনায়িত স্বচ্ছ জল সরু ঝর্ণার মতো ঝরে যাচ্ছে। আঁজলা ভরে জল নিয়ে চোখে মুখে ছেটাল ভালো করে। তারপর মুখ তুলল আয়নায়। ওর প্রতিবিম্বর পাশে আরও একটা প্রতিবিম্ব। রিনাদি। নিষ্পলক।

    –কী দেখছ?

    –দেখছি তোকে। লেন্স খুললে কেমন বদলে যায় তোর মুখটা। এত মিষ্টি দেখতে তুই! একটা কথা বলব অঙ্কিতা! তোর ডাকনামটা এখন আমারও জানতে ইচ্ছে করছে।

    –তুমি খেতে গেলেনা যে!

    –কথা ঘোরাচ্ছিস? সত্যি করে বলতো! ছেলেটাকে তুই চিনিস তাই না?

    অঙ্কিতা পায়েপায়ে করিডোরের একপ্রান্তে এসে দাঁড়ায়। স্লাইডিং উইন্ডো থেকে বাইরের ঝাপসা আকাশ দেখা যাচ্ছে। ধোঁয়াধূসর মেঘে আচ্ছন্ন। উঁচুউঁচু হাইরাইজের ফ্লোরগুলো একটা একটা করে নেমে গেছে নিচের দিকে। ওপরে ওঠার হয়তো শেষ নেই, কিন্তু নীচে নামার একটা শেষ আছে। ওই ফ্লোরগুলোর দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ পর মুখ খুলল অঙ্কিতা।

    –তুমি রেজিগনেশনটা টাইপ করে দেবে রিনাদি? আমি জাস্ট একটা সই করে দেবো।

    রিনাদি ওর মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। অঙ্কিতার চোখে সমুদ্রের মতো মণিদুটো নেই। তার বদলে নোনা জল টলটল করছে।

    –তারপর কী করবি, কিছু ভেবেছিস?

    –কী আবার!  জব খুঁজব। একটা নয়। দুটো।

    চিত্রকর: মৃণাল শীল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More