চতুরাশ্রম

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

সায়ন্তন মুখোপাধ্যায়

এক

রিটায়ার্ড অবিনাশ দত্তগুপ্ত পার্কে হাঁটছিলেন রুটিন মাফিক। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে হল ট্র্যাক থেকে বেরিয়ে পড়ছেন । থেবড়ে বসে পড়লেন ধুলোতে। মনোজবাবু পিছনে ছিলেন। লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে এলেন। অবিনাশকে দু’হাত লাগিয়ে তুলতে তুলতে বললেন – ‘এভাবে একা একা বেরুবেন না। প্রেসার সুগারটা চেক্ করিয়েছেন?

অবিনাশ লজ্জা পেয়ে বললেন – না, না। আমি পড়িনি, বসে গিয়েছিলাম।

মনোজবাবু হাসলেন – ঐ হলো, এখন কোন ধাপে আছেন বলুন তো?

অবাক হন অবিনাশ – ধাপ!

মনোজবাবু বুঝিয়ে বললেন – ব্রহ্মচর্য-গার্হস্থ্য-বানপ্রস্থ-সন্ন্যাস। এখন কি চলছে বলুন তো? বানপ্রস্থ, তারপর তো সন্ন্যাস।

অবিনাস হাসলেন একটু – ওসব ভাববেন না। আমি একদম ফিট।

ঘটনা ঘটেছে দিন চারেক আগে থেকে। আজ সেটা হঠাৎই চলে এসেছিল সামনে। হাঁটতে হাঁটতে তিনি দেখতে পেলেন, তাঁর কৈশোরের হারিয়ে যাওয়া জিনিসটা সামনে ভেসে উঠল। তাই মাথাটা ঘুরে যেতেই তিনি বসে পড়লেন। দিন চারেক আগে থেকেই অবিনাশের কোষে কোষে ছড়িয়ে পড়েছে – ‘খুঁজে তাকে পেতেই হবে।’

ঐ শব্দবন্ধটাই ওকে ছুটিয়ে নিয়ে চলেছে ।

বালক বয়সে রাতে মায়ের কোলের কাছে শুয়ে ‘নিশি-ডাক’-এর গল্প শুনেছে কতবার। ভয়ে সিঁটিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলেই মা বলত – ‘ভয় কি? বল, কাঁথ, কাঁথ।’  কাঁথ অর্থাৎ মাটির দেওয়ালের মতো স্থির থাকবি। কেউ তোকে নাড়াতে পারবে না। ‘নিশি-ভুত’ ভুলিয়ে ভালিয়ে উঠিয়ে নিয়ে যেতেও পারবে না।  অবিনাশ মায়ের বুকে মুখ গুঁজে অস্ফুটে বলত – কাঁথ! কাঁথ!

মনে হচ্ছে সেই নিশিটা যেন অন্য শরীর ধরে পিছনে লাগতে শুরু করেছে। কিন্তু মায়ের মত ‘কাঁথ’ ‘কাঁথ’ বলার মত এখন কেউ নেই। সেই নিশি বারবার ডাকছে – অবিন! অবিন!

দুই  

সোনাঝুরি – ইউ. সি – শিশু গাছ বেড়ে উঠেছে মাঠের পর মাঠ ফুঁড়ে। মাঝে মাঝে সুদৃশ্য দালান বাড়ি ঢুকে আছে গাছের ফাঁকে। অবিন কোথা থেকে নজর করছে ঠাওর করতে পারে না। ওকি নিশি ভূতের পিঠে চড়ে পাখির মত উড়ে উড়ে চলেছে! মোটেই ভয় লাগছে না। কাঁথ কাঁথ বলে ভয় তাড়ানোর ইচ্ছেও নেই। নীচে তাকিয়ে দেখছে গাছের ওপর ছড়িয়ে আছে এক ধূসর আস্তরণ। অবিন কান পাতে। কিছুই শোনা যায় না। শুধু সাঁ সাঁ শব্দে উড়ে চলেছে অবিন। মনে মনে ভেবে নেয় এটাই হয়তো বানপ্রস্থের লক্ষণ।

নিশিভূত এবার ঘুমটা ভাঙিয়ে দেয়। অবিন ধড়মড়িয়ে উঠে বসে। চোখ মেলে ধূসর আস্তরণের খোঁজ করে। নিশিভূত হো হো হেসে উঠে বলে – ‘পারবি না, পারবি না। এটা তোদের ইন্টারনেট নয়, যে ধরবি। এটা হল প্রাকৃতিক নেট। তোদের ঐ বিদ্যে নিয়ে ধরা যায় না।’

অবিন কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল – ‘তার মানে?’

নিশিভূত বলে – ‘মানুষের বুক থেকে দুঃখগুলো দীর্ঘশ্বাস বেয়ে বেরিয়ে আসে। গাছপালা সেগুলো ধরে নেয়। বছরের পর বছর ধরে ওরা সঞ্চয় করে রাখে মানুষের সেই দুঃখ।’

অবিনের মেরুদণ্ড সড়সড় করে। মুখ ফসকে বলে – ‘এটা কোনও কথা!’

নিশিভূত ওর শিরদাঁড়াতে হাত বোলাতে বোলাতে বলে – ‘তাই তো মানুষ যায়। ঐ দুঃখগুলো বুকের ভিতর দীর্ঘ দিন জমতে থাকলে মানুষ তো আত্মহত্যা করতে বাধ্য হত।’ নিশিভূত এবার একটু থেমে বলল – ‘তুই তো এখন শহর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিস। যাবি তো গাছপালার মাঝে। একটু শান্তির খোঁজে চলেছিস, তাই না?’

অবিন হকচকিয়ে বলল – ‘হ্যাঁ, ঠিক তাই।’

নিশিভূত এবার বুঝিয়ে বলল – ‘গাছপালার ওপর ধূসর আস্তরণ দেখলি তো। ওগুলো আসলে গাছপালার ‘নেট প্রক্রিয়ায়’ জমে থাকা মানুষের দুঃখ।’

অবিনের এবার সাহস জাগে – ‘মানুষের দুঃখরা এভাবে গাছপালার ওপর জমা হয়?’

নিশিভূত বলল – ‘শুধু তোর নয়, তোর চৌদ্দপুরুষের দুঃখগুলোও ওখানে খেলে বেড়াচ্ছে।’

এরকম কথা শুনতে শুনতে অবিনের মনে হয়, সে সত্যিই বেঁচে আছে তো?

তিন

দিগন্তব্যাপী আলু সরষের ক্ষেত। ঝুরঝুরে মাটিতে পা ফেলতেই কাদা লেপ্টে যায়। আলুগাছে সেচ দেওয়া হয়েছে সবে। এধার ওধার সরষে ক্ষেতে হলুদ ফুল। দূরে গাছের ডালে কয়েকটা পাখির কিচির মিচির। এখন অবিন শ্বাস প্রশ্বাসের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। গাছপালার মধ্যে অবিন শব্দহীন পায়ে হাঁটা লাগায়।

হাঁটতে হাঁটতে অবিন অনুভব করছে মৌনি শরীর থেকে বেরিয়ে আসছে তীব্র তাপ। মিশে যাচ্ছে ঠাণ্ডা হাওয়ায়। ক্রমশ মনটা শান্ত হয়ে আসছে। অদ্ভুত এক শান্ত সাগরে স্নান করে চলেছে। ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি। মনে পড়ল এটা ওর মায়ের নাম।

এই ভালো লাগাটা ওর শরীর মনে মোচড় দিয়ে আনন্দে ডুবিয়ে দেয়। অবিন অবাক হয়ে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই আনন্দ প্লাবন হারিয়েছিল এতদিন। ঝটিতি এক ঝটকা শিহরন এসে বৃ্দ্ধ শরীরের পর্দাটা শতছিন্ন করে মিশিয়ে দেয় বাতাসে। ফিরে আসে হারিয়ে যাওয়া কৈশোরের আনন্দময় শিহরন।

আনন্দময় শিহরনে বন্ধ হওয়া চোখ খুলতেই দেখল, সামনে একটা লোক। হাসছে। সামনের দাঁত দুটো                                      ভাঙা। ক্ষীণ শরীর। লোকটি হাত জোড় করে বলল – ‘হঠাৎ মানুষ দেখে শিউরে উঠলেন মনে হচ্ছে? সামনের বাঁশ বাগানের ভিতরই আমার ঘরবাড়ি। বাবু, গ্রাম ঘুরতে আইচেন বুঝি!’

অবিন হাসল – ‘ঠিকই বুঝেছ। কী ভাবে বুঝলে আমি ঘুরতে এসেছি?’

লোকটি হাসতে হাসতে বলল – ‘চেহারা।’

অবিনের হাসি পেল – ‘চকচকে চেহারা, তাই তো? এই চকচকে ভাবটাই ঘোচাতে এসেছি।’

লোকটি আপ্লুত হয়ে বলল ‘আমার বাড়িতে কটা দিন থাকুন। এমন বনে বাদাড়ে ঘোরাব, দু’দিনেই গেঁয়ো চেহারা হয়ে যাবে ।’

এবার ফিরে এল সেই এক্সিকিউটিভ মেজাজ। গম্ভীর হয়ে বলল – ‘থাকবো থাকবো, থাকতেই তো এসেছি। তোমার নাম কি? বাড়ি কোথায়?’

লোকটি বিগলিত হয়ে বলল – ‘আমার নাম সুশান্ত। দশ বছর বয়সে পূর্ববঙ্গ থেকে এখানে। এখন বয়স ছাপান্ন।’  এক্সিকিউটিভ অবিনাশ ঘাড় নাড়ল – ‘হুম।’

কিশোর অবিন ‘হুম’ শব্দ শুনে হুমড়ি খেয়ে পড়ল অবিনাশের ঘাড়ে। অবিনাশ বেশ খানিকটা টলোমলো হয়ে গেল।

সুশান্ত ছুটে আসে – ‘বাবুর প্রেসারটা মনে হয় বেড়েছে।’

অবিনাশ তুরন্ত স্থির ভাব এনে বলল – ‘না না ওসব কিছু নেই। চলো তোমার বাড়িতে।’

সুশান্ত হাত কচলে বলল – ‘আসুন বাবু, বাড়িতে আসুন। একটু জলযোগ সেরে বিশ্রাম নেবেন।’

চার

দামোদর নদীর চরে কাঠের ফ্রেমে দরমার বাড়ি সুশান্তর। বাড়িতে ইলেকট্রিক আছে, টিভি আছে, ফ্রিজ আছে এবং মোবাইল ফোন আছে। আর আছে দরমার তিন দেওয়াল ঘেঁষা কাঠের তাক। বইএ ভর্তি। বেশ সাজানো।

বইগুলির গায়ে জ্যাকেটের মতো পরানো আছে চাষের জন্য কেনাকাটা করা কীটনাশক অণুখাদ্যের প্যাকেট।

অবাক হয়ে দেখছে অবিন। সুশান্ত উল্লসিত ভাবে বলল – ‘এ ঘরে সাধারণের ঢোকা নিষেধ।’

অবিন বলল – ‘আমি!’

সুশান্ত হাত জোড় করে বলল – ‘বোদ্ধা মানুষ আপনারা, সুস্বাগতম।’

অবিন জিজ্ঞাসা করল – ‘চাষের পরিশ্রমের পর পড়ার সময় পাও? ’

সুশান্ত হাত কচলে বলল – ‘সময়ের কথা বলছেন কী স্যার। চাষের কাজ ছাড়ার পর এটাই তো আমার  বিশ্রাম। টিভি আছে ওঘরে, যাদের দরকার, দেখে। ফ্রিজ আছে, যার দরকার ব্যবহার করে। মোবাইল কাছে রাখি না। বাড়িতেই আছে তিন চার জনের। ওরা ওসব দেখে।’

অবিন জানতে চাইল – ‘তোমার এসব দরকার হয় না?’

সুশান্ত বলল – ‘রাতের লাইট, গ্রীষ্মের পাখা।’ এরপর তাকের দিকে আঙুল তুলে বলল – ‘সম্পদ। এদের নিয়েই সময় কেটে যায়। বিশ্রামও হয়।’

অবাক অবিন – ‘বই পড়ে তোমার বিশ্রাম হয়?’

প্রশ্নটা শুনে অজান্তে সুশান্তের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল – ‘এটাই তো আমার ‘নিজের’ সঙ্গে এবং ‘তার’ সঙ্গে দেখা করার সুযোগ। তাতেই সারাদিন ফ্রেস থাকি। পরদিন চাষে খুব আনন্দ পাই।’

কথাটা শুনে অবিন সুশান্তর ভাঙ্গা চেয়ারটায় ধপ করে বসে পড়ল । সে ও তো ‘তাকেই’ খুঁজতে বেরিয়েছে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে।

সুশান্ত অবিনের ওরকম ভাবে চেয়ারে বসা দেখে তাড়াতাড়ি এগিয়ে আসে – ‘বাবু, শরীর খারাপ লাগছে?’

অবিন বলল – ‘না না, আমি ঠিক আছি। কী বললে যেন, ‘তার সঙ্গে তোমার দেখা হয়’ না কি?’

সুশান্ত হাসল – ‘ঐ যে তাকগুলোতে খাপে খাপে সাজানো আছে যে সব অস্ত্র, তার মধ্যে ঢুকে গেলেই ‘সে’ ছুটে আসে আমার পাশে। গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।’

সুশান্ত একটু থেমে পুনরায় নিজেই নিজেকে শোনানোর মতো বলল – ‘মাত্তর সত্তর-পঁচাত্তর বছরের সময়সীমা। এই সময়টুকুর ভেতর পৃথিবী কী এমন ওলোট-পালোট করতে পারি! তাই সে পাশে এসে দাঁড়ালেই আমি আনন্দে হাবুডুবু খাই। মনে শান্তি পাই।’

এবার একটু হেসে অবিনের দিকে তাকিয়ে বলল – ‘এটাই হয়তো আমার বানপ্রস্থ। তারপরে তো সন্ন্যাস!’

অবিন অবাক, ওর ভাবনা সুশান্তর গলায়! ওকি মানুষ, না ‘নিশি’র মত কেউ? অবিন হাতটা বাড়িয়ে দিল সুশান্তর দিকে। সুশান্ত সাদরে অবিনের হাতটা ধরে বলল – ‘শরীর ঠিক তো?’

অবিন সুশান্তর হাতটা চেপে বলল – ‘এক্কেবারে ফিট। বাইশ বছরের যুবক।’

বাইশ বছরের যুবক এগিয়ে গেল বইভর্তি ‘তাকের’ দিকে। জ্যাকেট পরানো বই। খাপে খাপে সাজানো। কীটনাশকের জ্যাকেট পরে আছে প্রাচীন পুস্তকগুলি। সুশান্ত সোৎসাহে এগিয়ে আসে – ‘এই বাঁ দিকের তাকটা দেখুন। এই বইগুলো পরে আছে ফিউরাডন, ফোরাটকস, থায়মেট, ক্রিটাপ, ফোরেটের জ্যাকেট। সব পেস্টিসাইডস-এর জ্যাকেট। ওগুলো সব ধর্মগ্রন্থ। আর পাশের তাকটায় দেখুন – রেনিগোল্ড, নিট্রিপ্লাস, ঝ্যাটাক, আজডাগোলদ ইত্যাদি অণুখাদ্যের জ্যাকেট। ওগুলো প্রবন্ধ পুস্তক।’

অবিন হাত উঁচিয়ে বই তুলে আনতে গিয়ে হাতটা ফিরিয়ে নেয় – ‘ওরে বাবা, সব বিষ মাখানো বই।’                                            সুশান্ত হাসে  – ‘ভয় নেই। হাতে পরার গ্লাভস্ও আছে।’

কীটনাশক ছড়ানোর জন্য সংগৃহীত গ্লাভসগুলো পাশের টেবিল থেকে তুলে নেয়। তারপর অবিনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল – ‘পরে নিন দু’হাতে।’  পরক্ষণেই বলল – ‘থাক, এখন পরতে হবে না। আগে বইগুলোর ইতিহাস শুনুন।’

সুশান্ত বইয়ের তাকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে শোনাতে থাকল বইয়ের কথা – ‘ঐ যে ফিউরাডনের জ্যাকেট পরা বইটা দেখছেন, ওটা পূর্ববাংলার প্রাচীন ধর্ম পুস্তক। পদ্মা পুরাণ। দাদু মারা যাবার সময় এই বইটার সঙ্গে আরও অনেকগুলো বই দিয়ে বলেছিলেন –‘ভাই, বইগুলো তোর কাছেই রাখবি। অন্য কেউ ঠিকঠাক রাখতে পারবে না। কোথায় কখন উলি-টুলি লেগে সব মাটি করে দেবে।’ এই উইয়ের ভয়েই কীটনাশকের জ্যাকেট পরিয়ে রেখেছি।’

সুশান্ত কথা বলতে বলতে একটু আবেগপ্রবণ হয়ে হাঁফিয়ে পড়েছে। তাড়াতাড়ি দরমার দেওয়ালের মুলি বাঁশের চৌকো জানালার কপাটটা কঞ্চির ঠেকা দিয়ে তুলে দিল। এবার ঘরের ভেতর থেকে দেখা যায় ধূ ধূ দামোদর নদ। সবে সামান্য জ্যোৎস্না বালিতে এসে পড়ে শাদা হয়ে উঠতে শুরু করেছে। অবিন আড় হয়ে দেখতে পেল শান্ত নদীর সমাধিস্থ বালুচর।

এবার ফিউরাডনের জ্যাকেট খুলে প্রাচীন ‘পদ্মাপুরাণ’ বের করল সুশান্ত। বইয়ের মলাট উল্টে দিয়ে দেখাল অবিনকে। বলল – ‘আয়েসি হয়ে এর পাতা ওলটানো যাবে না। যথেষ্ট মনযোগ দিয়ে এর পাতা ওলটাতে হবে।’  আবেগভরা কণ্ঠে সুশান্ত বলে – ‘রাত দুপুরে একা একা সাবধানে এই পুস্তকের পাতা ওলটাই। পাতায় চোখ বোলাতে বোলাতে এক সন্ধিক্ষণে ‘সে’ আসে। হাত ধ’রে আমাকে উঠিয়ে নেয়। ‘তাকে’ অনুসরণ করে পায়ে পায়ে বেরিয়ে পড়ি বালুচরে।’

অবিন চমকে গিয়ে বলল – ‘তার মানে!’

সুশান্ত বলল – ‘যাক ওসব। চলুন খাওয়া দাওয়া করি।’

পাঁচ

খাওয়া দাওয়ার পর অবিন বুঝল, নিজেকে বাইশ বছরের যুবক ভাবলে কী হবে, শরীর জুড়ে ক্লান্তির ছায়া পাখা মেলেছে। পাশেই দড়ির খাটিয়াতে শুয়ে পড়ল অবিন। একটু দূরে মেঝেতে শুয়েছে সুশান্ত।

মাঝ রাত্তিরে ঘুমটা ভেঙে গেল অবিনের। দড়ির খাটিয়ার অনভ্যাস। ধড়মড়িয়ে উঠে বসে। দু’চোখ কচলে নেয়। ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখে নেয়। সুশান্ত নীচে। মেঝেতে ঘুমিয়ে কাদা।

অবিন চুপিসারে উঠে বসে। ওপাশে টেবিলের ওপর ঘোমটা ঢাকা ল্যাম্প। খুট করে জ্বেলে নেয়। বইটার জ্যাকেট খুলে সন্তর্পণে গন্ধ শোঁকে। বিষের গন্ধ নেই। পদ্মাসনে বসে কোলের ওপর বইটা তুলে নেয়। ধীর গতিতে মুচমুচে পাতা উল্টে পড়া শুরু করে। পড়তে পড়তে সুশান্তকে একবার দেখে নেয়। ঘুমে অচেতন। বাইরে আম কাঁঠালের ডালে শুধু ঝিঁঝির শব্দ।

এবার পড়াতে মনোযোগ করে। পড়তে পড়তে অনুভব করল, একটা অচেনা গন্ধ চারপাশে ছড়িয়েছে। অচেনা গন্ধটা ক্রমশ অচিনকে আবিষ্ট করে তোলে। আবিষ্ট হয়ে অবিন সামনে তাকাল। এক ফুটফুটে মেয়ে। হাঁটু পর্যন্ত ফ্রকের ঝুল। ঘন কালো কোঁকড়ানো চুল। দু’চোখে মোহিনী মায়া। বালিকা অবিনের হাতটা ধরল। অবিন ধীরে নেমে এল খাট থেকে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়েই আবিষ্ট অবিন বালিকার পিছনে পিছনে হাঁটতে শুরু করল। ওরা এখন নদী গর্ভে বালির ওপর দিয়ে হাঁটছে … হাঁটছে …

অবিন আর পারছে না হাঁটতে। বুকটা ধড়ফড় করে ওঠে। বালিকা পিছন ফিরে দেখল অচেতন হয়ে পড়ে যাচ্ছে। বালিকা ছুটে এসে অবিনকে জাপটে ধরে পড়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাল। এবার ধীরে ধীরে নিজের কোলে শুইয়ে নিল। এরপর কপালে মাথায় নরম হাত বুলিয়ে চলল। অবিন হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল।

অবিনের কান্নার শব্দে সুশান্তর ঘুম ভেঙে যায়। ধড়মড়িয়ে উঠে এসে অবিনকে ঠেলা দেয় – ‘দাদা, ও দাদা!’

অবিন শূন্যে  চোখ তুলে বলল – ‘জল, জল।’

সুশান্ত জলের বোতল তুলে ধরে। অবিন বাচ্চা ছেলের মত কয়েক ঢোঁক গিলে নেয়। সুশান্ত মুখে ঝাপটা দিতে গেলে অবিন হাত নেড়ে থামিয়ে দেয়।

সুশান্ত বিছানার পাশটিতে বসে বলল – ‘আমার পদ্মা মা এসেছিল তো? পারলেন না তার সঙ্গে যেতে, তাই না?’

এবার অবিনের গলার স্বর বেরিয়েছে। অবাক হয়ে বলল – ‘সেকি আমার স্বপ্নের কথা জানলে কী করে?’

সুশান্ত হাসতে হাসতে বলল – ‘ওটা স্বপ্ন নয়। আপনার মনটা এখন ও বানপ্রস্থের উপযুক্ত হয় নি। তাই স্বপ্ন মনে হল। ঠিক আছে, আধার উপযুক্ত হোক, তখন আবার তার দেখা পাবেন।’

অবিন কী উত্তর দেবে খুঁজে পাচ্ছে না। সুশান্তর হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বলল – ‘বইটা দিয়ে কী ফ্যাসাদে ফেলেছিলে বল তো? আমার তো ভয় হচ্ছিল। হয়ত কাল সকালেই দেখব, খবরের কাগজে প্রথম পাতায় হেডিং হয়েছে – ‘নদীগর্ভে নাবালিকা ধর্ষণ’।’

কথা কটা শুনে সুশান্তর চোখ দুটো  ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইল। অবিন সুশান্তর এরকম চোখ দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আচমকা চিৎকার করে সুশান্ত বলল – ‘সকালেই আপনার শহরে ফিরে যান। আপনাদের মতো লোকের জন্য এসব নয়। এরপর থেকে বানপ্রস্থ-সন্ন্যাস নিয়ে বেশি ন্যাকামো করবেন না।’

ছয়

ভোরের প্লাটফর্মে দিনের কাগজটা হাতে পেলেন প্রাক্তন এক্সিকিউটিভ অবিনাশ দত্তগুপ্ত। প্রথম পাতা জুড়ে লিড খবর –        ‘পদার্থ-বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং-এর কৃষ্ণ গহ্বরে প্রবেশ।’

পড়ুন ‘দ্য ওয়াল’ পুজো ম্যগাজিন ২০১৯–এ প্রকাশিত গল্প

সুনা সাঁওতালের কেঁদরার ছো

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More