ভোট পর্ব

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অমিত ভট্টাচার্য

    চার রাস্তার মোড়। প্রথমে ডানদিকের রাস্তা বরাবর রিক্সাটা সোজা গিয়ে ফিরে এল। তারপর বাঁদিকের রাস্তা। কিছুক্ষণ পর ফের ব্যাক। সবশেষে মোড়ের মাথায় রতনের চায়ের দোকানের সোজাসুজি বিশের রিক্সা ঢুকছে দেখে রতনের ঠাওর হলো, কিছু একটা হয়েছে। নিজের সাইকেল নিয়ে সেও চলল রিক্সার পেছন পেছন। জৈষ্ঠ্য মাসের ভরদুপুরে রিক্সায় বসে বুড়ির শরীর সপসপে। আর বিশের অবস্থাও তথৈবচ। রতন সাইকেল থেকেই হাঁক পাড়ল।

    –”অ্যাই বিশে, কী হয়েছে রে? তখন থেকে মাসিমাকে নিয়ে চক্কর খাচ্ছিস শুধু?”

    –”আর বোলো না, শুভদার মা’কে নিয়ে কী ঝামেলায় যে পড়েছি!”

    বলতে বলতেই সামনের বড় গাছটার ছায়া তাক করে বিশে রিক্সার ব্রেক মারে। রতনও সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। দুজনে কিছুক্ষণ কথা বলার পর আবার এগোতে থাকে রাস্তা ধরে। গ্রীষ্মের দাবদাহে জনমানুষহীন ফাঁকা রাস্তায় পাঁচ পাঁচটা টায়ারের গা বেয়ে পিচের পচপচ আওয়াজ উঠছে সামনে।

    রতন প্রশ্ন করল প্যাডেল মারতে মারতে, ”হ্যাঁরে বিশে, শুভদা’র দাদা ছিল বাড়িতে?”

    –”কে জানে। আমি কি উঁকি মেরেছি ঘরে? বউটা যা বলল, তাই বললাম।”

    কপালের ভাঁজ সরল না রতনের। যদিও দৃষ্টি ঘুরে গেল তখনই। দু’দিক বাঁধা ফেস্টুনটার একদিক ঝুলছে। সাইকেল থেকে ঝটপট নেমে সে ভেবে পাচ্ছে না কী করবে। বিশেকে একটু সাহায্যের কথা বলতেই সে প্রায় খেঁকিয়ে ওঠে।

    –”তোমার দরদ থাকে তো তুমি কর গে। আমি পারব না।”

    ওর ঝাঁঝালো উত্তর শুনে রতন কিছুটা বোমকে যায়। কোনওমতে ফেস্টুনের ঝোলা দিকটা যত্ন করে একটা গাছে বেঁধে ফের বিশের সঙ্গে সাইকেল নিয়ে এগোতে থাকে।

    বিশে রতনকে বলে, ”আচ্ছা রতনদা, তুমি যে নেতাকে নিয়ে এত ভোট ভোট করছ, সে কি তোমায় দেখবে?”

    ইশারায় তার পেছনের সিটে বসা বুড়িকে দেখিয়ে বলে, ”তালে এর এই দশা হয়?”

    জবাব না দিয়েই রতন প্যাডেলে চাপ মারে, ভাবে কথাটা সত্যি। তবে সেসব এখন না ভাবাই ভালো। ভালো খারাপ সব ভাগ্যের ব্যাপার। তবে সুযোগ কাজে লাগাতে হয়। দুনিয়াতে এত লোকের ভালো তো আর একসঙ্গে হয় না। পালা করে করে হয়। আজ ওর তো কাল আমার। এলাকায় ওর পরে খুলেও কত লোকের দোকান পাকা হয়ে গেল, অথচ ওরটা হল না। কাগজপত্তরে নাকি গন্ডগোল আছে। এবার সে সুযোগ কাজে লাগাবেই লাগাবে। ভোটটা উতরে গেলে হয়তো তারও কপাল ফিরবে। খোদ পৌরসভা ভোটের ক্যান্ডিডেট কথা দিয়েছে। এখন শুধু তার জেতার অপেক্ষা।

    বড়রাস্তার গা বেয়ে ইট বাঁধানো সরু রাস্তার কিছুটা গিয়েই ডানদিকের বাড়ি লক্ষ্য করে বিশে প্যাঁক প্যাঁক আওয়াজ দিতে শুরু করল। বাড়ির ভেতর থেকে পর্দার মতো ঝাঁকড়া লতানো গাছটার ফাঁক দিয়ে এক মহিলা রাস্তার দিকেই তাকিয়ে আছে। বিশে বলল, ”বাড়িতে কেউ আছে?”

    –”কেন?” মহিলা প্রশ্ন করল।

    গামছা দিয়ে শরীরের ঘাম মুছে বিশে ঘোমটা মাথায় তার রিক্সায় বসা বুড়ির দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিতে কিছু একটা বোঝাতে চাইল। কিন্তু বুড়ি নির্বিকার। কানেও খাটো, একবার শুনে কিছু বোঝে না।

    ঘণ্টাখানেক আগে বুড়ির বড় বউ বিশেকে ডেকে সেই যে বুড়িকে তার ঘাড়ে চাপিয়েছে, এখনও সে নামাতে পারেনি।

    বড় মেজো হয়ে এখন ছোট’র বাড়ি। এলাকায় তার খুব নামডাক। পেশায় সরকারি স্কুলের মাস্টার। বকলমে ছাপাখানার ব্যবসা। এবারের পৌরভোটের ক্যান্ডিডেট। পোস্টার ফেস্টুনে তার নামের ছড়াছড়ি। এছাড়া রোজই প্রায় জনসভা। পার্টির নেতারা আসছে বক্তৃতা দিতে। কোনও অঘটন ছাড়া শুভজিৎ ঘোষই যে জিতবে সে কথা এলাকার সবাই একরকম ধরেই নিয়েছে।

    রতন বিশেকে বলল, তুই দাঁড়া এখানে, আমি আসছি। বিশে খৈনি মুখে বিড়বিড় করে, ”যতই চেষ্টা কর, কিছু হবে না। সব এক রক্ত। নইলে দু-দুটো ছেলেই তো বুড়িকে খেদিয়ে দিল। হুঃ, ভদ্দরলোক।”

    বুড়ি বিশের কাঁধে হাত রেখে কী যেন জিজ্ঞেস করতে যাবে এমন সময় রতন ফিরে এল। বলল, ”দাদা বৌদি কেউ নেই বুঝলি। ওদের বউটা বুঝে উঠতে পারছে না কী করবে। এই বোলে সে রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে নিজের রুমাল ঘুরিয়ে হাওয়া খেতে লাগল।

    বিশে ভুরু কুঁচকে এগিয়ে এল রতনের দিকে।

    –”বলেছিলে, বুড়ি যে শুভদা’র মা?”

    –”হ্যাঁরে বাবা, না বলার কী আছে?”

    –”অ, তাও বুঝতে পারছে না? তবে তুমি দাঁড়ায়ে কেন, যাও বাড়ি গিয়ে খেয়ে দেয়ে এস। আমি বরং বুড়িকে নিয়ে রোদ্দুরে দাঁড়ায়ে থাকি।

    রতন আড়চোখে একবার বিশের দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে মোবাইল বার করল। একবার টেপাটেপি করে, আবার কানে দেয়। কাণ্ড দেখে বিশে আর না বলে পারল না, ”ওসব অত গোদা জিনিস না। আগে শিখতে হয়। তুমি বরং ইশকুলে ভত্তি হও। দেখ না বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েরা কেমন পটাপট কথা বলে!”

    সত্যি রতনের টেকনিকটা এখনও শেখা হয়নি পুরোপুরি। ভোট উপলক্ষে শুভদাই ম্যানেজ করে ওটা তুলে দিয়েছে তার হাতে। কখন কী দরকারে লাগে। কিন্তু নাম বার করে ফোন করাটা বেশ ফ্যাচাং–এর কাজ। তবু বিশের টিপ্পনি শুনে মুখ দিয়ে গালাগাল বেরিয়ে যাচ্ছিল রতনের। হঠাৎ হিন্দি গানের আওয়াজ বেরিয়ে এল তার ফোন থেকে। কানে লাগিয়েই উল্টোদিকের লোকটাকে কীসব যেন বোঝাতে লাগল সে।

    বিশে বুড়ির দিকে তাকিয়ে দ্যাখে সিটে বসে ঝিমোচ্ছে। আহা রে, সকাল থেকে পেটেও বোধহয় কিছু পড়েনি। কথার ফাঁকে বিশে জিজ্ঞেস করেছিল কয়েকবার। তো সে খালি বলে ”মনে নেই বাবা। একটু চা খেলে হত। বিশে একটা চায়ের দোকান থেকে চা আর বিস্কুট কিনে খাইয়েছে একবার। নিজেও খেয়েছে। কিন্তু সকাল থেকে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করল, তাতে মানুষ হিসেবে তারও লজ্জা। মনে মনেই ছ্যা ছ্যা করেছে। সেই সঙ্গে এও ঠিক করে ফেলেছে যে, বুড়ির ছোট ছেলে যদি না নেয় তবে সে–ই নিয়ে যাবে বুড়িকে তার ডেরায়। কথাটা রতনকেও জানিয়ে দেবে।

    কিন্তু রতনের কথা আর শেষই হয় না। নিশ্চয়ই সে তার নেতাকে বোঝাচ্ছে, মা’কে এখন না রাখলে ভোট ঝাড় হয়ে যাবে।

    বোঝ ঠ্যালা! যে লোক সারাদিন বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছে তাকেও কত কী বোঝাতে হয়!

    বুড়ির দিকে তাকিয়ে বিশে বলল, ”মাগো, যাবে নাকি তোমার এই ছেলের বাড়ি? চল, চল আর দাঁড়িয়ে কাজ নেই। জন্ম দিয়েছিলে বটে।”

    বুড়ি কী বুঝল কে জানে। তাঁর দৃষ্টি তখন রিক্সার হ্যাণ্ডেলের রডে, যেখানে দুটো ফড়িং বসে ফড়ফড় করছে।

    এতক্ষনে রতন ঘুরে এল। প্রথমেই বিশেকে উদ্দেশ্য করে বলল, ”নামা নামা, বুড়িকে নামা” বলেই সে গেটে দাঁড়িয়ে সেই মহিলাকে ডেকে নিজের মোবাইলটা এগিয়ে দিল। মহিলা বুঝতে না পেরে দাঁড়িয়ে আছে দেখে রতন বলল, ”ধর ধর, দাদা কথা বলবে।” শেষে কানে লাগিয়ে হুঁ হা করে গেল কিছুক্ষন, তারপর গেটের তালা খুলে দিল বুড়িকে নিয়ে আসার জন্য। রতন বিশে দুজনে মিলে বুড়িকে ধরে ঢুকিয়ে দেয় বাড়ির ভেতর।

    বিশে রতনকে বলল, ”এবার ভাড়াটা কে দেবে বল তো! নাকি মাগনা গেল?” রতন সে কথার উত্তর না দিয়ে চোখে চোখ রেখে বিশেকে সাবধান করে, ”তুই ব্যাপারটা আবার পাঁচকান করিস না যেন।”

    –”কোন ব্যাপারটা?”

    –”আরে এই যে, শুভদা’র মা’কে রাখা নিয়ে সেই থেকে চক্কর খেলি।”

    ইঙ্গিতটা বুঝে বিশে একটা ফোচকে হাসি ছাড়ল। রতন তাকে চেনে, ভালোমন্দ বলতে কাউকে রেয়াত করে না ব্যাটা।

    –”তোর ভাড়া আমি পাইয়ে দেব।” রতন বলল।

    বাঁ হাতে নাক ঝেড়ে বিশে ঘেন্নার সুরেই বলে ওঠে, ”যাও যাও, ও পয়সা আমি ছেড়ে দিলুম।”

    –”ছেড়ে দিবি কেন বোকা। বড় লোকের পয়সা ছাড়তে আছে? বরং সুযোগ বুঝে বেশি বেশি করে নিতে হয়।”

    বিশে ভুঁরু দুটো এক করে রতনকে একবার আগাপাস্তলা দেখে তার রিক্সায় উঠে পড়ে। অকারণেই দু’বার প্যাঁক প্যাঁক আওয়াজ দিয়ে এগিয়ে যায় রাস্তার দিকে।

    আজ দিনকয়েক হয়ে গেল বিশের দেখা নেই। রতনের চায়ের দোকানের উল্টোদিকেই এতদিন রিক্সা লাগাতো সে। চার রাস্তার মোড় বলে এটাই রিক্সাওয়ালাদের ঘাঁটি। শুভদা’র সঙ্গে কথা হয়ে গেছে রতনের। ভাড়াটা যেন বিশে নিজে হাতেই নিতে আসে তার কাছে। ভোটের সময় ওর রিক্সাটাও ভাড়া লাগবে বলেছে। কথাটা মনে পড়তেই উল্টোদিকের রিক্সাস্ট্যান্ডের দিকে একবার হাঁক পাড়ল রতন।

    –”অ্যাই মুনিয়া, বিশে কোথায় রে?”

    মুনিয়া ঠোঁট উল্টে হাতের মুদ্রায় বোঝাল, সে জানে না।

    রতন তার চায়ের দোকানে বসা আরও দু’জন রিক্সাওয়ালকে জিজ্ঞেস করল, ”তোরা জানিস?” তারাও ঘাড় নাড়ে।

    ভোটের দামামা এখন তুঙ্গে। যুযুধান দু’পক্ষেরই কাদা ছোড়াছুড়ি চলছে জোর কদমে। দু’পক্ষই ওঁত পেতে আছে হাতেগরম কেলোর খোঁজে। এর স্কুল তহবিল তো ওর পারিবারিক ব্যবসায় অন্যদের ফাঁকি দেওয়ার কুকীর্তি। দেওয়ালে দেওয়ালে ছড়া–ছবির বহর দেখে কাপড়ে কিংবা রুমালে মুখ ঢেকে হাসছে ভোটদাতারা। ঘণ্টায় ঘণ্টায় মিছিল আর স্ট্রিট কর্নারের আয়োজন। এলাকায় নিরপেক্ষ মান্য গণ্য লোকদের নিয়ে কাড়াকাড়ি, কে কার হয়ে দুটো বাক্য ব্যয় করবে। রতনের ভার পড়েছে বিরোধী মঞ্চের বক্তব্য শুনে এসে তার শুভদা’কে জানানো। সেই মতো উত্তর সাজিয়ে জবাব দেওয়া যাবে। সেই সঙ্গে চলছে শেষ মুহূর্তে আস্তিনের তলায় গোটানো শেল ফাটানোর ফন্দিফিকির। এ অবস্থায় শুভদা–ও রতনকে একবার বিশের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। রতনও সময় করে ছুটল বিশের ডেরায়।

    একে তাকে জিজ্ঞেস করে তার ডেরায় পৌঁছে দেখা গেল, এই গরমেও কাঁথা গায়ে বিশে মেঝের বিছানায় শুয়ে আছে। পাশে দুটো ওষুধের স্ট্রিপ আর এক ঘটি জল।

    –”বিশে, আ্যাই বিশে।” রতন ডাকল।

    প্রথম ডাকে সাড়া পাওয়া গেল না। কপালে হাত দিতেই ছ্যাঁকা লাগল হাতে। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়বার ডাকতেই চোখ খুলল সে।

    রতন ভেবে পাচ্ছিল না কী বলে শুরু করবে। বলল, ”কবে জ্বর হল?”

    বিশে উঠে বসতে গিয়েও গড়িয়ে পড়ল বিছানায়।

    –”ডাক্তার দেখিয়েছিস?” রতন জিজ্ঞেস করল।

    –”কে নিয়ে যাবে বলো। পাশের দোকানের ছেলেটা দুটো বড়ি এনে দিল, তাই খাচ্ছি। শরীরটা বড় কমজোরি হয়ে গেল গো।”

    –”চিন্তা করিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে। এই বলে রতন তার মোবাইল থেকে ফোন করে বলল, ”বিশে’র খুব জ্বর শুভদা, ওকে একটু ডাক্তার দেখানো দরকার।”

    ওপাশ থেকে একটা খিঁচুনি মার্কা আওয়াজ ভেসে এল। সেই সঙ্গে নির্দেশ– ”এখন ওসব বাড়াবাড়ি করতে হবে না। ভোটের পর দেখব’খন। তুই তোর নিজের কাজ নিয়ে মাথা ঘামা।”

    বিশে আবার এলিয়ে পড়েছে। বেচারার চোখদুটো খুলে রাখার মতো জোরটুকুও নেই। কাঁথাটা ভালো করে বিশের গায়ে জড়িয়ে রতন বাইরে এসে দাঁড়ায়। কী করবে ভাবতে ভাবতেই ডাক্তারখানার দিকে পা বাড়ায় সে।

    শুধু ওষুধ না, লুকিয়ে নিজের বাড়ি থেকে মাঝেমাঝে পথ্যও দিয়ে আসে বিশের ডেরায়। কৃতজ্ঞতায় বিশে রতনকে জিজ্ঞেস করে, ”তুমি আমার জন্য এত কেন করছ রতনদা?”

    –”দেখলাম, তুই আমি দুজনেই এক দলের বুঝলি? ওরাই আলাদা।”

    –”ওরা মানে?”

    রতন মুখটা নীচু করে বলে, ”তোর অত জেনে কাজ নেই।”

    রুগ্ন শরীরে বিশে ঠোঁটটা ফাঁক করে একটু হাসে। বলে, ”জানো রতনদা, যেদিন ওই বুড়িমাকে তোমার নেতার বাড়ি রেখে এলাম, সেদিন থেকেই আমার জ্বর। স্বপ্ন দেখলাম, আমার বউটাও যেন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে। কেন যে ঘুরছে, বুঝলাম না। ঘুমটা ভেঙে গেল। শুয়ে শুয়ে ভীষণ কান্না পাচ্ছিল জানো।”

    কথা বলতে বলতে একটু দম নিল সে। তারপর যেন নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলতে লাগল।

    –”আমার ছেলে দুটোও যদি ওরকম হয়? ওদের মা সারাদিন ওদের জন্য খাটে, আমি দুটো কাঁচা পয়সার জন্য এখানে এসে পড়ে আছি। এই তো সামান্য জ্বরেই মনে হচ্ছে, মরে যেতেও পারি। ছেলেরা না দেখলে ওকে আর কে দেখবে বলো! তোমার পড়াশুনো জানা নেতারাই যদি পারে।” এই বলে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ”বিশ্বাস করো, কদিন ধরে শুয়ে শুয়ে শুধু এসব কথাই ভেবে যাচ্ছি। আমার নিজের মা সেই ছোটবেলায় চলে গেছে, মুখটাও মনে নেই।” এই বলে সে আবার একটা দম নেয়। তারপর রতনের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করে, ”হ্যাঁ গো, সেই বুড়িমা কেমন আছে গো?”

    –”তুই এবার এসব চিন্তা বাদ দে। সুস্থ হয়ে ওঠ। কাজকম্ম করে বাড়িতে টাকাপয়সা পাঠাতে হবে তো!” এই বলে রতন উঠে দাঁড়ায়। দরজার দিকে এগোতেই বিশে জিজ্ঞেস করে, ”তোমাদের ভোটের কী খবর, রতনদা!”

    –”আবার কী শালা, শুধু এর ওর নামে বদনাম।”

    –”বুড়িমার খবরটাও বেরিয়েছে নাকি?”

    –”কেন তুই কাউকে বলেছিস?” রতন পাল্টা বলে।

    –”বলব কী শালা, শরীরটাই তো গেল বিগড়ে। তুমি কিন্তু একবার বুড়ির খোঁজ নিও রতনদা।”

    –”খোঁজ নিয়ে কী হবে? ভাগের মা যেমন থাকার তেমনই আছে। তুই বরং তাড়াতাড়ি সেরে ওঠ, ভোটের পর আবার হয়তো তোর বুড়িমা’কে নিয়ে এ–বাড়ি ও–বাড়ি করতে হবে।”

    রতনের কথা শুনে ওই দুর্বল শরীরেও বিশে না হেসে পারে না। হাসতে হাসতে তার দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়।

    রতন কুঁজো থেকে এক গ্লাস জল গড়িয়ে বিশে’র দিকে বাড়ায়।

    ধীরে ধীরে জল খেয়ে সে একটু জিরিয়ে নেয়, তারপর হঠাৎই রতনকে প্রশ্ন ছুড়ে বলে, ”আচ্ছা, তুমি তো তোমার নেতাকেই ভোট দেবে, না রতনদা?”

    রতন অপ্রস্তুত। বলে, ”দেখি এখনও স্থির করিনি।”

    সেই মুহূর্তে বিশে’র শানিত দৃষ্টি রতনকে ফালা ফালা করে দেয়। রতন বুঝতে পারে আরও কিছু প্রশ্ন ধেয়ে আসবে তার দিকে। তাই না দাঁড়িয়ে সে বেরিয়ে পড়ে তড়িঘড়ি।

    আকাশ জুড়ে জলভরা মেঘ। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢালবে। হঠাৎ হাওয়ার ঝাপটায় সবকিছু এলোমেলো। ধুলোর কুণ্ডলী পাক খাচ্ছে বাতাসে। মচমচ করছে গাছের ডাল। ঠেকনা দেওয়া বাঁশের কঞ্চি খুলে ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অস্থায়ী দোকানগুলোর। এদিক ওদিক থেকে ছুটে আসছে টুকরো টাকরা জিনিস। পড়িমড়ি করে লোক ছুটছে ডাঁয়ে বাঁয়ে। হাওয়ার দাপটে দড়ি বাঁধা ফেস্টুন ছিঁড়ে গড়াচ্ছে মাটিতে। রতনের পায়ের কাছে হঠাৎই বাসা সমেত ডাল থেকে খসে পড়ল দু–দুটো পাখির ছানা। সে তুলে নিল হাতে। ছানা দুটো চোখ বড় বড় করে চেয়ে আছে তার দিকে। আহা রে, বাঁচতে চায়! রতন ওদের দু’হাতের তালুতে ধরে এগোতে গিয়ে দ্যাখে, তার পায়ের তলায় একটা নতুন কাপড়ের ব্যানার হাওয়ায় লাট খাচ্ছে। তাতে লেখা জনদরদী ও সমাজসেবী শুভজিৎ ঘোষকে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত করুন। কোনওকিছু না ভেবেই ব্যানারটা মাড়িয়ে সে হনহন করে এগোতে লাগলো নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে।

    আজই প্রচারের শেষদিন। সব পক্ষই কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে ময়দানে। বিরোধী পক্ষের মঞ্চ বাঁধা হয়েছে স্কুলমাঠে। রতনও ঠিক সময় হাজির। তার কাজ দূর থেকে বিরোধীদের বক্তব্য শুনে শুভদা’কে জানানো। নেতার নির্দেশ– শেষবেলায় ওদের সব কুৎসার জবাব দিতে হবে। কিন্তু কী কারণে যেন রতন একটু অন্যমনস্ক, ছটফটে।

    হ্যাঁ হ্যাঁ, ওই তো বিশেকে কজন মিলে গার্ড করে নিয়ে আসছে। বেচারা দুজনের কাঁধে হাত রেখে পা ঘষে ঘষে এগোচ্ছে স্টেজের দিকে। হাতের বিড়ি ফেলে রতন গাছের পেছনে গা ঢাকা দেয়। ওদের নেতা বিশে’র দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। দৃশ্যটা দেখে রতনের যেমন মজা হয়, তেমনই একটা চাপা ভয় চাগাড় দেয় মনে। তলে তলে কার খেলায় আজকের এই নাটক টের পাবে না তো শুভদা?

    চিত্রকর : মৃণাল শীল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More