সোমবার, অক্টোবর ২১

ভবিতব্য

বিপ্লবকুমার ঘোষ

ঝমঝম শব্দে নদী পেরিয়ে চলে গেল নর্থবেঙ্গল এক্সপ্রেস। প্রতিদিন এই সময়ে ঘুম ভাঙে শিউলির। ভোরের আলো না ফুটলেও দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে সে। গুটি-গুটি পায়ে এগোয়। পুরনো বট গাছে পাখিদের কিচির-মিচির বহুদূর থেকেও শোনা যায়। তারই মধ্যে বেজে ওঠে নদীর কোল-ঘেঁষা সাধুর মন্দিরের কাঁসর ঘণ্টা।

বাড়ির বাগানের শেষ মাথায় সেই কবেকার শিউলি গাছ। অসময়েও ফুল ফোটে। শীতে নাকি শিউলি ফোটে না। কিন্তু অবাক কাণ্ড, টুপ-টুপ করে ঝরে পড়ছে শিউলি! চারদিকে ম ম করছে তার গন্ধ। বুড়ো গাছ। বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছে কিন্তু মরে যায়নি।

শিউলি আঁচল পেতে তুলে নেয় সব ফুল। পৌঁছে দেয় সাধুর মন্দিরে। এটাই এখন ওর প্রতিদিনের নিয়মে দাঁড়িয়েছে।

“শিলু, তুই ফিরেছিস?” মা হাঁক পাড়েন ঘুম থেকে উঠেই। হাঁটাচলার ক্ষমতা নেই। বাতে পঙ্গু।

“একটু দাঁড়াও, তোমায় গরম জল দিচ্ছি।” শিউলি হাত চালায়। সেই ফাঁকে উঠোনের তুলসিতলায় জল ছিটোয়। এই গাছ আর শিউলির বেড়ে ওঠা যেন একই সঙ্গে। উঠোনের মাঝখানে শিউলির বাবা অবনীবাবু এই গাছ এনে পুঁতেছিলেন যখন ওর বয়স ছয় কি সাত। শিউলির অসুখ ছাড়ত না। কিছু না কিছু লেগেই থাকত। বাড়িতে খঞ্জনি বাজিয়ে গান গাইতে আসত মাল্লাগুড়ির সনাতন খ্যাপা। সে-ই বলেছিল “বাড়িতে তুলসি গাছ লাগা। মেয়েটা বাঁচবে।” অবনীবাবু আর দেরি না করে দেশবন্ধুপাড়া থেকে নিয়ে এসেছিলেন এই তুলসি চারা।

সেই গাছ আজও মরেনি। এই গাছ আজও অবনীবাবুর স্মৃতি। তিনি যখন মারা গেলেন তখন তাঁকে এই তুলসিতলাতেই ফুল চন্দন দিয়ে সাজানো হয়েছিল। অবাক কাণ্ড, সেদিনও বাড়ির শিউলি গাছে ফুটেছিল অসংখ্য ফুল!

আজ কতদিন বাদেও শিউলির সঙ্গে ওই দুই গাছের কী গভীর বন্ধুত্ব! স্মৃতিও। উত্তরের ঘরে যে দিন গভীর রাতে শিউলি জন্মেছিল, সে দিন অবনীবাবু ওই গাছের নীচে রাত কাটিয়েছিলেন। সু-সংবাদটি পাওয়ার আগেই তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ভাগ্নে ভেলু যখন ডাকতে এসেছিলেন তখনই অবনীবাবুর চোখে মুখে এমনকি গোটা শরীরে ঝরে পড়েছিল অসংখ্য শিউলি। তখনই তিনি মেয়ের নাম দিয়েছিলেন ‘শিউলি’।

শিউলি বড় হল। ফ্রক পড়ল। “বাবা আমি এই গ্রামে পড়াশোনা করব না। আমাকে শিলিগুড়ির স্কুলে ভর্তি করিয়ে দাও।”

মেয়ের জেদ। বাবার প্রশ্রয়। হাজারও অসুবিধে পেরিয়ে মেয়েকে নিয়ে তিনি চললেন ওই স্কুলে। কখনও সাইকেলে, কখনও রিক্সায়। যাতায়াতে বড্ড কষ্ট। দূরত্ব তো কম নয়।  দুটো নদী পেরিয়ে তবে না শহরে যাওয়া। জোড়াপানি আর ফুলেশ্বরী। এমনিতে নদী খুবই শান্ত। কিন্তু বর্ষায় কয়েক মাস এই দুই নদীই খুবই ভয়ঙ্কর। মাঝে মধ্যেই ভাসিয়ে দেয় গ্রামের নিচু এলাকাও। ঝুপড়ির কেউ কেউ মারাও পড়ে। শিউলিকে বড় স্কুলে ভর্তি করার প্রথম বছরেই ঘটে গেল সেই অঘটন। পাহাড়ি ড্যাম ভেঙে বর্ষার শুরুতেই তিস্তা ফুলে ফেঁপে উঠল। নিজে সব জল ধরতে না পেরে ঠেলে দিল জোড়াপানি আর ফুলেশ্বরীকে।

দুই নদীর কাঠের সেতু জলের তোড়ে কোথায় ভেসে গেল কে জানে। শিউলির স্কুলে যাওয়া বন্ধ হল। বাড়িতে কাক–চিল  বসতে পারছিল না শিউলির মা রমাদেবীর চিৎকারে।

“গ্রামের স্কুল পছন্দ হল না। মেয়ের মাথা চিবিয়ে খেল বাবা নিজেই।” হারবার পাত্র নন অবনীবাবু। তিনিও হুঙ্কার মারলেন, “চল মা, তোকে জলপাগুড়ির হস্টেলে রেখে আরও বড় স্কুলে পড়াব।”

স্কুল, শৈশব দুটোই উতরেছে শিউলির হস্টেল জীবনে। বাবা-মাকে ছেড়ে বাইরে থাকতে প্রথমদিকে মনকে বেশ নাড়া দিত। অজান্তে চোখের জল ফেলত। কিন্তু বেশিদিন নয়।   সেনবাবুদের সংসারে পা রেখে সে যেন অনেক দুঃখই ভুলে গেল। ওই বাড়ির একমাত্র ছেলে আকাশ। এক ক্লাস উঁচুতে পড়ত শিউলির থেকে। স্কুল ছুটির পর শিউলি নিয়মিত বিকেলে ওই আকাশের সঙ্গেই কাটাত। পড়তে বসত। কখনও-কখনও ছড়া কবিতা লিখত, গান শুনত, গান গাইত। প্রতিমাসে স্কুলের বিতর্ক সভায় নাম লিখিয়ে প্রাইজ জিতে আনত। এ যেন এক অন্য জীবন, অন্য জগৎ।

জীতেন্দ্রমোহন সেন। অবনীবাবুর বাল্যবন্ধু। ওপার বাংলায় শৈশব কাটিয়েছেন একই স্কুলে। দেশভাগের পর ছিটকে গিয়েছিল ওই দুই পরিবার। দীর্ঘকাল বাদে আবারও দেখা। অন্তরঙ্গ মেলামেশা। সব হারানোর পরেও নতুন করে খুঁজে পাওয়া।

ওই বাড়িতেই শিউলি খুঁজে পেল নিজেকে। প্রায়ই বিকেলে আকাশের সঙ্গে সে চলে যেত তিস্তার চরে। ক্লাসে বসে লুকিয়ে যে কবিতা লিখত তা পড়ে শোনাত একজন আর একজনকে। খুনসুটিও করত। পড়ন্ত বিকেলে তিস্তা বইত। ঝাঁক-ঝাঁক টিয়া ফিরে আসত দূরের শালবনে। শিউলিকে টিয়ার ঝাঁক গুনতে বলে আকাশ বড় বোল্ডার ছুড়ে মারত জলে। জল ছিটকে শিউলির সর্বাঙ্গ ভিজে যেত। দৌড়ে পালাত আকাশ। পেছনে তাড়া করত শিউলি।

ফুলের নেশায় শিউলি ছিল পাগল। রঙ-বেরঙের পাহাড়ি ফুল ওকে ভীষণ টানত। এই নেশাতেই ওরা দুজনে একবার খুবই বিপদে পড়েছিল।

 

মোহিতনগরে ফুলের মেলা বসেছে। প্রতিবারই বসে। স্কুলের দারোয়ান ছেত্রী বাহাদুর হঠাৎ মারা যাওয়াতে স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছিল। বাড়ির কাউকে না জানিয়ে হলদিবাড়ি নিউ জলপাইগুড়ি প্যাসেঞ্জার ট্রেনে চেপে রওনা হয় দুজনে। সেখানে পৌঁছে ফুলের মেলায় হারিয়ে যায় আবেগে, আনন্দে।

সব আনন্দই যেন নিমেষে উবে গেল মোহিতনগর স্টেশনে পা রাখতেই। আমবাড়ির কাছে স্টিম ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেছে। বিকেলের ট্রেন বাতিল। তাহলে ওরা বাড়ি ফিরবে কী করে?

অসহায় দুই কিশোর-কিশোরী। কী করবে এবার? ছুটে যায় ন্যাশনাল হাইওয়ের দিকে। সেখানে পৌছেই দেখতে পেল বড় একটা লরি গাদা-গাদা লোক তুলছে তাতে। যাবে হলদিবাড়ির হাটে। কোনওরকমে দুজনেই উঠে পড়ল সেই লরিতে। একদিকে হাঁস-ছাগল-মুরগি। অন্যদিকে একগাদা মানুষ। শিউলি প্রায় গুটিয়ে যায় আকাশের শরীরে। বাড়ন্ত শরীর। এই প্রথম এক চাদরে মুড়ি দিয়ে নির্ভরতার আশ্রয় খোঁজে শিউলি। তার নিশ্বাস ঠেকছে আকাশের বুকে। উত্তেজনা ও নির্ভরতার।

“শিলু। তুই কোথায়? আজ কী হল তোর? আমায় ওষুধ দিলি না তো?” দূরে কুয়াশায় ঘেরা অস্পষ্ট মালগাড়ির সান্টিং দেখছিল শিউলি। মন চলে গিয়েছিল দূরে, অনেক দূরে। ঘোর কাটল মায়ের ডাকে।

যদুনাথ কবিরাজের ওষুধ খান রমাদেবী প্রতিদিন ঠিক এই সময়ে। শিউলির দেওয়া ওষুধ খেয়ে তিনি বারান্দার ইজিচেয়ারে এসে ঘণ্টাখানেক বসেন। রাস্তার লোক দেখতে ভালবাসেন। সারাদিনের সাংসারিক কথাবার্তা এখানে বসেই করে থাকেন। সাউডাঙি-ভুটকি হাটের দিকে অবনীবাবু এক সময় কিছু চাষের জমি কিনেছিলেন। এখনও সেখানে বারো মাস চাষ করে তসলিম। এই মুসলিম পরিবারটি কোনওদিন অবনীবাবুর কাছে তাদের ঋণ ভুলতে পারেনি। তসলিমের স্ত্রী ফতিমাকে নিজের বাড়িতে এনে ডাক্তার-কবিরাজ দেখিয়ে ৬ মাসে সম্পূর্ণ সুস্থ করে দিয়েছিলেন অবনীবাবু। রক্তাল্পতায় প্রায় মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েছিল ফতিমা। অবনীবাবু মারা গেলেও তসলিম ওই জমিতে চাষ করে নিয়মিত ফসল পাঠায় বাড়িতে। এমনকী অল্প হলেও সর্ষে শাকটুকুও।

চায়ের কাপ হাতে উঠোনে পা দিতেই শিউলির নজরে পড়ল সেই তসলিম এসে বসেছে রমাদেবীর পায়ের কাছে। টুকিটাকি কথা। ওই দেখে শিউলি আরও এক কাপ চা বেশি বানিয়ে নেয় তসলিমের জন্য। গায়ে শাল জড়ানো। কিন্তু তসলিম এই দামি শালটা কোথা থেকে পেল? ওকে জিজ্ঞাসা করতেই ফিরে তাকাল শিউলির দিকে। চোখে একরাশ বিস্ময়।

“ক্যানে বিটি, তোর সাদিতে বাবু তো হমাকে ইটা দিয়েছিলেক।” হাতে ধরা চা ছলকে পড়ল শিউলির শাড়িতে। এক দৌড়ে ঘরে। শাড়িতে চা ছলকে পড়া নয়, দু চোখে আছড়ে পড়ে বাঁধভাঙা জলের ঢেউ। স্বপ্নভাঙার ঢেউ।

কলেজে তখন  ফাইনাল পরীক্ষার প্রস্তুতি। রাত জেগে পড়া। আকাশ চলে যাচ্ছে ব্যাঙ্গালোর। ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। তার যাবতীয় খাতা বই নোট সব শিউলির হেফাজতে। আকাশের ইচ্ছে, সে হবে একজন বড় ইঞ্জিনিয়ার। শিউলি হবে ডাক্তার।

এমনই সময় অবনীবাবু হাজির হলেন হস্টেলে। মেয়েকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। তড়িঘড়ি বাড়ি ফিরল শিউলি।

স্বপ্নের তরি ডুবল মাঝ সমুদ্রে। অবনীবাবুর রূঢ় জেদে শিউলির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল শুকিয়ে যাওয়া ফুলের মতো।

“এমন ভালো পাত্র হাতছাড়া করলে কপাল পুড়বে তোর। আমারও” চোখে মুখে প্রশান্তির হাসি অবনীবাবুর। “তোর সুখ-ই তো আমার সুখ পাগলি”, বুকে জড়িয়ে ধরলেন মেয়েকে।

কোনও বাধা বাঁধতে পারেনি অনবীবাবুকে। আকাশের স্মৃতি, ছবি, কবিতা, গল্পের পাণ্ডুলিপি মায়ের গোপন বাক্সে রেখে শিউলি চলে গেল বালুরঘাটে। শ্বশুরবাড়িতে। সংসার পাততে। নতুন জীবনে পা দিতে। প্রচুর সম্পত্তির ‘রানি’ হতে।

কিছুদিনের মধ্যেই ভেঙে গেল অবনীবাবুর স্বপ্ন, মেয়ের সুখ। কারণ নিঃসঙ্গ শিউলির কয়েকটি গোপন চিঠিতে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল অবনীবাবুর সব স্বপ্ন। “……মা, অনীশ শারীরিক প্রতিবন্ধী। বিয়ে হলেও আজও আমি কুমারী রয়ে গেলাম। এখানে শুধুই কল্পনা আর স্বপ্ন। নেই সুখ। অনীশ বেপরোয়া। টাকার পিছনে ছুটছে দিনরাত। নদীতে বোল্ডারের বাঁধ দিতে যত বোল্ডার লাগবে তার এক আনাও নদীতে পৌঁছোয় না। তার আগেই সব গায়েব। এখানকার সাহেবগুলো সত্যিই বোকা। লরির সব বোল্ডারগুলো নাকি জলে ভেসে যায়। অনীশের সব কথা কেমন সরলভাবে বিশ্বাস করে সাহেবরা। ….. রাতে অনীশ বাড়ি ফেরে না। ও দিনে একরকম। রাতে অন্য গ্রহের মানুষ।”

জীবন যুদ্ধে পিছিয়ে পড়লেন অবনীবাবু। প্রদীপের তেল কমতে থাকে। ভোররাতে ঘুমের ঘোরেই মারা গেলেন। এমন ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই শিউলির জীবনে নেমে এল আরও এক ঘোর অমাবস্যা। কালচিনি নদীতে  সকালে ভাসছিল অনীশের নিস্প্রাণ দেহ। দুটি মৃত্যু, বদলে যায় এক নারীর জীবন।

 

ফিরতে হল বাপের ভিটেতে। শীতের মেঠো রোদে শিউলি হাঁটছে। আজ হাঁটতে ওর খারাপ লাগছে না। ফুলবাড়ি যাওয়ার বড় রাস্তা ধরে চলে এসেছে সাউথ কলোনির দিকে। কতদিন এ পথ ও মাড়ায়নি। একটু এগোতেই থমকে দাঁড়াল শিউলি। যাযাবরীদের হাট বসেছে যেন ফাঁকা মাঠে। ছোট ছোট তাঁবু। শীতের দু’মাস এখানে থাকবে। তারপর আবারও অজানা পথে পাড়ি  দেবে ওরা। আজব জীবন। পুরুষরা ঘর সামলায়। মহিলারা রোজগার করে। গ্রামের আনাচে-কানাচে মাটির গন্ধ শুঁকে সাপ ধরে। শীতের হাওয়া গায়ে লাগতেই পাহাড়ি কেউটেগুলো নরম মাটির নিরাপদ ডেরায় নিজেকে লুকোয়। হাতে ছোট্ট শাবল। বাঁ হাতের কবজিতে গুটি কয়েক শিকড়-বাকড়। তেজি কেউটেও কেমন নিস্তেজ হয়ে যায় ওই শিকড়ের গন্ধে।

কম বয়সি এক যাবাবরী মহিলাই শিউলিকে দেখতে পেয়ে তাদের তাঁবুতে ডেকে আনে। তিন-তিনটে ছোট বাচ্চা তাকে দেখতে পেয়ে ছুটে এল। শিউলি হাঁ করে দেখছিল ওদের। চতুর্থ সন্তানও আসন্ন মনে হল ওই গাট্টা-গোট্টা মহিলার চেহারা দেখে। হাতে পেঁচানো বিষাক্ত লাল-কালচে পাহাড়ি কেউটেকে বাক্সবন্দি করে গল্প জুড়ে দিল শিউলির সঙ্গে। কী অমায়িক, কী আতিথেয়তা! ততক্ষণে সূর্য পশ্চিমে ঢলছে। অনেকটা পথ। শিউলি পা চালায় বাড়ির পথে। বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি তখনও। ওই যাযাবরী মহিলা কীভাবে গড়গড় করে বলে দিল শিউলির সব গোপন কথা? ওরা কপাল দেখে মানুষের ভাগ্য বলে দিতে পারে নাকি?

জন্ম থেকে এই তিরিশ বছরের দোরগোড়া। এর পর যা ঘটবে তাও। এমন হয় নাকি কখনও? অবাক তাই প্রতিক্ষণে।

কিন্তু যাই হোক, আজ শিউলির প্রাণ খুলে হাসতে ইচ্ছে করছে। গান গাইতে ইচ্ছে করছে। বারবার মনে পড়ছে যাযাবরী মহিলার ছোট্ট ভবিষ্যৎবাণীটি। ওদের ভাষা সব বুঝতে না পারলেও শিউলির কানের কাছে মুখ এনে শুনিয়ে দিয়েছে এমন কথা যা শুনে সে চমকে ওঠে। আনন্দে জড়িয়ে ধরে ওই মহিলাকে। ‘ধ্যুৎ এমন হয় নাকি?’ মাটির আলপথে হোঁচট খায় শিউলি। “শিলু, তুই বাড়ি ফিরলি?” পথ চেয়ে আছেন রমাদেবী।

“তুই কোথায় চলে গেলি আমায় না বলে? আজ দুপুরে তোর সেন জেঠিমা এসেছিলেন। তোকে কত খুঁজলেন।”

“কে?” কেঁপে উঠল শিউলি।

“ওদের দুঃখের অবসান এবার বোধহয় ঘুচল। দীর্ঘদিন নিরুদ্দেশ হলেও আকাশের খোঁজ মিলেছে। ও নিজেই চিঠি দিয়েছে। ও তোর কথা জানতে চেয়েছে।”

শিউলিকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন রমাদেবী। কেঁদে ফেললেন তিনি। না, শিউলি কিন্তু একটুও কাঁদল না। একটি কথাও বলল না। পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। সারাদিন যেন বোবা হয়েই রইল।

সারারাত ঘুম এল না তার চোখে।

খুব ভোরে ঝমঝম শব্দে নদী পেরোল নর্থবেঙ্গল এক্সপ্রেস। দরজা খুলে বেরিয়ে এল প্রতিদিনের মতো। শিউলি গাছের তলে। ঘুম ভেঙে শুধু পাখিরাই চিৎকার করছে।

আজ আবার রাশি রাশি ফুল ফুটেছে গাছে। দু’হাতে ফুল তুলে ছড়িয়ে দিল এদিক-সেদিক। চারদিকে। যে দিকে মন চাইল সেদিকেই।

হঠাৎ সে বুড়ো শিউলি গাছটাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল জোরে। বুড়ো শিউলি যেন আশীর্বাদ হয়ে সব ফুল ঝরিয়ে দিল ওর মাথায়।

শিউলির চোখে মুখে, শরীরময় শুধুই ফুল।

শিউলি কাঁদছে তখনও। জীবন কত দ্রুত বদলায়। পাখির কলরব ছাড়িয়ে সেই কান্না তখন অন্য রূপ পেয়েছে। ভোরে ওঠা সূর্যের মোহময়ী রূপে।

এ যেন এক নতুন ভোর।

চিত্রকর: মৃণাল শীল

Comments are closed.