বুধবার, নভেম্বর ২০
TheWall
TheWall

বীজ

রাজেশ কুমার

ঘন জঙ্গল। চোখ ধাঁধানো সবুজ। ওরা হাঁটছিল দু’জনে। মিকার মাথা ছুঁয়েছিল গমড়ুর লোমশ খোলা বুক। হাত দুটো জড়িয়েছিল মেদহীন বলিষ্ঠ শরীর। মিকার কোমরে এক ফালি বাঘ ছাল। এক ফালি উঁচু বুক দুটোতেও। গাছে গাছে পাখির ডাক। শিস দিচ্ছিল গমড়ু। আনন্দের শিস। সে কথা বলে কম। শিস দেয় বেশি। গাছের কাটা গুঁড়ির ভেলা, তার নিজের হাতে তৈ্রি হাওয়াকল সাড়া দেয় সেই সুরে। প্রথম প্রথম পারত না, কিন্তু মিকা এখন বেশ বুঝতে পারে কোনটা আনন্দের, কোনটা দুঃখের। ভারী ভালো লাগে তার। গমড়ুর কাঁধে মাথা রাখে সে। হ্রদ আর নদী। গাছেদের গা ঘেঁষা-ঘেঁষি। জঙ্গলের গন্ধ গমড়ুর শরীরে। বুনো ফুল, ফল, পাতা আর গাছের ছাল। জিভ বুলিয়ে একবার চেটে নেয় মিকা।

হঠাৎ এলোপাথারি আওয়াজ। ঝোপে ঝাড়ে হুস হাস শব্দ। কারা যেন ছুটে আসে। কান খাড়া করে শোনে ওরা। পোকাদের হুটোপাটি। পাতার বোঁটায় মাকড়সার দ্রুত নিজেকে লুকিয়ে ফেলা। ঝিঁ ঝিঁ পোকার থেমে যাওয়া। ওদের চোখে ভয়ের চিহ্ন। এই আওয়াজ দু’জনারই চেনা। দিনের আলো যেমন তেমন, তারা গোনা রাতগুলোও যেন শান্ত ভাবে অপেক্ষা করে থাকতো এরই জন্য। হয়তো দু’জনে জানতও। এক দিন এভাবেই শেষ হয়ে যাবে সমস্ত কিছু। খাবারের সন্ধান পাওয়া পিঁপড়ের মতো সত্যিই ছেঁকে ধরবে ওরা। যে কোনও দিন। যে কোনও সময়। তবুও ভালোবেসেছিল। মিকা আর গমড়ু। পোকা মাকড়, কীট, পতঙ্গ, উইয়ের ঢিপির ওপর ঘুরে ঘুরে। পাছায় লাল পিঁপড়ের কামড় নিয়ে।

গমড়ু নিমেষে টেনে নেয় মিকাকে। একটা বড় গাছের আড়ালে। গোটা দশেক হিংস্র চোখ এগিয়ে আসে ওদের দিকে। নিষ্ঠুর চাউনি। তাকিয়ে থাকে অপলক। ব্যাধ যে ভাবে তাকিয়ে থাকে ফাঁদে পড়া খরগোশের দিকে ঠিক সেই ভাবে। গমড়ু আলতো ছোঁয় মিকাকে। চামড়ার ওপর তিরতির দাগ টানে। বাতাস একটু ভেজা। একেবারে নীরব। কোমর থেকে কুকরি বের করে সে। নীরবতা ভেঙে বলে, ভাগ মিকা ভাগ। মিকা শক্ত হয়ে দাঁড়ায়। গমড়ু ঠেলে দেয় তাকে। দু’জনে চোখ রাখে দু’জনার চোখে। একটা শুঁয়োপোকা গাছের উঁচু ডাল থেকে ঝুলে আবার উঠে যায় সুড়ুৎ করে। কিছু কি বলার ছিল! তন্ন তন্ন করে ভাবে মিকা। গমড়ু তাকায় তার পেটের দিকে। তারপর শিস দেয় সে। বিদায়ের বিষাদ তার সুরে বাজে। গমড়ু দেখে মিকার দ্রুত হেঁটে যাওয়া। মিলিয়ে যাওয়া জঙ্গলের ভেতর। এক সময় ঝাঁপিয়ে পড়ে সেও। পাঁচের বিরুদ্ধে এক। শুরু হয় ঠেকিয়ে রাখার অসম যুদ্ধ।

ছুটতে থাকে মিকা। প্রাণপণ দু’হাতে সরাতে থাকে ঝোপ–ঝাড়, লতাপাতা। যেন সরীসৃপ। হাঁচোড় পাঁচোড় শব্দ তোলে। দু’টো তির সাঁই সাঁই বেরিয়ে যায় কানের পাশ দিয়ে। গমড়ুর শিস ভেসে আসে। ভেসে আসে চিক চিক তীক্ষ্ণ শব্দ। বিষধর সাপেদের। সবাই যেন তার দিকে তাকিয়ে। কিন্তু থামার উপায় নেই মিকার। জেগে উঠেছে তার হৃদপিণ্ড। ধক ধক আওয়াজ বেড়ে চলেছে ক্রমশ। তাছাড়া শুধু সে-ই তো নয়। তার শরীরে গমড়ুর বীজ। রক্ষা করতে হবে তাকেও। দশ মাস দশ দিন।

ছুটতে ছুটতে অনেক দূর চলে আসে সে। যদিও শেষ হয় না জঙ্গল। এমন কি হালকা হওয়ারও দেখা যায় না কোনও লক্ষণ। অনেকক্ষণ পর তার মনে হয় গমড়ুর শিস আর শোনা যাচ্ছে না। আকাশ বাতাস বড় নিশ্চুপ। চারিদিক বড় শান্ত। পেছনে তাড়া করে আসছে না হিংস্র সেই চোখগুলো।

মিকা জঙ্গল চেনে। যেভাবে মানুষ চেনে তার বাচ্চা। যেন অনন্তকাল লালন করে আসছে সে। বড় করে তুলেছে একটু একটু করে। চোখ বন্ধ করেও সে চলে যেতে পারে বহু দূর। গিয়ে দাঁড়াতে পারে ঠিক মাঝখানটাতে। রাতের অন্ধকারেও। এই গাছ পালা, কাদা, নদীর জল, মাছ, পাখি সে চেনে নিজের মতো করে। এ-সবের মালিক সে। এ-সবের সঙ্গেই এতোগুলো দিন চলেছে তার শ্বাস-প্রশ্বাস। জুটেছে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান।

মিকা থামে। অস্থির, ব্যাকুল। গমড়ুর জন্য কষ্ট হয় তার। ভারী হয়ে আসে চোখের পাতা। লোকটা যেভাবে গাছের ডাল চেঁছে ছুলে তির বানায়, মসৃণ করে ঠিক সেভাবেই গড়ে তুলেছে তাকে। শক্তি জুগিয়েছে। জঙ্গলের সৌন্দর্য ঢেলে সাজিয়েছে। এতক্ষণে হয়তো আর কিছুই অবশিষ্ট নেই তার। মাটিতে পড়ে আছে কেটে ফেলা বড় গাছের শরীরের মতো। কাণ্ডে হয়তো ছুঁয়ে আছে অজস্র কুঠারের আঘাত। দখল হয়ে গেছে খেতি-বাড়ি। তাদের কঠোর পরিশ্রমের সমস্ত ফসল।

কাছেই একটা ক্ষীণ নদী। স্বচ্ছ স্ফটিক জল। মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে থাকে সে। হলুদ একটা বাঁশ। ছোট ছোট মাছ। ঠোকর মারে তার পায়ে। জল ছেটকায় সে। চোখে মুখে থাবড়ায়। খানিক তাকিয়ে থাকে। নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে জলে। নীল নির্জন আকাশ। যেন নিঃসঙ্গ এক নারী। সুখের দিন শেষ। দিন শেষ দুঃখেরও।

এ–রকমই ঝিরঝিরে জলে এক দিন ভেসেছিল সেই লোকটা। শরীরটা ডুবেছিল। জেগেছিল শুধু দুটো চোখ। যেন শান্ত কুমির। শীতের রোদ পোহানো নারকেল গাছের শুকনো কোনও ডাল। তখনও মিকা জঙ্গল চিনে উঠতে পারেনি। শেখেনি তির ছোড়া কিংবা নিপুণ দক্ষতায় কুকরি চালনা। ওৎ পেতে থাকা বিপদগুলো অনুভব করতে জানেনি রন্ধ্রে রন্ধ্রে। হাতে গোনা দিন কেটেছে ঠিকই কিন্তু অভ্যস্ত হয়নি গমড়ুর সঙ্গে জংলি জীবন যাপনেও। ফলে সহজেই বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিল সে। চিৎকার করতে পারেনি কিংবা লড়াই। লোকটা পা ধরে টেনেছিল। ডুবন্ত নৌকার মতো হঠাৎ দুলে উঠেছিল তার সমস্ত শরীর। লোকটা তার বড় হয়ে ওঠা অঙ্গটা ঢুকিয়ে দিয়েছিল মিকার দুপায়ের ফাঁকে। ফুসফুস ফাঁকা হয়ে আসছিল তার। যন্ত্রণা হচ্ছিল খুব। ঠিক তখনই ডুব সাঁতারে উঠে এসেছিল গমড়ু। দুরন্ত ক্ষিপ্রতায় কেটে দিয়েছিল লোকটার গলার নলি। বুরবুরি কেটেছিল খুব। তারপর থেমে গেছিল। গরম রক্ত ধীরে ধীরে মিশে গেছিল পাথর ঠান্ডা স্ফটিক জলে। অবাক হয়েছিল মিকা। রক্ত নয়। যেন খুপরিতে লুকিয়ে থাকা গভীর কোনও ষড়যন্ত্র। তারপর সে শিখেছে অনেক কিছু। দেখেছে কুকরি’র ঘা-এ ফিনকি দিয়ে ছুটে আসা রক্ত। খেতি-বাড়ির দখল নিয়ে যুদ্ধ। ধনুকের ছিলা থেকে তিরেদের ছুটে যাওয়া। যাই হোক, গমড়ু সে-দিনই তাকে প্রথম নাম ধরে ডেকেছিল। মিকা! মিকা! জলের ছিটে দিয়েছিল মুখে। প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছিল। সাড়া দিতে পারেনি সে। মানুষটা কাঁধে তুলে শুইয়ে দিয়েছিল বিছানায়। জঙ্গল থেকে এনেছিল তিন চার রকমের গাছের শিকড়। বেটে খাইয়েছিল তাকে।

মৈনাক, মিকার বর, সব কিছু-ই দেখেছিল। সে তির ছুড়তে পারত না। কুকরি চালাতেও না। শিকড় বাকড়ও চিনে উঠতে পারেনি তত দিনে। গাছ গাছালিও না। সে জিগ্যেস করেছিল, ভালো হয়ে যাবে তো! গমড়ু সাড়া দেয়নি। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েছিল অবহেলায়। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। বলেছিল, নতুন লাগানো ভুট্টার চারাগুলোর খেয়াল রাখো। রক্ষক ও মালিকানার আদেশ মেশানো কণ্ঠ। মিকা লক্ষ্য করেছে মৈনাকের কোনও কথার-ই উত্তর দিত না গমড়ু। কেবল আদেশ করত। আর কঠিন চোখে তাকিয়ে থাকত সারা দিন। মৈনাকের কাছে এটা ছিল পথের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া। যেখানে আর কোনও মাইলস্টোন নেই। কোনও বাঁক, কোনও মোড় নেই। নেই কোনও অস্পষ্টতাও। মিকা ওই অবস্থাতেও দেখেছিল। মৈনাকের চোখে তীব্র লাঞ্ছনা। নিজের বউয়ের ওপর আস্তে আস্তে সমস্ত অধিকার হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা।

মৈনাকের চোখ বেয়ে ঝরছিল জল। গড়িয়ে যাচ্ছিল চিবুক ছুঁয়ে বৃষ্টির ফোঁটার মতোই। কিন্তু অপারগ ছিল মিকা। গমড়ু গাছ কেটে ঘর বানিয়েছে। জঙ্গল সাফ করে চাষের জমি। তার কাছে খাবার আছে। অস্ত্র আছে আত্মরক্ষার। হাতের পেশিতে ক্ষমতা আছে। তাই মিকার শরীরের ওপর-ও প্রথম অধিকার তার। বুঝে নিয়েছিল সে। মৈনাক এক সময় বলেছিল, চলো পালাই। সামান্য খাদ্য আর এই দাসত্ব। সহ্য হয় না। মিকা ফিরতে চায়নি। গমড়ুর জড়িয়ে থাকা হাতের ছোঁয়া নিরাপদ লেগেছিল তার। সামান্য খাদ্য! প্রশ্ন করেছিল সে। পেটের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠেছিল একটা অনুভুতি। স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল খাবার না পাওয়ার তীব্র যন্ত্রণা। তার মন ফিরে গেছিল ফেলে আসা সেই দিনগুলোয়। যখন গাড়িটা ঝাঁকুনি তুলে হঠাৎ থেমে গেছিল রাস্তার মাঝে। রিমোট কন্ট্রোল কাজ করছিল না। কল কারখানার চিমনিগুলো নিজে থেকেই বন্ধ করে দিয়েছিল ধোঁয়া উদ্গিরণ।

প্রথমটায় দু-জনেই টের পায়নি কিছু। মৈনাক আর মিকা। ড্রাইভারহীন বিলাসবহুল কার। কালো কাঁচে ঘেরা। বাইরের শব্দ আসে না কিছুই। ভেতরেই আস্ত একটা প্রাসাদ। খাওয়া, শোয়া, আমোদ, প্রমোদ এমনকি সেক্সও। দুজনেই ভুরু কুঁচকে তাকায়। বাইরে তখন শ’য়ে শ’য়ে মানুষ। বউ বাচ্চার হাত। পথে নেমেছে। ছোট্ট শহরটায় যেন মড়ক। সবাই চলেছে ঘর বাড়ি সাংসারিক জিনিসপত্র ফেলে রেখে।

দরজা খুলছিল না। যেন ব্ল্যাক হোল। ভাগ্য বিড়ম্বিত কোনও গ্রহের আকারের একটা গর্ত। ওরা ধাক্কা মারছিল জানালার কাঁচে। বুলেট প্রুফ কালো কাঁচ ভাঙছিল না কিছুতেই। গাড়ির চার কোণ হাত ধরাধরি করে চেপে আসছিল ওদের দিকে। মাঝে মাঝে সরে যাচ্ছিল দূরেও। গাড়িটাকে তখন অনেক বড় লাগত ওদের। ভয় করত। খুঁজে পেত না নিজেদের। মিকা চিৎকার করেছিল, হেলপ হেলপ। কিন্তু ওদের আওয়াজও সেঁধিয়ে যাচ্ছিল গাড়িটার পেটের ভেতর। ঘুরপাক খাচ্ছিল শুধু মাত্র নিজেদের কানেই। খানিক বাদে ক্লান্ত হয়ে থেমে গেছিল সে। কাত হয়ে থাকা সানগ্লাসের মধ্যে বন্ধ ছিল তার চোখ। কিন্তু বাইরেটা দেখছিল সে। যেন ভ্যানিস হয়ে যাওয়া রাজপ্রাসাদ। কেউই দেখতে পাচ্ছিল না ওদের গাড়িটাকে। আবার ধাক্কাও খাচ্ছিল না চলতে চলতে। পুরোটাই নিপুণ ম্যাজিক। অথচ কাল পর্যন্তও রাস্তায় সার বেঁধে দাঁড়িয়েছিল লোকজন। চলতে চলতে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেছিল। কেউ কেউ আলগোছে ঝুঁকেও। যেন ধনীদের খেলনা গাড়ি।

কোনও প্রোগ্রামিংই কাজ করে না ঠিক ঠাক। হ্যাং হয়ে থাকে। হতাশায় মৈনাক ছুড়ে ফেলে হাতের রিমোট। মিকাকে জড়িয়ে ধরে বুকের মধ্যে। কেঁদে ওঠে মিকা।

– প্লিজ মনা কিছু কর। ডু সামথিং। ফর গড সেক।

মৈনাক কিংকর্তব্যবিমূঢ়। জীবনে সে অনেক নক্সা এঁকেছে। প্রোডাকসান বাড়িয়েছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ, শেয়ার বাজারের উত্থান পতনে কনট্রিবিউট করেছে। কিন্তু হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই যান্ত্রিক বিভ্রাটে যে ঠিক কী করা উচিৎ তা সে বুঝে উঠতে পারে না কিছুতেই। থেকে থেকে মাথা দিয়ে গোত্তা মারে। কাঁধ দিয়ে ধাক্কা। কখনও রেগে গিয়ে চিৎকার করে ওঠে। আবার পরক্ষণেই ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে নিজেকে ছেড়ে দেয় গাড়ির সিটে।

দু-এক দিনের মধ্যেই জনশূন্য হয়ে যায় রাস্তাঘাট। ফুরিয়ে যায় গাড়িতে সঞ্চিত খাবারও। হঠাৎ খুট করে শব্দ হয় একটা। প্রায় অচৈতন্য অবস্থায় সেই শব্দ কানের মধ্যে দিয়ে মাথায় পৌঁছায় মিকার। সে ডাকে, মৈনাক! মৈনাক! ঠেলে তোলে তাকে। যেন কোনও মন্ত্রবলে আকস্মিক ফিরে পাওয়া প্রাণ।

দরজার লকটা খুলে গেছিল। কোনও কারণ ছাড়াই। দুজনে তাকিয়েছিল দুজনের দিকে। ওরা বাইরে বেরিয়েছিল। এখনই কিছু খাবার চাই। ‘জল চাই জল’। বাড়ি বাড়ি ঘুরছিল। চিৎকার করে ডাকছিল, কেউ আছেন! কিন্তু সবারই জানালা দরজা উদোম। দেখা মেলে না কারও। পরিত্যক্ত শহর। ফ্রিজ, রান্না ঘর সব ফাঁকা। এমনকি ডাস্টবিন, নর্দমার ধারও। মিকা জিগ্যেস করে, এখন উপায়! মাথা নাড়ে মৈনাক। আকাশে গরমের তেজি সূর্য। ওরা বের হয় খাদ্যের সন্ধানে।

শহর। শহর ঘনিয়ে জঙ্গল। এভাবেই ওরা এসে পৌঁছায় গমড়ুর রাজ্যে। এখানে দিনগুলো লম্বা আর আর্দ্র। সূর্য দেখা যায় না। মাথা তুললে কেবল পাতা চুঁইয়ে আসা রোদের ঝিলিক। চারিদিকে ঝিঁ ঝিঁ ডাকা গাছপালা। মাঝখানে কাঠের তৈরি একখানা ঘর। ঘরের বাইরে গাছ কেটে নেওয়া খানিক জায়গা। সেখানে কালো ছাই। গম আর ভুট্টার চাষ। শরীরে ক্ষমতা ছিল না ওদের। কিছু খাবার পাওয়া যাবে! অনেক কষ্টে জিগ্যেস করেছিল মৈনাক। গমড়ু তাকিয়েছিল মিকার দিকে। একদম স্পষ্ট। সোজাসুজি। মিকা থমকে ছিল সামান্য। মৈনাক সায় দেয় নিঃশব্দে। মিকা পা রেখেছিল গমড়ুর চৌকাঠে। ‘কিন্তু আগে খাবার’। পিছন থেকে শর্ত দিয়েছিল মৈনাক।

সেদিন থেকেই পালটে গেছিল সব কিছু। লোকটা দরজা বন্ধ করেনি। এমনকি মৈনাকের চোখ দুটোও বেঁধে দেয়নি কালো কাপড় দিয়ে। সবটাই ঘটেছিল তার চোখের সামনে। দিনের সাদা আলোয়। প্রথমে আলতো ছুঁয়েছিল গমড়ু। যেন ব্যাথা না লাগে। অনুভব করেছিল মিকার নরম শরীর। অবাক হয়েছিল। তারপর একটা জংলি চুমু। তারও পর আর একটা। মিকার বাদামি স্তন ঘষা খাচ্ছিল তার লোমশ বুকে। হাত বোলাচ্ছিল সে।

অভ্যস্ত হয়ে উঠছিল মৈনাক। দিনের বেলায় ওরা বীজ বুনত। অঙ্কুর বের হলে গোড়ায় জল দিত। গমড়ু পাহারা দিত। সতর্ক চোখে খেয়াল রাখত ওদের ওপর। পাথরে পাথর ঘষে তৈরি করত ধারালো কুঠার। গাছ থেকে পেড়ে আনত ফল। কাঠ চিরে আগুন জ্বালাত। রাতের বেলায় সে ভোগ করত মিকাকে।

মৈনাক গাছ কেটে বর্শা বানিয়েছিল একটা। ওটা রাখা থাকত তার মাথার ভেতর। ঢাকা থাকত কালো পর্দায়। মিকাকে বলেছিল। ‘আমরা দুজন। ও একা। তারপর এই ঘর, খেত খামার সব সব কিছু…’। লোভী বেড়ালের মতো জ্বলে উঠেছিল তার চোখ। মিকা বলেছিল, কিন্তু তারপর! শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করে ফসল ঘরে তোলা! উত্তর দিতে পারেনি মৈনাক। মিকা চোখ তুলে তাকিয়েছিল।

– একদম নয়। আমাদের খাবারের স্বার্থে। বেঁচে থাকার স্বার্থে।

কিন্তু মৈনাকের মাথায় ওটা ঘুরছিল বন্ধ ঘরের তালার মতো। যেন উজ্জ্বল দিনের মুখের ওপর চাবি দেওয়া এক নিকষ অন্ধকার। ঠান্ডা শীতের রাতগুলো সে সহ্য করত ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে। গমড়ু তাকে স্বাধীনতা দেয়নি অস্ত্র রাখার। শেখায়নি লড়াইয়ের গোপন মন্ত্র। সে শুধু বীজ বোনাতো, মাটি কোপানো আর জল বওয়া। একদিন খরগোশ শিকারে বেড়িয়ে বিষাক্ত পোকার কামড়ে জ্বর আসে গমড়ুর। গায়ের প্রচণ্ড তাপে সে এলিয়ে পড়ে বিছানায়। ঠিক সেদিনই বর্শাটা বের করে মৈনাক। অন্ধকারের পৌরুষ যেন শক্তি সঞ্চয় করে। বাধা দেয় মিকা। বলে, এভাবে নয়। পোকাটা বিষাক্ত। মানুষটা হয়তো এমনিই মারা যাবে। মৈনাক শোনে না।

– যদি না যায়!

দুজনে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। কুঠারের ধারালো ব্লেডে চিরে যায় মিকার কাঁধ। অদৃশ্য কোনও সুতোয় টান পরে। ঠিক তখনই জ্ঞান ফিরে আসে গমড়ুর। বিষাক্ত তীরের এক খোঁচায় শেষ হয়ে যায় মৈনাক। আকস্মিকতায় হতবাক মিকা। মুখ দিয়ে আওয়াজ বেরোয় না তার।

অরণ্যের মতো চওড়া হয় গমড়ু। সবুজের মতো গভীর। সে কুকরি ধরা শেখায় মিকাকে। জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে প্রয়োজনীয় ফুল ফল পাতা শিকড় সংগ্রহ করতে শেখায়। বৃষ্টির জল জমিয়ে রাখতে শেখায়। মাঝে মাঝে মেঘ করলে সে তার পূর্বপুরুষের কথা বলে। ছোটবেলার কথা। গাছ থেকে গাছে ঘুরে বেড়ানোর কথা। বাঘ ভালুক শিকারের কথা। সন্ধেবেলা দাওয়ায় বসে একা একা শিস দেয় সে। গাছেদের সংসার করা নীরব গান শোনে। রাতেরবেলা চুমু খায় মিকার ঠোঁটে। আলতো করে জড়িয়ে ধরে তাকে। হাত বোলায়। অনুভব করতে থাকে তার বুকের কথা। গমড়ুর বোবা জিভ স্পর্শ করে মিকার অন্তরতম প্রদেশ। একই সঙ্গে হাসে আর কাঁদে মিকা। গভীর থেকে গভীরে খুঁড়ে চলে গমড়ু। এ-ভাবেই বীজ বোনে সে। খেতে খামারে আর মিকার শরীরে।

রুপালি বৃষ্টির ধারা মাটিতে পড়ে। নরম করে দেয় আলগা মাটিকে। শুধু আলো আর বাতাস। সেই বীজ ফসল ফলাবে। শিকড় গাড়বে মাটি থেকে মাটিতে। দূর থেকে দূরে। ফসলের মধ্যে জমা শ্বেতসার। শোনা যাবে ছোট ছোট প্রাণের ফিসফিসানি। কোলাহলে আবার মুখরিত হবে বুনো হয়ে যাওয়া জল জমি। ছোট ছোট মাছ খেলে বেড়াবে। ফুল ফুটবে। হলুদ সোনা ব্যাঙ খুঁজে বেড়াবে তার লীলা সঙ্গী।

হেঁটে যায় মিকা। জঙ্গল তলিয়ে আসে। ব্যস্ত ঝিঁঝিঁ পোকার পৃথিবী শেষ হয়ে যায়। লাল কেন্নো চলে যায় তার কাজে। মা–পাখিরা বাসায় ফেরে। সাদা গুবরে পোকারা আলো দেখে সরে পড়েছে সব। মিকা একটা মাঠে এসে দাঁড়ায়। সবুজ ঘাস নাড়িয়ে যায় রঙিন প্রজাপতি। ফড়িংয়েরা এগোয় পেছোয়। মৃদুমন্দ হাওয়ায় দোলে। মিকার পেটে গমড়ুর সুপ্ত শক্তি। বেড়ে চলা ভ্রুণ। মাথা তুলবে দশ মাস দশ দিনে। হাঁটতে থাকে মিকা। উঠতে থাকে সূর্য। পরিত্যক্ত মোটরগাড়িতে বড় হওয়ার অপেক্ষায় একটা বাচ্চা চামচিকে। রুপালি মৌমাছির ডানায় বাতাস লাগে। সে উড়ে চলে ফুল থেকে ফুলে।

চিত্রকর: মৃণাল শীল

 

Comments are closed.