বাহাত্তর ঘণ্টা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

প্রদীপ দে সরকার

সুবিনয়কে আইসিসিইউ-তে রেখে মল্লিকা যখন বাড়ি ফিরল তখন বেলা প্রায় আড়াইটে। নভেম্বরের শেষ। দুপুর গড়াতে না গড়াতেই আকাশের আলোয় বিকেলের গন্ধ লেগে যায়। আজ এই হলদে আলোয় প্রেম আর বিষণ্ণতা অদ্ভুত ভাবে গায়ে গা জড়িয়ে মিশে গেছে।

সকাল আটটায় সুবিনয় যখন চায়ের কাপ হাতে চেয়ারে এলিয়ে পড়ল তখন মল্লিকাও চোখে অন্ধকার দেখেছিল। তারপর খুব দ্রুত নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়ে প্রথম ফোনটা করেছিল মাসতুতো বোন প্রমিতাকে। ওরা লেক গার্ডেন্সে থাকে। মল্লিকাদের বাড়ি থেকে খুব দূরে নয়। ওর ছেলে রাজর্ষি তখনও অফিসে বেরিয়ে যায়নি। বাড়িতেই ছিল। বলল, ‘চিন্তা কোরো না মাসি। আমি এক্ষুণি আসছি।’ পরের ফোনটা করেছিল বিজনদাকে। কিন্তু বিজনদার ছেলে অভ্রকে পাওয়া গেল না। অফিসের কাজে চেন্নাই গেছে।

রাজর্ষি এসে একটা বেসরকারি হাসপাতালে ফোন করে সমস্ত ব্যবস্থা করল। আর করল পাশের বাড়ির রাধিকা। সুবিনয় আর মল্লিকাকে খুব ভালোবাসে মেয়েটা। মাসিমা-মেসোমশাই বলে ডাকে। খবর পেয়েই ছুটে এসেছিল রাধিকা। পাড়ার ডাক্তারের কাছে সব শুনে সঙ্গে সঙ্গেই ফোন করে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে ফেলেছিল। ওর অফিস দুপুর বারোটায়। তাই সকালের দিকটায় সময় পায়। তবে আজ শেষ পর্যন্ত আর অফিস গেল না। এরপর অ্যাম্বুলেন্স, ডাক্তার, নার্সিংহোম সবকিছু রাজর্ষি আর রাধিকা দুজনে মিলেই সামলালো। মল্লিকাকে শুধু টাকা দিতে হয়েছে আর হাসপাতালের কাগজপত্রে সই সাবুদ করতে হয়েছে। মেডিকেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে মেল করে সুবিনয়ের অসুস্থতা এবং এই বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তির কথা জানাতে হয়েছে। সেটাও করে দিয়েছে রাজর্ষি।

সেই সময়টায় খুব কষ্ট হচ্ছিল মল্লিকার। বড্ড অসহায় লাগছিল। দুই ছেলে, এক মেয়ে, সবাই দূরে থাকে। আজ যদি ওরা পাশে থাকত কতটা জোর পাওয়া যেত। ছেলেমেয়েরা থাকতেও কিনা পাড়া-প্রতিবেশী দূরাত্মীয়দের ভরসায় কাটাতে হল আজ মল্লিকার জীবনের কঠিনতম মুহূর্তগুলো। ভাগ্যিস রাজর্ষি আর রাধিকা ছিল। নইলে কী যে হত কে জানে।

এখন ছেলেমেয়েরা এসে গেলে অনেকটা নিশ্চিন্ত হওয়া যেত। ভরসা পাওয়া যেত। কিন্তু কালকের আগে ওরা কেউ আসতে পারবে না। এর জন্য ওদেরকে অবশ্য দোষ দেওয়া যায় না। সবাই আজকাল বড্ড ব্যস্ত। হুটহাট চলে আসা যায় না। অফিসে জানাতে হবে, ছুটি পেতে হবে, ছেলেমেয়ের পড়াশুনোর দিকটা সামলাতে হবে, তারপর প্লেনের টিকিট পেতে হবে, এমনি অনেক টুকিটাকি সমস্যা সামলে তবে না আসা।

বাইরের গেটের আওয়াজ পেয়ে যুধিষ্ঠির হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছিল। জিজ্ঞেস করল, ‘দাদাবাবু এখন কেমন আছে বৌদিমণি?’

মল্লিকা হাসপাতাল থেকেই ফোন করে যুধিষ্ঠিরকে জানিয়েছিল যে সুবিনয়ের বুকে একটা অপারেশন করতে হবে। এখন বলল, ‘এমনিতে ঠিক আছে। আমাদের সঙ্গে কথাও বলেছে। কিন্তু ডাক্তার বলেছে বাহাত্তর ঘণ্টা না পেরলে কিছু বলা যাবে না। বয়েস তো কম নয়।’

যুধিষ্ঠির প্রায় কেঁদে ফেলে আর কী। তবুও তার বৌদিমণিকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে, ‘দাদাবাবুর কিচ্ছুটি হবে না, দেখো। সব ঠিক হয়ে যাবে। এত ভালো মানুষকে কি ভগবান কষ্ট দেয়?’

মল্লিকা শত দুঃখেও না হেসে পারে না, ‘যুধিষ্ঠিরদা, ভগবান আজকাল ভালো মানুষদেরই দুঃখ দেয় বেশি।’

‘না গো, বৌদিমণি, দাদাবাবু ঠিক হয়ে যাবে। এখন তুমি হাত মুখ ধুয়ে একটু কিছু খেয়ে নাও দিকি।’

মল্লিকা ম্লান হেসে বলে, ‘একটু চা পেলে ভালো হত।’

যুধিষ্ঠির প্রায় ধমকের সুরে বলে, ‘এখন এই অবেলায় চা খাবে না। রেখার মা রান্না করে গেছে। খেয়ে নাও।’

মল্লিকা আর কিছু বলতে পারে না। ওর নিজের খেতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু ও না খেলে যুধিষ্ঠিরও খাবে না। তাই কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ ঢুকে গেল নিজের ঘরে। ঘরে ঢুকে অনুভব করল গোটা বাড়িটা আজ যেন অসহ্য রকমের শব্দহীন। অন্য দিন সুবিনয় কারণে অকারণে হইচই বাঁধায়। কখনও যুধিষ্ঠির আবার কখনও মল্লিকার ওপর চোটপাট করে। চেয়ারটা এখানে কে রাখল? বাইরের গেটটা খোলা কেন? ইলেকট্রিক বিলের টাকাটা গুছিয়ে রাখনি কেন? এমনি আরও কত কিছু নিয়ে যে হইচই বাঁধায় তার ঠিক নেই।

মল্লিকা সুবিনয়ের এসব হাবিজাবি কথায় পাত্তা না দিলে কী হবে। যুধিষ্ঠির মাঝে মাঝেই লড়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। লেগে যায় দুজনে। তারপর সুবিনয়ের দাপটের চোটে একটু পরেই ‘বৌদিমণি ডাকছে’ অজুহাতে রণে ভঙ্গ দেয় যুধিষ্ঠির। সুবিনয় তবুও গজগজ করতেই থাকে। যুধিষ্ঠির যে কিছুই জানে না সেটা মল্লিকাকেও বারেবারে জানিয়ে দিয়ে যায়। আবার খানিক পরে যুধিষ্ঠিরকে নিয়েই বাজারে বের হয়। মল্লিকা জানে এটা সুবিনয়ের সময় কাটানোর খেলা মাত্র। ওদের এই ছদ্মঝগড়া আর চেঁচামেচিতে বাড়িটা বেশ সতেজ থাকে। এভাবে ঝিমিয়ে পড়ে না।

অন্যদিন যুধিষ্ঠিরও কম হইচই করে না। কিন্তু আজ সুবিনয় অসুস্থ হওয়ায় সেও নিস্তেজ হয়ে গেছে। যুধিষ্ঠির এ বাড়িতে কবে এসেছিল সেটা সুবিনয়ও বোধহয় ঠিক মতো জানে না। মল্লিকা তো জানেই না। তার যে বাড়িঘর ঠিক কোথায় সেটাও জানে না মল্লিকা। যুধিষ্ঠিরের মুখেই শুনেছে সে নাকি আদতে উড়িষ্যার লোক। কিন্তু তার কথা শুনে সেটা বোঝা মুশকিল। কারণ সেই কোন ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে চলে এসেছিল কলকাতায়। তারপর এ–ঘাট ও–ঘাট ঘুরতে ঘুরতে সাত–আট বছর বয়সে এসে পৌঁছেছিল এ বাড়িতে। তারপর তার সারাটা জীবন কাটিয়ে দিয়েছে এখানেই, এ বাড়ির একজন হয়েই।

সুবিনয়ের কথা ভাবতে গিয়ে আজ হঠাৎ যুধিষ্ঠিরের কথা কেন মনের ঢেউয়ে উঠে এল বুঝতে পারে না মল্লিকা। হয়তো এমন একটা বিপদের দিনে একান্ত আপজনদের অনুপস্থিতে যুধিষ্ঠিরকেই আপন ভাবতে শুরু করেছে তার দুর্বল হৃদয়।

হঠাৎই মল্লিকার মনে হয়, আচ্ছা, সুবিনয় এই বয়সে বুকে স্টেন্ট বসানোর ধকল কাটিয়ে ফিরে আসতে পারবে তো? তারপরেই যেন নিজেকেই আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে। ডাক্তার তো বলেছে, ভয় নেই। আজকাল স্টেন্ট বসানো খুব সাধারণ ঘটনা হয়ে গেছে। শুধু বয়সটা ছিয়াত্তর বলেই যা চিন্তা। আর তাই তিনদিন অবজারভেশনে রাখার প্রয়োজন। আসুক, ফিরে আসুক সুবিনয় নিজের বাড়িতে, নিজের সব নিকটাত্মীয়ের ঘেরাটোপে ফিরে আসুক।

(২)

স্নান করে দুটো ভাত খেয়ে একটু শুয়েছিল মল্লিকা। চারটে বাজতে না বাজতে রাজর্ষি এসে হাজির, ‘কী গো মাসি, বিকেলে যেতে হবে তো। তৈরি হয়ে নাও।’

রাজর্ষি বলেছিল বিকেলে এসে ওকে নিয়ে যাবে হাসপাতালে। তবুও মল্লিকা নিজে থেকে আর ফোন করে ডাকেনি রাজর্ষিকে। নিজের ছেলে মেয়ের ওপর যে জোরটা খুব সহজে খাটানো যায় সেটা কি আর মাসতুতো বোনের ছেলের ওপর খাটে? একটা সংকোচ বোধ গ্রাস করছিল মল্লিকাকে। এখন রাজর্ষিকে দেখে আবার সংকুচিত হয়। বলে, ‘তুই আবার এলি কষ্ট করে।’

রাজর্ষি হাসে। বলে, ‘বাজে কথা রেখে চল। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও, আমি একটা ক্যাব ডেকে নিচ্ছি।’

মল্লিকা বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। চুলটা একটা হাতখোঁপা করে বলে, ‘তাহলে রাধিকাকেও একটা ফোন করি। বলেছিল তো বিকেলে যাওয়ার সময় ডাকতে।’

‘তুমি তৈরি হয়ে নাও, আমি ফোন করছি।’ বলতে বলতে রাজর্ষি ওর স্মার্ট ফোনে আঙুল চালায়।

মল্লিকা পাশের ঘর থেকে শুনতে পায় রাজর্ষি কথা বলছে রাধিকার সঙ্গে, ‘হ্যাঁ, আমি এখন মাসির বাড়িতে …মাসি রেডি হচ্ছে …আপনার হয়ে যাবে তো? …তাহলে মিনিট দশেকের মধ্যে ক্যাব ডেকে নেব…।’

হাজার টেনশনেও হাসি পায় মল্লিকার। একেই বলে বয়সের ধর্ম। বোধহয় রাধিকাকে মনে ধরেছে রাজর্ষির। ব্যাপারটা মন্দ নয়। দুটোয় মানাবে ভালোই। তবে আজকালকার ছেলেমেয়েদের সামান্য কথা শুনে কিছুই বোঝার উপায় নেই। ওদের কোনটা যে প্রেম আর কোনটা বন্ধুত্ব বোঝা খুব মুশকিল।

মল্লিকা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখল যুধিষ্ঠির চায়ের ট্রে নিয়ে হাজির। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে রাজর্ষি জিজ্ঞেস করল, ‘অভিদা শুভদারা কবে আসছে?’

‘বলেছে তো কাল আসবে। অনুও আসছে।’

‘আচ্ছা মাসি, ইন্স্যুরেন্সের টাকা পেতে তো সময় লাগবে। এখনকার মত টাকাপয়সার বন্দোবস্ত হয়েছে কি?’

‘হ্যাঁ, আপাতত চলবে। তবে কাল সকালে একবার ব্যাঙ্কে যেতে হবে। ফাইনাল বিলটা পেমেন্টের আগে একটা এফডি ভাঙিয়ে রাখতে হবে।’

‘যদিও অভিদারা চলে আসছে, টাকাপয়সার ব্যাপারটা ওরাই সামলে দেবে, তবুও তেমন প্রয়োজন হলে আমাকেও নিঃসংকোচে বোলো কিন্তু।’

মল্লিকা হেসে বলল, ‘হ্যাঁরে, তেমন প্রয়োজন হলে তো বলবই। তবে কী জানিস, তোর মেসো এই ব্যাপারে কারও মুখাপেক্ষী থাকতে রাজি নয়। তাই আমাদের জন্য খানিকটা ব্যবস্থা করেই রেখেছে। আশা করি ছেলেমেয়েদের কাছেও হাত পাততে হবে না। শুধু তোরা এই বুড়োবুড়িগুলোর পাশে থাকিস, তাহলেই হবে।’

চা-পর্ব চলার সময়েই ক্যাব বুকিং হয়ে গিয়েছিল। ঠিক সাত মিনিট পর চলে আসার কথা। রাজর্ষি সে কথা ফোনে রাধিকাকেও জানিয়ে দিল।

****

আইসিসিইউ-এর ভিজিটিং আওয়ারস পাঁচটা থেকে ছ’টা। ডঃ স্বামীনাথনের সঙ্গে কথা বলা গেল প্রায় সাতটা নাগাদ। ডাক্তারের ভাষায়, ‘পেশেন্টের অবস্থা যথেষ্ট স্টেবল। কিন্তু তবুও ওঁর বয়সের কথা মাথায় রেখে আমরা কোনও চান্স নেব না। তাই আরও একটা দিন পেশেন্টকে আমরা আইসিসিইউ-তে রাখব। আর সব মিলিয়ে অপারেশনের পর পুরো বাহাত্তর ঘণ্টা আমরা ওঁকে কড়া নজরদারির মধ্যে রাখব।’

মনের চাপা পাথরটা খানিকটা হলেও নেমেছে সুবিনয় আর ডঃ স্বামীনাথনের সঙ্গে কথা বলে। আর তাই এরপর রাজর্ষি ওদেরকে নিয়ে কফি শপে গিয়ে বসতে চাইলে মল্লিকা সাগ্রহে রাজি হয়েছে।

কফি শপটার ঠিক পাশেই ছোট্ট একটা বাগান। কফির কাপ হাতে মল্লিকা সেই বাগানের রেলিং-এর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। রাতের আলোয় কেয়ারি করা ফুলগাছগুলোকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। গাঁদা আর চন্দ্রমল্লিকা ফুলগুলো যেন ঝলমলিয়ে হাসছে। ফুলগুলো দেখতে দেখতেই হঠাৎ চোখ গেল রাজর্ষিদের দিকে। টেবিলে মুখোমুখি বসে ওরা হাসতে হাসতে গল্প করছে। খুব উচ্ছ্বল, প্রাণবন্ত দেখাচ্ছে দুজনকে। ঠিক এই ফুলগুলির মতোই। যেখানে কোনও অসুস্থতার ভার কিংবা ক্লান্তি নেই।

(৩)

ডাক্তারের দেওয়া বাহাত্তর ঘণ্টার অর্ধেক সময় মাত্র কেটেছে। সুবিনয়ের শারীরিক পরিস্থিতি যথেষ্টই ভালো। শুধু পালস্‌ রেটটা এখনও একটু বেশি রয়েছে। ডাক্তার বলেছে এটাও খুব স্বাভাবিক ঘটনা। এ নিয়ে কোনও চিন্তা নেই। তবুও ডাক্তারের দেওয়া সময়সীমা চিন্তায় রেখেছে মল্লিকাকে। সেই চিন্তায় বিশেষ হেরফের হয়নি।

তবে বাড়িতে মল্লিকার অবস্থা বেশ খানিকটা পালটেছে। আজ বিকেলের ফ্লাইটে নয়ডা থেকে বড়ছেলে অভিজিৎ এসে গেছে। একাই এসেছে। ছেলে যুধাজিতের স্কুলের পরীক্ষা চলছে। স্ত্রী জয়িতা আর মেয়ে সুকন্যাকে নিয়ে ছোট ছেলে শুভজিৎ বেঙ্গালুরু থেকে সন্ধের ফ্লাইটে চলে এসেছে। মেয়ে অনু এসেছে আজ দুপুরে। ও থাকে মুম্বাইতে। ওর ছেলে শাম্ব’র এবার ক্লাস টুয়েলভ। সামনেই পরীক্ষা। অনুও তাই একা এসেছে।

ছেলেমেয়েরা চলে আসায় এখন অনেকটাই নিশ্চিন্ত বোধ করছে মল্লিকা। যেন অনেকটা ভার কাঁধ থেকে নেমে গেছে। সুবিনয়ের ভাবনা এখন আর তার একার নয়। অসুস্থ বাবার জন্য ছেলে মেয়ের উৎকণ্ঠা মল্লিকাকে আশ্বস্ত করে। ছেলেমেয়েরা খুব কম আসত কিংবা কদাচিৎ ফোন করত বলে কম অনুযোগ ছিল না মল্লিকার। সুবিনয়কে বারে বারে বলেছেও সে কথা। সুবিনয় অত ভাবত না। বলত, ‘আরে, ওদের নিজেদের সংসার আছে। আজকালকার চাকরিতেও প্রচুর চাপ। ওসব নিয়ে অত অভিমান করতে নেই।’ এখন মনে হচ্ছে যাক, দূরে থাকলেও ছেলেমেয়েদের কাছে বাবার জন্য এই ভালোবাসাটুকু অন্তত টিকে আছে। মনের ভেতরে একটা গভীর প্রশান্তির পরশ পায় মল্লিকা।

মেয়ে অনুটা ছোট থেকেই বড্ড বাপ-ন্যাওটা। সুবিনয়ও ভীষণ ভালবাসত মেয়েকে। সব আবদার মেটানোর চেষ্টা করত। মল্লিকা বলত, ‘অতিরিক্ত প্যাম্পার করে মেয়েটাকে স্পয়েল কোরো না।’

সুবিনয় কিছু বলত না, শুধু মুচকি হাসত। আজ মাকে জড়িয়ে ধরে অনুর কান্নায় মল্লিকার এতদিনকার সব অভিযোগ যেন ধুয়ে মুছে গেছে।

বিকেলে মল্লিকাকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিল অভি আর অনু। সুবিনয়কে দেখে বেশ ভালোই মনে হল। দিব্যি কথাবার্তা বলছে। ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে সাড়ে আটটা নাগাদ বাড়ি ফিরল ওরা। ইতিমধ্যে শুভরাও চলে এসেছে। রাতের খাবার টেবিলে একপ্রস্থ আলোচনা চলল সুবিনয়কে নিয়ে। আরও ভালো কোনও ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া যায় কিনা তা নিয়ে কথা চলছে। ছেলেমেয়েদের কথা শুনছে মল্লিকা কিন্তু নিজে কোনও কথা বলছে না। সুবিনয়ের জন্য তার ছেলেমেয়েদের এই ভাবনাটুকু তাকে বেশ শান্তি দিচ্ছে।

কিন্তু ওদের আলোচনা একটু পরেই অন্যদিকে ঘুরে গেল। অভি হঠাৎ বলল, ‘আমার তো এই হাসপাতালটা একেবারেই ভাল লাগছে না। রাজর্ষিটা কী করতে যে বাবাকে এখানে ভর্তি করল কে জানে।’

‘ঠিক বলেছিস,’ ফোড়ন কাটল অনু, ‘ভালো একটা হাসপাতালে ভর্তি করতে পারত। যত্তসব লো মিডলক্লাস মেন্টালিটি। এমন জায়গায় কেউ স্টেন্ট বসায়?’

অনুর কথায় মল্লিকার খুব খারাপ লাগে। বলল, ‘ওভাবে বলিস না অনু। কাল সকালে রাজর্ষি না থাকলে কী যে করতাম কে জানে। ও ছিল বলেই অত তাড়াতাড়ি তোর বাপিকে ভর্তি করানো গেছে। ডাক্তার তো বললই, গোল্ডেন আওয়ার পেরিয়ে গেলে আর কোনও আশা ছিল না।’

শুভ চোখের ইশারায় অনুকে থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘আসলে মা, আমার মনে হচ্ছে অনু বলতে চাইছে যে এই জায়গাটায় তেমন ভালো ডাক্তার নেই। ভালো হাসপাতাল হলে স্টেন্ট বসানোর পর এমন বাহাত্তর ঘণ্টার জন্য টেনশন লাগানো প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে রাখত না।’

মল্লিকা বলল, ‘কিন্তু বিজনদা যে বলল, এখানে দুজন ভালো কার্ডিওলজিস্ট আছে। স্বামীনাথন আর অরিন্দম দত্ত। স্বামীনাথনই তো ওর অপারেশনটা করল।’

‘রাখ তোমার বিজনদা,’ অনু আবার ঝাঁঝিয়ে ওঠে। ‘এই দুজন ডাক্তারের নাম কেউ শুনেছে বলে মনে হয় না। আর তোমার এই বিজনদা লোকটা তো বাপির লেটেস্ট খবর জানার নামে যখন তখন আসছে আর চা-বিস্কুট সাঁটাচ্ছে। আমি বাড়িতে ঢুকেছি এগারোটা নাগাদ। তার পর থেকে তো তিনবার লোকটাকে আসতে দেখলাম। আরে বাবা, এতই যদি চিন্তা তাহলে একবার অন্তত হাসপাতালে গিয়ে দেখে আসুক না।’

অনুর কথাগুলো অশ্লীল লাগে মল্লিকার। কিন্তু মল্লিকা বুঝতে পারছে অভি, শুভ আর জয়িতা এই কথাগুলো বেশ উপভোগ করছে। শুভ হেসে বলল, ‘কিপ্পুস লোক। ওখানে যেতে আসতে খরচা আছে না। তার চেয়ে এখানে এলে মুফতে এক কাপ চা পাওয়া যায়। সঙ্গে দামি বিস্কুট।’

মল্লিকার গা ঘিনঘিন করে। ধমকের সুরেই বলে, ‘ছিঃ, শুভ। বিজনদা তোর বাবার ছোটবেলার বন্ধু। সবসময় আমাদের খোঁজ খবর নেয়। তোর বাবার অসুস্থতার খবর পাওয়া মাত্র ছুটে এসেছে। ওরা আমাদের পরিবারের মতো। ওঁর ছেল অভ্রও তোর বাবাকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করে। আজ সকালে কলকাতায় থাকলে ঠিক রাজর্ষির পাশে এসে দাঁড়াত। এই মানুষগুলোকে নিয়ে এভাবে কথা বলিস না।’

শুভ সঙ্গে সঙ্গেই মায়ের হাত ধরে বলল, ‘সরি, মা। তোমাকে দুঃখ দিতে চাইনি। কিন্তু আসলে কী ….’

‘থাক’, বলে মল্লিকা উঠে পড়ে। উঠে যেতে যেতে মল্লিকা ছেলেমেয়েদের মুখগুলো একঝলক দেখল। মল্লিকার কথায় সবাই চুপ করে গেছে। কিন্তু মল্লিকা ওদের মুখের ভাষা পড়তে পারছে।

(৪)

দোতলায় উঠতে গিয়ে সিঁড়িতেই দাঁড়িয়ে পড়ে মল্লিকা। একতলায় নিজের ঘরে নাতনি সুকন্যাকে নিয়ে শুয়ে ছিল এতক্ষণ। নাতনি ঘুমিয়ে পড়লেও ঠাম্মির চোখে ঘুম নেই।

সুবিনয়ের ভাইপো, মল্লিকার বোনপোরা হাসপাতাল এসে দেখা করে গেছে। অনেক আত্মীয়স্বজন ফোন করে খোঁজ নিচ্ছে। কয়েকজন বাড়িতে এসেও দেখা করছে। আর বাড়িতেও এখন প্রচুর লোক। প্রায় গমগম করছে বলা যায়।

বাড়িটাকে এখন আর খালি বলা যাবে না। কিন্তু তবুও মল্লিকা যেন অদ্ভুত এক শূন্যতা টের পাচ্ছে এ বাড়িতে। সুবিনয়ের অনুপস্থিতি যেন প্রতি মুহূর্তে খোঁচাচ্ছে মল্লিকাকে। নিজেকেই নিজে সান্ত্বনা দেয় মল্লিকা। আর তো মাত্র আজকের রাতটুকু। কাল দুপুরেই ছেড়ে দেবে সুবিনয়কে। এসব ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়বে ভেবেছিল। কিন্তু হল না। কিছুতেই ঘুম এল না।

ঘুম আসছে না দেখে বিছানা ছেড়ে বারান্দায় বেরিয়ে এসেছিল। ঠিক তখনই কিছু কথাবার্তা কানে এল। ছেলেমেয়েরা বোধহয় দোতলায় গল্প করছে। মল্লিকা ভাবল যাই, ওদের সঙ্গে একটু গল্প করে আসি। তাই সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করেছিল। কিন্তু মাঝপথেই দাঁড়িয়ে পড়তে হল।

শুভ ওর দাদাকে দোষারোপ করছে, ‘তুই বললি এবারেই একটা ব্যবস্থা হবে। আমি সেইজন্যেই ছুটি ম্যানেজ করে প্লেনের টিকিট কেটে ওদেরকে নিয়ে চলে এলাম। এখন যদি বলিস যে এই অবস্থায় বলতে পারবি না তাহলে আমার তো বহু টাকা লস হয়ে যাবে।’

অনুও সুর মেলালো, ‘হ্যাঁ, দাদা। তোর কথা শুনেই আমিও চলে এসেছি। কিন্তু কিছুই তো হচ্ছে না।’

অভি বলল, ‘বাঃ! সব ব্যবস্থা করব আমি, আর তোরা আমায় শুধু দোষারোপ করবি?’

শুভ সঙ্গে সঙ্গেই সুর নরম করে, ‘না, ঠিক দোষারোপ নয়। তুই-ই তো বললি যে এটাই হাই টাইম। বাড়ি ভেঙে মাল্টিস্টোরিড বানানোর ব্যাপারটা এখনই মিটিয়ে ফেলা দরকার। তোর ভরসাতেই তো চলে এলাম আমরা।’

অভি সুর চড়ায়, ‘সেই দিল্লিতে বসে আমি প্রোমোটার ঠিক করলাম। তারপর, বাবার অসুস্থতার খবর পেয়েই প্ল্যান করলাম। আর এখন শুধু বলেছি, বাহাত্তর ঘণ্টা না কাটলে বলা যাবে না, তাতেই আমাকে দোষারোপ করছিস? তোরা যদি মনে করিস কাল সকালেই বলে ফেলবি তো বল। আমার আপত্তি নেই।’

অনু বলল, ‘না, না, দুদিন যখন অপেক্ষা করতে পারলাম তখন আরও কয়েকটা ঘণ্টা না হয় কেটে যাক। আমি তো কাল সেটাই বলতে চাইছিলাম। ভালো হাসপাতাল হলে এসব পেশেন্টকে আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যেই সেফ ডিক্লেয়ার করে দিত। তারপর আমরাও ব্যাপারটা সেটল করে ফিরে যেতে পারতাম।’

শুভ বলল, ‘বাবার যা বয়স হয়েছে তাতে এভাবে কোনও দিন আচমকা কোনও অঘটন ঘটে গেলে আমরা কিন্তু কিছু গুছোনোরও সুযোগ পাব না।’

আরও অল্প কিছুক্ষণ সেখানেই চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে মল্লিকা সিঁড়ি দিয়ে নিঃশব্দে নেমে এল নীচের ঘরে। চতুর্দিক অসম্ভব রকমের নিস্তব্ধ লাগছে এখন। এ বাড়ির আসল শূন্যতাটা টের পাওয়া যাচ্ছে। এত শূন্যতার মাঝে শুধু দেওয়াল ঘড়ির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। টিক্‌ টিক্‌ টিক্‌। আস্তে আস্তে মনে হতে লাগল সেই সামান্য শব্দটাই যেন ঘণ্টাধ্বনি হয়ে উঠল। মল্লিকার মনে হল এ নিস্তব্ধ চরাচরে শুধু সময়ের ঘণ্টাধ্বনি শোনা যাচ্ছে। এখানে বুঝি বাহাত্তর ঘণ্টার হিসেব হয়ে চলেছে নিরন্তর।

(৫)

রাতে তেমন ভাবে আর ঘুম এল না। ছেঁড়াছেঁড়া ঘুম, ছেঁড়া মেঘের মতো ভেসে বেড়ালো চোখের পাতায়। তবুও সকালেই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল মল্লিকা। বিছানা থেকে উঠে দেখল জয়িতাও উঠে পড়েছে। জিজ্ঞেস করল ‘মা, চা খাবে তো, তোমাকে চা বানিয়ে দিই?’

মল্লিকা নিরুত্তাপ গলায় বলল, ‘না থাক। যুধিষ্ঠির দেবে’খন। রোজ তো ওর হাতেই চা খাই। অভ্যেস খারাপ হয়ে যাবে।’

জয়িতা কী বুঝল কে জানে। সুকন্যাকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে দোতলায় চলে গেল।

সকালেই স্নান করে টিফিন খেয়ে পরিপাটি করে শাড়ি পড়ে ন’টা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল মল্লিকা। অভি জিজ্ঞেস করেছিল, ‘মা, তুমি একা একা কোথায় যাবে?’

মল্লিকা শুধু বলল, ‘হাসপাতাল।’

শুভ বলল, ‘সেকী! এখন সেখানে গিয়ে কী করবে? চল আরএকটু পরে আমরাও যাচ্ছি।’

মল্লিকা কঠিন গলায় বলল, ‘থাক। আজ ওখানে আমি একাই যাব। এ প্রতীক্ষা একা আমার। তোমাদের কারও নয়।’

ছেলেমেয়েরা বুঝতে পারছিল কোথাও একটা কিছু হয়েছে। কিন্তু কিছু করতে পারছিল না। মল্লিকা একাই বেরিয়ে গেল। হাসপাতালে যখন পৌঁছল তখনও দশটা বাজেনি। মিনিট পাঁচেক বাকি। অফিসে বলে কয়ে ডঃ স্বামীনাথনের সঙ্গে দেখা করল। স্বামীনাথন বললেন, ‘আমি একটু পরেই রিলিজ অর্ডার লিখে দেব। আপনি অফিস থেকে ডিউজগুলো জেনে নেবেন।’

অফিস থেকে বিল পাওয়া গেল একটু পরেই। মল্লিকা আজ ব্যাঙ্কের কার্ড নিয়েই বেরিয়েছিল। এফডির টাকাটা গতকালই অ্যাকাউন্টে ঢুকে গিয়েছিল। হাসপাতালের বাকি টাকা মিটিয়ে দিয়ে কফিশপটার পাশের ফুলের বাগানটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। বাগানটা হাসপাতালের মূল বিল্ডিং-এর প্রায় গায়ে লেগে আছে। মল্লিকা আর বাগানের ফুল গুলির ওপাশেই বিভিন্ন ফ্লোরের বিভিন্ন বেডে শুয়ে আছে কয়েকশো রোগী। কিন্তু তার কোনও আঁচ নেই এ বাগানে। ঝলমলে ফুলগুলোকে দেখে মল্লিকার মনটাও ঝরঝরে হয়ে গেল। চতুর্দিকের এত নিদারুণ অসুস্থতার মাঝেই কী ভীষণ ভাবে বেঁচে আছে ওরা।

রাজর্ষিকে ফোন করল মল্লিকা। ‘রাজ, আজ তোর মেসোকে ছেড়ে দিচ্ছে।’

‘আমি আসব মাসি?’

‘না, আজ আর আসতে হবে না। বরং যদি সময় পাস তাহলে রাধিকাকে নিয়ে একটা সিনেমা দেখে আয় কিংবা শপিং মলের রেস্তোরাঁয় যা। তোরা যেভাবে আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলি সেটা আমি আজীবন মনে রাখব।’

রাজর্ষি কী বলবে ঠিক বুঝতে পারছিল না। হ্যাঁ, না, মানে, করতে করতেই মল্লিকা ফোনটা কেটে দিল। তারপর ফোন করল অভিকে।

‘ঘন্টা খানেক কিংবা আরও একটু পরে হয়ত আমি তোর বাবাকে নিয়ে বাড়ি ফিরব। শুভ আর অনু যেহেতু তোর কথা শুনেই চলে তাই তোকেই বলছি, তোরা সবাই আজকেই যে যার বাড়ি ফিরে যা। আমরা ফেরার আগেই আমাদের বাড়িটা খালি করে দিস। আমি ঠিক করেছি আমাদের বাড়িটায় একটা বৃদ্ধাশ্রম খুলব। তোদের বাবা, আমি, বিজনদা এমনই কয়েকজন মিলে থাকব। তোদের যখন বয়স হবে তখন প্রয়োজন পড়লে তোরাও আসিস।’

অভিও অনেক কথা বলতে চাইছিল কিন্তু মল্লিকা ওকেও কোনও সুযোগ দিল না। ফোন দুটো করার পর খুব নির্ভার লাগছে নিজেকে। অনেক সতেজ বোধ হচ্ছে। শিরদাঁড়ায় বেশ কিছুদিন হল একটা ব্যথা হচ্ছিল। মল্লিকা হঠাৎ টের পেল সেই ব্যথাটা আর নেই।

চিত্রকর: মৃণাল শীল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More