বুধবার, নভেম্বর ২০
TheWall
TheWall

অপ্রাণীবাচক

রাজ্যশ্রী ঘোষ

একটা শিরশিরে ঠান্ডা হাওয়া দিয়ে গরমের সকালটা শুরু হয়েছিল।

এমন সকালে ঘুম থেকে উঠেই যারা কলুর বলদের মত আবার একটা ব্যস্ত দিনের ঘানি ঘোরানোর তোড়জোড় করতে থাকে, তাদের চোখে সকালটার কোনও বৈশিষ্টই হয়তো তেমন করে ধরা পড়ে না। কারণ কোন দিনের সকালে ঠিক কি কি অনুপান পড়েছে…তাতে ক’ছটাক কুয়াশা আর ক’পো রোদ্দুর মিশে আছে… এসব তলিয়ে দেখবার অবকাশ তাদের থাকে না।

তবে হয়তো ফোজো মণ্ডলের আছে। বিভা বোসের বাগানবাড়িতে সে চৌকিদারি করে। আসলে সে কিছুই করে না। তিন কুলে কেউ নেই। দুবেলা নিজের জন্য একটু রান্না, মাঝেসাঝে বাজার আর রেশন ধরা ছাড়া ফোজো বুড়োর সারা দিন কাটে আলসেমি করে আর পাড়ার যেসব ফক্কড়রা আম কুড়োতে এসে তাকে খেপিয়ে দিয়ে যায় তাদের উত্তাল গাল পেড়ে। ফলে ধরে নেওয়া যায় যে ফোজো মণ্ডলের অবকাশ আছে।

সক্কালবেলা ফুটি ফাটা রকটার কানাচে বসে নিমডাল দিয়ে দাঁতন করার সময় শরীরে বাতাসের কনকনানিটা টের পেয়ে ঘোলা ঘোলা চোখ আকাশের দিকে তুলে সে ভাবছিল কোথাও একটা বিষ্টি-টিষ্টি হয়েছে নিয্যস, উত্তরদিকে কোথাও… নাকি মেদনিপুরে? এমন সময় শিবি গয়লানি এসে খবর দিল, নাপিতদের ছেলেটা কাল থেকে নিখোঁজ। শুনোচো তো?

হারু প্রামানিকের ছেলে বান্টি প্রামানিক গতকাল টিউশনি পড়াতে যাচ্ছে বলে সেই যে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে, আর ফেরেনি। তার মোবাইলে ফোন করা হলে শোনা গেছে সুইচড অফ্। বাড়ির লোক প্রথমে ভেবেছে যে হয়তো জরুরি কাজে আছে নইলে মোবাইলের ব্যাটারি ডাউন… কিন্তু বেলা গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে রাত এবং রাত ভোর হয়ে যাওয়ার পরেও ছেলে না ফেরায় এবং মোবাইল তখনও সুইচড অফ্ থাকায় বাড়ির লোকজন চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। যে কোচিং সেন্টারে সে পড়াতে যায়, বাড়ি থেকে খোঁজ নিলে জানা গেছে সেখানে নাকি সে গতকাল পড়াতেই আসেনি। এমতাবস্থায় বান্টির বাড়ির লোকজনদের কেউ বলছে থানায় খবর দাও… কেউ বলছে চিন্তা না করে আর একটু দেখো… দেখো হয়তো জরুরি কাজে গিয়ে কোথাও আটকে পড়েছে, খবর দিতে পারছে না…

মোটের উপর এই নিয়ে সকাল থেকেই পাড়ায় একটা গুমোট ঘনিয়ে উঠেছে।

বেলা বাড়তে থাকে। সাড়ে দশটা বাজলে ম্যাচিং ফিতের বিনুনি দুলিয়ে কমলাপাড় সাদাশাড়ি পদ্মপুকুর বালিকা বিদ্যালয়ের মেয়েরা সবুজ মাঠের পাশে লাল কাঁকরের রাস্তা ধরে স্কুলে যায়। চিত্তরঞ্জন স্পোর্টিং ক্লাবের সামনে তখন অজিত, বিল্টু, ন্যাড়া প্রমুখ পাড়ার নামকরা বখাটেরা সাইকেলের আয়নায় মুখ দেখে চুলে হাল্কা হাতে মসৃণ একটা ফাইনাল টাচ্ দিয়ে নেয় অথবা জামার কলারটা একটু উঁচিয়ে তুলে রাখে। তাদের চাকুরিহীনতা, ক্লাবের ক্যারাম বোর্ড, বর্তমান রাজনীতি অথবা আইপিএল ম্যাচের কথা ভুলে গিয়ে ঠিক ওই মুহূর্তে তারা শতকরা একশো ভাগ ঠিক ওই মুহূর্তটা সম্পর্কে সচেতন হয়ে পড়ে। ক্লাবঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মেয়েগুলো কেউ হয়তো ওদের দিকে ফিরেও তাকাবে না, গম্ভীরমুখে মাটির দিকে চেয়ে রাস্তা পেরোবে… কিন্তু তবু যদি, একবারের জন্যও,কারও নজর হঠাৎ পিছলে যায়…

সেই একটিমাত্র অলৌকিক সম্ভাবনার কথা ভেবে তারা রোজ প্রস্তুত হয়।

কিন্তু আজ তাদের প্রস্তুতিতে ছেদ পড়ে, কারণ তাদের হঠাৎ বান্টির বাড়ি না ফেরার কথা মনে পড়ে যায়। ওদের থমকানির সুযোগে মেয়েদের দলটা বাতাসে জুঁই ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে ক্লাবঘর থেকে বেশ খানিকটা দূর এগিয়ে যায়। ছেলেগুলোর তাতে খুব একটা আপশোস হয় না, বরং তারা তখন ক্লাবের রকে পা ছড়িয়ে বসে সাহাবাড়ির ছোট বৌটাকে নিয়ে আলোচনা শুরু করে।

আলোচনা শুরু করে কারণ বান্টির প্রসঙ্গে ওদের বৌটার কথা মনে পড়ে। কেননা বান্টি কিছুদিন চ্যাংড়ামি করে ফি-দুপুরবেলা বৌটাকে ফোন করা ধরেছিল।

তখনও বান্টি কোচিং সেন্টারে টিউশনি পড়ানো শুরু করেনি। সকাল থেকে রাত্তির ক্লাবের ঠেকে সে-ও নিয়মিত হাজিরা দিত। সাহাদের বাড়ির ছোট ছেলে জনার্দন সাহা একটু বেশি বয়সে ঘটা করে বিয়ে করল। ক্লাবের ছেলেরা তখন কব্জি ডুবিয়ে নিমন্ত্রণ খেয়ে এসেছিল। সাহাদের বালি-সিমেন্টের ব্যবসা। জনার্দন সাহা ভাইদের মধ্যে ব্যবসায় সবচেয়ে ধুরন্ধর। খাটতেও পারে তেমনি। সর্বদা কানে মোবাইল ফোন গুঁজে, বাইকের পিছনে বাড়ির চাকর কাম অফিসের কর্মচারী রতনকে বসিয়ে, এখান থেকে ওখান ব্যবসার কাজে সে ঘুরে বেড়ায়। বৌটা হয়তো স্বামীর ব্যস্ততার জন্য একা বোধ করত অথবা শ্বশুরবাড়ির লোকজনদের সঙ্গে তার ঠিক বনিবনা হত না অথবা ফেলে আসা বাড়িটার জন্য তার মন কেমন করত…

মোটের উপর বৌটাকে প্রায়ই ওদের তালপুকুরের দিকের জানালার গরাদে মাথা ঠেকিয়ে উদাস মুখে বসে থাকতে দেখা যেত।

সাহাদের তালপুকুরের দিকে লোকজন সচরাচর যায় না। কারণ একে তো পুকুরটা মজা, তার উপর পাড়ে ঘন বাঁশঝাড় আর মানুষসমান উঁচু জংলা ঘাসের বন। বান্টি হয়তো কোনওদিন কাটা ঘুড়ি লুটতে কি মুরগি খুঁজতে খুঁজতে… কি এমনই কোনও কারণে ওদিকটায় চলে গিয়েছিল এবং তখন সে বৌটাকে ওই ভাবে বসে থাকতে দেখেছিল। সম্ভবত তখনই তার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধিটা খেলে যায়। রকে বসে আড্ডা মারতে মারতে একদিন দুপুরবেলায় হঠাৎই সে জনার্দন সাহার বাড়ির ল্যান্ড লাইনে ফোন করে বসে। তখন হয়তো সাহা বাড়ির সকলে খেয়ে-দেয়ে উঠে দিবানিদ্রা অথবা টিভি সিরিয়ালে মগ্ন, ফলে বৌটা ফোন ওঠায়। বান্টি কথা শুরু করে।

-জনার্দনদা বাড়ি আছে?

-না।

-আপনি কে বলছেন?

-আমি… আমি ওনার স্ত্রী।

-ওহ্ বৌদি! নোওস্কার বৌদি।

-কে বলছেন বলুন… কি দরকারে বলুন… আমি বলে দেব।

-আঁই? ও আঁই কেউ নই বৌদি। কিস্যু বলতে হবে না মানে… ও আঁই কথা বলে নেওখন বৌদি। আচ্ছা ভালো থাকবেন বৌদি।

এমন চ্যাংড়ামি করে ফোন সে আরও বার দুই তিন রকে বসে করেছিল। তারপর তাদের মধ্যে আর কি কথা হয়েছিল বা আদৌ আর কোনও কথা হয়েছিল কিনা, বান্টির ফাজলামো ধরতে পেরে বৌটা তাকে ফোনে কোনওরকম গালমন্দ করেছিল কিনা এসব তাদের আর জানা হয়ে ওঠে না। কারণ এরপর হঠাৎ একদিন বান্টি ক্লাবে আসা বন্ধ করে দেয়। আড্ডার কুফল সম্বন্ধে সে হঠাৎ সচেতন হয়ে ওঠে এবং শিক্ষিত বেকার যুবক বান্টি প্রামানিক স্বনির্ভরতার তাগিদে পাড়ার ‘আমরা কজন’ কোচিং সেন্টারে দু’বেলা পড়ানো ধরে। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে লাট্টুর সতেরো বছরের পিসতুতো বোন মামাবাড়ি বেড়াতে এলে ওরা সকলে লাট্টুর বোনের ব্যাপারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং বান্টির কথা ভাববার তাদের আর ফুরসৎ থাকে না।

হয়তো বেকারত্ব অথবা রকবাজি নিয়ে বাড়ির লোকেরা ওদের কথা শোনায়, তাই রকের ছেলেগুলো দুপুরবেলা মানসিক শান্তির খোঁজে আবার রকে চলে এসে তাস পেটায়। আজ খেলার ফাঁকে বাতাসের হিমেল ভাবটা বিল্টুর হঠাৎ ঠাহরে আসে। সে বলে ওঠে, “কোথাও একটা জল-ঝড় হয়েছে, বুঝলে মনাদা। কেমন একটা ঠান্ডা ঠান্ডা আমেজ দিচ্ছে দেখেছো…” এমন সময় বান্টিদের বাড়ির দিক থেকে হই-চই শোনা যায় এবং রকবাজগুলো তাসপাত্তি ফেলে সেইদিকে ছোটে।

বান্টিকে পাওয়া গেছে। আত্মহত্যা কেস। নিজের হাতে ব্লেড দিয়ে গলার নলি কেটেছে। ব্লেডখানা তখনও হাতে ধরা। সাহাদের তালপুকুর পাড়ে বাঁশঝাড়ের অন্ধকারে পড়েছিল। বুধির মা ছাগল খুঁজতে গিয়ে দেখতে পায় এবং সব্বার আগে সে সাহাবাবুদের বাড়ি খবর দেয়। সাহাবাবুদের বাড়িশুদ্ধু সবাই কাশ্মীর বেড়াতে গেছে, আছে বলতে কেবল জনার্দন সাহা আর তার বৌ। বুধির মা’র ডাকাডাকি শুনে জনার্দন সাহা দৌড়ে যায় এবং ঘটনা দেখেই সে বুঝে যায় যে আত্মহত্যা কেস। জনার্দন সাহা এরপর থানায় ফোন করে। থানার বড়বাবু জনার্দন সাহার খুব বন্ধু। তাছাড়া স্থানীয় এক নেতার সঙ্গেও তাঁর আজকাল দহরম মহরম খুব। ফলে জনার্দন সাহার এক ফোনে খুব দ্রুত পুলিশ এসে যায়।

পাড়ার লোকেরা বান্টির বাড়ির লোকজনদের সান্ত্বনা দেয়, আবার জনার্দন সাহার বাড়িতে এসেও দুঃখ করে যায়, “ছোঁড়া মরার আর জায়গা পেলে না! মরবি মর গেরস্তর বাড়ির দোরগোড়ায়! তোমারই বা কত ঝক্কি এখন…” পুলিশ এসে প্রথমেই বোঝার চেষ্টা করে বান্টি কোনওভাবে নীল তিমি-র খপ্পরে পড়েছিল কি না।

-“ছেলে কি ডিপ্রেশনে ভুগত? মানে হতাশা মনোকষ্ট কিছু… ভিডিও গেম্-এর নেশা ছিল কি?’’ বান্টির বাবা-মা কিছুই বলতে পারে না, তবে তার বাংলা অনার্স পড়া বোন জানায় যে কখনই না, তার দাদা বরং বরাবরই খুব প্রাণবন্ত ছেলে… আর গেম্-এর নেশা বলতে ফুটবল…

রকের ছেলেগুলো আবার রকে ফিরে আসে। তারা মানুষের মনোকষ্ট নিয়ে আলোচনা করতে থাকে। একটা বিষয়ে তারা সকলেই একমত হয় যে মানুষের মনে মাঝে মাঝে এমন কিছু কষ্টও থাকতে পারে যার হদিশ হয়তো বাবা, মা, ভাই, বোন বা বন্ধু-বান্ধব কারও পক্ষেই পাওয়া সম্ভব হয় না। সে কষ্ট অতলান্তিক সমুদ্রের মতই রহস্যময়, হিমশীতল, বিষ-নীল। খুব গভীর ও গোপন কোনও প্রেম যেমন।

তারা চাপা গলায় বলাবলি করে, হয়তো বান্টি সাহাবাড়ির ছোটো-বৌয়ের প্রেমে পড়েছিল…

সে হয়তো প্রায়ই বৌটার সঙ্গে ফোনে কথাবার্তা বলতো… হয়তো ওইভাবেই ধীরে ধীরে ওদের মধ্যে প্রেম জন্ম নেয়… বৌটার কাছ থেকেই উৎসাহ পেয়ে বান্টি কাজকম্ম শুরু করে… হয়তো সে ভেবেছিল একদিন বৌটাকে নিয়ে সটান পালিয়ে যাবে… কিন্তু কোথায় সাহাবাড়ির ছোট বৌ আর কোথায় টিউশনি মাস্টার বান্টি প্রামানিক। বৌটা হয়তো পালিয়ে যেতে বেঁকে বসে এবং উলটে বান্টিকে অপমান টপমান করে। সেই দুঃখেই হয়তো সে নিজের গলায় ব্লেড চালায়…

অথবা আবার এমনও হতে পারে যে কোনও এক দুপুর বেলায় জনার্দন সাহা তার বৌকে বান্টির সাথে দেখে ফেলে। বান্টি হয়তো প্রায়ই দুপুরে কোনও না কোনও ছুতোয় পুকুরপাড়ে আসত। তারপর এক ফাঁকে বাড়ির লোকেরা যখন ঘুমোচ্ছে এবং জনার্দন সাহা বাড়ি নেই, তখন সে সুযোগ বুঝে দোতলার ঘরে বৌটার কাছে চলে আসত। তখন হয়তো তারা অমৃতজ্ঞানে ভালোবাসা (ভ্যাবলার অটো-র পিছনের গ্রাফিতি অনুসারে যা আসলে ‘মিষ্টি বিষ’) পান করে নীলকণ্ঠ এবং নেশাতুর… কোনও অমর্ত্য-লোকের অধিবাসী…। এদিকে ছকের বাইরে এমন কিছু একটা আঁচ করে জনার্দন সাহা হয়তো আগে থেকেই তক্কে তক্কে ছিল। সে–ই হয়তো উপযাচক হয়ে বাড়িশুদ্ধু সবাইকে কাশ্মীর বেড়াতে পাঠিয়ে দেয়। তারপর এক দুপুরে হঠাৎ অসময়ে বাড়ি ফিরে কাউকে কিচ্ছুটি না বলে সে চুপিসাড়ে দোতলায় নিজের ঘরে উঠে আসে। বান্টি পালাবার পথ পায় না। জনার্দন সাহা রাগের মাথায় রোগা-পটকা বান্টিকে পেড়ে ফেলে। তারপর বাড়ির চাকর তথা অফিসের কর্মচারী রতনের সাহায্যে তাকে তালপুকুর লাগোয়া বাঁশবনে নিয়ে গিয়ে ফেলে। রতন হয়তো পিছন থেকে এসে বান্টিকে চেপে ধরে। জনার্দন সাহা ব্লেড চালায়।

অথবা, হয়তো ওসব কিছুই নয়। সে প্রেমে-টেমেও পড়েনি বা তার মনে কোনও কষ্ট-ফষ্টও ছিল না। হয়তো নিছক কোনও আততায়ীর হাতে বান্টি আলটপকা খুন হয়ে যায়। সে হয়তো এমনই কোনও কারণে সাহাদের তালপুকুরপাড়ে গিয়েছিল… হয়তো সে প্রায়ই অমন যেত… মজা পুকুরের জলে পাতা ঝাঁঝির নীলচে-সবুজ রঙ… হয়তো তার ভালো লাগত… অথবা বাঁশবনের নির্জনতায় বসে সে ধ্যান-ট্যান করত…

সেদিন সে এমনই যখন একা একা পুকুরপাড়ে বসেছিল, তখন সেইসব আততায়ীরা হয়তো বাঁশবনে বসে চাপা গলায় অপরাধের ছক কষছিল; হয়তো কোনও খুনের অথবা ড্রাগ কি মেয়ে পাচারের। তাদের মধ্যেই কেউ হয়তো হঠাৎ অদূরে বান্টির উপস্থিতি টের পেয়ে যায়… তখন তারা, চুপিসাড়ে পিছন থেকে এসে বান্টিকে ধরে ফেলে এবং প্রমাণ লোপাটের জন্য তার গলায় ব্লেড চালায়…

তবে, বেশ কিছুদিন পর, কেউ একজন খবর নিয়ে আসে যে পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট নাকি এসে গেছে এবং তা থেকে নাকি জানা যাচ্ছে নতুন চকচকে ব্লেডখানা দিয়ে নিজের গলার নলি নিজে হাতে কেটে বান্টি আত্মহত্যা করেছে। সম্ভবত সে ক্রনিক ডিপ্রেশনে ভুগছিল।

তখন রকবাজ ছেলেগুলো বান্টির ডিপ্রেশনের কথা ভাবে। হয়তো ভালো চাকরি পাচ্ছিল না বলে… নতুবা মায়ের অসুখের জন্য… নইলে গ্রামের সব পুকুরগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে দেখে… অথবা সোমালিয়ার দুর্ভিক্ষের কারণে… অথবা এই সমস্ত কিছু মিলিয়ে মিশিয়ে বান্টি গোপনে গোপনে গভীর ডিপ্রেশনে ভুগতে শুরু করেছিল…। এর মধ্যে, পাড়ায় চিত্তরঞ্জন স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হয় এবং ছেলেগুলো সেই নিয়ে মেতে ওঠে। ফলে বান্টি বা তার ডিপ্রেশনের কারণ সবটাই তাদের মাথা থেকে বেরিয়ে যায়।

এরপর একদিন, এক উজ্জ্বল সকালে রাধু মিত্তিরের রেশন দোকানে একটি দৃশ্যের জন্ম হয়: ফোজো বুড়োকে দোকানের দাওয়ার এক ধারে মাথায় হাত দিয়ে বকের মত উবু হয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। দোকানে ভিড় সামলাতে সামলাতে রেশন ডিলার রাধু মিত্তির হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিল। তবু সে ফোজো বুড়োকে লাইনে না দাঁড়িয়ে অমন ভাবে বসে থাকতে দেখে খোঁজ নেয় যে তার শরীর গতিক ঠিক আছে কি না।

-হ্যাঁ রে বাপধন। ওসব ঠিক আছে…

-তবে?

-আমার র‌্যাশান কাড্ডা খোয়া গেছে রে বাপ্!

-রেশন কার্ড খোয়া গেল কি ভাবে? (আশপাশে কৌতূহল ঘনিয়ে ওঠে।)

ফোজো মণ্ডল ব্যাগভর্তি বাজার করে বাজারের ব্যাগটা পরিতোষের মুদির দোকানের খুঁটিতে ঠেসান দিয়ে রেখে সাইকেলটা আনতে গেছিল। সেই ব্যাগের মধ্যে ছিল কুমড়ো, বেগুন, আঁটিকয় পালং, বাঁধাকপি… আর রেশন কার্ড। সাইকেল নিয়ে ফিরে এসে ফোজো বুড়ো দেখে বুধির মা’র নচ্ছার ছাগলটা কোথা থেকে এসে সেই ব্যাগ গুঁতিয়ে ফেলেছে। ব্যাগের ভেতরকার জিনিসপত্র চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে একাকার। ওরই মধ্যে ছাগল আয়েশ করে চক্ষু মুদে মুখ চালাচ্ছে। তার বাজার করা শাক বা সবজি… ছাগল ছোঁয়নি কিছুই। কেবল পরিপাটি করে তার রেশন কার্ডখানা চিবিয়ে খেয়ে গেছে।

ফোজোবুড়োর কাহিনি শুনে ধারে কাছে উপস্থিত সকলে হেসে ওঠে। ‘ছাগলে কি না খায়’ এই বহুশ্রুত কাহাবতের যাথার্থ্য উপলব্ধি করে তারা বিস্ময় বোধ করে। যারা অপেক্ষাকৃত দূরে ছিল হাস্যরত লোকজনদের থেকে হাসির কারণটা ক্রমে তাদের কাছে পৌঁছয়… এবং আর দূরে অবস্থিত লোকজন আবার তাদের থেকে সে কাহিনিব্যাপারে অবগত হয়। ক্রমে হাসির একটা হল্লা রাধু মিত্তিরের রেশন দোকান থেকে জন্ম লাভ করে কোনও ছোঁয়াচে রোগের জীবাণুর মত গোটা এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে। জনার্দন সাহা বাইকের পিছনে তার সর্বক্ষণের সঙ্গী রতনকে বসিয়ে কোথা থেকে একটা ফিরছিল। বাইক একদিকে কাত করে সেই দিকের পা মাটিতে ঠেকিয়ে পাশের পান-বিড়ির দোকান থেকে সিগারেট কেনার সময় বিষয়টা তারও শ্রুতিগোচর হয়। সে-ও হা হা করে হেসে উঠতে যায়, আর অমনি, ঠিক তার ঘাড়ের কাছে একটা কনকনে ঠান্ডা হাওয়া সে অনুভব করে।

তখন হয়তো জনার্দন সাহারও মনে হয় কাছে পিঠে কোথাও দু এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে…

চিত্রকর: মৃণাল শীল

Comments are closed.