সোমবার, অক্টোবর ২১

অন্ধকারের জন্য

  • 60
  •  
  •  
    60
    Shares

সুবীর মজুমদার

রাত প্রায় পৌনে আটটা । বিপ্লব স্নান সেরে সবে চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছে। আজ অফিসে তার বড় ধকল গেল। লম্বা মিটিং, তারপর মিনিটস রেডি করে ওকে বেরতে হয়েছে। সোফায় বসা বিপ্লবের হাতে মৃদুলা মোবাইলটা দিয়ে বলল, অজয়দার ফোন। মৃদুলা রান্নায় ব্যাস্ত ছিল। ডাইনিং কাম ওপেন কিচেন থেকে এসে ফোনটা সে দিয়ে গেছিল বিপ্লবের হাতে। পাশের ঘর থেকে শব্দ করা মোবাইলটা কুঁড়েমি করে বিপ্লব আনেনি। মৃদুলা রান্না থামিয়ে সেই কাজটা করল। তার এখন দাঁড়ানোর সময় নেই। রান্না ঘরের দিকে যেতে যেতে বলল, অজয়দার কি ব্যাপার কে জানে। কিছুক্ষণ আগেই তো দেখলাম জানলায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে।

মৃদুলা তার সকালের রান্নার অনেকটাই সেরে রাখে রাতে। সকালে ওর দেরিতে ওঠা অভ্যাস। অফিসের রান্না অত কম সময়ে হয়ে ওঠে না। সিটি মারতে থাকা কুকারটা ওভেন থেকে নামাতে নামাতে বলল, একেবারে তো সামনের বাড়ি। মাঝে একটা মাত্র সরু রাস্তা। তাও আবার কানাগলি। যানবাহনের কোলাহল নেই। একবার হাঁক মারলেই তো তোমার সারা পেতো। বিপ্লব জানে তার বউ কথা বলে বেশি। এই কথাগুলো যাকে উদ্দেশ্য করে বলছে সে কিন্তু শুনছে না।

নিজের মনে মৃদুলা কথা বলেই যাচ্ছে, তাই বলছি, ফোন করার কি ছিল জানি না। মানুষটা একটু জিরোবে তার যো নেই।

মোবাইলটা কেঁপে যাচ্ছে। বিপ্লবের একটু হতভম্ব অবস্থা। তার এক হাতে চেঁচাতে থাকা মোবাইল আর এক হাতে চায়ের কাপ।

মৃদুলার কথা বলার বিশেষ স্টাইল আছে। নিজের প্রশ্নের সে নিজেই উত্তর দেয় ।

তুমি তো আজ হেঁটেই এলে। অজয়দা তোমায় দেখেছে নিশ্চয়ই। ডেকে বললেই পারত, কি বলার আছে। টায়ার্ড মানুষটাকে শুধু শুধু ফোন করার দরকার হতো না।  শেষের কথাগুলো বলল ডালে ফোড়ন দিতে দিতে। জিরে তেজপাতা ভাজা গন্ধ ছড়িয়েছে ঘরে। চিমনি চলার আওয়াজ সত্ত্বেও মৃদুলার গলা ভালই পাচ্ছিল বিপ্লব। বেজে যাওয়া মোবাইলের দিকে তাকিয়ে বিপ্লব আর এক চুমুক চা খেল। তারপর যতক্ষণে সে কলটা রিসিভ করল অনেকেই হয়তো অধৈর্য হয়ে কেটেই দিত। কিন্তু অজয় কাটেনি। তার প্রথম কথা, বিপ্লবদা ডিস্টার্ব করলাম? বিপ্লব লজ্জা পায়। ভাবে, কে জানে মৃদুলার কথাগুলো শুনে ফেলল নাকি?

– না না, বল ।

– আমাদের বাড়ির ঠিক আগে একটা অটো দাঁড়িয়ে আছে দেখলেন? অজয়ের গলাটা অন্য রকম শোনালো বিপ্লবের কানে।

– হ্যাঁ, দেখেছি ।

– কি দেখলেন ?

– আমি তো ভাবলাম তোমরা অটোটাকে ডেকেছ। কোথাও হয়ত তোমাদের যাবার আছে ।

– না বিপ্লবদা। অকারণে অটোটা দাঁড়িয়ে আছে। তা প্রায় আধ ঘন্টার কাছাকাছি হবে। ড্রাইভারটার চেহারা দেখলেন? বাউন্সার টাইপের ফিগার। আর কেমন যেন বেয়ারা হাবভাব ।

– মানে ?

– মানে সন্দেহজকনক ভাবে এদিক ওদিক দেখছে। অটোর ভেতরে কেউ একজন আছে। কিন্তু অন্ধকারে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। একটা বদ মতলব আছে মনে হয়। আমার, মানে আমাদের খুব ভয় করছে

– কিসের ভয়?

– বুঝতে পারছেন না? এমন তো হতেই পারে কোনও বাজে ব্যাপার ঘটতে চলেছে! কোনও একটা ঘটনা যদি ঘটে যায় তবে তো আমরাও জড়িয়ে যেতে পারি। বুঝতে পারছেন?

– তোমার ভয়েস খুব কম আসছে ।

– আমরা খুব টেনসড দাদা। ভেতরের ঘর থেকে বলছি।

মৃদুলা আবার চলে এসেছে বিপ্লবের সামনে। চোখে মুখে অনেক জিজ্ঞাসা নিয়ে তাকিয়ে থাকে স্বামীর দিকে। বিপ্লব ইশারায় বউকে বোঝায়, সিরিয়াস ব্যাপার।

মৃদুলা বলে, তোমার চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। বিপ্লব কাপের দিকে তাকায়। অজয় বলে, দাদা আপনি চা খেয়ে নিন। পরে আবার ফোন করছি। এখন সাহাবাবুর ফোন ঢুকছে।

সাহাবাবু বিপ্লবের নেক্সট ডোর নেবার। পুলিশের সার্কেল ইন্সপেক্টর হিসাবে গত বছর উনি রিটায়ার করেছেন। চৌকস মানুষ। মোবাইলটা রাখতে রাখতে সে মৃদুলাকে বলল, ওদের বাড়ির ঠিক আগে একটা অটো অনেক্ষণ ধরে সন্দেহজনক ভাবে দাঁড়িয়ে। ঠান্ডা হয়ে আসা চায়ে পর পর দু’চুমুক মেরে কাপটা সেন্টার টেবিলে রাখে। মৃদুলা নাইটিতে হাত মুছতে মুছতে বিপ্লবের পাশে সোফায় বসে পড়ে।

মৃদুলা প্রশ্ন করে, কিসের সন্দেহজনক?

– একটা গুন্ডা মতন লোক আমাদের এই রাস্তায় দাঁড়িয়ে। সঙ্গে একটা অটো। অটোর ভেতরে কেউ বা কারা সম্ভবত আছে। তবে পরিস্কার নাকি বোঝা যাচ্ছে না। অজয় সন্দেহ করছে লোকটার কোন খারাপ অভিসন্ধি আছে।

– খারাপ অভিসন্ধি মানে ?

– অজয় কি ভাবছে জানি না। তবে আমার মনে হল ওরা খুব ভয় পেয়েছে। হয়তো ভাবছে ডাকাতি হতে পারে। হয়তো ভাবছে, দলের বাকি লোকেরা পরে আসবে। এরা এখন রেইকি করছে।

একটু চুপ থেকে মৃদুলা প্রশ্ন করে, রেইকি জিনিসটা কি?

স্পট দেখে নিচ্ছে। কাজটা কতটা কী ভাবে করবে। অপরাধীরা অপারেশনের আগে জায়গাটা ছকে নেয়। কী জানি। আমাদের গলিটা তো বেশ নির্জন। সত্যি বলছি। ডাকাত দল হতেই পারে।

– সেকি গো! আমারও তো ভয় করছে! ফ্যাস ফ্যাসে গলায় কথাটা বলল মৃদুলা।

– হ্যাঁ, বেশ সিরিয়াস ম্যাটার। বিপ্লবের কনফিডেন্স বেশ কমে এসেছে সেটা বলার ঢং দেখে বোঝা যাচ্ছে। দাঁড়াও অজয়কে ফোন করি।

ফোন করার আগেই অজয়ের ফোন আসে। ফিস ফিস শব্দে অজয় বলে, অটোটা গড়িয়ে গড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে আপনাদের বাড়ির দিকে। একবার জানালা দিয়ে দেখুন। আর সাহাবাবু বললেন, আমরা যদি বেরোই একা একদম নয়। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বেরোতে বলল। ওই ছেলেটার কাছে মারাত্মক অস্ত্র থাকতেই পারে। বিপ্লবের ঠিক সামনের বাড়ির গুঁই বাবু নাকি দেখেছেন অটোর ভেতরে একজন সুবেশা মহিলা বসে। কোলে ছোট বাচ্চা। এটা উনি সাহা বাবুকেও বলেছেন। ব্যাপারটা কোনদিকে যাচ্ছে বুঝতে পারছেন বিপ্লবদা?

– আমাদের কাউন্সিলার পিন্টুদা চুপচাপ থাকতে বলল। বেরতে বারণ করল। বললেন, ওরা একেবারে যেন বুঝতে না পারে যে আমরা ওদের সন্দেহ করছি।

বিপ্লব অন্য ভাবে দেখছে, আচ্ছা এমন তো হতে পারে আমরা অকারণে সন্দেহ করছি।

– বলেন কী? যারা শুনছে তারাই বলছে উদ্দেশ্য খারাপ। এমন ঘটনা তো হরবখত হচ্ছে। তা সাবধানের মার নেই। সবাই যখন বারণ করছে বেরনোর দরকার নেই!

বিপ্লব কনফিউজড। মানে বেশ ভয় পেয়েছে। কিন্তু আর কিছু বলে না।

– আপনি আগে ওদিকে দেখুন কি হচ্ছে। পরে জানাবেন।

কাঁচের সেন্টার টেবিলে ওপরে মোবাইলটা রাখতে গিয়ে ঠক্ করে আওয়াজ হয়। বিপ্লব তার স্ত্রীর দিকে তাকায়।

মৃদুলার চুপ থাকার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। কি হয়েছে বলবে তো! ফোনে তখন থেকে বকবক করেই যাচ্ছে। বিপ্লব নিজের ঠোঁটের ওপর তর্জনি চেপে বোঝাতে চাইল, তুমি এখন চুপ থাকো। বড় প্রবলেম। সিরিয়াস ব্যাপার।  ফিসফিস করে বলে, আমার সঙ্গে ওপরে এসো। পরে  সব বলছি।

তারপর সে সটান দোতলার ব্যালকনিতে পৌঁছে যায়। মৃদুলাও পিছু নেয় বিপ্লবের। একেবারে হামাগুড়ি দিয়ে দোতলার ব্যালকনিতে ওরা পজিশন নিয়েছে। দ্যাখে ছেলেটা বা লোকটা একহাতে অটোর হ্যান্ডেল ধরে অন্য হাত দিয়ে ঠেলে অটোটাকে গড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ওদের বাড়ি পেরিয়ে দাঁড়াল একদম অন্ধকার নির্জনতম জায়গাটায়। কানাগলির শেষ যাকে বলে। যেটুকু বা আলো ওখানে যেতে পারত সেটা আটকাচ্ছে বড় একটা সজনে গাছ। ছেলেটার চেহারা যেমন অজয় বলেছিল ঠিক সেরকমই। আধো অন্ধকারে চোখ সেট হলে বোঝা যায় ভেতরে একজন মহিলাই বসে আছে মনে হচ্ছে। বাচ্চা টাচ্চা আছে বলে বোঝা যাচ্ছে না।

বেয়ারা ধরনের লোকটা বা ছেলেটা মাথা নীচু করে অটোর ভেতরের মহিলাটির সঙ্গে কথা বলেছে। দোতলার ব্যালকনি থেকে একটা শব্দও শোনা যাচ্ছে না। অটোর ভেতরে মোবাইলের টর্চ জ্বলল। বাচ্চাটাকে দেখা গেল। খুব ছোট। সাত–আট মাসের হবে। ব্যাগ থেকে কিছু খুঁজছে। বোধহয় পাচ্ছে না।

অজয়ের ফোন। বিপ্লব আগেই মোবাইল সাইলেন্স মোডে রেখেছিল। ফোনটা কেঁপে ওঠায় সে হামাগুড়ি মেরে ঘরে চলে আসে। মনে হল অজয়ের গলায় একটা মাত্রা পেয়েছে। বলল, বাচ্চাদের দ্যাখে গোন্দলপাড়ার অরিন্দম ডাক্তারকে জানেন?

– না।

– কয়েকদিন আগে ওনার চেম্বার থেকে নাকি একটা বাচ্চা চুরি গেছে। ওখানকার ছেলেরা এদের খুঁজছে। পিন্টুদা এই খবরটা ওদের দিয়েছে। দেখুন, খেলাটা কিন্তু এবার জমে উঠবে।

অজয়ের কথার পিঠে কী বলবে সেটা ভাবছিল বিপ্লব।

এর মধ্যে মৃদুলা ব্যালকনি থেকে বিপ্লবের পাশে চলে এসেছে। বিপ্লবকে ধাক্কা দিয়ে কিছু বলতে চাইছে। বিপ্লব নীচু স্বরে বলে, কি হল?

– শুনতে পাচ্ছ?

– কি?

– নীচে কলিং বেল বাজছে। ওই ছেলেটা বাজাচ্ছে।

– কোন ছেলেটা?

– আরে ওই অটোওলা। দেখলাম আমাদের বাড়ির দিকে এলো। মনে হচ্ছে বাচ্চাটার জন্য কিছু হেল্প চাইছে। যাব নীচে?

– না না একদম যেও না। অজয়কে ফোন করি।

– বাচ্চাটা কাঁদছে। যাই, দেখি না, কী হবে? কথাটা শেষ করে মৃদুলা তরতর করে একতলায় নেমে গেল। শুনল না বিপ্লবের বারণ।

সিঁড়ি লাগোয়া ছোট জানালাটা খুলে মৃদুলা একটু চেঁচিয়ে বলে, এদিকে আসুন। মৃদুলার গলায় বেশ আত্মবিশ্বাস। আধো অন্ধকারে মৃদুলা ছেলেটাকে দেখছিল। বয়স তিরিশ মতো হবে। চোখমুখ বেশ বিব্রত। হাতে একটা ফিডিং বটল।

– দিদি একটা উপকার করবেন?

– আপনারা এখানে কি করছেন? মৃদুলা কোনও সময় দেয়না। প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়।

– ডঃ অরুণ ঘোষকে দেখাতে নিয়ে গেছিলাম। সেখানে ছেলেটা খুব কাঁদছিল। আজ খুব ভিড়। ভেতরে বসার জায়গা ছিল না । তাই এখানে নিয়ে এলাম মায়ের দুধ খাওয়ানোর জন্য।

– তো ওখান থেকে আবার গাড়িটাকে গড়িয়ে গড়িয়ে এখানে নিয়ে এলেন কেন? মৃদুলা’র পরপর প্রশ্ন।

– বউ বলল ছেলেটা ঘুমোবে। আগে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম জায়গাটায় বেশ আলো। আমার ছেলে আবার আলোতে একদম ঘুমোতে পারে না। দেখলাম এই জায়গাটা বেশ নির্জন আর অন্ধকার মতো। তাই এখানে নিয়ে এলাম।

মৃদুলার ভেতর থেকে একজন ‘মা’ বেরিয়ে আসছে। বলল, বাচ্চাটার কি হয়েছে?

– না না কিছু হয়নি। আপনাদের আশীর্বাদে ছেলে ঠিক আছে। আজ ওর টিকা দেওয়ার দিন।

– কি লাগবে বল ভাই। মৃদুলার কণ্ঠস্বরে এই প্রথম স্নেহ ঝরে পড়ছে।

ছেলেটা গলির দিকে পিছন ফিরে তাকায়, একটা গোলযোগের শব্দ ভেসে আসছে।

– ফোটান জলের বোতলটা চেম্বারে ফেলে এসেছি। ছেলেটা জল খাবে। ঘরে আপনাদের এ্যকোয়াগার্ডের জল আছে?

ছেলেটা আরও একবার পিছনে তাকায়। গোলযোগের শব্দটা ক্রমশ কাছে আসছে।

– মৃদুলা গ্রিলের ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে দেয়। বলে, দিন বোতলটা। তারপর এক মিনিটের কম সময় হবে মৃদুলা দ্রুত জল ভরে নিয়ে আসে। ওর আর কোনও সংশয় নেই। দরজা খুলে দিয়েছে। বাড়িয়ে দেয় জল ভর্তি ফিডিং বটল। ছেলেটি কৃতজ্ঞতার হাসি হাসে।

গোলমালটা প্রায় ওদের বাড়ির সামনে চলে এসেছে। মৃদুলা দেখল একদল ছেলে। সবার হাতে লাঠি । মুখ থেকে ঝরছে খিস্তি আর হিংস্র লালা। ভিড় থেকে ভেসে আসা ‘ছেলে ধরা’ কথাটা মৃদুলার কানে এলো। ভয়ে কেঁপে উঠল ওর বুক। ছেলেটা রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে গেছে। ওকে ক্রদ্ধ মানুষগুলো ঘিরছে। দেখতে দেখতে রাস্তাটা ভিড় হয়ে গেল। বিপ্লব নীচে নেমে এসেছে। দরজায় মৃদুলা নেই। ফোন করেছিল অজয়কে। কিন্তু ধরেনি, ফোন কেটে দিয়েছে। একটা ছোট স্ট্রিট লাইটের দুর্বল আলোয় সে মৃদুলাকে দেখতে পাচ্ছে না। চড় থাপ্পর শুরু হয়েছে। ছেলেটা চেঁচাচ্ছে। মারছেন কেন আমাকে? এটা আমার বাচ্চা। কথাটা পুরো শেষ করতে পারে না। কঁকিয়ে ওঠে। আর কারও কোনও কথা শোনা যাচ্ছে না । বেদম মার চলছে। বিপ্লব এবার মৃদুলার গলা পেল। বলছে, মরে যাবে। ছেড়ে দিন। ছেড়ে দিন। আর এক মহিলার তীব্র কান্নার শব্দে জায়গাটা হঠাৎ করে বধ্যভূমির মতো লাগে বিপ্লবের।

মৃদুলাকে বাঁচাতে বিপ্লব ওই গন্ডগোলের এপিসেন্টারে ঢুকে যায়। দ্যাখে ছেলেটিকে জাপটে ধরে রেখেছে মৃদুলা। ভয়ঙ্কর ঠেলাঠেলি হচ্ছে। বিপ্লব হুমড়ি খেয়ে পড়ে। মৃদুলা চিৎকার করছে, বাঁচাও বাঁচাও। বিপ্লব চেঁচাচ্ছে, অজয় অজয়। যদিও কিছুই শোনা যাচ্ছে না। মৃদুলা বিপ্লবের জামা খামচে ধরে চেঁচাচ্ছে, এদের বাঁচাও। এরা ছেলেধরা নয়। বিপ্লবের চেহারা খারাপ নয়। চোখের পলকে একজনের লাঠি সে কেড়ে নেয়। তারপর সেটাকেই ঢাল করে। মৃদুলা টেনে হিঁচড়ে ছেলেটাকে দরজার কাছে নিয়ে আসে। তারপর নিজেদের বাড়ির ভেতরে ছেলেটিকে ঢুকিয়ে বলে, ভেতরে চলে যাও।

মৃদুলা বাড়ির প্যাসেজের মুখে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে। এটা আমার বাড়ি। আমি বলছি আপনারা চলে যান। ওর এমন মূর্তি বিপ্লব কোনওদিন দ্যাখেনি। নাইটি পড়া মৃদুলার বুকে ওড়না নেই। সেদিকে ওর কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। দু’হাত দু’দিকে ওপরে তুলে চিৎকার করে যাচ্ছে, এটা আমার বাড়ি…। বিপ্লব বুঝতে পারছে না এটা মৃদুলার কান্না নাকি প্রতিরোধ। বিপ্লব বাচ্চা সমেত অটোর মহিলাটিকে নিয়ে আসে বাড়িতে। বাঘিনীর মতো মৃদুলা তখনো ফুঁসছে, চলে যান আপনারা… চলে যান…। একে একে সবাই চলে যাচ্ছে। দরজা বন্ধ করার আগে বিপ্লব এক মুহূর্তের জন্য অজয়কে দেখতে পেল। নিজেকে মানুষের আড়ালে রেখে ফিরে যাচ্ছে বাড়ির দিকে। গুঁই বাবুরা নিজেদের ব্যালকনির ভেতরেই নিজেদের আটকে রেখেছেন। তবে ওনারা বাইরের সব আলো জ্বেলে দিয়েছেন। রাস্তায় কয়েকজন দাঁড়িয়ে তাদের সঙ্গে আকস্মিক এই ঘটনার পর্যালোচনা করছেন। অজয়ের বাড়িরও সব আলো জ্বালানো।

ভেতরে এসে বিপ্লব দ্যাখে মেয়েটি কাঁদছে আর শুয়ে থাকে ছেলেটির মাথায় হাত বুলোচ্ছে। ছেলেটি সাদা মারবেল মেঝেতে শুয়ে বোকার মত এদিক ওদিক দেখছে। মুখটা পুরো ফোলা। বিপ্লব মনে মনে ভাবছে এর পর পুলিশের হাঙ্গামা শুরু হবে। প্রথমে থানায় যাও। তারপর এটা করো ওটা করো। কোর্টে যাও। অপরাধীদের নাম বলো। ওহো, সেটা আবার বলা যাবে না। বললেই শুরু হবে উল্টো ঝামেলা।

ছেলেটার গা থেকে কেমন একটা গন্ধ বেড়োচ্ছে। গন্ধটা চেনা লাগছে কিন্তু মনে আসছে না।

এর পরের ঘটনাটা খুবই আকষ্মিক। হঠাৎ রাস্তা থেকে কয়েকজন গালিগালাজ করা শুরু করে। বিপ্লব বুঝে যায় সেটা তাদের উদ্দেশে করা হচ্ছে। সে রাস্তার দিকের ব্যালকনিতে সবে যাবে ভাবছিল। ঠিক তখনই শুরু হল ইঁট বৃষ্টি। কেউ বা কারা ওদের বাড়ি লক্ষ্য করে ইট ছুড়ছে। পর পর জানালার কাঁচ ভাঙ্গার শব্দ। এবার রাস্তার দিক থেকে হলুদ রঙের জোরালো আলো ভেতরে ঢুকতে শুরু করল। ক্রমশঃ আলোটা জোরাল হচ্ছে। চমকে ওঠার মত ব্যাপার। বিপ্লব দেখল, রাস্তায় দাঁড় করানো অটোটা দাউদাউ করে জ্বলছে। সম্ভবতঃ পেট্রল দিয়ে ওরা অটোটাকে জ্বালিয়ে দিয়ে গেল। আর শাসিয়ে গেল, মনে রাখবেন, অন্ধকারে ঠেলাঠেলিতে আপনি কাউকে চিনতে পারেননি। মৃদুলা বিপ্লবের দিকে তাকায়। বিপ্লবের নাকে সেই লেগে থাকা গন্ধটাকে সে চিনতে পারে। এটা পেট্রলের গন্ধ। তারমানে ওরা প্রস্তুত হয়ে এসেছিল। ছেলেটাকে পুড়িয়ে মেরে ফেলতো। সেটা না পেরে ওর অটোটাকে পোড়ালো। নীচু হয়ে ছেলেটার গায়ে হাত দেয় বিপ্লব। গা ঠান্ডা। শরীরটা পুরো পেট্রলে চান করিয়ে দিয়েছে হুলিগানগুলো। প্যান্টটা এখনো ভিজে। সোফায় বসে মৃদুলা বাচ্চাটাকে জল খাওয়াচ্ছে। শুয়ে থাকা ছেলেটার ট্রমা তখনও কাটেনি। ক্ষীণ হলেও ছেলেটার ওপর বিপ্লবের যেটুকু সন্দেহ ছিল সেটা কেটে গেল। দেখল, এত মার খাওয়ার পরেও ছেলেটার মুঠোয় শক্ত করে ধরা একটা ফিডিং বটল।

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ

Comments are closed.