অদৃশ্য বশীকরণ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    গৌর কারক

    বাস চলছে আপন গতিতে। মসৃণ রাস্তা। রাস্তায় খাল-ডোব নেই। থাকলেও বোঝা যায় না। লাক্সারি বাস। এ বাসে ঝাঁকুনি সেভাবে লাগে না। তবু আমার ঘুম আসছে না। বাসে আমার ঘুম হয় না। চাকরি করি। ডেলি প্যাসেঞ্জার। বাসে একঘণ্টা দশ-কুড়ি মিনিটের পথ। কয়েকজন সহযাত্রী আমার সঙ্গে বাসে উঠেই ঘুমোতে শুরু করে। সিট পেয়ে গেলে পোয়াবারো। আরামসে ঘুমোতে ঘুমোতে যায়। সিট না পেলেও বাসের রড ধরে ঢুলতে থাকে।
    আমাদের বাসে সবাই ঘুমোচ্ছে। না ঘুমোলেও জেগে থাকার কোনও লক্ষণ নেই। আমার গায়ে হেলান দিয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে নীতা। জেগে আছি শুধু আমি। ঘুমোবার যে চেষ্টা করিনি তা নয়। পুশব্যাক সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজে থাকছি অনেকক্ষণ। ঘুমও নেমে আসছে চোখে। একটু পরে হঠাৎ ভেঙে যাচ্ছে ঘুম।
    পরশু রাতটাও কেটেছে এভাবে। সারারাত এই ঘুম, এই জেগে থাকা। এতে আমার কোনও অসুবিধে হয় না। এমনিতে আমার ঘুম কম। ঘণ্টা চারেক ঘুমোলেই শরীর ফ্রি। এমনকি একটানা দু-তিন রাতও না ঘুমিয়ে থাকতে পারি। আমার ঠিক উল্টো নীতা। ও চব্বিশ ঘণ্টাই ঘুমোতে পেলে আর কিছু চায় না। ঘুমোয়ও। আটটার পর আমি অফিসে বেরিয়ে যাই। দশটা নাগাদ মেয়ে যায় স্কুলে। তারপর ও ঝাড়া হাত-পা। বারোটা থেকে চারটে পর্যন্ত টানা ঘুম। আবার রাত দশটার মধ্যে শুয়ে পড়ে। সেই মেয়ে বেড়াতে বেরিয়েও যে ঘুমোবে না, তা কি হয়! সেই সঙ্গে বাস জার্নির ধকল তো আছেই। আর এই ঘুমের জন্যই ওর কাল হাসিমারার জঙ্গল দেখা হল না। চা-বাগানেও ঘোরা হল না।
    তবে আমি ঘুরতে বের হয়েছিলাম। জঙ্গলে নয়, চা-বাগানে। জঙ্গলে যেতে হলে গাড়ি ভাড়া করতে হত। নীতা যেতে রাজি থাকলে, আরও দু-চারজনকে রাজি করিয়ে নিতাম। অন্ততপক্ষে শিশিরবাবু, সীমাকে তো রাজি করাতাম। কিন্তু বেঁকে বসে নীতা। সারারাত জার্নি করে এখন ওর ঘুম চাই, ঘুম। তবু বলি, ‘‘ঠিক আছে জঙ্গল যেতে হবে না। পাশেই চা-বাগান। চা-বাগানগুলো ঘুরে দেখি।’’
    ‘‘তোমার ইচ্ছে যাচ্ছে, তুমি যাও। আমি ঘুমোব।’’ বলে খেয়ে এসে শুয়ে পড়ে।

    গ্রামের গায়েই চা-বাগান। আমাদের ওদিকে ধানি জমির মতো জমিতে প্রায় আধ মানুষসমান চা-গাছগুলো বিকেলের মন্দ আলোয় কালচে-সবুজ হয়ে আছে। পাহাড়ের ঢালে চা-বাগানের ছবি দেখা অভ্যস্ত চোখ। পাহাড়বিহীন সমতলে ওদের অবস্থান দেখে মন ভরে না। বেড়া দেওয়া বাগানে ঢুকতে ইচ্ছে যায় না।
    সীমা বলে, ‘‘চলুন না, একটু ঘুরে দেখি। এত কাছে যখন এসেছি, চা-গাছের পাতায় হাত না দিয়ে কি ফিরে যাব!’’
    আমাদেরই বাসের যাত্রী সীমা। ওরাও স্বামী-স্ত্রী এসেছে। স্কুলে পড়া ছেলে আছে ফ্যামিলিতে। আমাদের মেয়ে যেমন আছে মামাঘরে। পাড়াতেই মামাঘর। আবার আমরা ধর্মশালায় একই রুমে আছি। এদিকে আমাদের বিছানা। ওদিকে ওদের। আমি চা-বাগান দেখতে যাচ্ছি শুনে ও বলে, ‘‘নীচে একটু ওয়েট করুন। আমরাও যাব আপনার সঙ্গে।’’
    আমি নীচে নেমে রাস্তায় ওয়েট করি। কী সুন্দর ফাঁকা রাস্তা। ধোঁয়াধুলোহীন পরিবেশ। যানবাহনের কান ঝালাপালা করা শব্দ নেই। নীতার দৌলতে বছরে এক-আধবার এরকম ভ্রমণ হয়। পাড়াতেই বাপের ঘর, শ্বশুরঘর হওয়ায়, কোথাও গিয়ে দু-দশদিন থাকার জায়গা নেই।
    একটু পরে একা নেমে আসে সীমা। বলে, ‘‘ও রুম পাহারা দিচ্ছে। দিদি তো ঘুমোচ্ছে। চাবি দিয়ে আসা যাবে না। আবার দুটো ফ্যামিলির ব্যাগপত্তর আছে রুমের মধ্যে।’’
    ধর্মশালা থেকে মিনিট দুই হাঁটলেই জনপদ শেষ। বাগান শুরু। বাড়ির গায়েই বাগান। বাড়ির উঠোনে এক ভদ্রমহিলা বসে ছিলেন। সীমা ওর কাছে গিয়ে বলে, ‘‘দিদি, আমরা বাগানটা একটু ঘুরে দেখব?’’
    উনি বলেন, ‘‘দেখুন, তবে পাতা ছিঁড়বেন না।’’
    পারমিশান পেয়েই সীমা বেড়ার কাছে চলে যায়। দড়ি দিয়ে বাঁধা গেটটা খোলে। আমাকে ভদ্রমহিলা জিজ্ঞাসা করেন, ‘‘কোথা থেকে এসেছেন?’’
    ‘‘বাঁকুড়া থেকে।’’
    ‘‘আপনার স্ত্রী কি ওখানকারই মেয়ে?’’
    ‘‘হ্যাঁ।’’
    ‘‘খুব এক্সপার্ট।’’
    সঙ্গে সঙ্গে সীমা ঘাড় ঘুরিয়ে ভদ্রমহিলাকে দেখে।
    ভদ্রমহিলা বলেন, ‘‘কাছাকাছি ঘুরে দেখুন। বেশি ভিতরে যাবেন না। সন্ধে হয়ে আসছে। বাঘের উৎপাত আছে।’’
    বাগানের মাঝে আলপথ। আলপথ ধরে এগিয়ে যায় সীমা। পেছনে বাধ্য স্বামীর মতো আমি। বেশ কিছুটা ভিতরে ঢুকে দাঁড়ায়। বলে, ‘‘এগুলো ঠিক চা-গাছ বলে মনে হচ্ছে না!’’
    ‘‘কেন?’’
    একথার কোনও উত্তর না দিয়ে দু-চারটে পাতা ছিঁড়ে দু’হাতে ঘষতে থাকে। তারপর হাত শুঁকে বলে, ‘‘চায়ের কোনও গন্ধ নেই। শুঁকে দেখুন।’’ বলে দু’হাত আমার নাকের সামনে মেলে ধরে।
    আমি ওর হাতে অন্য গন্ধ পাই। ক্রিমের সুগন্ধ। আমার সঙ্গে আসার আগে ও যেমন একটু সাজগোজ করেছে, মুখে ক্রিমও মেখেছে। মরা আলোতেও চকচক করছে মুখটা।
    সেকথা ওকে বলা যায় না। ও বলে, ‘‘চলুন। আর একটু ভেতর দিয়ে যাই।’’
    ‘‘না। সন্ধে হয়ে আসছে। এ সময় ঝোপঝাড়ে না ঢোকাই ভাল।’’ একটু থেমে আবার বলি, ‘‘শুনলেন তো, সন্ধের পরে বাঘের উৎপাত আছে।’’
    ‘‘তা হলে এখানেই বসে গল্প করি।’’ বলে ও আলের ওপর বসে পড়ে।
    আমার বসার ইচ্ছে নেই। তবু বসতে হয়। বসার পর গোটা পৃথিবী থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। কেউ আমাদের দেখতে পায় না। আমরাও কাউকে দেখতে পাই না। সেকথা ভেবে ওকে বলি, ‘‘ভদ্রমহিলা আমাদের দেখতে না পেলে কী ভাববেন বলুন তো!’’
    সীমা স্বাভাবিকভাবে উত্তর দেয়, ‘‘কী আর ভাববেন। উনি তো বলেই দিয়েছেন আমরা স্বামী-স্ত্রী।’’ বলে আপনজনের মতো আমার হাতটা ওর কোলে টেনে নেয়।

    বাস চলছে আপন গতিতে। ট্যুরিস্ট বাসের গতিবেগ বেশি হয় না। হাতির মতো রাজকীয় বাস। সোঁ সোঁ করে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। আমরা এখন যাচ্ছি আসাম। কামাখ্যা মাকে দর্শন করতে।
    রাতে খাওয়াদাওয়ার পর তিন ঘণ্টা হতে চলল বাস ছুটছে। এখন অনেকেই বাস থামাতে বলছে। ড্রাইভাররা জানেন রাতের বেলা কোথায় বাস থামাতে হয়। সেখানেই ওরা বাস থামান।
    রাস্তার এদিকে দু-তিনটে বড় ধাবা। ওপারেও আছে কয়েকটা। ধাবাগুলোতে লোকজন আছে। আমরা সবাই বাস থেকে নেমে শরীর হাল্কা করে নিই। কেউ কেউ চা খেতে যায় ধাবায়।
    শিশিরবাবু আমাকে বলে, ‘‘চলুন দাদা, একটু চা খেয়ে আসি।’’
    ‘‘মাঝরাতে চা খাওয়া আমার অভ্যেস নেই।’’
    ‘‘আমারও নেই। কোন গিন্নি স্বামীকে মাঝরাতে চা করে দেয়!’’ তারপর বলে, ‘‘ফকোটিয়া পেলে সদ্ব্যবহার করে নিতে হয়।’’
    সঙ্গে সঙ্গে আমার ওর স্ত্রীর কথা মনে পড়ে। চা-বাগানে ওকে ফকোটিয়া পেয়েও সদ্ব্যবহার করতে পারিনি। সেজন্য ও খুব ক্ষুন্ন। ফেরার সময় আমার সঙ্গে ভাল করে কথা বলেনি। এমনকি আজ সকালে আমরা একই গাড়িতে ভুটান গিয়েছিলাম। সেখানেও অচেনা লোকের মতো ব্যবহার করেছে।
    আবার বাস ছাড়ে। বাসের ভিতরের আলো সব অফ হয়ে যায়। কেউ কারও মুখ দেখতে পাই না। বাসে উঠেই প্রথমকার টু-সিটে আছি আমরা। আমাদের পিছনের সিটে ওরা। ওদের কথা কানে আসে। সীমা বলে, ‘‘এত রাতে চা খেতে গেলে কেন! একেই তোমার গ্যাস-অম্বলের ধাত।’’
    সেকথা শুনে নীতাও আমাকে বলে, ‘‘তুমিও চা খেয়েছ নাকি!’’
    ‘‘না না, আমি খাইনি।’’
    আস্তে আস্তে নীতাও ঘুমের রাজ্যে চলে যায়। আমারও চোখে ঘুম নামতে থাকে। যতই হোক রাতটা গভীর। তাছাড়া সারাদিন ভুটানে ঘোরাঘুরি করেছি।
    ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম জানি না। হঠাৎ ড্রাইভার জোরে ব্রেক কষে বাসটা দাঁড় করান। ভয়ে, আতঙ্কে জেগে ওঠে সবাই। কারও মাথা ঠোকা যায় বাসের সিটে।
    সবাই জানতে চায়, ব্যাপারটা কী?
    বাসের কেবিনে বসে আছেন ট্যুর অপারেটররা। ওরা চাপা গলায় উত্তর দেন, ‘‘বাঘ।’’
    সঙ্গে সঙ্গে আমরা ক’জন রাস্তার দিকে চেয়ে দেখি, বাসের আলোর বৃত্ত ছেড়ে একটা বাঘ বাম দিকের অন্ধকারে মিশে যায়। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে হাসিমারার সেই ভদ্রমহিলার কথা। সেটা যে এত তাড়াতাড়ি প্রমাণ হয়ে যাবে, বুঝতে পারিনি।
    এক-দু’মিনিট বাসটা ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর দু-তিনবার জোরে হর্ন দিয়ে ড্রাইভার বাস ছাড়েন।

    বাঘের ভয়ে ঘুম উড়ে গেছে অনেকের। একটা গুঞ্জন ভেসে আসছে বাসের ভিতর থেকে। পিছনের সিট থেকে শিশিরবাবু আমার উদ্দেশে বলেন, ‘‘বুঝলেন দাদা, আমার মনে হয় ওটা বাঘ নয়।’’
    ‘‘সে কী! আপনিও তো দেখলেন ওটা বাঘ। হাসিমারাতেই শুনেছি, সন্ধের পর এদিকে চিতা বাঘ বের হয়।’’
    ‘‘সে তো হাসিমারায়। কামাখ্যায় তো নয়।’’
    ‘‘এখুনি কামাখ্যা পেলেন কোথায়!’’
    ‘‘আরে, আর তো মাত্র ঘণ্টা দুয়ের পথ।’’
    একটুক্ষণ চুপ থেকে উনি আবার বলেন, ‘‘আমার মনে হয়, ও কোনও যোগিনী। বাঘের রূপ ধরে রাস্তা পেরিয়ে গেলেন।’’
    ‘‘মানে!’’
    শিশিরবাবু বলতে থাকেন, ‘‘কামাখ্যা তো তন্ত্রসাধনার পীঠস্থান। নানারকম তন্ত্রসাধনা হয়। ডাকিনীতন্ত্র, যোগিনীতন্ত্র, বশীকরণতন্ত্র। সবচেয়ে ডেনজারাস তন্ত্র হল যোগিনীতন্ত্র। এটা সাধিকারা সাধনা করেন।’’ উনি বক্তৃতা দেওয়ার মতো বলে চলেন, ‘‘এই তন্ত্রসাধনার মূলকথা কি জানেন, সাধিকারা নিশুতিরাতে একা কোনও শ্মশানে গিয়ে সাধনা করেন। সম্পূর্ণ নিরাবরণ অবস্থায়। অর্থাৎ সম্পূর্ণ উলঙ্গ।’’
    আমি হাঁ করে শুনতে থাকি শিশিরবাবুর কথা। বাঘের কথা শুনে নীতারও ঘুম উড়ে গেছে ভয়ে। ওনার কথা শুনে আমার হাতটা চেপে ধরে আছে। সীমাও কথা শুনছে, না ঘুমোচ্ছে ঠিক বুঝতে পারি না।
    উনি আবার বলেন, ‘‘সাধনা সেরে যজ্ঞ্যি করেন। তারপর সেই যজ্ঞ্যির আগুন নিয়ে নিকটবর্তী কোনও শ্মশানে যান।’’ একটু থেমে বলতে শুরু করেন, ‘‘কীভাবে আসাযাওয়া করে জানেন?’’ আমাকে হ্যাঁ না কিছু বলতে না দিয়ে নিজেই উত্তর দেন, ‘‘ওই উলঙ্গ অবস্থাতেই মাথায় একটা নতুন মাটির খোলায় আগুনটা নিয়ে ছুটতে থাকেন।’’
    মোহিত হয়ে শুনছি ওনার কথা। উনি বলেন, ‘‘সাধারণত ওনারা গ্রাম বা জনপদ এড়িয়ে চলেন। যদি কোনও গ্রাম বা এরকম রোড সামনে পড়ে যায়, তৎক্ষণাৎ ওরা রূপ পাল্টে নেন। জীবজন্তুর বেশ ধরেন।’’
    ‘‘তখন আগুনটা কী হয়?’’ পাশের থ্রি-সিটে বসা কর্মকারবাবু জানতে চান আগুনের কথা।
    তা হলে আমি একা শিশিরবাবুর কথা শুনিনি। উনিও শুনছিলেন। হয়তো আরও কেউ শুনছে। বাঘ তো সবার ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
    শিশিরবাবু উত্তর দেন, ‘‘মানুষের রূপ ধারণ করলেই আবার আগুনও ফিরে আসে। এরই নাম সাধনা।’’
    ‘‘আপনি এত সব জানলেন কী করে!’’ জানতে চাই আমি।
    ‘‘ও তো লটারির কাউন্টার বন্ধ করে এসে সারা দুপুর ওইসব বই পড়ে।’’ আমার প্রশ্নের উত্তরে উত্তর দেয় সীমা।
    একটি-দু’টি করে ফুল ফোটার মতো একজন-দু’জন করে আমাদের কথাবার্তায় যোগ দিচ্ছে। নীতা প্রথম থেকেই জানালার ধারের সিটে বসে আছে। ওই সিটে বসলে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আরাম। এখন আমার সঙ্গে সিট পাল্টাপাল্টি করতে চায়। কোনও প্রশ্ন না করে আমার সিটটা ছেড়ে দিই ওকে।

    শিশিরবাবুর সঙ্গে এতক্ষণ আমার কথা বলতে সুবিধে হচ্ছিল। দু’জনেই সাইড সিটে বসেছিলাম। কাছাকাছি ছিলাম। এখন আমি সিট পাল্টে সামান্য দূরে। তাতে অবশ্য কথা বলতে অসুবিধে হয় না।
    উনি বলেন, ‘‘পরশু দিন আমাদের কী প্রোগ্রাম আছে?’’
    ‘‘শিলং হয়ে চেরাপুঞ্জি যাওয়া।’’
    ‘‘ও।’’ একটু থেমে আবার বলেন, ‘‘তার পর দিন?’’
    ‘‘সকালে গৌহাটি ঘুরে দেখা। তারপর বিকেলে বাস ছাড়বে।’’
    ঘড়ির কাঁটায় এগিয়ে যাচ্ছে রাত। বাসের চাকায় কমে আসছে কামাখ্যার দূরত্ব। আর একটু পরেই আমরা নামব ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে। চান-টান সেরে মাকে পুজো দেবার পালা।
    শিশিরবাবু বলেন, ‘‘সেদিন গৌহাটি না ঘুরে, অন্য একজায়গায় ঘুরতে যাবেন?’’
    ‘‘কোথায়?’’
    ‘‘মায়াগ্রামে। যেখানে এখনও যোগী-যোগিনীরা গভীর জঙ্গলের মধ্যে সাধনা করেন।’’ একটু থেমে আবার বলেন, ‘‘তাদের অবশ্য চাক্ষুষ দর্শন পাব না। কারণ সেসব জায়গায় ঢোকা নিষেধ। তবে মায়াগ্রাম পর্যন্ত যাওয়া যায়।’’
    ‘‘কীভাবে?’’
    ‘‘গাড়ি ভাড়া করে। চার-পাঁচজন মিলে গাড়ি করলে সুবিধে হয়।’’
    ‘‘না না, ওসব জায়গায় যেতে হবে না। যেখানে এরা নিয়ে যাবে, সেইসব জায়গায় যাব। না কি বলুন দিদি?’’ সীমা একথা বলে সমর্থন চায় নীতার।
    নীতা বলে, ‘‘ওসব তন্ত্রমন্ত্রের জায়গা। কে যে কাকে বশ করে নিবে, তারপর সংসারটা ডুবুক।’’
    সীমা আবার বলে, ‘‘ও একদিন বলেছিল, ওখানে নাকি মেয়ে সাধিকারা পুরুষদের ভেড়া বানিয়ে রেখে দেন। তারপর তাদের যেমন খুশি ব্যবহার করেন।’’
    নীতা একটু উত্তেজিতভাবে বলে, ‘‘কী দরকার ওসব ঝুটঝামেলায় যাবার। বেড়াতে এসেছি। বেড়াব, আনন্দ করব ব্যাস।’’
    কর্মকারবাবু বলেন, ‘‘এখন তো অন্য যুগ। মেয়েরা তন্ত্রমন্ত্র ছাড়াই স্বামীকে ভেড়া করে পরপুরুষের সঙ্গে ফুর্তি করে বেড়াচ্ছে।’’
    বুকটা আমার ছ্যাঁৎ করে ওঠে। কর্মকারবাবু আমাদেরকে চা-বাগানে ঢুকতে দেখেছেন নাকি! সীমার মতো একজন নারীর সঙ্গে ঘুরবার আনন্দে পিছন ফিরে দেখিনি, আমাদের কেউ লক্ষ্য করছে কি না! তাছাড়া আমি তো ওর আমন্ত্রণে রাজি হইনি। কাজেই মায়াগ্রামে গেলেও আমার চিন্তার কিছু নেই।

    অঙ্কন: মৃণাল শীল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More