আর এক মৃত্যু

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সুমন মহান্তি

    তকাল রাতে প্রিয়নাথকে কেবিন থেকে আইসিইউ-তে শিফট করা হয়েছে। কেবিনে সাতদিন ছিলেন প্রিয়নাথ। প্রথম দু’দিন দিব্যি কথা বলছিলেন। রোগাভোগা শরীর তখনই প্রায় বিছানার সঙ্গে মিলিয়ে গিয়েছিল। তিনদিনের মাথায় ক্যাথিটার, স্যালাইন, ইঞ্জেকশনের চ্যানেলের সঙ্গে রাইস-টিউব যোগ হয়েছিল।  সারাদিনে দু-তিনটি কথা ঐ অবস্থাতেও বলতে পারছিলেন প্রিয়নাথ। তারপর কথা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল, চোখে ক্ষীণ আলোর তরঙ্গ অদৃশ্য হয়ে এল, শীর্ণ আঙুলগুলো প্রায় নড়াচড়া বন্ধ করে দিল। যন্ত্রণায় মুখের রেখা বেঁকেচুরে যেতে লাগল। সায়ন প্রিয়নাথের মুখে ধীরে ধীরে মৃত্যুর ছায়া বিস্তৃত হতে দেখল। কেবিনে ভর্তি হবার চব্বিশ ঘণ্টা পরেই ডাক্তার তাকে বলেই দিয়েছিলেন, “আশা খুব কম। এই ষ্টেজ থেকে রিকভারির চান্স কম। আমরা চেষ্টা করে যাব।”

    “একমাস আগেও তো ভালো ছিলেন। এত তাড়াতাড়ি এরকম হয়ে গেল!’’

    “এই রোগের এটাই প্রবলেম। কখন যে দুম করে খারাপের দিকে চলে যাবে বোঝা যায় না। আপনার বাবা প্রায় এগারো বছর ভুগছেন। এই বয়সে লিউকোমিয়া নিয়ে এতদিন সারভাইভ করা কম কথা নয়। মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে আপনাদের। আত্মীয়-স্বজন কেউ দেখতে চাইলে আসতে বলুন। একবার দেখে যান।”

    সায়ন বুঝেছিল ডাক্তার ‘শেষবার’ শব্দটি ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গিয়ে ‘একবার’ বলেছেন। শোনার পর কেবিনের বাইরে এসে নির্জন জায়গায় অনেকক্ষণ কেঁদেছিল সায়ন। কান্না তারপর থেকে বদলে গিয়েছে ব্যাকুল প্রার্থনায়—বাবা যেন কম যন্ত্রণা পায়, মৃত্যু যখন অনিবার্য তখন তা যেন বিলম্বিত না হয়, যেন প্রশান্তির মধ্যে আসে শেষঘুম।

    প্রশান্তি মেলেনি, বরং প্রিয়নাথের কষ্ট আরও বেড়েছে। সূঁচে যন্ত্রণাক্ষত শরীর ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে আসছিল, শ্বাসকষ্ট শুরু হচ্ছিল মাঝেমধ্যে, ঐ অবস্থাতেই রাইস-টিউব আর স্যালাইন খোলার অক্ষম চেষ্টা করছিলেন বারবার। কেবিনে থাকার সময়ে কাতরভাবে তাকে বারবার প্রিয়নাথ আর্তি জানিয়েছেন, “খুলে দে। এসব খুলে দে না রে শানু।”

    ডক্টরের নির্দেশে নার্স তাঁর হাত-পা শক্ত করে বেঁধে রেখেছে। সেই বাঁধন আর খোলা হয়নি। মাঝরাতে প্রবল শ্বাসকষ্ট শুরু হতে আইসিইউ-তে শিফট করা হয়েছে। শরীরে অসংখ্য তার জড়ানো, আবার এক ইউনিট ব্লাড দেওয়া হয়েছে আজ। চোখ দুটি বোজা, রুগ্ন ডানহাত ফুলে গিয়েছে সূঁচ, সালাইনের একটানা অত্যাচারে। আইসিইউ-তে ঢুকে বেশিক্ষণ থাকতে পারেনি সায়ন। দশখানা বেডের একটিও খালি নেই। রোগীদের মধ্যে তার বাবাই প্রবীণতম। পাশের বেডে এক যুবক শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কত আর বয়স হবে! বড়জোর চল্লিশের কাছাকাছি। এগারো বছর বাবাকে নিয়ে সে নিয়মিত এসেছে। আউটডোরে দেখিয়ে ফিরে গিয়েছে, স্বাভাবিক এবং সহজ থেকেছে। আইসিইউ-তে ঢুকে সে কিন্তু ভয়ে শিহরিত হয়েছে সারাক্ষণ। এখানে আইসিইউ মানে পেশেন্টের শেষ অবস্থা, কেউ বেঁচে ফেরে না, সাদা চাদরে মোড়া হয়ে বেরোয়।  প্রিয়নাথের হাত-পা এখনও  বাঁধা রয়েছে দেখে সায়ন অনেকক্ষণ ছটফট করছিল। কেন শেষ সময়ে মানুষটার প্রতি এই নিষ্ঠুরতা? অনেক হয়েছে, আর নয়। সায়ন প্রিয়নাথের গায়ের চাদর সরিয়ে পায়ের দিকে হাত বাড়াল। বাঁধনের গিঁট দ্রুত খোলার চেষ্টা নার্সের চোখে ধরা পড়ে যায়। প্রায় ছুটে এসে ধমকের স্বরে বলে, “করছেন কী আপনি?”

    “কেন? খুলে দিলে সমস্যা আছে কোনও?”

    “ডক্টরের অ্যাডভাইস ছাড়া আমরাই কিছু করতে পারি না। আপনি কোন সাহসে খুলে দিতে চাইছেন?”

    “ডক্টর বলেছেন যে বাবা কোমায় চলে গেছেন। তাহলে এভাবে বেঁধে রাখা কেন? এই অত্যাচার সহ্য করা যাচ্ছে না। বাবা কি জেলের কয়েদি?” সায়ন ক্ষোভে গজগজ করে।

    নার্সটি এবার নরমভাবে বোঝায়, “কোমা থেকে উনি ফিরে আসতেও পারেন। সেন্স রিভাইভ করলেই মরিয়া হয়ে চ্যানেল, রাইস-টিউব, ক্যাথিটার সব খুলে দেবার চেষ্টা করতে পারেন। তখন আর এক বিপত্তি। আপনারাই তখন বলবেন নেগলিজেন্স অফ ডিউটি। ডক্টর বলে দিলেই আমরা বাঁধন খুলে দেব। পেশেন্টকে এভাবে রাখতে কি আমাদেরই ভালো লাগে? মনকে শান্ত রাখুন, কো-অপারেট করুন প্লিজ।”

    সায়ন জানে এসব নিতান্তই স্তোকবাক্য। অবচেতন অন্ধকারের ঘূর্ণিপাকে তলিয়ে গেছে বাবা, ফেরার কোনও আশা নেই, শুধু বিভিন্ন সিস্টেমে কয়েকদিনের জন্য মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ডাক্তাররা। প্রিয়নাথ একবার বলেছিলেন, “যদি দেখিস শেষ অবস্থা, টানাহ্যাঁচড়া করিস না একদম। দৌড়ঝাঁপ করে তখন ট্রিটমেন্টের নামে কষ্ট দিস না। শান্তিতে যেতে দিবি। মনে থাকবে তো?”

    শেষ অবস্থা বুঝলে আদৌ এখানে বাবাকে সে নিয়ে আসত না। দিন পনেরো ধরে প্রিয়নাথ সারাক্ষণ ঝিমোচ্ছিলেন, নড়াচড়া করতে পারছিলেন না, সন্ধে হলেই জ্বর আসছিল। নিজে থেকেই বলেছিলেন, “একটিবার ওখানে নিয়ে চল। হয় বাঁচব না-হলে মরব।”

    প্রিয়নাথের বিশ্বাস ছিল যে এখানে ভর্তি করে নিলেই সেরে উঠবেন। কেবিনে ভর্তির সময় তাঁকে আশ্বস্ত এবং খুশি দেখাচ্ছিল। অলক্ষে মৃত্যু যে এগিয়ে আসছে কাছে তা বুঝতে পারেননি। বাঁচার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল, আবার সুস্থ হয়ে ফেরার আশা ছিল। এই তীব্র আশা আর মনের জোরেই এতবছর রোগটার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। আর ফেরা হবে না জানলে সায়ন নিয়ে আসত না। প্রিয়নাথের চলে যাওয়া অনেক শান্তির হতে পারত। এখন সে নিরুপায়। আরও কিছুক্ষণ আইসিইউ-তে আপাতত থাকা যায়। বাবাকে এই অবস্থায় দেখে তার বুক মুচড়ে যাচ্ছে, তবু সে সহ্য করে থাকতে পারত। দশ নম্বর বেডের পেশেন্ট যন্ত্রণাতে কাটা ছাগলের মতো ছটফট করছেন, করুণ আর্তনাদে কেঁপে উঠছে স্তব্ধ রুম। দু’চোখ বেয়ে নেমে আসা অবিশ্রান্ত জলের ধারা মুছিয়ে দিচ্ছেন এক ভদ্রলোক। মহিলার গায়ের রঙ বেশ কালো, বয়সও বেশি মনে হচ্ছে না, ছিপছিপে চেহারা, হাত-পা বেডের সঙ্গে বাঁধা রয়েছে। যন্ত্রণায় কাতরে উঠছেন, মুচড়ে যাচ্ছে শরীর, বেঁকেচুরে যাচ্ছে, শক্ত বাঁধনও যেন ধরে রাখতে পারবে না তাঁকে। স্ট্যান্ডে স্যালাইনের আর একটি বোতল ঝোলানোর সময়ে নার্সকে প্রশ্ন করল সায়ন, “ওনার কী হয়েছে?”

    প্রিয়নাথের হাতের চ্যানেলে ইঞ্জেকশন ঢেলে নার্সটি উত্তর দিল, “আপনি দশ নম্বর বেডের পেশেন্টের কথা বলছেন তো?”

    “হ্যাঁ।”

    “লিভারে ক্যান্সার।”

    “ওহ।”

    “বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। গতকাল সকালেই ভর্তি হয়েছেন। ভগবানকে ধন্যবাদ দিন যে আপনার বাবাকে এরকম মারাত্মক যন্ত্রণা পেতে হচ্ছে না। কোমায় চলে গেছেন বলে ব্যাথা হলেও টের পাচ্ছেন না।”

    ভগবান! রোগযন্ত্রণা কমবেশি হবার জন্যও তাঁকে ধন্যবাদ দিতে হবে? এমনিতে সে দুর্বল নাস্তিক, অবিশ্বাসের জোর বেশিক্ষণ থাকে না। এই ক’দিন সে তাই বাবার যন্ত্রণাহীন শান্তিময় মৃত্যুর আর্জি পেশ করে চলেছে অদৃশ্য সেই ভগবানের কাছে। দশ নম্বর বেডের পেশেন্টের কাতর আর্তনাদ বাড়তেই সায়ন আর স্থির থাকতে পারল না। সে তড়িঘড়ি বেরিয়ে

    # # #   

    সুরিতা আগেই আইসিইউ-তে গিয়ে দেখে এসেছেন। দোতলার প্রশস্ত বারান্দায় পাতা সারি সারি চেয়ারে তিনি অন্য রোগীদের আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে অপেক্ষা করছিলেন। সায়নের ছায়াচ্ছন্ন মুখ দেখে জানতে চাইলেন,“কী হল?”

    “কিছু না।”

    “মনকে শক্ত কর। আমি অনেক কষ্টে মন শান্ত রেখেছি।”

    সায়ন ঘাড় নাড়ে, “তা নয়। একজন পেশেন্টকে দেখে খুব খারাপ লাগছিল।”

    “কোন পেশেন্ট?’’

    “একেবারে বাঁদিকের বেডে একজন পেশেন্ট আছেন। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন।”

    “মহিলা?’’

    “হ্যাঁ। শুনলাম লিভার ক্যান্সার হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে এসেছেন।”

    সুরিতা বললেন, “এখানে সবাই ওনার কথাই বলছিল। ওনার স্বামী কাল থেকেই ভীষণ কান্নাকাটি করছেন। এক ছেলে, এক মেয়ে। ছেলের বয়স নয়, মেয়েটার সবে চার। ভদ্রলোক দুজনকেই হোটেলে রেখে দেখতে আসেন। বিদেশ-বিভুঁইয়ে একা। কখনও এর ওর পায়ে পড়ে যাচ্ছেন আর কাঁদছেন। বলছেন-আমার বউকে বাঁচান। আপনারা আশীর্বাদ করুন।”

    “আশীর্বাদে কি কিছু হয়?”

    “অনেকে বলাবলি করছিল যে শেষ অবস্থা। কিছু আর করার নেই।”

    সায়ন বলে, “বাবার ব্যাপারেও কিছু আর করার নেই। ভাবছি বাবাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাব। এখানে এরকম দেখতে ভালো লাগছে না। বাবা কোমায় চলে যাবার আগে কাঁপা গলায় শুধু একটা কথাই বলেছিল, বাড়ি যাবে। এদিকে আইসিইউ থেকে বের করাও রিস্ক হয়ে যাবে। পথেই হয়তো একটা কিছু হয়ে গেল। কী করি বল তো মা?”

    সুরিতা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, “থাক। মানুষটা এখানেই থাকুক। আর টানাটানি করিস না। এখনও মিনিট দশ আছে দেখছি। আর একবার দেখে আসি।”

    “যাও। আমি ওষুধপত্র কিনে আনি।”

    সায়ন হাতে হলুদ রঙের রিকুইজিশন স্লিপ নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকে। তিনতলা এই বিল্ডিংটি হসপিটালের বিশাল এলাকার একেবার শেষমাথায়, লোকজন এদিকে কম, একতলা ও দোতলায় ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের সঙ্গে তাদের মায়েরা থাকেন। মেডিসিন কাউন্টার যেতে হলে অনেকটা হাঁটতে হবে তাকে। সায়ন কিছুটা অন্যমনস্ক ছিল বলেই প্রথমটায় খেয়াল করেনি। বিল্ডিং থেকে এক ভদ্রলোক কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে আসছেন। উদভ্রান্ত অবস্থা, মুখচোখ ফুলে গিয়েছে, মাথার চুল এলোমেলো, পায়ে চপ্পল। কোথায় যেন এনাকে দেখেছে!

    হ্যাঁ, মনে পড়েছে, এই মানুষটি তো একটু আগেই দশ নম্বর বেডের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এগারো বছর ধরে প্রতিমাসে বাবাকে নিয়ে এসেছে এই হসপিটালে, অনেক নিঃশব্দ কান্না, চাপা বিলাপ, সজল চোখের সাক্ষী থেকেছে সে। কখনও এভাবে কাউকে হু হু করে কাঁদতে দেখেনি প্রকাশ্যে। সায়ন দাঁড়িয়ে পড়ে, এমন দৃশ্যে নির্বিকার থাকা অসম্ভব। কয়েক পা পিছিয়ে সে ভদ্রলোকের খুব কাছে গিয়ে বলে, “শান্ত হোন। এমন করছেন কেন?”

    ভদ্রলোক কাঁদতে কাঁদতে তার পায়ে লুটিয়ে পড়েন, “দাদা,আমার বউ বাঁচবে তো?”

    বিব্রত সায়ন বলে, “করছেন কী! উঠুন।”

    “আপনি আশীর্বাদ করুন। আপনাদের সবার আশীর্বাদ ছাড়া ও বাঁচবে না।”

    সায়ন হাত ধরে টেনে তুলে শুধু বলতে পারে, “বেশ। আশীর্বাদে যদি কাজ হয় তাই করছি। সবার শুভেচ্ছায় উনি হয়তো সুস্থ হয়ে উঠবেন।’’

    মনে মনে সায়ন বিড়বিড় করে— এসবে কিছু হয় না। সান্ত্বনা পাওয়া যায়। সামান্য সান্ত্বনা বা স্তোকবাক্যই  মনকে হালকা করতে পারে এই কঠিন সময়ে।

    ভদ্রলোক ফোঁপাতে থাকেন, “দেশে একা কীভাবে ফিরব বলুন! ও ছাড়া আমি যে একেবারে একা হয়ে যাব।”

    সায়ন জানতে চায়, “ছেলেমেয়েরা কোথায় এখন?”

    “সপ্তক হোটেলে। পাশের রুমে একজনের কাছে রেখে এসেছি।”

    “ওদের কথা ভেবেই আপনাকে শান্ত থাকতে হবে। মনে জোর আনতে হবে। আপনি এত ভেঙে পড়লে চলবে? ওদের কী হবে?”

    “সবাই বলেছিল ইন্ডিয়া নিয়ে চলে যাও। কিছু একটা সুরাহা হবে। কই, এখানকার ডাক্তারেরা ভরসা দিতে পারছে কই? বলছে যে আমি নাকি দেরি করে ফেলেছি। আগে যে বুঝতে পারিনি। ও চলে গেলে কী হবে আমাদের?” আবার বাষ্পাচ্ছন্ন হয়ে আসে তাঁর চোখ।

    সায়ন হাত ধরে মৃদুগলায় বলে, “চলুন,আমার সঙ্গে চলুন।”

    “কোথায়?’’

    “চলুন প্লিজ।”

    পুকুরের পাশে একটি সিমেন্টের বেঞ্চের কাছে গিয়ে সায়ন বলল, “এখানে একটু বসুন।’’

    “স্থির হয়ে কোথাও যে বসতে পারছি না!’’ তিনি অসহায় চোখে তাকালেন।
    “কিছুক্ষণ অন্তত বসুন। খেয়েছেন কিছু সকাল থেকে?”

    “না।”

    “সে কী! এখন এগারোটা বাজে। এতক্ষণ না খেয়ে আছেন?’’

    “বাচ্চাদের খাইয়েছি। বউ ওখানে ব্যাথায় কাতরাচ্ছে, বড় কষ্ট পাচ্ছে। চোখের সামনে অমন ছটফটানি দেখলে খেতে ইচ্ছে করে আর?”

    সায়ন বলে, “খালি পেটে থাকলে শরীর দুর্বল হবে। দৌড়ঝাঁপ করবেন কীভাবে?”

    “ দৌড়ঝাঁপ করার ইচ্ছেটাই যে হারিয়ে ফেলছি। কী হবে আর! সব তো শেষ হয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে।”

    # # #

    বেঞ্চে বসার পরে সায়ন জানতে চায়, “আপনার নাম?”

    “হিমেন সরকার।”

    “ইস, আপনার জামাপ্যান্ট সব ধুলোয় মাখামাখি হয়ে গেছে। ঐভাবে কেউ মাটিতে লুটয়ে পড়ে? আর কারও পায়ে পড়বেন না এভাবে।”

    “মাথা কাজ করছে না। কী  যে করব ভেবে পাচ্ছি না। ভাবতে পারছি না,” হিমেন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

    “সামনের ট্যাপে মুখচোখ ধুয়ে আসুন। রুমাল আছে কাছে?”

    “না।”

    “আমারটা নিন।”

    মুখচোখ ধুয়ে এসে হিমেন চুপচাপ বসে থাকলেন। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল তাঁকে। সায়ন বলল, “যান। ক্যান্টিনে খেয়ে আসুন এবার।”

    মাথা নেড়ে হিমেন বললেন, “থাক। বাচ্চাগুলোকে নিয়ে দুপুরে মিল খেয়ে নেব হোটেলে।”

    “তাহলে হোটেলে ফিরে বিশ্রাম নিন। রোদের তাপ বাড়ছে। বাচ্চাদের কাছে থাকুন। ওরা একা আছে। আইসিইউ-তে ভিজিটিং আওয়ার আবার সেই বিকেল পাঁচটায়। এখন এখানে থেকে কী করবেন?”

    হিমেন হতবিহ্বল চোখে তাকালেন, “সেখানেও যে থাকতে পারছি না। ছেলেমেয়ে সারাক্ষণ প্রশ্ন করে যাচ্ছে। মায়ের কী হয়েছে, ভালো হবে কিনা, কবে ছাড়া পাবে? শুনে যে আমি স্থির থাকতে পারি না। কান্না চাপতে বাথরুমে গিয়ে ছিটকিনি লাগিয়ে বসে থাকি।”

    একমুহূর্ত চুপ থেকে হিমেন অসহায় চোখে তাকালেন, “ছেলেটা অবুঝ নয়,দশ বছর বয়স। সে জানে তার মায়ের ক্যান্সার হয়েছে। আমি শুধু মিথ্যে বলে যাচ্ছি। ক’দিন থাকলেই ঠিক হয়ে যাবে। আবার সুস্থ হয়ে দেশে ফিরব। আমি তো জানি শেষ অবস্থা। কেউ সরাসরি মুখে না-বললেও বুঝতে পারছি। বউ যার চিরদিনের মতো বিশ্রামে চলে যাবে সে কীভাবে বিশ্রাম নিতে পারে?”

    সায়ন বোঝায়, “মাথা ঠান্ডা রাখুন। এত ভেঙে পড়লে চলবে?”

    হিমেনের গলায় বাষ্প জমে ওঠে, “এখানে আসার আগে কত জায়গায় মানত করেছি জানেন? পুজো দিয়েছি। মন্দিরে মাথা ঠুকে বলেছি-আমার এই শ্রীহীন বউই ভালো। রূপ না-থাকলেও সে আমার বউ।”

    সায়ন চুপ থাকে।

    হিমেন বিলাপের সুরে বলেন, “আমি সুন্দরী চাই না, দেখতে ভালো চাই না। কতবার ঝগড়ার সময়ে ওর রূপ নিয়ে খোঁটা দিয়েছি। ও  চুপ করে যেত, জানেন? এখন ওর মেঘলা মুখের ছবি বারবার মনে পড়ছে। ও কেমন নিভে যেত কথাটা শুনে। আর ওকে  কক্ষনো খোঁটা দেব না।”

    “এসব এখন ভাববেন না।’’

    “ নিজের অন্যায়ের জন্য ঠাকুরের কাছে মাথা খুঁড়েছি। মনে-মনে বলেছি, আমার কাছ থেকে ওকে কেড়ে নিয়ে শাস্তি দিও না। ও রোগশয্যায় পড়ে থাকার পর বুঝেছি ও কতখানি দামি! আমাদের মতো ছা-পোষা পুরুষের বউই শেষ আশ্রয়। সেই আশ্রয়টা চলে গেলে আমি কীভাবে বাঁচব?’’

    হিমেন ফোঁপাতে থাকেন। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে সায়ন। কী করবে কী বলবে ভেবে পায় না।  সান্ত্বনা দিতে গিয়েও সে থমকে যায়।

    হিমেন বসেই আছেন, নড়বেন না কিছুতেই হসপিটাল চত্বর থেকে। অগত্যা সায়ন হসপিটালের গেট পেরিয়ে হোটেলের দিকে হাঁটতে শুরু করল। মাথায় তার ভাবনার জাল। একটি মৃত্যু কি পুরুষের চিরন্তন রূপের মোহ পুড়িয়ে ফেলতে পারে? ভেবেও উত্তর খুঁজে পেল না সায়ন।

    সকালের আয়ু ফুরিয়ে আসছে। রুক্ষ বৈশাখী দুপুর ওঁত পেতে আছে সামনে মনের সমস্ত নরম অনুভূতিকে গিলে নেবার জন্য। সায়ন জানে দশ নম্বর বেডের পেশেন্টকে মৃত্যুর ছায়া গ্রাস করবে ক্রমশ। হিমেন সরকার একটু একটু করে অনুতাপে পুড়বেন।

    হিমেনের মৃত্যুযন্ত্রণা টের পাবে না কোনও ডাক্তারের স্টেথো…

    চিত্রকর : মৃণাল শীল 

    আরও একটি গল্প। শুনুন লেখকের মুখ থেকে।

    চন্দননগরের ‘গল্পমেলা ‘ গল্পের লেখক ও পাঠকদের কাছে সুপরিচিত একটি নাম। গত সাত -আট ডিসেম্বর চন্দননগর রবীন্দ্রভবনের জ্যোতিরিন্দ্র সভাগৃহে অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাদের বার্ষিক অনুষ্ঠান। এবারের ‘গল্পমেলা ‘ -র মিডিয়া পার্টনার ছিল “দ্য ওয়াল ‘। সেই অনুষ্ঠানে পঠিত চারটি সরস গল্প ‘দ্য ওয়াল ‘ -এর পক্ষ থেকে সরাসরি রেকর্ড করা হয়। ‘দ্য ওয়াল ‘ -এর গল্পের পাতায় পাঠকের সামনে এবার উপস্থিত করা হচ্ছে সেইসব গল্প যেখানে পাঠক জনপ্রিয় লেখকদের দেখতে পাবেন এবং তাঁদের মুখ থেকেই শুনতে পাবেন তাঁদের গল্প। ‘গল্পওয়ালা ‘ বিভাগে প্রতি রবিবার যে গল্প প্রকাশিত হয় তার সঙ্গেই পাঠকদের জন্য সংযোজিত হল এই উপহার।

    আজকের গল্প: শুক্রাণু ওয়েডস ডিম্বাণু
    লেখক : সুন্দর মুখোপাধ্যায়

    এবার আরও এক 'গল্পওয়ালা '। লেখকের মুখ থেকে সরাসরি শুনুন গল্পপাঠ।

    এবার আরও এক 'গল্পওয়ালা '। লেখকের মুখ থেকে সরাসরি শুনুন গল্পপাঠ।গল্প : শুক্রাণু ওয়েডস ডিম্বাণুলেখক : সুন্দর মুখোপাধ্যায়

    The Wall এতে পোস্ট করেছেন শনিবার, 28 ডিসেম্বর, 2019

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More