বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২১
TheWall
TheWall

যেসব লেখার কোনও শিরোনাম নেই

শাশ্বতী সান্যাল

১.

অসহ্য গুমোট হয়ে আছে হাত। আঙুলে শব্দ নেই। সুবাতাস নেই। অথচ জষ্টির শেষ। মাঠে মাঠে কৃষকেরা জল মাপছে। ছেঁচে নিচ্ছে পৃথিবীর বুক। ঘোলাটে সবুজ এক অদ্ভুত তরল এসে ধানের জমির মধ্যে শুয়ে আছে। অপাপবিদ্ধ তার মুখ। শরীরের জন্মরসে টলমল করে উঠছে শস্যসম্ভাবনা

অফলা দুহাতে আমি কাকে ধরবো? সে কোন শব্দকে প্রবল আছড়ে ভেঙে খুঁজে দেখবো জলতল, পুরনো গল্পের রেশ, মায়ের তলপেট কিংবা নদীর সান্ত্বনা

২.

অভিজ্ঞান রাখিনি শরীরে। যে সব ধানের জমি জল ঢুকে এখন সায়র হয়ে আছে, তার মধ্যে খেলা করছে দুবিঘৎ কালবোস মাছ। সোনার নোলক দিয়ে তুমি কি তাদেরও আজ বশ করতে চাও? শ্রাবণের পরে এই গ্রামদেশে জানি সম্পর্ক শুকিয়ে যায়, জলের মতোই। বাজরা পোকার ভয়

সেসময় ধানের শরীরে সবুজ ব্যথার জন্ম দেয়। লোকে ভুলে যায় মৃত মাছেদের কথা। লোকে ভুলে যায় দুর্বাশার নীল অভিশাপ…

অভিজ্ঞান রাখিনি শরীরে। কেননা জলের ধর্ম তাকেও তো গিলে খাবে। প্লুতরক্তস্বর কারো কানে পৌঁছবেনা হে রাজাধিরাজ, তবু শোনো –

ফসল পাকার দিন নিয়ে যাচ্ছি সঙ্গে করে,  সেই আমার নিভৃতের গর্ভলক্ষণও

৩.

পশ্চিমের বাতাস আমাদের নিয়তি। পূবে কিংবা দক্ষিণে ভাগ্যবানেরা জানালা খুলে রাখেন… বাতাসে স্বর্ণরেণুর মতো গুঁড়ো গুঁড়ো আতরের ঘ্রাণ। রোগা সাদা কুরুশের কাজ করা পর্দায় তাদের রাতের ঘর ঢাকা থাকে। কেবল পুব-দক্ষিণে হু হু হাওয়া বইলে  অল্প দোলা খায় সে ঘর। অল্পই। নইলে মেঘবতী কইন্যারা লজ্জা পাবে যে…

ঘরের পাশে একটিমাত্র সুপারি গাছ, সে  ছায়া দেয় না। রসসিক্ত দু–চার কলি তুলে দেয় না ঠোঁটে… তবু স্নেহে সুদক্ষিণা সেও।করুণায় আশরীরে আমাদের পানপাতা, খয়ের আর কষাটে প্রেমের লাল দাগ।

পশ্চিমের বাতাস আমাদের জিয়নকাঠি। মরণকাঠিও। কবে সে দস্যুর মতো আছড়ে পড়ে ভেঙে ফেলবে লজ্জাবতী পাখিদের বাসা, সুপারির গাছ তা নিজেও জানেনা…

৪.

ঝড়ের পরেও তো আবার সুবাতাস বয়। একটা নদীর এপার আর ওপার… ধান ভরে, খড় ভরে ডিঙিটি কি আবার ফিরবে না?তখন সূর্যাস্তের আলোয় মাঝির হয়তো মনে পড়বে গতজন্মের নদীর কথা। খরস্রোতের কথা। না গাওয়া ভাটিয়ালিটির কথা…

এক জন্ম কতজনের সঙ্গে দেখা হয় আমাদের… কতজনের সঙ্গে হয় না। তারা কোথায় যায়? কোন নদীতে সুপবনে নাও ভাসিয়ে? কুলোতে দুব্বো-চন্দন নিয়ে, প্রদীপ জ্বালিয়ে নদীর দেবতার কাছে মানত করে তাদের ঘরের মানুষ… “তোমার তরঙ্গে প্রাণপদ্ম ভাসাইলাম…”

পদ্ম ভাসতে ভাসতে যতদূর যায় ততদূরই আমাদের কেতকীপুরাণ। সর্বহারা, ডুবন্ত চাঁদ সেই মৃণাল আঁকড়ে ধরে প্রাণরক্ষা করে। মাথার সিঁদুর অক্ষয় হয় সনকার।

চ্যাংমুড়ি কানি, আর কতদিন বল বামহাতে পুজো নেবে? সুবাতাস বইবে না? সপ্তডিঙা মধুকর ভেসে উঠবে না আবার জলের উপরে? করুণ ডিঙিটি নিয়ে মাঝিও তো ঘরে ফিরবে। গরম ভাতের গন্ধে ঘুম ভেঙে উঠে বসবে মালোদের উপোসী সন্তান…

৫.

পাখির ডানার শব্দে ঘুম ভাঙলে তুমি দেখবে শূন্যের কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছ। অনেকটা নীচ দিয়ে ভেসে যাচ্ছে পয়োমুখ মেঘ। শাদা চন্দনের মতো শরীর তাদের। আলতো ছুঁলেই যেন গোধূলির স্নান সারা হবে।

তোমার চিঠির গায়ে নীলাঞ্জন লেগে আছে আজও। সঙ্গমশেষের চিহ্ন ব’লে তাকে  মুছতে পারোনি। কালাচ সাপের মতো ফণাহীন বিষ সে ঢেলে দিয়েছে ধীরে অক্ষরের গায়ে

আজ বৃষ্টি নেই কতদিন! পাহাড়ের নির্জনআবাসে নিরালম্ব পুরুষ শরীর ক্লিষ্ট হয়ে এল, ঠিক রোদেপোড়া ঘাসের মতোই। নাগরিকা নটীদের রূপ থেকে অভ্রকুচি ভেসে গেছে শূন্যে কতদূর…

রূপের কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছ। আজ আষাঢ়স্য প্রশম দিবসে, প্রোষিতভর্তৃকা মেঘ ফিরে এল। জবাবী চিঠিটি শুধু এখনো এলো না…

 

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষায় স্নাতকোত্তর শাশ্বতী নিয়মিত ভাষানগর, কৃত্তিবাস, শুধু বিঘে দুই, কবিতা আশ্রম, ঐহিক প্রভৃতি সাহিত্যপত্রিকা এবং ছোট বড় বিবিধ লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত লেখালিখি করে থাকেন।

প্রকাশিত গ্রন্থ: ‘সেই সব হরিণীরা’ (২০১৫), ‘ব্রেইলে লেখা বিভ্রান্তিসমূহ’ (২০১৮)

Comments are closed.