বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

প্রসূন মজুমদারের কবিতা 

নির্জ্ঞান

সমস্ত যাত্রাই দীর্ঘ, দৈবপথ হতে পারে আর সব দৈবপথ হয়ে যেতে পারে যাত্রা।জ্যোৎস্নার মতো মিথ্যাগুলো
আমাদের হতস্পৃহ জরার বোতামে দোলে, রাতে
যাতে সাজানো সহজ সব জোকারের জারজ সন্তান খরগোশ – কুয়াশা চিরে ছুটে যায়, অপ্রয়োজনের দেশে, হেসে।
মাথার ভিতরে বাজ, ঊর্ধ্বাচারী পাখিদের রাজা, বাজায় দুন্দুভি, তবে, যুদ্ধ কী অবশ্যম্ভাবী! কিন্তু কেন?
প্রশ্নের ওপারে ঝুরো বরফের শব্দহীন ঝরে যাওয়া শুধু।
শুধু ঝরে যাওয়া, ফুল, রক্ত এমনকি তারার, ঝরে যাওয়া একমাত্র সত্য মনে হয়।
মনে হয় ঝরে যায় প্রতিটি সময়।
যেপথে ফেরার ছিল সেই রাস্তা মুছে দেয় ধুলো, যে ধুলো মাখার ছিল সেই ধুলো বাতাসে হারায়।
সব পথ মুছে দিতে দিতে পদক্ষেপ নির্ঘুম এগোয়, ঘুমের দিকে
যেই ঘুম স্মৃতির মারক সেই কি সহজ – সখ্য?
ভাবি, যে ভাবনার নিঃস্ব সেই মহাঘুম? চেতনার অন্তিমতা?  প্রেতিনী – প্রকার?
মানুষ আসলে নিজে মানুষের মৃত ইতিহাস?

অথবা সে মৃত নয়। অথবা সে অন্যত্র কোথাও আঁকা হয়ে থেকে গেল? পুনঃ – প্রবাহের বীজে সেইসব চলাচল ফিরে আসে? শরৎ-এর রোদে অথবা শিশিরে, কোন ভোরে সেসব পায়ের ছাপ থাকে নাকি ভবিতব্য – বোধে?

যদি সবই অর্থহীন বাতাসের জলের খেয়াল তবে এই ক্রমাগত চলার ঘাসেরা ফুল ধরে, কোন বোধে, কোন গুপ্ত টানে?
আমাদের চেতনারা কতটুকু জানে?

জানার সমুদ্র ভাসে দূর, ছায়াপথ ছায়াপথে রমণের সুর ভাসে নিঃসঙ্গ হাওয়ায়, যেখানে হাওয়ারা আর নেই বলে মনে হয় তাকে ইন্দ্রিয় – বেদনে ধরা সম্ভবত অসম্ভব, তবু আলোর ব্যাদানে ব্যাপ্ত গাঢ় শিকারের মতো ছুড়ে দেওয়া চলে কল্পবোধ – চিৎ – চঞ্চলতা।

প্রশ্ন আনে প্রশ্ন আর প্রত্নরূপ ঘেঁটে ঘেঁটে ভবিষ্যৎ খোঁজার প্রকার মনে হয় পরিপূর্ণ নয় পুরোপুরি।
পথ কোন নিয়মের আবশ্যিক নির্মিতি মেনে চলে না নিয়ত।
কখনো পথের যাত্রা বাঁক নেয় অতর্কিত টানে, বিশেষত বিষণ্ণতা অঘ্রাণের দানে।
তবে তো যা – কিছু বীক্ষা তার সব পক্ষ নয় ডানা ঈগলের।
আরো কিছু ডাকিনীর জিহ্বার রক্তাভ অনির্ণেয় মহাজাগতিক নর্ম ছাই ঘেঁটে দেখার প্রকারে আলো থাকা অসম্ভবের খেলা নয়।
পেরিয়ে যাওয়ার পরে ফেরে না সময়। তবে কি মুহূর্ত জাগে? মুছে যায়?  ফেরা যদি যাবে না তাহলে সময় এগোয় শুধু বাঘের থাবার মতো ঋজু!
বৃক্ষের ভিতরে আরো বৃক্ষ হয়ে মিশে গেলে তবে অশ্রুত আকাশের কান্না শোনা যায়।
আকাশের মেঘে আরো মেঘের জলের মতো মিশে গেলে আকাশের হৃদধ্বনি অনন্য শোনায়।
আরও ঊর্ধ্বে, অনিঃশেষ, সীমার ওপারে কিছু কাব্যময় প্রেত ডাকে প্রেতের অক্ষরে।
চেতনা- প্রদীপ – শিখা জ্ঞানের ওপারে আরো নির্জ্ঞানের আলো হয়ে ঝরে।

 

অভিন্ন নিত্যতা – সূত্র

 

সময় হরিণও নয়, নদীস্রোত, অথবা সিংহও।
সময় ধারণামাত্র, অথবা বিশ্বাস।
প্রতিটি মুহূর্ত সত্য, মিথ্যা শুধু পূর্বাপর, মিথ।
মানুষী সম্বিত।  মৃত্যু তো ঘটনা মাত্র, মাত্রাহীন / বিভিন্ন মাত্রার।
ফলত আরম্ভহীন অন্তহীন গতি আমাদের।
অকল্প প্রকল্প এই বাস্তুবতা। সরে সরে যায়
ক্ষেত্রের আধার থেকে অন্যত্র পালায়।
ঘটনাপ্রবাহ জুড়ে সময়ের রূপ,চেনা জ্ঞান খুঁড়ে নিজেরা বানাই।
বাস্তব অতীত যদি সত্য ধরি ভবিষ্যৎ আছে,  কিন্তু নেই।
ফলত অসত্য, ভ্রান্ত, কোনো অঙ্ক মেলে না কোথাও।
কূট নিজে তৈরি হয়, নিজস্বতা থেকে তাকে ছিন্ন করে দেখি
নিজস্বতা বলে কাকে কতটা মাপার কোন পরিমাপ কারা জেনে ফেলে?  আসলে জানে না!
নির্মিত সময় – সত্য এমনকি শূন্যও। শূন্য অর্থে অন্তহীন জ্ঞানাতীত, বোধের অতল।
নিজেরা ধারণা করি জল?  প্রচল ধারণা শুধু পরষ্পরে সংযুক্ত হওয়ার।
অতঃপর জ্ঞানবৃদ্ধে মনে হয় ভাঁড়।
অতঃপর মাত্রা এক সাড়া দেয়, স্থান।
যেখানে ফিরি নি আর সেই স্থান আছে, কিন্তু নেই।
নিজস্ব অস্তিত্ব, স্থান, অন্য কোন স্থানে মিশে আছে।
অতঃপর স্থান ভাবনা  নিতান্ত কুহক।
যে জলে নিজের ছায়া সেই জল বাষ্প হয়ে যায়।
ছায়ায় হারায়। আধার সমেত স্থান শূন্যে মিশে শূন্যাকার, তবে?
স্থানের বিচার কী কী হবে?
তাহলে চেতনা যায় কোন স্থানে, যে স্থান কোথাও নেই?
সময় ধারণা, আর স্থান  অর্থে অবাস্তব, ধাঁধা।
কোন সত্যে জীবনের যুক্তিক্রম বাঁধা?
এমনকি শূন্যের তত্ত্ব, আরোপিত, ধন্দ মনে হয়।
যা নেই তা ছিল ভেবে সব অবক্ষয়, ধারণা সাজালো
কেবল মাথার কোশে অন্ধকার বলে এক নিষ্কোশিত আলো
ঘাই দেয়, মাই দেয় যেভাবে ছাগলে না বুঝে
সেমত অভ্যাসবশে অনিত্যকে নিত্যকাল খুঁজে ফিরি,খুঁজে।

 

মায়াবী করাত


মৃত্যু গাঢ় একাকিতা। সমগ্র সংযোগহীন। নিবিড় বিচ্ছেদ।
বেঁচে থাকা মোহমাত্র। মায়াবী করাত।
মোহন সম্পর্ক –  খোঁজ। বিনিময় ভাবের ও ভাষার।
দণ্ডাদেশ – প্রাপ্ত কোনো অপরাধী – নাম্নী আত্মনের
বাহির – দেখার যাচঞা এজীবন, এই জন্ম আয়ু
সলিটারি সেলের মতোন নিঝুম অদরকার। মৃতবৎ, কালো।
কূপের গভীর থেকে বাষ্পীয় শীতল, ঘুমে  কালান্তের বরফ পাঠালো।

 

সম্পর্ক

 

সঙ্গে সঙ্গে যায় আর আড়ে আড়ে দেখে।
সুযোগ সামান্য পেলে গু ঢালে মাথায়।
এসব সমস্ত বুঝি অথচ বুঝি না।
এই খোঁজ ব্যক্তি নয়,ভিতরের জল।
অসফল সব লক্ষ্য লক্ষ লক্ষ নিরন্ন পাতায়।
তেরচা আলো ফেলে ফেলে দেখে নেয় কূটের কুটিল।
ঈর্ষা আর অসূয়ার কাদা যেন দেহপটে ফুটে থাকা তিল।
চৈতন্য পালাতে চায়।অচৈতন্য হয়ে থাকি, ছল।
ফলত কামড় খেলে কষ্ট নিজে ঝরে যায় সন্তপ্ত মায়ায়।

 

প্রসূন মজুমদার, জন্ম ১৯৭৮, পদ্যচর্চার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকদের একজন, ১৯৯৯ এর দামাল দিনে  কম্পিউটার বিজ্ঞান পড়া ছেড়ে জীবনে যোগ দেন। সেই বুনো জীবন এখনও চলছে। পরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ তিনটি, অসুখ ও আরোগ্য (২০০৬), অধরেগোখুর-দন্ত (২০১৪), রাত্রিচর বুনোচাঁদ (২০১৬) । পেশায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিদ্যালয় শিক্ষক।

Comments are closed.