আড়ালে আততায়ী ১২

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়

    ট্যাক্সিতে নন্দ গড়াইকে নিয়ে শিয়ালদার জিআরপি থানায় আসা হয়েছে। থানা চব্বিশ ঘণ্টাই খোলা। দীপকাকু অফিসার সাহাকে ফোনে বলে দিয়েছিলেন, আপনি নিজের টেবিলে থাকুন। আমরা নন্দ গড়াইকে নিয়ে আসছি।

    মি. সাহা সিটে বসে অপেক্ষা করছিলেন ঝিনুকদের জন্য। এইমুহূর্তে জেরা চলছে। দীপকাকু নন্দ গড়াইকে জিজ্ঞেস করছেন, তুমি পালিয়ে বেড়াচ্ছিলে কেন?

    নন্দ গড়াই বলছে, ডাক্তারবাবু যখন ট্রেনের ধাক্কায় মারা গেলেন, তার একটু আগেই আমরা কাঁকুলিয়া ক্রসিংয়ের কাছে পৌঁছেছিলাম। গেট ফেলা ছিল। ডাক্তারবাবুর ফোন এল, ফোনের কথা শুনে বললেন, ‘আচ্ছা, আসছি’। তারপর গাড়ি থেকে নামতে নামতে আমাকে বলে যান, ওপারে একজন দাঁড়িয়ে আছে। দেখা করতে যাচ্ছি। গেট খুললে চলে আসিস। ডাক্তারবাবু গেছেন হয়তো একমিনিটও হয়নি, আমার জানলার পাশে এসে দাঁড়াল একটা ছেলে। রাস্তার লোকের থেকে আড়াল করে পিস্তল তাক করে রেখেছিল আমার দিকে। বলল, ড্যাশবোর্ডে একটা ফাইল আছে দে।

    পিস্তল দেখে ভয় পেয়ে গেছি। ড্যাশবোর্ড খুলে কালো একটা কভার ফাইল ছেলেটার হাতে দিলাম। ফাইলটা ডাক্তারবাবু কখন রেখেছেন, দেখিনি। ছেলেটার হাতে কী তুলে দিলাম, টাকা না অন্য কোনও দামি জিনিস, বুঝতে পারলাম না।

    –ছেলেটা দেখতে কেমন? বয়স কত হবে? জানতে চাইলেন দীপকাকু।

    নন্দ গড়াই বলল, আমার বয়সিই হবে। গালে দাড়ি আছে। চোখে সানগ্লাস ছিল।

    ঝিনুক আন্দাজ করতে পারছে না নন্দ গড়াইয়ের বয়স কত হবে। তিরিশ হতে পারে, চল্লিশও। দীপকাকু কত ধরলেন, কে জানে! ফের নিজের থেকেই বলা শুরু করল নন্দ গড়াই, ছেলেটা ফাইল নিয়ে চলে যাওয়ার পরই ডাক্তারবাবুকে ফোন করে ঘটনাটা বলতে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ লেভেল ক্রসিংয়ের কাছ থেকে হইচই ভেসে এল। তার একটু আগে একটা ট্রেন পাস করেছে। ছ্যাৎ করে উঠল বুক! ডাক্তারবাবুর কিছু হল না তো? উনি তো লাইন ক্রস করছিলেন! গাড়ি থেকে বেরিয়ে লেভেল ক্রসিংয়ের কাছে গিয়ে দেখি, যা ভাবছিলাম তাই! তখনই ফোন করলাম ডাক্তারবাবুর দুই ভাইকে আর কমলবাবুকে। কমলবাবু ডাক্তারবাবুর বন্ধু।

    দম নিতে থামল নন্দ গড়াই। ফের বলতে থাকে, ওরা এসে পৌঁছনোর আগে একটা বুদ্ধি এল আমার মাথায়। এদের বলব না ফাইল ছিনতাইয়ের ঘটনাটা। ডাক্তারবাবুকে বলতেই হত, উনি ফাইলের খোঁজ করতেন। এরা হয়তো জানেনই না ডাক্তারবাবুর সঙ্গে ফাইলটা ছিল। যদি জেনেও থাকেন, বলব, ডাক্তারবাবু ওটা সঙ্গে নিয়ে রেললাইন ক্রস করছিলেন। অ্যাক্সিডেন্টের সময় ওটা কোথায় ছিটকে গেছে, কে জানে! —আমি যদি ফাইলটা কীভাবে খোয়া গেছে ওদের বলি, নাও বিশ্বাস করতে পারেন। ভাবতে পারেন আমি চুরি করেছি ফাইল। ওর ভিতর কত দামি জিনিস ছিল, তা তো জানি না। বিরাট দামি কিছু হলে অহেতুক চুরির দায়ে ধরা পড়ব। জেলও হতে পারে।

    আবার থামল নন্দ গড়াই। ওর জলতেষ্টা পেয়েছে আন্দাজ করে অফিসার সাহা টেবিলে রাখা জলের গ্লাসটা এগিয়ে ধরলেন।

    সত্যি তেষ্টা পেয়েছিল। একঢোকে গ্লাসের জল শেষ করে নন্দ গড়াই বলতে লাগল, চেপে গেলাম ঘটনাটা। মেজকর্তা আমার মাইনে মিটিয়ে দিলেন। ভাবলাম, এখন কয়েকমাস গা-ঢাকা দিয়ে থাকি। দেখি, ফাইলের ব্যাপারে ডাক্তারবাবুর বাড়ির লোকের টনক নড়ে কি না? যদি নড়ে, ওরা আমায় পুলিশি জেরার মুখে ফেলতে পারে। পুলিশ এড়াতে আমি দেশের বাড়িই চলে যেতাম। সেই সময় বাড়িতে একটা লোক এসে বলল, ডাক্তারবাবু মারা যাওয়ার পর তুমি তো এখনও কোনও গাড়ি ধরোনি। ট্রান্সপোর্টের গাড়ি চালাবে?

    কথার মাঝখানে দীপকাকু বলে উঠলেন, তুমি কি লোকটাকে আগে থেকে চিনতে?

    –না, চিনতাম না। সে নিশ্চয়ই জানত ডাক্তারবাবুর গাড়ি চালাই আমি। বলে নিয়ে প্রসঙ্গে ফিরল নন্দ গড়াই। বলল, লোকটাকে বললাম ট্রান্সপোর্টের গাড়ি যদি লরি হয়, চালাতে পারব না। দূরেও যেতে পারব না। বাড়ির কাছাকাছি থাকতে হবে। বুড়ো বাবা-মা, বউ-বাচ্চা আছে বাড়িতে। সেটা শুনে লোকটা বলল, দূরে যেতে হবে না। লোকালেই কাজ। লরিও চালাতে হবে না। ম্যাটাডর চালাবে। ছোটহাতি যেটাকে বলে। -–রাজি হয়ে গেলাম লোকটার কথায়। গা-ঢাকা দেওয়ার জন্য মানিকতলায় এককামরার ঘর ভাড়া নিলাম। ফোন থেকে পুরোনো সিমকার্ড খুলে ফেলে লাগালাম নতুন সিম। নতুন নাম্বার থেকেই যোগাযোগ রাখতাম বাড়ির সঙ্গে। আপনারা কেউ আমার খোঁজে বাড়িতে গিয়েছিলেন, তাই না?

    কেউ কোনও উত্তর দিল না। ফোন এসেছে নন্দ গড়াইয়ের। প্যান্টের পকেট থেকে সেট বার করে স্ক্রিনে চোখ রাখল। দীপকাকুকে বলল, বউয়ের ফোন। দেরি হচ্ছে বলে খবর নিচ্ছে। আপনারা আমাকে এখন আটকে রাখবেন, না ছেড়ে দেবেন?

    –ছেড়ে দেব। বললেন দীপকাকু।

    কল রিসিভ করল নন্দ গড়াই। অপর প্রান্তকে বলল, এখনও আধঘণ্টা-পঁয়তাল্লিশ মিনিটমত দেরি হবে। ছাড়ছি। পরে করছি।

    ফোন কেটে পরের প্রশ্নের জন্য রেডি হল নন্দ গড়াই। দীপকাকু জানতে চাইলেন, ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির নামটা কী, যেখানে এখন চাকরি করছ? কোম্পানিটা কলকাতার কোথায়?

    –ল্যান্সডাউনে স্যার। জয়গুরু ট্রান্সপোর্ট। বলল নন্দ গড়াই।

    দীপকাকু বললেন, ঠিক আছে, এবার তুমি আসতে পারো। পুরোনো সিমটা ভরে নেবে ফোনে। দরকারে ফোন করতে পারি।

    –ওকে স্যার। বলে তড়িঘড়ি চেয়ার থেকে উঠে চলে গেল নন্দ গড়াই।

    অফিসার সাহা বললেন, ওকে কি এত তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেওয়া ঠিক হল? ব্যাটা হয়তো আবার গা-ঢাকা দেবে। সব যে সত্যি বলে গেল, তারও তো কোনও মানে নেই।

    –একে ধরে রেখে কোনও লাভ নেই। আসল অপরাধী আড়ালে থেকে যাচ্ছে। কেসটা জটিল হচ্ছে ক্রমশ। এতদিন শুধু প্ল্যান করে খুন। এখন তো দেখছি ছিনতাইও হয়েছে। ফাইলটায় কী ছিল জানতে হবে। ছিনতাইয়ের সঙ্গে খুনের কোনও একটা যোগ তো আছে নির্ঘাত। বলে বড় করে শ্বাস ফেললেন দীপকাকু। পরমুহূর্তেই অফিসার সাহাকে বললেন, একটু চা বলুন তো। মাথা ধরে পাথরের মত ভারি হয়ে গেছে।

    ।। সাত।।

    পরের দিন সকাল আটটা। চেতলার শঙ্কর বোস রোডে ডা. অলকেশ রায়ের বন্ধু কমল বিশ্বাসের বাড়ির সামনে ঝিনুকরা। দোতলা বাড়ি, খুব পুরোনো নয়। মোটরবাইক স্ট্যান্ড করে দীপকাকু এগিয়ে গিয়ে গ্রিলের গেটটা খুললেন। ঝিনুক আছে পিছনে। বাড়ির চৌহদ্দিতে ঢুকে দীপকাকু একবার উপরদিকে তাকালেন। কী দেখলেন আন্দাজ করতে পারছে ঝিনুক, দেখে নিলেন ছাদের পাঁচিলে টবসুদ্ধ গাছ আছে কি না। আগের সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতাটা ভুলতে পারেননি।

    দরজার বেল টিপেছেন দীপকাকু। একটু পরেই খুলে গেল দরজা। সাদামাটা চেহারার মলিন পোশাকের একজন বয়স্ক মানুষ। খুব সম্ভবত এ বাড়ির কাজের লোক।

    দীপকাকুকে জিজ্ঞেস করল, কাকে চাই?

    –কমলবাবুকে। বলো, দীপঙ্কর বাগচী এসেছে। ফোনে কথা হয়ে আছে ওর সঙ্গে। বললেন দীপকাকু।

    লোকটি বলল, আসুন। ভিতরে এসে বসুন। বাবু ছাদে হাঁটতে গেছেন। ডেকে দিচ্ছি।

    ঘরে ঢুকে ঝিনুক তো থ! বাইরে থেকে বোঝা যায়নি এ বাড়ির এত বড় ড্রয়িংরুম আর তেমনি সাজানো! কী সব ফার্নিচার! সবই পুরনো আমলের। অথচ ঝকঝক করছে। সোফায় এসে বসেছে ঝিনুকরা। এটাও রীতিমতো অ্যান্টিক। দীপকাকু চারপাশে চোখ বুলিয়ে বললেন, এদের রুচি আছে বলতে হবে।

    কমল বিশ্বাসের কাছে দীপকাকু এসেছেন কেসের কিছু জট কাটাতে। অনেক আগেই হয়তো আসা উচিত ছিল। কমল বিশ্বাস ছিলেন ডা. রায়ের সবচেয়ে কাছের লোক। ডাক্তারবাবুর অনেক পার্সোনাল কথা নিশ্চয়ই জানেন।

    ভিতর ঘরের দরজার ভারি পর্দাটা সরে গেল। মেদহীন লম্বা চেহারার যে মানুষটি ঘরে এলেন, নিশ্চয়ই কমল বিশ্বাস। পরনে ট্র্যাকশ্যুটের লোয়ার আর টি-শার্ট। জোড়হাতে নমস্কারের ভঙ্গি করে বললেন, বাড়ি চিনতে কোনও অসুবিধে হয়নি তো?

    প্রতিনমস্কার জানিয়ে দীপকাকু বললেন, না না, কোনও অসুবিধে হয়নি।

    সিঙ্গল সোফায় দীপকাকুর মুখোমুখি বসলেন কমলবাবু। বললেন, বলুন, আপনাকে কী ধরনের হেল্প করতে পারি?

    –ফোনে আপনাকে তো বলেছি, আমি একজন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর। ডাক্তারবাবু আমাকে একটা কাজে নিয়োগ করেছিলেন। আপনাকে কি বলেছিলেন সে কথা?

    –না, বলে‍‌নি। খুবই চাপা স্বভাবের মানুষ ছিল। তবে ও যে কোনও গোয়েন্দার দ্বারস্থ হবে, সেটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম।

    –কী করে?

    –হসপিটালে ছেলের সঙ্গে ওর দেখা হওয়ার ঘটনাটা আপনাকে তো অলকেশ বলেইছে। সায়ন বেঁচে আছে এবং কলকাতায় দেখা গেছে, এরপর তো ও ছেলেকে খোঁজার জন্য জোর দেবেই। পুলিশকে বলে খোঁজাতে পারবে না। যেহেতু সায়ন ফেরার আসামি। আর আপনি যতই পুলিশের লোক হওয়ার ভান করে তদন্ত করুন না কেন, ধরা পড়ে যাচ্ছেন আপনার অ্যাসিস্ট্যান্টটির জন্য। এত অল্পবয়সে, সম্ভবত ওর গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট হয়নি, এখনই এই চাকরিটা ওর পাওয়ার কথা নয়।

    –ঠিকই, এই কেসে এটা আমার একটা দুর্বল দিক। মেনে নিলেন দীপকাকু।

    আগের কথার টোনেই কমলবাবু বললেন, আপনার উপর যে অ্যাটাকটা হল, সেটাও এই কারণে। পুলিশকে মারার সাহস সহজে কেউ করে না। কড়া তদন্তের মুখে পড়তে হয়।

    নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হচ্ছে ঝিনুকের। তার জন্যই দীপকাকুর প্রাণসংশয় দেখা দিয়েছিল। দীপকাকু অবশ্য পয়েন্টটাকে গুরুত্ব দিলেন না। কমলবাবুকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি ঘটনাটা কী করে জানলেন?

    –অলকেশের ভাইরা বলেছে। ওরা তো আমাকে ওদের ফ্যামিলির লোকই মনে করে।

    –কে আমার ওপর টবটা ফেলতে গিয়েছিল, এ ব্যাপারে কী বলছেন ওরা?

    –ওরা আপনাকে যা বলেছে, আমাকেও তাই। বিড়াল, হনুমান অথবা পাখিদের কাজ। ছাদের খিল তো লাগানোই ছিল। কে যাবে উপরে?

    দীপকাকু মোবাইল সেট বার করে ফেলেছেন। হুমকির এসএমএসটা স্ক্রিনে এনে মোবাইলটা দিলেন কমলবাবুর হাতে। মেসেজটা পড়ে কমলবাবু বলে উঠলেন, উরেঃ বাবা! এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার।

    এরপর কপাল কুঁচকে এসএমএসটার দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবতে লাগলেন কমলবাবু। ভাবনা শেষ করে বললেন, এমন নয়তো, টবটা পড়ার পর কেউ ওটাকে হুমকি হিসেবে কাজে লাগিয়েছে। লোকটা ঘটনার কাছাকাছি ছিল। এই নাম্বারে ফোন করে লোকটাকে ট্রেস করার চেষ্টা করেছেন?

    –করেছি। সিমকার্ডটা জাল। আচ্ছা, একটা আন্দাজ দিন তো, আমি যে ডাক্তারবাবুর মৃত্যু নিয়ে তদন্ত করছি, এতে কার স্বার্থে ঘা লাগছে?

    –এর উত্তর তো খুব সোজা। যে অলকেশকে খুন করেছে। যদিও অলকেশকে ধাক্কা মেরে ট্রেনের নিচে ফেলে দেওয়াটা নিয়ে আমার যথেষ্ট  সন্দেহ আছে। অলকেশের বোন শ্রাবণী সম্ভবত বানিয়ে বলছে ওটা। বড়দার টাকাকড়ি যাতে অন্য দুই দাদা হাতাতে না পারে তার জন্য বাড়িতে পুলিশ ঢুকিয়ে দিয়েছে।

    চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                                                       পরের পর্ব আগামী শুক্রবার

    রহস্য উপন্যাসের আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য নীচের শব্দে ক্লিক করুন

    আড়ালে আততায়ী

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More