আড়ালে আততায়ী: পর্ব ৯

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়

রেল পুলিশের দশ সিটের বড় গাড়িতে এ বাড়িতে এসেছে ঝিনুকরা। পুলিশের ড্রাইভার নিয়ে মোট ছ’জন এসেছে। অফিসার সাহার সঙ্গে আছেন দু’জন কনস্টেবল। যাঁরা এখন বাড়ির সদর দরজায় মোতায়েন। ডা. রায়ের বাড়িতে ঢোকার আগে জিআরপি’র গাড়ি একবার লোকাল থানায় গিয়েছিল। গাড়ি থেকে নেমে গিয়েছিলেন অফিসার সাহা। দীপকাকু গাড়িতেই ছিলেন। ঝিনুক দীপকাকুর কাছে জানতে চেয়েছিল, মি. সাহা লোকাল থানায় এলেন কেন?

উত্তরে দীপকাকু বললেন, ডা. রায়ের ঘর সার্চ করতে যাচ্ছেন জানাতে গেলেন। সার্চ করতে গিয়ে যদি কোনও ধরনের বাধা পান, মানে স্থানীয়রা অথবা বাড়ির লোক হয়তো মি. সাহাকে কাজ করতে দিল না। তখন লোকাল থানার ফোর্স গিয়ে সাহাবাবুকে হেল্প করবে। রেল পুলিশ লোকাল থানার সঙ্গে এমন যোগসাজশেই কাজ করে থাকে।

ডা. রায়ের বাড়িতে এসে কোনও বাধার মুখেই পড়তে হয়নি। দলবল নিয়ে সদর দরজার সামনে এসে কলিং বেল টিপে ছিলেন অফিসার সাহা। আগের দিনের মতোই দরজা খুলতে একটু সময় লেগেছিল। সেই ফাঁকে ঝিনুক খেয়াল করে দরজা পাশে ডাক্তারবাবুর নাম লেখা বোর্ডটা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাপস কুণ্ডুই খুলেছিলেন সদর দরজা। পুলিশি পোশাকের লোকজন দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিলেন বেশ। চেনা মুখ বলতে দীপকাকু আর ঝিনুক। পুলিশের পোশাক নেই দু’জনের পরনে। তাপস কুণ্ডু অসহায় দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়েছিলেন দীপকাকুর দিকে। দীপকাকু ওঁর সামনে গিয়ে জানালেন এ বাড়িতে আগমনের হেতু। তাঁর সঙ্গে এটাও বলেন, ডাক্তারবাবুর দু’ভাইকে ডেকে দিন। ঝিনুকদের ঘরে ঢুকতে দিয়ে তাপসবাবু বলেছিলেন, ছোটভাই এখন অফিসে। মেজকর্তা বাড়ি আছেন। উনি রিটায়ার করেছেন কিছুদিন হল। ওঁকে ডেকে দিই তা হলে?

–ডাকুন। এটা বলেছিলেন অফিসার সাহা।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক্তারবাবুর ভিজিটার্সদের ঘরে এসেছিলেন মেজভাই। মি. সাহা ততক্ষণে তাপস কুণ্ডুর চেয়ার টেবিলের দখল নিয়েছেন। যেখানে বসে তাপসবাবু পেশেন্টদের নাম ডাকতেন। অফিসার সাহাই কথা শুরু করেছিলেন ডা. রায়ের ভাইয়ের সঙ্গে। প্রথমে নাম জানতে চাইলেন। নাম, সমরেশ রায়। নামটা ঝিনুক জানত। বলেছিলেন ডা. রায়। অফিসার সাহা কী কারণে এসেছেন, জানালেন সমরেশবাবুকে। রেলের সার্চ অর্ডারটা দেখালেন। জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনার দাদার লিভিং রুমটা কোথায়?

–এই এক তলাতেই। প্রথমে এই ঘরটা। তারপর রুগি দেখার চেম্বার। পাশেই শোওয়ার ঘর, কিচেন, বাথরুম, বলেছিলেন সমরেশবাবু।

মি. সাহা বললেন, আপনার দাদার পোর্সানে যে যে জায়গায় চাবি দেওয়া আছে, সে চাবিগুলো কোথায় জানেন?

–সব চাবি আমার কাছেই আছে। নিয়ে আসছি এক্ষুণি। বলার পর কী একটু ভেবে নিয়ে সমরেশবাবু ফের বলেছিলেন। দাদার আলমারি থেকে বেশ কিছু দরকারি জিনিস আমি নিজের কাছে রেখেছি। চুরি হয়ে যাওয়ার ভয়ে। দাদার কম্পাউন্ডার দিনে এখানে থাকলেও, রাতে তো থাকে না, তাই।

–দরকারি জিনিস বলতে? এই প্রশ্নটা করেছিলেন দীপকাকু।

সমরেশবাবু বললেন, দাদার ব্যাঙ্কের কাগজপত্র, কুড়ি হাজার টাকা। আর একটা উইল।

–কিসের উইল? ফের দীপকাকুর প্রশ্ন।

উত্তরে সমরেশবাবু বলেছিলেন, দাদা এ বাড়ির নিজের অংশটা ছেলেকে দিচ্ছে। তার উইল।

অফিসার সাহা বললেন, ডা. রায়ের যা কিছু আপনার হেফাজতে আছে। সব নিয়ে আসুন।

জিনিসগুলো আনতে দশ মিনিটও লাগেনি সমরেশবাবুর। সেই ফাঁকে দীপকাকু তাপস কুণ্ডুর থেকে জেনেছিলেন এ বাড়ির গোটা পরিস্থি্তি। দুই ভাইয়ের পরিবারে সদস্য এবং কাজের লোক ক’জন, কে কোথায় থাকে? যা জানা গেল, একতলার পিছন পোর্সানে থাকেন ডা. রায়ের ছোট ভাই, যাঁর নাম কমলেশ রায়। স্ত্রী নিয়ে তাঁর পরিবার চার জনের। দুই সন্তানের একটি ছেলে অপরটি মেয়ে। সমরেশবাবু দোতলায় থাকেন, আগের সাক্ষাতে বলেছিলেন তাপস কুণ্ডু। এবার জানা গেল দোতলাটা পুরো বাড়ি জুড়ে নয়, বাড়ির হাফ পোর্সান। স্ত্রী এবং এক ছেলেকে নিয়ে সমরেশবাবুর তিনজনের সংসার। বড়ছেলেকে হারিয়েছেন আগেই। বাড়িতে সব সময়ের কাজের লোক বলতে একজন, হারু। ডাক্তারবাবুর দেখাশোনা হারুই করত। হারু এখন মেজকর্তার সংসারে কাজ করছে। বাকি তিনটে ঠিকে কাজের লোক আছে। যারা তিনজনে তিন ভাইয়ের পোর্সানে কাজ করে। ডাক্তারবাবুর ঠিকে কাজের লোকটিকে আসতে মানা করেছেন মেজকর্তা। তাপসবাবুর তো এখন বিশেষ কোনও কাজ নেই। ডা. রায়ের পোর্সানটা উনিই ঝাড়পোছ করে পরিস্কার রাখছেন।

দীপকাকু তাপস কুণ্ডুর সঙ্গে কথা থামিয়েছিলেন সমরেশবাবুকে ঘরে ফিরে আসতে দেখে। সমরেশবাবুর এক হাতে ছিল চাবির গোছা। অন্য হাতে প্লাস্টিকের ক্যারি ব্যাগ। ব্যাগের মধ্যে ছিল ব্যাঙ্কের কাগজপত্র, নগদ টাকা, উইল। সব কিছু টেবিলের উপর রেখেছিলেন। চেয়ারে তখন অফিসার সাহা। দীপকাকুর জন্য একটা টুল এনে দিয়েছিলেন তাপস কুণ্ডু। জহর সাহা, দীপকাকু কাগজপত্রগুলো খুঁটিয়ে দেখলেন। নগদ টাকাগুলো গুনলেন। পাঁচশো আর একশোর নোট। খুচরো নোট ছিল সামান্যই। দুজনেই উইলটা পড়ে দেখে নিলেন। গোটা কাজটা করতে মিনিট পঁয়তাল্লিশ মতো লেগেছিল। ক্যারিব্যাগে আনা জিনিসপত্র সমরেশবাবুকে ফেরত দিয়ে দীপকাকু বলেছিলেন, এগুলো আপনার হেফাজতেই রাখুন।

ব্যাগটা নিয়ে চলে গিয়েছিলেন সমরেশ রায়। আর আসেননি। ঝিনুক তখন ভেবেছিল। যাক কাজ প্রায় শেষ হল। দীপকাকু তো ডা. রায়ের সম্পত্তির খতিয়ান বুঝতে চেয়েছিলেন, সেটা তো হয়ে গেল। কিন্তু দেখা গেল, তা নয়। ডাক্তারবাবুর তিনটে আলমারি আছে, সমরেশবাবুর এনে দেওয়া চাবি দিয়ে এক এক করে সেগুলো খুলেছেন দীপকাকু। ভিতরের জিনিসপত্র দেখলেন অনেকক্ষণ ধরে। তিনটে আলমারির একটা ছিল শোওয়ার ঘরে, একটু আগে সেটার সার্চিং সেরে দীপকাকু চলে এসেছেন ডাক্তারবাবুর রিডিং টেবিলের কাছে। সেখানকার কাগজপত্র দেখছেন। পাশে আছেন অফিসার সাহা। দীপকাকুর কথা মতো উনি সার্চ করার অ্যাক্টিং করে যাচ্ছেন।

তদন্তের এই খানা তল্লাশি পর্বটা ঝিনুকের সব চেয়ে বোরিং লাগে। সেটা আরও বিরক্তিকর হয়ে ওঠে, যখন ঝিনুক বুঝতে পারে না দীপকাকু আসলে ঠিক কী ধরনের সূত্রের সন্ধানে আছেন। ঝিনুকের কেমন জানি মনে হচ্ছে এই কেসটাতে দীপকাকু বেশ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। নিজের অনুমানগুলোকে সঠিক প্রতিপন্ন করতে হাতড়াচ্ছেন অদরকারি জিনিস। কেসে অগ্রগতি বলতে খুব সামান্যই। মোটরম্যানের অবজার্ভেশন শুনে দীপকাকু অনুমান করেছিলেন। মৃত্যুর আগের মুহূর্তে ডা. রায়ের মোবাইলে কোনও কল এসেছিল। শার্টের পকেট থেকে উনি ফোনসেট বার করতে গিয়েছিলেন। মিলে গেছে দীপকাকুর কথা। রেল পুলিশের হেফাজতে থাকা ডা. রায়ের মোবাইল চেক করে দেখা গেছে বিকেল চারটে দশে ফোন এসেছিল নামহীন নাম্বার থেকে। সেই নাম্বারটায় ফোন করা হলে শুনতে হচ্ছে, নাম্বার ডাজ নট এক্সিট। যে ফোন কোম্পানির নাম্বার, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন অফিসার সাহা। জানতে চেয়েছেন নাম্বার হোল্ডারের নাম-ঠিকানা। তথ্যগুলো দিয়েছে ফোন কোম্পানি। দেখা গেছে ঠিকানা অস্তিত্বহীন, নামটাও তার মানে মিথ্যে। বোঝাই যাচ্ছে জাল সিমকার্ড ব্যবহার করেছিল কেউ। ওই ধরনের ফেক নাম্বার থেকে ফোন করা মানেই ব্যক্তির উদ্দেশ্য সৎ ছিল না। হতেই পারে ট্রেন এসে পড়ার আগের মুহূর্তে ডা. রায়কে অন্যমনস্ক করে দেওয়ার জন্য কলটা করেছিল সে। ডা. রায়ের ফোনের কল লিস্ট থেকে দেখা যাচ্ছে  নাম্বারটা থেকে ওই একবারই  ফোন এসেছিল।

ডা. রায়ের কাছে আসা লাস্ট কল নিয়ে তদন্তটা অফিসার সাহা একাই করেছেন। দীপকাকুকে ফলাফল জানিয়েছেন ফোনে। আজ যখন ঝিনুকরা এ বাড়িতে আসার আগে জি আর পি থানায় গিয়েছিল, জহর সাহা দীপকাকুকে ডা. রায়ের ফোনের কললিস্ট দিলেন। মারা যাওয়ার আগের সাতদিনের লিস্ট। ওই ক’দিন যাদের ফোন এসেছে এবং  উনি যাকে যাকে ফোন করেছেন। সব আছে লিস্টে। দীপকাকুর সঙ্গে ফোন চলাচালি হয়েছে সেটাও আছে। চারটে নামহীন নাম্বার পাওয়া গেল। যার একটাতে দু’বার কল করেছেন ডাক্তারবাবু। নাম্বারটা থেকে কল এসেছে দু’বার। দীপকাকু চারটে নাম্বারের ইউজারদের ট্রেস করতে বলেছেন অফিসার সাহাকে। তদন্ত আছে এখন অবধি এই পর্যায়। এটাকে প্রাথমিক অবস্থাই বলা ভাল। আরও অনেকটা দূর যেতে হবে দীপকাকুকে… ঝিনুকের ভাবনা হোঁচট খেল একটা দৃশ্য দেখে। ডা. রায়ের রিডিং টেবিলে বসে দীপকাকু একটা কভার ফাইলের কাগজপত্র ঘাঁটছিলেন। হঠাৎ একটা কাগজ তুলে ভাঁজ করে শার্টের পকেটে পুরলেন। পোরার আগে চকিতে দেখে নিয়েছেন তাপসবাবু আর মি. সাহার অবস্থান। অর্থাৎ ওঁদের অগোচরে কাগজটা রাখতে চেয়েছেন নিজের কাছে। দীপকাকুর পরেই ঝিনুকও তাকিয়েছে ঘরের বাকি দু’জনের দিকে, অফিসার সাহা ক্লান্ত হয়ে ডা. রায়ের বিছনায় বসে আছেন। দীপকাকু কী করছেন সেদিকে লক্ষ নেই। তাপস কুণ্ডু দেওয়ালে হেলান দিয়ে দৃষ্টি নামিয়ে আছেন মেঝেতে।

কভার ফাইল বন্ধ করে যথাস্থানে রাখলেন দীপকাকু। চেয়ার থেকে উঠে পাশেই বইয়ের র‍্যাকের মুখোমুখি দাঁড়ালেন। দেওয়াল গর্ত করা র‍্যাক। সামনের কাঠের ফ্রেমের উপরে কাচের স্লাইডিং পাল্লা। কাচের এপার থেকে বই দেখতে দেখতে গলা তুললেন দীপকাকু, ডাক্তারবাবুর ওষুধের স্টক কোথায় আছে?

প্রশ্নটা তাপসবাবুর উদ্দেশে। চমকে মেঝে থেকে দৃষ্টি তুলে উনি বললেন, ওষুধের আলাদা ঘর আছে স্যার। ল্যাবরেটরি বলতে পারেন। ও ঘরে কাউকে অ্যালাউ করতেন না। আমাকেও না। রুগি দেখার আগে ওই ঘর থেকে একটা ওষুধের বাক্স নিয়ে এসে চেম্বারে বসতেন। রুগি দেখা হয়ে গেলে বাক্সটা রেখে দিতেন ওষুধের ঘরে। ঘরটায় তালা মেরে রাখতেন সব সময়।

কথাটা শুনে ঘুরে দাঁড়ালেন দীপকাকু। তাপসবাবুর দিকে তাকালেন ভালো করে। বোঝা যাচ্ছে ওঁর দেওয়া তথ্যটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে দীপকাকুর কাছে। বললেন, চলুন, ডাক্তারবাবুর ওষুধের ঘরটা এবার দেখি।

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                                                       পরের পর্ব আগামী শুক্রবার

রহস্য উপন্যাসের আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য নীচের শব্দে ক্লিক করুন

আড়ালে আততায়ী

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More